পবনপত্র - পর্ব ২৬ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          মৌমিতা পড়ছে না। খাতার শেষ পৃষ্ঠায় আঁকিবুকি করছে। সে এখন অবধি বেশ কয়েকবার ডান হাতে লেখার চেষ্টা করেছে। কলমই ধরা যায় না ঠিকমতো। আর লিখতে গেলেই আঙুলগুলো ব্যথা হয়ে যায়। দুই হাতে লিখতে পারলে খারাপ হতো না। তার হাতের লেখা চিনতে গিয়ে সবাই হিমশিম খেতো।

মার্জিয়া ঘরের ভেতরে ঢুকেই ছিটকিনি লাগিয়ে দিলো। খাটের এক কোণে এসে বসলো শুষ্ক মুখে, “আপা? একটা কথা বলো তো।”

“কী?”

সে একটু ভেবে নেয় প্রথমে। কীভাবে প্রশ্ন করলে তার আপা এড়িয়ে যেতে পারবে না—এটা সে জানে। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে, “কলেজের পেছনের গলিতে, তোমার সাথে ঐ ছেলেটা কে ছিলো?”

মৌমিতা এতো ভয়ানকভাবে চমকে উঠলো যে তার হাত থেকে কলমটা প্রায় ছিটকে পড়লো টেবিলে। সে হতভম্ব হয়ে বোনের দিকে তাকালো, “কোন ছেলে?”

“তুমিই ভালো জানো।”

“আশ্চর্য! আমি কেন কোনো ছেলের সাথে ওদিকে হাঁটতে যাবো?”

“সেটা আমি কীভাবে জানবো? তোমাকে জুনায়েদ ভাই একটা ছেলের সাথে দেখেছে, ঐ গলিতে হাঁটতে। এখন তুমি বলো, এটা কি সত্যি?”

মেয়েটা সোজা হয়ে বসে। মার্জিয়ার চোখের দিকে তাকানোর সাহস নেই তার। আমতা আমতা করে স্বীকারোক্তি জানায় সে, “হ্যাঁ। সত্যি।”

মার্জিয়া তবু অবিশ্বাসের সুরে বলে, “তুমি এমন কিছু করতে যাবা কেন?”

“কারণ আছে মার্জু। তোকে বলেছিলাম না, আমি ডায়েরিটা কলেজ লাইব্রেরিতে ফেলে এসেছি? ঝামেলা হয়ে গেছে। একটা ছেলে ওটা পেয়েছে। কতোবার ফেরত চাইলাম, কিছুতেই দিলো না। উল্টো শর্ত দিচ্ছিলো শয়তানটা!”

মার্জিয়া গুরুগম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করে, “ঐ শয়তানটার সাথে হাঁটতে গেলা কেন?”

“চুপ কর! আমি কেন আবার...” মৌমিতা টের পেলো, মনে মনে কোনো কথা সে ঠিক করে রাখেনি, গুছিয়ে রাখা হয়নি কিছুই, “আসলে, ঐ... ডায়েরিটার জন্য...”

“কী শর্ত দিয়েছিলো?”

“বলতে পারবো না।”

“বুঝেছি!” মার্জিয়া সটান হয়ে বসলো, “ডায়েরিটা কি ফেরত দিতে চাচ্ছে না? মামাকে বলে দিও তো, ব্যাটার নাক-মুখ ফাটিয়ে উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার। অন্যের জিনিস নিয়ে—”

“আরে না না। ওরকম কিছু করার দরকার নেই। ঐসব ঝামেলা আমার ভালো লাগে না। ছেলেটাও তো ভালো না, মামা কিছু করলে ওরা চুপ করে বসে থাকবে না।”

“তাহলে? ডায়েরিটা?”

“ওটা আমার লাগবে না। এমনিতেও তো পড়েই ফেলেছে—”

“হায় খোদা! তুমি ঐ ডায়েরিটা আমাকে ধরতেও দাওনি কখনও। এখন অচেনা-অজানা একটা ছেলে সব পড়ে বসে আছে, তবুও কিছু করবা না তুমি?”

“আমার আর কোনো আগ্রহই নেই এটা নিয়ে। এমনিতেও আমি ওর কোনো ফালতু শর্ত মানতে পারবো না।”

“প্রেম করতে চায় নাকি?”

মার্জিয়ার এই সোজাসুজি জিজ্ঞাসায় মৌমিতা মুখ শক্ত করে বলে, “হুম।”

“একটা সুযোগ কিন্তু তুমি দিতেই পারো—”

“ছেলেটা জুনিয়র!”

“আরে আপা, সত্যি সত্যি প্রেম করতে বলছি নাকি! তুমি একটু নাটক করবা, ওর কাছ থেকে ডায়েরি নিবা, তারপর রিপন মামাকে সব জানিয়ে দেবো আমরা। নাটোর থেকে বের করে দেবো ঐ ছেলেকে। আর জীবনেও মুখ দেখাতে পারবে না। আবার জুনিয়র হয়েও এতো দেমাগ দেখায়। বাপরে! পিটিয়ে হাড্ডি গুঁড়ো করে দেয়া উচিত।”

মৌমিতা মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো। তার অসতর্কতার কারণে যদি আরও জানাজানি হয়? যদি সত্যিই বাদলের কোনো ক্ষতি হয়? ছেলেটার উপর অদ্ভুত একটা মায়া জন্মে গেছে। তার গায়ে সামান্যতম আঘাত করার কথা ভাবতেও ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। সে ভুল করেছে বটে, তবে এমন কোনো অপরাধ এখনও করেনি, যার জন্য তাকে এতো বড় শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। আসল দোষ তো মৌমিতারই। বাদল তো ডায়েরিটা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো। মৌমিতা নেয়নি।

“বুঝেছো আপা? ছেলেটাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না কিছু। সে ভাববে, তুমি সুযোগ দিচ্ছো—”

“সুযোগ দেওয়া মানেই প্রশ্রয় দেওয়া। ছেলেটা প্রশ্রয় পাবে। আরও মাথায় উঠে নাচবে। আর... একটা মিথ্যা আশ্বাস নিয়ে থাকবে। ভুল বুঝবে। এর চাইতে, ডায়েরিটা যদি রাখতে চায়, রাখুক। ও এখন পর্যন্ত আমার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেনি। আমি কেন ওর ক্ষতি করবো?”

বোনের কথা শুনে মার্জিয়া নীরবে চেয়ে থাকে খানিকক্ষণ। তারপর ধীরে সুস্থে বলে, “তুমি ঐ রাস্তায় ছেলেটার সাথে হাঁটছিলে কেন?"

“ও হ্যাঁ—” মৌমিতার কিছু একটা মনে পড়ে যায়, সে ব্যাগের পকেট থেকে জিনিসটা বের করে, “বিট লবণ নিতে গিয়েছিলাম। ঐ রাস্তায় এতো কুকুর! দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে। বাদল এগিয়ে দিতে চাইলো, কুকুরগুলো ওকে চেনে। তাই... রাজি হয়ে গেলাম।”

শখের জিনিসটা পেয়ে মার্জিয়ার ক্রোধ একেবারে জল হয়ে গেলো। তবে সে আড়চোখে বোনের দিকে তাকালো, হাসিমুখেই একটা তীর্যক প্রশ্ন ছুঁড়লো, “ছেলেটার নাম বাদল?”

“হ্যাঁ।”

অনিচ্ছাকৃতভাবে সামান্য লালিমায় ছেয়ে গেলো মৌমিতার মুখ। বাদলের সামনে সে বিট লবণ কিনতে পারেনি, অন্য দোকান থেকে কিনেছে। কারও সম্মুখে ছোটখাটো শৌখিনতা প্রকাশ করতে ভীষণ সংকোচ তার।
মার্জিয়া খুশিমনে মাথা নাড়লো, “ছেলেটা অতোও খারাপ নয় তাহলে।” আপার চোখের দিকে তাকায় সে, “তোমাকে পছন্দ করে। তাই না?”

মৌমিতা বিরক্তি প্রকাশ করে, অন্যদিকে ঘুরে বসে, “জানি না!”

“সিনিয়র মেয়েকে পছন্দ করলো তাই বলে! ইশ রে!”

“ফালতু কথা না বলে নিজের কাজ কর।”

“আচ্ছা আপা... ছেলেটা দেখতে কেমন? একটু কল্পনা করে দেখতাম আরকি!”

“তুই কি যাবি? নাকি থাপ্পড় খাবি?”

“আচ্ছা যাই। ফল মাখাবোওও...” মার্জিয়া লবণের প্যাকেটটা নিয়ে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে ছুট দিলো। জানালায় তাকালে সে দেখে, মারুফ আসছেন। বারান্দার দরজাটা খুলতে হবে। 
মেয়েটাকে বেরোতে দেখেই মারুফ দরজার সামনে দড়িতে ঝোলানো গামছার দিকে ইশারা করলেন, “গামছাটা ওখান থেকে তোলো। নাহলে তোমার আম্মা বকবে আবার।”

আব্বার কথায় সে মাথা নাড়ে, গামছাটা নিয়ে আসে। এই কাজটার জন্য রাবেয়ার কাছে সবসময়ই বকা খায় সে। তবু অভ্যেস ছাড়তে পারে না।
মারুফ এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। বাচ্চাদুটো তুচ্ছ কারণে তিরস্কারের শিকার হবে—এটা তিনি চান না।

—————

কলেজ থেকে ছুটির নোটিশ দেয়া হয়েছে। মৌমিতা সরু চোখে সেটাই পর্যবেক্ষণ করলো। তামান্না আজও এলো না। বন্ধের আগে আর দেখা হবে না সম্ভবত।
মৌমিতা ব্যাগ হাতড়ে দেখে, রিকশাভাড়া আছে। হাঁটতে হবে না। হাঁটা উচিতও হবে না। যেকোনো সময় ঝুম করে বৃষ্টি নামতে পারে। সে একটা লম্বা শ্বাস টেনে হাঁটতে শুরু করলো। ফটকের কাছে বাদলকে দেখতেই একটা মেয়ের পেছনে কোনোমতে লুকিয়ে পড়লো।

ইতোমধ্যে জুনায়েদ ভাই তাকে এই ছেলেটার সাথে দেখে ফেলেছে। মৌমিতা চায় না, আবার কেউ তাদের একসাথে দেখুক।
সে জড়োসড়ো হয়ে দরজার কাছে পৌঁছাতেই বাদল ডাক দিলো, “ম্যাডাম?”

মৌমিতা কোনোপ্রকার কর্ণপাত না করেই চলে যাচ্ছিলো। ছেলেটা দৌড়ে এসে তার সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে শুরু করে, “আপনি কি বাড়িতে যাচ্ছেন?”

“নয়তো কোথায় যাবো?”

“কিছু যদি মনে না করেন, রেলস্টেশনে আসতে পারবেন একটু?”

মৌমিতা দাঁড়িয়ে যায়, বাদলের দিকে তাকিয়ে অত্যধিক বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, “তোমার কি মাথা খারাপ?”

“কেন! একসাথে যাওয়ার কথা বলি নাই। আমি সাইকেল নিয়ে যাচ্ছি, আপনি রিকশা নেন। আচ্ছা? তাড়াহুড়া করা লাগবে না। আমি অপেক্ষা করবো।”

প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করে ছেলেটা হোস্টেলের দিকে ছুটলো। এখনই সাইকেল নিয়ে রওনা হবে হয়তো! মৌমিতা ডাকতে গিয়েও তাকে ডাকতে পারলো না। দাঁতে দাঁত চেপে বললো কেবল, “আমি যাবো না। ধ্যাৎ! পাগল একটা, অপেক্ষা করবে! করো!”

মার্জিয়া গুনগুন করে পড়ছে। পূজার ছুটিতে সে কোনোরূপ পড়াশোনা করবে না। তাই যা পড়ার, এখনই পড়ে রাখবে। এই বুদ্ধিটার কার্যকারিতা নিয়ে সে নিজেও সন্দিহান, তবু বিকল্প কিছু ভাবেনি। বন্ধের পর আবার কিসের লেখাপড়া!

মৌমিতা ঘরে ঢোকে। আজ ব্যবহারিক ক্লাসে অনেকটা সময় চলে গেছে। তবে ক্লান্ত লাগছে না তেমন। আবহাওয়া সুন্দর। শরীরটাও ঘামেনি। এখন গোসল করতে হবে। আলমারি থেকে কাপড়চোপড় বের করে সে বোনকে জিজ্ঞেস করলো, “তোদের ছুটি দিয়েছে?”

“হ্যাঁ। পরের সপ্তাহ থেকে স্কুল বন্ধ। কোথাও ঘুরতে গেলে কেমন হয়?”

“আমার যাওয়ার ইচ্ছা নাই। ছুটি পেলে আমি ঘুমাবো আগে। অনেকদিন হলো ভালোভাবে ঘুমাই না।”

“আজকে দেখা হয়েছিলো?”

“কী?”

“বাদল ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিলো?”

মৌমিতা চোখ সরু করে পেছনে তাকায়, “এখন আবার বাদল ভাই!”

“হ্যাঁ, আমার চেয়ে তো বড়-ই, সেজন্য বললাম। আর আমার না আরেকটা কথা মনে হচ্ছে, তোমার হাবভাব দেখে...”

“কী মনে হচ্ছে?”

“কিছু না। এমনি বললাম।”

মার্জিয়া বেশ নিরপরাধ ভঙ্গিতে অনীহা দেখালো। বোনটাকে ক্ষ্যাপানোর মতো একটা বিষয় পাওয়া গেছে! সে কী বলতে চেয়েছিলো—তা জানার জন্য অদম্য কৌতূহল কাজ করছে মৌমিতার মনে। কিন্তু কোনো প্রশ্ন করলো না মেয়েটা। অহেতুক আগ্রহ দেখিয়ে সন্দেহের বীজটাকে আরও গভীরে রোপণ করা ঠিক হবে না। অবশ্য মার্জিয়া কী-ই বা ভাবতে পারে। তার বড়জোর এমনটাই মনে হতে পারে, আপা ঐ ছেলেটাকে পছন্দ করে। মনে করলে করুক। কথাটা তো মিথ্যে নয়!

দুপুর গড়ানোর আগেই দমকা বাতাস বইতে শুরু করেছে।
মেয়েদুটোর সাথে জোবেদাও ছুটে গিয়ে উঠোন থেকে কাপড় তুলে আনলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে রাবেয়া দুশ্চিন্তায় পড়লেন। রিপনের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি, “রিপন? দোকানে যেও তো একবার। ছাদে নাকি সমস্যা হয়েছে, পানি পড়ে।”

রিপন মাথা নাড়লো, “আচ্ছা।”

রাবেয়া মৌমিতার উদ্দেশ্যে বললেন, “মৌ? আজকে টিউশনে যাওয়ার দরকার নেই। বাসায় পড়ো।”

এই আদেশটা শোনার পর মৌমিতার খুশি হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তার মুখ শুকিয়ে যায়।
সপ্তাহের শেষ দিন আজ। তারপর দীর্ঘ ছুটি। বাদলের সাথে একবার ভালোভাবে কথাও বলা হয়নি। তামান্নার সাথেও কথা হয়নি। মেয়েটার বাড়িতে নাহয় যাওয়া যাবে। কিন্তু বাদল? এই দীর্ঘ সময়ে ঐ মুখখানি আর দেখা হবে না! আজকেই শেষ সুযোগ।

মার্জিয়া পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে দিয়ে, মৌমিতা জানালা বন্ধ করলো। জামা বদলে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চুল শুকোয়নি এখনও। বৃষ্টির দিনে এই অসুবিধেটা হবেই। মেয়েটা খোঁপা বাঁধতে পারলো না। খোলা চুলের উপরেই ওড়নাটা জড়িয়ে নিলো কোনোমতে। কী যেন মনে করে চোখের আশেপাশে কাজলের রেখাও টেনে নেয় সে।
ধরা পড়ে গেলে সর্বদাই একটা গা ছাড়া ভাব চলে আসে তার মাঝে। তা-ই যেন আজ চূড়ান্ত আকারে দেখা দিতে লাগলো।

রাবেয়া নিজ ঘরে শুয়ে আছেন। বিশ্রাম নিচ্ছেন। মেয়েটা দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। বেশি নিকটে ঘেঁষলেই যেন সে আরেকবার ধরা পড়ে যাবে।

“আম্মা? আজকে না গেলে অনেক অসুবিধা হবে। স্যার আলাদাভাবে বুঝাবেন না। আর বন্ধের জন্য পড়াও দিবেন অনেকগুলো।”

রাবেয়া ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলেন, “আচ্ছা মা, ছাতাটা নিও। সাবধানে যাও।”

—————

দোকানে ক্রেতাদের ভালোই ভিড় দেখা যাচ্ছে। রিপন ভেতরে ঢুকলো না। একপাশে গিয়ে দাঁড়ালো। কাস্টমার বিদায় নিতেই সে ভেতরে আসে, ছাদের দিকে তাকিয়ে বলে, “কোথায় সমস্যা হয়েছে, মারুফ ভাই? ঠিক করে দিচ্ছি।”

মারুফ বললেন, “লাগবে না। ঠিক করে নিয়েছি। জুনায়েদ মিস্ত্রী এনেছিলো।”

রিপন ছোট একটা শ্বাস ফেলে ছাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফেরায়। ঘাড় চুলকে বলে, “আমাকে বলতে পারতেন। টাকাও লাগতো না।”

তার কণ্ঠে সামান্য অভিমানের রেশ। মারুফ বললেন, “ব্যাপার না। তুমি একটু বসো তো এখানে। হিসাবগুলো দেখো।”

প্রস্তাবটা রিপনের মস্তিষ্কে প্রক্রিয়াজাত হতে সময় লাগলো। সে দ্বিধা নিয়েই মারুফের পাশে এসে বসলো। খাতাটা হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলো, “ভালোই বিক্রি হচ্ছে এখন। দেখেন, পূজার আগে আরও কাস্টমার আসবে। নতুন মাল আনা লাগবে নাকি?”

ওসমান কাপড় গুছিয়ে তুলে রাখছে। মারুফ সেদিকে তাকিয়েই ছোট একটা শ্বাস ফেললেন, “আপাতত লাগবে না।”

“আপনি যে কেন এতো চিন্তা করেন। সব ঠিকঠাক হয়েই যাবে।” রিপনের কণ্ঠটা তুলনামূলক কোমল শোনায়, “মেয়ে দুটোকে নিয়েও টেনশন করবেন না। ওরা ভালো কিছু করবে জীবনে। এখন ছোট মানুষ, অনেককিছুই বোঝে না। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

মারুফ শ্যালকের দিকে ঘুরতে পারলেন না। হাতে ধরে রাখা চশমাটির দিকে তাকিয়েই ব্যথিত গলায় বললেন, “আমার বড় মেয়েটা যে বড় হচ্ছে না! ওর মনটা এখনও অনেক নরম, এখনও এতো অবুঝ। আমার খুব চিন্তা হয় ওকে নিয়ে। জীবন কি আর সরলরেখায় চলে? ও একটু আঘাত পেলেই সেটা ভুলতে পারে না। অথচ আমার অতো সামর্থ্য নেই, মেয়েটাকে আগলে রাখবো একটু, সেই সাধ্য নেই। সারাজীবন তো আমার কাছে থাকবেও না। আমিও থাকবো না সবসময়। রিপন, ওদেরকে একটু দেখেশুনে রেখো। একটু শক্ত হতে বোলো। জীবনটা সহজ নয়।”

রিপন মাথা নিচু করে বসে রইলো। একজন পিতা হিসেবে মারুফের এমন করুণ অনুরোধ তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন। নিজের স্বল্প অভিজ্ঞতা থেকে কোনো জবাব খুঁজে বের করতে পারলো না সে। সান্ত্বনার বাণী শোনাতেও ইচ্ছে করলো না।

—————

তামান্নার সাথে দেখা আর হচ্ছে না। আজকে আসেনি সে। দ্বিতীয়জনকেও দেখলো না মৌমিতা। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো ছেলেদের দলটার দিকে।
চারিদিক একেবারে অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। আকাশে ছোটাছুটি করছে কালো কালো মেঘ, ক্ষণে ক্ষণে বিকট শব্দে গর্জে উঠছে।

“রাশেদ? বাদল আসেনি?”

ক্লাসে প্রবেশ করার আগে রাশেদ মৌমিতার এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলো, “না। কলেজ ছুটি দেওয়ার পর থেকে ওকে আমি আর খুঁজে পাইনি কোথাও। হোস্টেলেও আসেনি। কোথায় গেছে—কিচ্ছু জানায়নি।”

মেয়েটা ফাঁকা রাস্তায় হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলেটা হারিয়ে গেছে আবার। কেউ তার খোঁজ জানে না। কেন জানে না? তাকে কি কোনোভাবে আটকে রাখা যায় না?
মৌমিতা কপালে হাত বোলায়। সবকিছুই অসহ্য লাগছে হঠাৎ করে। সে হাত তুলে একটা খালি রিকশা থামায়। ধীরে সুস্থে উঠে বসে। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাবেন?”

সে একটা শুষ্ক ঢোক গিলে জবাব দেয়, “রেলস্টেশন।”

এ সময় কোনো ট্রেন আসে না, যায়ও না হয়তো। ছুটি শুরু হবে কাল থেকে। তাই বলে আজ এই বাড়াবাড়ি রকমের নিস্তব্ধতা?
সুনসান রাস্তা। সিঁড়ি বেয়ে তড়তড় করে স্টেশনে উঠে আসে মেয়েটা। হাড় হিম করা পরিবেশ। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনো মানুষের দেখা নেই। সন্ধ্যার দিকে স্টেশনটা বখাটেদের আস্তানায় পরিণত হয়। কোনো বিপদ হলে উদ্ধার করার কেউ থাকবে না। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও কেউ শুনবে না, এগিয়ে আসবে না। এলাকাটা যেন একেবারেই জনশূন্য।

মৌমিতা তবু পেছনে ঘুরতে পারলো না। তার মস্তিষ্কে বীভৎস কিছু আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। তবু সে যান্ত্রিক ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে যায়।

প্ল্যাটফর্মে ঠাণ্ডা বাতাস। কোনো আলো নেই। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, তাতেই কেবল কয়েক মুহূর্তের জন্য আলোকিত দেখাচ্ছে জায়গাটা।

মেয়েটা উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে থাকে। ছাউনির শেষ প্রান্তে গিয়ে একটা মানব অবয়ব দেখতে পায় সে। বুক কেঁপে ওঠে। পরক্ষণেই সে চোখ মেলে ভালো করে দেখে ছেলেটাকে। ভয়, আশঙ্কা, আশা, স্বস্তি–সব অনুভূতি মিলেমিশে ভীষণ চাপে পড়ে যায় মেয়েটা। অনেক কষ্টে পা তুলে এগিয়ে যায়, দেহটাকে অস্বাভাবিক ভারী মনে হতে থাকে।

বাদল খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাত দুটো পকেটে। দূরে তাকিয়ে কী যেন দেখছে। ওইদিকে হয়তো স্টেশন মাস্টারের অফিস। আসন্ন ঝড়ের কারণে দোকানপাট সব বন্ধ। ওপাড়ের জমাট অন্ধকারে যদি কেউ দাঁড়িয়েও থাকে, তা চোখে পড়ার কথা নয়।

“বাদল? তুমি এখানে কেন?”

মৌমিতার অতর্কিত ধমকে বাদল মাথা ঘোরালো। মেয়েটাকে আজ একটু বেশিই সুন্দর দেখাচ্ছে। কারণটা সে ধরতে পারলো না। মুখ ফিরিয়ে নিলো। মৌমিতা আরও বিকৃত স্বরে বলে উঠলো, “তুমি এতোক্ষণ ধরে এখানেই আছো?”

“বলেছিলাম তো, অপেক্ষা করবো।”

শিরশিরে বাতাসের ন্যায় ছেলেটার কথাগুলোও ধাক্কা খায় দেয়ালে। কানের কাছে বাজতে থাকে। মেয়েটা চোখ ফেরায়।
আকাশ হতে ঝমঝম করে পানি ঝরতে শুরু করলো। মুহূর্তের ব্যবধানে আশপাশ ঝাপসা হয়ে যায়, সমস্ত আওয়াজ চাপা পড়ে যায়। কেটে যায় অনেকটা সময়। এভাবেই।

মুষলধারে বৃষ্টি। অল্প দূরত্বে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে দু'জন। আর যেন কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই ধরণীতে। স্টেশন থেকে যতোদূর চোখ যায়, কেবল আগ্রাসী জলধারাই দৃশ্যমান।

বাদল আড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকায়। সামনে ছোট করে কাটা চুল এলোমেলোভাবে তার মুখের উপর উড়ছে। সুন্দর মুখখানি আড়াল হয়ে যাচ্ছে বারবার। বাদল ছোট একটা শ্বাস নেয়, মেয়েটার মুখের দিকে হাত বাড়ায় ঐ চুলগুলো সরানোর উদ্দেশ্যে। হাতখানি গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মৌমিতা সতর্ক হয়ে যায়। সে দ্রুত নিজের চুল গুঁজে ফেলে কানের পিঠে, নিরাপদ দূরত্বে সরে দাঁড়ায়।
বাদল হাতটা তৎক্ষণাৎ সরাতে পারলো না। এই আকস্মিক প্রত্যাখ্যান মেনে নিতেই কিছু সময় লেগে যায় তার। তারপর সে সামনে তাকায়, বুকের উপর হাত গুটিয়ে আবার খুঁটিতে হেলান দেয়।

মৌমিতা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। ভীষণ ক্লান্তি কাজ করছে, পা ব্যথা হয়ে গেছে। সে পেছনে থাকা বেঞ্চটার বামপাশে বসে পড়ে। বাদলের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে, তাকে ডাকতে গিয়েও থেমে যায়। কিছুটা গুটিসুটি হয়ে বসে থাকে বেঞ্চের কিনারায়। দু'হাত দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রাখে। বাতাসটা কনকনে ঠাণ্ডা।

বাদল ধীরপায়ে পিছিয়ে এসে বেঞ্চের আরেক প্রান্তে বসে পড়লো। নীরবতা ভেদ করে তখন মৌমিতা বলে ওঠে, “আমাকে এখানে ডাকার কারণ কী?”

বাদল সহসা উত্তর দিতে পারে না। কনুই দ্বারা হাঁটুতে ভর দিয়ে ঝুঁকে বসে, অযথা নখ খুঁটতে খুঁটতে বলে, “এমনি। আমি অবশ্য ভাবিনি, আপনি আসবেন।”

মৌমিতা বাইরের বৃষ্টিভেজা রেললাইনের দিকে দেখে এক পলক, “আমি না আসলে কী করতা তুমি? সারারাত এখানেই থাকতা?”

ছেলেটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসে, দুই গালে বরাবরের মতোই টোল পড়ে তার। সে নিচু স্বরে বলে, “ডায়েরি পড়ে আপনাকে খুব অদ্ভুত মনে হচ্ছিলো। কিন্তু বাস্তবে আপনি আরও অনেক অদ্ভুত।”

তার দিকে তীর্যক নজরে তাকিয়ে থাকা মেয়েটা কোনো কথা বলে না। বাদল জানে, মৌমিতা এখন তার দিকেই চেয়ে রয়েছে। সে আবার হাসে, “অবশ্য আমি নিজেও অদ্ভুত!”

প্রসঙ্গটা ঠিক কোথায় যেতে চলেছে—মৌমিতা একটু হলেও অনুমান করলো। কোনো প্রস্তাব গ্রহণ বা বর্জনের অবস্থায় নেই সে। ব্যস্তভাবে বলে উঠলো, “কিন্তু আমরা দুইজন দুই মেরুর মানুষ।”

এই প্রতিবাদের পাল্টা জবাব খুঁজতে থাকে বাদল। তার মুখ শক্ত হতে থাকে।
অন্যজনও চুপচাপ বসে আছে। এখানে এভাবে বসে থাকার ইচ্ছে নেই, পালাবার ইচ্ছেও নেই। তাড়াহুড়ো নেই। নেই কোনো কোলাহল। কেবল বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ শোনা যায়। স্টেশন ফাঁকা, শুধু দু'জন কিশোর-কিশোরী বেঞ্চের দুই ধারে বসে রয়েছে নীরবে।
ছেলেটার দৃষ্টি সামনের মেঝের দিকে। তবে সে খেয়াল করে, মৌমিতার ডান হাতখানি ভীষণ অবহেলায় বেঞ্চের উপর পড়ে আছে।
বাদল এই মেয়েটাকে এখানে অকারণে ডাকেনি, যে কাজের জন্য ডেকেছে, সেটা তাকে করতেই হবে।

“চুম্বকের উত্তর মেরু যেভাবে দক্ষিণ মেরুকে আকর্ষণ করে, দক্ষিণ মেরুও কি সেভাবে উত্তর মেরুকে আকর্ষণ করে না?”

মৌমিতা সরল মনে মাথা দোলায়, “করে।”

“তাহলে আমি কেন একা আপনার পেছনে দৌড়াচ্ছি? নাকি আপনিও দৌড়াচ্ছেন, কিন্তু স্বীকার করতে চাচ্ছেন না?”

এমন কিছু আশা করেনি মৌমিতা। সে কোনো উত্তর দেয় না। বৃষ্টি থামেনি, তবু সে আর দেরি করতে চাইলো না। ছাতা তো আছেই। হেঁটে যেতে সমস্যা নেই। রিকশা পেয়ে গেলে ভালো হয়। বাড়িতে সবাই চিন্তা করছে হয়তো।

সে বাম কাঁধে ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াতে গেলেই বাদল তার অন্য হাতের কব্জি চেপে ধরলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই স্পর্শ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকে। মৌমিতা সরতে গিয়েও দেরি করে ফেলেছে, হাত ততোক্ষণে যেন অবশ! অগত্যা আরেক হাতে ব্যাগের ফিতেটা আঁকড়ে ধরে আবার বসে পড়লো মেয়েটা।

চোখের সামনে চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসে আরও।
মৌমিতা বিশ্বাস করতে চায় না, যা ঘটছে, তা বাস্তবেই ঘটছে। যে ছেলেটা তাকে বাজে ইঙ্গিত করেছিলো, স্পর্শ করতে চেয়েছিলো, সে সত্যি সত্যিই তার হাত ধরে রয়েছে। আশেপাশের কেউ এই দৃশ্য দেখলে বড়সড় কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। বাদল এসব নিয়ে কখনও ভাবে না, এখনও ভাবছে না। এদিকে মৌমিতার ভেতরটা মুষড়ে পড়তে থাকে কোনো ভয়ানক সর্বনাশের আশঙ্কায়। ছেলেটার শক্ত মুঠোর মাঝখানে তার ক্ষীণকায় কোমল হাতখানি কেঁপে ওঠে।

অনেকক্ষণ ধরেই দু'জনের মুখে কোনো কথা নেই। বৃষ্টি কমেছে খানিকটা, পুরোপুরি থামেনি। কিন্তু ঐ টুপটাপ শব্দ ছাপিয়ে মেয়েটা নিজের হৃদস্পন্দন শুনলো শুধু। আতঙ্কে তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, বাদলের হাতটা আরও ভালোভাবে অনুভব করতে পারছে সে, যেন এক অপরিচিত তপ্ত শিহরণ তার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে যাচ্ছে।
নিজের সাথে অনেক সংগ্রামের পর সে বিড়বিড় করে, “হাত ছাড়ো।”

বাদল ছেড়ে দেয়। মৌমিতার হাতটা তবু কিছুক্ষণ বেঞ্চের উপরেই পড়ে থাকে। এতোক্ষণ যাবৎ ছেলেটার ধরে রাখা হাতের অংশটুকু হঠাৎ অনাবৃত হয়ে পড়ায়, ত্বকের উপর শীতল বাতাস এসে বেশ জোরেই ধাক্কা দেয়। এক মুহূর্ত আগের ঐ উষ্ণতার শূন্যতা জানান দেয়। জানান দেয়, একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। যথেষ্ট ছাপও ফেলে গেছে।

বাইরে এখনও অন্ধকার। কয়টা বাজে? মাগরিবের সময় হয়ে যায়নি তো?

মৌমিতা উঠে দাঁড়ালো, “আমি গেলাম।”

তারপর দ্রুত হাঁটতে থাকে সে। বিপরীত দিক থেকে আসা ক্ষিপ্র হাওয়ায় কখন তার মাথা থেকে ওড়না সরে গেছে, টের পায় না। এ মুহূর্তে তার লক্ষ্য একটাই। এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া।

“মৌমিতা?”

মেয়েটার পা জমে গেলো। নাম ধরে ডাকার দুঃসাহস কোথায় পেলো বাদল?
মৌমিতা ছুটে বেরিয়ে যেতে চাইলো প্ল্যাটফর্ম থেকে। কিন্তু বিধ্বস্ত দেহটা তাতে সায় দেয় না। পায়ের তলায় যেন শিকড় গজিয়ে গেছে। মেঝের সাথে আটকে গেছে সেগুলো। তার মনে হলো, বাদল এগিয়ে আসছে। এখানে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয়। কিন্তু সে নড়তে পারে না এক চুল পরিমাণও। অবচেতন মনের একটা অংশ এখনও কৌতূহলী, ছেলেটার পরবর্তী স্পর্ধা কেমন হবে? কী করতে পারে সে?

কাছে কোথাও বিদ্যুৎ চমকালো, এক মুহূর্তের জন্য কর্কশ আলোয় ছেয়ে গেলো নাটোর রেলস্টেশন। বিকট শব্দে বাজ পড়লো কোথাও। পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার ভেতরেও প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়ে যায়। চলে যাবে, নাকি রয়ে যাবে এভাবেই? তার মনের মাঝে তীব্র দ্বন্দ্ব চলাকালীনই বাদল আরেকটা তীর ছোঁড়ে, “আমি আপনাকে ভালোবাসি।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp