নিজের থেকে চৌদ্দ বছরের ছোট একটা মেয়েকে বিয়ে করবো সেটা আমার পরিকল্পনায় কখনোই ছিলো না। মাকে বহুবার বারণ করেছি। পেয়ারার বড়চাচাকে তো মুখের উপর না করে দিয়েছিলাম। চৌদ্দ বছর ছোট মানে সেই মেয়ের বোধবুদ্ধিও হবে চৌদ্দ বছর ছোট। আমার মতো দামড়া ব্যাটাকে সে কি বুঝবে? উলটো আমাকেই তাকে পেলেপুষে বড় করতে হবে। কিছু বললে দেখা যাবে সে ঠোঁট ফুলাবে, কান্নাকাটি করবে। তখন ঢং আমার সহ্য হবে না। কোন সময় আমার মেজাজ খারাপ হবে, আর ঠুন্না দিয়ে বসবো তার ঠিক নেই।
মাকে বহুবার বলেছি, আমি বিয়ে করবো না। বিয়ে মানেই অযাচিত ভাবে এক অপরিচিত নারী জীবনে ঢুকে পড়া। প্রেমপীরিতি আমাকে দিয়ে হয় নি। আমার ওসবে গা গুলায়। এখন একজন মানুষের সাথে বিয়ের বাঁধনে জড়ালে সেই মানুষের দায়িত্বও আমার কাঁধে আসবে। আমি সত্যি-ই খুব ক্লান্ত। তার উপরে মেয়েটা মাহমুদের বয়সী। সে আমাকে কি বুঝবে? এই গোটা সংসার এবং আমার বোঝায় সে পিষে যাবে। মা বুঝলেন না। সুন্দরী দেখেই মায়ের খুব পছন্দ হয়েছে। সে এখন বিয়ে দিতে এক পায়ে রাজী। শেষমেশ আমাকেও রাজী হতেই হলো। উপায়ন্তর না পেয়ে অবশেষে সেই চৌদ্দ বছর ছোট পেয়েরাকেই আমার বিয়ে করতে হলো।
পেয়েরাকে আমি আগে দেখি নি। তার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিলো আমাদের বিয়ের দিন। কবুলপর্বের পর তাকে আমার পাশে বসানো হলো। ভীত হরিনীর মতো মেয়েটাকে প্রথম যখন দেখলাম আমি থমকে গিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিলো একটা চাঁদের টুকরো আমার জীবনে এসেছে। সেই সাথে রাগও হয়েছিলো, মেয়েটা এতো ছোট, এতো নরম। আমি ছুলেই তো গুড়িয়ে যাবে। আমি ওকে নিয়ে কি করবো! আহ্লাদ আমি করতে পারি না। এই মেয়েটাকে ধমকালে নিশ্চিত কেঁদে পদ্মা-যমুনা এক করবে। টের পেলাম, আমার নিরেট জীবনে এক আস্তো ঝামেলা এসে পড়লো। কিন্তু কিছুই করার নেই। বিয়ের বাঁধনে বাঁধা যখন পড়েছি তখন এই ঝামেলাটাকেও ঘাড়ে নিতেই হবে। দায়িত্বের তালিকায় আরেকটা নাম জুটলো,
"কানন" উরফে আমার গ্যাদা বউ পেয়ারা।
একটু পর ফ্যাসফ্যাসানির শব্দ কানে এলো। আমি পাশে তাকাতেই দেখলাম পেয়ারা কাঁদছে। ওর ডাগর ডাগর চোখে টলমল করছে পানি। নাক টেনে টেনে একাকার অবস্থা। বুঝতে পারলাম সে বিয়েতে রাজী নয়। শুনেছিলাম কোনো একটা ছেলে তাকে উত্যক্ত করে বিধায় বিয়ের জন্য এতোটা তাড়াহুড়ো। সাথে সাথেই আমার মনটা বিষিয়ে উঠলো। রাগ হলো প্রচুর। বিয়ে তো আজকালের ব্যাপার না। একটা গোঁটা জীবন কাটাতে হবে। একেই আমাদের বয়সের বিস্তর ফারাক। উপর থেকে পেয়ারার আমাকে পছন্দ নয়। এই সম্পর্কটা কি করে টানবো! ঠিক করলাম, শুধু দায়িত্বতেই সীমাবদ্ধ রাখবো একে। বেশি আহ্লাদ দিবো না। ঢলাঢলি করবো না।
কিন্তু আহ্লাদ না দেওয়ার সুযোগ হলো না৷ কাননের চোখগুলো খুব ভয়ংকর। ও যখন আমার দিকে ভীত হরিনীর মতো তাকাতো ওই ডাগর ডাগর চোখ দিয়ে, নিজেকে সামলানো দায় হয়ে উঠলো। আমি ওই চোখ থেকে নিজেকে আঁড়াল করে রাখলাম।
পেয়ারার একটা সমস্যা আছে। মুখ ফুঁটে কিছু বলতে পারে না। ফ্যাসফ্যাস করে, কাঁপে। আমি তাকালেই ওর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। মনে হয় এখনই হেগে দিবে। কি এক যন্ত্রণা। ঘরে এসে সিগারেট খাওয়ার জো নেই। দেখি পেছনে দাঁড়িয়ে কাঁপছে আর কাশছে। ওর কাঁপুনী দেখে আমার এতো মেজাজ খারাপ হলো, ইচ্ছে করলো একটা ঠুন্না দেই। কিন্তু ওই মুখটার দিকে তাকিয়ে রাগ দেখানো গেলো না। অগত্যা সিগারেট ফেলে দিতে হলো।
প্রথম রাতে যখন ওই নরম শরীরটা আমার পাশে শুয়েছিলো, আমি টের পেয়েছিলাম আমার মাঝেও একটা পুরুষ সত্তা আছে যে ইন্দ্রিয়পরায়ণ, যার মাঝে নিষিদ্ধ চাহিদা বিদ্ধমান। আমি অবিবেচকের মতো তার উপর নিজের কর্তৃত্ব খাটাতে চাই না। যেখানে সে এই বিয়েতেই রাজী নয় সেখানে আমার আধিপত্য সে মেনে নিবে না। একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে সেই রাতটা আমি কাটালাম।
ভোরে আমার ঘুম ভাঙ্গলো। আকাশে তখনও আলো ফুটে নি। আমি উঠে পাশে তাকাতেই দেখলাম আমার বউ নেই। যাক রাতের ছবক কাজে দিয়েছে। আমি চাই না আমার মা বা বোন আমার বউয়ের কোনো খুঁত ধরুক। এই সংসারের গৃহিনী তাকে একদিন হতেই হবে। কেনো না প্রথম থেকেই সতর্ক করি। এই মা-শ্বাশুড়ির ঝামেলা আমার ভালো লাগে না। মা আমার কানে ফু দিবে, বউ সেই ফু তে কাঁদবে এসব জ্বালা আমি চাই না। তাই বউকে নিজের থেকে গড়িয়ে তুলতে হবে। আমার গ্যাদা বউটার আবার ফ্যাসফ্যাসানি স্বভাব আছে। এখন দিন দুনিয়ায়ার জগতে সে অগা। এই অগা মেয়ে মানুষকে গড়াতেই আমার জীবন কেঁটে যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে বিছানা গুছিয়ে গোসলে যাব অমনি দেখলাম গ্যাদা একটা শাড়িকে থানের মতো কোনো মতে পেঁচিয়ে বেরিয়েছে। তার চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে, ব্লাউসের হুক এলোমেলো। শাড়ির আঁচল কোনো মতে কাঁধে তোলা। ভেজা শরীরে কাপড়টা লেপ্টে থাকায় তার কমনীয় খাঁজ অবধি স্পষ্ট। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে রক্তের স্রোত বয়ে গেলো। লোম দাঁড়িয়ে গেলো। এই মেয়ের কি কোনো ধারণা আছে তাকে কেমন লাগছে! এই মেয়ের কি কোনো ধারণা আছে আমার মন-মস্তিষ্কে তার কি প্রভাব পড়ছে? নেই, একেবারেই নেই। থাকলে এমন অসহায়, নিরীহ চোখে তাকিয়ে থাকা সম্ভব হতো না। আমি কোনোমতে পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম। আমার অন্তস্থল অস্থির। হৃদস্পন্দনের বেগ বোধ এক বিশ ছাঁড়িয়ে গেছে। সকালের সেই বরফ শীতল পানিতেও আমার টগবগে রক্তের সেই দাপট কমলো না।
মসজিদে যাবার আগে তাকে সতর্ক করলাম,
"শাড়ি পরার মাথার দিব্যি কেউ দেয় নি। সমস্যা হলে এসব ন্যাকামি করার মানে নেই।"
দেখলাম গ্যাদা আমার দিকে হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে আছে। ওকে নাম ধরে ডাকতে ইচ্ছে হয় না। কানন নামটা কেন যেন ওর আদুরে মুখের সাথে যায় না। আমার ওকে আদর আদর দিয়ে ডাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেই অধিকার কি ও দিবে!
আমি ভেবেছিলাম আমার গ্যাদাকে আমি কোনো আহ্লাদ দিব না। আহ্লাদে মাথায় উঠে নেত্য করবে। কিন্তু সেই উপায় রইলো না। আমার গ্যাদা বিয়ের প্রথম দিন তার পা পুড়িয়ে একাকার করে ফেললো। একটা মানুষ গরম পানিও ঢালতে জানে না। ও কি করে ওর ছোট্ট কাঁধে এই সংসারের দায়ভার নিবে? আমি যে কারোর উপর কখনো ভরসা করতে পারবো সেই আশাতেও গরম পানি ফেলে দিলো আমার গ্যাদা। আমি ওকে বকতে চাইলাম কিন্তু ব্যথায় নীল হওয়া মুখটা দেখে খুব মায়া হলো। বকতে পারলাম না। সেই রাতেই ছুটলাম হাসপাতালে।
গ্যাদার পা খুব বাজে ভাবেই পুড়লো। আঙ্গুলের চামড়া ঝলসে গেছে। মেয়েটার সাহসের তারিফ করতে ইচ্ছে হলো। এতোটা যন্ত্রণা এতোটুকু শরীর কি করে সহ্য করছে! আমি খেয়াল করলাম গ্যাদা লজ্জিত। এতোটাই লজ্জিত যে ক্ষুধার কথা বলতেও তার দ্বিধা। হাসপাতালের বিশ্রী খাবার তার গলা থেকে নামছে না অথচ সে সেটাই জোর করে খাওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত। মুখ ফুঁটে একবার বলবেও না,
"আমি এসব খাবো না। আপনি আমাকে বাহির থেকে খাবার কিনে দিন!"
কি অদ্ভুত! আমার রাগ হলো। এই ফ্যাতফ্যাতা মেয়ের সাথে কি করে জীবন কাটাবো! আমি বাধ্য হয়ে কিছু খাবার কিনে আনলাম। আমার বউ সেটা খুব তৃপ্তি করে খেলো। একটা সময় মুখ ফুঁটে বলেও ফেললো,
"আরেকটু ভাঁত হবে!"
ও সেই প্রথমবার মুখ ফুঁটে কিছু চাইলো। আমার কেন যেন ক্ষুধা মিটে গেলো। মনে হলো এই গ্যাদার তৃপ্তিতেই আমার তৃপ্তি। তার ভীত চোখের সেই দৃষ্টিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে শান্তি লাগলো।
গ্যাদাকে নিয়ে আমার খুব জ্বালা হলো। পা পোঁড়া, চলতে পারে না। কোলে কোলে নিয়ে হাটতে হয়। ওই নরম শরীরটাকে ইচ্ছে করে বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলি। এতো তুলতুলে হতে হবে কেন তাকে। কিন্তু এই কথাগুলো মুখে বলা গেলো না। তবে আমার সংযম ভেঙ্গে গেলো। ওর চুলের সেই মিষ্টি গন্ধ আর শরীরের নরম স্পর্শে আমি নিজের ভেতরের সেই পুরুষ সত্তাকে আটকাতে পারলাম না। আমার বাঁধ ভাঙ্গলো। আমি নিজের ভারী শরীরের নিচে পিষে ফেললাম আমার তুলতুলে গ্যাদাকে। গ্যাদা বাঁধা দিতে চাইলো। কিন্তু তাও আমি কেমন বেপরোয়া হয়ে উঠলাম। হুশ ফিরলো যখন ওর নাক টানার শব্দ পেলাম। নিজের উপর নিজের রাগ হলো। এতোটা অধৈর্য তো আমি কোনো জনমেই ছিলাম না। তবে এই গ্যাদার কাছে আসলেই কেন আমি ব্যতিক্রম হয়ে যাই। আমার কঠিন সংযম ভাঙ্গে। আমি নরম হয়ে পড়ি। এই ছোট গ্যাদা আমার মাথায় উঠে নাচে। তবুও আমি কিছুই বলতে পারি না। ও ফ্যাতফ্যাত করে, আমাকে দেখে ভয় পায়। আমি চাইলেও ওর ভয় ভাঙ্গাতে পারি না। হয়তো এই স্বভাবটা আমার নেই।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর যেদিন প্রথম আমি অফিসে গেলাম, সেদিন বিকালে আমার অফিসে ফোন এলো গ্যাদা বাথরুমে পড়ে গেছে। এই স্বল্প দিনে এই গ্যাদা আমার মাথায়, মনে এতোটাই আধিপত্য লাভ করেছে যে আমি পাগলের মতো সেদিন বাসায় ফিরে এসেছিলাম। আমার মনের ভেতর টর্নেডো চলছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি যতক্ষণ না তাকে স্বচক্ষে দেখবো আমার মন শান্ত হবে না। আমি সেদিন কিভাবে বাড়ি ফিরেছিলাম আমি ই জানি।
বাড়ি ফিরে গ্যাদার সেই রক্তাক্ত পা দেখে আমার মাথা ঠিক থাকলো না। রাগ হলো প্রতিটা মানুষের উপর। ঘরে এতোগুলো মানুষ অথচ আমার অবর্তমানে আমার এই বাচ্চা বউটার খেয়াল রাখার কেউ নেই। আমি সেদিন মায়ের সাথেও খুব চেঁচিয়েছিলাম। বাচ্চা বউ বিয়ে করার এই জ্বালা, বুঝে তিন কাঠি বেশি। সেও তিন কাঠি বেশি বুঝে কান্নাকাটি জুড়লো। যখন বললো,
"আপনি একটা খবিশ, আপনার সাথে আমি থাকবোই না।"
আমার ভেতরটায় কামড় পড়লো। মনে হলো কেউ আমার গলা টিপে ধরেছে। গ্যাদাটা আমাকে তার ভীত চোখের মায়ায় ফেলে এখন পালাতে চায়! অবশ্য নিজেরও অবাক লাগলো আমি একটা ছোট্ট মানুষের ডাগর ডাগর চোখে নিজেকে সম্পূর্ণ হারিয়েছি। তার সেই চাহনী আমার বুক কাঁপাতো। অদ্ভূত এক ব্যাথা হত। ইচ্ছে করতো এই বাচ্চাটাকে বুকের ফেরত আগলে রাখি। মেয়েটি আমার আশেপাশে ফড়িং এর মতো লাফাতো! আমি শুধু দেখতাম, শাসন করতে পারতাম না। মেয়েটি কি সত্যি আমাকে কখনো বুঝে নি নাকি আমি সত্যি এতোটা খারাপ মানুষ। অবশ্য সে পরে আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলো। টলমলে সেই চোখ নিয়ে আমার হাত ধরে বলেছিলো আর কখনো এমন কিছু বলবে না।
আমার গ্যাদা ততটা গ্যাদা নয়। সে খুব বুদ্ধিমতী। তাই তো একটা গোটা সংসার সামলেও সে পড়াশোনা করতো। পরীক্ষার আগে দেখতাম ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে টেবিলে বসে আছে। মাঝে মাঝে চোখের পাতা ঘুমে জড়িয়ে আসতো তার। মায়া হত। কিন্তু মায়া দেখালে আমার দূর্বলতা ধরে ফেলবে সে। তাই নিজের কাজের বাহানা দিয়েই তাকে পাহাড়া দিতাম। মাঝে মাঝে চা বানাতে পাঠাতাম। গ্যাদা রাগ করতো। পেয়ারার মতো লাগতো ওকে। চুমু খেতে ইচ্ছে হত। গ্যাদার আশেপাশেই আমি ভীষণ নির্লজ্জ, বেহায়া পুরুষ।
পেয়ারা আমার তীব্র রাগের সম্মুখীন হলো যখন আমি মাহমুদকে মেরে ওর ঠোঁট ফাটিয়ে দিয়েছিলাম। সেদিন আমার ভীষণ রাগ হয়েছিলো। মাথায় ছিলো না আমার গ্যাদা যে আমাকে ভয় পায়। তার রক্তশূন্য মুখটা দেখে আমার মনে হয়েছিলো ও হয়তো কখনো আমাকে ভালোবাসতে পারবে না। কিন্তু তেমনটা হলো না। বরং পেয়ারা আমার সামনে নকটামি করতো, আহ্লাদী করতো। আমার ভালো লাগতো যখন সে আমার জন্য আলাদা করে আমার পছন্দের খাবার রাঁধতো। আমার গরুর মাংস ভালো লাগতো কথাটা ভুলে গিয়েছিলাম অনেক আগে। কিন্তু মেয়েটা ঠিক আমার জন্য গরুর মাংস আলাদা করে রাখতো। আমার একটা ছবিও সে আমার জন্মদিনে দিয়েছিলো। আমি সেই ছবিটা এখনো ট্রাংকে রেখেছি। আমার পেয়ারার প্রথম উপহার।
পেয়ারা যেদিন ইন্টার পাশ করলো সেদিন মেয়েটাকে আমি লাল শাড়ি দিয়েছিলাম। শাড়িটা যখন পরে আমার সামনে দাঁড়ালো তাকে অপ্সরার মতো লাগছিলো। এতোটা সুন্দরও কোনো নারী হতে পারে আমার জানা ছিলো না। আমার মনে হলো এই গোলাপফুলটা শুধু আমার, আমার নিজস্ব। আমি সেদিন আবার টের পেলাম আমি একজন বেহায়া পুরুষ। ওর খুব শখ ছিলো আমার হাতে খোঁপায় মালা পরার। বাচ্চামো শখ। আমার ইচ্ছে হত না পূরণ করার। কিছু শখ পূরণ হয়ে গেলে পূর্ণতা চলে আসে। আমি চাইতাম আমার কাছে পেয়ারা অনেক অপূর্ণতা থাকুক। যা ও ক্ষণে ক্ষণে আমার কাছে আবদার করবে। সে আমার অপেক্ষা করবে। ওর চোখের নিজের অপেক্ষা দেখতেও শান্তি লাগতো।
পেয়ারা প্রায় আমাকে শুধাতো,
"আপনি আমাকে ভালোবাসেন?"
আমি উত্তর দিতে পারতাম না। কারণ আমার কাছে উত্তর ছিলো না। এই ভালোবাসা শব্দটা আমার কাছে নাটুকে মনে হয়। একটা ছোট্ট শব্দ কি আমার মনে পেয়ারার প্রতি যে স্নেহ, আদর সেটাকে ব্যক্ত করতে পারবে? ওকে না পেলে আমার হৃদয় ছটফট করে! সারাক্ষণ চিন্তা করি মেয়েটা কি করছে! ও এতো সুন্দর, কোনো বখাটে ছেলে ওকে উত্যক্ত করছে কি না! আমার মতো মানুষ কি না আমার বউকে আংটি কিনে দিয়েছি যেখানে নিজের নাম খোঁদাই করা। ভাবা যায়! এই উন্মাদনা, এই পাগলামি কি এক শব্দে ব্যক্ত হবে! যদি হয় তবে আমি পেয়ারাকে খুব ভালোবাসি।
এই ভালোবাসাটা যে কতটা গভীর আমি টের পেলাম যখন পেয়ারা মা হতে চললো। মুশফিকার যখন ওর গর্ভে এলো, আমি সত্যি ভয় পেয়েছিলাম। ভয় পেয়েছিলাম ওর তুলতুলে শরীরটা কি এই ধকল নিতে পারবে তো! ডাক্তার যখন আমাকে খবরটা প্রথমবার দিয়েছিলো তখন আমাকে বলেছিলো ওর শরীর অনেক দূর্বল। বাচ্চা নেওয়ার মত অবস্থা ওর না। আমার মনে হয়েছিলো আমার দুনিয়া নড়ে গেছে। আমার বাবা আমার হাতে মারা গিয়েছিলো। ওই ভোঁতা শুণ্যতা আমাকে আবার আষ্টেপৃষ্টে নিল। এই গ্যাদা পেয়ারাটাকে ছাড়াও যে আমার একটা জীবন হতে পারে আমি ওই মুহূর্তে কল্পনা করতেও শিউরে উঠলাম। আমার ভেতর যে ঝড় চলছিলো শুধু আমি জানি। নিজের সেই ভয়ের কারণে আমি পেয়ারাকে খুব আঘাত দিয়েছিলাম। নিজেকে বোঝাতে না পারার ব্যর্থতায় প্রায় হারাতে বসেছিলাম আমার পেয়ারাকে। অফিস থেকে এসে শুনি পেয়ারা রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গেছে। কোনো কথা! মেয়েটাকে এক মুহূর্ত না দেখলে আমার দম আঁটকে আসে। ও কি বোঝে না?
পেয়ারা সেদিন অনেক কেঁদেছিলো। হাউমাউ করে কেঁদে বলেছিলো তার বাচ্চাকে যেন আমি না যন্ত্রণা বলি। কিন্তু ওকে কি করে বুঝাই, ও ছাড়া আমার চলবে না।
এই পুরো মাতৃত্বের যাত্রাটা আমার পেয়ারা খুব কষ্ট করে পার করেছে। ওর নিষ্প্রাণ ক্লান্ত মুখটা দেখলে আমার মনে হত আমি খুব তুচ্ছ একটা মানুষ। পুরো পৃথিবীটাও যদি আমি এই নারীর পায়ের কাছে এনে দেই কম হবে। ও যখন ঘুমাতো আমার ওকে বুকে নিয়ে রাখতে ইচ্ছে হত। মনে হত এই বুঝি ও পালিয়ে যাবে। আমি হারিয়ে ফেলবো আমার পেয়ারাকে। রাতে ঘুমাতে পারতাম না। দুঃস্বপ্ন আমাকে জাপটে ধরে রাখতো। একদিন সেই দুঃস্বপ্ন সত্যি হলো।
পেয়ারার পেইন শুরু হলো। ও ব্যথায় নীল হয়ে যাচ্ছে অথচ আমি নিরুপায়। আমার চোখের সামনে পেয়ারার ম্যাক্সি, পেটিকোট রক্তে ভিজে যাচ্ছে। ওর তুলতুলে শরীরটা আমার কোলে ঢলে পড়লো। আমি মনে হল আমার পৃথিবীটা নির্জীব হয়ে গেছে। আমার হাতে আমার দুনিয়াটা, অথচ আমি কিছুই করতে পারছি না।
পেয়ারার ডেলিভারি হলো। একটা ছোট্ট প্রাণ পৃথিবীতে এলো। কিন্তু ও এতোটাই ছোট যে ওকে ইনকিউবেটরে ঢোকানো হয়েছে। আমার মনে হলো এটা হয়তো আমার শাস্তি। এতোকাল আমি এই বাচ্চাটাকে চাই নি। তাই আল্লাহ এতো ফুটফুটে জ্যোৎস্না আমার কোলে দিয়েও তাকে কেড়ে নিতে চান। অন্যদিকে আমার পেয়ারাকে নেওয়া হয়েছে আইসিউতে। আমার কলিজাগুলো জীবন মৃত্যুর সাথে লড়ছে। অথচ আমার করার কিছু নেই। আমি শুধু দরজার বাহিরে অপেক্ষায় থাকি একটা সুখবরের। আমার পেয়ারা নির্জীব হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতো। আমার ওর সেই নিথর শরীরটা দেখলে ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যেত। আমার ছোট মেয়েটাকে যখন ইনকিউবেটরে দেখতাম আমার নিজেকে হতভাগা মনে হত। এতো অপদার্থ আমি! একটা ভোঁতা ব্যথা ছড়িয়ে পড়তো আমার শরীরে। মনে হতো আমার কলিজাদের কষ্টে দেখার থেকে আমার মৃত্যু শ্রেয়।
পেয়ারার যেদিন জ্ঞান ফিরলো আমার মনে হয়েছিলো আমার খরা জীবনে এক পশলা বৃষ্টি নেমেছে। আল্লাহ আমার ডাক শুনেছেন। আমি হয়তো এতোটাও পাপী মানুষ না।
আমার গ্যাদা পেয়ারার কোলে একটা ছোট্ট গ্যাদা এসেছে। মায়ের মতোই সাহসী। মৃত্যুর সাথে লড়াই করে এই হতভাগা বাপের সংসারে এসেছে সে। মায়ের মতোই ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদে, মেয়ের মতোই জেদি। নকটামিও একদম মায়ের মতো। ওর ছোট শরীরটাকে যখন কোলে নিলাম মনে হলো আমার কোলেই জান্নাতের সুখ। আমি পৃথিবীর সবথেকে সুখী মানব। এর থেকে সুখী হওয়া সম্ভব নয়।
মুশফিকা জন্মানোর পর আমার গ্যাদা ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেলো। সেই অবাধ্য ফড়িংটা কেমন গৃহিনী হয়ে গেলো। একহাতে সব সামলাতো। আমি অবাক হতাম। এইটুকু ছোট মেয়ে ছুটে ছুটে সব করছে। আমাদের যত্নে কোনো ত্রুটি নেই, মুশফিকার যত্নে কোনো ত্রুটি নেই। মেয়েরা হয়তো এভাবেই গড়া। আমি চাই নি আমার গ্যাদা এভাবে বড় হয়ে যাক। আমি চাই আমার গ্যাদা পেয়ারা সবসময় গ্যাদাই থাকুক।
কিন্তু পরিস্থিতি আমার গ্যাদা পেয়ারাটাকে আরোও শক্ত করে তুললো। আমাদের একটা দূর্ঘটনা ঘটলো। আমরা গাজীপুর থেকে ফিরছিলাম। সেই রাতে আমাদের গাড়ির এক্সিডেন্ট হয়। ওই সময়ে আমার মনে হয়েছিলো আমি হয়তো মারা যাবো। আমি না থাকলে আমার কলিজা দুটো কি হবে ভেবেই আমার অন্তস্থলে অস্থিরতা শুরু হলো। ঘটনাটা এতো দ্রুত হলো যে আমি কিছু করতে পারলাম না। আমার বোনের স্বামী সেই দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। সেই সাথে আমাদের জীবনে এক ঘোর বিপদ নেমে এলো। আমাকে মিথ্যে মামলায় জেলে নেওয়া হলো।
সেই সময়টায় আমার পেয়ারা আমার হাত ছাড়ে নি। আমি খুব অবাক হতাম মেয়েটার ধৈর্য্যে। ছোট একটা মানুষ অথচ কি মনের জোর। আমার পেয়ারা প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসতো। ওকে দেখলে আমার মনটা শান্ত হয়ে যেত। আবার নিজেকে খুব অপরাধীও লাগতো। মেয়েটার শুকনো মুখটা দেখতে ভালো লাগতো না। আমি ঝাড়ি মারতাম যেন কান্নাকাটি না করে কি করে বুঝাই ওকে আমার যে ওর চোখের পানি সহ্য হত না।
আমার চাকরি চলে গেলো। বেকারত্ব, অভাবে টলমলে সংসার। সেই সংসারের হাল আমার পেয়ারা ধরেছিলো। কি বুদ্ধির সাথে সে সব সামলেছে শুধু আমি জানি। যখন দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম আসতো না আমি পায়চারি করতাম, মেয়েটা উঠে বসতো। আমাকে টেনে বিছানায় নিয়ে আমার বুকে মাথা রেখে বলতো,
"সব ঠিক হয়ে যাবে!"
যে পেয়ারাকে আমার আগলে রাখার কথা, সেই পেয়ারা আমাকে আগলেছে। সে আমার দায়িত্বটা ভাগ করে নিয়েছে। আমি কখনো ভাবি নি সংসারের এই বিশাল দায়িত্বটার কেউ যেচে এসে ভাগিদার হবে। ভাগ্যিস পেয়ারা আমার বউ। নয়তো আমি কবে ভেঙ্গে গুড়িয়ে যেতাম। আমার সেই ভাঙ্গা অংশগুলো কুড়ানোরও কেউ থাকতো না। পেয়ারা ছিলো। ভাগ্যিস ও ছিলো।
আমার পেয়ারার বাচ্চামোও আমার কাছে প্রিয়। আমার পেয়ারার হাসিও আমার কাছে প্রিয়। শুধু ওর কান্না আমার সহ্য হয় না। ও একবার খুব কেঁদেছিলো। যখন জেনেছিলো ও আর মা হতে পারবে না। ওর গর্ভ খুব দূর্বল। মুশফিকা বেঁচে আছে আল্লাহর রহমত। ও খুব কেঁদেছিলো। আমার ওই কান্না সহ্য হয় নি। কিন্তু ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার বানী আমার কাছে ছিলো না। শুধু বলেছিলাম,
"আমার জন্য মুশফিকাই যথেষ্ট। আমার এতো ওয়ারিশের প্রয়োজন নেই। আমার খাটিয়া নাহয় অন্যরাই ধরলো। তাতে কিছু হবে না। এতো কান্নার কিছু নেই!"
মেয়েটা শুনে নি। ও অনেক কেঁদেছিলো। আমার কলিজা ছিড়ে যাচ্ছিলো ওর কান্নায়। ওই দিন-ই শেষ। এরপর আমি কখনো পেয়ারাকে কান্নার সুযোগ দেই নি।
শোনো মুহাইমিন,
আমি জানি তোমার একটা কঠিন রোগ হয়েছে। তুমি একটা সময় সব ভুলে যাবে। তুমি নিজেকেও ভুলে যাবে। কিন্তু একটা জিনিস সবসময় মনে রাখবে,
"আমার একটা গ্যাদা বউ আছে। নাম পেয়ারা। ওকে কখনো ভোলা যাবে না"
কারণ আমার গ্যাদা পেয়ারা তোমার এই ভুলে যাওয়া সইতে পারবে না। ও খুব কাঁদবে। ও তোমাকে খুব ভালোবাসে। তোমার ভুলে যাওয়া ওকে ভেঙ্গে ফেলবে। আমি আমার গ্যাদা পেয়ারার কান্না সহ্য করতে পারবো না। আর গ্যাদা পেয়ারাকে ভুলে গেলে এই পৃথিবীটা জাহান্নাম লাগবে তোমার। তুমি হয়তো বেঁচে থেকেও মরে যাবো। তাই ওকে ভোলা যাবে না। এই ডাইরিটা তুমি প্রতিদিন পড়বে। এখানে আমাদের জীবনের অনেককিছুই নেই। তবে পেয়ারা তোমাকে মনে করানোর চেষ্টা করবে। তুমি অধৈর্য্য হবে না। তুমি এমন ভাব করবে যেন তুমি কিছুই ভুলো নি। এই বিশাল জীবনটা ওই নারীর উপস্থিতি ছাড়া অপূর্ণ, ফিঁকে, বিশ্রী। সেই ফড়িংয়ের মত গ্যাদা মেয়েটা ছিলো বলেই তুমি আজ পূর্ণ মুহাইমিন সরকার। তুমি তাকে খুব ভালোবাসো। তাই গ্যাদাকে ভোলা গর্হিত অপরাধ। ওকে ভোলা যাবে না।
আরোও অনেক ছোট ছোট নোট করা রয়েছে সেই ডায়েরিতে। এই কথাগুলো কাননের বলা। লোকটাকে যখন সেই কাহিনীগুলো সে বলে লোকটা টুকে রাখে। কানন ডায়েরি বন্ধ করলেন। আরেকবার ঘুরে ঘুমন্ত মানুষটাকে দেখলেন। তার গাল ভিজে গেছে। কৃপাধারী হুতুমকে আরোও একবার ভালোবাসতে ইচ্ছে হলো। এই মানুষটা প্রতিদিন তাকে মনে রাখার চেষ্টা করছেন। অথচ কখনো তা প্রকাশ করেন না। কানন ভাবতেন এই লোকটা হয়তো তাকে ভালোবাসেন না। অথচ আর তিনি টের পেলেন মুহাইমিন তাকে তার চেয়েও অধিক ভালোবাসে। এই মানুষটার শক্ত পরদের ভেতর একটা অসম্ভব প্রেমিক পুরুষ আছে। সেদিন তাহাজ্জুদের নামাজে কানন মোনাজাতে একটাই দোয়া করলেন,
"আল্লাহ, আমার সাহেবকে তুমি আমার আগে নিও। আমি তাকে ছাড়া হয়তো বাঁচতে পারবো। কিন্তু আমার সাহেব আমাকে ছাড়া খুব অসহায় হয়ে যাবেন। হয় তুমি এক সাথেই আমাদের মৃত্যু দিও নয়তো সাহেবের মৃত্যু আমার আগে দিও।"
—————
সকালের টেবিলে মুহাইমিন সরকার দেখলেন গরুর মাংস ভুনা এবং পরোটা। গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ মুহাইমিনের জন্য। কিন্তু তবুও তার পাতে হাড়ছাড়া তিনটে পিস। কাননের দিকে চাইতেই দেখলেন, কানন আয়েশ করে চা খাচ্ছেন। গতকালের মতো সে আজ রাগারাগি করছে না। কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তিনি তাই হাতা গুটিয়ে খাওয়া শুরু করলেন। রান্নাটা কানন নিজে করেছে। আজকাল হাটুর ব্যথায় অনেকক্ষণ সে দাঁড়াতে পারেন না। তবুও রান্না করেছেন, মানে বিশেষ কোনো কারণ। মুশফিকা এসেছে মেয়ের সাথে। মেয়েটা হয়েছে একেবারে মুশফিকার কপি। সে ড্রয়িংরুমে খেলতে ব্যস্ত। মুশফিকা খুব অবাক স্বরে শুধালো,
"তোমার মাথা খারাপ? বাবাকে নিয়ে তুমি সেন্টমার্টিন যাবে? এটা কোনো কথা?"
"এটাই কথা! বুড়ো হয়েছি বলে কি স্বাদ আহ্লাদ নেই। আমার সমুদ্র দেখা হয় নি। টাকা থাকলেও সুযোগ হ্য নি। এখন যাব। আমাদের সামনে এনিভার্সারি। আমি চাই তোমার বাবার সাথে একান্তে এইবারের এনিভার্সারি কাটাবো।"
"মানে উই আর নট এলাউড?"
"হ্যা! নট এলাউড। না তুমি, না নেওয়াজ, না মিষ্টি আপু, না আদনান ভাই, না মাহমুদ। কেউ না। শুধু আমি আর আমার সাহেব।"
"বাবা রাজী!"
বলতেই মুহাইমিন চোখ তুললেন। বউয়ের দিকে একবার চেয়ে বললেন,
"ম্যাডাম যা বলে ঘরে সেটাই হয়। আমার না করাতে কি হবে!"
"বাহবা! কালকের শাসনে দেখছি সুবোধ বালক হয়ে গেলে বাবা!"
মুহাইমিন ঝাঁঝালো স্বরে বললেন,
"কোনো শাসনে টাসনে না। এতোগুলো বছর একসাথে কাটিয়েছি তাই এই কথা মানাটাই তোমার মায়ের গিফট। কৃপা করলাম আর কি!"
"আর কিছু দিবে না?"
"এখন তাজমহল লিখে দিব? আমি তো শাহজাহানের নাতী!"
মুশফিকা কথা বাড়ালো না। কানন হাসলে মৃদু। এই লোকের মুখে মিষ্টি কথা কখনোই আসবে না।
ব্যাগ গুছানো হলো। হঠাৎ আলমারীতে একটা লাল শাড়ি পাওয়া গেলো। সাথে কাচের চুড়ি। এই ঠোংগাটাই গতকাল তার হাতে ছিলো। লোকটা এই শাড়ি কিনতেই পথ হারিয়ে ফেলে ছিলেন? এজন্যই কাউকে সাথেও নেন নি। কি পাগল!
আজ কানন এবং মুহাইমিনের আটত্রিশ তম বিবাহ বার্ষিকী। সেন্ট মার্টিন পৌছালেন দুপুর দুটায়। হালকা খাবার জাহাজেই খাওয়া হয়েছিলো। রিসোর্টে যেয়ে কিছুসময় বিশ্রাম নিলেন তারা। তারপর বিকালে লাল শাড়ি পড়লেন কানন। খুব বেমানান লাগছে। মেহেদি দেওয়া চুল। চামড়ায় ভাঁজ। বার্ধক্য তার শরীরে ঠিকড়ে পড়ছে। তবুও তিনি সাঁজলেন। মনে হলো সেই আঠারো বছরের কিশোরী সাজছে তার সাহেবের জন্য। যখন মুহাইমিনের সামনে দাঁড়ালেন সেই প্রগাঢ় দৃষ্টি আজও তাকে সেভাবেই দেখলো যেমনটা আটত্রিশ বছর আগে দেখতো। কানন লজ্জা নিয়ে শুধালেন,
"কেমন লাগছে আমাকে?"
"ঝাল পেয়ারা মাখার মত!"
"ধ্যাত!"
আজ রাগ হলো না কাননের। আবেগী স্বরে বললেন,
"চলুন আজ সমুদ্রে পা ঢুবিয়ে সূর্যাস্ত দেখি!"
—————
সন্ধ্যে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। লাল সূর্যটা সমুদ্রের উপর ছায়া ফেলছে। বাতাসটা ঠান্ডা। সেই ঠান্ডা বাতাসে কাননের খোঁপা থেকে খুলে আসা সাদা কমলা চুল উড়ছে। মুহাইমিন সমুদ্রের প্রবালে আঁছড়ে পরা ঢেউ দেখতে ব্যস্ত। আর কানন ব্যস্ত তার সাহেবকে দেখতে। গাংচিলেরা সমুদ্রের সেই স্বচ্ছ পানি ছুয়ে উড়ে যাচ্ছে। আশেপাশে অনেক মানুষ। তাদের কলরব। এর মাঝে কানন শুধালো,
"আপনি আমাকে ভুলে যাবেন না তো?"
মুহাইমিন অনেকটা সময় তাকিয়ে রইলেন কাননের দিকে। তারপর মৃদু স্বরে কাননকে চেঁতিয়ে দিতে বললেন,
"পেঁয়ারা খেতে খেতে এখন পেঁয়ারার অভ্যাস হয়ে গেছে। চাইলেও ভুলতে পারি না। আফসোস!"
কানন গাল ফুলিয়ে বললেন,
"উপায় থাকলে ভুলে যেতেন তাই তো?"
এবার মুহাইমিন গাঢ় স্বরে উত্তর দিলেন,
"আমি আমার পেয়ারাকে ভুলতে চাই না।"
কাননের চোখ কেনো যেন ভিজে গেলো। জড়িয়ে ধরলেন তিনি তার সাহেবকে। আজ মনটা খুব তরল হয়ে আছে। খুব আবেগে আচ্ছন্ন। তিনি ধরা স্বরে বললেন,
"আপনি আমাকে কখনো ভুলবেন না ঠিক আছে? নয়তো আমি খুব কাঁদবো। আপনাকে আমি খুব ভালোবাসি।"
"জানি!"
"আর কি জানেন?"
মুহাইমিন পকেট থেকে একটা শুকনো গোলাপ বের করলো। এটা কখন পকেটে ঢুকিয়েছে মনে নেই। গোলাপটা শুকিয়ে গেছে। তবুও তিনি সেই শুকনো গোলাপ গুঁজে দিলেন কাননের খোঁপায়। মৃদু হেসে বললেন,
"এই যে আমি তোমার খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা।"
"উহু, আপনি আমার খোঁপার গোলাপ!"
মুহাইমিন মৃদু হাসলেন। উষ্ণ চুমু আঁকলেন কাননের কপালে। নিজেকে এখন সত্তর বছরের প্রৌঢ়টি লাগছে না। মনে হচ্ছে তিনি এখন সেই বত্রিশ বছরের যুবক। তার সামনে তার আঠারো বছরের অর্ধাঙ্গিনী। যাকে তিনি শাসন করেন, আহ্লাদ করেন, ভালোবাসেন। গুনগুন করে গাইলেন,
"খোঁপার ওই গোলাপ দিয়ে
মনটা কেনো এতো কাছে আনলে
পারবে কি বাসতে ভালো আমাকে জানলে
আমাকে তেমন করে জানলে"
সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আঁছড়ে পড়ছে। সূর্য সেই ঢেউয়ে অস্তীয়মান। মুহাইমিনের গাঢ় দৃষ্টি তার পেয়ারাতে আবদ্ধ। কি সুন্দর লাগছে তার পেয়ারাকে। এই পেয়ারাকে সে ভুলে কি করে!
·
·
·
সমাপ্ত……………………………………………………