ছুটির ঘণ্টা বেজেছে।
মৌমিতা ব্যাগ গুছিয়ে নিলো। দাঁড়াতে গিয়ে টের পেলো, পা জোড়া কাঁপছে। মাথাটাও ঘুরে কেমন যেন উঠলো। ব্যবহারিক ক্লাসে যাওয়া ঠিক হবে না। ততোক্ষণে শরীরটা আরও খারাপ হয়ে যাবে।
বাইরে বেরোতেই ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা লাগলো গায়ে। মেয়েটা তার ওড়না আরও ভালোভাবে পেঁচিয়ে নেয় গলার চারপাশে। তারপর হাঁটতে শুরু করে।
এখনও সেভাবে রোদ ওঠেনি। মাঠের ঘাসগুলো দোল খাচ্ছে। বাতাস বইছে। মৌমিতার নাক বন্ধ। কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিয়ে নাকটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো সে, কাজ হলো না। ঘোর লাগা ভাবটাও রয়ে গেছে।
পুরোনো ভবনের কাছাকাছি গিয়ে সে গাছতলার দিকে তাকায়।
বাদল তাকে দেখেই মুখ ঘোরায়, অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে ব্যাগ হাতড়াতে শুরু করে। মৌমিতা ধীরপায়ে এগিয়ে যায় সামনে। বাদলের দিকে তাকিয়ে থাকতে খুব ইচ্ছে করলো তার! মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর দেখা হলো। তবু সে মাথা নিচু করে, চোখ নামায়। অদ্ভুত একটা অস্বস্তি কাজ করছে।
ছেলেটাকে অতিক্রম করতে গেলেই ডাকটা কানে আসে, “আপু?”
মৌমিতা ক্লান্তি অনুভব করলো। তবু ঘুরে তাকালো, দুর্বল স্বরে সাড়া দিলো, “জ্বী?”
বাদল বেশ বিনয়ের সাথে নীল ডায়েরিটা এগিয়ে দিলো তার দিকে, “আপনার ডায়েরি।”
ক্ষণিকের জন্য সামান্য বিভ্রান্ত দেখালো মেয়েটাকে। সে ভ্রু কুঁচকে বললো, “ফেরত দিচ্ছো?”
“জ্বী।”
মৌমিতা ছেলেটার হাতে ধরে রাখা নিজের ব্যক্তিগত সম্পদের দিকে তাকালো। কী যেন ভেবে সেটা ঠেলে সরিয়ে দিলো বাদলের দিকে, “এখন ফেরত দিয়ে কী হবে? সব তো পড়েই ফেলেছো।”
এমন অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তরে বাদল আবার অপ্রস্তুত হয়। তার পরবর্তী কথার অপেক্ষা না করে, মেয়েটা চলে যেতে উদ্যত হলে সে তাড়াহুড়ো করে বলে ওঠে, “ফেরত নেবেন না?”
“না।”
বাদল বুঝলো না, এখন খুশি হওয়া উচিত, নাকি মন খারাপ হওয়া। ডায়েরিটা সে রাখতে চায় ঠিকই। কিন্তু এতো সাধনার পরেও মৌমিতার সাথে তার কথোপকথন এতোটা সংক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে, এটাও সে ঠিকঠাক মানতে পারলো না। আরও বিভ্রান্ত হয়ে প্রশ্ন করলো, “সত্যিই?”
“হুম।”
“আমার কাছেই থাকবে?”
মৌমিতা বাদলের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো পুরোপুরি, মাথা নেড়ে বললো, “হুম, রাখো।”
বাদল তার মুখ থেকে চোখ সরায়। ভেতরটা ধকধক করছে। ইচ্ছা না থাকলেও তার ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসির রেখা দেখা দেয়। ব্যাগের চেইন খুলতে গেলে হাতটা কাঁপতে থাকে অকারণে! ডায়েরিটা সে নিজের কাছে রাখতে পারবে। আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমতি পেয়ে গেছে।
মৌমিতার মাথা ঘুরছে। চোখের সামনে সবটাই দুলছে যেন। চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে। সে কেবল খেয়াল করলো, ছেলেটার গালে খুব অল্পতেই টোল পড়ে। খেয়াল করলো, তাদের মাঝখানে দূরত্ব খুবই কম। এখন যদি সে মাথা ঘুরে বাদলের গায়ের উপর ঢলে পড়ে, কেমন হবে? দারুণ একটা কেলেঙ্কারি হবে!
মেয়েটা মনে মনে হাসলো। জ্বর তাকে পুরোপুরি কাবু করেছে। তবে সম্পূর্ণ দোষটা জ্বরের নয়। মেয়েটা নিজেই নিজের আজগুবি কল্পনার লাগাম ছেড়ে দিয়েছে। আরও অদ্ভুতুড়ে সব ভাবনা আসছে তার মাথায়। বাদলের গাল টেনে দিতে ইচ্ছে করছে।
ডায়েরিটা সন্তর্পণে ব্যাগে ঢুকিয়ে বাদল আবার তার দিকে তাকায়। অনেকটা কৈফিয়তের মতো করে উচ্চারণ করে, “আপনার ডায়েরি আর কেউই দেখেনি। আমি কাউকে ধরতেও দেইনি।”
“ভালো করেছো।”
মৌমিতা ঘুরে হাঁটতে শুরু করলো। কপালের উপরের অংশে খুব অস্বস্তিকর একটা ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। অসহনীয় একটা ব্যথা।
“আপু?”
সে পেছনে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো, “আপু বলবা না। ম্যাডামই ঠিক আছে।”
“আ... আচ্ছা।”
“আমি আজকে টিউশন ক্লাসে যাবো না। তুমিও যেও না।”
কথা শেষ করেই মেয়েটা আবার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করে। এদিকে অন্যজনের হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। ছেলেটা বুঝে উঠতে পারছে না, কী প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত। দেহের অভ্যন্তরে একের পর এক রাসায়নিক বিস্ফোরণ ঘটে চলেছে। সে চলে যেতে থাকা মেয়েটির পানে নির্নিমেষ চেয়ে থাকে।
“আরেকটা কথা—” বাদল চেঁচিয়ে উঠলো হঠাৎ, “ম্যাডাম? আর কিন্তু ফেরত পাবেন না ডায়েরি!”
মৌমিতা ইতোমধ্যে অনেকটা দূরে চলে এসেছে। মাথার ভেতরে যেন কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে সজোরে। বাদলের হুমকিটা কর্ণগোচর হলেও সে আর ফিরে তাকালো না। থামলোও না। এতোগুলো মানুষের মাঝে একটা জুনিয়র ছেলে চিৎকার করে তাকে এসব বলছে—এটাতেও সে বিচলিত হলো না। সবটাই যেন একটা সুন্দর স্বপ্ন। এর মাঝে হস্তক্ষেপ করার আগ্রহ হলো না তার।
রাশেদ নোটখাতার পাতা ওল্টাচ্ছে। মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, সে খুবই বিরক্ত। বাদল ঘরে ঢুকতেই সে বলে ওঠে, “এতো দেরি করলি কেন? কতোগুলো হোমওয়ার্ক দিয়েছে আজকে। শেষ যে কেমনে করবো—”
বাদল নির্বিকার হয়ে বলে, “কর আস্তে আস্তে।”
“খাতা নিয়ে আয়। একসাথে শুরু করি।”
“আমি যাবো না আজকে।”
“কেন?”
“এমনিই!”
কথাটা বলতে গিয়ে বাদল ভুলবশত একটু হেসে ফেলে। আমজাদ ভ্রু নাচিয়ে বলে, “কী রে পিচ্চি? তুই কি পাগল-টাগল হয়ে গেলি নাকি? এতো ফাঁকিবাজি করা তো ভালো লক্ষণ নয়।”
অন্য কোনো সময়ে বাদল এই ‘পিচ্চি’ সম্বোধন নিয়ে বিদ্রোহ শুরু করে দিতো। কিন্তু আজ সে প্রত্যুত্তরে আরেকবার হাসলো। কোনো প্রতিবাদ করলো না। রাশেদ সরু চোখে তার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। কিছু একটা তো ঘটেছে। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেই নিজের খারাপ হওয়া নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে হতাশ হচ্ছিলো, তাকে হঠাৎ এতো খুশি খুশি দেখাচ্ছে কেন? ভাবখানা এমন, যেন কোনো সোনার হরিণ পেয়ে গেছে!
—————
মৌমিতা জানালার কপাট লাগিয়ে ফেললো। বাড়ির পেছনে কয়েকটা ছেলে ঢুকেছে কামরাঙা পাড়ার জন্য। এই কাজের তদারকি করছে রিপন। মার্জিয়া অনেকক্ষণ আগেই বাড়ি ফিরেছে। তবু জানালা বন্ধ করেনি। ছেলেগুলো এতোক্ষণ ধরে ঘরের ভেতরে উঁকিঝুঁকি দেয়ার চেষ্টা করছিলো।
ছোট বোনের আক্কেল নিয়ে অসন্তুষ্ট হলো মৌমিতা। সে ছিটকিনি লাগিয়ে খাটে গিয়ে বসলো। শরীরটা কাঁপতে শুরু করেছে। জ্বরের প্রাথমিক ঘোরটা কেটে গেছে। অস্বস্তি কাজ করছে এখন।
মৌমিতা ভাঁজ করে রাখা চাদরটার দিকে হাত বাড়ালো। কিন্তু ভাঁজ পুরোপুরি খুলতে পারলো না। চোখের সামনে সব অস্পষ্ট হয়ে আসতে থাকে। অগত্যা সে বালিশে মাথা রেখে কোনোমতে শুয়ে পড়লো। চারপাশের পৃথিবী একটা পাতলা পর্দায় ঢাকা পড়ে যায়। বাহিরের শব্দ মৃদু থেকে মৃদুতর হয়ে আসছে কানে। গাছ থেকে ফল সংগ্রহের শব্দ। রান্নাঘরের হাড়ি পাতিলের শব্দ। বাড়ির মানুষগুলোর কথাবার্তা। দরজা খোলার শব্দ...
মার্জিয়া ভেতরে ঢুকে বোনকে ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো। পায়ের কাছে মোটা চাদরটা অগোছালো অবস্থায় পড়ে আছে। সেটা গোছানোর জন্য হাত বাড়ালে আপার পায়ের সাথে তার হাত লেগে যায় ভুলবশত। মার্জিয়া চমকে ওঠে। মৌমিতার কপালে হাত রাখলো সে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। চাদরটা না গুছিয়ে মার্জিয়া সেটার ভাঁজ খুলে ফেললো। তারপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা বোনটাকে আপাদমস্তক ঢেকে ফেললো। মাথায় হাত দিয়ে তাপমাত্রা বোঝার চেষ্টা করলো আরেকবার। মৌমিতা অস্ফুটে বললো, “মার্জু?”
তার চোখ বন্ধ, কথাটাও তেমন স্পষ্ট শোনালো না। মার্জিয়া তবু কান পেতে দেয়, “জ্বী আপা?”
“পানি খাবো।”
মেয়েটা তড়িঘড়ি করে ছুটলো খাওয়ার ঘরে। অসুস্থতার কারণে হলেও আপার অভিমানটা চলে গেছে। কিন্তু এতোটা অসুস্থ হয়ে গেলো মেয়েটা, কাউকে কিছু বললো না। গ্লাসে পানি ঢেলে বোনের পাশে এসে দাঁড়ালো মার্জিয়া, “আপা? পানি খাও।”
মৌমিতা চোখটা অর্ধেক খুললো। অনেক সময় নিয়ে উঠে বসলো। কয়েক ঢোক পানি গিলেই সে গ্লাসটা ফেরত দেয়। মার্জিয়া বলে, “আজকে তেলাপিয়া মাছ রান্না করেছে আম্মা। দুপুরের জন্য।”
“দুপুরে খাবো না। মাথা ব্যথা।”
“কালকে ঐভাবে ভিজলা কেন? রাগ করার আগে একটু চিন্তা করতে পারো না?”
মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে বোনের দিকে তাকায়, তার চোখজোড়া লাল হয়ে উঠেছে। সে এক ঝটকায় গা থেকে চাদর সরিয়ে আবার শুয়ে পড়ে। মার্জিয়া হতভম্ব হয়ে যায়। সে চাদরটা তুলে দিতে গেলে মৌমিতা আবার সরিয়ে ফেলে। সামান্য কথায় অভিমান করতে মেয়েটা বেশ পারদর্শী। এই অসুস্থ শরীর নিয়েও এমন তেজ দেখানোর দরকারটা কী?
মার্জিয়া কিছু সময় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
মারুফ এসেছেন। বারান্দায় রাখা পাকা কামরাঙা গুলোর দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন। ছোট মেয়েকে দেখেই তিনি প্রফুল্ল হয়ে বললেন, “ছোট মা, দেখেছো, এবার কতো বড় হয়েছে কামরাঙা?”
“হুম।”
“দেখলাম অনেকগুলোই নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টির কারণে মাটিতে পড়ে গেছে। একেবারে অনেকগুলো নষ্ট হয়েছে। বাদুড়ে খেয়েছে। কামরাঙা পাকলে কিন্তু মাঝে মাঝে গাছে টিয়া পাখিও আসে। দেখেছো কখনও?”
“হ্যাঁ, দেখেছি।” মার্জিয়া চৌকাঠে হেলান দেয়, নখ দিয়ে দেয়ালে দাগ কেটে নিচুস্বরে বলে, “আপার জ্বর এসেছে।”
মারুফের মুখের অভিব্যক্তি সহসা বদলে গেলো, “কখন?”
“জানি না। আজকে আপা একেবারে অসুস্থ হয়ে গেছে দেখলাম। চোখ লাল হয়ে আছে।”
“তাই নাকি?”
ঘরের দরজা খোলা। মৌমিতা শুয়ে আছে হাঁটু ভাঁজ করে, জড়োসড়ো হয়ে। তার শিয়রে এসে দাঁড়িয়ে মারুফ টের পেলেন, মেয়েটা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তিনি মাথার কাছে বসলেন। কপালে হাত বুলিয়ে আদুরে স্বরে ডাকলেন, “মৌ মা?”
মৌমিতা সাড়া দেয় না। হা করে শ্বাস নিচ্ছে সে, বেশ মৃদু তবে অদ্ভুত একটা শব্দ হচ্ছে, সম্ভবত গলা থেকে আসছে আওয়াজটা। মারুফ অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মেয়েটার মাথায় পানি ঢালতে হবে। তার শরীরটা চাদরে ভালোমতো ঢেকে দিলেন তিনি। মুখখানির দিকে চেয়ে রইলেন।
লোকে বলে, বড় মেয়েটা হুবহু তার মতো দেখতে। নিজেকে নিজের কাছে বিশেষ মনে হয়নি কখনও। তবে তার মুখশ্রী মেয়েটা যদি পেয়ে থাকে, স্বীকার করতেই হয়, পিতার এই বৈশিষ্ট্য বেশ সুন্দরভাবে মানিয়ে গেছে তার সঙ্গে। তার ঘুমন্ত মুখটা ভীষণ নিষ্পাপ দেখাচ্ছে।
মৌমিতা ঘুমের মাঝেই নড়েচড়ে ওঠে। চাদরের ভেতর থেকে হাত বের করে চোখ ঘষতে শুরু করে। মারুফ পরম স্নেহে তার হাতটা ধরে বাধা দিলেন, “ব্যথা লাগবে মা।”
মেয়েটার ঘুম ভাঙে না। আব্বার তালুতে হাত রেখে সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে আবার। হঠাৎ করেই খুব ছোট দেখায় তাকে, যেন বয়সটা অনেকখানি কমে গেছে।
মারুফ সর্বদা উতলা থাকেন—মেয়ে দুটো কবে বড় হবে, কবে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, এসব ভেবে। এই মুহূর্তে তার মনে হলো, মেয়েদুটো যদি কখনোই বড় না হতো! কোনো জাদুমন্ত্রের সাহায্যে যদি সময়টা আটকে রাখা যেতো, মন্দ হতো না। কিন্তু ওরা ঠিকই বড় হবে। এই বাড়ি ছেড়ে, আব্বাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে দু'জনকেই। হাজার চেষ্টা করলেও তাদের বেঁধে রাখা সম্ভব হবে না। কী নিষ্ঠুর সব নিয়ম-কানুন!
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়ের কোমল হাতখানি চাদর দ্বারা ঢেকে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। রাবেয়াকে জানাতে হবে, মৌমিতার জ্বর এসেছে। মাথায় পানি ঢালার ব্যবস্থা করতে হবে।
—————
রাত ১০টা বাজে।
মৌমিতা খাটের এক কোণে বসে রয়েছে। হাতে একটা বই, তারানাথ তান্ত্রিক সমগ্র। অসুস্থ হওয়ার একটা সুবিধা হলো, আম্মার বকা খাওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। সুতরাং পড়াশোনা এবং কাজ ফাঁকি দিয়ে এ সময় শখের কিছু করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
এই বইয়ের সব গল্পই তার মুখস্থপ্রায়। তবু যেগুলো কম পড়া হয়েছে, সেগুলোতেই আরেকবার করে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে সে। বাইরে ঝড়ো হাওয়া। এমন বই পড়ার উপযুক্ত সময়। তবে ভাগ্য তেমন সুপ্রসন্ন নয় তার। লোডশেডিং শুরু হলো। অন্ধকার ঘরে খানিকক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকে মেয়েটা। এরপরেই মার্জিয়া মোমবাতি হাতে ভেতরে ঢোকে, “আপা, খেতে আসো।”
“খাবো না। পেটে জায়গা নাই। বিকালের নাস্তাই হজম হয়নি এখনও।”
“কিছু তো একটা খেতে হবে। নাহলে তো ওষুধ খাওয়া যাবে না।”
“ওষুধ লাগবে না। এখন জ্বর নাই।”
“আচ্ছা।”
মার্জিয়া মোমবাতিটা টেবিলের উপরে রেখে বেরিয়ে গেলো। মৌমিতা আবার বই খুললো। স্বল্প আলোয় ছোট ছোট অক্ষরগুলো চোখের সামনে পিঁপড়ের মতো নাচতে শুরু করেছে। সে তবু বইয়ের পাতায় তাকিয়ে থাকে। চুলগুলো ভেজা, এতোক্ষণে শুকিয়ে যাওয়া উচিত ছিলো। মাথায় পানি ঢালার ইচ্ছেই ছিলো না, তবু আব্বা জোর করলেন বলেই কাজটা করতে হলো। তবে জ্বরটা ছাড়ানোর কারণ হয়তো এটাই। নাহলে শরীরটা এখনও খারাপ থাকতো।
তার মনে পড়ে যায়, আজকে কলেজে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা।
ডায়েরিটা বাদল আর ফেরত দেবে না—সর্বশেষ ছেলেটার এই কথাটাই শুনেছে মৌমিতা। এর পূর্বের কথোপকথন মনে পড়তেই তার মুখ লাল হয়ে যায়। সে নিজে টিউশনে যাবে না বলে বাদলকেও বারণ করেছে। আশ্চর্য! বাদল কি তাকে দেখতে টিউশনে যায়? ওটা তো পড়াশোনার জায়গা। বাদল এখন কী ভাববে!
নাটকীয় ভঙ্গিতে বড় একটা শ্বাস নিলো মৌমিতা। নিজেকে বোঝালো, নির্লজ্জদের সাথে এমন লজ্জাহীনতা করাই যায়! তারপর নিজের যুক্তি বিবেচনা করে সে নিজেই শিউরে উঠলো। এ কেমন অধঃপতন হচ্ছে তার!
রাবেয়া ভাত মেখে এনেছেন। বিছানার উপরে খবরের কাগজ বিছিয়ে সেখানে থালাটা রাখলেন তিনি, “নাও। এখানে ভাত এনে দিলাম। খাও একটু, যতোটুকু খেতে পারো। খেয়ে ওষুধ খাও।”
মৌমিতা অনীহা প্রকাশ করে, “খেতে একদমই ইচ্ছা করছে না।”
“না খেলে তো চলবে না। আমি খাওয়াবো?”
মেয়েটা অপ্রস্তুত হয়ে বসে থাকে। এতো বড় সন্তানকে মা তুলে খাইয়েছে—এই খবর কারও কানে গেলে কোনো মান-সম্মান অবশিষ্ট থাকবে না। এ ধরনের মুখরোচক সংবাদ প্রচারের জন্য মার্জিয়া খন্দকার তো রয়েছেই। তাছাড়া বাড়িতে এখন রিপন মামাও উপস্থিত। মানহানির ভয়ে মৌমিতা জোরে জোরে মাথা নাড়লো, “না না! আমি নিজে খাবো।”
“তাহলে পানি এনে দেই। হাত ধোও।”
“আচ্ছা। আম্মা? আমি কিন্তু শুধু এতোটুকু খাবো।”
“অতোটুকু খেয়ে কী হবে? অল্প করেই তো দিলাম। পুরোটা খাও।”
“না।”
“আচ্ছা, যতোটুকু পারো, খাও।”
খাওয়া শেষ করে মৌমিতা বারান্দায় গেলো। বিদ্যুৎ এখনও আসেনি। তবে এখানে চাঁদের আলো রয়েছে। কিছুক্ষণ আগের বাতাসে আঙিনায় অনেক শুকনো পাতা এসে জমেছে। কিছু জোনাকি জ্বলজ্বল করছে উঠোন জুড়ে। বারান্দা থেকে দৃশ্যটা খুব অপরূপ দেখালো।
রাবেয়া কামরাঙা মেখেছেন লবণ-মরিচ দিয়ে। রিপন তা দেখে আক্ষেপ করে বললো, “পাকা কামরাঙা আবার মরিচ দিয়ে মাখলেন? এসব বুদ্ধি আপনি কই পান আপা? সঙ্গদোষে মাথা খারাপ হয়ে গেছে আপনার।”
কথাটা বলে সে মারুফের দিকে তাকায়। অন্ধকারের কারণে মারুফ তা টের পেলেন না। তিনি মৌমিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন শরীরটা কেমন মৌ মা?”
মেয়েটা ক্ষীণস্বরে জবাব দেয় মাথা দুলিয়ে, “ভালোই।”
মারুফ পাশের চেয়ারটা দেখালেন, “বসো।” তারপর স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “রাবেয়া? ভালো ভালো কয়েকটা কামরাঙা বেছে রাখো তো। জহির ভাইয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিও কালকে। জোবেদাকে দেয়া হয়েছে?”
রাবেয়া হাতপাখাটা ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, “হ্যাঁ। ওকে দিলাম কয়েকটা।”
রিপন বিরক্তির সুরে বললো, “এই মহিলা খুবই খারাপ। আমাকে বলে, আমার নাকি চেহারা ভালো না। পাত্রী পাওয়া যাবে না, বিয়ে হবে না। আমি বললাম, আপনার যেহেতু বিয়ে হয়েছে, আমারও হবে।”
বাকিরা হেসে উঠলো। মারুফও হাসলেন, “জোবেদা ভালো মানুষ। কথা বলার মানুষ পায় না তো, তাই তোমাদের সাথে বেশি কথা বলতে চায়।”
“ধুরো মারুফ ভাই! আপনি আবার ওকালতি করতে আসেন কেন? আমি কখন বললাম, উনি খারাপ? বললাম যে, আমি ওনার চেয়েও বেশি খারাপ।”
বড়দের কথাবার্তার মাঝেই মৌমিতা ভেতরে এলো। রান্নাঘরে ঢুকে আলমারি হাতড়ে দিয়াশলাই খুঁজে বের করলো। একপাশে রাখা ছোট্ট মোমবাতি জ্বালিয়ে ফলের ডালাটার দিকে তাকালো সে। বেছে বেছে সবচেয়ে ভালো দেখতে একটা কামরাঙা নিলো। তামান্নার জন্য।
তামান্না প্রতিবছরই মৌমিতাকে বরই এনে দেয়। তার মামার বাড়িতে নাকি অনেকগুলো বরইয়ের গাছ আছে। মায়ের হাতের বরইয়ের আচারও মৌমিতাকে খাওয়াতে চেয়েছিলো। মাঝে মাঝে পাকা পেয়ারাও আনে। অথচ তাকে এখন পর্যন্ত কিছু দিতে পারেনি মৌমিতা। এমনকি এতো ভালো একজন বন্ধু হিসেবে তামান্নার প্রাপ্য সঙ্গটুকু, সময় আর মনোযোগটুকুও দিতে পারেনি। এমন করলে আর চলবে না। তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, অন্তত এমন মানুষগুলোর জন্য হলেও একটু সামাজিক হতে হবে।
—————
আজ শরীরটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। জ্বর নেই। তবে নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না, রাতে আবার জ্বর আসতে পারে। মৌমিতার সাথে প্রায়ই এমন হয়।
দুঃখের বিষয় হলো, তামান্না কলেজে আসেনি। এবার টানা অনেকদিন ধরেই সে অনুপস্থিত। বাড়িতে কি কোনো সমস্যা হয়েছে?
ব্যবহারিক ক্লাস শেষে মৌমিতা আপনমনে হাঁটতে লাগলো। হাতদুটো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। নাকটা শিরশির করছে খুব, হাঁচি আসতে পারে। বিরক্ত হয়ে গেলো সে। হাঁচি হবে হবে ভাবটা তার ভীষণ অপছন্দ। হাঁচি না হওয়ায় চোখে পানিও এসে যাচ্ছে। তখনই তার নজর গেলো ছেলেটার দিকে।
এদিকে ছেলেদের আবাসিক হল। বাদল একাকী দাঁড়িয়ে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, মনোযোগ দিয়ে কোনো নোটিশ দেখছে সম্ভবত।
মৌমিতা নাকমুখ চেপে ধরে। এই মুহূর্তে নতুন কোনো অরাজকতা চায় না সে। দ্রুত চোখ মুছে ফেলে। আবার এগিয়ে যায় ধীরে ধীরে।
কারও উপস্থিতি টের পেতেই ছেলেটা মাথা ঘোরায়। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ব্যাগ থেকে ফলটা বের করে মৌমিতা তাকে আদেশ করলো, “হাত দাও।”
বাদল হাত বাড়ালো। মেয়েটা তার হাতের উপর রাখলো একটা পাকা কামরাঙা। বাদল বিভ্রান্ত হয়ে তার দিকে তাকায়। মৌমিতা ব্যাগটা ভালো করে কাঁধে ঝুলিয়ে বলে, “আমাদের গাছের।”
“আমাকে... দিলেন কেন?”
“এমনি।”
সে চলে যেতে উদ্যত হতেই বাদল পিছু ডাকে, “দাঁড়ান একটু।”
পকেটে হাত ঢুকিয়ে অস্থিরভাবে খুঁজে বের করে কিছু, মেয়েটার দিকে এগিয়ে দেয় ছয়-সাতটা রক্তচন্দনের বীজ। মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে বলে, “এগুলো দিয়ে আমি কী করবো?”
“এমনিই। রাখেন।”
এই তুচ্ছ উপহারটুকু গ্রহণ করতে গিয়ে মৌমিতা ফিক করে হেসে ফেললো, যদিও হাসি আটকানোর যথাসাধ্য চেষ্টা সে করেছিলো। তবু ব্যর্থ হতে হলো। বাদলের হাতের উষ্ণ ছোঁয়া লেগে আছে বীজগুলোতে। মেয়েটা মুঠোর মাঝে সেগুলো চেপে ধরলো।
ছোটবেলায় সে এবং মার্জিয়া গাছের পাতা আর বীজকে টাকা-পয়সা হিসেবে ব্যবহার করে বাজার বাজার খেলতো। ছেলেটাও কি তাই খেলছে? মুখ দেখে অবশ্য মনে হচ্ছে, সে বেজায় অপমানিত বোধ করেছে মৌমিতা এভাবে হাসায়।
আদতেই বাদল একটু অপ্রস্তুত হয়েছে। মৌমিতা খন্দকার কি কখনোই তাকে জুনিয়র পরিচয়ের বাইরে একটু আলাদা নজরে দেখতে পারবে না? আর ২-৩ বছর আগে জন্ম নিলে কী ভালোটাই না হতো! কেবল দৈহিক উচ্চতা দিয়ে যে মেয়েটার থেকে বড় হওয়া সম্ভব নয়, এটা বাদল জানে। তার প্রিয়তমা কেবল বয়সে বড় হওয়ায়, সামাজিক বেড়াজালে তার থেকে কতোটা দূরত্বে গিয়ে ঠেকেছে, এটা ভাবতে তার ভালো লাগলো না। সে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলো। তালুতে আলগা করে ধরে রাখা একটা নরম পাকা ফল, একটু জোর দিয়ে আঁকড়ে ধরতে গেলেই যেন নষ্ট হয়ে যাবে। ছেড়ে দেওয়া যাচ্ছে না, অথচ শক্ত করে ধরাও যাচ্ছে না।
বাদল অমন গভীর কিছু ভাবলো না অবশ্য। সে জানে, তার কাছে মৌমিতার খুব মূল্যবান একটা জিনিস আছে ইতোমধ্যেই। তবুও তার প্রশ্ন, কামরাঙা না দিয়ে অন্যকিছু দেয়া যেতো না, যেটা সারাজীবন রেখে দেওয়া যায়?
·
·
·
চলবে……………………………………………………