ভাঙা আয়নার আলো - পর্ব ১৯ - শারমিন আক্তার সাথী - ধারাবাহিক গল্প

ভাঙা আয়নার আলো - শারমিন আক্তার সাথী
          সকালের আলোটা আজ অদ্ভুত নির্মম লাগছে কোয়েলের কাছে। জানালার ফাঁক গলে সোনালি রোদ ঢুকছে কেবিনে, অথচ সেই আলোয় কোনো উষ্ণতা নেই। বরং মনে হচ্ছে প্রতিটা রোদ্দুর ওর বুকের ভিতর জমে থাকা ক্ষতগুলোকে আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে।হাসপাতালের সাদা বেডে নিথর হয়ে শুয়ে আছে কোয়েল। চোখদুটো স্থির সিলিংয়ের দিকে। কিন্তু দৃষ্টি যেন সেখানে নেই। বহু দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে।

চোখের কোণ বেয়ে বইছে অনর্গল অশ্রুধারা। জবা চৌধুরী ওর সাথে এমন কিছু করবে ও কল্পনাও করেনি। ভেবেছিল শাস্তি হিসাবে চাকরিচ্যুত করবে অথবা আর্থিক ক্ষতি করবে। কিন্তু কোনো মেয়ে অন্য একটা মেয়েকে এমন শাস্তি দিতে পারে ওর ধারণা ছিল না! একটা মেয়ে হয়ে কীভাবে আরেকটা মেয়ের মাতৃত্ব কেড়ে নেয়?

গতকাল বিকেলে কোয়েলকে কল করেছিল জবা। কণ্ঠটা ছিল বরফের মতো ঠান্ডা।
'আমাদের অফিসের কাছের হসপিটালে আসো। রুম নাম্বার ৭০৫।'
থমকে গিয়ে কোয়েল জিজ্ঞেস করল,
'কেন?'
'আসো। কথা আছে জরুরি।'

তারপর কোয়েলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই জবা চৌধুরী কল কেটে দেয়। কোয়েলের কাছে কোনো অপশন ছিল না। ও তৎক্ষনাৎ হসপিটালে চলে গিয়েছিল।
হাসপাতালে ঢোকার পর থেকেই কোয়েলের বুক ধড়ফড় করছিল। করিডোরের সাদা আলো, জীবাণুনাশকের গন্ধ, নার্সদের দ্রুত হেঁটে যাওয়া, সবকিছু মিলিয়ে একটা অজানা ভয় চেপে বসেছিল ওর শরীরে।

রুম ৭০৫ এর সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার ঢোক গিলেছিল কোয়েল। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই দেখল, জবা চৌধুরী সোফায় পা তুলে আরাম করে বসে আছে। তার সামনে একজন যুবক একজন ডাক্তার।

জবাকে দেখে কোয়েলের বুকের ভিতরটা ধপ করে উঠল। এই নারীকে ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ জবা হাসতে হাসতেও মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। কোয়েলের মনে ভয়ের উদয় হলো। ঢোক গিলে গলা শুকানোর চেষ্টা করল। লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে সাহস সঞ্চয় করার বৃথা চেষ্টাও করল। কিন্তু সাহসটা বড্ড বেইমানি করছে। জবাকে দেখে সে আগেই পালিয়েছে।

জবা ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল,
'দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো।'
কোয়েল বসল। হাত-পা কাঁপছে ওর। জবা টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। বলল,
'এটা খেয়ে গলা ভিজাও। তোমায় দেখলেই বোঝা যাচ্ছে ভয়ে তোমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।'

কোয়েল যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো জবার কথা শুনল। ভিতর থেকে বড্ড ভয়ে আছে ও
জবা জানে ও-ই জবার কার অ্যাকসিডেন্ট করাতে চেয়েছিল। সেটা জানার পর থেকে কোয়েল প্রচণ্ড ভয়ে আছে। জবা না ওকে গুম করে দেয় সে ভয়। ওকে গুম করতে জবার বেশি সময় লাগবে না।

ঢকঢক করে পানি খাওয়ার পর কোয়েল জিজ্ঞেস করল,
'আমাকে কেন ডেকেছেন ম্যাডাম?'

জবা হাসল। সেই হাসিটা ভয়ংকর সুন্দর। যেন বিষ মেশানো ফুল। ধীরে ধীরে বলল,
'তোমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য।'
কোয়েলের বুক কেঁপে উঠল।
জবা শান্ত স্বরে বলতে লাগল,
'তোমার পানিতে অজ্ঞান হওয়ার ওষুধ ছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে তুমি জ্ঞান হারাবে।'

কোয়েলের চোখ তখনই ঝাপসা হয়ে আসছিল। চারপাশটা দুলে উঠছিল। ও কাঁপা গলায় বলল,
'কি… শাস্তি?'
জবা সামান্য ঝুঁকে এলো। তার চোখে কোনো রাগ নেই। কোনো উত্তেজনাও নেই। শুধু ভয়ংকর স্থিরতা।
'জ্ঞান হারানোর পর তোমার অপারেশন হবে।'
 ঘুম ঘুম কণ্ঠে বলল,
'কিসের অপারেশন?'
'তোমার জরায়ু আর ডিম্বাশয় কেটে ফেলা হবে।'
মুহূর্তেই কোয়েলের শরীর বরফ হয়ে গেল।
জবা আবার বলল,
'তুমি জীবনে মা হতে পারবে না। ডিম্বাশয় কাটার পর আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাধ্যমেও তোমার অংশ আর এ পৃথিবীতে আনা সম্ভব হবে না। এটাই তোমার শাস্তি।'

ঘুমের ঘোরেও কোয়েল বুঝল ওর কত বড়ো বিপদ। ও উঠে পালাতে চাইলে, জবা উঠে দাঁড়িয়ে পিছন থেকে এমন এক লাথি মেরেছিল যে কোয়েল মেঝেতে ছিটকে পড়ে যায়। মাথা ঝিমঝিম করছিল। চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। শেষবার ও যা দেখেছিল, জবা চৌধুরী ঠান্ডা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। যেন একজন মানুষ না।
বরং বিচারক।

তারপর…! অন্ধকার। জ্ঞান ফিরতেই কোয়েল বুঝল, সব শেষ। তলপেটের অসহ্য ব্যথা ওকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, ও আর আগের মানুষটা নেই। ও ধীরে ধীরে হাত তুলে নিজের পেট স্পর্শ করল। চোখ থেকে আবার জল গড়িয়ে পড়ল। একটা মেয়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ কী? নিজের মাতৃত্ব হারানো। কোয়েল ঠোঁট কামড়ে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করল। পারল না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মুখ ফুটে বলে উঠল,

'জবা চৌধুরী...!
ওর কণ্ঠে জমে উঠল ঘৃণা, প্রতিশোধ আর অসহ্য যন্ত্রণা।
'তোমাকে আমি ছাড়ব না।'
চোখ মুছতে মুছতে ফিসফিস করে বলল,
'তুমি আমার মা হওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছো। আমি তোমার সন্তান কেড়ে নিব।'

ওর চোখ লাল হয়ে উঠল।
'তোমার জান তো ওই মেয়ের মধ্যেই। আমি সেই জায়গাতেই আঘাত করব।'
হাসপাতালের সাদা দেয়াল নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। কোয়েল ধীরে ধীরে ঠোঁট বাঁকিয়ে ফিসফিস করল,
'আমি কোয়েল। এত সহজে হার মানার মেয়ে আমি নই। তোমাকে আমি শেষ করে দিব, জবা চৌধুরী।'

—————

জারা ছোট ছোট পা ফেলে কেবিনে ঢুকতেই হাসপাতালের ভারী পরিবেশটা যেন খানিক নরম হয়ে গেল। শিশুরা বোধহয় এমনই তারা অজান্তেই বিষণ্নতার মাঝেও একফোঁটা আলো এনে দেয়।

বেডে আধশোয়া ইরফানের দিকে তাকিয়ে জারা কৌতূহলী চোখে বলল,
'বাবা তুমি ব্যথা পেলে কী করে?'
প্রশ্নটা শুনে ইরফান জবার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত সংকোচ। মনে হচ্ছিল, নিজের মেয়ের চোখে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে তার। জবা শান্ত কণ্ঠে বলল,
'তোমার বাবা পড়ে গিয়েছিল মা।'
জারা আবার প্রশ্ন করল,
'কীভাবে পড়লে বাবা?'
ইরফান ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টানল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
'হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছি। ভেবেছিলাম রাস্তা সমতল অথচ ভুলে গিয়েছিলাম সামনে কাটাওয়ালা গাছ আছে।'

কথাটা শুনে জবা চুপ করে রইল।
কারণ ইরফান শুধু নিজের ব্যথা পাওয়ার কথা বলেনি। নিজের জীবনটার কথাও বলে ফেলেছে। সে ভেবেছিল তার সংসার নিরাপদ, শান্ত, সুন্দর। কিন্তু নিজের লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা আর ভুল সিদ্ধান্তের কাঁটায় নিজেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে।

জারা কিছুই বুঝল না। সে নিষ্পাপ চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বেডের কাছে এগিয়ে এলো।তারপর ছোট্ট হাতটা ইরফানের মাথায় রেখে বলল,
'কষ্ট হচ্ছে বাবা?'
ইরফান মেয়ের হাতটা নিজের হাতে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
'হ্যাঁ খুব।'
জারা সাথে সাথে গম্ভীর হয়ে গেল। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব এখন ওর কাঁধে।
'আমি আদর করে দিলে কষ্ট কমে যাবে। তুমি চোখ বন্ধ করো।'

ইরফান বাধ্য ছেলের মতো চোখ বন্ধ করল।
জারা খুব যত্ন করে বাবার মাথায় হাত বুলাতে লাগল। তারপর ঝুঁকে এসে বাবার কপালে ছোট্ট একটা চুমু খেল। মুহূর্তেই ইরফানের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

এত সুন্দর একটা সংসার ছিল তার। একটা মেয়ে, ছিল যে তাকে নিঃস্বার্থভাবে নিজের সবটা উজার করে ভালোবাসত। একটা সন্তান, যে এখনও তাকে পৃথিবীর সেরা বাবা মনে করে।

তবুও সে বিপথে গিয়েছিল। নিজের হাতে নিজের সাজানো স্বর্গ ভেঙে ফেলেছিল। মানুষ কখন নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনে, তা বোধহয় ধ্বংসের আগে বুঝতে পারে না।

ইরফানের চোখের কোণ ভিজে উঠল।
ধীরে ধীরে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল কান বেয়ে। এ কান্না ব্যথার না। এ কান্না অনুশোচনার। নিজের হাতে হারিয়ে ফেলা সুখের জন্য জন্ম নেওয়া এক নিঃশব্দ শোকের।

—————

জেনারেল ওয়ার্ডের শেষ কোণার বেডটায় নিঃশব্দে শুয়ে ছিল সিনথিয়া।চারপাশে অসুস্থ মানুষের কষ্টের শব্দ, নার্সদের হাঁটাহাঁটি, ওষুধের গন্ধ। সব মিলিয়ে একটা ভারী, ক্লান্ত পরিবেশ। তবুও সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছিল অন্য একটা বিষয়। প্রতিটা বেডের পাশে কেউ না কেউ আছে। কোথাও মা সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কোথাও স্বামী স্ত্রীর জন্য ফল কেটে দিচ্ছে। কোথাও সন্তান বাবার হাত ধরে বসে আছে। শুধু সিনথিয়ার বেডটাই ফাঁকা।

একা। বড্ড একা ও। কনুই ভাঁজ করে কপালের উপর হাত রেখে চোখ বন্ধ করে ছিল ও। মুখটা শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি জমেছে। একসময় যার সৌন্দর্যে মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত, আজ সেই মেয়েটাকে দেখে করুণা লাগে। মানুষের রূপ সত্যিই ক্ষণস্থায়ী। আজ যে সৌন্দর্যে পৃথিবী পাগল হয়, কাল সময় সেটাকে নিষ্ঠুরভাবে মুছে দেয়। এ কারণেই বোধহয় রূপের চেয়ে গুণের প্রেমে পড়তে হয়।

ধীরে ধীরে সিনথিয়ার বেডের সামনে এসে দাঁড়াল জবা চৌধুরী। তার উপস্থিতিতেই যেন আশেপাশের বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেল। জবা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত স্বরে বলল, 
'কেমন আছো সিনথিয়া?'

সিনথিয়া চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল জবা চৌধুরী। ওর চোখে একরাশ ঘৃণা আর ভয় ফুটে উঠল। অসহায় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
'কেন করলেন আমার সাথে এমন?'

জবা ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
'তুমি জানো না?'

সিনথিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল। বলল,
'এর চেয়ে মেরে ফেলতেন।'

জবা মুখ দিয়ে ধীরে চুক চুক করে শব্দ করল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
'তোমারা যা অন্যায় করেছো তার শাস্তি মৃত্যুর চেয়ে জঘণ্য হতে হবে।'

জবা একটু ঝুঁকে এলো সিনথিয়ার দিকে। চোখ দিটো অদ্ভুত শান্ত। বলল,
'মরে গেলে তো মুক্তি পেয়ে গেলে। বেঁচে থেকে মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করাই হচ্ছে আসল শাস্তি।'

সিনথিয়ার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ও ফিসফিস করে বলল,
'ইরফানের কী শাস্তি দিলেন?'

জবার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বাঁকা হাসি ফুটল। ভয়ংকর সেই হাসি। বলল,
'ডোন্ড ওয়ারি সেও শাস্তি পেয়েছে। কিন্তু এখনও জানে না।'

সিনথিয়ার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
জবা তখন ব্যাগ খুলে একটা চেক বের করল।
চেকটা সিনথিয়ার হাতে সেটা গুঁজে দিয়ে বলল,
'জবা চৌধুরী কারও সাথে নাইনসাফি করে না।'

সিনথিয়া কাঁপা হাতে চেকটার দিকে তাকাল।
এক কোটি টাকা। জবা শান্ত কণ্ঠে বলতে লাগল,
'তুমি আমার সাথে যা করেছো, তার প্রাপ্য তুমি পেয়েছো। হয়তো ভবিষ্যতেও পাবে।'

তারপর ওয়ার্ডের চারপাশে একবার তাকিয়ে ধীরে বলল,
'তবে একা মেয়ের পক্ষে এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কঠিন।'
জবার কণ্ঠে হালকা বিদ্রুপ মিশে গেল।
'এই টাকাটা রাখো। আশা করি সামনের দিনগুলো হেসে খেলেই কেটে যাবে তোমার।'

সিনথিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিল।
জবা ওকে সুযোগ দিল না।
আরও কাছে ঝুঁকে বিষের মতো ধীরে ধীরে বলল,
'টাকার জন্যই আমার স্বামীকে সিডিউস করেছিলে। এখন এই টাকা দিয়ে রোজ নিত্য নতুন লোকদের সিডিউস করো।'

ওর ঠোঁটে নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল। বলল,
'এখন তো বাচ্চা হওয়া কিংবা পিরিয়ড হওয়ারও ঝামেলা নেই তোমার।'

সিনথিয়ার চোখ বড়ো হয়ে গেল। মনে হলো কেউ ওর বুকের ভিতর ছুরি ঘুরিয়ে দিল। জবা সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর একবারও পিছনে না তাকিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে বের হয়ে গেল ওয়ার্ড থেকে।

পিছনে পড়ে রইল সিনথিয়া। হাতে এক কোটি টাকার চেক। আর বুকের ভিতর অসহনীয় শূন্যতা। কারণ পৃথিবীর সব টাকা মিলিয়েও কিছু জিনিস আর কখনো ফেরত পাওয়া যায় না।

—————

দুদিন পর....
হাসপাতালের কেবিনের জানালার পাশে শুয়ে দূরের ফাঁকা মাঠটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ইরফান। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে। আকাশে রঙ বদলাচ্ছে, কিন্তু ইরফানের জীবনে যেন সব রঙ একসাথে মরে গেছে।

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল জবা। ধীর পায়ে এসে দাঁড়াল ওর বেডের পাশে। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি। না সেখানে ভালোবাসা আছে, না মায়া। যেন দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে ক্লান্ত এক সৈনিকের শীতল নির্লিপ্ততা।

নিচু স্বরে বলল জবা,
'কেমন লাগছে জান?'

ইরফান ধীরে চোখ বন্ধ করল। গলার স্বর ভেঙে এলো। বলল,
'এর চেয়ে আমায় মেরে ফেলতে জবা।'

জবা মৃদু হেসে উঠল। সেই হাসিতে শীতল বিষের মতো কিছু ছিল।
'মৃত্যু তো মানুষকে মুক্তি দেয়। আর তুমি তো এত সহজে মুক্তি পাবে না ইরফান। বেঁচে থেকেও প্রতি মুহূর্তে তুমি মরবে।'

ও আরও কাছে এগিয়ে এল। চোখে ভয়ংকর স্থিরতা। বলল,
'নারী শরীরের প্রতি খুব লোভ ছিল তোমার। এখন সুন্দর থেকে সুন্দরতম নারী তোমার সামনে ল্যাংটা হয়ে নাচলেও, তোমার ভিতরে তার কাছে যাওয়ার কোনো অনুভূতি জন্মাবে না। কোনো কামনা না। কোনো আকর্ষণ না। কিছুই না।’

একটু থামল জবা। তারপর খুব ধীরে বলল,
'আর না কোনোদিন তুমি নিজের অংশ পৃথিবীতে আনতে পারবে। তোমার একমাত্র অংশ কেবল জারাই।'

ইরফান আর তাকাতে পারল না। মুখ ফিরিয়ে নিল। বুকের ভিতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
পুরুষ হয়ে থেকেও আজ সে অসম্পূর্ণ।
জবা তার শরীর থেকে শুধু ক্ষমতাই কেড়ে নেয়নি। কেড়ে নিয়েছে তার অহংকার, তার পৌরুষ, তার ভবিষ্যৎ। মৃত্যু হয়তো সহজ ছিল। এ জীবন তার চেয়েও ভয়ংকর।

ইরফান আর কোনো কথা বলল না। অপরদিকে মুখ ঘুরিয়ে চোখ বন্ধ করল।
জবা ওর শরীরের অনুভূতি শক্তি নষ্ট করে দিয়েছে। এখন কোনো মেয়েকে দেখলে ওর ভিতর কোনো রকম অনুভূতি কাজ করবে না। সাথে কেড়ে নিয়েছে ওর বাবা হওয়ার ক্ষমতা। এখন ইরফানকে হিজরা বললে ভুল বলা হবে না। এর চেয়ে জবা ওকে মেরে ফেলতে পারত। সেটা ওর কাছে অধিক সুখের হতো।

ইরফান বিস্ময়ে তাকাল। কেন? এত ঘৃণার পরও এ স্পর্শ কেন? জবা চোখ বন্ধ করল। কয়েক ফোঁটা জল কাঁপতে কাঁপতে চোখের কোণেই আটকে রইল। এই মানুষটাকেই তো ভালোবেসেছিল। উন্মাদের মতো।
নিজের পৃথিবীর কেন্দ্র বানিয়েছিল। এই মানুষটা ওর স্বামী। আর সেই মানুষটাই ওর সমস্ত বিশ্বাসকে পিষে ধুলো করে দিয়েছে।
জবা ধীরে বিছানার পাশে বসে ইরফানের হাতটা ধরল।

জবা চোখ বন্ধ করে লম্বা নিঃশ্বাস নিলো। ওর চোখের ভেইনগুলো লাল দেখাচ্ছে। জবা ইরফানের পাশে বসল। ওর হাত ধরে বলল,
'কেন করলে আমার সাথে এমন ইরফান?'
গলাটা কেঁপে উঠল এবার জবার। বলল,
'এতদিন এ প্রশ্ন আমি করিনি। আজ করছি বলো? কিসের ঘাটতি ছিল আমার ভালোবাসায়?'

ইরফান ঠোঁট নড়াল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। কারণ সত্যি বলতে, উত্তরটা ও নিজেও জানে না। হয়তো নেশা। নারীর নেশা।
টাকার নেশা। ক্ষমতার নেশা। আর সেই নেশাই আজ তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।

জবা ইরফানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
'এটাই তোমাকে দেওয়া আমার শেষ চুমু। এরপর আর আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকবে না।'

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল ও। বলল,
'সত্যি বলতে তোমার প্রতি এখন আমার কোনো ভালোবাসা, মায়া, অনুভূতি কাজ করে না। তুমি যদি অবৈধ সম্পর্কে না জড়িয়ে আমাকে যদি বলতে জবা আমি আরেকটা বিয়ে করতে চাই। বিশ্বাস করো আমি নিজে মেয়ে দেখে তোমাকে বিয়ে করতাম। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা এরূপ ছিল।'

জবার কণ্ঠ ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে এলো। বলল,
'কিন্তু যখন থেকে জানলাম তুমি আমাকে ভালোবেসে নয় বরং আমার সম্পত্তির লোভে বিয়ে করেছো তখন থেকে তোমার প্রতি আমার অনুভূতি মরতে শুরু করেছিল। কিন্তু যখন জানলাম তুমি আমি ব্যতিত একাধিক মেয়ের সাথে অবৈধ মেলামেশা করেছো; তখন থেকে তোমার প্রতি থাকা আমার সকল ভালোবাসা, মায়া কেমন যেন উধাও হয়ে গেল।'

জবার চোখ আরও লাল হয়ে উঠল,
'আর যেদিন নিজ চোখে তোমাকে আর সিনথিয়াকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখলাম সেদিন থেকে তোমার প্রতি ঘৃণার জন্ম হলো। তোমার প্রতি আমার শেষ ভালোবাসাটুকুও মরে গেল। এখন তোমার প্রতি মায়া, ভালোবাসা কোনো অনুভূতিই অবশিষ্ট নেই। অবশিষ্ট আছে কেবল ঘৃণা। ভয়ংকর ঘৃণা।

জানো ইরফান, তোমার আসল রূপ সামনে আসার আগে আমি নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী ভাবতাম তোমায় পেয়ে। তোমার স্ত্রী হতে পেরে অহংকারে আমার যেন মাটিতে পা পড়ত না। বন্ধুমহলে তোমাকে নিয়ে আমার গর্বের শেষ ছিল না। সেই তুমি আমার সকল অহংকার আর গর্বে নোংরা ছুড়ে মারলে। যাই হোক অনেক কথা বলেছি এখন এই কাগজে সাইন করো।'

ইরফান চুপ রইল কিছুক্ষণ। আটকানো কণ্ঠে বলল,
'কিসের পেপার?'
'আমাদের ডিভোর্স পেপার। আর জারার কাস্টাডি পেপার।'

ইরফানের বুক ধক করে উঠল। বলল,
'মানে?'
'মানে তুমি জারার উপর কোনো অধিকার দেখাতে পারবে না। ও কেবল আমার মেয়ে। ওর সাথে দেখাও করতে পারবে না।'

মুহূর্তেই ইরফান ভেঙে পড়ল।
'এ অসম্ভব! জারা আমার জান। ওকে না দেখে আমি থাকতে পারব না।'

জবার কণ্ঠ এবার পাথরের মতো কঠিন,
'এটাই তোমার শাস্তি ইরফান। এ জীবনে তুমি আর জারার চেহারা দেখতে পাবে না।'

'আমি এ নিয়ে আদালতে যাব।'

'যেতে পারো। কিন্তু তুমি ভালো করেই জানো তুমি জিততে পারবে না। তোমার পরকীয়ার লিস্ট দেখালেই তুমি হেরে যাবে। তো শুধু শুধু এসব করে সময় নষ্ট করো না। আর যে কথাগুলো এখন বাড়ির ভিতরে আছে তা আদালতে টেনে নিও না। তাতে সম্মানহানি তোমারই হবে। আমি তো বেচারি বউয়ের অ্যাক্টিং করে পার পেয়ে যাব। তুমি পাবে না। তো সাইন করে নিজেও মুক্ত হও। আমাকেও মুক্ত করো।'

কিছুক্ষণ থেমে ঠান্ডা গলায় জবা বলল,
'ভয় নেই তোমার সকল দেনা পরিশোধ করে দিয়েছি। এখন কেউ তোমাকে মারতে আসবে না। আর যে টাকার জন্য তুমি এতকিছু করলে সে টাকাও তোমাকে দিয়েছি। তোমার অ্যাকাউন্টে অলরেডি পঞ্চাশ কোটি টাকা আমি দিয়েছি। তোমার স্বপ্নের প্রজেক্টও তোমার নামেই করে দিয়েছি। এখন তুমি যা খুশি করতে পারো।'

ইরফান হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইল। জবা বলল,
'আচ্ছা ইরফান টাকার জন্য এত কিছু তো করলে, সেই টাকা এখন তোমার হলো। তুমি এখন সুখী ইরফান?'

প্রশ্নটা যেন ছুরি হয়ে বিঁধল ইরফানের বুকে।
ইরফান বেড থেকে নিচে নেমে জবার পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল৷ বলতে লাগল,
'আমায় মাফ করো জবা। একটা বার মাফ করে দেখো। আমি আর এমন করব ন। আমার টাকা পয়সা, সম্পদ কিছু চাই না। আমার কেবল তোমায় আর জারাকে চাই।'

জবা অনুভূতিহীন কণ্ঠে জবাব দিল,
'সাইন করো ইরফান।'
'না।'
জবা নিচু হয়ে ইরফানকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। ইরফান থমকে গেল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
'যদি সত্যি আমাকে আর জারাকে ভালোবাসো তবে তোমার এই পাপী জীবন থেকে আমাদের মুক্তি দাও। প্রাণ খুলে বাঁচতে দাও আমাদের। তোমার আসে পাশে তোমার চরিত্রে ভয়ংকর দুর্গন্ধ। সে দুর্গন্ধে আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারি না। আমাদের নিঃশ্বাস নিতে দাও। বাঁচতে দাও আমাদের।'

ইরফান অপরাধী চোখে তাকিয়ে রইল জবার পানে। তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে সাইন করে দিলো ডিভোর্স পেপারে। চিরতরে শেষ হয়ে গেল জবা আর ইরফানের সম্পর্ক।

—————

পরিত্যক্ত বিশাল টিনের ঘরটা যেন সময়ের বুকের মধ্যে আটকে থাকা এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস। এ বাড়ি ফারিসের নানার। একসময় এখানে চাঁদের হাট বসত। উঠোনজুড়ে মানুষ, হাসির শব্দ, পিঠার গন্ধ, শিশুর দৌড়ঝাঁপ। সব মিলিয়ে বেঁচে থাকার উষ্ণতা ছিল।
এখন? নিস্তব্ধতা।

একা পড়ে থাকা পুরোনো টিনের ঘর।চারপাশে বিশাল গাছপালা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন বাড়িটার পাহারাদার।
পটুয়াখালীর বাউফল থেকে আরও দূরে মাধবপুর গ্রাম। এখানেই জবাদের পৈতৃক ভিটা। জবার দাদা-দাদি বহু বছর আগে মারা গেছেন। তারপর থেকে বাড়িটা ধীরে ধীরে মানুষশূন্য হয়ে পড়ে।

তবুও জবার বাবা, জয়নুল আবেদিন চৌধুরী, বাড়িটাকে অবহেলা করেননি। প্রতি বছরই আসেন। ভাঙা বেড়া ঠিক করান, টিন পাল্টান, আগাছা কাটান। বাড়িটার দেখাশোনার জন্য লোকও রাখা আছে। যেন মৃত স্মৃতিগুলোকেও তিনি বাঁচিয়ে রাখতে চান।

ফারিসরা আসবে শুনে আরও দুজন কাজের লোক রাখা হয়েছে।

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে জবা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বুকের ভিতরটা কেমন হু হু করে উঠল। বাড়িটা যেন অনেকদিন পর মানুষ দেখে নিঃশব্দে কেঁদে উঠেছে।

দাদা-দাদি বেঁচে থাকতে প্রতি ছুটিতেই এখানে আসা হতো। উঠোনে দৌড়াত ছোট্ট জবা। বৃষ্টিতে ভিজত। টিনের চালের শব্দ গুনত।
তারপর মানুষগুলো চলে গেল। সাথে করে নিয়ে গেল বাড়িটার প্রাণও।

আজ এত বছর পর আবার এ বাড়িতে আসা।
আর এ আসার পেছনে কারণ ফারিস। জবার তালাক হয়েছে মাত্র এক সপ্তাহ আগে। ভিতর থেকে ভেঙে পড়ছে ও। যদিও মুখে তা প্রকাশ করে না। ফারিস অনেক ভেবেছিল, কী করলে জবার মনটা একটু ভালো হয়। কী করলে ওর বুকের ভিতরের যুদ্ধটা একটু থামে!

সেদিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল,
'তোর এখন কী মন চাইছে?'
জবা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল,
'টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতে মন চাচ্ছে।'

ফারিসের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। আষাঢ় মাস চলছে। এ সময় গ্রামের টিনের ঘরে বৃষ্টির শব্দ মানেই অন্যরকম এক বিষণ্ণ শান্তি।ফারিস আর দেরি করেনি। দুদিনের মধ্যেই সব ব্যবস্থা করে সবাইকে নিয়ে চলে এসেছে মাধবপুরে।

চারপাশজুড়ে বিশাল বিশাল গাছ। আম, জাম, কাঁঠাল, ডালপালা মিলে আকাশ ঢেকে দিয়েছে প্রায়। বিকেল নামার আগেই বাড়িটার চারপাশে অদ্ভুত এক অন্ধকার নেমে আসে।
তবুও কী শান্ত! কী মায়াময়! এমন বাড়িতে মানুষ চাইলে পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে পারে।

সন্ধ্যা নামার আগেই আকাশ কালো হয়ে এলো। তারপর হঠাৎ করেই আষাঢ়ের রাগী বৃষ্টি নামল। ঝমঝম শব্দে টিনের চাল কেঁপে উঠল। মনে হচ্ছিল আকাশ নিজের সব জমে থাকা কান্না একসাথে ঢেলে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে।

বৃষ্টির সাথে সাথেই বিদ্যুৎ চলে গেল। চারপাশ অন্ধকার। শুধু বৃষ্টির শব্দ। আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলক। জবা চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল। দীর্ঘ সময় শুধু বৃষ্টির শব্দ শুনল।
টিনের চালে বৃষ্টির শব্দের মাঝে অদ্ভুত এক মায়া আছে। মনে হয় পৃথিবীর সব কোলাহল দূরে সরে গেছে। সব ব্যথা ধুয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

ঠান্ডা বাতাসে জারার গায়ে কম্বল টেনে দিল জবা। তারপর ধীরে ধীরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। সামনে ঝমঝম বৃষ্টি।
অন্ধকারে গাছগুলোকে আরও গভীর লাগছে।

জবা হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল বৃষ্টিকে। ঠান্ডা পানির ফোঁটা আঙুল ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়তেই বুকের ভিতর কেমন শূন্য শূন্য লাগল। আজ খুব ভিজতে ইচ্ছে করছে। একদম শিশুর মতো। সব ভুলে। সব কষ্ট ধুয়ে ফেলতে।
কিন্তু পারে না। এ সময় ভিজলে নিশ্চিত জ্বর আসবে। তাই শুধু হাত বাড়িয়ে বৃষ্টিকে ছুঁয়ে রইল।

বারান্দার অন্যপাশে দাঁড়িয়ে ছিল ফারিস।অন্ধকারে জবা খেয়াল করেনি। কিন্তু ফারিস একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। বৃষ্টিভেজা অন্ধকারে জবাকে আজ অন্যরকম লাগছে। যেন বহুদিনের হারানো কোনো গল্প হঠাৎ জীবন্ত হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে।

ঠিক তখনই, আকাশ চিরে তীব্র বিদ্যুৎ চমকাল। সেই সাদা আলো এক মুহূর্তের জন্য পুরো বারান্দা আলোকিত করে তুলল। আর আলোতেই জবা দেখতে পেল বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে। চমকে উঠে বুকের কাছে হাত চেপে বলল,
'ও মা গো!'
ফারিস সাথে সাথে হেসে উঠল।
বৃষ্টির শব্দ ভেদ করে ওর কণ্ঠ ভেসে এলো,
'কীরে? ভয় পেলি নাকি?'
মৃদু হাসল জবা। বলল,
'ভয় পাইনি। চমকে গেছে একটু।'

ফারিস ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো জবার দিকে।
চারপাশে তখন টিনের চাল ভেদ করে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ নেমে আসছে। দূরে কোথাও ব্যাঙ ডাকছে। ভেজা মাটির গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস।
হঠাৎ এক দমকা হাওয়া এসে জবার মুখের উপর এলোমেলো চুল ছড়িয়ে দিল। ফারিস কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে হাত বাড়িয়ে জবার গালে লেগে থাকা ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিল। সেই স্পর্শে জবার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। 

ফারিস নিচু স্বরে বলল,
'তোর হাতটা ধরি?'

মাত্র তিনটা শব্দ। তবুও শব্দগুলোর মধ্যে কত শত বছরের অপেক্ষা, কত না বলা ভালোবাসা, কত নিঃশব্দ আকুতি লুকিয়ে ছিল। এ যেন কোনো পুরুষের প্রশ্ন না,
ভালোবাসার কাছে ভালোবাসার অনুমতি চাওয়া।

জবা কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল ফারিসের দিকে। বৃষ্টির আলো অন্ধকারে মানুষটার চোখ দুটো কেমন অসহায় লাগছে।
তারপর ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর বুক থেকে। বলল,
'আমার ইদ্দতকাল চলছে।'

মুহূর্তেই থেমে গেল ফারিস। হাতটা ধীরে নামিয়ে নিল। মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
অনধিকারচর্চার অপরাধবোধে কেমন লজ্জিত হয়ে পড়ল সে। যেন না বুঝেই নিষিদ্ধ কোনো দরজায় কড়া নেড়েছে। বৃষ্টির শব্দ আরও ভারী হয়ে উঠল। জবা সেটা বুঝতে পেরে নরম গলায় বলল,
'পাশে বসুন। গল্প করি। অনেকদিন আমি মন খুলে কারও সাথে কথা বলি না।'

ফারিস চুপচাপ মাথা নেড়ে বারান্দার লম্বা কাঠের বেঞ্চটায় গিয়ে বসল। জবাও পাশে এসে বসল। দুজনের মাঝখানে অদ্ভুত এক নীরবতা। কিন্তু সে নীরবতা অস্বস্তির নয়।
বরং বহুদিন পর নিরাপদ কাউকে পাশে পাওয়ার শান্তি।

বৃষ্টি পড়ে চলল। টিনের চালের শব্দ কখনো তীব্র, কখনো মৃদু। ওরা গল্প করল। পুরোনো দিনের। শৈশবের। মেলার। হারিয়ে যাওয়া মানুষের।নভাঙা বিশ্বাসের। নিঃশব্দ কষ্টের।

অনেকদিন পর জবা এত কথা বলল।
অনেকদিন পর ফারিস এত মন দিয়ে শুধু একজন মানুষকে শুনল। 

রাত আরও গভীর হলো। বৃষ্টির শব্দ ধীরে ধীরে কোমল হয়ে এলো। একসময় কথা বলতে বলতে জবার চোখ দুটো ভারী হয়ে এলো। ও অজান্তেই ধীরে মাথাটা ফারিসের কাঁধে রেখে দিল।

কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল ফারিস। নিঃশ্বাস নিতেও ভয় লাগছিল যেন। জবা ঘুমিয়ে পড়েছে। এত শান্ত মুখে তাকে বহু বছর দেখেনি ফারিস।

মনে হচ্ছে বহুদিন যুদ্ধ করার পর অবশেষে একটু আশ্রয় পেয়েছে মেয়েটা। ফারিস নড়ল না। একটুও না। শুধু নিঃশব্দে বসে রইল।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ভিতরে তার বুকের মধ্যে এক সমুদ্র শান্তি।
ফারিস মনে মনে বলল,
'এ জীবনে এর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি হয়তো আমার আর কিছু নেই।'
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp