খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ১৩ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          মা শব্দটির ভার আমি এতোকাল না বুঝলেও ওই রাতে ঠিক বুঝতে পেরেছিলাম। আমাকে এনআইসিউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। বাবুর অক্সিজেন মাত্রা কমে গিয়েছিলো। পুরোটা শরীর হলুদ। আমার মেয়েটা হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। অনেকক্ষণ পর পর তার পেটে নড়ছে। মুখের নল দিয়ে দুধ খাওয়ানো হচ্ছে খুব সতর্কতার সাথে। আমার বুকটা মনে হচ্ছিলো ছিড়ে যাচ্ছে। এতোটা কষ্ট! আমার ছোট একরত্তি মেয়েটা কতটা কষ্ট সহ্য করছে। আল্লাহ এই কষ্টগুলো আমাকে কেন দিলেন না। আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না। মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলাম। তখন কাঁধে স্পর্শ পেলাম আমার সাহেবের। তিনি পর্বতশৃঙ্গের ন্যায় মতো দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখশ্রী কঠিন। চোখজোড়া শুষ্ক। যেন তিনি প্রস্তুত যেকোনো অনর্থের জন্য। আমি অসহায়ের মতো জিজ্ঞেস করলাম,
"আমার মেয়েটা বেঁচে থাকবে তো!"

সাহেবের চোখ যেন কাঁপলো কিঞ্চিত। কিন্তু স্বর স্বাভাবিক রেখে বললেন,
"যা হবার হবেই। আমাদের হাতে কিছু নেই! শুধু দোয়া করতে পারবো এটুকুই। মন শক্ত করতে হবে!"

কথাটা কানে যেতেই মনে হলো কেউ আমার বুকে ভোঁতা ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো। এই লোকটা এতো পাষাণ। অন্তত একটা সান্ত্বনা দিতে পারতো! আমার পেট কাটার যন্ত্রণাও এতোটা তীক্ষ্ণ ছিলো না। আমি বিতৃষ্ণা নয়ে তার দিকে চাইলাম। তারপর মুখ সরিয়ে নিলাম। আমার ব্লিডিং চলছে নামায পড়ার সুযোগ নেই। কিন্তু দোয়া তো করাই যায়। নয়তো আল্লাহর কাছে হাত পেতে বসে রইবো। আল্লাহ আমার আর্তনাদ কি ফিরিয়ে দিবেন! 
আমাদের সময় শেষ আমি গ্লাসের উপর দিয়ে আমার বাচ্চাটাকে একবার ছোঁবার চেষ্টা করলাম। তারপর ধীর পায়ে এগুলাম রুমের দিকে। আমার সাহেব আমাকে পিঠ ধরে আছেন যেন আমি পড়ে না যাই। আমি বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকালাম তার দিকে, কঠিন স্বরে বললাম,
"আমাকে ছুঁবেন না।"

তিনি শান্তচোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। হাত সরালেন না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই রাতটা ভয়ংকর ছিলো। আমি সারারাত শুধু দোয়া ইউনুস পড়েছি আর আল্লাহর কাছে আমার মেয়ের সুস্থতা চেয়েছি। সাহেব জেগে ছিলেন সারারাত। নামায শেষ করে নামাযের পাটিতেই তাকে ঝিম ধরে বসে থাকতে দেখলাম। তার চোখ মুখ কেমন মলিন। মধ্যরাতের দিকে আমার বাবুর শরীর আরোও খারাপ হলো। অক্সিজেন অনেক কম। আমাকে ডাক্তার বললেন,
"দোয়া করুন। আমাদের হাতে কিছু নেই!"

কথাটা শুনতেই আমার হাটু অসার হয়ে গেলো। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ধপ করে ফ্লোরে বসতেই আমার সাহেব আমাকে আঁকড়ে ধরলো। বুকে মাথাটা চেপে ধরে বললেন,
"শক্ত থাকো। শক্ত থাকো!"

সেই বিভীষিকাময় রাত কাটলো এনসিউএর বাহিরে। আমি এক ফোঁটা নড়লাম না। বাহিরের গ্লাসে চোখ রেখে বসে রইলাম। যেন পাহাড়া দিচ্ছি। আজরাইল (আঃ) কিছুতেই যেন আমার বাচ্চার রুহ না নিতে পারে। আমার সাথে সেই সারারাত সাহেবও দাঁড়িয়ে রইলেন। নার্স বের হতেই জিজ্ঞেস করতাম,
"শ্বাস চলছে? শ্বাস চলছে?"

আমার আহাজারি আল্লাহ কবুল করলেন। ভোরের দিকে আমার বাচ্চার অক্সিজেন লেভেল স্বাভাবিক হলো। ডাক্তার জানালেন,
"এখন স্ট্যাবল। চিন্তার আপাতত কারণ নেই। আরোও তিন-চার দিন থাকুক। জন্ডিসটা কন্ট্রোল করতে হবে।"

কথাটা শোনার পর আমার শরীরটা নিস্তেজ হয়ে গেলো। যেন একটা বিশাল ভার নেমে গেছে। গলার কাছে আটকে থাকা জড়ো হয়ে বসে থাকা বিষাদগুলো উবে গেলো। আমার শরীরটা একটু যেন হেলে গেলো। সাহেব আমাকে ধরলেন। আমি তার প্রশস্ত বুকে হেলান দিয়ে রইলাম। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে এলো। যেন কত ঘুম জমা! 

ঘুম যখন ভাঙ্গলো দেখলাম আমি আমার কেবিনের বিছানায়। সাহেব নেই। ঘরটায় আমি একা। একা থাকতে ভালো লাগে না আমার। কেমন যেন ভয় হয়। যদিও আমি সাহেবের উপর তখন খুব অভিমান করেছিলাম। তবুও দূর্বলপায়ে হেটে বাহিরে গেলাম তাকে খুঁজতে। নির্লজ্জ মনটার অভ্যাস হয়ে গেছে সাহেবের। সাহেবকে দেখা গেলো হাসপাতালের করিডোরে। ওখানে একটা ল্যান্ডলাইন আছে। তিনি কার সাথে কথা বলছেন,
"আমাকে বিশ হাজার টাকা ধার দে। বেতন পেলেই শোধ করে দিব। হাসপাতালের বিলটা জমা দিতে হবে। হাতে একটু শর্ট পড়ছে।"
"..."
"হ্যা হ্যা, তোদের ভাবি ভালো আছে। বাবু এখনো এনআইসিউতে। বুঝিস-ই তো। এখন ভালো আছে। দেখা যাক!"
"...."
"আরে না, আমি তো রিলিজের টাইমেই নিবো। তুই একটু যোগাড় করে রাখিস।"

ফোনটা রেখে তিনি আরেকজনকে ফোন করলেন, 
"হ্যালো, প্রণবদা! আমাকে কিছু ধার দিতে পারবে? এখন না দুই-তিন দিনের মধ্যে! হাজার বিশেক হলে হবে। আমি আগামী মাসের বেতন পেলে চুকিয়ে দিব।"
"..."
"হ্যা, একটু বিল এসেছে।"
"...."
"সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসাও তো সরকারীর মতোই হত। যে অবস্থায় ছিলো একটাও বাঁচতো না। টাকা তো আসবে যাবে। কয়েকটা টাকার জন্য জীবন নিয়ে তো ছেলেখেলা করা যায় না। কাননের কিছু হয়ে গেলে ওকে কোথায় পেতাম বলো! হাসপাতাল দামী কিন্তু চিকিৎসা তো ভালো। আমি বেতনটা আসলেই দিয়ে দিব। তুমি চিন্তা কর না।"

আমি আর দাঁড়ালাম না। কারণ সাহেব আমাকে দেখে ফেলবেন। আমার সামনে তার দূর্বলতা ধরা পড়ে যাবে। সাহেব কাউকে তার দূর্বলতা দেখান না। বাড়ির চারটা প্রাণের যা প্রয়োজন সব তিনি বিনা অভিযোগে পূরণ করেন। কখনো বলেন না, এতো কেন প্রয়োজন! সেই মানুষটা এখন আমার জন্য মানুষের কাছে ধার করছেন। নিশ্চয়ই তিনি কখনো চাননা আমরা কেউ এই দৃশ্য দেখি। তিনি হয়তো লজ্জা পাবেন। এই ভেবেই আমি সেখান থেকে সরে গেলাম। সাহেবের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভগুলো ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগলো। নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হলো। আমি কেন সাহেবকে বুঝি না! কেন এতো ছেলেমানুষী করি! এজন্যই তিনি আমাকে ভালোবাসেন না। 

—————

পাঁচ দিন পর আমার মেয়েকে এনআইসিউ থেকে বের করা হলো। আমার কোলে দেওয়া হলো ওই নরম শরীরটাকে। জন্ডিসের হলদেটে ভাব অনেকটা কমে এসেছিলো। ডাক্তার বললেন,
"বেশি করে বুকের দুধ খাওয়াবেন। আর ঠিক সাতটা থেকে রোদ লাগাবেন। জন্ডিস চলে যাবে।"

আমার ডাক্তারের দিকে খেয়াল নেই৷ আমি দেখছি আমার তুলতুলে মেয়েটাকে। ফর্সা একটা ছোট মুখ। নাকটা বাবার মতো বোঁচা। ভ্রু খুব পাতলা। নেই বললেই চলে। মাশাআল্লাহ চুল হয়েছে। একেবারে ঠোঁটগুলো লাল টকটকে। একটা জিনিস খেয়াল করলাম আমার মেয়ে দেখতে অবিকল আমার সাহেবের মতো। মনে হলো কেউ সাহেবকেই কপি করে ছোট একটা ভার্শন পেস্ট করে দিয়েছে আমার কোলে। কিন্তু আমার মেয়ের মুখে সেই কাঠিন্য নেই। আমার সাহেব কোমল মনের হলে তাকে যেমন দেখানো আমার মেয়ে ঠিক তেমন। কি সুন্দর ঘুমিয়ে আছে শান্ত ভাবে। ওজন কম হওয়ায় বাবুকে একদম হাওয়ার মতো মনে হলো। এতো নরম যে একটু চাপ দিলেই ভেঙ্গে যাবে। আমাদের হাসপাতাল ছয় তালা। ডাক্তার লিফট দিতে বারণ করেছে। লিফটে নাকি অক্সিজেন কম। তাই হেটে নামতে হবে। আমি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম,
"আপনি নিয়ে সিড়ি দিয়ে নামুন। আমার হাত কাঁপছে।" 
"এই টিকটিকির বাচ্চা আমার হাতের ফুঁকো দিয়ে পড়ে যাবে। এর থেকে যেখানে আছে ওইটাই ভালো। ক্লান্ত লাগলে ঠিক পেছনে পড়ে যাবে। আমি ধরে ফেলবো!"

আমার বাচ্চাকে টিকটিকির বাচ্চা বললো! কৃপাধারী হুতুমটার মাথাটা ফাঁটিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো আমার। খুব রাগী স্বরে বললাম,
"ও মোটেই টিকটিকির বাচ্চা না!"
"তো কি পেয়ারার বাচ্চা!"
"ও মুহাইমিন সরকার এবং কানন সরকারের বাচ্চা!"

সাহেব বাঁকা হাসলেন যেন। চোখ সরিয়ে বললেন,
"হয়েছে এবার কৃপা করে হাটলে ভালো হয়। পেয়ারার একটা মুখ হয়েছে, শুধু ফাও বকবক। যন্ত্রণা! যতসব!"

—————

বাবুকে নিয়ে বাড়ি ফিরতেই দেখলাম বাবা-মা এসেছে নাতিকে দেখতে। আমার শ্বাশুড়ি মা একটু অপ্রসন্ন ছিলেন। আশা করেছিলেন ছেলে হবে। কিন্তু আমার মেয়ে এতোই খেল দেখালো যে তাকে প্রথম কোলে নিয়ে তিনি অশ্রু ছেড়ে দিলেন। নরম শরীরটা বুকে দিয়ে বললেন,
"আমার বাড়িওয়ালি এসেছে!"

মিষ্টি আপু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
"নাম কি ভাবলে ভাবি? কি নামে ডাকবো আমাদের পুচুকে?"

আমি আড়চোখে তাকালাম সাহেবের দিকে। দুষ্টু কণ্ঠে বললাম,
"কৃপা!"

আমার নাম বলার সাথে কঠিন চোখে তাকালেন সাহেব। আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। সবাই মুখ ভসকালো। নাম পছন্দ হয় নি। মাঝে সাহেব ঠিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আমার কানে গমগমে স্বরে বললেন,
"হাসপাতাল থেকে ফিরতেই পেয়ারার ব্রেইনের পোকাগুলো নাচানাচি শুরু করেছে! ঘরে আসা হোক কৃপা করে! নিজের হাতে ব্রেইন পরিষ্কার করবো।"

—————

মা হওয়া বলা সোজা কিন্তু এই বিশাল দায়িত্বে আমি খাবি খেলাম। ছোট একটা মেয়ে আমার। কিন্তু তার গলা একটা ট্রান্সজিস্টর। ক্ষুদা লাগুক আর না লাগুক তার কাজ হলো কান্না করা। শুধু কান্না নয়। একটা চিৎকার দিয়ে মহোদয়া একেবারে লাল হয়ে যেতেন। শ্বাস আটকে ফেলতেন। নিঃশ্বাস নিতেন না। আমার কলিজায় তখন কামড় লাগতো। ধীরে ধীরে আয়ত্ত্ব হলো এটা আমার মেয়ের কান্নার ধরণ। আমি তাকে যখন বলতাম,
"শ্বাস নাও, শ্বাস নাও।"

সে শ্বাস নিত। সাহেব মুখ কুঁচকে বললেন,
"খুব বুঝে কথা!"
"তো আপনি শান্ত করুন!"

সাহেব ইতস্তত করতেন। তিনি কৃপাকে কোলে নিতেন না। পাশে দাঁড়িয়ে দেখতেন শুধু। এমন বাবা আমি কখনো দেখি নি। সাধারণত মেয়ের বাবাগুলো আহ্লাদী হয়। কিন্তু সাহেবের মধ্যে আহ্লাদের ছিঁটেফোঁটাও থাকতো না। মা যখনই বলতো,
"কোলে নে একটু"

তিনি একটু খসখসে স্বরে বলতেন,
"ঘাড় শক্ত হোক। কোলে নিলেই ভেঙ্গে যাবে তো!"

আবার বলতেন,
"যেভাবে তোমরা কাথা দিয়ে মুড়ে রাখো, আমার মনে হয় কাঁথার ভেতর থেকে টুপ করে পড়ে যাবে।"

কি অদ্ভুত কথা! কৃপাকে তাই তিনি একটিবার কোলে নিতেন না। শুধু তাকিয়ে থাকতেন ওর দিকে। ও আচ্ছা, আমার মেয়ের ভালো নাম কিন্তু কৃপা না। ওর নাম মুশফিকা বিনতে মুহাইমিন। মুশফিকা শব্দের অর্থ কৃপা। সবাই তাকে নানা নামে ডাকতো। কেউ পুচু, কেউ বাড়িওয়ালি আর আমি আড়ালে ডাকতাম কৃপা। আমার সাহেবের কৃপার ফল কি না! 

কৃপা দেখতে যেমন সাহেবের মতো, স্বভাবও সাহেবের ডুপলিকেট। সারাদিন তার কাজ কান্না করা। তাও যে সে কান্না না, বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করে কান্না। প্রথম দশ বারোদিন যা একটু ঘুমাতো, এর পর থেকে তার চোখে ঘুম নেই। এদিকে আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আমার কোল থেকে কারোর কোলে যাবে না। আমি যে একটু বাথরুমে যাবো তার জো নেই। কেউ কোলে নিলেই হিক্কিরি উঠিয়ে কাঁদতো যেন মানুষটা তাকে মেরেছে। আমি কোল থেকে বিছানায় শোঁয়ালেই ঠোঁটটা ফুলিয়েই একটা চিৎকার করতো। সেই চিৎকারে পুরো ঘর মাথায়। কেউ থামাতে পারতো না। আমি দুধ খাওয়ালে একটু শান্ত হতো। এই সময়ে আমার সহযোগী ছিলো দুজন মিষ্টি আপু আর জরিনা। জরিনা খ্যাটখ্যাটে স্বভাবের। কিন্তু বাচ্চাকাচ্চা পালায় সে খুব পারদর্শী। আমি কৃপাকে দুধ খাওয়াতে পারতাম না। নিপল ওর মুখে ঢুকাতে খুব যন্ত্রণা হত। জরিনাই আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলো। যদিও ঝামটি দিয়ে কথা বলতো,
"এতো বড় মাতারি কিন্তু বাচ্চারে দুধ খাওয়াইতে জানে না। অমনে দুধ খাওয়াইলে তো ওর পেটে যাইবো খালি পানি। তখন বারবার মুতবে। বেশি করে ঢুকাইতে হয়!"

ঝামটি মারলেও সে আমার কাঁধ ছাড়া হত না। একেই সিজারের যন্ত্রণা। উপর থেকে কৃপার মা-ঘেষা স্বভাব। জরিনা ছাড়া আমি অন্ধপ্রায়। কৃপাকে গোসল করাতে পারতাম না। জরিনাই আমাকে সাহায্য করতো। আর রান্নাবান্না করতো মিষ্টি আপু। শাহনেওয়াজ সাহেব সকালে মিষ্টি আপুকে দিয়ে যেতেন আর রাতে এসে নিয়ে যেতেন। মিষ্টি আপুকে তিনি প্রচুর ভালোবাসতেন। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম,
"তুমি সুখী তো আপু?"
"উনি খুব ভালো মানুষ ভাবী। উনাকে ঠকানোটা অন্যায় হবে!"

আমার খুব খুশী লাগলো। এই মানুষটার সুখ আমি সর্বদা কাম্য করি। আমার মিষ্টি আপু সুখে থাকুক। আমার সাহেবটাও যদি ভালো মানুষ হতেন! 

এর মধ্যে বাঁধলো বিপদ। আমার সেলাইয়ে ইনফেকশন হলো। সেই থেকে এক রাতে তীব্র জ্বর। আমি চোখ খুলতে পারছি না। গায়ে তীক্ষ্ণ ব্যথা। মনে হচ্ছে কেউ পিটিয়েছে। সেই যন্ত্রণায় আমি বেহুশ প্রায়। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। এদিকে কৃপা গলা ছেড়ে চিৎকার। লাল লাল ঠোঁট ফুলিয়ে কি কান্না মেয়ের। আমি শুনছি কিন্তু তাকে কোলে তোলার শক্তি নেই। এদিকে সাহেব পড়লেন বিপাকে। কাকে সামলাবেন? প্রতি রাতে আমি কৃপাকে বুকের উপর নিয়ে ঘুমাই। সারা রাত মাঝে মাঝে হাটি যেন মেয়ে ঘুমায়। আজ কে মেয়েকে কোলে নিবে! হঠাৎ আবছা চোখে দেখলাম সাহেব কৃপাকে কোলে নিয়েছেন। সোজা করে ঘাড়ে নিয়েছেন। বিড়বিড় করে সূরা পড়ছেন, আর হাটছেন। কৃপার কান্না ধীরে ধীরে থামলো। একটা সময় আমার তেজী, জেদি মেয়ে বাবার কোলে ঘুমিয়ে গেলো। সাহেব তখন নরম গলায় বললেন,
"তুই তো দেখছি একেবারে মায়ের ডুপ্লিকেট। স্বভাব একদম মায়ের মতো, দেশি পেয়ারা মার্কা। শুধু সাইজটা মায়ের থেকে ছোট। তোর মা হলো গ্যাদা পেয়ারা পার্ট ওয়ান আর তুই পার্ট টু।"

সেদিন কিছু একটা বদলালো, যে সাহেব শুধু মেয়ের দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইতেন। সেই সাহেবের চোখের মনি হলো আমার মেয়ে, তার পেয়ারা পার্ট টু।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp