এহসান সাহেব খানিক হতাশ ভঙ্গিতে জবার বাড়ি থেকে বের হলেন। তিনি নিজেও জানেন জবা সব কিছুই জানে। কিন্তু জবা কেন রত্মাকে পালাতে সাহায্য করেছে তা তিনি বুঝতে পারছে না! ঘরের বাইরে বের হতেই দেখল ইরফান ভিতরে ঢুকছে। মাত্রই অফিস থেকে ফিরেছে ইরফান। মন্ত্রী সাহেবকে দেখে বলল,
'হ্যালো স্যার। হাউ আর ইউ?'
বিরস মুখে এহসান সাহেব বলল,
'গুড। তুমি?'
'অলসো গুড।'
'তোমার সাথে কথা আছে।'
'এখন?'
'হ্যাঁ।'
'চলেন বাগানে বসি।'
বিশাল বাগান৷ অনেক ফুল এবং ফল গাছ সেখানে। ইরফানের হাজারো খারাপ অভ্যাসের মধ্যে একটা ভালো অভ্যাস হলো, ও গাছ খুবই পছন্দ করে। বাড়ির প্রতিটি কোণা ও ফুল ফলের গাছ দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছে।
বাগানে পাতা চেয়ারে বসে ইরফান ভিতরে কল করে চা দিতে বলে বলল,
'বলুন স্যার কী বলবেন?'
'জবা চৌধুরীকে কন্ট্রোল করার কোনো উপায় জানো?'
ফিচেল হেসে ইরফান বলল,
'তাকে কন্ট্রোল করার প্রয়োজন আপনার কেন পড়ল?'
'আমার স্ত্রী পালিয়ে গিয়েছে। কোথায় গেছে আমি জানি না।'
চা চলে আসল। চায়ে চুমুক দিয়ে ইরফান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি। এহসান সাহেবের মনে হলো সে হাসিতে তাচ্ছিল্য ভরা৷ তাকে বিদ্রুপ করছে ইরফান। বলল,
'তুমি এমন করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছো কেন?'
'এমনি। মন্ত্রীদের বউও পালিয়ে যায় আজ প্রথম শুনলাম।'
'খবরদার বিদ্রুপ করবে না। আমি তোমার ওয়াইফকে খানিক ভয় পেলেও তোমাকে ভয় পাই না।'
আবারও হাসল ইরফান। বলল,
'পাবেন খুব ভয় পাবেন। আপনার ওয়াইফ তো আপনার হিসাব রক্ষক মিরাজের সাথে পালিয়েছে তাই না।'
খানিক চমকালো এহসান সাহেব। এ কথা তো বাইরের কারও জানার কথা না। তিনি এবং তার সেক্রেটারি ব্যতিত এ কথা তো কেউ জানে না। তারমানে ইরফান চৌধুরী কিছু না কিছু জানে।
'তুমি কীভাবে জানলে?'
'সেটা আপনার জানার বিষয় না। তবে তারা আর এদেশে নেই। ইউরোপের কোনো এক শীতল দেশে হানিমুন করছে টোনাটুনি৷ আপনি তাদের টিকিটিও ছুতে পারবেন না। আর তার গর্ভের সন্তানও আপনার নয়। সে বাচ্চা মিরাজের। এটা তো আপনার এতক্ষনে জানার কথা।'
ক্রোধিত হয়ে এহসান সাহেব বলল,
'এতকিছু জানো। তাহলে নিশ্চয়ই তোমরাই ওদের হেল্প করেছো।'
'জানা এক বিষয় আর হেল্প করা আরেক বিষয়। সেধে কচু কে খায়? সেধে মন্ত্রীর সাথে লাগতে যাওয়ার শখ আমার নেই। আপনি নিজের ঘরের খবর রাখেননি তা আপনার দোষ। বাই দ্যা ওয়ে কত টাকা নিয়ে গুল হয়েছে?'
'আট কোটি।'
ইরফান এবার শব্দ করেই হাসল। বলল,
'এবার তো তারা আরামছে বাকি জীবন কাটাতে পারবে।'
'কেন দেশে গেছে?'
'জানি না। এজন্যই বয়স দেখে বিয়ে করতে হয়। আপনার এক পা কবরে। আপনি বিয়ে করছে যুবতী মেয়ে। যুবতী মেয়ে টেকেল দেওয়া কী এত সহজ? তাও যদি ফিজিক্যাললী ফিট হতেন। ফিজিক্স বলতে আপনার যা দেখি তা একটা আটমাসের ভুড়ি আর চকচকে টাক। একবার হসপিটালে গিয়ে নিজের স্পার্ম কাউন্টিং করাবেন। দেখবেন বাচ্চা সত্যিই আপনার না। বেশি টাকা খরচ করে ডিএনএ টেস্ট করাতে হবে না।'
এহসান সাহেব মাথা হেড করে উঠে গেলেন। তাকে অপদস্ত করে ইরফানের বেশ ভালো লাগল৷ এই লোক ওকে অনেক জ্বালিয়েছে। আজ তাকে খোঁচা মেরে কথা বলে ইরফানের বেশ লাগছে। তবে এহসান সাহেব কি এত সহজে জবাকে ছেড়ে দিবে!
ইরফান চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে নিজে নিজে বলল,
'সবাইকে তার স্থান দেখানোর সময় হয়েছে। জবাকেও বোঝাতে হবে আমায় ও যত কাঁচা খেলারি ভাবছে, ততটা কাঁচা খেলারি আমি নই। এতদিন ওকে ভালোবাসার কারণে ওর সকল অন্যায় মুখ বুঝে সহ্য করেছি। আর নয়। টাইম টু গেট ব্যাক ইরফান। ভিতরের ঘুমন্ত শয়তানটাকে জাগ্রত করো। জবাকে বুঝিয়ে দিতে হবে আমিও ওর চেয়ে কম না।'
ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে জবা ইরফানের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ছক কাটছে ইরফানকে নিয়ে নেক্সট স্টেপের।
ইরফান বারান্দায় জবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্মিত হাসল। জবার মুখ গম্ভীর। তবে জবাকে দেখে ইরফান বেশ মুগ্ধ হলো।
আজ জবা ছাই রঙের শাড়ি পরেছে। এ রঙেও যে কাউকে এত সুন্দরী লাগতে পারে ইরফান জানত না। ইরফান চাইলে জবাকে ভালোবেসে খুব সুখী একটা জীবন কাটাতে পারত৷ কিন্তু কুকুরের স্বভাব গুয়ে মুখ দেওয়া৷ ও সেটা করে সব হারিয়েছে।
ভিতরে আসতেই জারা ইরফানকে জড়িয়ে ধরল। ইরফান বলল,
'হাই প্রিন্সেস।'
'হ্যালো বাবা।'
'হাউ ইজ ইউর ডে সুইটহার্ট?'
'ইট'স গুড।'
'খেয়েছো?'
'নো৷ এখন খাব। তুমি নুডুলস খাবে বাবা?'
'ইয়েস প্রিন্সেস। তার আগে আমাকে ফ্রেশ হতে দাও।'
'ওকে।'
ইরফান রুমে চলে গেল। সিনথিয়ার বিষয়টা জবা জানার পরই ওরা আলাদা রুমে থাকছে৷ ইরফান ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল৷ আগে যখন ও গোসলে যেত জবা তখন ওর কাপড় বিছানায় সাজিয়ে রাখত। পাশের টেবিলে গরম ব্লাক কফি ঢেকে রাখত। গোসল করে বের হলেই খালি গায়ে ইরফানকে জড়িয়ে ধরত৷ বলত গোসলের পর ওকে জড়িয়ে ধরতে জবার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। অথচ আজ কতদিন যাবত জবা ইরফানের সাথে কথা পর্যন্ত বলে না।
ইরফান ফ্রেশ হয়ে ছাই রঙের একটা শার্ট পরল। ইচ্ছে করেই করল এটা। নিচে নেমে দেখল জবা টেবিলে বসে নাস্তা করছে৷ জারার খাওয়া প্রায় শেষ। অথচ জবা ইরফান বাড়ি থাকাকালীন কখনো একা খাবার খেত না।
ইরফান নিচে নেমে জারাকে বলল,
'মামনি আমার জন্য ওয়েট করলে না যে?'
'আমি অপেক্ষা করছিলাম, কিন্তু মাম্মি বলল, কারও জন্য অপেক্ষা করা মানে ওয়েস্ট অফ টাইম। সময় নষ্ট করা না কি খুবই খারাপ।'
জবা বলল,
'জারা তোমার খাওয়া হয়েছে?'
'হ্যাঁ। ওকে রুমে গিয়ে পড়তে বসো। কিছুক্ষণ পর তোমার নিউ টিচার আসবে।'
'ওকে।'
জারা চলে গেল। দূরে সিনথিয়া দাঁড়িয়ে এতক্ষণ ওদের দেখছিল৷ জবা ইচ্ছে করে চায়ের কাপ ফেলে দিয়ে বলল,
'সিনথিয়া জায়গাটা পরিষ্কার করো।'
সিনথিয়া পরিষ্কার করতে আসলে জবা ইচ্ছাকৃত ভাবে পানির গ্লাস ওর গায়ে ঢেলে দিল। নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল সিনথিয়া। মনে মনে জবাকে ভয়ংকর সব ভৎসনা করতে লাগল। ইরফান ওসব দেখেও না দেখার ভান করে রইল।
সিনথিয়া জায়গাটা পরিষ্কার করতেই জবা আবার সেখানে চা ফেলল। সিনথিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
'আপনি এমন কেন করছেন?'
জবা শুধু তাকাল সিনথিয়ার পানে। তাতেই ওর ভিতরটা ভয়ে জমে গেল। বিরবির করে বলল,
'হাতি গর্তে পড়লে চামচিকাতেও লাথি মারে।' জবা হেসে বলল,
'কে হাতি? আর কে চামচিকা? আমার তো তোমাকে নর্দমায় থাকা কালো পোকার মতো মনে হয়।'
সিনথিয়া আর কোনো কথা বলল না। কদিন যাবত জবা ওর সাথে ভয়ংকর সব আচরণ করে। বাড়ির অন্য সকল কাজের লোকদের পরিবারের সদস্যদের মতো মানলেও ওকে নিতান্তই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। যেন ও এখানের কেনা দাসী।
সিনথিয়া শুধু এখানে কয়েকটা মাস থাকতে চায়। তারপর হাতে কিছু টাকা আসলে চলে যাবে। ও টিউশনি খোঁজার চেষ্টাও করেছিল। দুটো টিউশনি পেয়েওছিল কিন্তু পরে তারা ফোন করে না করে। কারণ জানতে চাইলে দুজন বলেনি। একজন বলল,
'তোমাকে বাচ্চা পড়াতে রাখলে তুমি না আবার বাচ্চার বাবাকে পড়ানো শুরু করো।'
সিনথিয়া বুঝতে পারল এটা কার কাজ। ও আর উচ্চবাচ্য করল না। সাথে এটাও বুঝে গেল বাইরে গিয়ে কাজ করা ওর হবে না। ও এখন নতুন পরিকল্পনা করছে। সেটা বাস্তবায়নের কাজ অলরেডি শুরু করে দিয়েছে।
—————
রাত দুটো,
অদ্ভুত ভয়ংকর হাসির শব্দে সিনথিয়ার ঘুম ভাঙল। এমনি ফ্লোরে ঘুমায় বলে ওর ঘুম হয় না। তার উপর এমন হাসিতে ভয়ে হাড্ডি পর্যন্ত কাঁপছে। হাসির শব্দটা বিকট। হা হা হা হা।
হাসির শব্দ শুনে টিকলি বলল,
'শয়তানটা আজ আবার ঘরে এসেছে। ওকে আজ জবেহ করে খাব।'
ভয়ার্ত কণ্ঠে সিনথিয়া বলল,
'এমন করে হাসছে কে?'
'আর বলবেন না চিটার আপা। থুরি টিচার আপা। এটা তো বাড়ি না, চিড়িয়াখানা। সব রকম পশুপাখি আছে। এখন হাসছে ব্লু নামের একটা তোতা পাখি। হারামজাদা মানুষের মতো কথা বলে৷ রাত বিরাতে এমন শয়তানের মতো হা হা করে হাসে। প্রথম প্রথম কদিন তো আমি সেই ভয় পেতাম। এখন ওটাকে বাইরের ঘরে রাখা হয়। আজ মনে হয় জারা নিয়ে আসছে৷ সারারাত এমন ঘরে ঘুরবে আর হা হা করে হাসবে। দাঁড়ান শয়তানটাকে তাড়াচ্ছি।'
সিনথিয়া ফস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
'এ বাড়ির পাখিটা পর্যন্ত আমাকে জ্বালানোর সুযোগ ছাড়ে না। ওহ গড হেল্প মি। এই জাহান্নাম থেকে বের হওয়ার সুযোগ দাও।'
টিকলি দরজা খুলে দেখল ব্লু দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে। গায়ে শার্ট পরা। টিকলি নাক কুচকে বলল,
'বড়ো লোকের বিরাট কারবার। একটা পাখি তার গায়েও এত সুন্দর জামা।'
টিকলি ব্লুকে হাতে নিতেই ব্লু বলল,
'তিতলি তিতলি।'
'আমার নাম টিকলি ছাগল। ওহ তুই তো ছাগল না। চল তোরে তোর ঘরে দিয়ে আসি।'
ব্লু তিতলি বলছে আর হা হা হা করে হাসছে। সিনথিয়া পাখিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
'রঙ গ্রে আর নাম রাখছে ব্লু। ফাজলামি সব এই ঘরেই চলে।'
দোতলায় তাকিয়ে দেখল,
'ইরফান যে ঘরে থাকে সেখানে লাইট জ্বলছে।'
সিনথিয়ার মনে কু বুদ্ধির উদয় হলো৷ ও বাঁকা হেসে দোতলায় গেল। ইরফানের দরজায় টোকা দিল। ইরফান তখন অফিসের কিছু কাজ করছিল। এত রাতে দরজায় টোকা পেয়ে ভাবল জবা এসেছে হয়তো। খানিক খুশি হলো৷ খুশি মনে দরজা খুলেই মুখের হাসি মিইয়ে গেল। সিনথিয়া দাঁড়িয়ে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি৷
ইরফান কিছু বলবে এর আগেই সিনথিয়া ওকে ঠেলে ভিতরে ঢুকিয়ে পাগলের মতো ওর ঠোঁটে চুমু খেতে লাগল। খুলতে লাগল শার্টের বোতাম। কিছু মুহূর্তের জন্যও ইরফানও ভুলে গেল জবার কথা। সিনথিয়াকে জাপটে ধরে ওর কামিজ টেনে খুলে ফেলল। তারপর কিছু একটা মনে পড়তেই ঠেলে সিনথিয়াকে সরিয়ে দিল। ও খানিক অবাক হয়ে ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,
'কী হলো থামলে কেন জান?'
ইরফান ফোন বের করে জবার রুমে সেট করা গোপন ক্যামেরা চেক করল। জবা কম্বল মুড়ি ঘুমাচ্ছে। এটা জবার ছোটোবেলার অভ্যাস৷ এসির টেম্পারেচার ১৩° করে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমায় ও।
ইরফান জবাকে ঘুমাতে দেখে আবার সিনথিয়াকে কাছে টানল। একে অপরকে জোঁকের মতো লেপ্টে ধরল। দুজন যেন কিছু পাওয়ার আশায় পাগল। কিছু খুঁজছে দুজন৷ হয়তো অন্তত শারিরীক সুখ। অস্থিরতায় ঘামছে দুজনই।
কম্বলের তলে ফোনে ওদের এসব নোংরামো দেখে মুখ চেপে কাঁদছে জবা। সিনথিয়াকে এ বাড়িতে রাখার পর থেকে জবা ভাবত হয়তো সিনথিয়াকে আর পাত্তা দিবে না ইরফান।
এতদিন এতটুকু আশা ছিল ইরফান আর সিনথিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ হবে না৷ কিন্তু ওকে ভুল প্রমাণ করে দিল ইরফান। ইরফানকে আরেকদফা পরীক্ষা করতেই ও সিনথিয়াকে বাড়িতে রেখেছিল। জবা জানে ইরফান ওর রুমে ক্যামেরা সেট করেছে। কিন্তু ইরফান জানে না জবা বহু আগে থেকেই এ বাড়ির প্রতিটি কোণায় অসংখ্য গোপন ক্যামেরা সেট করে রেখেছে। জবা নিজের রুমেও অনেকগুলো ক্যামেরা লাগিয়েছে।
সে কারণেই জানে ইরফান ওর রুমের পশ্চিম কোণায় পেইন্টিং-এ ক্যামেরা লাগিয়েছে। ও জানে ইরফান ওকে খেয়াল করবে সে কারণে ঘুমের ভান ধরে কম্বল মুড়ি দিয়ে ফোনে দেখছে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা কী করে অপ্রিয় হয়!
জবার চোখ থেকে যেন অশ্রু নয় রক্ত ঝরছে। হৃদয়ে হওয়া ক্ষতর আঘাতে দমটা আটকে আসছে। জবা আর স্থির থাকতে পারল না। উঠে গেল রুম থেকে। গাড়ির চাবি নিয়ে বের হয়ে গেল।
এত রাতে জবাকে বাইরে বের হতে দেখে দারোয়ান বলল,
'মা কোথায় যাচ্ছো?'
আটকানো কণ্ঠে জবা বলল,
'জরুরি কাজ আছে কাকা। একটু পর আসছি।'
অনেকক্ষণ পূর্ণ গতিতে উদ্দেশ্যহীনভাবে গাড়ি চালাল ও। তারপর এক স্থানে থেমে পাগলের মতো কাঁদতে লাগল। পুরো পৃথিবীর সামনে নিজের শক্ত আবরণ বজায় রাখলেও একাকিনী জবা তা পারে না৷ পারছে না। চাইছেও না। পাগলের মতো কাঁদল অনেক সময়। কেন ইরফান আবার করল এমন? কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না।
জবা তো ভেবে নিয়েছিল অনুশোচনা করলে একসময় ও ওকে ক্ষমা করে দিবে। আর কিছু না হোক জারার জন্য হলেও ক্ষমা করবে। এখন ক্ষমা করার প্রশ্নই ওঠে না। অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল৷ কাঁদতে কাঁদতে একসময় গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়ল।
—————
হাঁপাচ্ছে সিনথিয়া ইরফান উভয়ই৷ ইরফান বলল,
'ওফ অনেকাদিন পর শরীর হালকা লাগছে। এতদিন যেন জ্যাম হয়ে ছিল।'
শুকনো ঠোঁট জিব দিয়ে ভিজিয়ে সিনথিয়া বলল,
'কেন তোমার ওয়াইফ দেয় না?'
'ও তোমার মতো বেহায়া মেরুদণ্ডহীন নয়। তোমার মতো ওর শরীরে এত ক্ষুধাও নেই।'
'তুমি আমায় অপমান করছো।'
'এসব শব্দ তো তোমার জন্য কমপ্লিমেন্ট হওয়ার কথা, জান।'
সিনথিয়া ছড়ানো কাপড়গুলো উঠিয়ে গায়ে জড়িয়ে বলল,
'আমার কিছু টাকা দরকার।'
'তোমার সার্ভিস চার্জ? '
'হেয়াট?'
'নয়তো আমি তোমায় কেন টাকা দিব? আমি তো নিজে তোমায় ডাকিনি। তুমিই আমার কাছে এসেছো। ঝড়ের মতো আমার উপর আছরে পড়েছো। তো আমি কেন টাকা দিব?'
'নয়তো আমি জবাকে আজ রাতের কথা বলে দিব।'
'বলো। সে তোমার কথা বিশ্বাস করবে কীভাবে ভাবলে?'
'জানি৷ তাকে বলা না বলা সমান। তবে আমার কিছু জিনিস লাগবে, তার জন্য টাকার প্রয়োজন।'
'কত?'
'আপাতত হাজার বিশেক হলেই হবে।'
'আমার কাছে নেই।'
'তুমি মজা করছো?'
'না। জবা আমার সব কার্ড ব্লক করে দিয়েছে। আমার পারসোনাল অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত ও বন্ধ করে দিয়েছে। এখন আমার কাছে যা টাকা আছে তা দিয়ে আমাকে খুব হিসাব করে কাজ করতে হচ্ছে। সামনের কাজে আমার অনেক টাকা লাগবে। তো তোমাকে এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। কম তো দেইনি এতদিন।'
'যা দিয়েছো সব তোমার ওয়াইফ নিয়ে গেছে। উল্টো সাতলক্ষ চল্লিশ হাজার টাকা তাকে আমার দিতে হবে। তুমি টাকাটা তাকে দিয়ে আমাকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করো। আমি এমনভাবে আর থাকতে পারছি না।'
ইরফান বিছানা থেকে উঠে ট্রাইজার পরে দরজা খুলে সিনথিয়াকে বলল,
'গেট আউট। কেউ দেখার আগে বের হয়ে যাও।'
সিনথিয়া মনে হলো কেউ ওকে ব্যবহার করে অপ্রয়োজনীয় বস্তুর মতো ছুড়ে ফেলেছে। কিন্তু সিনথিয়ার পরিকল্পনা অন্যকিছু। আপাতত কদিন ও নিজ থেকে ইরফানের কাছে আসবে। ইরফানের একটা অংশ নিজের মাঝে ধারণ না করা পর্যন্ত ওর পরিকল্পনা সফল হবে না। জবা আর ইরফান চৌধুরীকে তো এত সহজে ছাড়বে না।সিনথিয়া রহস্যময় হেসে চলে গেল।
ইরফান লম্বা শাওয়ার নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
'ভালো সে* ক্সের পর ঘুম ভালো হয়।'
—————
পাখির কিচির মিচির কলরবে ঘুম ভাঙল জবার৷ তখনও সূর্য উঠেনি। তবে পূব আকাশে রক্তিম আভা দেখা দিচ্ছে। সূর্য উঠবে পৃথিবী আলোময় করবে করবে করছে। তবে জবার জীবন যেন ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে। জবা অনেক ভেবেও কূল কিনারা করতে পারছে না ইরফানের জন্য কী শাস্তি বরাদ্দ করবে। কিছু বুদ্ধি এসেছিল মাথায় কিন্তু এখন সেসব প্রয়োগ করা বৃথা মনে হচ্ছে। এত কিছুর পরও যখন ইরফান সিনথিয়ার কাছে গেছে তার মানে ইরফানের মনে জবার জন্য কোনো অনুভূতি আর অবশিষ্ট নেই।
জবা বলল,
'ও যখন আমার ভালোবাসাকে সম্মান করে না আমি কেন ওর সম্মানের খেয়াল করব। ওর জন্য ভয়ানক অসম্মান অপেক্ষা করছে। তার আগে ওকে আমি ছাড়ব না৷ কার কাছে যাব যে আমার বুদ্ধিগুলোর ফাঁক ফোকর ধরিয়ে দিবে।'
জবা গাড়ি নিয়ে সোজা ওর বাবার বাড়ি আসল। গাড়ি থেকে নামার পূর্বে রুমাকে কল করে বলল,
'রুমা। '
'জি আপা।'
'জারা উঠলে ওকে তৈরি করে স্কুলে নিয়ে যাও। আমি একটা জরুরি কাজে এসেছি। আবারও বলছি তুমিই ওকে তৈরি করবে। সিনথিয়া যেন ভুলেও ওর কাছে যেতে না পারে।'
'আচ্ছা।'
'আর ঐ বান্দিটা উঠলে ওকে বলবে বাড়ির প্রতিটি বাথরুম সুন্দর করে যেন পরিষ্কার করে।'
'আচ্ছা।'
কল কেটে রুমা টিকলির দিকে তাকিয়ে বলল,
'টিকলি তুই কী কিছু জানিস?'
'কী?'
'সিনথিয়া আগে জারাকে পড়াত। সে এখন কেন এ বাড়ির কাজের লোক? আর জারার আশেপাশেও ওকে কেন যেতে দেয় না!'
'এতদিন সঠিক জানতাম না। তবে কাল রাতে সব আইডিয়া করেছি।'
'কী?'
'ইরফান স্যার আর সিনথিয়া আপার মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক চলে।'
'তুই কী করে জানলি?'
'কাল রাতে দেখেছি আমি। সিনথিয়া আর ইরফান ভাইজানকে নোংরামি করতে।'
'বলিস কী?'
'হ্যাঁ। দুজন সে কি চুম্মা চাট্টি দিল একজন আরেকজনরে। তারপর কী হয় তা তো জানেনই। সিনথিয়া মাগি রুমে এসে রাতে গোসলও করছে।'
রুমা হতভম্ব হয়ে বলল,
'জবা আপার মতো বউ থাকতেও কেউ আরেক বেডির কাছে যেতে পারে?'
'সেটাই তো ভাবেন একবার।'
'আর বেডা জাত কুত্তা জাত। জায়গায় বেজায়গায় মুখ দেওয়া ওগো স্বভাব। আমার স্বামীডারে দেখোসনি? কুত্তাতায় আমারে ছেড়ে আরেক মাগি নিয়া ভাগছিল। সে আমি নাহয় গরীব ঘরের মেয়ে। দেখতেও ভালো না। কিন্তু জবা আপা...! কী নেই তার? এত ধনী। এত সুন্দরী, যোগ্য তার স্বামী এমন করছে ভাবতে পারিস?
অবশ্য দোষ জবা আপার। ইরফান ভাইজান তো খয়রাতির বাচ্চা ছিল। সেই খয়রাতিকে আপা কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেছে। ছোটোলোক হঠাৎ করে সব পেলে হুস থাকে না কী করবে? হারামজাদা মাগিবাজি শুরু করছে। জবা আপার জায়গায় আমি হলে গুলি করতাম।'
'আমিও।'
'এখন আমাদের দুজনার একটাই কাজ জবা আপা যা বলে তা শোনা। জারার খেয়াল রাখতে হবে। ঐ ভুসকি মাগি সিনথিয়া যাতে জারার কাছেও যেতে না পারে।'
'ঠিক। দেখা যাবে বাচ্চাটার কোনো না কোনো ক্ষতি করে বসবে।'
সিনথিয়া আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে রান্নাঘরে আসল। নবাবের বেটির মতো বলল,
'আজ নাস্তায় কী আছে?'
রুমার এত রাগ উঠল। টিকলি তো বলেই উঠল,
'গু খাবেন?'
সিনথিয়া নাক সিটকে তাকিয়ে বলল,
'হোয়াট?'
'আরে সাগুর পায়েশ।'
'সকালে মিষ্টি?'
'এগুলো তো জবা আপা, জারা মা আর স্যারের জন্য। আপনার জন্য পান্তা ভাত আর মরিচ পোড়া৷ খাইলে খান। নয়তো কাজে লেগে পড়ুন।'
'আমাকে পড়োটা বানিয়ে দাও।'
টিকলি বলল,
'রাঙ্গা ভুসকি বেডি কয় কি? আপনারে আমাগো কাজের লোক হিসাবে রাখছে জবা আপা। আপনে সেটা খাইবেন যা আমরা দিমু। এখন যান খেয়ে ঘরের সবগুলো বাথরুম পরিষ্কার করুন৷ জবা আপার হুকুম।'
'অসম্ভব! আমি বাথরুম পরিষ্কার করতে পারব না।'
'সে জবা আপাকে বইলেন।'
'আমি এখনি তোমাদের স্যারকে বলছি।'
টিকলি মুখ ভেংচি কেটে বলল,
'যান বলেন গিয়া। নালিশ দিয়া বালিশ পান।'
ইরফান কেবল ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলল। দেখল সিনথিয়া দাঁড়িয়ে। ইরফান হাই তুলে বলল,
'সকালে তুমি আমার রুমের সামনে কেন? আমার দিনটাই খারাপ করে দিলে।'
'জবা আমাকে বাথরুম পরিষ্কার করতে বলেছে।'
'তো করো। আমি কী করব? আর জবাকে জবা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করবে।'
'তুমি কিছু বলবে না?'
'জবার বাথরুম পরিষ্কার করে বেলী ফুলের ঘ্রাণ ওয়ালা যে স্প্রে আছে সেটা করবে। জবা সেটাই পছন্দ করে। নাউ গেট লস্ট।'
ইরফান ওর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো। সিনথিয়া থ মেরে দাঁড়িয়ে রইল। ইরফানের কাছে কোনো পাত্তা না পেয়ে নাম মুখ কুচকে বাথরুম পরিষ্কার করতে লাগল৷ মনে মনে বলতে লাগল,
'এখন আমি ইরফানকে কিছুই বলবো না৷ জাস্ট দুটো মাস যেতে দাও। তারপর ইরফান আর জবার অবস্থা আমি বারোটা বাজাবো।'
জবা সোজা আসল ওর বাবার বাড়ি। ভিতরে ঢুকে ওকে দেখে খানিক অবাক হলেন জয়নুল আবেদিন আর ওর মা জুঁই সুলতানা। জুঁই সুলতানা বলল,
'একিরে রাতের কাপড় পরেই এখানে? আর এত সকালে? এখনো তো সূর্যও ওঠেনি।'
জবা শক্তকে করে মাকে জড়িয়ে ধরল। মানুষের কষ্ট হলে মাকে জড়িয়ে ধরতে পারলেই বোধহয় শান্তি লাগে। জুঁই অনুভব করল জবা কাঁদছে। জবার গরম অশ্রু তার কাধ ছুঁয়ে যাচ্ছে। তিনি জবাকে ধরে বলল,
'সোনা মা! মা কী হয়েছে তোর?'
জবার মন চাইল মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। কিন্তু সেটা কী আদৌও উচিত হবে। পাশ থেকে ভারী পুরুষ কণ্ঠে একজন বলল,
'কেঁদে নে জবা। মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলে কষ্ট কমে। মামা মামিকে সব খুলে বল।'
জবা তাকিয়ে দেখল ফারিস। বুঝতে পারল না এত সকালে ও এখানে কী করছে? কিন্তু অতকিছু ভাবার সময় নেই জবার। ও মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল হু হু করে। যেন এত দিনের সকল কষ্ট কান্নার জলে ভাসিয়ে দিবে।
জবা খুব আস্তে করে বলল,
'মা আমি হেরে গেছি। ভালোবাসার মানুষকে নিজের সাথে বেঁধে রাখার যুদ্ধে আমি গো হারান হেরে গেছি।'
উদ্বীগ্ন হয়ে জয়নুল আবেদিন ও জুঁই সুলতানা বলল,
'কী হয়েছে মা পাখি? বল সোনা? কিসের কষ্ট তোর? তোকে হারানোর সাহস কার হলো।'
জবা কাঁদতে রইল অনর্গল। ফারিস চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কাল রাতে বিশেষ জরুরি কিছু কাজে ফারিস জয়নুল আবেদিনের কাছে এসেছিল। কাজ সারতে সারতে রাত একটার বেশি বাজলে ওকে আর যেতে দেয়নি।
ফরজরের নামাজের পর জবাকে বিষন্ন মুখে ভিতরে ঢুকে মা কে জড়িয়ে কাঁদতে দেখেই ফারিস পড়ে ফেলেছিল জবার মনোভাব। বুঝে গিয়েছিল আজ আবার ইরফান জবাকে কষ্ট দিয়েছে।
অনেকক্ষণ পর জবা ধাতস্থ হলো। তারপর খুলে বলল বাবা মায়ের কাছে সকল কথা। সব শুনে রাগে জয়নুল আবেদিন তার বন্দুক নিয়ে রেডি হলেন ইরফানকে মারার জন্য। এত বড়ো সাহস তার মেয়েকে ধোঁকা দেয়। জবা তাকে থামিয়ে বলল,
'না বাবা শাস্তি তো ওকে কেবল আমি দিব। আর এমন শাস্তি যা ওকে সারাজীবন ভোগাবে। ওকে আমি শেষ করব না বাবা। ওকে আমি ধ্বংস করব। তোমরা এখন কিছু করবে না। ওকে বুঝতেও দিবে না তোমরা সব জানো। আমার এখন কেবল ফারিস ভাইয়ের হেল্প লাগবে।'
জবা তাকাল ফারিসের দিকে। ফারিসও চেয়ে রইল ওর চোখের পানে। কখনো কখনো কখনো নীরবতা কথা বলে। চোখের দৃষ্টি মনের ভাষা পড়ে নয়। মুখের বুলি তখন গৌন কিন্তু নীরবতা অকপটে সকল সত্যি বলে যায়। ফারিসও যেন জবার না বলা সকল কথা বুঝতে পারছে।
মনে মনে বলল,
'ভালোবাসা না পেলেও মানুষ বাঁচে।
কিন্তু প্রতারণা মানুষকে বদলে দেয়।
কেউ কাঁদে আর কেউ হয়ে ওঠে ভয়ংকর। জবার চোখ বলে দিচ্ছে ও হয়ে উঠেছে ভয়ংকর৷ অতি ভয়ংকর।'
জবা মনে মনে বলল,
'খেলা শুরু হয়েছে ইরফান। তুমি ভাবছো খেলা তোমার হাতে, কিন্তু এখানে তুমি কেবই শিকার আর আমি শিকারি। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ।'
·
·
·
চলবে……………………………………………………