ভাঙা আয়নার আলো - পর্ব ১৪ - শারমিন আক্তার সাথী - ধারাবাহিক গল্প

ভাঙা আয়নার আলো - শারমিন আক্তার সাথী
          কফি মগ নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে জবা৷ এই সাত সকালেও প্রকৃতি কেমন রুক্ষ। শীতের শেষে পাতঝড়ার এ মৌসুমে প্রকৃতি যেন রুক্ষতায় কাঁদছে। এই ভোরবেলাতেও প্রকৃতির মুখে হাসি নেই। শীতের শেষ প্রহরে ঝরে পড়া পাতাগুলোর মতোই নিঃশব্দ কষ্ট ছড়িয়ে আছে চারপাশে। হাওয়া বয়ে যায়, কিন্তু তাতে প্রাণ নেই। শুধু শুষ্কতার দীর্ঘশ্বাস। শীত বিদায়ের ক্লান্তি আর পাতাঝরার নিঃসঙ্গতায় প্রকৃতি আজ কেমন নির্জীব। গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে, অথচ তাদের ভেতরে যেন একরাশ শূন্যতা। ভোরের আলো এসে ছুঁয়ে গেলেও প্রাণ জাগেনি প্রকৃতির। পাতাঝরার বিষণ্ণতায় যেন নিজের ভেতরেই ডুবে আছে, রুক্ষ আর নিঃসঙ্গ। ঠিক জবার মনের মতো।

জবার হাতে থাকা কফি কখন বরফ শীতল পানি হয়ে গেছে সে দিকে খেয়াল নেই ওর। কিছু ভাবছে ও। ভেবেই চলছে অনর্গল অথবা অনর্থক। ফারিস এসে জবার এ অবস্থা দেখে, নিচে গিয়ে আবার দু মগ কফি আনল। জবার হাতের কফিটা নিল। ধ্যান ভাঙল জবার। বলল,
'মগটা নিলেন যে?'
'হট কফি সেই কখন কোল্ড কফি হয়ে গেছে খেয়াল আছে? এই নে গরম কফি।'

জবা তপ্ত গরম কফিতে বেখেয়ালে চুমুক দিয়েই জিব পুড়ল জবা। অসাবধানতায় কফি ছলকে হাতেও পড়ল। মগও হাত থেকে পড়ে গেল৷ ফারিস দ্রুত টেবিলে থাকা পানির গ্লাস দিয়ে হাতে পানি ঢালল। পানি খেতে বলল।
তারপর জবার হাত ধরে বলল,
'বার্নজেল কোথায়?'
'আমার রুমে।'
'চল।'

ফারিস খুব যত্ন করে জবার হাতে জেল লাগিয়ে বলল,
'খুব জ্বলছে?'
'ভিতরটা যেখানে জ্বলেপুড়ে ছাই সেখানে হাতের এ জ্বলনে জ্বলছে না।'

ফারিস আর ওর কথার প্রতিত্তোরে করল না। মনোযোগ দিয়ে জেল লাগাতে লাগল। জবার জ্বলছে ভীষণ জ্বলছে ওর হৃদয়টা। হু হু করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ফারিসের সামনে কাঁদতে ইচ্ছা করছে না। তাতে ফারিস হয়তো ওকে দুর্বল ভাববে।

জবার মনের গোপন কথা খুব সহজে পড়ে নিল ফারিস। বলল,
'কাঁদতে মন চাইলে কাঁদতে পারিস। আমি তোকে তাতে দুর্বল ভাবব না। মনের কষ্ট মনে লুকিয়ে কাঁদতে না পারা আমার মতে দুর্বলতা।'

জবা যেন এ কথার অপেক্ষায় ছিল। দু হাতে মুখ ঢেকে অনেকক্ষণ কাঁদল। জবা যতক্ষণ কাঁদল ফারিস ততক্ষণ ওর পাশে স্থির হয়ে বসে ছিল। কোনো শান্তনা দেয়নি। কোনো মহান বানীও শোনায়নি। ও শুধু জবার সাথে থেকেছে। জবাকে এটা বুঝিয়েছে ও সবসময় ওর সাথে আছে।

জবা স্বাভাবিক হওয়ার পর ফারিস বলল,
'এতকিছুর পরও সিনথিয়াকে কেন তোর বাড়ি রাখলি? এ দোষ কিছুটা তোর উপর বর্তায় না, নাকি?'

'আমি ইরফানকে শেষ আরেকটা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। দেখতে চেয়েছিলাম ক্ষমা করলে বা সুযোগ পেলে ও আবার আমার বিশ্বাস ভাঙে কি না? মনের কোণে কিঞ্চিৎ আশা ছিল আর আমায় ধোঁকা দিবে না। সে আশাও শেষ হয়ে গেল। আর সিনথিয়া, ইরফান যা করেছে, তার শাস্তি দিতে হলে ওদের আমার চোখের সামনে থাকতে হবে।'

'কী শাস্তি দিবি ওদের?'
'সিনথিয়াকে কী শাস্তি দিব তা ভেবে ফেলেছি। ভেবে পাচ্ছি না ইরফানকে কী শাস্তি দিব? ওর অনেক দুর্বল পয়েন্ট থাকলেও কোনোটাই ওর বিপক্ষে এত সহজে ব্যবহার করা যাবে না। শিয়ালের মতো ধূর্ত। হায়নার মতো হিংস্র ও। ওকে একটা আঘাত করলে ও তার তিনটা ফিরিয়ে দিবে।'

'তাহলে ওকে একটা দুটো আঘাত করে পরাস্ত করা যাবে না। ওকে একসাথে এতবেশি আঘাত করতে হবে যে কোনটার প্রতিক্রিয়া কিভাবে দিতে হবে তা ভাবারই সময় না পায়। ও প্রতিক্রিয়া করার আগে আমরা আবার ওকে আঘাত করব। একসাথে কয়টা আঘাত সহ্য করবে ও?

একটা একটা করে ক্রমান্বয়ে রইয়ে সইয়ে আঘাত করলে ওর তা সয়ে যাবে। ও তোর অ্যাথিক্স বুঝে যাবে। কিন্তু একসাথে যখন সকল আঘাত আসবে তখন ও দিশেহারা হবে। ভাবনা লোপ পাবে। কাউন্টার করার সময় সুযোগ পাবে না। একইসাথেই শেষ হয়ে যাবে।'

জবা খানিক সময় মৌন থেকে বলল,
'হুমম গুড আইডিয়া।'
'ইরফানের সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্ট কী? সেখানে আঘাত আগে কর। তাহলে ও আগেই ভেঙে পড়বে। সেই ভাঙনে তুই একসাথে অনেক আঘাত করবি। দেখবি ও শেষ হয়ে গেছে।'

'সেটা সম্ভব নয়।'
'বুঝলাম না।'
'ওর সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্টে আঘাত করা সম্ভব নয়।'
'কেন?'
'ইরফানের সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্ট জারা৷ কিন্তু জারাকে টার্গেট করে কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। জারা কেবল ইরফানেরই নয়, আমারও সবচেয়ে বড়ো উইক পয়েন্ট।'

ফারিস কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
'ইরফানের আর কেউ প্রিয় নেই?'
'না। জীবিত বলতে ওর তেমন কোনো আত্মীয় নেই। ওর রক্ত বলতে এখন কেবল জারাই আছে।'
'জারাকে ওর থেকে দূরে নিয়ে গেলে ও কষ্ট পাবে না?'

'পাবে। অনেক কষ্ট পাবে, কিন্তু জারাও অনেক কষ্ট পাবে। আমি চাই না আমাদের সম্পর্কের খারাপ প্রভাব জারার উপর পড়ে।'
'তুই কী সারাজীবন ইরফানের সাথে থাকবি?'
'অসম্ভব।'
'তাহলে বিচ্ছেদ হলে জারা ইরফানের সাথে থাকবে?'
'কখনো না। আমার মেয়ে ওর সাথে থাকলে ওর মতো বিবেকহীন হবে। আমি তা কখনো চাই না।'

'তাহলে জারাকে আগে থাকতে তেমন করে তৈরি কর। ওকে মানসিকভাবে স্ট্রং করে তোল। ওর বাবার সত্যিটা ধীরে ধীরে ওর সামনে আন। যখন ও বুঝতে পারবে ওর বাবা কেমন; তখন এমনি ইরফানের কাছ থেকে দূরে চলে যাবে। আর সেটাই ইরফানের সবচেয়ে বড়ো শাস্তি হবে।'

'জারা এখন এত ছোটো। ওর মনে নেগেটিভিটি ঢুকাতে চাই না আমি।'
'সত্যি কখনোই নেগেটিভিটি হয় না। বরং ওর থেকে সত্যি লুকিয়ে, ইরফানের থেকে তুই আলাদা হলে; তখন ও বড়ো হয়ে নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবে কেন ওর বাবাকে ছেড়েছিলি? সে প্রশ্নের উত্তর তখন কীভাবে দিবি? তার চেয়ে এখন থেকে ওকে সত্যিটা জানালে ও ছোটোবেলা থেকেই মেন্টাললী স্ট্রং হবে। আর ইরফানও ওর মন ঘোরাতে পারবে না।'

'ও ছোটো। খুব ছোটো।'
'আট বছরের বাচ্চা যথেষ্ট বুঝদার এবং ম্যাচিওর আমার মতে। আমার ফিরনাস কিন্তু জানে ও আমার পালিত ছেলে। ছোটোবেলায় আমি কেন দত্তক নিয়েছিলাম তা কিন্তু ও জানে। ওকে আমি নিজ থেকেই আগেই বুঝিয়ে বলেছি। বাইরের কারও থেকে জানলে ও হার্ট হতো বেশি। কিন্তু আমি আমার মতো বুঝিয়ে বলার পর সুন্দর বুঝেছে। জারার ক্ষেত্রেও তার বিপরীত নয়৷ ও বাইরের কারও থেকে তোদের সম্পর্কে জানলে ওর তখন দিশেহারা হয়ে যাবে। তোকেই হয়তো ভুল বুঝবে। কিন্তু তুই বুঝিয়ে বললে ঠিক বুঝবে। তখন তোকে সাপোর্টও করবে।'

'কিন্তু এ বিষয়ে ওর সাথে আমি কথাই বা বলবো কী করে?'
'ধীরে ধীরে ওকে ক্রমান্বয়ে বোঝাবি। একসাথে নয়। আকার ইঙ্গিতে বোঝাবি। যাতে ও মনে কষ্টও না পায় এবং বুঝতেও পারে।'

জবা ভাবল এটাই হয়ত ঠিক হবে। এতে জারাও ভালো থাকবে। ওর কাছে থাকবে আর ইরফানেরও শাস্তি হবে।

তবে জবা যে কাজ করার কথা এখন ভাবছে ইরফান তা অলরেডি করা শুরু করেছে। খাবার টেবিলে জারাকে কোলে নিয়ে ইরফান ওকে খাইয়ে দিতে দিতে বলল,
'মাম্মা আমি দূরে গেলে তুমি থাকতে পারবে?'
'তুমি কোথায় যাবে বাবা?'
'আগে বলো থাকতে পারবে কি না?'
'কখনো না। মাকে ছাড়া থাকতে পারবে?'
'না।'

'যদি তোমাকে কখনো কেউ বলে তুমি শুধু বাবা বা মা যে কোনো একজনকে বেঁছে নাও, তখন কাকে নিবে?'
'কে বলবে?'
'আচ্ছা মা যদি তোমাকে বলে আমাকে ছেড়ে তার কাছে থাকতে তুমি থাকবে?'

'তোমাকে ছেড়ে কেন থাকতে বলবেন মা? আমরা তো একসাথে থাকব। আমি তোমাকে আর মা কে দুজনকে ছাড়া কখনো থাকতে পারব না।'
'আচ্ছা ধরো তোমার যদি বলে বাবার সাথে থাকতে পারবে না তাহলে তাকে কী বলবে?'
'আমি মাকে বোঝাব। সে যাতে একসাথে থাকে তেমন করেই বুঝাব। আমি তো তোমায় ছাড়া থাকতেই পারব না।'

'গুড। এটাই শুনতে চেয়েছিলাম। এখন চলো তোমাকে স্কুলে দিয়ে আসি।'
'মা আজ এত সকালে কোথায় গেছেন?'
'জরুরি কাজ ছিল তার।'

ইরফান জারার হাত ধরে ভাবল, জবাকে এখন মেন্টাললী ব্রেকডাউন করার একটাই মাধ্যম সে হলো জারা। আবার জবার বিশ্বাস অর্জন করে জবার সব হাতিয়ে নেওয়ার জন্য জারাকেই মাধ্যম বানাতে হবে।

নাস্তা করে ইরফান জারাকে নিয়ে স্কুলে গেল। যাওয়ার আগে টিকলিকে বলল,
'তোমার ম্যাডাম আসলে আমাকে কল করতে বলো৷ তার ফোন বন্ধ।'

টিকলি মাথা কাঁধ করে সম্মতি জানাল। এ লোকটাকে এখন ওর অসহ্য লাগছে। ভয়ও লাগছে। মনে হচ্ছে নর্দমার কীট। যার চারপাশ থেকে গন্ধ ছড়াচ্ছে। জবার মতো স্ত্রী ছেড়ে যে সিনথিয়ার মতো তৃতীয় শ্রেণীর মেয়ের কাছে যেতে পারে, তাকে ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কবে না আবার এ বাড়ির কাজের লোকদের উপর নজর দিয়ে বসে।

ইরফান যেতেই সিনথিয়া টেবিলে বসে নাস্তা খেতে লাগল। বসা আর খাওয়ার ভঙ্গি এমন যেন ও এ বাড়ির মালিক। টিকলির তা দেখে রাগে গা জ্বলে গেল। মনে মনে সিনথিয়াকে খা* নকি, বে** বলে ভৎসনা করতে লাগল এবং বেশ রাগী কণ্ঠে বলল,
'আপনি জবা আপার চেয়ারে বসছেন কেন?'

তাচ্ছিল্য হেসে সিনথিয়া বলল,
'চেয়ারে কারও নাম লেখা আছে না কি?'
'হ আছে। এটা জবা আপার চেয়ার। তার চেয়ারে অন্য কারো বসা মানা। আপনি উঠেন। আর বাড়ির কাজের লোকদের খাবার টেবিল তো রান্নাঘরেই আছে।'
'আমি এ বাড়ির কাজের লোক নই। কদিন পরই বুঝতে পারবে।'

টিকলি বুঝতে পারল কাল রাতের পর সিনথিয়ার সাহস অতিরিক্ত বেড়েছে। ও ভেবেই নিয়েছে জবা আসলে আজ সব বলবে।

—————

জারার স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জবা৷ স্কুল ছুটি হতে এখনও বেশকিছু সময় বাকি আছে৷ ও গাড়ি থেকে বের হয়ে দাঁড়াল। শীতের শেষের দুপুরের এ রোদটা গায়ে বেশ বসে যায়। শীতের দুপুরের রোদের মতো মিঠা রোদ না। বরং গা জ্বালানো তপ্ত রোদ। 

সামনে বিশাল ক্যাফেটোরিয়া। দুপুরের এ সময়টায় জায়গাটা কেমন অচেনা লাগে। ভিড় নেই, কোলাহল নেই। শুধু ফাঁকা টেবিল আর চেয়ারের সারি। যেন একটু আগে পর্যন্ত হাসি-আড্ডায় ভরা জায়গাটা হঠাৎ করেই নিঃশব্দ হয়ে গেছে।

কাঁচের দরজার ওপাশে দেখা যায় দু-একজন কর্মচারী ধীর গতিতে কাজ করছে। কোথাও একটা কফির হালকা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, কিন্তু তাতে কোনো টান নেই, বরং একটা নির্জনতার অনুভূতি বাড়িয়ে দেয়।

রোদের তাপে কাঁচের দেয়াল ঝলমল করছে, আর সেই আলোয় ক্যাফেটোরিয়ার ভেতরটা আরও বেশি ফাঁকা, আরও বেশি নিরাবেগ মনে হচ্ছে। যেন জায়গাটা নিজেও অপেক্ষা করছে, ছুটির ঘণ্টা বাজলেই আবার প্রাণ ফিরে পাবে বলে।

জবা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এত বড় জায়গা, অথচ এই মুহূর্তে কত নিঃসঙ্গ! ঠিক ওর নিজের মনের মতো বাইরে শক্ত, ভেতরে ফাঁকা। 

ফস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে জবা ভিতরে ঢুকে বসল। ওকেই দেখেই ওয়েটার স্বাগতম জানিয়ে বসতে বলল। আজ সকালে জবা নাস্তা করেনি। পেট ক্ষুধার জানান দিচ্ছে। ও রেড ভেলভেট পেস্ট্রি আর ব্ল্যাক কফি অর্ডার করল। এ ক্যাফের পেস্ট্রি খুবই বিখ্যাত। 

জবা এক চামচ পেস্ট্রি মুখে দিয়ে চুপ করে বসে রইল। সত্যি অনেক বেশি সুস্বাদু এ পেস্ট্রি। কিন্তু মন ভালো না থাকলে মিঠা খাবারও অসহ্য লাগে। অথচ মিষ্টি খাবার ওর মন ভালো হওয়ার অন্যতম কারণ।

ক্যাফের বাইরে কিছু সুবিধাবঞ্চিত শিশু ফেলনা বোতল, প্লাটিক কুড়াচ্ছে। জবা এদের জন্য সবসময় কিছু করার চেষ্টা করে। ওর মনে হয় পৃথিবীর সব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগবে। আর কিছু না হোক মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে চায়। আগে নিজেই এসব কাজ মাঠে নেমে করত। কিন্তু ইরফানের প্রতারণার পর মেন্টাললী এতটা ভেঙে পড়েছে যে প্রতিমাসে নির্দিষ্ট অ্যামাউন্টের টাকা পাঠিয়ে দেয়।

জবা ওয়েটারকে বলে বাচ্চাগুলোকে ভিতরে ডাকতে বলল। খুব ভয়ে বাচ্চাগুলো ভিতরে আসল। জবা সবাইকে কেক আর জুস দিতে বলল। বাচ্চারা যখন খাচ্ছিল জবা তখন বিল মিটিয়ে আবার স্কুলের গেটের সামনো গেল। স্কুলে ছুটির ঘন্টা বাজল।

কিছুক্ষণ পর জারা বের হলো। বিষন্ন মুখ। চোখ ভর্তি পানি টলমল করছে। জবা ওর কাছে গিয়ে বলল,
'কী হয়েছে, জারা? তোমার মুখ এমন কেন? চোখে পানি কেন?'
'আমার ফ্রেন্ড এশা আমার সাথে চিট করেছে।'
'কি নিয়ে চিট করেছে মা?'

'গত কদিন যাবত আমরা বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম। একসাথে বসতাম। আমরা একে অপরের জন্য বেঞ্চে জায়গা রাখতাম। গতকাল রাইমা ওকে ক্যাটবেরি দিয়েছে। তখন থেকে ওরা নাকি বেস্ট ফ্রেন্ড। এশা বলেছে আমার সাথে আর চলবে না। রাইমা ওকে রোজ চকলেট দিবে, সে কারণে ও রাইমার সাথে চলবে।'

জবা হেসে বলল,
'মা, তোমার এমন বন্ধুর প্রয়োজনই-বা যে সামান্য একটা চকলেটের লোভে তোমাকে ছেড়ে যায়? যে বন্ধু সে সবসময় পাশে থাকে। সে তুমি তাকে চকলেট দাও বা না দাও। সত্যিকারের বন্ধুত্বে কখনো বিনিময় হয় না মা। তা নিঃস্বার্থ হয়। নিশ্চয়ই তুমি এমন কোনো বন্ধু পাবে যে চকলেটের লোভে নয়, বরং তোমাকে ভালোবেসে বন্ধুত্ব করবে। এমন কাউকে নিশ্চয়ই পাবে। এখন বাড়ি চলো।'

গাড়িতে উঠে চকলেট পেস্ট্রির বক্স দেখে জারা জিজ্ঞেস করল,
'এগুলো কার মা?'
'তোমার।'
'ইয়ে...। আই লাভ ইউ মা। আমি এখন খাব?'
'নো। বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে তারপর খাবে।'
'ওকে।'

গাড়ি চালাতে চালাতে জবা জারাকে বলল,
'জারা..!'
'জি মা।'
'যারা চিট করে তারা কী ভালো?'
'মোটেও ভালো না।'
'তুমি কী আর এশার সাথে মিশবে?'
'নো।'
'কেন?'
'কারণ সে সামান্য চকলেটের লোভে আমায় ছোটো করেছে। চিট করেছে।'

'কেউ যদি এশার চেয়েও খারাপ কিছু করে আমাকে চিট করে তাহলে কি আমার তার সাথে থাকা ঠিক হবে?'
'মোটেও না।'

'এশা যেমন সামান্য একটা চকলেটের জন্য তোমাকে কষ্ট দিয়েছে, তেমনি আমার একটা বন্ধুও খুবই সস্তা একটা জিনিসের জন্য আমাকে খুব আঘাত করেছে। চিট করেছে। কষ্ট দিয়ে আমাকে শেষ করে দিচ্ছে। আমার কি তার সাথে বন্ধুত্ব রাখা ঠিক হবে?'

'একদম না মা৷ তুমি তাকে শিক্ষা দিবে। এবং তার সাথে সকল বন্ধুত্ব শেষ করে দিবে।'
'তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে?'
'অবশ্যই মা।'
'তোমার সিনথিয়া মিসকে তোমার কেমন লাগে?'

'আগে খুব ভালো লাগত। এখন একদম ভালো লাগে না।'
'কেন?'
'সে খুব পঁচা।'
'কেন মা?'
'সেদিন সে বলল, সে যদি আমার নতুন মা হয় তাকে আমি মা ডাকব কি না? সে কেন আমার হবে?'

জবার ভিতরটা কেঁপে উঠল। রাগে হাতও কাঁপছিল। দ্রুত ব্রেক কষলো গাড়িতে। তারপর বলল,
'এ কথা সিনথিয়া তোমাকে বলেছে?'
'হ্যাঁ।'
'তারপর তুমি কী বললে?'
'আমি বলেছি আমার মা ছাড় পৃথিবীতে কেউ আমার মা হবে না।'

'গুড গার্ল।'
'তারপর আজ সকালে দেখলাম সে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমার তখন খুব রাগ হয়েছিল। সে কেন আমার বাবাকে জড়িয়ে ধরবে।'

রাগে জবার ভিতরে বিস্ফোরণ হলো। এত নিচে নেমে গেছে ওরা? একটা বাচ্চার সামনেও নিজেকে সংযত করছে না? জবা গাড়ি ঘুরিয়ে ওর বাবা বাড়ির গেল সোজা। জারাকে বুঝিয়ে সেখানে রেখে ও সোজা বাড়ি আসল। ও চায় না বাড়ির তামাশা জারার ছোট্ট মনে খারাপ প্রভাব ফেলুক।

জবা ভিতরে ঢুকে দেখল সিনথিয়া খাবার টেবিলে বসে খাচ্ছে। জবা রাগে ডালের বাটি সিনথিয়ার মাথায় ঢেলে পরপর কয়েকটা চড় মেরে বলল,
'আমার মেয়ের নতুন মা হতে চাস? তোর শখ তো কম না। তোর আমি এমন অবস্থা করব যে তুই নিজেও বুঝতে পারবি না কী করবি।'

তারপর টিকলিকে ডেকে বলল,
'টিকলি, ও এই টেবিলে কী করে খায়? ওর এত সাহস হলো কী করে? ওকে তো বলেছি নিচে বসে খেতে।'
টিকলি ভয়ে ভয়ে বলল,
'আমি তাকে বলেছি। সে আমার কোনো কথাই শোনেনি। উল্টো তেজ দেখিয়ে বলল, দুদিন পর এসব তারই হবে।'

জবার গা রাগে এত জ্বলছে যে এখনি সিনথিয়াকে খুন করে ফেলতে পারে। কিন্তু ও তা করবে না। নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করল অনেক কষ্টে। তারপর বলল,
'আজ থেকে ও আউটহাউজে থাকবে। সেখানে থাকতে পারলে থাকবে নয়তো যেখানে খুশি যাক। ওর সব জিনিসপত্র আউটহাউজে দিয়ে আসিস।'

—————

রাত ঠিক নয়টা।
চারপাশে এমন এক নীরবতা নেমে এসেছে, যেন শব্দ নিজেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শহরের কোলাহল এখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই হার মেনে যায়। শুধু দূরে কোথাও মৃদু গাড়ির আওয়াজ, তাও যেন খুব ক্ষীণ, খুব দূরের কোনো স্মৃতি।

আকাশ ভরা অন্ধকার, তবু তারার ক্ষীণ আলোয় রাতটা কেমন গভীর হয়ে উঠেছে। হালকা শীতের বাতাস ছাদ জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্পর্শে শীতলতা অথচ অদ্ভুতভাবে শূন্য। মাঝে মাঝে শুকনো পাতার মচমচে শব্দ সেই নীরবতাকে আরও প্রকট করে তোলে।

এই নিস্তব্ধতার মাঝেই ছাদের এক কোণে বসে আছেন মোস্তফা হোসেন। সামনে খোলা বই, কিন্তু চোখ বারবার আটকে যাচ্ছে অক্ষরের ফাঁকে ফাঁকে।

পড়ায় মন নেই। মন চলে যাচ্ছে বহু বছরের পুরোনো কোনো সময়ের দিকে। আজ তার মৃত স্ত্রীকে বড্ড মনে পড়ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস বুকের ভেতর জমে আছে, অপ্রকাশিত, অমীমাংসিত।

একসময় একরাশ অভিমানে তিনি নিজেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। কথা বলেননি, কাছে আসেননি, ভালোবাসাটুকু দিয়ে জড়িয়ে ধরেননি। অথচ সেই মানুষটাই এখন আর নেই। যার কাছে ফিরে গিয়ে সব অভিযোগ, সব দূরত্ব মুছে ফেলার সুযোগ ছিল।

রাতের নীরবতা যেন আজ তাকে প্রশ্ন করছে
কেন এত দেরি করলে? বাতাস এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে, যেন কারও অচেনা স্পর্শ।
মনে হচ্ছে, এই নির্জন ছাদের কোথাও হয়তো সে-ই আছে অভিমান ভাঙা এক নীরব উপস্থিতি হয়ে।

মোস্তফা হোসেন বইয়ের পাতায় চোখ রাখেন, কিন্তু দেখতে পান না কিছুই। কারণ আজকের এই নিস্তব্ধ রাত তার ভেতরের সমস্ত না বলা কথার মতোই ভারী, আর অসমাপ্ত ভালোবাসার মতোই গভীর।

অনেক বছর আগে ফারিস আর জবার সম্পর্ক নিয়ে মোস্তফা হোসেন এবং হালিমা বেগমের মাঝে অনেক গভীর মান অভিমানের খেলা শুরু হয়েছিল। সে খেলা শেষ হয়নি হালিমা বেগমের মৃত্যুর পরও। আজও তিনি হালিম বেগমকে দায়ী করেন ফারিসের এ ছন্নছাড়া সুখহীন জীবনের জন্য। যার জন্য হালিমা বেগম ফারিসের জীবনে দুঃখ ডেকে এনেছিল সে দিব্যি সুখে আছে।

ফারিস অনেকক্ষণ যাবত মোস্তফা হোসেনের দিকে তাকিয়ে রইল অন্ধকারে আধুনিক পিদিমের আলোয় তিনি বই পড়ছেন৷ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম আলো। ফারিস তার কাছে গিয়ে বসল। তিনি তা খেয়াল করলেন না। তিনি মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। ফারিস ডাকল,
'বাবা।'

আচমকা কিছুটা চমকে উঠে নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয় মোস্তফা হোসেন। ফারিসের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে জিজ্ঞেস করে,
'কখন আসলি?'
'অনেকক্ষণ।'
'কিছু বলবি?'

'এই রাতে এখানে বসে বই পড়ছেন বাবা?'
'হ্যাঁ। ভালো লাগছে। শীতল বাতাসে প্রাণটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাবা এই ওয়েদারে এখানে এভাবে বসে থাকাটা আপনার ঠিক না। ঠান্ডা লাগবে একটু পর কাঁশি শুরু করবে। তখন আপনারই কষ্ট হবে।'

'ও কিছু হবে না। বয়স হলেও তোদের ইয়াং বয়সী ছেলেদের থেকে আমি যথেষ্ট স্ট্রং।'
হাসল ফারিস। মৌনতার কিছু মুহূর্ত পার হওয়ার পর বলল,
'একটা কথা জানার ছিল বাবা।'
'বল?'
'মৃত্যুর আগে বহু বছর আগ থেকে আপনি মায়ের সাথে ঠিকভাবে কথা বলতেন না। এ প্রশ্নের উত্তর আমরা এত বছর জানতে চাইলেও আপনারা বলেননি। আজও বলতে হবে না। আমি শুধু জানতে চাই এর কারণটা কী কোথাও আমি আর জবা।'

চকিত মোস্তফা হোসেন এক নজর ফারিসের পানে তাকিয়ে আবার চোখ নিচু করে ফেলল। ফারিস বলল,
'জবা আমার জীবনের এক আকাশ আফসোসের নাম তা আপনি জানেন। এত বছর আমি জানতাম জবা আমায় ঠকিয়েছে, কিন্তু কিছুদিন আগেই আমি জবার থেকে জানতে পারলাম ও আমায় ঠকায়নি। ও মাকে আগেই বলেছিল ও আমায় পছন্দ করে। তখন মা ওকে বলেছিল আমি নাকি নিশা না ইশা নামের কোন মেয়েকে পছন্দ করি। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল। মা এমন কেন করেছিল জানেন কিছু? কেন তিনি জবা আর আমার বিচ্ছেদ করালেন।'

'এত বছর তো হয়ে গেল ফারিস। এখন এটা জানা জরুরি? পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে কী লাভ?'

'লাভ কিছু নেই ঠিকই, কিন্তু যে প্রশ্নটা আমার জীবনটাকে থামিয়ে রেখেছে সেই সময়ে। ছন্নছাড়া করেছে আমার জীবন কাহিনি। এগোতে দিচ্ছে না জীবনকে সে প্রশ্নের জবাব জানার অধিকার কি নেই আমার? জবা নাহয় ভুল কিছু জানার পর সহজে মুভ অন করতে পেরেছিল। আমি পারিনি বাবা। আমার জীবন আটকে আছে সেই ঝড়ো হাওয়ার রাতে যে রাতে আমি প্রথম জেনেছিলাম জবা আমায় ভালোবাসে। আমরা কি সুখী হওয়ার অধিকার নেই বাবা? এ প্রশ্নের উত্তর না জেনে আমি তো সুখী হতেও পারব না। জানলে বলুন বাবা। কেন মা করলেন এমন?

মোস্তফা হোসেন খাবিক সময় নীরব কাটালেন। বইটা বুকমার্ক দিয়ে বন্ধ করে টেবিলে রাখল। চোখের চশমা খুলেও টেবিলে রেখে দু আঙুলে চোখ মুছলেন। ফারিস ভীষণ আগ্রহে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। 

'তোর মা যে এসব খারাপ উদ্দেশ্য করেছিল তা বলবো না। হালিমা ছিল বোকা মহিলা। সবাইকে সুখী করতে চাইতো৷ ও সেদিন জবাকে মিথ্যাটা বলেছিল যাতে তুই জবা এবং তোর ভাই ফরহাদ তিনজনই সুখী হোস।'
'ফরহাদ এর মধ্যে কোথা থেকে আসল?'

'ও শুরু থেকেই ছিল। তুই তোর মাকে নিজের পছন্দের কথা জানানোর পর হালিমা অনেক খুশি হয়েছিল। তার একমাত্র ভাইজি তার ঘরে আসবে এর চেয়ে সুখের আর তার কাছে কী আছে। সে তো খুব শীঘ্রই জবার বাবার সাথে কথা বলতে চাইতো৷ কিন্তু বিপত্তি বাধল তার পরেরদিন। সেদিন তোর বোন হাফিজার সাথে কথায় কথায় তোর মা জানতে পেরেছিল ফরহাদ জবাকে পছন্দ করে। শীঘ্রই প্রপোজ করবে। ওরা যেহেতু সমবয়সী এবং দুজনার বন্ধুত্বও ভালো। হয়তো জবাও রাজি হয়ে যাবে।

তোর সরল মায়ের মনে গড়ল প্রশ্নের ঝড় বইলো। যদি তোর হয়ে জবার জন্য কথা বলে তাহলে ফরহাদ কষ্ট পাবে আবার ফরহাদের হয়ে কথা বললে তুই। জবা এ ঘরে যার বউ হয়েই আসুক তার দুই ছেলের মধ্যে একজন কষ্ট পাবে শিওর। তিনি অবশ্য তখন জানতেন না জবা তোকে পছন্দ করে। তারপর তিনি ভাবলেন জবাকে আর এ বাড়ির বউ করবেন না। সে কারণে হালিমা আর তোর মামা মামির সাথে কথা বলেনি।

কিন্তু বিপত্তি বাঁধল তার কিছুদিন পর। একদিন জবা সরাসরি তাকে জানাল ও তোকে পছন্দ করে। বিয়ে করতে চায়৷ তোর মা চরম সংকায় পড়ে গেলেন। বোকা মহিলা দুই ছেলেকে এবং ভাইজি তিনজনকে সমানতালে সুখী করার কথা ভাবলেন৷ ভাবলেন তিনজন জীবনে নতুন তিনজন জীবনসঙ্গী নিয়ে সুখী হোক। জবা এ বাড়িতে তোর বউ হয়ে আসলে ফরহাদ কষ্ট পাবে। আর ফরহাদের বউ করা তো এমনি সম্ভব ছিল না।

সে কারণে তিনি বলে দিলেন তুই অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসিস তাকে বিয়ে করবি। ফরহাদকে কৌশলে বলল জবা অন্য একটা ছেলেকে পছন্দ করে। তাকে বিয়ে করবে। তারপর জবা সত্যি ইরফানকে বিয়ে করল। তোর মা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। ভাবল এবার তার দুই ছেলে অন্য দুটো মেয়েকে বিয়ে করে সুখী হবে।

কিন্তু বেঁকে বসলি তুই। জবার বিয়ের পর তুই কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেলি। তোর মা ভাবল কদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তুই ঠিজ হেসনি। বরং জবার প্রতি তোর উন্মাদনা আরও বাড়ল। তারপরও তিনি ভাবলেন তুই ঠিক হবি৷ তারপর তুই ফিরনাসকে দত্তক নিলি। ততদিনে ফটহাদও বিয়ে করে সুখী হয়েছে। জবাও সুখে আছে। মাঝখান থেকে তুই হয়ে গেলি ভবঘুরে। তোর মা সারাক্ষণ তোর কথা ভেবে কাঁদত। অনুশোচনা করত নিজের করা কৃতকর্মের জন্য। তুই তো তার সাথে ঠিকমতো কথাও বলতি না।

আমিও অভিমান করে বলতাম না। তার বোকামির কারণেই তোর জীবনটা এমন ছন্নছাড়া দিশেহারা। জবা, ফরহাদ অন্য মানুষ নিয়ে ঠিকই সুখে আছে। কেবল সুখে নেই তুই।

তুই জবাকে এতগুলো বছর ভুল জেনে এসেছিস জেনেও আমরা চুপ ছিলাম এটা ভেবে যে ওর উপর রাগ করে হলেও তুই জীবন নতুন করে শুরু করবি। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না।'

কথাগুলো বলে লম্বা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন মোস্তফা হোসেন।

—————

ভোরবেলা নিজের বাগানে মুখ গোমড়া করে বসে আছে ইরফান। চারপাশে ফাগুনের রঙিন উৎসব, অথচ তার ভেতরটা কেমন নিষ্প্রাণ। হালকা দখিনা হাওয়া বইছে, কানে ভেসে আসছে কোকিলের ডাক, তবু তার কাছে সবকিছুই বিরক্তিকর, সবকিছুই বেসুরো।

গাছের ডালে ডালে নতুন পাতার কচি সবুজ, কোথাও কোথাও রঙ ছড়িয়েছে ফুল। প্রকৃতি যেন নতুন করে সাজতে ব্যস্ত। কিন্তু সেই সাজ তার চোখে লাগে বাড়তি অভিনয়, অতিরিক্ত উজ্জ্বল, অস্বস্তিকর।

সূর্যের আলো নরম, মিঠে, তবু তার গায়ে লাগে তীব্র। বাতাসের ছোঁয়া স্বস্তি আনার কথা, অথচ সেটা যেন উল্টো আগুনে ঘি ঢালে। চারপাশের এই মোহময়তা তার ভেতরের অস্থিরতাকে আরও বেশি করে উসকে দিচ্ছে।

আজ জবা ওর থেকে সব ছিনিয়ে নিচ্ছে।
শুধু সম্পদ নয়, নাম, অধিকার, অস্তিত্বের এক একটা স্তর খুলে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। ইরফান আপোষ করতে চায় না। তার ভেতরে জেদ আছে, প্রতিরোধ আছে, কিন্তু জবা সরাসরি কিছু করছে না। সে কৌশলে এগোচ্ছে, নিঃশব্দে, নিশ্চিতভাবে। ঠিক যেমন বসন্ত আসে, চোখে না পড়েই সব বদলে দেয়।

একটা শুকনো পাতা হাওয়ায় ভেসে এসে তার পায়ের কাছে পড়ে। ইরফান তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। মনে হয়, এই পতনটা খুব চেনা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার মতো।
ফাগুনের এই উচ্ছ্বাসের মাঝেও তার চারপাশে যেন এক অদৃশ্য ঝড় বইছে। বাইরে রঙিন, ভেতরে ভাঙন। আর সেই ভাঙনের শব্দ শুধু সে-ই শুনতে পাচ্ছে।

দূরে বসে এই ভাঙনের শব্দ অবশ্য জবাও শুনতে পাচ্ছে। কারণ ওকে বরবাদ তো জবাই করছে। 

এতদিন সময় নিয়ে ইরফানকে শুধু এটা বুঝিয়েছে জবা মুখে মুখে হুমকি দেয়। কাজের কাজ কিছুই করবে না। কিন্তু আজ ইরফান বুঝতে পারছে কত গভীরে গিয়ে খেলা খেলেছে জবা।

ইরফানের যেসব খবরাখবর ও ব্যতিত কেউ জানত না তা-ও জেনে গেছে জবা। কীভাবে জানল জানে না ইরফান। আজ ইরফানের সব ছিনিয়ে নিবে জবা বিনিময়ে ভিক্ষা দিবে প্রাণটা। কারণ ইরফান জানে এখন জবা না বাঁচালে কুকুর বিড়ালের মতো মরতে হবে ওকে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp