মাহির আট বছর বয়সে খেলা শেষে বাসায় এসে তার বাবাকে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে থাকতে দেখে।
মাহির জানতো আজকাল বাবার অনেক মন খারাপ, সে অনেক টেনশন করছে। তাদের ব্যবসায় নাকি মস্ত বড়ো লস হয়েছে। অকূল নদীতে পড়ার মতো বিপদ ঘনিয়ে এসেছে।
কয়েকদিন ধরেই লোন, সিলগালা, জব্দ, নিলাম এরকম ভারী ভারী শব্দ শুনছে সে। বড়ো চাচ্চু এসে বাবার সাথে অনেক রাগারাগি করে গিয়েছে। একবার তো সে যাওয়ার পর মাহির খেলতে গিয়ে পড়ে ব্যাথা পেলে যেভাবে কাঁদে বাবা ঠিক সেভাবে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদেছে। মাহিরের তখন খুব খারাপ লেগেছে।
অথচ কয়েকমাস আগে বাবা কতো খুশি ছিল।
মাহিরদের সুন্দর ছিমছাম তিন রুমের ফ্ল্যাটে এসেই মা'কে ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছিল। মা রান্নায় ব্যস্ত ছিল। মাহির ম্যাথে ট্রিপল স্টার পেয়েছে তাই মা তার জন্য শ্রিম্প ক্রিমি পাস্তা বানাচ্ছে।
অবসরে বাবা মজার মজার রান্না করতেন, মাহির কখনো মা'কে বলেনি কিন্তু বাবার রান্না বেশি মজা। বাবা রান্না করতে করতে এতো মজা করে যে আনন্দ ও স্বাদ দ্বিগুণ হয়ে যায়।
মা বাবার দিকে থমথমে মুখে তাকায়। বাবা দেরি করে বাড়িতে আসলেই মার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বাবা বলে এটা লাভ সিকনেস।
মা বাবাকে বেশি ভালোবাসে দেখে রাগ হয়। অথচ মাহিরকে কতো কতো ঘন্টার জন্য স্কুল ও কোচিংয়ে পাঠায়! তো এর মানে কি দাড়ায়? মা'কে এ নিয়ে অভিযোগ করা মাত্র মা বাবার ওপর আরো রাগ হয়ে যায়। তখন মা আর বাবাকে গান গেয়ে শোনায় না। বাবার ছেলে হিসেবে মাহিরের ওপর দিয়েও ঝড় যায়। দুজনকেই সরি বলতে হয়।
বাবা অবশ্য সেদিনের রাগ-টাগের ধার ধরলেন না। চট করে মা'কে ধরে গালে টুপ করে চুমু দিয়ে দেয়। মাহির এক হাতে চোখ ঢেকে বলে, ইয়্যু বাবা!
মনে মনে তার ভালো লাগে। এখন নিশ্চয়ই মার মন ভালো হয় যাবে। মাহির হোমওয়ার্কটা রেখে এই ফাঁকে একটু গ্রাউন্ডে গিয়ে ফুটবল খেলতে পারবে।
হলো তাই! বাবা মাকে জানালো কয়েকজন ইনভেস্টরের কথা। তারা নাকি বাবাদের ব্যবসা আরো অনেক এক্সপান্ড করতে চায়। এই অর্ডার পেলে ভবিষ্যতে আরও বড় বড় চুক্তি আসবে।
তারা প্রজেক্ট শুরু করার জন্য কিছু অগ্রিম টাকা দিবে। পুরো টাকা ধাপে ধাপে আসবে কাজের ওপর ভিত্তি করে। কাগজপত্রে বিষয়টি এমনভাবে সাজানো ছিল যে এটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার মতোই মনে হয়। যদিও কিছু শর্ত ছিল কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু বাবা বলতেন রিস্ক ছাড়া প্রফিট আসে না।
পরিবারের ভেতরে তখন মতভেদ দেখা দেয়। বাবা এই সুযোগকে বড় পরিবর্তনের পথ হিসেবে দেখেন। সে অনেক আশাবাদী। তার ধারণা এই সুযোগটি না নিলে ব্যবসা হয়তো কারেন্ট কম্পিটেটিভ মার্কেটে অনেক পিছিয়ে পড়বে। অন্যদিকে চাচ্চু কখনোই রিস্ক নিতে চান না। নতুন কিছু ট্রাই করতে চান না। বিষয়টিকে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। কিন্তু প্রফিট না আসলে বাবার সাথে খুব রাগ করেন।
শেষ পর্যন্ত বাবা সিদ্ধান্ত নেয় এগিয়ে যাওয়ার। সে মেহনত করার জন্য প্রস্তুত। নিজের বাকি সব কাজ হোল্ডে রেখে সে এটাতে জানপ্রান দিয়ে লেগে পড়ে। সময়মতো কাজ শুরু করতে পারলে বাকি টাকা ঠিকই আসবে। সেই সিদ্ধান্তের পরই কাজ শুরু হয়। নতুন মালপত্র আসে, কিছু যন্ত্রপাতি কেনা হয়, কর্মচারীদের কাজ বাড়ে, এবং ব্যবসা যেন নতুন করে গতি পেতে শুরু করে।
মাহিরের মনে পড়ে যে প্রথম দিকে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হয়। কাজ এগোয়, পরিবেশে ব্যস্ততা বাড়ে, এবং চাচ্চু ও কিছুটা আশাবাদী হয়ে ওঠে। শারমিন চাচী মা’র জন্য শাড়ি গিফট পাঠায়। দাদু মাকে নিজে থেকে ও বাড়িতে দাওয়াত দেয়। আগের চেয়ে অনেক বেশি আদর করে।
কিন্তু কিছুদিন পরেই সমস্যা শুরু হয়। যে অর্থ ধাপে ধাপে আসার কথা ছিল, তা সময়মতো আসে না। তারা বিভিন্ন অজুহাত দিতে থাকে। কখনো কাগজপত্রের সমস্যা, কখনো যাচাই-বাছাইয়ের দেরি।
এই সময়েই বাস্তব চাপ বাড়তে শুরু করে। কাজের জন্য নেওয়া ব্যাংক ঋণের কিস্তি শুরু হয়ে যায়। খরচ চলতে থাকে, কিন্তু আসল অর্থ আসা বন্ধ থাকে। ফলে নগদ টাকার সংকট দেখা দেয়।
বাবা বারবার যোগাযোগ করেন, কিন্তু বিনিয়োগকারীরা শুধু দেরির কথা বলে। তারা সরাসরি অস্বীকারও করে না, আবার নিশ্চিত কিছু দেয়ও না। এই অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। একই সময় মার্কেটের অবস্থাও আরো খারাপ হয়ে যায়, নতুন অর্ডার বা বিক্রির সুযোগও প্রত্যাশামতো আসে না। এই দুই চাপ মিলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে থাকে।
চাচ্চু ভয় পেয়ে আবারও বলেন যে শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। বাবাকে অফিসে সবার সামনে ডেকে বকাঝকা করে। মাহিরের অবশ্যই এসব জানার কথা না কিন্তু সে লুকিয়ে লুকিয়ে মা-বাবার কথা শুনে ফেলে।
ধীরে ধীরে তাদের ব্যবসার অবস্থা আরও খারাপ হয়। ঋণের কিস্তি বকেয়া হতে থাকে, ব্যাংক থেকে নোটিশ আসতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি জব্দ বা বিক্রির মতো পরিস্থিতির কথাও সামনে আসে।
এই সময় পরিবারের সবচেয়ে খারাপ সময় চলে আসে। বাবা ঘনঘন সিগারেট ফুঁকতে থাকে। মা নীরব হয়ে যায়। বাজে রকমের ঝগড়া হতে থাকে। এতো বিচ্ছিরি ঝগড়া যে মাহিরকে রুমে কান বন্ধ করে বসে থাকতে হয়। বাবা আরও বেশি চুপচাপ এবং দূরে সরে যান।
শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যেখানে কোনো দিক থেকেই সমাধান দেখা যায় না। চাপ, ঋণ, দায় এবং ব্যর্থতার ভার মিলিয়ে পুরো পরিবার ভেঙে পড়ে। এই ঘটনার পর বাবার মানসিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।
তারপর একদিন তিনি মনে করেন সবাইকে রেখে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুুলে পড়লে সব সমস্যার সমাধান হবে এবং তিনি তাই করেন।
বাবাকে নিয়ে এর পরের আর কোন স্মৃতি তার মনে নেই। তাকে কবরে নামতে বললে চাচ্চু কোলে নিয়ে নেয়। কাঁদতে কাঁদতে তার বেহাল দশা। ছেলেরাও এভাবে কাঁদতে পারে মাহির তাকে না দেখলে জানতে পারত না। তিনি বললেন মাহির ভয় পাবা?
মাহির হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। তার কোন অনুভূতি কাজ করছে না। মার কাছে যেতে ইচ্ছা করছে, একটু জড়িয়ে ধরে ঘুমোতে ইচ্ছা করছে। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।
পরের ঘটনাগুলো নিয়েও মাহিরের কোনো স্পষ্ট স্মৃতি নেই। সব কেমন ঝাপসা ভ্রমের মতো। কয়েকদিনের মধ্যেই তারা নিজেদের ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে আহমেদ নিবাসে শিফট হয়। সেখানে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। একপর্যায়ে পাওনাদাররা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে যায়।
আগে সে এখানে বেড়াতে আসতো শুধু, কাজিনদের সাথে খেলা করতে ভালো লাগতো কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে তাও বিষাক্ত হয়ে উঠল। তাকে সবাই এখন অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখে।
মায়মুনা যৌথ পরিবারে মানিয়ে নিতে না পেরে স্বামী মিরাজের হাত ধরে যে ঘর ছেড়ে গিয়েছিল, বিধবা হয়ে এতিম ছেলের হাত ধরে সেখানেই তাকে ফিরতে হলো। জীবন যাপন আগের চেয়ে অনেক বেশি সম্মানহীন ও কষ্টকর হয়ে গেল।
প্রেমের বিয়ের কারণে শাশুড়ী চক্ষুশীল তো সে ছিলই কিন্তু এখন নতুন করে সবার চোখের কাঁটাও হয়ে উঠে। তিনি সরাসরি ঘোষণা দেন যে তার ছেলেকে এই নষ্ট মেয়েই সবার থেকে আলাদা করে তিলে তিলে মেরেছে।
ব্যবসায় লোকশান ও মিরাজের আত্মাহত্যার কারণে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে তার জন্য সবাই তাকে দায়ী করে। মৃত মানুষকে দোষারোপ করা যায় না, তবে জীবিতদের করতে তো দোষ নেই।
বাবা থাকা আর না থাকার পার্থক্য মাহির সেই এক বছরে বুঝতে পারে। বাবার ওপর অনেক রাগ হয় তার! কিভাবে সে তাদের ছেড়ে চলে যেত পারলো? ছেড়ে যাওয়া বুঝি এতো সহজ?
এই যে মা এখন প্রতি রাতে কাঁদে তার জন্য কি বাবার কষ্ট হয় না? সে কি আকাশ থেকে দেখতে পায় না?
মাহিরের স্কুল পরিবর্তন হয়, আগের স্কুলের বেতন দেওয়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। মায়মুনা হন্য হয়ে চাকরি খুঁজতে থাকে। তার ক্যারিয়ারে গ্যাপ পড়ে যাওয়ায় সেখানেও নিরাশা দেখা দেয়। মিডিয়ার মানুষরা বাড়ি থেকে বের হওয়া অসম্ভব করে দেয়। তাদের অনুচিত প্রশ্নগুলো শুনে মাহিন প্রথমবার মানুষের নির্মমতা সম্পর্কে বুঝতে পারে।
এর মাঝে শারমিন আরা তার ভাইয়দের সাহায্য চাকরি নিয়ে ডাবল শিফট কাজ করতে থাকে। বলতে গেলে সেসময়টা তার জন্যই আহমেদ নিবাসে আলো জ্বলে।
মায়মুনার জন্য জায়গাটা বিষাক্ত গ্যাস চেম্বারের মতো হয়ে যায়। পরিবারে তার অবস্থান শোচনীয় পর্যায়ে চলে যায়। বাবারবাড়িতে আগে পরে কেউ না থাকায় বিকল্প কোনো সাহায্য ও পায় না।
রাত-বিরেতে কাঁদতে থাকে৷ মানসিক অবস্থার অধপতন হয়। একমাত্র ছেলেকেও অসহ্য লাগতে শুরু হয়। মাহিরের ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুড়ে খায়।
মাহির মা'র নিষ্পৃহ ব্যবহারে অসহায় হয়ে পড়ে। দুরন্ত ছেলেটাকে প্রায় গৃহবন্দী হয়ে সময় কাটাতে হয়।
-তোমাকে বলেছি না দাদুর কাছে থাকতে? রায়হানের সাথে খেলতে?
-সে-তো নেয় না আমাকে খেলায় মা। আমরাও আর খেলতে ইচ্ছে করে না।
-ইচ্ছা-অনিচ্ছা জানতে চাইনি। ওদের সাথে ভাব জমাও। কেন নিবে না তোমাকে? কি সমস্যা তোমার মধ্যে? সোসালাইজ করো ভালোমতো।
-মা আমাকে শুধু শুধু ধাক্কা দেয়।
-মাহির বি ম্যাচিওর। নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করো।
-মা আমি তোমার সাথে থাকি প্লিজ? আমার দাদুর কাছে ঘুম আসে না একদম।
-অভ্যাস করো। ওরাই তোমাকে বাঁচাতে পারবে। নিজের জায়গা করতে শেখো তুমি।
-মা প্লিজ! আমার একদম ভালো লাগে না মা। চলো না আমরা আমাদের বাসায় যাই?
-আমাদের কোনো বাসা নেই। তোমার কাপুরুষ বাপ সব ধ্বংস করে দিয়েছে! কিচ্ছু নেই আর।
বাবাকে নিয়ে এভাবে কথা বললে মাহিরের খুব কষ্ট হয়। কিন্তু এখন উঠতে-বসতে এসব শুনতে শুনতে তার সয়ে গেছে।
মায়মুনা চারুকলা শিক্ষার্থী ছিল, একসময় সে ছোটখাটো একটা পার্ট টাইম জব জুটিয়ে ফেলে। নাচ-গান শেখাতে হবে দেখে সাহেরা বানুর তাতে ঘোর আপত্তি। কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে সেটা ছেড়ে দিতে হয়।
মাকে নিয়ে মাহিরের শেষ স্মৃতি হলো শিশুপার্কে ঘুরতে যাওয়া। অনেকদিন পর মাহির একটু প্রাণ খুলে হাসে, ছুটে বেড়ায়। তারা একসাথে বসে লাঞ্চ করে। মা তাকে অনেক আদর করে। একটু পরপর কপালে, গালে চুমু দেয়। মাহিরের খুব লজ্জা লাগে। আগে হলে মাহির ইয়্যু বলে চলে যেতো, আই'ম আ বিগ বয় বলে নাক ফুলাতো। কিন্তু এখন তার খুব ভালো লাগছে।
মা মাহিরকে বলে, তোমার চাচ্চুর নম্বর কি?
মাহির তা জানে, গতকাল রাতেই তাকে মুখস্থ করানো হয়েছে।
-বাড়ির এড্রেস?
মাহির সেটাও খুব ভালো করে জানে।
-বাবা! বি আ গুড ম্যান ইন ফিউচার।
মাহির অনেক বোকা, নাহলে সে বুঝতে পারতো মা সেসব কেন বলছে। তাকে বসিয়ে রেখে মা যে গেল আর ফিরে এলো না।
সন্ধ্যা পর্যন্ত সে মা যে পথে হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে গেছে সেদিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করল।
মা আর কোনোদিনই ফিরে আসেনি।
—————
মাহির শহরের রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছিল।
রাগের মাথায় বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ঠিক কতটা পথ হেঁটেছে তার হিসাব নেই। এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তা, ফুটপাত বদলাচ্ছে, মোড় বদলাচ্ছে, মানুষের ভিড় বদলাচ্ছে, কিন্তু তার ভেতরের অবস্থা একই রয়ে গেছে। তারা নিরুদ্দেশ হতে ইচ্ছা করছে। কোথাও যাওয়ার জন্য সে হাঁটছে না, বরং কিছু একটা থেকে পালিয়ে থাকার জন্য হাঁটছে।
ফোনের ওপাশে আরিফ কথা বলে যাচ্ছে। সে গত কয়েকদিন ধরে নিজের পরিচিত জায়গাগুলোতে কথা বলছে, পুরোনো কানেকশন ব্যবহার করছে। কে কোথায় জড়িত থাকতে পারে সেটা বোঝার চেষ্টা করছে। মাহিরের কেসটা অন্তত ভেতর থেকে কেউ দেখুক, এই চেষ্টাটুকু সে করেই যাচ্ছে।
-শোন, পুরো ব্যাপারটা একদম ডেড এন্ড না। দুইটা জায়গা থেকে কিছু ইনফো পেয়েছি। ওই কমপ্লেইনটা কোথা থেকে এসেছে সেটা বের করার চেষ্টা করছি। একটু টাইম লাগবে, কিন্তু আমি মোটামুটি নিশ্চিত ভেতরে কেউ গেইম খেলছে। তুই হোপ হারাস না।
মাহির কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না।
রোডের সামনের সিগন্যালটা সবুজ হলো। মানুষ দল বেঁধে রাস্তা পার হচ্ছে। একটা ছোট ছেলে বাবার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে যাচ্ছে। পাশে একজন রিকশাওয়ালা সাথে ভাড়া নিয়ে ঝগড়া করছে। সব স্বাভাবিক। শহর নিজের মতোই চলছে। শুধু মাহিরের মনে হচ্ছে সে যেন এই চলমান শহরের ভেতরে থেকেও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কোনভাবেই সে তাদের স্রোতে মিশতে পারছে না।
সে আরিফকে বলল,
হোপ রাখার মতো খুব বেশি কিছু আর বাকি আছে বলে মনে হয় না।
আরিফ বিরক্ত গলায় বলল,
এইসব কথা বলিস না তো। তুই সবসময় সব একা নিতে চাস। এখন অন্তত সেটা করিস না। দেখ, যদি আমরা প্রুভ করতে পারি যে পুরো ব্যাপারটা প্ল্যানড…
মাহির চোখ বন্ধ করল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। মাথার ভেতর হালকা ঝিঁঝিঁ করছে।
-আমি এখন আর ওইসব নিয়ে ভাবছি না। সত্যি বলছি। তবুও তুই যেটা করছিস। থ্যাঙ্কস।
কথাগুলো বলার সময় তার নিজের কণ্ঠস্বরও তার কাছে অচেনা লাগল। এমন শোনাচ্ছে যেন অনেক দূরের কেউ কথা বলছে। ক্লান্ত, আগ্রহহীন, হতাশাগ্রস্থ একটা মানুষ।
আয়নার একটা পদক্ষেপে তার এই অবস্থা হলো? নিজের ব্যক্তিত্বকে কি তাসঘরে লালন করেছে সে? অন্তরমন থেকে উত্তর আসে আসলে আয়নাকে নিজের মানদন্ড বানিয়ে তার কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমান করতে চেয়েছিল সে। তার সবচেয়ে ভরসাস্থল হতে চেয়েছিল চুপিচুপি। একজন দায়িত্বশীল ছেলে ও স্বামী হতে চেয়েছিল।
মেয়েটার আসলে দোষ নেই। অন্য পুরুষ হলে তাকে মাথায় করে রাখতো। সকল সুখ দিতে পারতো। ভাগ্যের পরিহাসে তার কপালে জুটেছে মাহির আহমেদ।
আরিফ তাকে আরও কিছু বলতে চাইছিল। মাহির শুনল না। ফোনটা কানে থেকে নামিয়ে দিল, কিন্তু কল কাটল না। ওপাশে এখনো ভেসে ভেসে শব্দ আসছে।
সে আবার আনমনে হাঁটতে শুরু করল।
রোদের তাপ গায়ে গরম ধাতুর মতো লাগছে। বাতাসে ধুলো, ধোঁয়া আর ব্যস্ত নগরীর ক্লান্তি।
দূর থেকে তাকে দেখলে এক পলকের জন্য হলেও চোখ আটকে যায়। লম্বা গড়ন, সুগঠিত শরীর, চওড়া কাঁধ। তার ব্যক্তিত্ব সাধারণত মানুষকে স্বস্তি দেয়। খুব বেশি কথা না বললেও ভরসা করতে ইচ্ছে হয়। শান্ত স্বভাবের, ভদ্র, সংযত একজন মানুষ মাহির।
তাকে বিধ্বস্ত রূপে হাঁটতে দেখে চোখ তো থামবেই।
গাঢ় কালো চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর পড়ে আছে। কয়েকদিনের চাপ আর অনিদ্রায় চোখের নিচে হালকা কালি জমেছে। শার্টটা ঠিকভাবে গুঁজে রাখা নেই, কুঁচকে গেছে। এক হাতে সাদা প্লাস্টার, যেটা তার পুরো উপস্থিতির সাথে বেমানানভাবে চোখে লাগে। হাঁটার সময় সে অবচেতনভাবেই হাতটা বাঁচিয়ে চলছে, কিন্তু নিজের দিকে তার কোনো খেয়াল নেই।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার মনে হলো সে আসলে কোথায় যাচ্ছে?
প্রশ্নটার উত্তর তার কাছে নেই।
তার মাথার ভেতর খুব পরিচিত একটা ভয় ধীরে ধীরে ফিরে এলো। সে আসলে কী করছে? সে কি সত্যিই সবাইকে শুধু সমস্যার ভেতর ফেলছে? শেষ পর্যন্ত কি সে বাবার মতোই হয়ে যাচ্ছে?
চিন্তাটা আসতেই তার বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে গেল।
সে দ্রুত মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগল। যেন হাঁটলেই চিন্তাগুলো পেছনে পড়ে থাকবে।
তারপর হঠাৎ করেই সামনে শিশুপার্কটা চোখে পড়ল।
মাহির থেমে গেল।
বড় লোহার গেট বন্ধ। মরচে জমে রঙ উঠে গেছে। ভেতরে আগাছা ছড়িয়ে আছে। দূর থেকে ভাঙা দোলনার একপাশ দেখা যায়। স্লাইডের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বহু বছর আগে সংস্কার কাজ শুরু হয়েছিল। ব্যানার টাঙানো হয়েছিল, বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তারপর কাজ থেমেছে, আবার শুরু হয়েছে, আবার থেমেছে। মানুষ ধীরে ধীরে জায়গাটাকে ভুলে গেছে।
এখন এটা আর পার্ক না।বরং একটা পরিত্যক্ত স্থান।
মাহির ধীরে ধীরে গেটটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এ পথ দিয়েই তার মা আসমানী শাড়ি পড়ে বেড়িয়ে গিয়েছিল। পেছনে ফিরে একবার তাকাতেই মাহির কি বুঝে যেন হেসেছিল। ইশারা করে দ্রুত চলে আসতে বলেছিল। ঠিক এই গেইট সে শক্ত করে ধরে রেখেছিল যখন চাচ্চু রাতের বেলা তাকে নিতে এসেছিল।
মাহিরের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।সে ধীরে হাত তুলে গেটের ঠান্ডা লোহার শিক আঁকড়ে ধরে। এখানে তার জীবনের একটা অংশ আটকে আছে। ছোট্ট একটা ছেলে, যে এখনো বুঝতে পারে না কেন মানুষ হঠাৎ করে হারিয়ে যায়।
হঠাৎ পাশ থেকে ছোট্ট একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
-ও ভাইয়া ফুল নিবেন?
মাহির মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
সাত-আট বছরের একটা মেয়ে। ময়লা হয়ে যাওয়া ফ্রক পরা। হাতে গোলাপের ছোট্ট ঝুড়ি। চুলগুলো এলোমেলো করে বাঁধা। এই বয়সেই চোখে সেই অদ্ভুত চতুরতা চলে এসেছে, যেটা রাস্তায় বড় হওয়া বাচ্চাদের খুব দ্রুত শিখে ফেলতে হয়।
মেয়েটা দাঁত বের করে হাসল,
নেন না ভাইয়া। লাল গোলাপ। আপুরে দিলে অনেক খুশি হবে।
মাহির কিছু বলল না। মেয়েটা আবার বলল,
একটা নেন না। প্রেম করলে ফুল দিতে হয়।
কথাটা শুনে মাহিরের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। হাসিও না, কষ্টও না। মাঝামাঝি কিছু। অল্প বয়সে এরকম কথা শিখে গেছে!
সে পকেট থেকে ওয়ালেট বের করল। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা ২০০ টাকার নোট বের করে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিল।
মেয়েটা অবাক হয়ে বলল,
এতো টাকা? কয়টা ফুল দিতাম?
-রাখো।
মেয়েটা তাড়াতাড়ি ঝুড়ি থেকে দশটা গোলাপ বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
মাহির মাথা নাড়ল, না, লাগবে না।
মেয়েটা ভুরু কুঁচকে তাকাল, ফুল নিবেন না কেন?
মাহির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, দেওয়ার মতো কেউ নেই। আমার থেকে কেউ ফুল নিবে না।
কথাটা বলার পর বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠল।
মেয়েটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। বাচ্চারা অনেক কিছু বুঝে ফেলে। পুরোটা না বুঝলেও মানুষের মুখ দেখে কষ্ট চিনতে পারে।
মাহির হাত বাড়িয়ে মেয়েটার মাথায় হাত রাখল।
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে কেমন সন্দেহের চোখে তাকাল। যেন এত সহজে আদর পাওয়ার অভ্যাস তার নেই। তারপর দ্রুত নোটটা আঁকড়ে ধরে দৌড়ে অন্যদিকে চলে গেল।
মাহির স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
দূরে কোথাও মেঘ ডাকল। বাতাসের গন্ধ বদলে গেছে। দুপুরের ভ্যাপসা গরমের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আকাশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে।
মাহির গভীর একটা শ্বাস নিল। না, এভাবে চলতে পারে না।
সে চোখ বন্ধ করল কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
নিজেকে সামলাতে হবে। যা-ই হোক, তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কাজ করতে হবে। পরিবারের জন্য ভাবতে হবে। সে আর ছোট না যে সব ছেড়ে পালিয়ে যাবে।
বাবার মতো না।
চিন্তাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতরটা আবার শক্ত হয়ে গেল। সে ধীরে চোখ খুলল।
হাতে ধরা গোলাপটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর হাঁটতে শুরু করল। একটা রিকসা পেলে ভালো হতো।
রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলতে শুরু করেছে। আকাশ আরও কালো হয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে।
মাহির কয়েক কদম হাঁটার পর হঠাৎ থেমে গেল।
তারপর ধীরে পেছনে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে আবার আগের দিকে হাঁটতে শুরু করল। এবার একটু দ্রুত।
রাস্তার ওপাশে, একটা চায়ের দোকানের পাশে মেয়েটাকে আবার দেখা গেল। সে আরেকজনের কাছে ফুল বিক্রি করার চেষ্টা করছে।
মাহির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মেয়েটা চিনে ফেলল।
-আরে ভাইয়া! আবার আসছেন?
মাহির পকেট থেকে টাকা বের করল।
-একটা ফুল দাও।
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল, ওও… এখন লাগবে?
মাহির কিছু বলল না।
মেয়েটা এবার ইচ্ছে করেই সবচেয়ে ভালো গোলাপটা বের করল।
ফুলটা হাতে দিতে দিতে দুষ্টু গলায় বলল, এইবার মনে হয় কাউরে দেওয়ার মানুষ পাইছেন।
মাহির মৃদু হেসে তাকালেও কিছু বলল না। শুধু ফুলটা নিয়ে ফিরে হাঁটতে শুরু করল।।
পেছন থেকে মেয়েটার খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এলো।
আর ঠিক তখনই আকাশ থেকে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটাটা এসে পড়ল তার হাতে ধরা লাল গোলাপের ওপর। কেউ তার ওপর আশা রাখুক বা না রাখুক, তার দেওয়া ফুল নেক বা না নেক, দিয়ে যাওয়া তার দায়িত্ব। এটা তার স্বভাব। এটা মাহিরের ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা।
—————
বৃষ্টি পুরোপুরি নামার আগেই মাহির বাড়ি পৌঁছে গেল।
তবুও শার্ট ভিজে গেছে সামান্য। কপালের চুলগুলো আরও এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর পড়ে আছে।
আহমেদ নিবাসের ভেতরে ঢুকতেই তার কেমন অদ্ভুত লাগল। বাড়িটা অস্বাভাবিক চুপচাপ। ড্রয়িংরুমের টিভি চলছে, কিন্তু শব্দ খুব কম। রান্নাঘরের দিক থেকেও তেমন কোনো আওয়াজ আসছে না। পুরো বাড়িটার ওপর ভারী আবহ জমে আছে।
মাহির কারো দিকে তাকাল না। জুতো খুলে সোজা নিজের চিলেকোঠার দিকে চলে গেল।
ঘরে ঢুকেই কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে হাতে ধরা গোলাপটা টেবিলের ওপর রেখে দিল।
লাল রঙটা অদ্ভুত উজ্জ্বল লাগছে। আয়না কি রাগ ভেঙে খোপায় পড়বে?
কয়েক সেকেন্ড সে ফুলটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ সরিয়ে ঘরের ভেতর তাকাল।
আয়না নেই।
বাথরুম খালি। বারান্দাও খালি।
মাহির ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকাল। হয়তো নিচে গেছে। অথবা ওই পাশের ভাড়াটিয়া মেয়েটার কাছে।
তার মনে পড়ল বিকেলের কথাগুলো। নিজের আচরণ মনে হতেই বুকের ভেতরটা কেমন অস্বস্তিতে ভরে উঠল। সে খুব বাজেভাবে রিঅ্যাক্ট করেছে। রাগ হওয়ার হয়তো কারণ ছিল। অপমানও লেগেছে। কিন্তু তাই বলে ওইভাবে কথা বলা উচিত হয়নি। আয়নার মুখটা তখন কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল।
মাহির ধীরে বিছানার ধারে বসে পড়ল। সে আসলে এসব সামলাতে শেখেনি। সবকিছু নিজের ভেতরে চেপে রেখে একসময় হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে যায়।তারপর আবার অপরাধবোধ হয়।
সে নিচু চোখে নিজের প্লাস্টার করা হাতটার দিকে তাকাল। হালকা একটা তিক্ত হাসি এলো ঠোঁটে।
একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ হয়েও নিজের জীবনটাই ঠিকভাবে ম্যানেজ করতে পারছে না। আজ সে ঠিক করেছিল আয়না ফিরলে শান্তভাবে কথা বলবে। সরি বলবে। বুঝিয়ে বলবে কেন ব্যাপারটা তাকে এত আঘাত করেছে।
কিন্তু ঘন্টা খানেক পার হয়ে গেলেও আয়না ফিরল না।
মাহির এবার ফোন বের করল।
একবার কল দিলে ফোন বন্ধ পেল।
সে কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আবার কল দিল।
একই উত্তর।
তার বুকের ভেতর অস্বস্তি জমতে শুরু করল।সে দ্রুত উঠে বাইরে বেরিয়ে এলো। ডাইনিংয়ের দিকে যেতেই মিনি তাকে দেখে বলল,
-ও মা মাহির ভাইয়া! তুমি একা ?
মাহির থেমে গেল, মানে?
মিনি অবাক হয়ে বলল, আমি তো ভাবছিলাম ভাবি তোমার সাথেই আছে।
মাহিরের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।।
-সে বাড়িতে নাই?
-না তো। তুমি বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই সেও বের হয়েছিল। কেমন অস্থির লাগছিল দেখতেও। আমি জিজ্ঞেস করছিলাম কোথায় যাও, ঠিকমতো কিছুই বলে নাই।
মাহিরের মুখের রঙ ধীরে ধীরে বদলে গেল,
কখন গেছে?
অনেকক্ষণ তো হলো। আমি দুই-তিনবার ফোনও দিলাম। বন্ধ ছিল। ভাবছিলাম হয়তো তোমার সাথে আছে।
শেষ কথাটা শোনার পর মাহিরের মাথার ভেতর কেমন শূন্য হয়ে গেল।
ফোন বন্ধ, আবার অনেকক্ষণ ধরে খোঁজ নেই।
অস্থির অবস্থায় বের হওয়া। হঠাৎ করেই তার মাথার ভেতর বহু বছরের পুরোনো একটা দৃশ্য ঝলকে উঠল।
সে ঝমঝম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বেরিয়ে গেল। তার মাথার ভেতর এখন আর কোনো যুক্তি কাজ করছে না। শুধু ভয় কাজ করছে। পুরোনো, অসহ্য, দমবন্ধ করা ভয়।
মানুষ কি এভাবেই চলে যায়? একবার বেরিয়ে যায়, তারপর আর ফিরে আসে না?
·
·
·
চলবে……………………………………………………