পবনপত্র - পর্ব ১৪ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          ঘরে ঢুকে বাদল দরজাটা ভিড়িয়ে দিলো। তার কলেজের পোশাক ঘামে ভিজে গেছে। আজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার শেষ দিন ছিলো। কাল থেকে পুরোদমে ক্লাস শুরু। যখন খুশি, ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসা যাবে না, লাইব্রেরিতে যাওয়া যাবে না। আজই সব স্বেচ্ছাচারিতার শেষ দিন! আর আজকেই মানুষটা এলো না। লাইব্রেরি থেকে শুরু করে তাকে সব জায়গায় খুঁজেছে বাদল। উপলব্ধি করেছে, মেয়েটার ব্যাপারে সে তেমন কিছুই জানে না। নামটা পর্যন্ত জানা নেই। ২য় বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে—এতোটুকুই জানা আছে। তবে তার সম্বন্ধে খুঁটিনাটি সব জানতে ইচ্ছে করছে কেন, এটা জানা নেই!

খাটের নিচে ট্র্যাঙ্ক রাখা। সেখান থেকে বাদল পরনের কাপড়-চোপড় বের করে নিলো। রাশেদকে উদ্দেশ্য করে বললো, “চল, বাহির থেকে ঘুরে আসি।”

রাশেদ দুই হাত জোড় করে বলে, “ক্ষমা কর! ভুলেও কখনো তোর সাথে বের হবো না। কখন কোন মেয়ের খাতা ধরে টানাটানি করবি, কখন কাকে ধাক্কা দিবি! আমি আর কোনো ঝুঁকি নিচ্ছি না।”

আমজাদ ভ্রু কুঁচকে বলে, “তাছাড়া আজকে বের হওয়ার কথা তো ছিলো না। সবাই মিলে চড়ুইভাতির প্ল্যান করে রাখলাম। টিউশন থেকে এসে ছাদে যাস। আমরা সব ঠিকঠাক করে রাখবো। তুই রান্না করবি।”

বাদল মাথা তুলে তাকালো, মাত্রাতিরিক্ত বিস্ময় প্রকাশ করে বললো, “আমি রান্না করবো? আর মানুষ পাইলেন না আপনি?”

“এটা তোর সৌভাগ্য যে আমরা তোকে ঠিক করেছি রান্নার জন্য! কোনো কাজ না করে এমনি বসে বসে গিলতে ভালো লাগবে তোর? খুব গর্ব হবে?”

“হ্যাঁ। আপনি রান্না করতে দেয়ায় গর্বে মরে যাচ্ছি আমি! অন্যকিছু করতে দেন। রান্না বাদে।”

“আহা শোন, আমাদের মধ্যে আর কেউ সেরকম রাঁধতে পারে না—”

“আমিও পারি না।”

“মিথ্যা বলিস কেন? কী সমস্যা তোর?”

“খালা থাকতে কেন আমি ঐ কাজ করতে যাবো? মেয়ে মানুষের কাজ আমাকে দিয়ে হবে না।”

আমজাদ রাশেদের দিকে এক ঝলক তাকায়। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বাদলকে জিজ্ঞেস করে, “তাহলে তুই রান্না করবি না? এটাই ফাইনাল?”

বাদল মাথা নাড়ে, “হুম।”

“রাশেদ? কী করা যায় এখন?”

রাশেদ নিজের কাজ করতে করতেই বলে, “কী আর করবেন? খালাকে বলেন। কালকে থেকে সবাই ব্যস্ত হয়ে যাবে।”

৪টা বাজতে আরও মিনিট দশেক বাকি। বাদল রবিউল স্যারের বাইরের ঘরটাতে উঁকি দিলো। কেউ আসেনি এখনও। বাম সারির তৃতীয় বেঞ্চের পাশে এসে দাঁড়ালো সে। মেয়েটা আজ কলেজে আসেনি, তাই শাস্তিস্বরূপ আবারও তার বেঞ্চ ভিজিয়ে দেয়া হবে! বোতলের মুখ খুলে বাদল টেবিল আর বেঞ্চে পানি ঢেলে দিলো। তারপর খুব প্রসন্ন চিত্তে বেরিয়ে গেলো।
মেয়েটা কি এখনও টের পায়নি তার বেঞ্চে পানি কে ফেলে?
পায়ের আওয়াজ শুনে ছেলেটা তাড়াতাড়ি প্রাচীরের আরেকপাশে গিয়ে দাঁড়ায়। রবিউল স্যার টের পেলে ঝামেলা হয়ে যাবে। এমনিতেও বাদল পড়ায় তেমন ভালো নয়। আর কোনো ভুল বা অপরাধ ধরা পড়লে স্যার কোনোমতেই মাফ করবেন না।

সাইকেলে উঠে বসার পর মনে হলো, ক্লাস তো কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে। একটু অপেক্ষা করাই যায়।
বাদল সাইকেল নিয়ে রাস্তার অন্যপাশে গিয়ে দাঁড়ালো। আজকে ঝালমুড়িওয়ালা আসেনি। সে পাশের গাছটার ছায়ায় দাঁড়ায়। দু'হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙে। মেয়েদের একটা দল উচ্চস্বরে হাসাহাসি করতে করতে ক্লাসে ঢুকলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগের ব্যাচের মেয়েরা দলে দলে আসতে শুরু করেছে। যতোবারই ঐ বাড়ির সামনে কোনো রিকশা থামলো, ছেলেটা উন্মুখ হয়ে চেয়ে রইলো। রাস্তায় যানবাহন কম। পথচারী বেশি। বাদলের আর কোনোদিকে মন নেই। সে রাস্তার দিকেই তাকিয়ে থাকে।

কিছু সময় পর ক্লাসে আসা ছাত্রীদের সংখ্যা কমে গেলো। মেয়েটা এতো দেরি করছে কেন? ছেলেটা ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এখনও। আশেপাশের কারও কাছে সময়টা জেনে নেয়া যায় না? বাদল গাছের ছায়া থেকে কিছুদূর সরে এসে জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দেয়ার চেষ্টা করলো। জানালার একটা কপাট লাগানো, কিছু দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটা এসেছে কি?

এভাবে রোদে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কঠিন। বাদল আবার গাছতলায় যায়। গাছের গুঁড়ির উপর উঠে হেলান দিয়ে নখ খুঁটতে শুরু করে। রিকশা বা সাইকেলের টুং টাং শব্দ শুনলেই তার চঞ্চল ঐ চোখজোড়া বারবার সড়কের পানে ছুটে যায়।
তার একবারও মনে হলো না, নিজের মূল্যবান সময়টুকু সে অপাত্রে খরচ করছে। সময়ের থেকে অপাত্রই যেন মূল্যবান হয়ে উঠেছে! এতো অপেক্ষা, অস্থিরতা যে বিফলে যেতে পারে, ছেলেটা তা বিশ্বাস করতে চাইলো না। তার কেবল মনে হলো, অনেক বছর ধরে সে এই গাছতলায় দাঁড়িয়ে আছে। এমন একজন মানুষের জন্য, যাকে সে পুরোপুরি পছন্দ করে না। আবার অপছন্দও করতে পারছে না। তবু যেন ঐ একটা মানুষের কাছাকাছি থাকার আশায়, সে দিন রাত এভাবে দাঁড়িয়েই কাটিয়ে দিতে পারবে। অদ্ভুত ব্যাপার!

“বাদল?”

সে চমকে উঠে আনিসের দিকে তাকায়। আনিস প্রশ্ন করলো, “কী রে, রাশেদ আসবে না?”

বাদল উত্তর দেয় না। বিস্ময় নিয়ে চারপাশে একবার চোখ বোলায়। পড়ন্ত বিকেলের মৃদু সূর্যালোক ছড়িয়ে রয়েছে শহরতলির এই সীমানায়, অনেক বেলা হয়ে গেছে। সে মাথা ঘুরিয়ে ব্যস্তভাবে আনিসকে বলে, “কয়টা বাজে?”

“আর চার-পাঁচ মিনিট বাকি আছে পাঁচটা বাজতে।”

এক ঘণ্টা কেটে গেছে! ছেলেটা আনমনে ডানদিকে এগিয়ে যায়। কোনো সহৃদয়বান ব্যক্তি এতোক্ষণে জানালার কপাট সরিয়ে দিয়েছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তৃতীয় বেঞ্চটা ফাঁকা।
বাদল অবিশ্বাস নিয়ে চেয়ে রইলো, তারপরই মুখ শক্ত করে গাছতলায় ফিরে এলো। সাইকেলের হ্যান্ডেল চেপে ধরে সামনে এগিয়ে গেলো। আনিসের দিকে মুখ তুলে তাকালো না, ক্ষীণ স্বরে বললো, “আজকে ক্লাস করবো না। ভালো লাগছে না।”

ছেলেটা একটু অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কলেজের হোস্টেল এখান থেকে বেশি দূরে না। তবু কষ্ট করে এসে ক্লাস না করেই চলে যাওয়ার কোনো উপযুক্ত কারণ আনিস দেখলো না।

মৌমিতা ঘুম থেকে উঠেছে আসরের আজানের কিছুক্ষণ আগে। আজ সকাল থেকেই তার মাথাটা বেশ ঝিমঝিম করছে। সেজন্য সে আজ বাইরে কোথাও বের হয়নি। আরেকটা কারণ আছে অবশ্য। গতরাতে একটা বই পড়তে শুরু করেছিলো। ওটা শেষ না করে কোনো কাজে মন দেওয়া সম্ভব হতো না। তবে বইটা শেষ করেও সে বিশেষ শান্তি পায়নি।

মৌমিতা হয়তো তামান্নাকে কোনোকালে বলেছিলো, বিয়োগান্তক গল্পগুলো তার ভালো লাগে। তারপর থেকেই তামান্না যতো সব কঠিন দুঃখের বই খুঁজে খুঁজে এনে দিতে লাগলো! সে নিজেও এধরনের বইগুলো পছন্দ করে। স্বাভাবিক। বেশি সুখে থাকলেও জীবনটাকে একঘেয়ে মনে হয়। যেখানে প্রতিটা দিন কাটে চেনা স্বাচ্ছন্দ্যে, বিষাদ সেখানে হীরের মতোন দামী হয়ে ওঠে। তখন মানুষ টাকা খরচ করে দুঃখ কেনে। তামান্নার অবস্থা এমনই!
তার দেয়া বইটা শেষ করার পর মৌমিতার মাথার হালচাল আরও খারাপ হয়ে গেছে। কাল্পনিক চরিত্রের জন্য শোক করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, টের পায়নি সে। টিউশন ক্লাসের সময়ও পেরিয়ে গেছে।
মার্জিয়া কখনোই কাজের সময় তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলবে না। যখন কোনো কারণ থাকবে না, সে কেবল তখনই ঘুমন্ত আপার কানের কাছে এসে গবেষণা করবে, কোন আসবাবটি সবচেয়ে বিরক্তিকর বাদ্যযন্ত্র হওয়ার উপযুক্ত।

জায়নামাজটা খাটের একপ্রান্তে রেখে মৌমিতা ঘরের বাইরে আসে। রাবেয়া অনেকক্ষণ আগেই আঙিনা থেকে শুকনো কাপড়গুলো তুলে আনতে বলেছিলেন। মার্জিয়া কাজটা করেনি। সে রান্নাঘরে গিয়ে আবার কোনো যুগান্তকারী অখাদ্য আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। কয়েকদিন হলো তার মাথায় রাঁধুনী হওয়ার ভূত চেপেছে। এটা সে স্পষ্টভাবে কাউকে বলেনি, তার আপা অনুমান করে নিয়েছে।

বিকেলের নাস্তার পর মৌমিতা বই-খাতা নিয়ে বসে পড়লো। মার্জিয়া অনেকক্ষণ ধরে ঘ্যানঘ্যান করেছে, তামান্নাকে গল্পের বইগুলো যেন এতো তাড়াতাড়ি ফেরত না দেওয়া হয়। কারণ সে এখনও কোনো গল্প শেষ করতে পারেনি। অনেকবার আশ্বাস দেওয়ার পর অবশেষে মার্জিয়া ফাঁকিবাজি ছেড়ে স্কুলের পড়ায় মনোযোগ দিয়েছে। বিছানার এক কোণে বসে সে গুনগুন করে কিছু একটা পড়ছিলো। হঠাৎ খাটের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে মৌমিতার টেবিলের কাছে চলে এলো।

“আপামণি!”

মৌমিতা ঘুরলো, সরু চোখে মার্জিয়াকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে বললো, “ওমা! আদর একেবারে উথলে পড়ছে! কী চাস তুই?”

“তোমার ক্যালকুলেটরটা একটু দাও তো, অঙ্ক করতে হবে।”

“তোর আছে না?”

“আমারটার ব্যাটারি উড়ে গেছে।”

মৌমিতা নিজের খাতার দিকে তাকায়, “জুনায়েদ ভাইকে দেখা, ঠিক করে দিবে।”

মার্জিয়া একটু রাগ দেখালো, যান্ত্রিক স্বরে বললো, “মামাকে দেখিয়েছি। ঠিক করতে পারেনি।”

“জুনায়েদ ভাইকে বলে দ্যাখ—”

“তুমি ক্যালকুলেটর দিবা না, তাই তো? সেটা সোজাসুজি বললেই হয়।”

মৌমিতা অবাক হয়ে বোনের দিকে তাকায়, মার্জিয়া ততোক্ষণে হামাগুড়ি দিয়ে আবার বিছানার অপরপ্রান্তে চলে গেছে। তার দিকে ক্যালকুলেটর এগিয়ে দেয় মৌমিতা, “এই যে, নে।”

মার্জিয়া বই খুলে বসে পড়ে, অবাঞ্ছিত ক্ষোভ দেখিয়ে তারস্বরে বলে, “লাগবে না।”

ঘরে বৈদ্যুতিক পাখার খটখট শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। মৌমিতা হাতে কলম ধরে আছে ঠিকই, তবে লিখতে পারছে না কিছু। বইখাতার স্তূপ হতে সে তামান্নার গণিত খাতাটা সাবধানে টেনে বের করলো। মলাটের উপর আঙুল বুলিয়ে চুপ করে বসে রইলো। বাদল নামের ছেলেটা তার চিন্তার জগৎকে বেশ ভালোভাবেই দখল করে ফেলেছে। ওরকম অসভ্য মানুষের উপর এমন অপ্রয়োজনীয় আকর্ষণ জন্মানোর কোনো কারণ নেই। অথচ তার সামান্য ছোঁয়াটুকুই এতোটা প্রভাবিত করেছে যে মৌমিতা এখন চাইছে, তামান্না আগামীকালও কলেজে না আসুক! খাতাটা আরও কয়েক ঘণ্টা তার কাছেই থেকে যাক।

—————

আজ তেমন রোদ নেই। আকাশে সাদা মেঘ ভেসে ভেসে যাচ্ছে। সুন্দর একটা সকাল।
মৌমিতা ধীরপায়ে ক্লাসে ঢুকলো। উপস্থিতি ভালোই। বসার জন্য জায়গা খুঁজতে গিয়ে সে দেখলো, তামান্না কলেজে এসেছে। মৌমিতাকে দেখতেই মেয়েটা হাত নাড়লো, উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো, “মৌ? এখানে জায়গা রেখেছি।”

দেয়ালের দিকের আসনে বসলো মৌমিতা, পাশেরজনকে উদ্দেশ্য করে বললো, “কতো বছর পর দেখলাম তোকে।”

তামান্না খিলখিল করে হাসে, “পড়াশোনা ভালো লাগে না। আসতেও ইচ্ছা করে না। তোর সাথে দেখা হয়, তাই আসি। কালকে এসেছিলাম, কিন্তু তুই আসিসনি।”

মৌমিতাও হাসলো, একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে। ব্যাগটা কোলে নিয়ে তামান্নার খাতা বের করলো, “স্যার দিলেন কালকে। তুই তো টানা কয়েকদিন ধরে যাচ্ছিস না।”

“আর বলিস না! ওখানে তো আরও বিরক্ত লাগে। খালি ঘুম ধরে।”

“তোর বই দুটো আনতে পারিনি। মার্জিয়ার এখনও পড়া হয়নি, তাই আনতেই দিলো না।”

“আরে, সমস্যা নেই। পড়ুক আস্তে ধীরে।” একটা ছোট শ্বাস ফেললো তামান্না, “মার্জিয়াও বই পড়ে?”

“হ্যাঁ।”

“একা একা থাকতে খুবই খারাপ লাগে। এখানে আমিই বোধহয় একমাত্র মানুষ, যার কোনো ভাই-বোন নাই। আশেপাশে যাকেই দেখি, কেউই একা না, কয়েকটা করে ভাই-বোন আছে সবারই।”

কথা বলতে বলতে তামান্নার গলা একটু ধরে আসে। বিষয়টা গুরুতর নয়, তবুও সে গম্ভীর হয়ে গেলো। মৌমিতা চুপ করে রইলো। কেউ হঠাৎ করে আবেগপ্রবণ হয়ে গেলে সে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না। এখন হয়তো একটু সান্ত্বনা দেয়া উচিত, কিংবা ভাই-বোন থাকার অসুবিধা নিয়ে একটা ছোটখাটো বক্তৃতাও দেয়া যেতে পারে। কিন্তু মেয়েটা নিশ্চুপ হয়ে থাকে।

কথা না বললে ব্যাপারটা খুব দৃষ্টিকটু দেখায়। তবু কিছু বলা হয় না। বাইরের মানুষেরা বড়জোর তাকে অসামাজিক ভাবে, আড়ালে বিচার বসায়, দু' চারটে কটু কথা বলে হাসাহাসি করে, তারপর ভুলে যায়। কিন্তু অসামাজিক মানুষটার ভেতরে না বলা কথার পাহাড় আর অস্বস্তি জমে থাকে। ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে অপরাধবোধে।

টিফিনের বেল দেওয়া মাত্রই তামান্না ক্লাসের বাইরে চলে গেছে। মৌমিতা গালে হাত দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রয়েছে। জানালার অপরপাশে আরেকটা ভবন। মাঝখানে বড় একটা গাছ। বাতাসে গাছের কচি ডালপালাগুলো দুলছে। সেদিকে আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকলেও, বেঞ্চে অন্যকারো উপস্থিতি টের পেয়ে মৌমিতা মাথা ঘোরায়।
সুরাইয়া ভ্রু নাচিয়ে বলে, “কী অবস্থা?”

মৌমিতা সোজা হয়ে বসলো, “এই তো—”

“আচ্ছা মৌ, তোর পুরো নাম মৌমিতা খন্দকার না?”

“হ্যাঁ।”

সুরাইয়ার মুখটা হুট করে বেশ উজ্জ্বল দেখায়, যেন কোনো বিষয় নিয়ে খুব উৎসাহ পেয়ে গেছে। সে মৌমিতার দিকে একটু সরে আসে, নিচু গলায় বলে, “ফার্স্ট ইয়ারের কয়েকটা বেয়াদব ছেলে আছে না? ওদের একজন আছে, বাদল। ঐ ছেলেটা তোকে খুঁজছে।”

“ওহ।”

মৌমিতা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো ঠিকই, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। বাদল তার নাম জানলো কী করে? আর তাকে খোঁজার কথা সুরাইয়াকে জানালো কেন? এসব কি রটিয়ে বেড়ানোর মতো বিষয়?
মৌমিতার অমন ঠাণ্ডা প্রতিক্রিয়ায় সুরাইয়ার সমস্ত উত্তেজনা মাটি হয়ে গেলো। সে বিস্মিত হয়ে বলে, “কেন খুঁজছে, সেটা জানার ইচ্ছা নাই তোর?”

“কেন খুঁজছে?”

“আমি কীভাবে জানবো!”

“তাহলে কে জানে?”

সুরাইয়া হাল ছেড়ে দিয়ে বললো, “বাদ দে। কিন্তু আমার মনে হয় না, ভালো কিছু কিছুর জন্য খুঁজছে।” সে আবার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে, “বাদল কিন্তু ভালো ছেলে না!”

মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালো, ভুলবশত একটু হেসেও ফেললো, “আমি কবে বললাম, বাদল ভালো?”

“ঐ আরকি, একটু সাবধানে থাক—”

পাশ থেকে কেউ বলে ওঠে, “কে সাবধানে থাকবে?”

ওরা দু'জন তামান্নার দিকে তাকায়। তামান্না সুরাইয়াকে একটু ঠেলা দিয়ে বেঞ্চের কিনারায় বসলো, “কী নিয়ে কথা হচ্ছে?”

তার দিকে ঘুরে বসে সুরাইয়া, “তোর সাথেই দেখা করতে এসেছিলাম। শোন, আমাদের ব্যাচের আমজাদ আছে না? ওদের পুরো দলটার বিরুদ্ধে আবার কমপ্লেইন করবো আমি।”

“আবার কী করলো ওরা?”

“কালকে ওরা ওদের হলের ছাদে পিকনিক করেছে। সেটা সমস্যা না। বেয়াদবগুলো ছাদ থেকে আমাদের হলের দিকে ঢিল মেরেছে। মাঠেও মেরেছে।”

“তাহলে তো অবশ্যই কমপ্লেইন করা উচিত।”

সুরাইয়া হতাশ হয়ে বলে, “আমি ওদের নামে এমনিতেও অনেকবার কমপ্লেইন করেছি। স্যাররা এতো দরদ দেখায় ওদের ওপর! আর ভালোই লাগে না—”

“আচ্ছা দ্যাখ, এবার আমরা কয়েকজন মিলে কমপ্লেইন করি। গার্লস হোস্টেলের সবাই সাক্ষী থাকলো নাহয়। আর, মৌয়ের হাতের লেখা অনেক ভালো, ওর কাছ থেকে লিখে নিলে বাড়তি সুবিধা।”

মৌমিতা এসব আলোচনার মধ্যে নেই। আমজাদকে সে চেনে না। বিজ্ঞান বিভাগের গুটিকয়েক পুরুষ সহপাঠীর নাম জানে, এতোটুকুই। অতো মানুষের সাথে মৌমিতা খন্দকারের পরিচয় নেই। আর এমনিতেও তার মাথায় এখন অন্যকিছু চলছে। তামান্নার প্রস্তাবে সে একটু অস্বস্তিবোধ করলো। কিন্তু সরাসরি আপত্তি জানানোর ইচ্ছেও হলো না।

লাইব্রেরির এক কোণে, জানালার পাশের আসনটা খালি পড়ে আছে। জানালা প্রতিদিনের মতোই খোলা, বাতাস আসছে। মাথার উপরে ফ্যানও ঘুরছে অবশ্য, বাতাসটা সেদিক থেকেও আসতে পারে।
মৌমিতা সেসব নিয়ে ভাবলো না, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। এখানে অধিকাংশই পুরোনো বই। সেগুলোও আবার নন-ফিকশন আর কবিতা। লাইব্রেরিতে এসে জ্ঞানের বই পড়ার কোনো মানেই হয় না।
মৌমিতা আলমারির তাকে সাজানো নানান ধরনের বইয়ে আঙুল বুলিয়ে যেতে থাকে। পড়ার মতো যা ছিলো, সবই যেন পড়ে ফেলেছে। যা বাকি আছে, তা পড়ার ইচ্ছে নেই। হঠাৎ তার মনে হলো, সে পড়ার জন্য এখানে আসেনি, অন্য কোনো কিছু তাকে টেনে এনেছে! নিজের এই উপলব্ধিকে অস্বীকার করলো মৌমিতা। একটা বই বের করে আনলো, ‘প্রাচীন বাংলার ইতিহাস’। সেটা উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো। বইটাকেও বেশ প্রাচীন মনে হলো, ধূলো জমে গেছে, যেন বছরের পর বছর কেউই ছুঁয়ে দেখেনি।

হঠাৎ মেয়েটার কানের কাছে কেউ শিস বাজায়। সে চমকে উঠে পেছনে ঘোরে। বাদলকে এতো কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরও চমকে যায়। কয়েক পা পিছিয়ে ছেলেটা হেসে বলে, “ভয় পেলেন নাকি?”

মৌমিতার আতঙ্কগ্রস্ত মুখখানি সহসা বিরক্তিতে ছেয়ে যায়। এই প্রশ্নের উত্তর মেয়েটা দিবে না, বাদল সেটা জানে। সে অন্য প্রশ্ন করে, "গতকাল কলেজে আসেননি দেখলাম। আবার টিউশনেও যাননি—”

মৌমিতা খটখটে গলায় বলে ওঠে, “নজর রাখছো?”

“নজর রাখা গেলে রাখতাম। কিন্তু সেটার জন্য অনেককিছু জানার দরকার হয়। আর আমি তো সবচেয়ে গুরুত্ব—”

বাদলের কথা পুরোটা না শুনেই মৌমিতা নিজের আসনের দিকে এগিয়ে গেলো। চেয়ারে বসে পড়লো তার সামনেই। বাদলের সেদিকে খেয়াল নেই। সে এগিয়ে আসে, অসম্পূর্ণ কথাটা আবার বলতে শুরু করে, “আপনার ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটাই আমি জানি না।”

মেয়েটা না শোনার ভান করলো। পুরোনো আমলের বইটার মাঝামাঝি কোনো পৃষ্ঠা বের করে সেটার প্রতি কৃত্রিম মনোযোগ দেখালো। বাদল তার মুখ থেকে চোখ সরালো না, “বলবেন?”

“কী?”

“আপনার নাম।”

মৌমিতা সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকায়। একে তো ছেলেটা এমন ভাব দেখাচ্ছে, যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। নাম জানার পরেও এতো আদিখ্যেতা করে জিজ্ঞেস করছে কেন? তার উপর সে মৌমিতার টেবিলের উপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের মানুষ কী মনে করবে, তা নিয়ে কি ছেলেটার মধ্যে এতোটুকুও ভয়ডর নেই? কেউ এতোটা বেহায়া কী করে হতে পারে?

মৌমিতা আবার বইয়ের দিকে তাকায়, মাথার ওড়নাটা আরেকটু টেনে দেয় মুখের উপর। বাদল তার গতিবিধি দেখে আশেপাশে অন্যদের দিকে তাকায়, তারপর বেঞ্চ থেকে হাত সরিয়ে একটু পিছিয়ে দাঁড়ায়। গলায় জোর দিয়ে বলে, “বলবেন না?”

“না।”

“কেন?”

মেয়েটা উত্তর দিলো না। সে বই পড়ছে না, তবু খুব মনোযোগ দিয়ে বইটার দিকে তাকিয়ে রইলো।

“আপনি আবার এখানে বসেছেন কেন?”

মৌমিতা বুঝলো, বাদল এতোক্ষণ আসনের ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি, হয়তো লক্ষই করেনি। ছেলেটার এই বিলম্বিত চৈতন্য তাকে মনে মনে হাসতে বাধ্য করলো। সে কোনো উত্তর দিতে পারলো না। বাদল তার ঐ হাসি দেখলো না, বাহ্যিক গম্ভীরতাটুকু প্রত্যক্ষ করে সে আরও ক্ষুব্ধ হলো, “কতোবার বললাম, এটা আমার জায়গা।”

মৌমিতা একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে, বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে কঠোর গলায় বলে, “তোমার এই কলেজে আসার বেশিদিন হয়নি। তার আগে থেকেই এটা আমার জায়গা।”

“তাতে? আপনার জায়গা কেমনে হয়? এখানে কি আপনার নাম লেখা আছে?”

“হ্যাঁ।”

বাদল আবার এগিয়ে আসে টেবিলের দিকে, “দেখান দেখি।”

মেয়েটা উঠে দাঁড়ালো, আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বললো, “আচ্ছা যাও। এটা তোমার জায়গা।”

তারপর সে আর দাঁড়িয়ে থাকলো না। বইটা অন্য আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখলো কোনোমতে, তড়তড় করে হেঁটে লাইব্রেরির বাইরে বেরিয়ে গেলো। এমন স্বল্প পরিচিত কোনো মানুষের সাথে এভাবে কথা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে কোনোদিন সম্ভব হয়নি। আজকেও সেই অসম্ভবের সীমানা অতিক্রম করা উচিত হবে না।
বাদল যদিও দাঁড়িয়েই রইলো। আসনের মালিকানা তাকে ফেরত দেয়া হয়েছে। কেন? সে তো এবার অন্যকিছুর মালিকানা চেয়েছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp