মির্জা ম্যানশনে আজ বেশ এলাহিভাবে লাঞ্চের আয়োজন করা হয়েছে। করিম তাজওয়ার এবং সম্রাট তাজওয়ারও ভরদুপুরে এসে উপস্থিত হয়েছে সেখানে। সম্রাটকে হসপিটাল থেকে রিলিজ করা হয়েছে আজ সকালেই। হাতে ব্যান্ডেজ আর ব্যাগ পড়ে এসেছে সে। তবে, ভোজের এই বিশাল আয়োজন আসলে তাজওয়ারদের জন্যে নয়। তাজওয়ারদের প্রতি অমন সমীহ মনোভাব কোনকালেই ছিলোনা শওকত মির্জার মনে। আয়োজনটা আসলে হোম মিনিস্টারের জন্যে করা হয়েছে। কাশেম হক। মূলত তাকে নিমন্ত্রণ করেই আয়োজন করা হয়েছে এই বিশেষ ভোজের। যদিও সম্রাট কিংবা করিমের সঙ্গে বিশেষ কোন সখ্যতা নেই কাশেমের। বরং দীর্ঘদিনের এক গোপন রেষারেষি-ই আছে ব্লাক হোলের সঙ্গে।
তাও এই বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খাওয়ার পেছনে রয়েছে যারযার ব্যক্তিগত স্বার্থ। কাশেম হক শওকত মির্জার কাছে দায়বদ্ধ, নিজের স্বার্থে। অন্যদিকে বর্তামান স্বার্থ রক্ষায় শওকতের সঙ্গে কাশেমের কানেশনের সুবিধাটা প্রয়োজন তাজওয়ারদের। যারফলে একে অপরের জাত শত্রদেরও একসঙ্গে আজ এক টেবিলে ভোজে বসতে হচ্ছে।
কাশেম হক মির্জা ম্যানশনে এসে পৌঁছলো দুপুর দুটোয়। সকালে পার্টি অফিসে জরুরি এক মিটিং ছিল। সেই মিটিং সেড়ে সরাসরি এসে পৌঁছছে। কালো রঙের পাঞ্জাবী পড়ে ফিটফাট হয়ে এসেছে সে। জানুয়ারির নরম রোদে বেশ লাগল দেখতে। আজ যেন আরও বেশি তরুণ লাগছে পঞ্চাশ বছর বয়সী এই মন্ত্রীকে।
যথারীতি গেইট অবধি গিয়ে তার দেহরক্ষীসহ তাকে সাদরে ভেতরে নিয়ে এলো শওকত মির্জ এবং শান মির্জা। প্রসন্ন হয়ে শানের পিঠে হাত চাপড়ে দিলো কাশেম হক। উনি ভেতরে এলেই করিম তাজওয়ার দ্রুত উঠে দাঁড়াল সোফা থেকে। মুখে কৃত্রিম একটু হাসি ঝুলিয়ে করমর্দনের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিল। জবাবে কাশেমও সামান্য হেসে হাত মেলালো, কুশল বিনিময় করল। কিন্তু মনে মনে দুজনেই গুষ্ঠি উদ্ধার করল দুজনের।
করিমের সঙ্গে কুশল বিনিময় শেষে, কাশেম ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল সম্রাটের দিকে। যে এখনো পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে। তোষামোদের কোন লক্ষণ নেই ওর মাঝে। ব্যপারটাতে অভ্যস্ত নয় কাশেম। সে ওপর থেকে নিচ অবধি সম্রাটকে একবার পরখ করে বলল, 'এটা তোমার ছেলে নাকি তাজওয়ার সাহেব? কী যেন নাম? বাদশা না সম্রাট যেন?
বসে থেকে, উত্তরে ঠিক একই ভঙ্গিতে ঘাড় বাকালো সম্রাট তাজওয়ার। ঠান্ডা গলায় বলল, ' সম্রাট। কিন্তু আপনিতো ডোম মিনিস্টার, আই মিন হোম মিনিস্টার হাশেম হক তাইনা? ওপস্ স্যরি, কাশেম হক।'
ঠোঁটের মৃদু হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল কাশেম হকের। ধারাল চোখে চেয়ে রইল সামনে দাঁড়ানো উগ্র, বেয়াদব তরুণের দিকে। সম্রাট নিজেও চোখে চাপা এক রেষ নিয়ে তাকিয়ে আছে। বিজনেস, ডিল, টাকা সব ডুবে জাহান্নামে যাক। তবুও তেলবাজি হবেনা ওর দ্বারা। এই পৃথিবীতে একমাত্র রাণীর সামনেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ও। নরম হয়ে কথা বলে। নিজের ব্যক্তিত্বের উগ্রতাকে আড়াল করে হ্যাংলার মতো আচরণ করে। কিন্তু বাকি সবার সামনে ও সম্রাট তাজওয়ারই, আর সম্রাট তাজওয়ারই থাকবে।
কাশেম ওর ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, 'হাতে কী হয়েছিল। বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলে নাকি?'
একহাতে ঘাড় চুলকে হাসল সম্রাট, ' উহু। কুতকুত খেলতে গিয়ে পড় গেছি। ঐযে, আঠারো সালে আপনি যেভাবে পড়ে গিয়েছিলেন। মনে আছে তা?'
কাশেমের চোখের চাহনী আরও তীক্ষ্ণ হল। পরিবেশটা বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। গলা ঝেড়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করল শওকত, 'তুমি বসো কাশেম। একটু জিরিয়ে, পানিটানি খাও। এরপর সোজা ডাইনিংয়ে যাব। লাঞ্চ টাইম হয়ে গেছে। বাকি আলোচনা সেখানেই হবে।'
মাথা নাড়ল কাশেম হক। চোখে চোখে আরও একবার স্নায়ুযুদ্ধ হল সম্রাট আর কাশেমের মধ্যেহ পলাশের সঙ্গে কুশল বিনিময় করা শেষে, হলরুমে বসেই একসঙ্গে শরবত খেলো সকলে মিলে। জরুরি কোন কথা হলোনা সেখানে আর। হালকা পাতলা কুশল বিনিময়ই চলল।
এরপর সোজা ডাইনিংয়ে নিয়ে গেল শওকত ওদের। বিশাল ডাইনিং টেবিলজুড়ে হরেকরকম খাবার সাজানো; পোলাও, রোস্ট, মাংস আর ডিমের কোর্মা, গরুর মাংস দু-তিনরকমের মাছ, তিন-চারপদের ভাজি, দু-রকমের চাটনি, মিষ্টি, পায়েস, কোলড্রিংক্স। খাবারের গন্ধে মৌ মৌ করছে ডাইনিং রুমটা। এই টেবিলে বসা মাত্রই ক্ষিদে পেয়ে যাওয়াটা অন্যায় কিছু হবে না।
খাওয়া শুরু করার আগে এদিকওদিক তাকাল করিম তাজওয়ার। গম্ভীর শ্বাস ফেলে সরু চোখে তাকালো শওকতের দিকে। অসন্তোষ নিয়ে বলল, 'আপনার মেয়ে কী আজও মিটিংয়ে উপস্থিত থাকবেনা করিম সাহেব?'
রাণীর কথা ওঠামাত্র চোখজোড়া চঞ্চল হয়ে উঠল কাশেম হকের। পূর্ণ যুবতি হওয়ার পরতো সেদিনই প্রথম দেখল মেয়েটাকে। কী চমৎকার লতানো শরীর, যেন হলদে আলো ছিটকে বেরোচ্ছে গা থেকে, সেই কম্পমান সরু ঠোঁটজোড়া, ভরাট গাল। যেন মিতারই প্রতিবিম্ব। রূপের পাল্লায় মাপলে রাণী একটু না, অনেকটাই বেশি হবে। ঐ মেয়েকে একবার, শুধু একবার হলেও বিছানায় চাই তার। তখন ছোট ছিল তাই চেঁচামেচি করেছে, বাঁধা দিয়েছে। কিন্তু এখনতো বড় হয়েছে। মায়ের মতো লোভ আর উচ্চাকাঙ্খা আছে নাকি ভেতরে? না থাকলে এই পথে কেন? কোন সুবিধা কিংবা ডিলের বিনিময়ে রাজি হবেনা? হওয়াতো উচিত।
এদিকে সম্রাট মির্জা ম্যানশনে আশামাত্রই গিয়েছিল রাণীর রুমে। কিন্তু ঘুমোচ্ছিলো সে, দরজা খোলেনি। ও বলল, 'রাণী ঘুমোচ্ছে। আমি গিয়ে ডেকে আনছি ওকে।'
বলে সম্রাট উঠতে নিলেই হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিল শওকত, 'তার কোন প্রয়োজন নেই। লোক খবর পাঠিয়েছি ওর কাছে। আসার হলে চলে আসবে।'
'আসার হলে?' ভ্রু উঁচু করে বলল করিম।
এপর্যায়ে বিরক্ত হল শান। পাড়ার কূটনী চাচিদের মতো রাণীর পিছে পড়ে থাকে এই লোক। সারাদিন প্যানপ্যানিনি। ও বিরক্তিসূচক 'চ্যাহ' শব্দ করে বলল, 'তো এখন কী মাথায় ব*ন্দু*ক ধরে তুলে নিয়ে আসব ওকে?'
করিম কিছু বলার আগেই পলাশ মির্জা বলল, ' আচ্ছা থাকনা। মন্ত্রী সাহেবের সামনে কী শুরু করেছো তোমরা? আমরা খেতে খেতে কথা শুরু করি। ও আসলে দেখা যাবে পরে।'
কাশেম সৌজন্যের ভং ধরে বলল, ' সমস্যা নেই। ওর জন্যে একটু অপেক্ষা করতেই পারি আমরা।'
' তার প্রয়োজন নে_'
কথাটা শেষ করতে পারল না শওকত। তার আগেই ডাইনিংয়ে এসে উপস্থিত হল প্রিয়তা। ওর আগমনের শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল সকলে। যা পড়ে ঘুমিয়েছিল, তা পড়েই নেমে এসেছে রাণী। ঢিলেঢালা ছাইরঙা গেঞ্জি আর কালো ট্রাউজার। চেঞ্জ করার প্রয়োজনও মনে করেনি। এমনকি চুলগুলোও আচড়ায়নি মেয়েটা। যদিও চুলগুলো ভীষণ মসৃণ হওয়ায় তেমন বোঝা যাচ্ছেনা তা। দুচোখ ভর্তি তখনও ঘুম ওর।
ডাইনিংয়ে এসে দাঁড়াতেই সবার আগে রাণীর চোখ গেল কাশেম হকের দিকে। কিছু সেকেন্ডের জন্যে থমকালো ওর দৃষ্টি। চোখাচোখি হতেই মৃদু বাঁকা হাসি দিল কাশেম। রাণী দাঁতে দাঁত পিষল, শক্ত করে আকড়ে ধরল গেঞ্জির নিচটা। ও জানতো এই লোক আজ আসবে। নিচে নামার আগে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই নেমেছে ও। ভেতর ভেতরে ভীষণ অস্থির, উত্তেজিত হয়ে উঠলেও বাইরে তা বিন্দুমাত্র প্রকাশ করল না। উল্টে নিরস গলায় বলল, 'ডেকেছো কেন?'
রাণীর এভাবে কাশেমকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল সকলে। শত হোক দেশের হোম মিনিস্টার সে। কিন্তু কাশেমের ঠোঁটের সেই নির্লজ্জ হাসিটা বাড়ল কেবল। আরও একবার পরিস্থিতি সামাল দিয়ে শওকত বলল, 'ডেলিভারীর ডেইটযে চলে এসছে ভুলে গেছো তা?'
চোখ উল্টে শ্বাস ফেলল প্রিয়তা, 'ওহ্ ইয়াহ।'
সেই দুই বছর আগের নিয়মে, সম্রাটের পাশের চেয়ারটাই ফাঁকা রাখা হয়েছে ওর জন্যে। প্রিয়তা কোন আপত্তি না করে সেই চেয়ারটা টেনেই বসল। সার্ভেন্ট দ্রুত হাতে খাবার সার্ভ করল ওর প্লেটে। সম্রাট ঝুঁকে মৃদু স্বরে জানতে চাইল, 'আর ইউ ওকে?'
প্রিয়তা উত্তরে মাথা নাড়ল কেবল। একটা কাটা চামচ তুলে আঙ্গুলে নাড়তে নাড়তে তাকাল সবার দিকে। এরপর ভ্রুজোড়া সামান্য বাঁকালো। অর্থাৎ, শুরু করো।
অতঃপর খেতে খেতে শুরু হল আলোচনা। শুরু করল করিম তাজওয়ার, 'চিঠি এসেছে। আমাদের ধারণাই ঠিক ছিল। ইন্ডিয়া গিয়ে ইন্ড্রিয়া গ্রুপের সঙ্গে কোন না কোন ডিল করেছে সোলার সিস্টেম। আর গত দুবার আমাদের মাল ডিলিংয়ে যে ব্লান্ডার হয়েছে নো ডাউট, ও ডিলটা পেয়েছে। তারওপর দুবাই গিয়ে ও কী করে এসেছে আমরা কেউ জানিনা। আর "ওও" জানেনা। তাই আমাদেরও জানাতে পারেনি। তবে এইটুকু নিশ্চিত পরের ডিলিংয়েও রুদ্র বড়সর ঝামেলা করবে। ওটাই হবে ওর শেষ চাল। আর কোনভাবে যদি সেটা ও করতে পারে, তাহলে আমাদের পরিণতি কী হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। সোলার সিস্টেম ঘুরে দাঁড়াতে পারছে কারণ ওদের রুদ্র আমের আছে, উচ্ছ্বাস আছে। আমাদের তা নেই।'
উচ্ছ্বাসের নাম শোনামাত্র জ্বলে উঠল সম্রাট। সুস্থ হাতটা দিয়ে টেবিলের ওপর চাপড় মেরে বলল, 'কালকেই টপকে দিতে পারতাম ঐ বাইন** রুদ্রটাকে। আচমকা হামলা করেছিলাম, বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলোনা না ও। এতোসব বা*ছালের দরকারই হতোনা। কিন্তু ঐ বেজ*ন্মার বাচ্চাটা এসেসব ভেস্তে দিলো। ঐটাকে আমি _'
বাক্যটা শেষ না করেই রাগে ফোঁসফোঁস করে উঠল সম্রাট। শান তাচ্ছিল্যের করে বলল, ' ও যে আসবে, তা তুমি জানতে না? ও সেটাই করেছে যেটা ওর করার কথা ছিল। তুমি পরিস্থিতি সামলাতে পারোনি সেটা তোমার ব্যর্থতা। শেষে এতো বেপরোয়া হয়ে উঠতে কে বলেছিল তোমাকে? বারবার বলা হয় কিপ ইও্যর টেম্পার আন্ডার কন্ট্রোল।'
সম্রাট তেঁতে উঠে কিছু বলতে নিয়েও বলল না। পাল্টা তর্ক দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেলোনা তখন। বেশ অনেকক্ষণ কোন কথা বলল না কেউ। প্লেটের সঙ্গে চামচের সংঘর্ষের শব্দ শোনা গেল কেবল।
সেই সময়ে মনে মনে কথাগুলো সাজানো হলে বলতে শুরু করল শওকত, 'প্রথম কথা, নেক্সট ডেলিভারিটা কয় তারিখে হবে সেটা আজকের মধ্যেই জানাতে হবে ওদের। গোল্ডেন কস্ট তাড়া দিচ্ছে। বড় ডিল, আর্মেক্স আর কস্টের মতো বড় বড় দল থেকে আসছে মাল। এই ডিলে সবচেয়ে বেশি কেয়ারফুল থাকতে হবে আমাদের। স্পেশিয়ালি গোল্ডেন কস্টের থেকে ভয়ংকর দল। কলিজা নিয়ে টান দেবে যদি পরবর্তীতে কোনরকম টালবাহানা করি আমরা। সবার আগে ডেইটটা ফিক্সড করে ফেলতে হবে আমাদের।'
করিম এক চামচ পোলাও মুখে নিয়ে বলল, ' দ্রুত করে ফেললেই ভালো হয়। যত সময় লাগবে, রুদ্র ততবেশি সুযোগ পাবে প্রিভেন্ট করার।'
সম্রাট জানাল, ' আমার হাতটা ফিক্সড হতে খানিকটা সময় লাগবে। পরশু হলে ভালো হয়। আজ আট তারিখ। দশ তারিখ ফিক্সড করলেই ভালো হয়।'
হঠাৎই প্রিয়তা বলে উঠল, ' দশতারিখ ভোররাতে মাল রিসিভ হবে। সময় কম হাতে, কাজ অনেকটা। সবদিক দিয়ে বিবেচনা করলে সেটাই সবচেয়ে সেরা সময়। আর এ নিয়ে আর কোন আর্গুমেন্ট করে টাইম ওয়েস্টের প্রয়োজন নেই।'
শান আর পলাশও সম্মতি জানাল সে কথায়। সত্যিই নষ্ট করার মতো সময় এখন নেই। সুতরাং এমাসের, অর্থাৎ জানুয়ারির দশ তারিখেই এই দফার শেষ ডেলিভারির দিন নির্ধারণ করা হল।
কাশেম এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে দেখছিল রাণীকে। ব্যক্তিত্ব, চলন, অঙ্গভঙ্গিতে সুমনার চেয়ে কয়েক কাঠি ওপরে এই মেয়ে। কথা বলার সময় আই মুভমেনটস্, ঠোঁটের গতি, আত্মবিশ্বাসে পূর্ণ অঙ্গভঙ্গি। এখানে বসা প্রত্যেককে যেন একবার করে হাঁটে বেঁচে আবার কিনে নিয়ে আসতে পারবে এই মেয়ে। আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে গেল তার।
সবাই থেমে যেতেই নিজেকে সামলে নিল কাশেম। ধীরে সুস্থে একঢোক কোল-ড্রিংকস গিলে বলল, ' এখানে আমার ভূমিকাটা কী, শওকত ভাই? সবতো তোমাদের দলীয় ব্যপার-স্যপার।'
এবার মূল আলোচনায় এলো শওকত, ' গত দুবারের ডেলিভারিতে রুদ্র আগেভাগেই সব জেনে ফেলেছিল। কোন না কোনভাবে সব গোপন ইফরমেশন হাতিয়ে শেষ মুহূর্তে এসে বিগড়ে দিয়েছে সবটা। অতর্কিতে এসে ইকীভাবে, তা আমরা জানিনা।'
প্রিয়তা আনমনেই আলতো করে হাত রাখল ওর গলায় থাকা লকেটটাতে। যেটাতে এমুহূর্তে কোন মাইক্রোফোন নেই। কিন্তু ওর অজান্তেই ছিল, কয়েকদিন। শওকত বলে চলেছে, 'ধরে নিচ্ছি প্রতিবারের মতো কোন অলৌকিক বলে রুদ্র আমের জেনে গেল সবটা। কোথায়, কোনসময়, কোনদিক দিয়ে মাল আসবে, সব। কিন্তু এবার ওকে সে সুযোগ দেওয়া যাবেনা। উল্টে ওকে এমনভাবে দিশেহারা করে ফেলতে হবে, যাতে কোনভাবে লোকেশনের হদিল পেলেও; মাল নিয়ে ও পালিয়ে যেতে না পারে। তার জন্যে আপনার সাহায্য চাই আমাদের।'
' কী সাহায্য?'
এবার কথা বলল সম্রাট, ' মাল আসবে চট্টগ্রাম পোর্টে। সেখান থেকে চাকা-চট্রগ্রাম হাইওয়ে দিয়ে আসবে ঢাকাতে। হাইওয়ের সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরা, স্ট্রিট লাইট এবং লোকাল হাইওয়ে পুলিশের টহল শিডিউল ম্যানেজ করে করতে হবে আপনাকে। ভোররাত ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে হাইওয়ের একটা বড় অংশকে সম্পূর্ণ ব্লাইন্ড স্পট বানিয়ে ফেলতে হবে আপনার। যাতে আমাদের মালের কনভয় কোনো বাধা ছাড়াই স্মুদলি ঢাকা ঢুকে যেতে পারে। রুদ্র কোনরকম হদিশ পাওয়ার আগেই।'
গাল চুলকে খানিকটা চিন্তা করল কাশেম হক, ' একটু বেশিই ঝামেলার কাজ।'
শওকত ঠান্ডা গলায় বলল, ' আপনার জন্যে অনেকসময় এরচেয়েও বেশি ঝামেলার কাজ করেছি আমি। তাই_'
হাত উঁচিয়ে শওকতকে থামিয়ে দিল কাশেম। শালা কিছু হলেই অতীতের সাহায্যের খোটা দেয়। এটা করতে হবে, সেই করতে হবে। নেহাতই একে প্রয়োজন তাই। নয়তো চাপকে সোজা করে দিত এতোদিনে। কিন্তু কন্ঠে যথাসাধ্য বিনয় নিয়ে বলল, 'পুরশু ভোররাতে, তাইতো? কিন্তু সেটা করতে হলে আজ রাতেই কাজে নামতে হবে আমাকে। কেননা কাল আমি ফ্রি নেই। আজ রাত এগারোটা থেকে দুইটা, এই কয় ঘন্টার মধ্যে যেকোন এক ঘন্টা সময় আমার চাই সব সেটআপ রেডি করার জন্যে।'
শান বলল, 'কিন্তু সমস্যা আছে এখানে। রুটের সিস্টেম সেটআপে কোন চেঞ্জস্ এলে রুদ্রর ফিল্ড ওয়ার্কাররা টের পেয়ে যাবে, আর সঙ্গে সঙ্গে ইনফর্ম করে দেবে ওকে। আর ও একবার টের পেলে এতো সহজে ঘটতে দেবেনা ব্যপারটা।'
কাশেম বলল, 'একবার সেটআপ রেডি হয়ে গেলে বিশেষ কিছু করার থাকবেনা ওর। কিন্তু করার মাঝে টের পেয়ে গেলে সমস্যা। ও তখন ওর নিজস্ব কানেকশন কাজে লাগাবে। সেটা আমার জন্যে ঝামেলা হয়ে যাবে।'
পলাশ হতাশ গলায় বলল, ' কিন্তু রুদ্রর কাছে ইনফরমেশন যাওয়া থেকে আটকানো যাবে বলেতো মনে হয়না।'
পুনরায় থমকে গেল ডাইনিং রুমটা। এবার চামচের টুংটাং শব্দটাও নেই। খানিদ বাদে সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে শওকত বলল, 'যাবে! যদি ঐ একটা ঘন্টা কোনভাবে রুদ্রকে আটকে রাখা যায়। কোনভাবে ওকে আউট অব কনটাক্ট রাখা যায়। তাহলে নিশ্চয়ই যাবে।'
' আর রুদ্রকে কিছুক্ষণের জন্যে আটকে রাখার কাজটা এখানে শুধু একজনই করতে পারবে।' চেয়ারে হেলান দিয়ে রাণীর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল করিম। ঠোঁটে খোঁচা মারা এক হাসি।
সকলের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল রাণীর ওপর। ফোঁস করে উঠল সম্রাট। তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল, 'অসম্ভব! তখন রুদ্রর বউ হিসেবে ছিল ও, কভারে ছিল, তাই ওসব করতে পেরেছে। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন রাণী আটকাতে চাইলেই বা ও আটকে থাকবে কেন? ওকে গাধা ভাব তোমরা? কোনভাবে টের পেয়ে যদি রাণীর ক্ষতি দেয়? গত দু'বার কিছু করেনি এবারও ছেড়ে দেবে তার কোন মানে নেই। ওকে নিয়ে এবার আর কোনরকম রিস্ক আমি নেবনা। তাতে যা লস হওয়ার হোক।'
মনে মনে কষিয়ে ছেলেকে একটা চড় মারল করিম। আবার এই ছেলের সেই লুতুপুতু প্রেম! ওদিকে রাণীর রুদ্রর প্রতি উতলে ওঠা প্রেম, এদিকে তার গুনধর ছেলে এই মেয়ে বলতে অজ্ঞান। জান একেবারে হাতে নিয়ে বসে আছে একে দেওয়ার জন্যে। এদের এই পীরিতই ওদের সাবাইকে নিয়ে ডুবাবে তা বুঝতে বাকি নেই তার।
এ বিষয়ে কেউ কোন মতামত দেওয়ার আগেই রাণী বলে উঠল, ' আজ রাত একটা টু দুইটা। এই এক ঘন্টা রুদ্রকে আটকে রাখব আমি। আমার মতো করে। ঐ এক ঘন্টা ওর সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করতে পারবে না। সেই এক ঘন্টায় যে যা পারো করে নাও।'
বাকিরা প্রসন্ন হলেও শান থমকে তাকাল। সম্রাট প্রতিবাদ করে উঠছিল কিন্তু সে সুযোগ দিলোনা প্রিয়তা। উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল করিমের চেয়ারের দিকে। হাতলে রাখ রেখে মৃদু ঝুঁকল। থতথত খেয়ে খানিকটা গুটিয়ে গেল করিম। মেয়েটা সাংঘাতিক। প্রিয়তা ফিসফিসিয়ে বলল, 'আমাকে নিয়ে আপনার একটু বেশিই ইন্টারেস্ট। সব কাজ ফেলে সারাদিন আমায় নিয়ে গবেষণা করেন নাকি? এজন্যই বুঝি দলের এই হাল? একা হাতে বা*টাও ছিড়তে পারেন না? এর-ওর লেজ ধরে ঝুলতে হয়?'
কান লাল হয়ে উঠল করিমের। অপমানে থমথমে হয়ে গেল মুখটা। কাশেম তখন বিস্ময় আর ঘোর নিয়ে তাকিয়ে আছে রাণীর দিকে। ঠোঁটে সামান্য হাসি। রাণী সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ' আশা করি আমাকে এই আলোচনায় আর কোন প্রয়োজন নেই। আমার ভাগের কাজটা আমি করে রাখব। বিকেলের মধ্যেই রওনা দেব ঢাকা। তোমরা তোমাদের ভাগেরটা করে রেখো, যদি হ্যাডম হয়। দশ তারিখ ভোরে পুরোপুরি সাকসেসফুলভাবে ডিলটা রিসিভ হয়ে ডিসটেনিশেন অবধি যেন পৌঁছোয়। অ্যাট এনি কস্ট। উঠছি আমি, হ্যাভ আ গুড লাঞ্চ।'
বলে যেতে নিলেই ওর হাত চেপে ধরল সম্রাট, 'তুমি যাবেনা আর ওখানে।'
উত্তর দিলোনা প্রিয়তা। কোনরকম তর্কও করল না আজ সম্রাটের সঙ্গে। হাত ছাড়িয়ে সোজা চলে গেল ওয়াশ এরিয়াতে হাত ধুতে। যা স্পষ্ট জানিয়ে দিল, কারো কথা শুনবেনা ও।
রাণী উঠে চলে যেতেই দীর্ঘক্ষণের ধ্যান ভাঙল কাশেমের। এই মেয়েতো পুরো আগুন! ঘোর লেগে যাচ্ছিল তার। সে কোনমতে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'আমারও খাওয়া শেষ শওকত ভাই।'
যদিও পুরোটাই চামচ দিয়ে খাওয়ায় হাতে খাবার লাগনি তার। তাও হাত ধুতে যেতে উদ্ধত হল। পলাশ ব্যস্ত হয়ে বলল, 'আরে আরে, আপনাকে উঠে যেতে হবেনা স্যার। এখানেই হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করছি আমি।'
' না, না। তার প্রয়োজন নেই। আমিই যাচ্ছি, নো ওয়ারিস্।'
বলে কারো কোন প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করেই পা বাড়াল ওয়াশ-এরিয়ার উদ্দেশ্যে।
প্রিয়তা নিজের হাত ধুয়ে আয়নায় তাকাতেই দেখতে পেল কাশেমকে। ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ওর সেকেন্ডের জন্যে হলেও চমকে উঠল ও। পিশাচটার ঠোঁটে সেই নির্লজ্জ হাসিটা এখনো ঝুলে আছে। ভেতরে ভেতরে আবার অস্থির হয়ে উঠল প্রিয়তা। ছোটবেলার সেই ট্রমা, ভয়, অনিরাপত্তা বোধ হৃদপিণ্ডটা যেন চিপে ধরল। কিন্তু নিজের নার্ভকে দৃঢ় রাখল ও। গভীর শ্বাস নিল। কাশেম খানিক এগিয়ে বলে উঠল, 'আমার দ্বিতীয় বউ হওয়ার অফারটা কিন্তু খারাপ না রাণী মির্জা। দেশে সরাষ্ট্র মন্ত্রীর বউ হিসেবে এমন কোন সুবিধা নেই, যা তুমি পাবেনা। যা পরিস্থিতি তাতে আগামী পনেরো বছরেও আমরা ক্ষমতাচ্যুৎ হবনা, তা তুমি ভালোকরেই জানো। রুদ্রতো এমনিও তোমাকে আর কোনদিন মেনে নেবেনা। আর সম্রাট, ওতো একটা গাধা। প্রেমে ছ্যাবলা হয়ে যাওয়া পুরুষদের আমি গাধাই ভাবি। যে হিসেবে আমি কিন্তু সেরা অপশন।' কথার মাঝে আয়নায় একপলক চোখ ফেলে বলল, 'জানি একটু বয়স হয়েছে আমার। তবে দেখে কিন্তু তা বোঝা যায়না। এন্ড ট্রাস্ট মি, বিছানাতেও আমার বয়স টের পাবেনা তুমি।'
নিঃশ্বাস আটকে আশেপাশে চোখ বোলালো রাণী মির্জা। ছু*রিটুরি কিছু আছে কিনা খোঁজার জন্যে। পেলের এখানেই এই জন্তুটার পালা সাঙ্গ করে দিতো ও। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নেই কিছু। দাঁতে দাঁত পিষল রাণী। এই পিষাচটাকে মারার সময় এলেই হাতের কাছে কিছু খুঁজে পায়না ও। কখনও ম্যাগাজিন খালি থাকে, কখনও ঘর। রাণী ঠোঁটে কৃত্রিম এক হাসি ঝুলিয়ে আয়নার প্রতিবিম্ব দিয়েই কাশেমের চোখ চোখ রাখল। শান্ত, স্থির গলায় বলল, ' দেশের আইন অনুযায়ীতো এক বউ থাকাকালীন দ্বিতীয় বিয়ে করা যায়না। সরকারের লোক হয়ে আইনভঙ্গ করলে জনগণ ছাড়বে?'
উৎসাহে জ্বলজ্বল করে উঠল কাশেমের চোখজোড়া। আরও খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বলল, ' সে নিয়ে চিন্তা করোনা। তালাক বলেওতো শব্দ আছে।'
' আর ছেলেমেয়ে?'
' থাকবে ওরা ওদের মতো। যথেষ্ট বড়। একজন দেশের বাইরে, আরেকজনও চলে যাবে শীঘ্রই। বেবী সিটিংয়ের চিন্তাতো নেই তোমার। ইনফ্যাক্ট কোন ঝামেলাই নেই। শুধু তুমি আর আ_'
কথাটা বলেই প্রিয়তার ঘাড়ের ওপর থেকে চুলগুলো সরানোর উদ্দেশ্যে হাত বাড়াচ্ছিল কাশেম। সঙ্গেসঙ্গে চোখের দৃষ্টি বদলে গেল প্রিয়তার। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ঐ চোখজোড়ায় যেন লাভা জ্বলে উঠল। হাত থেমে গেল কাশেমের। কায়াসহ কেঁপে উঠল। ভেতর থেকে কেউ যেন চিৎকার করে বলে উঠল, এই মেয়েটাকে ছুঁতে গেলে ছাই হয়ে যাবে সে।
রাণী ঘাড় কাত করে এবারও প্রতিবিম্ব দিয়েই তাকাল কাশেমের ঘাড়ের সেই দাগটার দিকে। ঠান্ডা হেসে বলল, ' কিছু দাগ চরিত্রের মতোই হয় তাইনা? দাগ যেমন বছরের পর বছর চলে গেলেও ওঠেনা। কিছু কিছু মা*গিবাজ বুড়ো বয়সেও মা*গিবাজী ছাড়েনা। আর রইল বাকি ক্ষমতা। সেতো সময়ের খেলা। পনেরো বছর কখন দু'বছরে এসে ঠ্যাকে, তা কে বলতে পারে?'
ঠোঁটে সেই নির্লজ্জ হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল কাশেমের। দাঁতে দাঁত পিষে বলল, ' মেয়েমানুষের এতো চোপা কিন্তু আমি পছন্দ করিনা।'
' আর আপনার পছন্দকে আমি_'
নিজের মধ্যমা আঙুলটা সোজা কর দেখালো রাণী। কাশেম স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ওর দেখা জীবনের অন্যতম বোল্ড মহিলা ছিল সুমনা। কিন্তু এতো আলাদাই জিনিস। সংকোচ কিংবা ভীতির নামগন্ধ নেই এর মধ্যে। কাশেমকে আগের ডোজটা হজম করার সময় না দিয়েই প্রিয়তা বলল, 'হায়াত আছে আপনার। এ নিয়ে দুবার আমার হাতে মরা থেকে বেঁচে গেলেন।'
খানিকটা অবাক হলেও হেসে ফেলল কাশেম, ' আমাকে মারবে? তোমার কী মনে হয় রাণী? আমায় খু*ন করলে তুমি বেঁচে যেতে?'
শরীরটা হালকা দুলিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিল রাণী মির্জা। উল্টো ঘুরে বলল, 'মরার আবার মরার কীসের ভয়? প্রশ্নটা এখন আর আমার বাঁচার না, আপনার মরার। আপনার আয়ু্ও ফুরিয়ে এসেছে কাশেম হক। পৃথিবীতে নিজের শেষমুহূর্তগুলো মনভরে উপভোগ করুন। কজ ট্রাস্ট মি, মৃত্যু দিনটা আপনার ভীষণ যন্ত্রণার হবে।'
' হুমকি দিচ্ছো?'
' ভবিষ্যৎ বলছি।'
কাশেমের চোখে চোখ রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথাটা বলল রাণী। যেন স্পষ্ট ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে সে। মেয়েটার চোখের সেই আগুন দেখে খানিকটা হলেও বিভ্রান্ত হল কাশেম। সেই বিভ্রান্তি দেখে আরও একবার গা দুলিয়ে হাসল রাণী মির্জা। পাশ কাটিয়ে হেলতে-দুলতে চলে গেল সেখান থেকে।
—————
উগ্রভাবে গাড়ি চালাচ্ছে সম্রাট তাজওয়ার। দিনের বেলায় ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে এমনভাবে গাড়ি চালানোটা রীতিমতো প্রাণঘাতি। সিট আকড়ে ওরে নিঃশ্বাস আটকে বসে আছে করিম। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছেনা এই বেয়ারা ছেলেকে। না জানি উল্টে বিশ্রী কোন কথা শুনিয়ে দেয়। কিন্তু হঠাৎ ভীষণ বিপদজ্জনকভাবে একটা বাস ওভারটেক করল সম্রাট। এবার আর ধৈর্য্য ধরতে পারল না করিম। ধমকে উঠে বলল, 'কী সমস্যা কী তোমার? মারবে নাকি?'
জবাব দিলোনা সম্রাট, আর না গতি কমালো। করিম রোষ নিয়ে বলল, 'বাড়াবাড়ি কমাও। রাণীর কোন ক্ষতি করার হলে এতক্ষণে তা করে ফেলতো রুদ্র। এখনো করেনি তারমানে তোমার মতোই প্রেমে মজে আছে ঐ ব্যাটা। চ্যা*টাও করবেনা।'
সম্রাট পাল্টা ধমকে স্টিয়ারিংয়ে বাড়ি দিয়ে বলল, ' আমি ভালোভাবে চিনি ঐ বা*স্টা*র্ডটাকে। ও কোন পিরীতের টানে রাণীকে এখনো বাঁচিয়ে রাখেনি। নিজের কোন স্বার্থের জন্যেই রেখেছে। আমি আমার রাণীকে নিয়ে আর কোনরকম রিস্ক নিতে পারব না।'
করিম তাচ্ছিল্য করে বলল, ' আর সেই স্বার্থে তোমার রাণীই মদদ দিচ্ছে। মা*গীবাজি ছেড়ে বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তা করলে বুঝতে পারতে বিষয়টা।'
সম্রাট এবার হুট করেত তেঁতে উঠল না। ধীরে ধীরে গাড়ির স্পিড কমালো। থমথমে গলায় বলল, ' নিজের বউকে জোর করে ভাইয়ের বিছানায় পাঠানোর চেয়ে মা*গীবাজি করাটা বেশি ভালো নয় কী?'
করিম তাজওয়ারের ওপর যেন বোমা ফেলল সম্রাট। শক্ত-স্থির হয়ে বসে রইল সে। সারা শরীর যেন ঝিম ধরে রইল। শরীর উষ্ণ হয়ে উঠেছে তার। সম্রাটতো এসব কথা সাধারণত তোলেনা। যদিনা মনে খুব বেশি উথালপাতাল চলে। আজ চলছে কী?
এদিকে সম্রাটও আর পাল্টা কিছু বলল না। ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিল কেবল। তবে চোখজোড়াতে চলছে ভয়ংকর এক বিষাদ আর শূণ্যতার খেলা।
বেশ দীর্ঘ এক সময়ের অস্বস্তিকর নীরবতার পর নিজেকে ধাতস্থ করল করিম। লম্বা শ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল, 'আচ্ছা, মাথা ঠান্ডা করো। ওর সঙ্গে একটু যোগাযোগ করে দেখো কিছু তথ্য পাওয়া যায় কিনা। রুদ্র কী করতে চলেছে, কীভাবে করছে কিছু জানতে পারছে কি-না।'
সম্রাট শান্ত হয়ে ওঠা চোখজোড়া জ্বলে উঠল আবার। রাগে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ' তোমার কী মনে হয় এরপরও ঐ আবালটার সঙ্গে আমি যোগাযোগ করব? আমি? বরং এবার সামনে পেলে ওটাকে আমি _'
' আহ্। সব কিছুতে এতো ক্ষেপলে হয়না। ওর আর কিছু করার ছিলোওনা সেসময়। তাছাড়াও ওকে এখন আমাদের দরকার। অন্তত এই লাস্ট ডেলিভারীটার আগে ওকে হাতে রাখতেই হবে। এরপর যা খুশি করো ওকে। কিছু বলতে আসবনা আমি। যাই হোক, তোমাকে যোগাযোগ করতে হবেনা, আমিই করছি।'
নিজের ফোনটা বের করে পটাপট একটা নাম্বারে মেসেজ করলেন করিম তাজওয়ার। আলাদা এক সিম থেকে। লিখলেনও কোড ল্যাঙ্গুয়েজে, বরাবরের মতো। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবার আর মেসেজ দেখতে কয়েক ঘন্টা বা এক-দুদিন লাগল না। অপারের ব্যক্তি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দেখল মেসেজটা। কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেলোনা। কারণ রুদ্র ইদানিং অনেক কিছুই শেয়ার করছে না ওদের সঙ্গে। সারাক্ষণ এতো কাছাকাছি ঘেষে থেকে, খুটিয়ে খাটিয়ে জিজ্ঞেস করেও লাভ হচ্ছেনা বিশেষ। বলছেনা কিছু।
নিজের কাছের লোকদের সঙ্গে এই বিশ্বাসঘাতকতা করেও বিন্দুমাত্র আফসোস নেই তার। বিশ্বস্ত হয়েই বা কী লাভ হয়েছে? একসময় নিজের ভালোবাসাকেও ত্যাগ করেছিল এই মানুষগুলোর কথা ভেবে। তার বিনিময়ে পেয়েছে কী সে? সারাজীবন কেবলই দাবার একটা গুটির মতো ব্যবহার করেছে এই পরিবার ওকে। ওর জীবন, ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ কখনও চিন্তা করেনি। সবাই নিজেরটাই গুছিয়েছে কেবল। কেউ যখন ওর কথা কেউ চিন্তা করেনি। তাহলে ও কেন কারো কথা চিন্তা করবে কারো কথা।
—————
সম্পূর্ণ কালো আউটফিটে নিজে তৈরী করে নিয়েছে রাণী মির্জা। কালো গেঞ্জি, কালো, জিন্স আর কালো জ্যাকেট সঙ্গে কালো স্নিকার্স। চুলগুলোতে চিরুনী চালানোর সময়টাতে দরজায় এসে নক করল শান। প্রিয়তা হাত থামিয়ে একপলক তাকাল সেদিকে। অতঃপর আবার কাজে মনোযোগ দিল। শান খানিক ইতস্তত করে বলল, 'ওর ফ্লাটে যাবি?'
' হু।'
' আমিও যাব সঙ্গে।'
' কেন?'
' মেয়েটাকে দেখিনা অনেকদিন। কিছু জিনিস কিনেছি ওর জন্যে। আর_ ওকেও দেখা হয়না।'
' কোন অধিকারে দেখবে?'
' বউ-বাচ্চা আমার।'
' লজ্জা করেনা বলতে?'
' নিরূপায় ছিলাম তখন আমি। কোন পথ খোলা রেখেছিল আমার জন্যে ওরা?'
' ছেড়ে দিতে পারতে। বাঁচতে দিতে পারতে ওকে নিজের মতো। জোর করে আটকে রেখে অন্যায় করেছো তুমি ওর সাথে।'
' ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে রাখার জন্যে আমরা এমন বহু অন্যায় করি। সেটা তোর চেয়ে ভালো কে জানে?'
হাত থেমে গেল প্রিয়তার। আয়না দিয়েই স্থির চোখে তাকাল শানের দিকে।
—————
বাবা আর ফুপিকে একসঙ্গে দেখে যারপরনাই খুশি হল শায়না। দৌড়ে গিয়ে লাফিয়ে উঠল শানের কোলে। শানও ভীষণ আবেগী হয়ে উঠল বহুদিন পর মেয়েকে কাছে পেয়ে। মেয়ের জন্যে কেনা খেলানা, পোশাক, বই সব একে একে শায়নাকে দেখাল শান। শায়না আনন্দে আত্মহারা হয়ে দেখল সেসব দেখে। দৌড়ে গিয়ে তনুজার হাত ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলল, ' দেখো মা, বাবা কতকিছু এনেছে। বাবা ইজ দ্য বেস্ট।'
তনুজা একপলক তাকাল শানের দিকে। চোখে চোখ পড়তেই চোখ সরিয়ে ফেলল অস্বস্তি আর সংকোচে। অস্বস্তিকর সেই নীরবতা কাটিয়ে প্রিয়তা বলল, ' আমি কাকার সঙ্গে কথা বলে আসছি। বেশিক্ষণ থেকে থাকব না আমি। যেতে হবে।
বশিরের কক্ষে যেয়ে প্রিয়তা দেখল ঘুমোচ্ছে সে। প্রিয়তা ধীরেসুস্থে বসল বশিরের পাশে। আলতো করে হাত বোলাতে শুরু করল বশিরের মাথায়। যেন পরম মমতায় নিজের সন্তানের সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতেই প্রিয়তার মনে পড়ল সেই সময়কার কথা, যখন নতুন নতুন জেল থেকে বের করে নিয়ে এসেছিল বশিরকে। এমনি ঘুমন্ত অবস্থায় বশিরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় বশিরের। ঘুম ভেঙে প্রিয়তাকে দেখামাত্র পানির বোতলটা দিয়ে সজোরে ওর মাথায় আঘাত করেছিল সে। চিৎকার করে বলেছিল, 'কেন এসেছিস। অভিশাপ একটা! বিষ কোথাকার। এই বিষাক্ত মুখ নিয়ে আসিস কেন আমার সামনে? মরে যেতে পারিস না? তোর মরা মুখ কেন দেখিনা আমি?'
সেদিনের কথা মনে করে আলতো হাসল প্রিয়তা। বশিরের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও কাকা। নয়তো গিয়ে শান্তি পাব না আমি। কার কাছে রেখে যাব তোমাকে?'
—————
অল্প খানিকক্ষণ থেকেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল প্রিয়তা। বের হওয়ার আগে তনুজাকে বলল, 'ঢাকা যাচ্ছি আমি। কাকার ঠিকঠাক খেয়াল রাখবে।'
' আমার যেতে হবেনা ম্যাম?'
' নাহ। এবার প্রয়োজন নেই। এখানে থেকে কাকার খেয়াল রাখো।'
তনুজা মাথা। শানের মুখটা থমথমে হয়ে আছে। ও খানিকটা সংশয় নিয়ে বলল, 'তুই আসলেই কাজটা করতে চাইছিস?'
' নকলে করার কোন অপশন আছে?'
এমন অদ্ভুত রসিকতায় জবাব দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেলোনা শান। গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল।
প্রিয়তা যাওয়ার সময় আজ কেঁদে ভাসালো শায়না। প্রিয়তা এবারও তেমন পাত্তা দিলোনা। কেবল বলে গেল, 'অভ্যেস করে রাখ। এই পৃথিবীতে সবাই আসেই ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যে।'
শায়না সে কঠিন কথা বুঝল না। কান্নার আওয়াজ বাড়ল তার। শান মেয়েকে কাঁধে নিয়ে হেঁটে হেঁটে শান্ত করল। কাঁদতে কাঁদতে বাবার কাঁধেই ঘুমিয়ে পড়ল সে। শায়নাকে শুইয়ে দিয়ে তনুজার দিকে তাকাল শান। তনুজা নড়েচড়ে উঠে বলল, ' কিছু খাবেন?'
মাথা নাড়ল শান। কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। তনুজা বুক ধুকপুক করছে। ব্যপারটা স্বাভাবিক করতে ও বলল, 'আ-আমি কফি করে নিয়ে আসছি।'
কথাটা বলে প্রায় পালাতে নিচ্ছিল তনুজা। কিন্তু দ্রুত হাত ধরে ফেলল শান। নরম গলায় বলল, 'এখনো কী আমায় ক্ষমা করা যায়না, তনু?
তনুজা হাত ছাড়াতে চাইল। কিন্তু সবলে নিজের দিকে টেনে দিল ওকে শান। কোমর জড়িয়ে মিশিয়ে ধরল নিজের সঙ্গে। ফিসফিসিয়ে বলল, 'আর কত শাস্তি দেবে? মানুষের জীবন অনেক ছোট তনু। ভুলে যাওনা সব।'
তনুজার শরীর ছটফট করে উঠল শানের বাহুবন্ধনে, 'কী ভুলে যাব? সারাজীবন একসঙ্গে থাকার ওয়াদা করে কীভাবে মাঝপথে হাত ছেড়ে দিয়েছিলেন সেটা? কীভাবে আমি থাকতেও অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছেন সেটা? নাকি আমাকে প্রেগনেন্ট অবস্থায় এই নরকে রেখে, কীকরে বিদেশে বউ নিয়ে ফুর্তি করেছেন সেটা? কোনটা ভুলব?'
'কোন ফুর্তি করিনি আমি ওকে নিয়ে।'
ফ্যাসফ্যাসে গলায় ধমকে উঠল শান। ঝুঁকে তনুজাকে চুমু খেতে গেলে নড়েচড়ে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করল তনুজা, 'শান ছাড়ো!'
তনুজাকে শক্ত করে ধরে সেই একই গলায় শান বলল, 'সবসময় জোর করতে ভালো লাগেনা আমার তনু। আ'ম ইও্যর হাজবেন্ড। এন্ড ইউ্য নো আই কান্ট স্টে এওয়ে ফ্রম ইউ।'
বাক্যটা শেষ করতে করতেই তনুজার ঠোঁটে আগ্রাসীভাবে চুম্বন করল শান। তনুজা আরও বেশি ছটফটিয়ে উঠল। শানের বাহুবন্ধনে মুচড়ে উঠল শরীরটা। কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে নামল একফোঁটা জল।
—————
বিকেল পাঁচটা বাজতে চলেছে। চারপাশে হালকা কুয়াশার আবরণ পড়েছে পুনরায়। দুপুরের স্বস্তির উষ্ণতা কাটিয়ে পুনরায় শহরের বুকে নামছে কনকনে শীত।
রুদ্রর রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল জ্যোতি। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। রুদ্র তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বসে কোলের ওপর ল্যাপটপটা রেখে কাজ করছে। জ্যোতি এগিয়ে কফিটা নিয়ে টি-টেবিলের ওপর রাখল, ' তোমার কফি।'
' হুম।' ছোট্ট করে নিয়ে জবাব দিল রুদ্র। চোখ তখনও ল্যাপটপে।
' প্রিয়তাকে কবে আনছো? কুহু ভীষণ জেদ করছে। প্রিয়তা কথা বলায় একটু শান্ত হয়েছে, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকবেনা। শুধু ও কেন, আমরা কেউই বিষয়টা মেনে নিতে পারছিনা। আর না তোমার কাজের কোন মানে পাচ্ছি।'
বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে তাকাল রুদ্র, ' একবারতো বলেছি সময় হলে নিয়ে আসব। ওকে দিয়ে কী কাজ তোদের?'
এবার বিরক্ত হল জ্যোতিও, 'এসব কোন কথা নয় রুদ্র। মেয়েটাকে একা ফেলে রেখেছো এখানে। কোনভাবে পানিশ করছোনাতো? না বলে চট্টগ্রাম গিয়েছিল বলে? তুমি কী পাগল? দেখো, কাল সকালের মধ্যে ওকে নিয়ে আসবে তুমি। নয়তো আমি যাব আনতে।'
উত্তরে কিছু বলল না রুদ্র। ভ্রুজোড়া কুঁচকে রেখেই নিজের কাজে মনোযোগ দিল। জ্যোতি হতাশ এক নিঃশ্বাস ফেলল। ফিরে যাওয়ার জন্যে পেছন ঘুরতে থেমে গেল খানিকটা। দরজায় হেলান দিয়ে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে উচ্ছ্বাস। কেমন স্থির চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দুজনের দিকে। জ্যোতি কিছু না বলে চলে গেল। খানিকক্ষণ নীরবতা চলল। উচ্ছ্বাস দাঁড়িয়ে রইল ঠিক সেভাবেই। রুদ্র ল্যাপটপে চোখ রেখে বলে উঠল, 'কী ব্যপার?কিছু বলবি?'
উচ্ছ্বাস নড়ে উঠল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, 'রাতে কোথাও যাবি তুই। কোন কাজে?'
'জানি এখনো। কেন?'
' নাহ্। আসলে নাজিফার ডেলিভারির ডেইটতো আজ ছিল। কিন্তু তেমন কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। কোথাও যেতে হলে জ্যোতি আর নীরবে বলে রাখতাম_'
উচ্ছ্বাসের বাক্য শেষ হওয়ার আগেই রুদ্র বলল, ' আমি বের হলেও আজ একাই বের হব। তোর যাওয়ার প্রয়োজন নেই।'
' কোথায় যেতে হতে পারে?' কিছুটা আগ্রহ উচ্ছ্বাসের কন্ঠে।
' পরে বলব। যদি যাওয়া হয়।'
উচ্ছ্বাস সঙ্গেসঙ্গে চুপ হয়ে গেল। রুদ্র বলল, ' আর হ্যাঁ, নাজিফাকে কালই হসপিটালে এডমিট করে ফেল। পেইনের জন্যে অপেক্ষা করার দরকার নেই। এই মুহূর্তে কোনরকম রিস্ক নেওয়া ঠিক হবেনা।'
' আমিও সেটাই ভাবছিলাম।' ছোট্ট করে মাথা নাড়ল উচ্ছ্বাস। অতঃপর সেকেন্ড দুই উশখুশ করে বলল, 'কাকা ডাকছিল একটু বৈঠকঘরে।'
কাজ থামিয়ে চোখ তুলে তাকাল রুদ্র। 'কেন?'
' আমিই বললাম, মোট হিসেবটা আরেকবার একটু দেখা দরকার। কাকাও সম্মত হল, সাথে আরও কিছু আলাপ আলোচনা আছে বলল।'
লম্বা একটা শ্বাস ফেলল রুদ্র। পুনরায় কাছে মন দিয়ে বলল, 'রঞ্জুর কী খবর?'
' স্টেবল।'
' জয় কোথায়?'
' আছে, বললেই আসবে।'
' তোরা গিয়ে বস বৈঠক ঘরে। আসছি আমি।'
' হুম, আয়।'
কথাটা বলেই চলে গেল উচ্ছ্বাস। উচ্ছ্বাস যেতেই চোখ তুলে তাকাল রুদ্র। বেশ অনেকটা সময় অজান্তেই তাকিয়ে রইল উচ্ছ্বাসের যাওয়ার দিকে। ফোঁস করে একটা শ্বাস নিয়ে পুনরায় কাজে মনোযোগ দিল ও।
—————
কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে নেমে ৩০০ ফিটের শুরুর রাস্তা। রাত বারোটা বাজতে চলেছে। হাইওয়ের চারপাশটা ঢেকে আছে নিয়ন আলো আর হালকা কুয়াশায়। সামনের মূল রাস্তা দিয়ে দূরপাল্লার বড় বড় ট্রাক আর বাসগুলো সশব্দে ছুটে যাচ্ছে তীব্র বেগে।
রাস্তার পাশে নিজের কালো ইয়ামাহা MT-9 বাইকটার ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাণী মির্জা। ভীষণ শান্ত, স্থির। হাতে একটা ওয়ান টাইম কফির কাপ, যেখান থেকে ওঠা সাদা ধোয়া একটু ওপরে উঠেই মিলিয়ে যাচ্ছে কুয়াশার সঙ্গে। গরম কফিতে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে ও। চুপচাপ, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফ্লাইওভারের ওপর থেকে নেমে আসা ঢালু রাস্তাটার দিকে। স্থির চোখভর্তি আত্মবিশ্বাস। এই রাস্তা দিয়েই আসবে রুদ্র। নটার দিকে রুদ্রকে মেসেজ করেছিল ও। বলেছিল, ঠিক পৌনে বারোটায় এখানে আসার কথা। জরুরি আলাপ আছে। ব্যস এটুকুই। আলাদা কোন স্ট্রাজেজি ব্যবহার করেনি ও রুদ্রকে নিয়ে আসতে। কিন্তু ও জানে, রুদ্র তাও আসবে। কোন প্রেম বা মায়ার টানে না। চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসে রুদ্র। আসল ঘটনা বোঝার জন্যে হলেও সে আসবে।
প্রিয়তার বিশ্বাসকে সত্য প্রমাণ করে খানিক বাদেই ঢালু সেই রাস্তা দিয়েই নেমে এলো রুদ্রর র্যাংলার। ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল প্রিয়তার। সন্তুষ্ট চিত্তে কফিতে চুমুক দিল। জীপটা পার্ক করে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রিয়তার দিকে তাকাল রুদ্র আমের। প্রিয়তা চোখে হাসল।
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড অপলকে চেয়ে রইল মেয়েটার দিকে। নড়ল না। অতঃপর নির্বিকারভাবেই নেমে এলো জীপ থেকে। ওও আজ সম্পূর্ণ কালো পোষাকে আছে। কালো জিন্স, কালো টিশার্ট, কালো লেদার জ্যাকেট, হাতের ভারী গ্লাভটাও কালো। ও সশব্দে গাড়ির দরজাটা লাগিয়ে এসে দাঁড়াল প্রিয়তার সামনে। কোন প্রশ্ন করল না রুদ্র। কেবল তাকিয়ে রইল শীতল, শান্ত দৃষ্টিতে।
প্রিয়তা ঘাড় ঘুরিয়ে স্টলম্যানের দিকে তাকিয়ে গলা উঁচিয়ে বলল, 'আরেক কাপ কফি।'
রুদ্র ধীরেসুস্থে মুখোমুখি একটা বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। একটা সিগারেট বের করে মুখে পুড়ে জিজ্ঞেস করল, 'কেন ডেকেছো?'
প্রিয়তা অপলকে তাকিয়ে রইল রুদ্রর দিকে। দীঘল চোখজোড়া যেন আঠার মতো আটকে গেল তার স্বামীর দিকে। অনেকটা আনমনে, কাব্যিক স্বরে বলল,
'কতকাল হল দেখিনা তোমায় প্রিয়তম,
দর্শনের তরে হৃদয় পুড়িয়া যায়।
অঙ্গারেও ওঠে তোমারই স্মৃতির ধোয়া,
দর্শন বিনা বাঁচার কী উপায়?'
চোখের পাতা সামান্য কেঁপে উঠল রুদ্রর। গলা শুকিয়ে এলো হৃদপিন্ঠে পেরেক ঠুকলো যেন কেউ। অথচ ঠোঁট বাঁকিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল রুদ্র। সিগারেটটা জ্বালিয়ে বলল, 'কবি নাকি?'
রুদ্রর তাচ্ছিল্যকে গায়ে মাখল না প্রিয়তা। কাঁধ ঝাকিয়ে বলল, ' লিখতাম কখনও অল্পসল্প।'
' প্রেম আর যুদ্ধ একই অঙ্গে! এরা একসঙ্গে থাকতে পারে নাকি?'
' তা পারেনা। তবে ইতিহাস বলে, বহু যুদ্ধ প্রেমের জন্যেই হয়েছে।'
এরমধ্যেই স্টলম্যান কফি দিতে এলো। প্রিয়তা চোখের ইশারায় বলল রুদ্রকে দিতে। রুদ্র কাপটা হাতে নিল, মুখভর্তি ধোঁয়া ছেড়ে কুয়াশায় মিলিয়ে দিয়ে বলল, ' উদ্দেশ্য কী?'
' উদ্দেশ্য?' ভ্রু তুলল প্রিয়তা।
রুদ্র সিগারেটের ছাই ঝেরে বলল, ' রাণী মির্জা উদ্দেশ্য আর স্বার্থ ছাড়া এক চুলও নড়েনা। এইটুকু রিসার্চতো আমিও করেছি তোমাকে নিয়ে।'
প্রশংসায় ঠোঁট বাঁকাল প্রিয়তা, ' ইম্প্রেসিভ।'
রুদ্র হেসে ফেলল, 'সেতো তুমি। নয়তো দুই বছর প্রেমের ভং ধরে রুদ্র আমেরের চোখে পট্টি পরানোটা মোটেও সহজ কিছু না।'
ঠোঁটের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল প্রিয়তার। কিন্তু রুদ্র থামল না। বলে চলল, ' নিজের স্বার্থ আর উদ্দেশ্য পূরনে নিজের সবচেয়ে বড় শত্রুর সঙ্গে বিয়ে-বিয়ে খেলা খেলে, তার বিছানা অবধি যে চলে যেতে পারে। তার জন্যে অসম্ভব কিছু আছে বলে আমি বিশ্বাস করিনা।'
রাণী দাঁতে দাঁত পিষল। কিন্তু কিছু বলল না। রুদ্রও চুপ থাকল। খানিকক্ষণ চুপ থেকে কুয়াশাঘেরা রাতের স্তব্ধতা আর বাস-ট্রাকের কর্কশ আওয়াজ শুনল দুজন। দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল অদূরে কোথাও। কিছুটা সময় পর রুদ্র সিগারেটটা ফেলে পায়ে পিষে বলল, 'বললে না কেন ডেকেছো?'
নিজের কাপটা ডাস্টবিনে ফেলল প্রিয়তা। হাত ঝেড়ে বলল, 'চলুন একটা রেস হয়ে যাক, বাইক রেস।'
রুদ্র অবাক হল খানিক। এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল, 'বাইক রেস?'
' হু, বাইক রেইস। তবে এমনি এমনি না। ডিল হবে একটা। ইফ আই উইন, আমি যা চাইব তা দিতে হবে আপনাকে। আপনার দলের গোপন তথ্য থেকে শুরু করে গোটা সোলার সিস্টেম। যা আমি চাইব, তাই। আর যদি আপনি জেতেন, আপনিও সেটাই পাবেন যা আপনি চাইবেন। ডিল?'
' হঠাৎ এই সেটআপ? প্লান কী বলোতো?'
মৃদু হেসে উঠল প্রিয়তা, ' কিছু একটা করেতো জানতে হবে আপনার পেটে কী আছে। কীভাবে কী করছেন। এখনতো আমার গলায় মাইক্রোফোনও নেই, তাও এতো আত্মবিশ্বাসের কারণ কী? দুবাই আর ইন্ডিয়া গিয়ে আসলে কী করে এসেছেন আপনি? আপনার ইনফরমেশ সোর্সটা কী? এইযে এতো এতো প্রশ্ন, এর জবাবতো পাওয়া লাগবে কোন উপায়ে?'
' আর তারজন্যে তুমি এই উপায় বেছে নিয়েছো?'
' এরচেয়ে ভালো উপায় জানা থাকলে বলুন। সেটাও চেষ্টা করব।'
প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে থেকেই কফিতে চুমুক দিল রুদ্র, 'বাচ্চা বাচ্চা শোনাচ্ছেনা? তুমি জিতে গেলেযে আমি কথা রাখব তার গ্যারান্টি কী? কথার খেলাপও করতে পারি। আর যদি হেরে যাও? এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছো। এতবড় লস এফর্ড করতে পারবে?'
প্রিয়তা আবার হেসে ফেলল। নিজের শখের ইয়ামাহা বাইকের ওপর হাত বুলিয়ে বলল, 'মানুষ হিসেবে আমরা দুজন যেমনই হই। কথার খেলাপ কখনও করিনা। তারজন্যে যতবড় ত্যাগই স্বীকার করতে হোক। রইল হারার কথা, বাইক চালাতে জানলেও নিয়মিত বাইক রাইডিংয়ের এক্সপেরিয়েন্স নেই আপনার। অন্যদিকে নিয়মিত বাইক চালাই আমি। ব্রিটেনে বহু রেস করেছি। অনেক তাগড়া তাগড়া পুরুষদের পলকে হারিয়ে দিয়েছি। হারার কোন রেকর্ড নেই আমার।'
' কোনকিছুতে হারার রেকর্ডতো আজ অবধি আমারও নেই।'
' কারণ প্রতিদ্বন্দ্বি রাণী মির্জা ছিলোনা। প্রতিদ্বন্দ্বি রাণী মির্জা হলে অপরপক্ষকে যেকোনমূল্যে হারতে হয়।'
সোজা হয়ে দাঁড়াল রুদ্র। ধীরপায়ে এগিয়ে দাঁড়ার প্রিয়তার ঠিক সামনে। ওর দুপাশ দিয়ে বাইকের ওপর দুহাত রেখে ঝুঁকলো ওর দিকে। প্রিয়তা খানিক হকচকিয়ে গিয়ে চোখ রাখল রুদ্রর চোখে। রুদ্র শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার স্ত্রীর বিভ্রান্ত চোখদুটোয়। সেই চোখ, যার দিকে তাকালে রুদ্রর সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যায়। যুক্ত, তর্ক, বুদ্ধি, সংযম সব হারিয়ে ফেলে ও। তবে আজ নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখল ও। ফিসফিসিয়ে বলল, 'আর প্রতিদ্বন্দ্বি যখন রুদ্র আমের হয়, তখন অপরপক্ষকে ধ্বংস হয়ে যেতে হয়। শ্রেফ ধ্বংস। এর অন্যথা হওয়ার উপায় নেই।'
ছোট্ট একটা ঢোক গিলে নিজেকে সামলালো প্রিয়তা। রুদ্র এতো নিকটে আসার সেই উথালপাতাল অনুভূতিতে ঠেসে চেপে রাখল। রুদ্রর চোখে নিজের এলোমেলো দৃষ্টি রেখেই পকেট থেকে একটা চাবি বের করল ও। এগিয়ে দিল রুদ্রর দিকে, 'দেন এক্সেপ্ট দ্য চ্যালেঞ্জ। দেখা যাক, কে হারে আর কে ধ্বংস হয়?'
প্রিয়তার চোখের দিকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রুদ্র। হঠাৎ ঠোঁটে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি। অদ্ভুত সেই হাসি ধরে রেখেই চাবিটা নিল রুদ্র। উত্তরে প্রিয়তাও হেসে বলল, 'এতক্ষণ যে বাইকটা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওটাই। হেলমেট রাখা আছে।'
ঘাড় ঘুরিয়ে বাইকটা পরখ করল রুদ্র। খানিক আনমনে বলল, '৩৫০ সিসির কাওয়াসাকি নিনজা।'
খানিক চমকে উঠল প্রিয়তা। রুদ্র তা খেয়াল করে বলল, 'কলেজ লাইফে খানিক রাইডিং এর সখ আমারও ছিল।'
আর কোন কথা না বাড়িয়ে সোজা বাইকে গিয়ে বসল রুদ্র। প্রিয়তাও বসল নিজের বাইকে। নিজের ফোনটা বের করে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, 'রেসের গোটা সময়টা ফোন বন্ধ থাকাই উচিত। ডিস্ট্রাকশন এলে শুধু রেস রিস্ক না, লাইফ রিস্কও হয়ে যাবে। রাত হয়েছে অনেক, রাস্তা ফাঁক হলেও বেশ ভারী ভারী ট্রাক যাচ্ছে কিন্তু।'
বলতে বলতে নফোনটা সুইচড অফ করে ফেলল রাণী। রুদ্রর উদ্দেশ্যে চোখ টিপ মেরে ফোনটা পুনরায় রেখে দিল পকেটে। আরও একবার অদ্ভুত বাঁকা হাসি খেলে গেল রুদ্রর ঠোঁটে। চুপচাপ নিজের ফোনটা বের করে সুইচড অফ করে ফেলল ও নিজেও। প্রিয়তা লম্বা শ্বাস ফেলল, এইমুহূর্তে কল করে ওকে আর পাবেনা কেউ। কিন্তু গুরুত্ব দিয়ে ভাবলা না, ওর নিজের ফোনটাও বন্ধ আছে এখন!
—————
কুড়িল ফ্লাইওভার পার হয়ে ৩০০ ফিটের মূল রাস্তায় যখন বাইক দুটো এসে দাঁড়াল, রাত তখন ঠিক বারোটা। কাঞ্চন ব্রিজের দিকে চলে যাওয়া চওড়া রাস্তাটা নিয়ন আলো আর হালকা কুয়াশায় ঢাকা। রাস্তাটা মোটামুটি ফাঁকা। তবে দূরপাল্লার বড় বড় মালবাহী ট্রাক, আন্তঃজেলা বাস আর সাধারণ কিছু গাড়ি তখনো আপন গতিতে হাইওয়ে দিয়ে ছুটছে।
ঠিক পাশাপাপাশি দুটো বাইক নিয়ে পজিশন নিল রুদ্র-প্রিয়তা। রুদ্র ৩৫০ সিসির কাওয়াসাকি নিনজা আর প্রিয়তা ইয়ামাহা MT-15 বাইকের ওপর বসে। দুজনের মাথাতেই কালো হেলমেট। একে অপরকে একপলক দেখে প্রায় একইসঙ্গে হেলমেটের গ্লাসটা নামিয়ে দিল। কোনো কথা হলো না, শুধু ইঞ্জিনের গর্জনটাই যেন শুরুর সংকেত দিল। গ্লাভস পরা হাতে এক্সিলারেটর মোচড় দিতেই দুটো বাইক একইসাথে ছুটে চলল।
এক টানে স্পিড উঠে গেল একশোতে। দুটো বাইক চলন্ত গাড়িগুলোর মাঝখান দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে তীব্র গতিতে এগোতে লাগল। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়ছে না। রুদ্র খেয়াল করল, বাইক রেসিংয়ে প্রিয়তা অনেক বেশি বেপরোয়া। সাধারণ বাস-ট্রাকগুলোকে ও যেভাবে গা ঘেঁষে বিপজ্জনক স্পিডে ওভারটেক করছে, তা গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। রেস জেতার জন্যে আক্ষরিক অর্থেই জীবন বাজি রাখছে ও।
বিন্দুমাত্র গতি না কমিয়ে দুটো চলন্ত বাসের মাঝখান দিয়েই মাত্র ফুট দুয়েকের ফাঁকা জায়গা দিয়ে সাপের মতো বাইকটা গলিয়ে বের করে নিল প্রিয়তা। রুদ্রর গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে নিনজা নিয়ে প্রিয়তার পিছু নিল ও। ১১০-১২০ স্পিডে চলন্ত গাড়িগুলোকে ওলটপালট করে ওভারটেক করার এই রোমাঞ্চ যে দেখতো তারই হার্টবিট বেড়ে যেতো।
উত্তেজনা আরও বাড়ল, যখন দুটো ওভারলোডেড বাস একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে পুরো রাস্তা প্রায় ব্লক করে এগোতে দেখল ওরা। কিন্তু এবার রুদ্র আমের ব্রেক তো করলই না, বরং গতি আরও বাড়িয়ে দিল। একদম বাম পাশের মাটির কাঁচা ঘেঁষে, ধুলো উড়িয়ে বাস দুটোকে ডান কাটে ফাঁকি দিল ও। রাণীও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। নিজের গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখে চলন্ত বাস দুটোর মাঝের সরু গ্যাপটা দিয়ে চোখের পলকে সমানে চলে এলো ও। তখন দুজন একদম পাশাপা কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়ছে না। ইঞ্জিনের তীব্র গর্জন আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে কান পাতা দায় হচ্ছে। সামনে ফাঁকা রাস্তা পেয়ে বাইকের স্পিড আরও বেপরোয়া করল দুজনেই। স্পিডোমিটারের কাঁটা তখন ১৫০ ছুঁইছুঁই।
ঠিক এই চরম উত্তেজনার মাথায়, ওরা যখন কাঞ্চন ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখনই বুক কাঁপানো এক ঘটনা ঘটে গেল। রাস্তার বাম লেন দিয়ে একটা বিশাল মালবাহী ট্রাক নিজের গতিতে চলছিল। প্রিয়তা তখন রুদ্রকে পেছনে ফেলার জন্য এতোটাই ডেসপারেট যে ট্রাকের ঠিক পেছনে গিয়ে ব্লাইন্ড স্পটে পড়ে যায় ও। ঠিক ওই মুহূর্তে ট্রাকটা হঠাৎ হালকা ডান লেনে চাপল। প্রিয়তার সামনে ব্রেক চাপার বা সরে যাওয়ার ঊর কোনো রাস্তাই ছিল না। সরাসরি চলন্ত ট্রাকের পেছনের চাকার নিচে পিষে যাওয়ার অবস্থা হল ওর।
হৃদপিণ্ড ছলকে উঠল রুদ্রর। অজান্তেই সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে হার্ডব্রেক চাপল ও। শোনা গেল টায়ারের সাথে পিচ রাস্তার ঘর্ষণে বিকট আর্তনাদ। সেইসঙ্গে ধোঁয়া উড়িয়ে নিনজা বাইকটা একচুল লাইনে থেকে থমকে গেল।
কিন্তু রাণী মির্জা হাল ছাড়েনি। ও ব্রেক না চেপে, একদম শেষ সেকেন্ডে বাইকটাকে অনেকটা অলৌকিকভাবেই ডান দিকে কাত করে দিল। চলন্ত ট্রাকের বিশাল চাকা আর প্রিয়তার ডান কনুইয়ের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি! ট্রাকের পেছনের বডির সাথে ওর হেলমেটের একটা হালকা ঘষা লাগার মতো শব্দ হলো। এক সেকেন্ডের শতভাগের এক ভাগ এদিক-ওদিক হলেই ওটা নিশ্চিত মৃত্যু হতো। কিন্তু প্রিয়তা সেই মৃত্যুর মুখ ফুঁড়ে রকেটের গতিতে ওপাশে বেরিয়ে গেল।
রুদ্র স্তব্ধ হয়ে ট্রাকের ওপাশে মিলিয়ে যাওয়া প্রিয়তার বাইকের লাল আলোটার দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর তখন হাতুড়ি পেটাচ্ছে ওর। কপাল বেয়ে নেমে চিকন ঘাম। স্বস্তিতে শরীর শিথিল হয়ে এলো ওর। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্র বলল, 'ফা** ক্রেজি শী ইজ।'
বাইকটা আবার গিয়ার লেগে এক্সিলারেটর মোচড় দিল রুদ্র। রেসের শেষ অংশ বাকি এখন। প্রিয়তা সেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেও গতি কমালোনা। কিন্তু ওই হালকা ঘষার কারণে ওর বাইকের চেইন বা ইঞ্জিনে একটা ঝটকা লেগেছিল, যা ও নিজেও টের পেয়েছে। তাও থামল না ও।
কিন্তু শেষ লাইনের ঠিক ১০০ মিটার আগে ইচ্ছা করেই এক্সিলারেটরের গ্রিপটা সামান্য আলগা করে দিল রাণী। অপরদিকে নিখুঁত কর্নারিং আর অসামান্য রাইডিং স্কিল খাটিয়ে প্রিয়তাকে ইঞ্চি মেপে পেছনে ফেলে দিল রুদ্র আমের তীরের বেগে ফিনিশ লাইন পার হয়ে গেল রুদ্রর নিনজা। রাণীর বাইকা ফিনিশিং লাইন ছুলো এক সেকেন্ড পর।
পাশাপাশি বাইকে বসেই জোরেজোরে শ্বাস ফেলল দুজন। অতঃপর আলতো হাতে হেলমেটের গ্লাস তুলে প্রিয়তার দিকে তাকাল রুদ্র। চোখে হাসি। প্রিয়তাও আস্তেধীরে তুলল হেলমেটের গ্লাস। হাসি লেগে আছে ওর চোখেও। কিন্তু দুজনেই চোখের হাসিই যেন বলছে ভিন্ন কোন গল্প।
—————
রাত তখন একটা। কাঞ্চন ব্রিজের নিচে, শীতলক্ষ্যা নদী। নদীর পাড়ে চারপাশটা একদম নিঝুম। শুধুমাত্র ব্রিজের ওপর দিয়ে মাঝে মাঝে দু-একটা বড় ট্রাক যাওয়ার ভারী শব্দ হচ্ছে। ব্রিজের হলুদ আলোটা এসে পড়েছে নদীর শান্ত পানিতে।
নদীর পাড়ে বাইক দুটোর ওপরই পাশাপাশি বসে রুদ্র আর প্রিয়তা। হেলমেট খুলে ফেলেছে দুজনেই। মাঝরাতের ঠান্ডা বাতাস এসে লাগছে ওদের ঘামে ভেজা মুখে। কেউ কোনো কথা বলছে না। শুধু নদীর পানির মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে। পকেট থেকে আবার সিগারেটের প্যাকেট বের করল রুদ্র। নিজের জন্যে একটা নেওয়া মাত্রই হাত বাড়িয়ে দিল প্রিয়তা। রুদ্র ভ্রুকুটি করে তাকাল মেয়েটার দিকে। কিন্তু ওর দৃষ্টি তখন নদীর পানিতে। রুদ্র তর্ক না করে বাড়িয়ে দিল সিগারেট। অতঃপর নদীর কলকল শব্দ ছাপিয়ে লাইটার অন হওয়ার আওয়াজ শোনা গেল। সিগারেটে লম্বা এক টান দিয়ে প্রিয়তা বলল, 'আপনার স্পীড জাজমেন্ট কিন্তু দুর্দান্ত। প্রাকটিজে থাকলে সেরা রাইডার হতে পারবেন।'
রুদ্রও নিজেও নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ' আর তুমি একটা পাগল। জেতার এতো ডেস্পারেশান? আরেকটু হলে সোজা ট্রাকের নিতে যেতো তোমার মাথা।'
প্রিয়তা হেসে উঠল, 'মন্দ হতোনা কিন্তু?'
রুদ্র আবার ভ্রুকুটি করে তাকাল। প্রিয়তাও হাসিমুখে তাকিয়ে বলল, 'তাওতো জিততে পারলামনা বলুন। বাই দ্য ওয়ে, কী চাই উইনার?'
' যা চাই তা দেবে?' ভ্রু তুলে জানতে চাইল রুদ্র।
' কথাতো তাই ছিল।'
' কথাতো সারাজীবন পাশে থাকারও দিয়েছিলে।'
' আমি এখন পাশে থাকতে চাইলেই আপনি রাখবেন?'
' রাখার কোন উপায় বাকি রেখেছো?'
উত্তর দিতে পারল না প্রিয়তা ওরফে রাণী মির্জা। আরও কিছুক্ষণের নীরবতার পর প্রিয়তা নিজেই বলল, ' বললেন না, কী চাই?'
' তোমার প্রাণ।' শীতল স্বরে বলল রুদ্র। প্রিয়তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কিল ইওরসেলফ।'
প্রিয়তা হাসল, 'আপনি সত্যিই তাই চান?'
'চাই।'
'আজই?'
'এখনই।'
' আপনার চোখ ভিন্ন কিছু বলছে।'
' আমার চোখ তুমি ভুলভাল পড়ছো। যেমন আমি পড়েছিলাম দুবছর, ভুলভাল।'
' বেশ!'
মাথা দুলিয়ে কথাটা বলল প্রিয়তা। ঠোঁটে তখনও হাসি ঝুলে আছে। নিজের বেরেটাটা বের করে সেইফটি ক্যাচ অফ করল প্রিয়তা। অতঃপর নলটা ঠেকিয়ে ধরল নিজর মাথায়। তাকাল রুদ্রর দিকে। রুদ্র তখনও তাকিয়ে আছে, চোখমুখ একদম নির্বিকার। নিঃশ্বাস আটকে ধীরে ধীরে চোখ বুজে ফেলল প্রিয়তা। প্রায় কয়েকটা সেকেন্ড সময় নিল নিজেকে প্রস্তুত করতে। শেষমেশ দীর্ঘ এক শ্বাস টেনে প্রিয়তা ট্রিগারে আঙুল প্রেস করতে গেলেই রুদ্র আচমকা বলে উঠল, 'একটার বেশি বেজে গেছে। এখন আর এই নাটকের প্রয়োজন নেই তোমার।'
ঝট করে চোখ খুলল প্রিয়তা, হাত থেমে গেল ওর। ধীরে ধীরে বেরেটাটা নামিয়ে বিস্ময় নিয়ে তাকাল রুদ্রর দিকে, 'আপনি... আপনি জানেন সব?'
হেসে ফেলল রুদ্র। বেশ আয়েশ কর সিগারেটের ধোঁয়া টেনে বলল, 'সব।' অতঃপর কুয়াশায় ধোঁয়া উড়িয়ে দিয়ে বলল, 'এই এক ঘন্টা, আমাকে আউট অব কন্টাক্ট ট্রাকে আটকে রাখতে চেয়েছিলে তুমি। কেন?.রুটের সিস্টেমস্ চেঞ্জ করাতে?'
রাণীর চোখের বিস্ময় বাড়ল। রুদ্র আয়েশ করে সুখটান দিয়ে সিগারেটা ঘুরিফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল, 'তোমার কী মনে হয়েছে? আমি এমনিই তোমার কাছে চলে এসছি? এমনিই এই স্টুপিড রেসটা করতে রাজি হয়ে গেছি? আগেই বলেছি উদ্দেশ্য ছাড়াযে তুমি কিছু করোনা, তা আমি খুব ভালোভাবেই জানি। আর সেভাবেই আমার লোকসহ জয় আর রঞ্জুকে কাজে লাগিয়ে দিয়ে এসেছিলাম আমি। যার কারণে ফোন সুইচড অফ থাকা সত্তেও আমার কানেকশন বুইল্ডিং এ কোন সমস্যাই হয়নি। কিন্তু _'
রুদ্রর কিন্তু শুনে খানিক নড়েচড়ে তাকাল প্রিয়তা। রুদ্র খানিকটা বাঁকা হেসে বলল, 'কিন্তু তোমার ফোনওতো অফ ছিল, রাণী মির্জা। না জানি কী কী ঘটে গেছে এই এক ঘন্টায়?'
রাণীর চোখজোড়া বিস্ফোরিত হয়ে উঠল। এতক্ষণে বিষয়ট মাথায় খেলল ওর। ও দ্রুত নিজের ফোনটা বের করল পকেট থেকে। হাতের কম্পনে ফোন ফসকে পড়তে গিয়েও পড়ল না। ও দ্রুত ফোনটা অন করল। ফোন অন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য মেসেজে ফোনটা ভাইব্রেট হয়ে উঠল। রাণী চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল রুদ্রর দিকে। রুদ্রর ঠোঁটে তখন বাঁকা হাসি।
নিঃশ্বাস আটকে রেখে মেসেজেস্ সব দেখল প্রিয়তা। দেখা শেষে হৃদয় যেন স্পন্দন হারাতে চাইল। এই এক ঘন্টায় রুদ্রর দলের লোকেরা ওর সেন্ট্রাল লজিস্টিকস সার্ভারে এমন একটা ম্যালওয়্যার পুশ করেছে, যা রাণীর পুরো ট্র্যাকিং স্ক্রিনকে একটা টাইমলুপে ফেলে দেবে। আন্তর্জাতিক দুই সাপ্লায়ার দলের সাথে রানীর সার্ভারের ডাটা সিঙ্ক হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। রানীর আইটি ড্যাশবোর্ডে ডেলিভারির যে টাইমস্ট্যাম্প এবং সিকিউরিটি কোড জেনারেট হওয়ার কথা ছিল, সেটা একটা টেকনিক্যাল এরর দেখিয়ে ইতিমধ্যে লক করে দেওয়া হয়েছে।'
রুদ্র নিচে রাখা সিগারেটটা পায়ে পিষে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় রাণীর ঠিক সামনে। মেয়েটা তখনও বিস্ময়ে স্থির হয়ে আছে। রুদ্র হাসে প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে।
'তোমার মনে হচ্ছিলো এই এক ঘন্টা তুমি আমাকে আটকে রেখেছো। বাট দ্য ট্রুথ ইজ, এই এক ঘন্টা তুমি আমাকে না, বরং আমি তোমাকে আটকে রেখেছিলাম। সমস্ত যোগাযোগের বাইরে। যদি ফোনটা অন রাখতে, তাহলে ব্যপারটা আটকাতে পারতে তুমি।'
প্রিয়তা ধীরে ধীরে তাকাল রুদ্রর মুখের দিকে। স্থির, নির্বিকার চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। রুদ্র হঠাৎ করেই চেপে ধরল প্রিয়তার নরম গাল। ওর মুখটা উঁচু করে ধরে ঝুঁকল। ফিসফিসিয়ে বলল, ' আর রইল বাকি হার-জিতের কথা। তোমার ঐ বিষাক্ত চোখের মায়ায় পড়ে, তোমাকে ভালোবেসে ফেলাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় হার। আর আজও তোমাকে ঘৃণা করতে না পারাটা আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কিন্তু এক ভুল রুদ্র আমের বারবার করেনা। তোমার ঐ চোখের ছলনায় তুমি দ্বিতীয়বার বাঁধতে পারবেনা আমায়।'
প্রিয়তা কেবল তাকিয়েই রইল রুদ্রর দিকে। একচুলও নড়ল অবধি না। রুদ্র ওর গালটা ছেড়ে দিয়ে বলল, 'বলেছিলাম না, এতো সহজ মৃত্যু দেবনা তোমাকে আমি। নরক দর্শন এখনো অনেকটা বাকি রাণী মির্জা। এটা শুরু মাত্র।'
বাইকের ওপর সশব্দে চাবিট রাখল রুদ্র। অতঃপর কোনদিকে না তাকিয়ে উল্টোঘুরে হাঁটা দিল চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। একটাবারও পেছন ফিরে তাকালনা রুদ্র। হেঁটে চলল ও। ধীরে ধীরে অন্ধকারে হারিয়ে গেল রুদ্রর সুঠাম, লম্বা শরীরের অবয়ব। যতক্ষণ রুদ্রকে দেখা গেল, ততক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল প্রিয়তা। তাকিয়ে থাকতে থাকতে জলে টলমল করে উঠল দীঘল, অপূর্ব চোখজোড়া। প্রিয়তা এখন এখানে একা। একদম একা। হঠাৎ আঙুলে ছ্যাঁত করে লাগল সিগারেটের আগুনের অংশটা। রাণী চমকে উঠে ছেড়ে দিল ওটা। হাত ঝাড়া দিয়ে সামলানো নিজেকে। অতঃপর বাইকে ভর দিয়ে তাকাল খোলা আকাশের দিকে। পরাজয়ের যন্ত্রণায় কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে নামল চোখে জমা জলটুকু। রাতের আবছা আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল সেই অশ্রু। কিন্তু এই অশ্রু ঠিক কোন পরাজয়ের, বলা মুশকিল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………