পবনপত্র - পর্ব ১৩ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          রাস্তার দুই পাড়ে কাশবন। মাটির রাস্তা, কোথাও কোথাও কাদা জমে আছে। বাদল সাইকেল চালাচ্ছে ধীরে ধীরে। কোনো তাড়া নেই। রাশেদ পেছনে বসে আছে। সামনে একটা ব্রিজ, আমজাদ সেখানে সাইকেল থামায়। তার কাছাকাছি এসে বাদলও থামে, রাশেদ নেমে পড়ে। আমজাদ ব্রিজের এক কোণে গিয়ে দাঁড়ায়, “এদিকে ভালোই বাতাস।”

বাদল নামলো না, প্যাডেল ঘুরিয়ে বললো, “আমি একটু ঐদিক থেকে আসি।”

কারও মতামতের অপেক্ষা করলো না সে। কাঁচা রাস্তায় নেমে পড়লো মুহূর্তের ব্যবধানে। দূর দূরান্তে কোনো মানুষ বা যানবাহন দেখা গেলো না, তবু তার সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ শুনলো বাকি দু'জন।
বাতাসে কাশফুলগুলো দুলছে। আমজাদ বড় একটা শ্বাস টেনে নিলো, “এই বাদলটা যখনই একা কোথাও যায়, তখনই মনে হয়, হারিয়ে যাবে।”

রাশেদ ব্রিজের কিনারায় আসে, আমজাদের পাশে দাঁড়ায়, “এখন ভালো করে বলেন তো, ঐদিন কী হয়েছিলো? বাদল কি আসলেই কারও গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করেছে?”

“আমি সেটা দেখিনি। কিন্তু আমার একটা কথা মনে হচ্ছে।”

“কী?”

“বাদল মনে হয়, এখনও ঐ মেয়েটাকে খুঁজছে। ডায়েরিটা ফেরত দিতে চাচ্ছে।”

রাশেদ পাশের মাঠটার দিকে তাকায়। বড় বড় ঘাস সেখানে। বাতাসের দোলায় মাঠ জুড়ে সবুজের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। বাদল অনেকক্ষণ আগেই দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। তবুও রাশেদ মাটির সড়কের দিকে আরেকবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।

“আমার সেটা মনে হচ্ছে না আমজাদ ভাই। কোনো কারণে ঐ ডায়েরির মেয়েটাকে ওর কাছে আর ভালো লাগছে না। একটা না একটা ঝামেলা তো হয়েছেই। এসব নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। যার জীবন, সে-ই বুঝুক।”

আমজাদ কথাগুলো শুনলো, আংশিক বুঝলো। তবু সহমত পোষণ করলো, “সেটাই।”

“এখানে দাঁড়ায় থাকতে ভালো লাগছে না। চলেন তো হলে যাই। বাদল যখন আসে, আসুক।”

ছুটির দিন। হোস্টেলের আশেপাশে আজ তেমন জনসমাগম নেই। রাশেদ আগেই হলে ফিরে গেছে। আমজাদ দোকান থেকে খাবারের প্যাকেট নিয়ে হলের দিকে যাচ্ছে। বাগানের ভেতরে সুরাইয়াসহ কয়েকজন মেয়েকে দেখে সে আরেকটু সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

“সুরাইয়া?”

মেয়েটা আমজাদের দিকে ঘুরে তাকায়, কৃত্রিম বিস্ময় নিয়ে এগিয়ে আসে, “বাব্বাহ! অবশেষে তোমার দাঁত গজিয়েছে। নামটা এতো ভালোভাবে বলার কোনো কারণ আছে কি?”

আমজাদকে দেখে মনে হলো, সে আগে থেকেই দমে আছে। মিনমিনে স্বরে বললো, “একটা সাহায্য চাইতাম তোমার কাছে।”

“কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”

“ঐ আরকি... তুমি কি মৌমিতা খন্দকার নামে কাউকে চেনো? আমাদের কলেজেই পড়ে।”

সুরাইয়া ভ্রু কুঁচকায়, “মৌমিতা খন্দকার? মৌমিতা নামের দুই-তিনজনকে চিনি। তবে পুরো নাম জানি না। কী দরকার তার সাথে?”

“বাদল খুঁজছে এই নামের একটা মেয়েকে—”

“বাদল আবার কে? তোমার ঐ রুমমেট নাকি?”

“হ্যাঁ।”

“কেন খুঁজছে?”

“সেটা পরেও বলা যাবে। তুমি আগে দেখো, খুঁজে পেলে আমাকে জানিয়ে দিও।”

আমজাদ ছেলেদের আবাসিক হলের দিকে হাঁটতে লাগলো। সুরাইয়া দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বাগানের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে অল্প কিছুক্ষণ। তারপর আবার বান্ধবীদের মাঝে ফিরে যায়।

রেলস্টেশন বিকেলের দিকে ফাঁকাই থাকে। আজকে ছুটির দিন হওয়ায় মোটামুটি ভালোই ভিড় দেখা যাচ্ছে। বাদল তাই আর ভেতরে দাঁড়ালো না। রেললাইনের পাত ধরে হাঁটতে শুরু করলো। আকাশে কিছু কালো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, রোদের তেজ কম। রেললাইনের অল্প দূরত্বেই কয়েকটা কুকুর শুয়ে রয়েছে। বাদল তাদের দিকে কয়েক পা এগোয়। ব্যাগে হয়তো পাউরুটির প্যাকেট আছে। সে একদিকে সরে এসে সন্তর্পণে ব্যাগের চেইন খোলে, ভেতরে উঁকি দেয়। পাউরুটি নেই, নীল ডায়েরিটা আছে। খানিকক্ষণ সেটার দিকে স্থির তাকিয়ে থাকার পর ছেলেটা প্ল্যাটফর্মে উঠে আসে। একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে। এখানে ছাউনি নেই। বিকেলের স্নিগ্ধ রোদ এসে পড়েছে ঢালাই করা মেঝেতে।
বাদল ডায়েরিটা বের করলো। সেটাকে বেঞ্চের উপর রেখে ব্যাগের চেইন লাগিয়ে নিলো ধীরে সুস্থে। চুপচাপ বসে রইলো কয়েক মুহূর্ত। তারপর উঠে দাঁড়ালো। প্ল্যাটফর্ম থেকে ঝাঁপ দিয়ে আবার ঢালুতে নেমে পড়লো।

গত রাতে বৃষ্টি হয়েছিলো। রেলের পাতগুলো পরিষ্কার। রোদে ঝিকমিক করছে। কুকুরগুলো ঝিমাচ্ছে এখনও। আর অল্প কিছুদূর এগিয়ে গেলেই স্টেশনের ঢালাই করা উঁচু প্ল্যাটফর্মটা শেষ। এরপর থেকে ফুলের বাগান।
বাতাস বইছে। বাদল টের পেলো, টুপটাপ বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। কুকুরগুলোও সহসা উঠে ছাউনির দিকে যাচ্ছে। ছেলেটা হাঁটা বন্ধ করে পেছনে ঘোরে। স্টেশনের ঐ বেঞ্চটা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তার উপরে ফেলে আসা ডায়েরিটা দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে। মুখের উপর, হাতের পিঠে, ঠাণ্ডা পানির অস্তিত্ব অনুভূত হলো আরও ভালোভাবে। মেঘের মৃদু গর্জনও শোনা গেলো বোধহয়, অথবা কেবলই মনের ভুল।

জগতে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অনুভূতি হলো মায়া। আর মানুষ যাকে ঘৃণা করে, তার মায়ায় পড়াটা একাধারে নির্বুদ্ধিতা। এই ভুল যদিও সবাই করে না। যে করে, তার সম্পূর্ণ জীবনটাই তছনছ হয়ে যায়। ঘৃণা করে ঠিকই, কিন্তু ছাড়তে পারে না। নিজের সবচেয়ে ঘৃণ্য বস্তুটি হয়ে ওঠে জীবন সাজানোর প্রধান উপকরণ! কিংবা এটাও মনের ভুল, প্রবৃত্তির প্ররোচনা।

বাদল ছুটে এসে ডায়েরিটা হাতে তুলে নেয়। নীল মলাটে কয়েক ফোঁটা পানির দাগ পড়েছে। সে হাতের তালু দ্বারা ঐ দাগটুকু মুছে দিতে চায়, লাভ হয় না। ভেতরটা হঠাৎই কেমন অস্বস্তিতে ভরে ওঠে। সে ডায়েরিটা বুকের উপর চেপে ধরে পা বাড়ায় ছাউনির দিকে।
বাস্তবের মৌমিতা যেমনই হোক, ডায়েরির মেয়েটাকে তার ভালো লাগে। তার ছয় বছরের যাত্রাটাকে যেন বাদল নিজ চোখে দেখেছে। ষষ্ঠ শ্রেণির একটা ছোট্ট মেয়ে থেকে তার কলেজ জীবনে পদার্পণের যতোটুকু অভিজ্ঞতা এখানে লিপিবদ্ধ আছে, সবটুকুই যেন বাদল জানে। মেয়েটা যা লিখেছে, সে জানে সবটাই। যা লেখেনি, তা হয়তো জানা হবে না কখনও। সম্ভবত নিজের প্রতিই মেয়েটার কোনো কৌতূহল বাকি ছিলো না, কিংবা নিজের অতীতকে ময়লা ফেলার ঝুড়িতে দাফন করতে চেয়েছিলো, যে কারণেই হোক। নিজেকে পরিবর্তন করতে চেয়েছিলো। বাদল তার সেই ফেলে দেয়া অতীতকে উদ্ধার করেছে। উদ্ধার যখন করেই ফেলেছে, দায়িত্ব এখন তারই। এখান থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই। বাস্তবের মেয়েটার কথা বাদ, তার পরিচিত মৌমিতা খন্দকার নাহয় এই নীল মলাটেই বন্দী থাকুক। বাদল তাকে কোথাও একা ফেলে যাবে না। অন্তত, ফেলে যেতে পারবে না।

—————

মার্জিয়ার বার্ষিক পরীক্ষা সামনে। এমন সময়ে তার ক্যালকুলেটর নষ্ট হয়ে গেছে। যন্ত্রটা বেশ পুরোনো। মৌমিতাকে এটা রিতা পাঠিয়েছিলো। তারপর মার্জিয়া নিয়েছে নিজের পড়াশোনার জন্য। এতোদিন ধরে ব্যবহার করার পর সঠিক সময়ে গিয়ে জিনিসটা অক্কা পেলো। মৌমিতার একটা আলাদা ক্যালকুলেটর আছে, সেটা তার নিজের পড়ায় দরকার হয়। মার্জিয়াকে এবার নতুন ক্যালকুলেটর কিনতেই হবে। রিতা আপার পাঠানো অনাকাঙ্ক্ষিত উপহার হতে সে মুক্তি পেতে চলেছে, এটাই ঢের! অঙ্ক যেহেতু করা যাচ্ছে না, স্কুলের পড়াশোনা ফেলে রেখে সে নিশ্চিন্তে বই পড়তে শুরু করলো, তার আপার আনা গল্পের বই।

মারুফ কিছুক্ষণ আগেই বাড়িতে এসেছেন। ছুটির দিনে তিনি এখন ছুটি নিচ্ছেন না। টেবিলে খেতে বসেছেন।
রাবেয়া রান্নাঘর থেকে উচ্চস্বরে ডেকে উঠলেন, “মার্জু?”

মার্জিয়া উঠলো না, যেভাবে শুয়ে ছিলো, সেভাবেই উত্তর দিলো, “জ্বীইই?”

আর কারও কোনো সাড়াশব্দ নেই। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মার্জিয়া আবার বইয়ের দিকে তাকায়।

“অ্যাই মার্জু? কথা শোনো না কেন?”

এক লাফে বিছানা থেকে নেমে পড়লো মার্জিয়া। দরজার সামনে এসে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললো, “কী হয়েছে আম্মা?”

রাবেয়া রেগে মেয়ের দিকে তাকালেন, “গামছাটা আবার কে ওখানে ঝুলিয়েছে?”

মার্জিয়া চেয়ারে বসে থাকা মারুফের দিকে আঙুল তুলে বললো, “ঐ যে, ওনার ছোট মেয়ে।”

“কতোবার বলেছি, ঐ জায়গায় গামছা ঝুলায় রাখবা না। কিন্তু যেটা করতে মানা করবো, আমার গুণবতী মেয়েরা সেটাই করবে।”

“আহা, এতো রাগ করছেন কেন? তুলে আনছি। এ আর এমন কী!”

“উঠোনটা একটু ঝাড়ু দাও। কতো পাতা পড়ে আছে। বাড়ির সব কাজ কেন আমি করবো, এতো বড় বড় দুটো মেয়ে থাকতে? তোমার আপা কি গোসল থেকে বের হয়নি?”

“না।”

“এখনও বের হয়নি?”

“নাহ!”

“ওকে বলে আসো তাড়াতাড়ি বের হতে। এতো ভিজলে জ্বর আসবে।”

মার্জিয়া লাফাতে লাফাতে গোসলখানার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দরজায় সজোরে আঘাত করে বললো, “আপা? আর কতোক্ষণ?”

মৌমিতা উত্তর দিলো না। মার্জিয়া যখনই দরজায় বেশি শব্দ করে, মৌমিতা তার একটা কথারও জবাব দেয় না। মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। মার্জিয়া এটা বুঝেও বোঝে না। সে আরও জোরে শব্দ করলো দরজায়, “আম্মা বলেছে, এতো ভিজলে পানি শেষ হয়ে যাবে।”

বড় বোনের কোনো প্রতিক্রিয়া বোঝা গেলো না এবারও।

“আপা? তুমি কি ভেতরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছো?”

“হ্যাঁ!”

“ওহ, ভালো। পড়ে থাকো, পানি নষ্ট কোরো না।”

মেয়েটা আবার লাফাতে লাফাতে উঠোনের দিকে যেতে লাগলো। খাওয়ার ঘরে এসে একটু দাঁড়ালো, “আব্বা, আমার নতুন ক্যালকুলেটর লাগবে।”

মারুফ মেয়ের দিকে ঘুরলেন, “আগেরটা কী হয়েছে?”

“নষ্ট হয়ে গেছে।”

“ওটা দিও তো। ঠিক করে আনবো।”

মার্জিয়া যেন আকাশ থেকে পড়লো। আমতা আমতা করে বললো, “আমার মনে হয় না, ওটা আর ঠিক হবে। এতোবার হাত বদল হয়েছে। প্রথমে রিতা আপা, তারপর আপা, এখন আমি। বেচারা আর কতো সহ্য করবে?”

“আচ্ছা দেখি।”

উঠোনে এখনও একটু পানি জমে আছে। বৃষ্টি হওয়ার পর হয়তো আর ঝাড়ু দেওয়া হয়নি। ছোট ছোট ডালপালা আর অসংখ্য পাতা পড়ে আছে আঙিনায়। ভেজা মাটি থেকে স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ আসছে।
মার্জিয়া ঝাড়ু হাতে বারান্দার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বড় একটা শ্বাস নিয়ে কাজে নেমে পড়লো। ঝরা পাতাগুলো একদিকে সরিয়ে সে টবের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার শখের ফুলগুলোর পাপড়িও ঝরে গেছে বৃষ্টিতে। হতাশ ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়ে, বাড়ির সামনে জুনায়েদকে দেখলো মার্জিয়া। সব কাজ বন্ধ করে সেদিকেই তাকিয়ে রইলো। ছেলেটা এদিকে তাকাচ্ছে না, ঠাণ্ডা মেজাজে মোড়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। মারুফ কখন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন, তার ছোট মেয়েটা টের পেলো না। তিনি গলা উঁচিয়ে ডেকে উঠলেন, “জুনায়েদ?”

ছেলেটা থেমে দাঁড়ায়, ঘুরে তাকায় খন্দকারদের বাড়ির দিকে। মারুফ বললেন, “ভেতরে এসো তো।”

মার্জিয়া জড়োসড়ো হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে। মারুফ খন্দকার উঠোনে নেমে এলেন, জুনায়েদকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মার্জুর ক্যালকুলেটর নাকি নষ্ট হয়ে গেছে। দেখো তো ঠিক করতে পারো কিনা।” মার্জিয়ার দিকে তাকালেন তিনি, “জুনায়েদকে দেখাও দেখি।”

হাত থেকে ঝাড়ু ফেলে মার্জিয়া ভেতরে ছুটলো। পুরোনো ক্যালকুলেটরটা তার পছন্দ না। কিন্তু যদি সেটা জুনায়েদ ভাই ঠিক করে দেয়, তাহলে এই জিনিস আরও চার-পাঁচ বছর ব্যবহার করতেও তার আপত্তি নেই! মেয়েটা ঘরে যাওয়ার পর আবার জুনায়েদের দিকে ঘুরলেন মারুফ, “তোমার কি একটু সময় হবে?”

“কিসের জন্য?”

“কয়েকদিন হলো বেচাকেনা নেই বললেই চলে। ব্যবসায় লালবাতি জ্বলছে বলতে পারো। ওসমানের বয়স কম। সে-ও কিছু বোঝে না। আর আমারও ভালো লাগছে না কিছু। তুমি তো এ বিষয়ে বেশ জ্ঞান রাখো, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম—”

জুনায়েদ মাথা নাড়ে, “জিজ্ঞেস করবেন কেন? সরাসরি আদেশ করবেন। আমি চেষ্টা করে দেখি, কিছু করতে পারি কিনা।”

মারুফ বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “তোমাকে এসব বলতে আমার ইচ্ছে করে না। তোমার নিজের পড়াশোনা আছে, কাজকর্ম আছে। সেগুলো বাদ দিয়ে—”

“কী যে বলেন চাচা! আমি তো তেমন কিছুই করতে পারি না। আপনি আমাদেরকে যেভাবে আপন মানুষ ভাবেন, সে হিসেবে আমি তো কিছুই করিনি।”

মারুফ হাসলেন, “সব কাজ আপন মানুষ দিয়ে হয়ও না! রিপনকেই দেখো। যাই হোক, এই কথাটা বলে তুমি আমাকে অনেকখানি চিন্তামুক্ত করলে। সন্ধ্যার দিকে নাহয় দোকানে এসো। এখন যেতে পারো।”

জুনায়েদ ইতস্তত করে বারান্দার দিকে তাকালো। মেয়েটা অনেকক্ষণ আগেই ভেতরে গেছে, এখনও আসছে না। এখান থেকে এখনই চলে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু মারুফকে কীভাবে কথাটা বলবে, সে বুঝতে পারছে না। তিনি হয়তো এতোক্ষণে ক্যালকুলেটরের প্রসঙ্গটাই ভুলে গেছেন। এদিকে, চলে যেতে বলার পরেও এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা ভালো দেখাচ্ছে না। ছেলেটা মাথা নেড়ে বললো, “তাহলে, আসি।”

মার্জিয়া বারান্দায় এসেই দেখে, জুনায়েদ চলে যাচ্ছে। মেয়েটার উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলো। ছোট একটা শ্বাস ফেলে সে আবার অন্দরের দিকে পা বাড়ালো।

মৌমিতা অনেকক্ষণ ধরে পড়ার টেবিলে বসে রয়েছে। গণিতের কিছু বাড়ির কাজ ছিলো, কয়েকটা সমাধান করেছে। তারপর আর একটাও কাজ করেনি। গালে হাত দিয়ে বসে আছে। মার্জিয়া এখন বাইরে গিয়েছে হয়তো, গাছে পানি দিচ্ছে।
মৌমিতা ড্রয়ার খুললো। ধূসর ডায়েরিটা বের করে উদ্দেশ্যহীনভাবে পাতা ওল্টাতে লাগলো। একটা মানুষকে নিয়ে খুব লিখতে ইচ্ছা করছে। জীবনে এতো বড় বড় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তার প্রবেশের পর থেকে। কিন্তু তাকে নিয়ে কিছুই লেখা যাচ্ছে না। নীল ডায়েরিটার কথা খুব বেশিই মনে পড়ে মাঝে মাঝে। তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী ছিলো ডায়েরিটা। যা কেউ জানতো না, তার সবটাই সেখানে টুকে রাখা। রাগের মাথায় ওটাকে ফেলে দেয়া অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে।

মৌমিতা দুই হাত গুটিয়ে টেবিলের উপর মাথা রাখে। বাদলের মতো কারও সাথে আগে কখনোই পরিচয় হয়নি তার। চেনা নেই, জানা নেই, একটা সিনিয়র মেয়ের পেছনে কেন এভাবে লেগে আছে ছেলেটা! তার হাবভাব ভালোমতো বোঝাও যায় না। মৌমিতার সাথে কী শত্রুতা—এটাও বোঝার উপায় নেই। বাদল হয়তো মানুষকে বিরক্ত করে খুব আনন্দ পায়। এবং এই কাজের জন্য সে মৌমিতাকে বেছে নিয়েছে। মৌমিতাই কেন? কোনো প্রতিবাদ করছে না বলে? সে হয়তো শান্ত স্বভাবের মানুষদের উত্যক্ত করতে পছন্দ করে। হয়তো প্রতিবাদ পছন্দ করে না, অথবা সহ্য করাটাকেই অপছন্দ করে।

মৌমিতা সোজা হয়ে বসলো। টিউশন ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। ক্লাসের কথা ভাবতেই একরাশ ক্লান্তি ভর করলো তার দেহে। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের রবিউল স্যার শুক্রবারেও পড়ান। কেননা সামনেই পরীক্ষা। আজ একাদশ শ্রেণির ক্লাস নেই। এটা ভেবে মেয়েটা আরও অলসতা অনুভব করলো। তবু গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।

—————

নিজের বেঞ্চের সামনে গিয়ে থামলো মৌমিতা। শুকনো খটখটে কাঠের বেঞ্চের দিকে নির্বিকার হয়ে তাকিয়ে রইলো। তারপর সেখানে ব্যাগটা রাখলো। তামান্না আজকেও আসেনি। পাশের আসন তাই ফাঁকা থাকার কথা ছিলো, তবে তেমন হলো না। পেছন থেকে একটা মেয়ে এসে ঐ আসনে বসেছে।

মৌমিতার চোখ বারবার জানালার ওপাশে যাচ্ছে। রাস্তা ফাঁকা, রাস্তার ঐপাড়েও কেউ নেই। এখানেই ছেলেটা দাঁড়িয়ে থাকে বাকিদের সাথে। প্রথম যেদিন এই রাস্তায় দেখা হয়েছিলো, সেদিন অবশ্য বাদল আরেকটু দূরে দাঁড়িয়েছিলো। সহপাঠীদের সাথে হাসাহাসি করছিলো। তারপর যে কী হলো! এখন সে এতো গোমড়ামুখো হয়ে থাকে কেন, কে জানে? ছেলেটা কি জানে, হাসলে তাকে কতো অপূর্ব দেখায়!
মৌমিতার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো। সে আবার আবোল তাবোল ভাবতে শুরু করেছে। বেশ ভালোই অধঃপতন হচ্ছে দিন দিন!

রবিউল স্যার নাম ধরে ডেকে ডেকে খাতা ফেরত দিচ্ছেন, “তামান্না আজকেও আসেনি? ওর খাতাটা কেউ একজন নিয়ে যেও তো।”

প্রথম বেঞ্চের একটা মেয়ে খাতাটা নিজ দায়িত্বে মৌমিতাকে দিলো। সেটা বেঞ্চের উপর রেখে মৌমিতা আবার গালে হাত দিয়ে জানালার বাইরে তাকায়।

কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে সাইকেল থামালো বাদল। পেছনে বসে থাকা রাশেদ খুব অবাক হয়ে বললো, “এখানে থামলি কেন? বাজারে যাবি না?”

“হ্যাঁ, যাচ্ছি। তার আগে একটা কাজ আছে। নাম।”

রাশেদ বিভ্রান্ত হয়ে সাইকেল থেকে নামে, “আজকে তো ক্লাস নাই।”

“জানি। একটা ম্যাথ যে সলভ করতে পাচ্ছিলি না, ওটা বুঝায় নে।”

“সেটার জন্যে তো কালকে আসলেই হতো, আর কালকে তো আমাদের ক্লাসও আছে—”

“তর্ক করিস কেন? তুই চুপচাপ মানুষ, চুপ থাকতে পারিস না?”

বাদল রবিউল মাস্টারের বাড়ির দিকে দেখে, ছুটি দিয়েছে। একদল মেয়ের ভিড়ের মাঝে তাকিয়ে সে অস্থিরভাবে কাউকে খুঁজতে শুরু করলো। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি কি আদৌ এসেছে আজকে?
রাশেদ তার দিকে হা করে চেয়ে রয়েছে। সে ব্যাপারটা বুঝেও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছে না। কোনো প্রশ্নও করছে না, কেননা উত্তর পাবার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
বাদল নিরাশ হয়ে বিড়বিড় করে, “আসেনি...”

“কে রে আসেনি?”

মাথা ঘুরিয়ে ধমক দিলো বাদল, “তোকে সবকিছু বলতে হবে?”

রাশেদ আর অহেতুক আগ্রহ দেখালো না। মাথা চুলকে অন্যদিকে ঘুরলো। বাদল আবার ভিড়ের মাঝে উঁকি দেয়। মেয়েটা এসেছে! হাতে একটা খাতা নিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রিকশা খুঁজছে। বাদলের দিকে চোখ পড়তেই সে যেন একটু থমকে দাঁড়ালো। একবার রাস্তা পার হওয়ার পায়তারা করলো, কিন্তু পার হলো না কোনো কারণে। স্বভাবসুলভ জড়তা নিয়েই ধীরপায়ে এগিয়ে আসতে লাগলো। বাদল তার থেকে দৃষ্টি সরায়, দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েটা এখনও দ্বিধায় আছে, রাস্তা পার হবে, নাকি... ঝুঁকি নেবে?

মৌমিতা সোজাসুজি হাঁটতে শুরু করলো। ছেলেটা কী এমন করতে পারে, দেখা যাক!
বাদল আর রাশেদ—উভয়েই খুব ভদ্রভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মেয়েটা তাদের অতিক্রম করতে যাওয়া মাত্রই বাদল ছোঁ মেরে তার হাত থেকে খাতাটা নেয়। রাশেদ, মৌমিতা, দু'জনেই হতভম্ব হয়ে যায়। বাদল অল্প হেসে বেশ সহজভাবে বলে, “এক মিনিট আপু। একটা জিনিস দেখেই দিয়ে দিচ্ছি। আচ্ছা, এখানে কি ত্রিকোণমিতি নোট করা আছে?”

মৌমিতা উত্তর দিলো না। এটা তার নিজের খাতা হলে সে নিরুত্তর থাকতো না অবশ্য। বাদল খাতাটা রাশেদের কাছে হস্তান্তর করে, “দ্যাখ তো, ঐ অঙ্ক আছে নাকি?”

রাশেদ নিরুপায় হয়ে বাদলের মুখের দিকে তাকায়, খাতা হাতে নিয়ে আমতা আমতা করে বলে, “আমি খুঁজে পাবো না।”

বাদল নিচুস্বরে ধমক দেয়, “খুঁজে দ্যাখ আগে।”

একটা শুকনো ঢোক গিলে পাতা ওল্টাতে থাকে রাশেদ, তার আঙুলগুলো কাঁপছে। বাজারে যাওয়ার নাম করে বাদল এমন একটা পরিস্থিতিতে ফাঁসিয়ে দেবে, সে কল্পনাও করেনি।
মৌমিতার বিস্ময় কাটেনি এখনও। বেশ অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তার সাথে। তবুও কেন যেন খুব একটা বিচলিত মনে হচ্ছে না নিজেকে। তবে সংবিৎ ফিরে পেতেই সে তাড়া দেখালো, রাশেদের উদ্দেশ্যে বললো, “একটু তাড়াতাড়ি দিতে পারবেন?”

রাশেদ উত্তর দেয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতেই বাদল বলে উঠলো, “তা নাহয় দিলাম। কিন্তু আপনি আমাদেরকে আপনি বলে ডাকছেন কেন? আমরা আপনার জুনিয়র।”

মৌমিতা তার কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করলো না। ছেলেটা মুখ কালো করে তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। তারপর ভ্রু কুঁচকে খাতার দিকে তাকায়, রাশেদের কাঁধে বাহু তুলে ব্যঙ্গ করে বলে, “এই মেয়েগুলোর যে কী সমস্যা, নিজের বয়স কম দেখানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে থাকে!”

মেয়েটা এবারও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। খোঁচাটা হজম করলো, রাশেদকে বললো, “নেই বোধহয়। অন্য খাতায় আছে।”

বাদল আবার শিশুতোষ বায়না শুরু করে, “দেখুক, থাকতেও তো পারে!”

রাশেদ তাকে উপেক্ষা করে মৌমিতাকে খাতাটা ফিরিয়ে দিলো, “নেই। দেখেছি আমি।”

খাতা হাতে পেতেই মেয়েটা ব্যস্তভাবে রিকশা ডাকলো, দ্রুত উঠে বসলো রিকশায়। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, বাদল সাইকেল নিয়ে রিকশার পিছু নিবে। তবে এমন কিছু হলো না। ওরা ইতোমধ্যেই অন্য রাস্তায় চলে গেছে। মৌমিতা কোলের উপর খাতা নিয়ে বসে রইলো। হঠাৎ মনে পড়লো, বাদল এই খাতাটা ছুঁয়েছে! তামান্নার খাতা।
ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। মৌমিতার খুব সহজেই শীত লেগে যায়, এদিক দিয়ে সে সর্বদাই সংবেদনশীল। তবে কানের কাছে শোঁ শোঁ করে বইতে থাকা শীতল বাতাস আজ তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারলো না। মেয়েটা কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাই আপন মনে আওড়ালো আরেকবার। 'আপনি' বলে ডাকতে বাদল মানা করেছে। কিন্তু সেটা এতো কুৎসিত কায়দায় বলার কী দরকার ছিলো? মৌমিতার মনে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন উঁকি দেয়। সম্বোধন পরিবর্তনের মাধ্যমে ছেলেটা কি সম্মান কমাতে চায়? নাকি দূরত্ব?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp