আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ১৪ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
          মেঝেতে পড়ে থাকা অবন্তিকার দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়েই তৎক্ষণাৎ ধমকে উঠল—

“এই মেয়ে, চুপ করো! এভাবে কেউ চিৎকার করে নাকি? কোল থেকেইতো পড়েছো, অথচ এমন ভাব ধরছো মনে হচ্ছে যেন পাহাড় থেকে পড়েছো!”

ধমক খেয়ে অবন্তিকা সাথে সাথেই চুপ হয়ে গেল। নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ব্যথায় মুখটা কুঁচকে আছে—মাজায় ভালোই লেগেছে।

“এই জাউরা বেডা! ব্যথা পেলে চিৎকার করব না তো কি, আপনাকে চুমু খাবো নাকি…? 
আ-আ, আমার মাজা শেষ! আমি মনে হয় আর হাঁটতেই পারবো না। আমি তো পঙ্গু হয়ে গেলাম রে! এখন আমাকে বিয়ে করবে কে?”

কাঁদতে কাঁদতেই আবার বলে উঠল—
“আমি তো ভেবেছিলাম বিয়ে করব, বিয়ের পর বাচ্চা কাচ্চা দিয়ে একটা ক্রিকেট টিম বানাবো—ছয়টা মেয়ে, পাঁচটা ছেলে…! গিনেস বুকে নাম লেখাবো। আমার স্বপ্নগুলো কি আর পূরণ হবে না? আমার কী হয়ে গেল রে!”

বাচ্চা দিয়ে ক্রিকেট টিম বানানোর কথা শুনে জারিফের চোখ কপালে উঠল। ভ্রু কুঁচকে মনে মনে বলল—
“এইটা আবার কেমন মেয়ে! পুরো মেন্টাল নাকি?”
তারপর গম্ভীর হয়ে বলল—
“এই মেয়ে, আর একটাও বাজে কথা না! অনেক বলেছো। তুমি কি চিৎকার ছাড়া আর কিছুই পারো না? যখনই দেখি, চিল্লাতেই থাকো—যত্তসব!”

বলতে বলতেই অবন্তিকার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল—
“এই, উঠো।”

অবন্তিকা মুখ ভেংচি কেটে বলল—
“লাগবে না আপনার সাহায্য! নিজেই ফেলে দিয়ে, আবার বকা দিয়ে এখন সাহায্য করতে আসছেন!”

“ওকে…”—বলেই জারিফ হাত গুটিয়ে নিল। একটু ঝুঁকে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
“কানের কাছে এভাবে চিৎকার দিলে ফেলে দিতাম না তো… তোমাকেও চুমু খেতাম নাকি?”আর আমার কোলে যে উঠলে…?”

এই কথাটা শুনতেই লজ্জায় অবন্তিকার গাল লাল হয়ে উঠল। এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে—মুখ তুলে তাকাতেই পারছে না। অচেনা একটা ছেলের কোলে উঠে পড়েছে—ভাবতেই অস্বস্তি লাগছে।

দেয়ালে ঠেস দিয়ে, মাজায় হাত রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো সে।

“আসলে আমি ভয় পেয়ে—”

“ভয় পেলে কোলে উঠে পড়ো নাকি? আজই জানলাম,”—মাঝখানেই কথা কেটে দিল জারিফ।

অবন্তিকা মাথা নিচু করে বলল—
“আমি তো ইচ্ছে করে উঠিনি… দুঃখিত।”

জারিফ বুঝল, মেয়েটা সত্যিই লজ্জা পাচ্ছে। তাই আর কথা বাড়াল না। তবে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে বলল—
“তুমি এত বাঁশ পাতার মতো হালকা কেনো? খাওয়া-দাওয়া করো না নাকি? ফুঁ দিলেই উড়ে যাবে।”

অবন্তিকা সাথে সাথেই মুখ তুলে বলল—
“এই কী বললেন! আমি বাঁশ পাতা…?”

“হুম, সেটাই।”

“তাহলে আপনি হাতি!”

“এই মেয়ে, চুপ!”

অবন্তিকা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
“চুপ থাকবো কেনো? আপনি আগে আমাকে বাঁশ পাতা বললেন, আমি একটু ফিরতি দিলাম, তাতেই সমস্যা!”

জারিফ চোখ কুঁচকে তাকাল—
“আমি হাতি তাই তো?”

“হুম! পুরো হাতি! শুধু শুঁড়টা নাই।”

“ওটা থাকলে তো এখনই তোমাকে তুলে আবারো আছাড় দিতাম!” উফস নানা তুলে নিয়ে গিয়ে আদর দিতাম, বলেই বাঁকা হাসলো।

অবন্তিকা চোখ বড় বড় করে—
“দূর! আমাকে নিয়ে কি করবেন?”

“কি আর করব… তোমাকে দিয়ে পুরো একটা ক্রিকেট টিম বানাবো না?”

অবন্তিকা সাথে সাথেই মুখ হাঁ করে—
“এইটা আমার আইডিয়া ছিল! আপনি কপি করছেন!”

“আইডিয়া ভালো হলে কপি করতেই হয়,”

“তাহলে আগে পারমিশন নিন!”

“ওকে, মিস বাঁশ পাতা, পারমিশন দিবেন?”

অবন্তিকা একটু ভেবে, নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
“না! কপিরাইট আছে!”

জারিফ ঠোঁট চেপে হাসল, তারপর বলল—
“কপিরাইট থাকলেও আমি তো তোমার লাইভ ভার্সন দেখে ফেলেছি।”

জারিফ একটু থেমে অবন্তিকার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল—
“তুমি তো ভালো এন্টারটেইন করছো।”

অবন্তিকা সাথে সাথেই ভ্রু কুঁচকে তাকাল—
“মানে? আমি কোনো সার্কাস নাকি, যে আপনাকে এন্টারটেইন করছি?”

জারিফ ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল—
“সার্কাস না… তবে তুমি একাই পুরো একটা শো!”

“বাহ! ধন্যবাদ, মানে আপনি আমাকে ভাঁড় বলছেন?”—অবন্তিকা চোখ গোল করে বলল।

“না না, তুমি তো ভিআইপি ভাঁড়!।

—অবন্তিকা রেগে সামনে এগিয়ে এল
“এই! আর একবার বললে কিন্তু সত্যি সত্যি ঠেলে ফেলে দিব!”

“আর আমি মনে হয় তোমাকে আস্ত রাখব।”

“আপনি একদমই ভালো না!”

“আর তুমি একদমই চুপ থাকতে পারো না,”।
“বাচাল মেয়ে মানুষ!”

বলেই সে পা বাড়িয়ে চলে গেল।

পেছনে দাঁড়িয়ে অবন্তিকা রাগে কাঁপছে। চোখ কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল—
“বাচাল? আমি? এই লোকটা দেখি একদম পাগল!”
সে পা ঠুকে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।

“আরেকবার পেলে না… আমি দেখিয়ে দেবো বাচাল কে!”

—————

অন্ধকার করিডোর। মাঝে মাঝে দেয়ালে লাগানো কিছু টিমটিমে লাইট হালকা আলো ছড়াচ্ছে। আজ পার্টি থাকায় সবাই নিচে, তাই উপরের ফ্লোরের বেশিরভাগ লাইটই অফ করা ছিল।

অবন্তিকা সেই ম্লান আলো-অন্ধকার ভেদ করে এগোচ্ছিল। হঠাৎ দেয়ালের পাশেই বড়, লম্বা একটা ছায়ার মতো কিছু চোখে পড়ে তার। অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না, কিন্তু অস্বাভাবিক আকৃতি দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে।

ভয়ে সে এক মুহূর্তে থমকে যায়। দূর থেকে দেখে মনে হয়—কোনো অচেনা ছায়া বা ভয়ংকর কিছু দাঁড়িয়ে আছে!
ঠিক তখনই আতঙ্কে আশপাশ না দেখে সামনে দিকেই দৌড় লাগায়, সামনে যেটাকেই পায় সেটাকেই ভরসা ভেবে দৌড়ে গিয়ে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে সরাসরি তার কোলেই উঠে পড়ে।

পরে যা ভেবেছিল, তার কিছুই না। সেটি আসলে একটা বড় ফ্লাওয়ার ভাস। আরও কাছে গেলে বোঝা যায়, জারিফ যাওয়ার সময় লাইট অন করে রেখে গিয়েছিল বলেই আলো একটু বেড়ে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গেছে।

ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, পুরো ঘটনাটা ছিল তার ভয় আর ভুল বোঝাবুঝির ফল। আর সবচেয়ে বড় অস্বস্তি—অচেনা ছেলের কোলে উঠে পড়া আর নিজের সেই তীব্র চিৎকার।

লজ্জায় বারবার কুঁকড়ে যাচ্ছে সে। সাথে হালকা ব্যথাটাও শরীরে অনুভব করছে।

মনে মনে রাগ চেপে বিড়বিড় করল—
“রাহার বাচ্চা… তোকে আজকে পেলে আমি…”
একটু থেমে আবার রাগে ফুঁসল—
“শালী, তোর জন্য আজকে আমার সাথে কী কী হয়ে গেল!”।

—————

জারিফ নিচে নেমে সোজা ড্রিংকস কর্নারে চলে গেল। সেখানে বসে একটা ফ্রেশ ড্রিংকস অর্ডার দিল।

কিছুক্ষণ আগেই ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই করিডোরে সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা ঘটে যায়। মুহূর্তের সেই দৃশ্য—অবন্তিকার হঠাৎ তার কোলে উঠে পড়া—এখনো বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সে অস্বস্তিতে একবার মাথা ঝাঁকালো, কিন্তু মন থেকে ছবিটা সরাতে পারল না।
এসি চলছিল, তবুও জারিফের কপালে চিকন চিকন ঘামের রেখা দেখা দিচ্ছে। শরীরটা যেন অজান্তেই টানটান হয়ে আছে।
কারণ এটা তার জীবনে প্রথম—এতটা কাছ থেকে কোনো মেয়ের স্পর্শ পাওয়া।

সে সাধারণত মেয়েদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। অতীতের কিছু অভিজ্ঞতা তার ভেতরে এমন একটা কঠিন সিদ্ধান্ত গেঁথে দিয়েছে—বিশ্বাস না করাই ভালো।

তবুও কেন যেন তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক হাসির রেখা ফুটে উঠল।পরক্ষণেই চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই অতীতের ভয়াবহ ঘটনা।

—————

অতীত……

জারিফের বড় ভাই নাম আরিফ, তাকে হারিয়েছে কোনো এক মেয়ের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। 
বলা হয় মেয়েরাই নাকি মেয়েদের শত্রু।
কিভাবে এক মেয়ে হয়ে আরেক মেয়ের সর্বনাশের কারণ হয় সেটাই জারিফ বুঝে উঠতে পারে না, নিজে মেয়ে হয়ে আরেক মেয়ের ক্ষতি করতে কি দুবার ভাবে না??

কোনো এক দূর্বিসহ পরিণতি, যেটা তার মনে গেঁথে গেছে খুব বাজে ভাবে।
তাই মেয়েদের দুই চোখে দেখতে পারে না।

মায়া নামের একটা মেয়ে ছিল। যাকে জারিফের বড় ভাই আরিফ খুবই ভালোবাসত। ছোটবেলা থেকে পছন্দ করত। তারা ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের। আর মায়া নিম্ন মধ্যবিত্ত। আরিফ যতটুকু পারত মায়া ও তার পরিবারকে সাহায্য করতে চাইত কিন্তু মায়ার মা মিসেস কামরুন্নেসা নাহার ছিলেন খুবই স্পষ্টবাদী একজন ভদ্র মহিলা। তিনি সরাসরি আরিফকে এসব সাহায্যের জন্য নাকচ করে দিয়েছিলেন।

তার মতে তিনি নিজে যতটুকু পারেন তাতেই সন্তুষ্ট।
মায়াওআর আরিফের বিয়ে হওয়ার কথা পাকা ছিল।

কিন্তু একদিন হঠাৎ মিলে মায়ার ধর্ষণ কৃত লাশ।
যেটা শুনে আরিফ প্রায় পাগল হয়ে যায়।
নিজের ভালোবাসার এমন মৃত্যু কথা শুনে সে ঠিক থাকতে পারেনি। হার্ট অ্যাটাক করে বসে।
যা তাকে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যায়।

জারিফ এই ঘটনায় পুরো ভেঙে পরে। কিন্তু কয়েকদিন পর জানতে পারে আসল কাহিনী।

তদন্ত করে জানা যায়, মায়াদের এলাকায় মুরাদ নামের এক মেম্বারের ছেলে ছিলো । মায়া নাকি নিজ থেকেই একসময় মুরাদের সংস্পর্শে গিয়েছিল। এলাকার সবাইকে জানানো হয়, সেদিন রাতে মায়া শুধু মুরাদের সাথে দেখা করেই চলে আসে আর এই ঘটনার সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

যেটা পরবর্তীতে ভুয়া খবর বলে প্রমাণিত হয়। 
 আসলে এলাকার মেম্বারের ছেলে মুরাদ ও তার কিছু লোক মিলে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল। প্রভাবশালী হওয়ায় তারা আইনের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যায়। আর টাকার বিনিময়ে অনেকের মুখও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মেম্বারের ছেলেকে বাঁচানোর জন্য ঘটনাটা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দিকে সবাই না জেনে মনে করেছিল মায়া হয়তো কারো সাথে পালিয়ে গেছে। এরপর থেকে মায়া কোথায় গেছে, কী হয়েছে—কেউই আর কিছু জানে না।

কিন্তু সত্যিটা জারিফ জানতে পারে কয়েকদিন আগেই…

মায়ার মায়ের সাথেই কয়েকদিন আগে ঢাকায় জারিফের হঠাৎ দেখা হয়েছিল।
জারিফ এক নজরে তাকে চিনে ফেলেছিল।
প্রথমে মায়ার মা চিনতে পারেননি।
কিন্তু পরিচয় দেওয়ার পর ঠিকই চিনে ফেলেন।

কান্নায় ভেঙে পড়ে মায়ার মা একে একে সব ঘটনা খুলে বলেন। সেদিন রাতে আসলে কী ঘটেছিল, কীভাবে সবকিছু উল্টে দেওয়া হয়েছিল—সব সত্যি ধীরে ধীরে সামনে আসে।

—————

মায়া যেমন নাম, তেমনই ছিল তার স্বভাব—মায়াবী আর সুন্দর। সেই কারণেই মুরাদের কুদৃষ্টি তার ওপর পড়ে।
মায়ার স্কুল ফাংশনে মুরাদ চিফ গেস্ট হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছিল। সেদিন শাড়ি পরা মায়াকে দেখে তার মধ্যে এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়। সে মায়ার দিকে অস্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।

মায়া ছিল তার ক্লাসের একজন মেধাবী ছাত্রী। তাকে যখন ফুল দিয়ে বরণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন মায়া ফুল এগিয়ে দেয় মুরাদের দিকে। কিন্তু সেই মুহূর্তে মুরাদ সুযোগ নিয়ে ফুলের তোড়ার আড়ালে তার হাত চেপে ধরে।
মুহূর্তেই মায়া ভয়ে কেঁপে ওঠে। তার চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট হয়ে যায়। কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সে সেখান থেকে চলে যায়।

পরের দিন মেম্বারের ছেলে ও তার দলবলসহ যায় মায়াদের বাড়িতে। মায়ার বাবা নেই—বাড়িতে শুধু মা আর ছোট বোন। মায়া নবম শ্রেণিতে পড়ে, আর তার মায়ের একই স্কুলেই চাকরি।
মায়ার বাবা তাদের সঙ্গে থাকেন না। মায়া দেখতে পুরো বাবার মতো, আর তার মা শ্যামলা বর্ণের। তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেছে। তাই বাবা আলাদা থাকেন, দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে নিজের মতো সংসার করছেন।

অন্যদিকে মায়ার মা দুই মেয়েকে নিয়ে কোনোভাবে জীবনযাপন চালিয়ে নেন। শিক্ষকতা করেই তার সংসার চলে।কষ্টের মাঝেও তিনি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ।

মুরাদ বাঁকা দৃষ্টিতে চারপাশে নজর বুলাতে থাকে। জিভ দিয়ে দাঁতের এক পাশ থেকে আরেক পাশে ঘষতে ঘষতে পুরো জায়গাটা পর্যবেক্ষণ করছিল।
সেদিন মায়ার মা বাসায় ছিলেন না। তিনি একজন স্কুল শিক্ষিকা। স্কুলে গেলে ছোট মেয়েটাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন। 
বাড়ির বাইরে এসেই সে তার লোকজনকে বলে—মায়ার সব বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে যেনো রাতের মধ্যেই তাকে জানানো হয়।

মুরাদের বাবা মেম্বার হওয়ার দরুণ মুরাদ সবসময়ই ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকে। যেনো তার বাবার রেপুটেশন ঠিক থাকে।
কিন্তু এই মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কুৎসিত, বিকৃত মানসিকতার মানুষ—যেটা সহজে কেউ ধরতে পারে না।

মায়া ছিল খুব শান্ত, ভদ্র আর মিতভাষী একটা মেয়ে। এই অল্প বয়সেই সে অনেক কষ্টের মুখোমুখি হয়েছে। তার মা সিঙ্গেল মাদার হওয়ায় সমাজের অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে তাদের।
তবুও তারা কখনো ভেঙে পড়েনি। যারা খারাপ কথা বলত, তাদেরকে তারা নিজেদের কাজ আর দৃঢ়তায় জবাব দিয়েছে। ধীরে ধীরে অনেকেই তাদের নিয়ে কথা বলাও বন্ধ করে দেয়।

মুরাদের আদেশে সেদিন রাতের মধ্যেই মায়ার সব খোঁজ-খবর এনে মুরাদকে জানানো হয়। আরিফ যে মায়াকে পছন্দ করে, সেটাও সে জানতে পারে।

সব শুনে মুরাদের মুখে এক শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে। সে বিড়বিড় করে বলে—
“হায়রে ভালোবাসা… আমায় করলি নৈরাশা।

 আর লাভ নেই ভালোবেসে… পাখির উপর যে এই মুরাদের নজর পড়ে গেছে।”।

—————

আরিফ মায়ার পরিবারকে নিজের পরিবার মনে করত। সে ইতিমধ্যেই তার বাবা-মাকে মায়ার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পাঠিয়েছিল।
তখন আরিফের বয়স ছিল পঁচিশ আর জারিফের আঠারো।

 মায়ার মা একজন শিক্ষিত মানুষ হওয়ায় চেয়েছিলেন, মেয়ে আগে পড়াশোনা শেষ করে স্বাবলম্বী হোক। তার বিশ্বাস ছিল,একজন শিক্ষিত মা-ই পারে শিক্ষিত সন্তান গড়তে।

আরিফের পরিবারও তাদের এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানায়। তারা খুশি হয়েছিল এমন চিন্তাভাবনা দেখে এবং বলেছিল, বিয়ের পর তারা মায়াকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দেবে।

মায়ার মা তখন বলেছিলেন, মেট্রিকের পর আকদ করে রাখবেন, আর কলেজ পাশ করলে বিয়ে দিয়ে মেয়েকে তুলে দেবেন।
দুই পরিবারের সম্মতিতে আরিফ আর মায়াও এতে রাজি হয়।
তাই মাঝে মাঝে আরিফ এসে মায়াকে দেখে যেতো, যা অনেকের নজরেও পড়ে। সেই কারণে আরিফের পরিবার মায়ার জন্য আংটি পড়িয়ে রেখে দেয়, যাতে কেউ তাদের নিয়ে খারাপ মন্তব্য করতে না পারে।

—————

একদিন সন্ধ্যায় মায়ার প্রিয় বান্ধবী নাফিসা তাকে তাদের বাড়ির একটি অনুষ্ঠানের কথা বলে ডেকে নিয়ে যায়। সোজা রাস্তা ছেড়ে যখন জঙ্গলের পথ ধরে হাঁটা শুরু করল, মায়া একটু থেমে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এই রাস্তা দিয়ে কেন এলি নাফিসা? আমার খুব ভয় করছে…”

নাফিসা হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“আরে, দেরি হয়ে যাচ্ছে। মেহমানরা সব চলে এসেছে। তাই তাড়াতাড়ি পৌঁছানোর জন্য এই রাস্তা ধরেছি।”।

সরল বিশ্বাসে মায়া আর কিছু বলল না। ধীরে ধীরে পা ফেলতে ফেলতে সামনে এগোতে লাগল। কিন্তু কিছুদূর যেতেই হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল—সামনে মুরাদ তার গাড়ি আর কয়েকজন লোক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দৃশ্যটা দেখেই মায়া থমকে গেল। কয়েক কদম পিছিয়ে এলো। ভয়ে তার শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। তাড়াতাড়ি নাফিসার হাত শক্ত করে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
“আমি… আমি সামনে যাবো না, নাফিসা। প্লিজ… তুই চলে যা।

নাফিসা ভয় পাওয়ার ভান করে সামনে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর হঠাৎই খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিটা অস্বাভাবিক… ভীষণ ভয়ংকর। যেনো তার ভেতরের অন্য একটা চেহারা বেরিয়ে এসেছে।

মায়া হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। নাফিসার এই চাহনি, এই রহস্যময় হাসির মানে সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। ভয় আরও বেড়ে গেল। ধীরে ধীরে সে পিছিয়ে যেতে লাগল।

হঠাৎই নাফিসা ঝট করে তার হাত চেপে ধরল।
“কোথায় যাচ্ছিস, শালী?”

মায়ার গলা কেঁপে উঠল,
“তু… তুই এমন কেন করছিস?”

নাফিসার চোখে তখন জ্বলছে হিংসা। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“তোর সাথে আর কেমন করবো বল? আমি মুরাদকে ভালোবাসি… আর সে কী করল? তোকে পছন্দ করল! তোর থেকে আমি কিসে কম, বল?”

মায়ার চোখ ভিজে উঠল। অসহায় গলায় বলল,
“কিন্তু নাফিসা… তুই তো জানিস, আমি আরিফকে ভালোবাসি। আমাদের তো বিয়েও ঠিক হয়ে আছে…”

“তো…!”

“তো মানে… তাহলে এসবের মানে কী!!”

নাফিসা ঠান্ডা গলায় বলল,
“কিছুই না। আমার কোনো ইচ্ছে ছিল না… কিন্তু তোর মা আমার মুরাদকে বকা খাইয়েছে তার বাবার থেকে।তোদের বাসায় তো একটু গিয়েছিল… তাতে কী এমন হয়েছিল?”

মায়া কাঁপা গলায় আবার বলল,
“তুই জানিস না নাফিসা… উনি ভালো লোক নয়।”

“চুপ কর তুই!”—নাফিসা চেঁচিয়ে উঠল, “আমার মুরাদের মতো ছেলে আর হয় না।”

মায়া অসহায় গলায় বলল,
“অনেক বড় ভুল করছিস তুই…”

নাফিসা ঠোঁট শক্ত করে বলল,
“আমার কিসে ভালো আর কিসে খারাপ সেটা আমি ভালো বুঝি।”

মায়া চুপ করে গেল…
কিন্তু সত্যিটা অন্যরকম—

মুরাদ নাফিসাকে দাবার গুটি বানিয়েছে।
বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে দিনের পর দিন তাকে ভোগ করে আসছে।
সেদিনও, নাফিসার কাছে ভালো সাজার জন্য এমনভাবে মায়া আর তার মাকে নিয়ে কথা বলেছিল—
যেনো মুরাদের কোনো দোষই নেই…
সে একেবারে নিষ্পাপ।

মুরাদের কথা শুনে তেতে উঠে নাফিসা।
প্রতিজ্ঞা করে—ওকে শাস্তি দেবে নিজেই।
তখনই মুরাদ মুচকি হেসে বলল,

“তোমার কিছু করতে হবে না, ডার্লিং… তুমি শুধু ওকে আমার কাছে আনার ব্যবস্থা করে দাও। আমি শুধু একটু ভয় দেখাব।”

—————

একদিন মুরাদ তার দলের এক ছেলেকে দিয়ে মায়াকে দেখে পাঠায়। মায়া না করে দেয়।
পরের দিন আবারও তাকে পাঠানো হয়। সেদিনও মায়া না করে দেয়। পরে মায়া বিষয়টি তার মাকে জানালে তিনি মেম্বারের কাছে অভিযোগ করেন, যার ফলে মুরাদকে অনেক বকাঝকা শুনতে হয়। এই ঘটনাই মুরাদের মধ্যে মায়ার প্রতি চরম জেদ তৈরি করে।

আর এই সিম্পল বিষয়টা মুরাদ কোনোভাবেই হজম করতে পারেনি। তাই নাফিসাকে ব্যবহার করে সে পরিকল্পনা সাজায়—মায়াকে তুলে নেওয়ার জন্য পুরো ফাঁদটাই আগে থেকে তৈরি ছিল।

মায়া কাঁদতে কাঁদতে নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল,
“প্লিজ এমন করিস না আমার সাথে… তুই আগে আমার সব কথা শোন।”

নাফিসা মুখ শক্ত করে বলল,
“আমার আর কিছু শোনার নেই।”

মায়া আর্তনাদ করে একসময় নাফিসার পায়ে পড়ে গেল,
“প্লিজ… আমাকে এভাবে শেষ করিস না…”

কিন্তু নাফিসার চোখে কোনো নরম ভাব ছিল না।
মায়া কোনোভাবে সাহস জোগাড় করে উঠে দাঁড়াতেই—নাফিসা তাকে ধাক্কা দিয়ে উল্টো দিকে ঠেলে দেয়।

ঠিক সেই মুহূর্তেই মুরাদের লোকজন সামনে এসে পথ আটকে ফেলে। চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে মায়াকে।

ভয়ে মায়া কুঁকড়ে যায়। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছে। তার মাকে মনে করছে, আরিফকে মনে করছে—এই বিপদ থেকে কেউ কি তাকে উদ্ধার করতে পারবে না।

মুরাদ বিশ্রী হাসি হেসে এগিয়ে আসে।

আর ঘাড় বাঁকিয়ে নাফিসার দিকে ইশারা দেয় চলে যেতে। নাফিসা মিষ্টি হেসে চলে যায়।

সারারাত ধরে অসহায় মায়ার উপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। শেষ রাতে প্রচুর রক্তক্ষরণে মায়া মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

মায়ার মা মেয়ের খোঁজ না পেয়ে দিশেহারা হয়ে চারদিকে খুঁজতে থাকেন। সন্দেহটা ধীরে ধীরে গিয়ে পড়ে মুরাদের দিকে। তিনি খোঁজ নিতে সোজা মুরাদের পথেই চলে যান।

সেখানে গিয়ে মায়ার মায়ের অসহায় অবস্থা দেখে মুরাদ কটাক্ষের হাসি হাসে। তারপর ঠান্ডা গলায় বলে—
“কি শিক্ষিকা সাহেবা, জাতির জননী! আমার নামে বিচার দিয়েছিলে তাই না? কেমন লাগছে এখন মেয়ের খোঁজ না পেয়ে?”

একটু থেমে সে আরও নিচু স্বরে বলে,
“মেয়েকে আর সহজে পাবেন না।”

এই কথা শুনে যেন মায়ার মায়ের মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে। কাঁপা গলায় তিনি বললেন,
“কি… কি বলছিস তুই, জানোয়ার…”

মুরাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“ঠিকই শুনেছিস বুড়ি। তোর মেয়ে নেই। মরে গেছে। অবশ্য আমরাই মেরে ফেলেছি।”

বলেই সে জোরে হেসে উঠল।

সেই মুহূর্তে মায়ার মা গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, বুক চাপড়ে কাঁদতে থাকেন।
“খোদা, এটা কী করলে তুমি… আমার কলিজার টুকরার সাথে এমন কেন হলো? আমার তো স্বামীও নেই… দুই মেয়ে নিয়ে কোনোভাবে টিকে ছিলাম।”

আকাশ গর্জে উঠে, আর ঝরঝর করে বৃষ্টি নেমে আসে ধরণীতে।
বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল তার নিজের অশ্রুকণা। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তার ছোট মেয়েটি, নিঃশব্দে কাঁদছে

এক মায়ের সেই হৃদয়বিদারক কান্নায় যেন আকাশও কেঁদে উঠেছিল। মুহূর্তেই গর্জে ওঠে আকাশ, আর ঝরঝর করে বৃষ্টি নেমে আসে ধরণীতে।

বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল তার নিজের অশ্রুকণা। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তার ছোট মেয়েটি, নিঃশব্দে কাঁদছে।

কান্না থামিয়ে মায়ার মা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন—
“কেন করলি তুই এটা? আমার মেয়ে তোর কী ক্ষতি করেছিল?”

মুরাদ বিকৃত হাসি দিয়ে বলল—
“মেয়ে তো কিছুই করেনি। আমি তো তাকে ভালোভাবেই আদর করতে চেয়েছিলাম। আদর করে ছেড়েও দিতাম। কিন্তু সে সেটা সহ্য করতে পারেনি। আমার মুখে থুতু দিয়েছে। তাই আর নরম আদর না, একটু কঠিন করে দিয়েছি। যেটা সে নিতে পারেনি। আমরা পাঁচজন ছিলাম, এখন বল—আমাদের কী দোষ?”

এমন পৈশাচিক কথা শুনে মায়ার মা যেন স্থির হয়ে গেলেন। শরীরটা ভারী হয়ে আসছে, নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলছেন। কথাগুলো কল্পনা করতেই বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। চোখের সামনে ভেসে উঠছে ছোট মেয়েটার অসহায় মুখ।

কত স্বপ্ন ছিল—মেয়েকে নিয়ে, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে। সবকিছু যেন এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

তিনি কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললেন—
“তোকে আমি ছাড়ব না… নরপিশাচ…”

“ওহ্ রিয়েলি… কী করবি তুই?”

মুরাদ ঠান্ডা হাসি দিয়ে বলল,
“পুলিশ ডাকবি? ওই দেখ, পুলিশ তো তোর পিছনেই।”

কান্নায় ভেঙে পড়া শরীর, লালচে চোখ নিয়ে কামরুন্নেছা পিছনে ফিরতেই দেখলেন—পুলিশ কমিশনারের এসপি জনাব সাদেকুর হাসান ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন।
তার দৃষ্টি ছিল কঠিন, চারপাশে এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।

মুরাদ কিছুটা থেমে গেলেও মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি ছিল। কামরুন্নেসা যা বুঝার বুঝে গেলো।

 কাঁপা গলায় শুধু বললেন,
“আমি… আমার মেয়ের লাশটা অন্তত দিয়ে দিন…”

মুরাদ ঠান্ডা গলায় বলল,
“তোমার বাড়ির পেছনে একটা পরিত্যক্ত জায়গা আছে—সেখানে পাবে। আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে তুমিও আর তোমার ছোট মেয়ে কেউই নিরাপদ থাকবে না।”

এই হুমকিতে কামরুন্নেসা ভেঙে পড়লেন। মেয়ের লাশ ফিরে পাওয়ার তাগিদে তিনি নীরবে সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হলেন।
তার ভেতরে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—
ন্যায়বিচার কি সত্যিই আছে, নাকি সবকিছুই হারিয়ে গেছে?

কিন্তু আল্লাহর দরবারে হাত তুলে তিনি ভেঙে পড়লেন। ঝরঝর বৃষ্টির মধ্যে দুই হাত আকাশের দিকে তুলে কাঁপা কণ্ঠে বললেন—

“ও আমার আল্লাহ… তুমি তো সব দেখছো… তুমি তো জানো সবকিছু।গলা আটকে আসছিল, চোখের পানি আর বৃষ্টির পানি এক হয়ে যাচ্ছিল। আমি দুর্বল, আমি কিছুই করতে পারছি না।কিন্তু একজন মায়ের কান্না তুমি ফিরিয়ে দিও না।”
তিনি বুক চাপড়ে কেঁদে আবার বললেন—
“হে আরশের মালিক।আমার নিষ্পাপ সন্তানের সাথে যারা এই নির্মমতা করেছে, তাদের বিচার আমি তোমার হাতেই রেখে গেলাম।আমি আর কিছু চাই না… শুধু ন্যায় চাই।”

কামরুন্নেসা ভারী শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে সেই পরিত্যক্ত জায়গার দিকে এগোতে থাকেন। প্রতিটি পা ফেলাই যেন তার কাছে পাহাড়সম ভারী লাগছিল। বুকের ভেতর শুধু একটাই শব্দ—মায়া।

জায়গাটায় পৌঁছে চারপাশটা দেখে তিনি থমকে যান। নিস্তব্ধ, ভাঙাচোরা পরিবেশে ভয় আর শোক মিলেমিশে এক অদ্ভুত ভারী বাতাস তৈরি করেছে।
তিনি কাঁপা হাতে এগিয়ে যান… আর তখনই তার চোখ আটকে যায় এক জায়গায়।
সবকিছু যেন মুহূর্তে থমকে যায়।
তিনি হাঁটু ভেঙে পড়ে যান মাটিতে। মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হয় না, শুধু চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।

“মায়া…”—শুধু এই একটা নামই কাঁপা গলায় উচ্চারণ হয়।

তার মায়া আর নেই—এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই তিনি আবারও গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলেন। বুকটা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়লেন, কান্নায় ভেঙে চারপাশটাকে ভারী করে তুললেন। মনে হচ্ছিল, সেই আর্তনাদ আকাশ ছুঁয়ে আবার মাটিতে ফিরে আসছে।

শুধু আরিফের পরিবারকে জানানো হয়, এবং লাশ দেখানো হয়। সব শুনে তারা প্রথমে যেন বিশ্বাসই করতে পারেন না—কিছুক্ষণ সম্পূর্ণ বাকহীন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

আরিফের মা লাশ দেখেই এক ঝটকায় মাটিতে বসে পড়েন। তারপর হঠাৎ করে চিৎকার করে ওঠেন,
“না… না এটা আমার ছমায়া না… এটা হতে পারে না…”

লাশটি দেখেই আরিফ একেবারে ভেঙে পড়ে। মুহূর্তেই তার শরীর অসাড় হয়ে যায়, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সবাই দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসকেরা অনেক চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায় না—সেই শোকই তার জীবন থামিয়ে দেয়।

একই পরিবারের দুইটি মৃত্যুতে চারপাশে নেমে আসে গভীর শোক। কেউই ঠিকভাবে কিছু মেনে নিতে পারে না।

পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আরিফের দাফন করা হয় তাদের পারিবারিক কবরস্থানে—নিজ বাড়ির পাশেই। সেখানে নীরবতা আর কান্না ছাড়া আর কিছুই থাকে

দুইটি কবর পাশাপাশি। একটি আরিফের, আরেকটি মায়ার—যেটা এখনো অনেকেই নিশ্চিতভাবে জানে না। তবে চারপাশে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ বুঝতে পারে না, কী এমন ঘটেছিল যে মায়াদের পরিবার রাতের অন্ধকারে এলাকা ছেড়ে চলে গেল, আর আরিফের মৃত্যু এতটা হঠাৎ করে ঘটে গেল।

এই ঘটনার পর আরিফের বাবা-মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কিছুদিনের মধ্যেই তারা এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। পরে জারিফকে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, আর সেখানেই এক নতুন জীবনের মধ্যে অভ্রের সঙ্গে তার দেখা হয়।

এসব কথা মনে পড়তেই জারিফের চোখ ভিজে ওঠে। দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করে—যারা এই দুইটি পরিবারকে আজ এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যারা তাদের কলিজার টুকরোদের কেড়ে নিয়েছে, তাদেরকে সে ছাড়বে না। 

তার ভেতরে জমে থাকা কষ্ট ধীরে ধীরে রূপ নেয় কঠিন প্রতিজ্ঞায়। সে নিজেই ঠিক করে, এবার ন্যায়ের হিসাব সে নিজের হাতেই নেবে—যে অন্যায়ের কোনো ভাষা নেই, তার উত্তরও সে কঠোরভাবে দেবে।
কেউ দেখার আগেই সাথে সাথেই সে চোখের অশ্রু মুছে ফেলে। মুখটা আবার শক্ত করে নেয়, যেন কিছুই হয়নি। ভেতরের কষ্টটা লুকিয়ে বাইরে শুধু একটাই ভাব—নীরব, কঠিন প্রতিজ্ঞা।

দূর থেকে বিষয়টি দেখে সাফা। তার ভেতরটা খারাপ লাগায় ভরে যায়। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে, বুঝতে চেষ্টা করে—এই কঠিন, পাথরের মতো মানুষটা হঠাৎ কেন কাঁদল।

তার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে,
“এতটা শক্ত মানুষ… তাহলে কি ভেতরে কোনো ভাঙন লুকিয়ে আছে?”

সে আর এগোয় না। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে দূর থেকেই তাকিয়ে থাকে। ভেতরে অজানা একটা কষ্ট জমে ওঠে—কেন জানি সেই শক্ত মানুষটার চোখের ভেজা মুহূর্তটা তার মন থেকে সরছে না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp