পিনপতন নীরবতার সঙ্গে, গাঢ় ঘন অন্ধকার চারপাশে। একফোঁটা আলো নেই কোথাও। নিস্তব্ধতা কোন অভেদ্য জালের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। হঠাৎ সেই অন্ধকার ভেদ করে কিছু কালো হাত এসে থাবা দিয়ে ধরল কুহুকে। কুহু চমকে উঠে নড়তে চাইল, কিন্তু পারলনা। মনে হল ঐ অন্ধকারের বন্ধনে শক্ত করে বাঁধা হয়েছে ওকে। সেই সুযোগে কালো হাতগুলোর নোংরা স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ল ওর সমগ্র শরীরে। ওর শরীর শিউরে উঠল, শ্বাস আটকে এলো তীব্র ঘৃণা আর আতঙ্কে। কিন্তু কুহু সর্বোশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেও একফোঁটা নড়তে অবধি পারল না। ওর সেই অপারগতায় নিস্তব্ধতা ভেদ করে ভেসে এলো ভয়ংকর সব হাসির শব্দ। শরীর হিম হয়ে গেল ওর। সর্বাঙ্গে কী অসহ্য যন্ত্রণা!
লাফিয়ে উঠে বসল কুহু। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। জানুয়ারির শীতেও ঘেমে স্নান করে ফেলেছে ও। অস্বাভাবিক শ্বাসের শব্দে অস্থির হয়ে উঠল রুমের পরিবেশ। সে শব্দ কানে আসা মাত্রই ধরধর করে উঠে বসল নীরব। হন্তদন্ত হয়ে মাঝের কোলবালিশ সরিয়ে কুহুতে আগলে নিতে গেলে ছিটকে পিছিয়ে গেল কুহু। হাতপা ছুড়ে প্রতিরোধ করতে চাইল। নীরব দ্রুত লাইট জ্বালাল তা দেখে। দুচোখে আতঙ্ক নিয়ে বিছানায় ছটফট করতে থাকা কুহুর দিকে তাকিয়ে দেখল, ফর্সা চোখমুখ লাল হয়ে গেছে মেয়েটার, চোখের জলে ভিজে আছে সমস্ত মুখ। হা করে শ্বাস নিচ্ছে। নীরব অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল, 'কুহু।'
আবার এগিয়ে গেল সেদিকে। কুহুকে ছুঁতে গেলে পুনরায় একইভাবে পিছিয়ে গেল কুহু। আরও বেশি অস্থির হয়ে ছটফট করে উঠল তীব্র ভয়ে। নীরব আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দুহাত তুলে ফেলল, 'ওকেহ্, ওকে। আ'ম নট টাচিং ইউ। রিল্যাক্স! কাম ডাউন।'
কুহু পিছিয়ে গিয়ে হেডরেস্টে হেলান দিয়ে চোখ বুজল। জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে গা ছেড়ে দিল ও। চোখে কার্নিশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে নামছে বিরতিহীন। নীরব খামচে ধরল বিছানার চাদর। চোখদুটো ছলছল করছে তীব্র বিষাদে। বিয়ের পর এরকমটা প্রায়ই হয়। কুহু পারেনি সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনার ট্রমা থেকে নিজেকে বের করতে। বিভৎস ব্যপার হল, এটা সেদিনই বেশি হয় যেদিন রাতে নীরব কুহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে। এর আগেও দুবার দেখেছে। মেয়েটা বাঁধা দেয়না ঠিকই। কিন্তু কেমন শক্ত হয়ে জমে যায়, বোঝাই যায় জোর করে মানিয়ে নিতে চাইছে। কিন্তু ঘনিষ্ঠ স্পর্শের প্রতি কুহুর সেই ট্রমা, সেই ভয়ে খানিকটা এগোতেই কুহু অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার করে। ভুলে যায় ওরপাশে ওটা নীরব, ওর স্বামী। কিছুতেই মানতে পারেনা সেই স্পর্শ। নীরব সরে আসে। কিন্তু সেই ভয়, সেই আতঙ্ক মেয়েটাকে সারারাত ভোগায়। আর সকাল হলেই গ্রাস করে অনুতাপবোধ। নীরব ঠিক করে ও আর ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করবেনা কুহুর সঙ্গে। আগে একটা ভালো কাউন্সেলিং করাবে কুহুর। তারপর বাকি সব। কিন্তু গতরাতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল সামান্য। তাই কী এমন হল?
অনেককটা সময় পর কুহু ধাতস্থ হতেই এগিয়ে গেল নীরব। কুহুকে আলতো হাতে স্পর্শ করে বুঝতে চাইল, মেয়েটা স্বাভাবিক হয়েছে কিনা। নীরবের আশ্বস্ত ছোঁয়া পেতেই এগিয়ে এসে নীরবের বুকে গুটিয়ে গেল কুহু। কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠল গোটা শরীর। নীরবের চোখের জল এবার গাল গড়িয়ে নামল। ও কেঁপে ওঠা গলায় বলল, 'আ'ম স্যরি। আ'ম সো স্যরি মাই লাভ। আমি আর এমন করবোনা। তুমি স্বাভাবিক না হওয়া অবধি আমি আর কখনও তোমাকে ওভাবে ছোঁবনা। আই প্রমিস।'
কুহু কাঁপতে কাঁপতে আরও শিটিয়ে গেল নীরবের বুকের মাঝে।
———
ফোনের রিংটোনের আওয়াজ যেন মস্তিষ্কে আঘাত করল প্রিয়তার। ভ্রু কুঁচকে পিটপিট করে চোখ খুলল। মাথা তুলে দেখল, দেয়ালে হেলান দিয়েই ঘুমোচ্ছে বশির। ঘুম ঘুম চোখেই আস্তে করে উঠল বসল বশিরের কোল থেকে। কোনমতে হাতরে ফোনটা নিয়ে তাকাল স্ক্রিনে। কিন্তু স্ক্রিনে 'ভাই' নামটা দেখামাত্র চোখ থেকে ঘুম উড়ে গেল ওর। সকাল ন'টা বাজে! এমন সময় উচ্ছ্বাস কেন কল করল? কী হয়েছে? দ্রুত কলটা রিসিভ করল প্রিয়তা, 'হ্যালো?'
উচ্ছাস ব্যস্ত স্বরে বলল, ' হ্যাঁ বউমণি? কোথায় তুমি?'
' কেন?' নিরস গলায় বলল রাণী। যেন শোনার কোন আগ্রহ তার নেই।
উচ্ছ্বাস গলার স্বর নামিয়ে বলল, 'তুমি কী এখন মির্জা ম্যানশনে?'
' হুম।'
' কুহু সকাল থেকে তোমার কাছে যাওয়ার জন্যে জেদ করছে, তোমাকে নিয়ে আসতে বলছে। ওর দেখাদেখি জ্যোতিও চাইছে দেখা করতে যাবে। কিন্তু রুদ্রর অনুমতি ছিল ছাড়া আমি তোমাকে আনতে পারবনা। আর তুমি নিজেও আসবে কিনা, সেটাও প্রশ্ন। অনেক কষ্টে বুঝ দিয়েছি। আমি জানি, তুমি চাওনা। তাও তুমি কী একটু কথা বলবে ওদের সঙ্গে? প্লিজ।'
কিছুক্ষণ চুপ থাকল প্রিয়তা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'দাও।'
এতক্ষণ ওদের কাছ থেকে দূরে সরে কথা বলছিল উচ্ছ্বাস। প্রিয়তার সম্মতি পেয়ে পুনরায় আমের ভিলার বসার ঘরের মাঝামাঝি চলে এলো। নীরব, কুহু, জ্যোতি, নাজিফা চারজনই আছে। জাফর আমের ইতিমধ্যে খেয়ে বেরিয়ে গেছে আমের ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্যে। জ্যোতির অবস্থা ভালো না আজকাল। মাইগ্রেনের ব্যথায় সারাক্ষণ মাথা ধরে থাকে। রুদ্র নামক ঐ পুরুষটির চিন্তায় দিনরাত বুক ধরফর করে বেড়ায় ওর। ইদানিং সে কীভাবে কী করে বেড়াচ্ছে কেউ জানেনা। তারওপর গেছে এখন ইন্ডিয়া। না জানি কতরকমের বিপদ মাথায় নিয়ে ঘুরছে। যতক্ষণনা ফিরে আসবে এক মিনিটের শান্তির ঘুমও আসবেন ওর চোখে। অন্যদিকে প্রিয়তার চিন্তাতো আছেই।
উচ্ছ্বাস ওদের মাঝে এসে বসে বলল, 'বউমণি আছে লাইনে। বল, যা বলার।'
সঙ্গেসঙ্গে মাথা এগিয়ে আনল জ্যোতি, 'প্রিয়তা, আমি উচ্ছ্বাসকে বলছি তোমাকে নিয়ে আসতে। আজই চলে আসবে তুমি। ঐ পাগলের সাথে কথা শুনে আর ওখানে বসে থাকতে হবেনা। না হলে কিন্তু আমিই চলে আসব বলে দিলাম।'
' জ্যোতি আপু, শান্ত হও। আমার তেমন অসুবিধা হচ্ছেনা এখানে। উনি যখন বলেছেন, তখন কিছু ভেবেই বলেছেন।'
' কিন্তু _' কুহু হাতের ইশারায় নানাকথা বলে যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। জ্যোতি তা দেখে বলল, 'কুহু অস্থির হয়ে উঠছে, প্রিয়তা। ও তোমাকে দেখার জন্যে পাগলামি করছে। তোমরা দুজন এমন করছো কেন বলোতো? আমাদের কথাটা একটু ভাবো? তোমাদের এসব খামখেয়ালিতে আমাদের ওপর কী প্রভাব পড়ছে তা কী তোমরা বুঝতে পারছোনা?'
প্রিয়তা আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একটু সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে কুহুর উদ্দেশ্যে বলল, 'কুহুরাণী। তুমি আমার লক্ষ্মী ছোট বোন না? আমিতো জাস্ট কটা দিনের জন্যেই দূরে আছি। চলে আসবতো। তোমাদের ছেড়ে আমি থাকতে পারি বলো? তোমার ভাই আসুক, এরপরই আমি চলে আসব। ওনার কোন কথা শুনব না। আরেকটু ধৈর্য্য ধরো সোনা, প্লিজ।'
প্রিয়তা এতো নরম স্বরে, চমৎকারভাবে বলল যে কুহু এমনিতেই শান্ত হয়ে গেল। কেবল খানিকটা নাক টানছে এখন সে। এরমধ্যেই নীরব বলে উঠল, ' সত্যি বলছি ভাবি, আপনাকে ছাড়া বাড়িটা ভীষণ ফাঁকা লাগে। বলতে গেলে আমের ভিলার প্রাণ আপনি। প্লিজ ভাই আসার পর আর ওখানে থাকবেন না। যেভাবেই হোক, চলে আসবেন।'
নাজিফা নিজের ভরা পেটে দুহাত রেখে একটু সোজা হয়ে বসল। নড়াচড়া করতে কষ্ট হয় ওর। অল্পতেই প্রচন্ড হাঁপিয়ে যায়। নাজিফা অনুরোধের স্বরে বলল, 'দুদিন পর আমার ডেলিভারির ডেট, ভাবি। এরপর আপনার দেওরের সঙ্গে বিয়ে হবে আমার। এর আগে আপনি আসবেন তো?'
আবার কিছুক্ষণের নীরবতা। অতঃপর প্রিয়তা আস্তে করে বলল, ' আসব।'
কেটে গেল কলটা। লম্বা একটা শ্বাস ফেলে দু হাতে মুখ চেপে ধরল জ্যোতি। ঝুঁকে গেল হাঁটুতে কুনুইয়ের ভর রেখে। বাকি চারজনও গম্ভীর। নীরব আলোতো হাতে টেনে কুহুকে জড়িয়ে রাখল নিজের সঙ্গে। উচ্ছ্বাস ভ্রু কুঁচকে ফোনটা ওভাবেই ধরে বসে আছে। অথচ একটা সময় ছিল যখন এরা একসঙ্গে হলে আমের ভিলা ঝলমল করে উঠতো। হৈচৈ আর প্রাণখোলা হাসিতে মজে থাকতো বসার ঘরটা।
উচ্ছ্বাস তাকাল কুহুর দিকে। ভ্রু তুলে বলল, ' এই ছিঁচকাদুঁনী। আসবে তোর ভাবি, বলেছে। বাপরে বাপ! বউমণির জন্যে কেঁদে একেবারে চোখমুখ টমেটো করে ফেলেছে। সারাজীবন সবখানে ননদ-ভাবির চুলোচুলি দেখেছি। এখানেতো রীতিমতো প্রেমকাহিনী চলে। একজনের বিরহে আরেকজনের কলিজা ছিড়ে যায়, আলাদাই সিন। শেক্সপিয়র এদৃশ্য দেখলে তোদের নিয়েই প্রেমের নাটক লিখে ফেলতো। নীরব হত বেচারা ওয়ান সাইডেট হার্ডব্রোকেন লাভার। থাম এখন!'
উচ্ছ্বাস এমনভাবে কথাটা বলল। না চাইতেও হালকা করে হেসে ফেলল সবাই। বিকট পরিস্থিতিতেও ছেলেটা কীকরে এমন কৌতুকপূর্ণ মনোভাব নিয়ে চলে, সে এক অমীমাংসিত রহস্য।
জ্যোতি নিজের জরজেটের আঁচলটা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। ক্লান্ত গলায় বলল, 'রুদ্রর কোন খবর জানো?'
এতক্ষণে আবার গম্ভীর হল উচ্ছ্বাস। ফোনটা পকেটে রাখতে রাখতে বলল, ' কাজে গেলে ও যোগাযোগের সব উপায় বন্ধ করে দেয় তাতো জানিস। দরকার হলে নিজেই কন্টাক্ট করে।'
' কবে আসার কথা তাও জানোনা?' প্রশ্নটা করল নাজিফা।
' কালকের মধ্যেতো চলে আসার কথা। বাকিটা আমি ও-ই জানে।'
কথাটা বলে উঠে দাঁড়াল উচ্ছ্বাস। নাজিফার দিকে তাকিয়ে বলল, ' রাতে সম্ভবত ফিরব না আমি। ফোন অফ থাকবে। চিন্তা করবেনা। নিজের খেয়াল রেখো। জ্যোতি আছে, নীরব আছে। কোনরকম কোন সমস্যা ফিল হলে ওদের বলবে। কেমন?'
নাজিফা অস্থির চোখে তাকাল। বছর দুই আগের নাজিফা বোধহয় চোখ রাঙাতো। শাসনের স্বরে নিষেধ করতো। কিন্তু এখন সেসব করার মতো শারীরিক, মানসিক কোন জোর নেই ওর। কেবল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ' সাবধানে থেকো।'
উচ্ছ্বাস মাথা নাড়ল। নিজের পিস্তলটা হোলস্টারে গুজে বেরিয়ে গেল আমের ভিলা ছেড়ে। পুনরায় থমথমে হয়ে গেল আমের ভিলার বসার ঘরটা। এ মুহূর্তে আমের পরিবারের প্রত্যেকটা সদস্যের মধ্যে গা ছমছমে এক ভয় কাজ করে। তারা ইতিমধ্যে ভয়ংকর, বিভৎস খারাপ দেখে ফেলেছে। কিন্তু এরচেয়েও বিভৎস কিছু দেখা বোধহয় এখনো বাকি আছে।
এদিকে আমের ফাউন্ডেশনের মানুষদের মাথায় এখন ভিন্ন চিন্তা। এতোবড় একটা ধাক্কার পরেও এখানো অবধি কোন প্রত্যাঘাত করেনি ডার্ক নাইট বা ব্লাক হোল। এমন ক্রিটিকাল সময়ে যেটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। ব্যপারটা চিন্তার। এনিয়ে একসকাল গম্ভীর আলোচনাও হয়েছে জাফর আমের আর উচ্ছ্বাসের মধ্যে। কিন্তু রুদ্রর অনুপস্থিতিতে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা ওরা।
———
কল কেটে স্থির হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল প্রিয়তা। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল বশিরের দিকে। ধরে আস্তে করে তোষকের ওপর শুইয়ে দিল তাকে। একটু নড়ে উঠে আবার ঘুমে তলিয়ে গেল বশির। প্রিয়তা আলোতো করে হাত বুলিয়ে দিল ঘুমন্ত বশিরের মাথায়। তারপর ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়াল। হাত দিয়ে নিজের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতে বেরিয়ে এলো বশিরের ঘর থেকে।
বেরিয়ে দেখল, ডাইনিংয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে শায়না। তনুজা খাওয়ানোর চেষ্টা করছে মেয়েকে। কিন্তু সে খেতে নারাজ। ভ্রুকুটি করে এগিয়ে গেল রাণী মির্জা। গম্ভীর স্বরে বলল, 'কাঁদছে কেন?'
তনুজা খানিক চমকে উঠল। প্রিয়তাকে দেখেই লাফিয়ে চেয়ার থেকে নামল শায়না। প্রিয়তার পেট জড়িয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কেঁদে বলল, ' রাণী পিপি! পিপি!'
' ইটস্ রাণী। কী হয়েছে?' রাণীর কন্ঠস্বর তখনও গম্ভীর।
' আম্মু খারাপ।'
' কেনো?'
' ভাই এনে দেয়না। বলেছিল দেবে।'
রাণী ভ্রু তুলে তাকাল তনুজার দিকে। তনুজা হতমত খেয়ে গেল। রাণী বলল, ' কী ব্যপার? সেকেন্ড বেবীর প্লান করছিলে নাকি? একবার বাঁশ খেয়ে শিক্ষা হয়নি?'
তনুজা মাথা নিচু করে মিইয়ে যাওয়া গলায় বলল, 'আমার কথা বলিনি আমি।'
'তবে?'
তনুজা শুকনো ঢোক গিলল। কোনমতে সাহস জুগিয়ে বলল, 'আপনি যখন জানিয়েছিলেন আপনি প্রেগনেন্ট। তখন আমি খুব এক্সাইটেড হয়ে ওকে বলে ফেলেছিলাম, ওর একটা ছোট ভাই আসবে। সেটাই এখনো মাথায় গেঁথে আছে।'
কথাটা বলতে বলতে ভেজা বেড়ালের মতো চুপসে গেল তনুজা। অপেক্ষা করল, রাণীর কোন আক্রমণাত্মক ব্যবহারের জন্যে। কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া করল না সে। কেবল শীতল চোখে তাকিয়ে রইল তনুজার দিকে। শায়না ওর দু'হাত ঝাঁকিয়ে বলল, ' পিপি! তুমি এনে দিবা ভাই? বলো বলো?'
প্রিয়তা চোখ সরিয়ে তাকাল শায়নার দিকে। তনুজা শায়নাকে থামাতে উদ্ধত হয়েও থেমে গেল প্রিয়তাকে হাঁটুতে ভর দিয়ে শায়নার মুখোমুখি বসতে দেখে। ভয়ে ভয়ে রাণীর দিকে চেয়ে আছে ও। প্রিয়তা শীতল গলায় শায়নাকে জবাব দিল, 'না।'
কিন্তু সেই শীতল স্বরটাও কেমন কেঁপে উঠল। মনে হল হৃদয়ের কোন গভীর কোণ থেকে চিড়ে বেরিয়ে এলো সে শব্দ। শায়না ঠোঁট ফুলিয়ে বায়না করে বলল, ' কেন, কেন দেবেনা ভাই এনে? দিলে কী হয়?'
' ডাইনী, পিশাচিনীরা কখনও ভাই এনে দিতে পারেনা। তাদের পেটে সন্তান সয় না। সওয়া উচিতও না।'
তনুজা চকিতে তাকাল রাণীর দিকে। ভয় সরে গিয়ে দুচোখে এসে ভর করল বিস্ময়। রাণী অসম্ভব সুন্দর চোখদুটো লালচে হয়ে উঠেছে। জ্বলজ্বল করছে কেমন। ছোট্ট শায়না সরল চোখদুটো বৃহৎ করে বলল, 'কে ডাইনী?'
সামান্য হাসল রাণী, 'কেন? এইযে তোর সামনে বসে আছি, আমি।'
শায়না মাথা দুলিয়ে বলল, ' উহু! তুমি কেন ডাইনী? আমি দেখেছি কার্টুনে, ডাইনী অনেক খারাপ দেখতে হয়। তুমিতো অনেএএক সুন্দর।'
রাণীর হাসি আরও প্রসারিত হল। তবে চোখের জ্বলজ্বলে ভাবটা বেড়েছে। ও শায়নার দিকে ঝুঁকে বলল, ' কখনও কখনও ডাইনীরাও ভীষণ সুন্দর দেখতে হয়। তাদের রূপে সবাই মোহিত হলেও তাদের ভেতরটা থাকে অন্ধকার, কলঙ্কিত, পাপে পূর্ণ। আমিও তেমনই এক ডাইনি। আজ থেকে আমায় এই নামেও ডাকতে পারিস। তোর মায়ের মতো।'
তনুজা আরও একবার চমকাল। কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া করতে পারলনা। ইতস্তত করে চোখ সরিয়ে নিল শুধু। এই মেয়ের কাছে কী কিছুই গোপন থাকেনা? শায়নার সামনে থেকে উঠে দাঁড়াল রাণী মির্জা। কোনদিকে না তাকিয়ে অমন এলোমেলো অবস্থাতেই বেরিয়ে গেল তনুজার ফ্লাট থেকে। শায়না কান্নাকাটি শুরু করে দিল। প্রতিবারই রাণী যাওয়ার সময় এমন কেঁদে ভাসায় মেয়েটা। অথচ রাণী কখনও ফিরেও তাকায় না। শেষমেশ তনুজাকেই এটা-ওটা বুঝ দিয়ে মেয়ের কান্না থামাতে হয়। রাণীর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোন স্নেহ কখনই পায়নি ও। তাও কীসের এতো টান বোঝেনা তনুজা। শুধুই কী রক্তের টান?
তবে আজ কিছু বুঝ দেওয়ার মতো অবস্থায় থাকল না তনুজা। কেবল কাঁদতে থাকা শয়নাকে কোলে নিয়ে বসে রইল চুপচাপ। রাণীর কথাগুলো কেমন থমকে দিয়েছে ওকে। আজকাল কোনদিকের কোনকিছুই ঠিকঠাক মনে হয়না ওর। কেমন ভয়ানক থমথমে মনে হয় সব। খুব শীঘ্রই যেন ভয়ংকর কিছু একটা ঘটবে। এমনকিছু যা এক ধাক্কায় অবশিষ্ট সবকিছু ধ্বংস করে দেবে।
******
সারাটাদিন ভীষণ শান্ত, স্থির কাটল। কোথায় কোন ঝামেলা, অস্বাভাবিকতা কিংবা জটিলতার দেখা মিলল না। স্বাভাবিক দিনটা পেরিয়ে পৃথিবীর একপ্রান্তে নেমে এলো অন্ধকার রাত। সেই রাত ধীরে ধীরে গভীর হল। মাঝ রাত পেরিয়ে রাত্রি তখন তার শেষ প্রহরে প্রবেশ করেছে। আধারের সঙ্গে প্রবল আকার নিয়েছে ঘন কুয়াশা আর নিস্তব্ধতা।
বেশ কিছুক্ষণ হল ভারত সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে রুদ্র আমের। ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রুদ্রর জীপ। পাশে রঞ্জু। এবার জীপটা রুদ্রর নিজের। জীপ র্যাংলার Rubicon, "Sky one touch" এডিশন। কালচে সবুজ। জানুয়ারির বরফশীতল হাওয়া রীতিমতো কামড় বসাচ্ছে ওদের গায়ে। রুদ্র নিজের কালো ভারী লেদার জ্যাকেট, কানটুপি, হাতমোজা সব পড়ে আছে। রঞ্জু ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত আবৃত হয়ে বসে আছে। সেইসঙ্গে আটকে রেখেছে জীপের ছাদ এবং দরজাও। তবুও এই মারণশীত থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা। চোখ জ্বালা করছে। মাঝেমধ্যে একে অপরের সঙ্গে বাড়ি খাচ্ছে দাঁতের দু পাটি।
রঞ্জু হাতের তালু ঘষতে ঘষতে চারপাশে তাকিয়ে গুনগুন করছে। মন ভালো ওর। রুদ্র ডিলটা সফলতার সঙ্গে নিতে পেরেছে। পাচ্ছে পঞ্চাশ কোটি এডভান্স। যদিও কাছে ইম্পর্টেন্ট কোডেট ডকুমেন্টস্ আছে ওদের কাছে। এখন নিরাপদে গুলশান পৌঁছতে পারলেই হল। কিন্তু রুদ্রর চোখেমুখে আনন্দতো দূর, সন্তোষের ও কোন স্থান নেই। নিষ্ঠুর মুখটা বরাবরের মতোই গম্ভীর। গম্ভীর সেই মুখে ড্যাশবোর্ডের আলোয় জ্বলজ্বল করছে চোখের কোণের কাটা দাগটা।
রাস্তাঘাট ফাঁকা প্রায়। দুপাশে কখনও জঙ্গল, কখনও ঝোপঝার, কখনও কাটা ধানক্ষেত। মাঝে মাঝে বড় বড় ট্রাক যাতায়াত করছে কেবল। এমুহূর্তে রাস্তাটা তুলনামূলক সরু। অপরদিকে ঘন কুয়াশা। হেডলাইটের আলোও সেই কুয়াশাকে বেশিদূর ভেদ করতে পারছেনা। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা দূরের রাস্তা। এইসময় এই রাস্তায় ড্রাইভ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তটাই অনেক ভেবেচিন্তে নিয়েছে রুদ্র। প্রথমত সময় কম, দ্বিতীয়ত ঝামেলা এড়িয়ে নিরাপদে গুলশান ফিরতে চায় ও।
কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই মাধবপুর পৌঁছবে রুদ্রর জীপ। ঠিক তখনই সজাগ হয়ে উঠল রুদ্রর ইন্দ্রিয়। চোখ-কান সতর্ক হয়ে উঠল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। শরীর শিরশির করে ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেল আপনাআপনি। অস্বাভাবিকতার গন্ধ পাচ্ছে তখন ও। সঙ্গে সঙ্গে নিজের তীক্ষ্ম চোখ রিয়ার-ভিউ মিররে ফেলল রুদ্র। ট্রাকটাকে অনেকক্ষণ যাবতই পেছনে দেখছিল সে। কিন্তু আচমকাই স্পিড অনেকটা বাড়িয়েছে মনে হল। রুদ্র লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেও স্পিড বাড়িয়ে দিল অনেকটা। রঞ্জু নড়েচড়ে উঠে তাকাল বসের দিকে। কিন্তু রুদ্রর মুখয়াভব তখন শক্ত, চোখদুটো সমানতালে দেখছে রিয়ার-ভিউ মিরর আর সামনে। রুদ্রর জীপের স্পিড বাড়তেই আরও বেড়ে গেছে ট্রাকের। মনে মনে প্রমাদ গুনল রুদ্র। ক্লান্ত ও। এখন এইসব নাটকের ইচ্ছা ওর একদমই ছিলোনা। রুদ্র দাঁতে দাঁত পিষে স্পিড আরও বাড়াল। থতমত খেয়ে গেল রঞ্জু। শ্বাস আটকে তাকাল রুদ্রর দিকে, 'করেন কী ভাই? মইরা যামুতো!'
কিন্তু রুদ্র কানে তুলল না। স্পিড বাড়ছে। রঞ্জু ততক্ষণে বুঝে ফেলল গন্ডগোল আছে কিছু একটা। পেছনের ট্রাকটা যেন পিষে দিতে চাইছে জীপটাকে। দম বন্ধ করে সিট আকড়ে বসে রইল বেচারা। একপাশে কাত হয়ে বারবার সামনে পেছনে দেখছে। এমন বেপরোয়া গাড়ি চালনায় অবস্থা নাজেহাল ওর।
তখনই, এমন বিপদজনক গতিতে চলমান অবস্থাতেই, সবেগে সামনের বাঁক থেকে একই বেগে ছুটে এলো আরেকটা ট্রাক। চোখ বিস্ফোরিত হয়ে উঠল রুদ্রর। হৃদস্পন্দন থেমে গেল। দম আটকে স্টেয়ারিং সজোরে বায়ে ঘোরালো ও। রঞ্জু সর্বোশক্তি দিয়ে সিট আকড়ে 'হরিগো!' বলে চেঁচিয়ে উঠল। রুদ্রর জীপের বাঁপাশের চাকাদুটো রাস্তা ছেড়ে তখন মাটিতে। ত্রিশ ডিগ্রী বেঁকে বিভৎস ক্যারক্যার শব্দ করে ট্রাকটা পাশ কাটিয়ে নিল রুদ্র। কাঁধে ধাক্কা লেগে ভীষণ ব্যথা পেল রঞ্জু, হালকা কেটে গেল বাঁ গালটা। রুদ্রও মাথায় বড়সর আঘাত পেল, কিন্তু কাটল না কোথাও। সরতে আর এক সেকেন্ড দেরী করলে দুপাশ থেকে দুটো ট্রাক পিষে দিতো ওদের। দম ছেড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল রুদ্র। হৃদপিণ্ড তীব্রবেগে লাগাচ্ছে ওর। ঘেমে গেছে শরীর। অনিয়ন্ত্রতিত শ্বাস ফেলতে ফেলতে গালি ছাড়ল একটা।
বেপরোয়া ট্রাকদুটোর ড্রাইভার আশা করেনি রুদ্রর এমন মুভ। প্রাণপনে তাড়া চেষ্টা করল দুই ট্রাকের সংঘর্ষ আটকাতে। কিন্তু পুরোপুরি সম্ভব হলোনা। একপাশে সবেগে লেগে রাস্তার পাশের ঝোপে উল্টে পড়লো সামনের ট্রাকটা। পেছনের ট্রাকটা ব্যালেন্স হারিয়ে গিয়ে পড়ল ফাঁকা ক্ষেতে। কিছুদূর গিয়েই কাঁত হয়ে গেল একপাশে। সামনে ঘুরে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল রুদ্র। শালার, ও ঝামেলা এড়াতে চাইলে কী হবে? ঝামেলা ওকে এড়াতে চায়না।
' ভাই, শালারা কী আমাগো পিষষা_'
বাক্যটা শেষ করার সুযোগ হলোনা রঞ্জুর। তার আগেই বিকট আওয়াজে গুলি এসে লাগল রুদ্রর জীপে। একটা, দুটো। মাথা নুইয়ে ফেলল রুদ্র। প্রশিক্ষিত রঞ্জুও মাথা নিচু করে ফেলল আদেশের আগেই। রুদ্র ঐ অবস্থাতেই স্পিড বাড়িয়ে এঁকেবেঁকে চালাতে শুরু করল। তৃতীয়বার গুলিটা লাগল সোজা ডানপাশের সাইড ভিউ মিররে। হায় হায় করে উঠল রঞ্জু, 'ভাই! ত্রিশ হাজার টাহার লস!'
রুদ্র তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, কোথায় ঘাপটি মেরে গু*লি চালাচ্ছে এরা। তখনই পিঁপড়ার দলের মতো ঝোপের সব আড়াল থেকে সবগুলোকে বেরিয়ে আসতে দেখল রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে। সেইসঙ্গে পেছনে দেখা মিলল দুটো টায়োটা ল্যান্ড ক্রুজার, 70 series এর। দাঁতে দাঁত পিষে গালি ছাড়ল রুদ্র, 'মাদার***'
বিপদজ্জনক স্পিডে রেখেই তাকাল আশেপাশে। এরমধ্যে আরও দুটো গু*লি চলেছে তবে গাড়িতে লাগেনি। টায়োটা দুটো সবেগে এগিয়ে আসছে। রুদ্রর চোখে পড়ল বাঁ পাশে জঙ্গলে ঢুকে পড়ার রাস্তা। আর কোনকিছু ভেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল না ও। সোজা নিজের জীপ নামিয়ে দিল জঙ্গল অভিমুখী রাস্তার ঢালে। ওর শক্তিশালী র্যাংলার ছুটে চলল এব্রোথেব্রো জঙ্গলের রাস্তার ভেতর দিয়ে। টায়োটা দুটোও ফলো করে নেমেছে। রুদ্র জানে, বেশিদূর আসতে পারবেনা টায়োটা। আটকে যাবে। ওর জীপটাও যে বেশিদূর যেতে পারবে, ব্যাপারটা তাও না। যেকোন সময় আটকে যেতে পারে।
ঘটলোও তাই। টায়োটা দুটো থেমে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে রুদ্রর গাড়ির সামনে পড়ে গেল বিস্তৃত শেকড়। তবে রুদ্রও আর চেষ্টা করল না এগোনোর। এই ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না, মুখোমুখিই হতে হবে। জীপ থামিয়ে হেডলাইট নিভিয়ে দিল রুদ্র। ছাদ দরজা দুটোই খুলে দাঁড়িয়ে তাকাল পেছনে। ওর সঙ্গে লোকবল বলতে এখন কেবল রঞ্জু। এদিকে ওরা বেশ কয়েকজন। রুদ্র ইচ্ছে করেই কোন লোক রাখেনি, তাতে ওর গোপনে গুলশান পৌঁছনোতে আরও বাঁধা আসতো। কিন্তু এতো গোপনীয়তার পরেও এরা জানল কীকরে রুদ্র কোন সময়, কোন রাস্তা দিয়ে, কীভাবে আসছে। এখনতো ওর কাছে মাইক্রোফোনও নেই যে ওর গুনধর স্ত্রী সে খবর দেবে। তাহলে? বেশি চিন্তা করার সময় নেই। তাই নিজের 'ঈগল ডেজার্ট' বের করতে করতে লাফিয়ে নামল জীপ থেকে। শত্রু অভিমুখে এগোতে শুরু করল। পেছন পেছন রঞ্জুও আসছে নিজের অ*স্ত্র বের করতে করতে। রঞ্জু জোরে শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, 'ফায়ারিং এর প্লান করতাছেন, ভাই?'
' হ্যাঁ।'
একশব্দে উত্তর দিয়ে গতি বাড়াল রুদ্র। সামনে লোকের উপস্থিতি টের পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে একটা গাছের আড়ালে চলে গেল ও। রঞ্জুও ঠিক পাশের গাছটাকে নিজেকে আড়াল করল। আকাশে চাঁদটা আর্ধেক। আট-নদিনের মধ্যে পূর্ণরূপ ধরবে। সুতরাং চাঁদের আলোয় অনেকটাই আলোকিত জঙ্গল। ব্যপারটা বিরক্ত করল রুদ্রকে। আমাবশ্যা হলে ভালো হতো। লুকোনোর জন্যে আদর্শ জায়গা অন্ধকার। ও খেয়াল করল শ্বেত কুয়াশা ভেদ করে শিকাড়ি নেকড়ের মতো এগিয়ে আসছে একগুচ্ছ অস্ত্রধারী লোক। নিজেদের গাছের আড়ালে রেখে রেখে সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে। তাদের মধ্যমণি হিসেবে দেখা যাচ্ছে একজনকে। সুঠামদেহী, লম্বা কোন যুবকের অবয়ব। রঞ্জু সম্মোহিতের মতো সেদিকে চেয়ে থেকে চাঁপা স্বরে বলল, ' ক্যাডা হইতে পারে ভাই? ডার্কের?'
ঠোঁট বাকিয়ে হাসল রুদ্র। মাথা নেড়ে বলল, ' উহু। তবে ডার্কের রাণীর প্রিয়তম, ব্লাকের সম্রাট। সম্রাট তাজওয়ার।'
রঞ্জু কেশে উঠল। রুদ্র সেফটি ক্যাচ অফ করল পিস্তলের। রঞ্জুও তা করতে করতে বলল, ' এতোজনের অপজিটে দুইজনে মোটে? রিস্ক হইয়া যাইব না?'
' অপশন নেই।'
কথাটা বলতে বলতে নেকড়ের পালের দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল রুদ্র। সফল লক্ষ্যভেদ। সরতে পারল না বেচারা। গুলিটা সম্রাটকেই করতে চেয়েছিল। কিন্তু তিন নম্বর ডেলিভারির আগে এদের কাউকে মেরে ফেলতে চাইছেনা ও। নিজের প্রয়োজনেই এদের জীবিত চাই ওর। তাছাড়াও সম্রাটকে লক্ষ্য করলে তা ভেদ হতো কিনা সেটাও সন্দেহের। যথেষ্ট ভালো গতি তার।
এদিকে প্রথম ফায়ারিংয়েই একজনকে হারিয়ে মাথায় র*ক্ত উঠে আসল সম্রাট তাজওয়ারের। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সঙ্গে সঙ্গে সেদিকেই লক্ষ করে গু*লি ছুড়ল, যেদিক থেকে গু*লি এসেছে। কাজটা সম্রাট করেছে গু*লি আসার সঙ্গেসঙ্গে। ভীষণ দ্রুত। ফলে রুদ্র সরার সুযোগ পায়নি। তবে গাছের আড়ালে সুরক্ষিত রেখেছে নিজেকে। নয়তো ভোগে যেতো ও নিজেও। মনে মনে হাসল রুদ্র। রাণী মির্জা কাউকে চুজ করলে এমনি এমনি করেনা। ফেলনা নয় এই ছেলে। সম্রাটকে এদিকে আসতে দেখে অলক্ষ্যে গু*লি ছুড়ে গাছ বদলালো রুদ্র। রঞ্জুও ছুড়ল একই সময়। চলে গেল অন্যসাইডের গাছের আড়ালে।
দুজনের আচমকা একসঙ্গে গুলি করায় কিছুটা ভরকে গেল সম্রাট ও তার লোকজন। তবে সামলেও নিল ভীষণ দ্রুত। সম্রাটের নির্দেশে পুনরায় তারা গাছের আড়ালে চলে গেল। কিছুক্ষণ গাছের শেল্টার অদলবদল করে করে ফায়ারিং চলল। কজন আহত হল বা মারা পড়ল, জানা নেই। সম্রাট অধৈর্য হয়ে বেপরোয়া লক্ষ্যে গু*লি ছুড়তে শুরু করল রুদ্রর দিকে। রুদ্র তখন ম্যাগাজিন চেঞ্জ করছিল। গু*লিটা লেগে গেল ওর কোমরের ওপর দিয়ে। সজোরে জায়গাটায় ধাক্কার সঙ্গে তীব্র ব্যথা অনুভব করল রুদ্র। কিন্তু বুলেট প্রুভ পড়া সে। তাই সামলেও নিল দ্রুত। নিজেও গু*লি ছুড়ল সম্রাটকে লক্ষ্য করে। ততক্ষণে আড়ালে চলে গেছে সম্রাট। ওর গতি আশ্চর্যরকম ক্ষীপ্র।
এদিকে গাছের শেল্টার চেঞ্জ করতে গিয়ে একটা বু*লে*ট রঞ্জুর পা ঘেষে চলে গেলে। সঙ্গে ছিড়ে নিয়ে গেল রানের সামান্য খানিক মাংস। গাছের আড়ালে গিয়ে পা ধরে আর্তনাদ কর্য বসল রঞ্জু। রুদ্র তাকাল সেদিক। রাগে গা জ্বলে উঠল ওর। ক্ষীপ্ত চোখে তাকিয়ে সেদিকেই গু*লি ছুড়ল যেদিন থেকে রঞ্জুর দিকে গু*লি করা হয়েছে। শু*টকারীর মাথার খু*লিসহ উড়ে এলো। আরও একবার ফায়ার করে সকলকে ডাইভার্ট করে রুদ্র মাটিতে গড়িয়ে চলে গেল রঞ্জুর কাছে। ওকে গাছের আড়ালে চেপে ধরে পা পরীক্ষা করল অতিদ্রুত। এরমধ্যে আরও দুবার অলক্ষ্যে শ্যুট করল তাদের কাছে আশা থেকে আটকাতে। ক্ষত গভীর না। তবে রক্তক্ষরণ হচ্ছে বেশ। রঞ্জু দাঁতে দাঁত চেপে ব*ন্দুক নিয়ে উঠতে গেলেই ধমকে উঠল রুদ্র। অলক্ষ্যে আরেকটা গু*লি ছুড়ে বলল, 'চুপচাপ বসে থাক। বাকিটা আমি সামলাব। এন্ড ইটস্ এন অর্ডার।'
বলে পুনরায় ফায়ারিংয়ে মনোযোগ দিল রুদ্র। এবার অলক্ষ্যে নয়। প্রপার লক্ষ্য ঠিক করে। অপরদিকে সম্রাটের কৌশলও প্রশংসনীয়। দারুণ নির্দেশনার মাধ্যমে ব্যপারটা সামলাচ্ছে ও। ক্ষীপ্র হলেও ওদের প্রত্যেকটা মুভ পরিকল্পপিত। রুদ্র আমের বলেই এতক্ষণ টিকে আছে। অন্যকেউ পারতো না। মনে মনে প্রশংসা করতে বাধ্য হল রুদ্র।
রুদ্র এবং সম্রাট প্রায় কাছাকাছিই চলে এসেছে দুজন। সম্রাট চেঁচিয়ে বলে উঠল, ' আজ আমি তোকে জীবিত ফিরতে দেবনা রুদ্র। কোনভাবেই না।'
রুদ্র ঐ অবস্থাতেই হাসল। নিজেকে শেল্টারে রেখেই বলল, 'তোর সৌভাগ্য। আজও আমি তোকে প্রাণে মারবনা। যদিনা তুই বাধ্য করিস।'
অতঃপর রুদ্র যে গু*লিটা করল সেটা সম্রাটের কানের খুব কাছ দিয়ে গেল। ক্ষয়ে নিয়ে গেল খুব সামান্য মাংসও। সজোরে চেঁচিয়ে উঠল সম্রাট। চোখেমুখে অন্ধকার দেখল। কিন্তু এতে ওর ক্ষীপ্রতা বেড়ে গেল কয়েকগুন। এতক্ষণে ও বুঝে গেছে রুদ্র বুলেট প্রুভ পড়া। ও এবার বেপোরয়া শ্যুট শুরু করল। লক্ষ্য রুদ্রর মাথা। একে রুদ্র একা, বিপরীতে এতো লোক। সে সঙ্গে প্রতিপক্ষ স্বয়ং সম্রাট তাজওয়ার। বেশ বেকায়দায় পড়ল রুদ্র। রঞ্জুও পারছে না উঠে ওকে সাহায্য করতে। যেকোন সময় অঘটন ঘটে যাবে।
হঠাৎই বেশ ভালো বেগে পাঁচ পাঁচটা বাইক এসে ঘিরে ধরল এদেরকে। প্রতি বাইকে তিনজন করে মোট পনেরোজন। সংখ্যাটা এখন সম্রাটের সুস্থ লোকেদের চেয়ে বেশি। রুদ্র ভ্রুকুটি করে দেখল সবচেয়ে সামনের বাইকের প্রথমজন আর কেউ নয়, উচ্ছ্বাস। হতভম্ব সম্রাট তাজওয়ার এবং তার দলকে আরও হতভম্ব করে দিয়ে আক্রমণ শুরু করল সোলার সিস্টেম। দিশেহারা অবস্থা হলেও সামলানোর পূর্ণ চেষ্টা করল ব্লাকহোল। ক্ষেপা সম্রাট তখন আরও ক্ষেপে গু*লি ছুড়ল উচ্ছ্বাসের দিকে। উচ্ছ্বাসের নিজের শেলটার বেছে নিয়ে এ অবস্থাতেও কৌতুক করে চেঁচিয়ে বলল, 'কী ভাই? কেমন লাগল ওয়াইল্ডকার্ড এন্ট্রি? জোস্ না?'
সম্রাট্রের শরীর তখন রাগে থরথর করে কাঁপছে। এই বেজ*ন্মার বাচ্চাটা সবখানে এসে ওর গোছানো খেলাটা বিগড়ে দেয়। একে না মে*রে ম*রেও শান্তি পাবেনা।
রুদ্র খানিকটা থমকালেও সামলে নিল নিজেকে। রুদ্র, উচ্ছ্বাসসহ বাকি লোকবলে এখন তাদের পাল্লা ভারী। সুতরাং দু মিনিটে আরও দুজন হারিয়ে, আর আহত হয়ে ব্লাকহোল বুঝে ফেলল পাশা পাল্টে গেছে। হার নিশ্চিত। সুতরাং পিছু হটার জন্যে প্রস্তুত হল তারা। কিন্তু সম্রাট তা মানতে পারল না কিছুতেই। তীব্র রাগে কেঁপে উঠে রুদ্র শেল্টারে থাকা গাছটার দিকে শ্যু*ট করতে করতে এগিয়ে গেল ও। ভাব এমন, ও ম*রলে মরবে আজ। কিন্তু রুদ্রকে মে*রে ম*রবে। এদিকে দুটো গু*লি ইতিমধ্যে সম্রাটের বুলেটপ্রুভ জ্যাকেটে ধাক্কা দিয়েছে। তাও বিরত হলোনা সে। দাঁতে দাঁত পিষে ব্যথা হজম করেও নিজ জেদে অটল হয়ে এগিয়ে গেল।
ফলে রুদ্রর জন্যে শেল্টারে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল। একটা ডাইভার্শন ফায়ার করে গাছের শেল্টার বদলাতে গেল রুদ্র। কিন্তু বিস্তৃত এক শেকড়ে পা আটকে পড়ে যেতেই নিচ্ছিল। তখনই পাশের গাছ থেকে ছুটে এসে ওর হাত ধরে ফেলল উচ্ছ্বাস। সে সুযোগে রুদ্রর মাথা বরাবর গু*লি ছুড়তে উদ্ধত হল সম্রাট তাজওয়ার। কিন্তু তারআগেই সোজা সম্রাটের দিকে শ্যু*ট করল উচ্ছ্বাস। যেটা সোজা ওর বাহুতে লেগে ছিটকে গেল পিস্তল। কাঁত হয়ে মাটিতে পড়ল সম্রাট তাজওয়ার। জীবনে প্রথমবার অন্যকিছু দেখা গেল উচ্ছ্বাসের চোখে। সদা কৌতুকপূর্ণ চোখদুটোতে যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্যে খু*ন চেপে গেল। দ্বিতীয় শ্যুটটা করতে চাইল ঠিক ওর মাথায়। কিন্তু উচ্ছ্বাসের ম্যাগাজিন তখন ফাঁকা। এই গোটা ব্যপারটা ঘটল মাত্র তিন সেকেন্ডে। গালি ছেড়ে পিস্তলটা নামিয়ে নিল উচ্ছ্বাস। সোলার সিস্টেমের বাকি সদস্য ততক্ষণে ওদের দুজনকে শেল্টার দিয়ে দাঁড়িয়েছে।
উচ্ছ্বাস রুদ্রকে টেনে দাড় করিয়ে বলল, 'শালা, ওপরওয়ালা আমারে শুধু তুই পা ফসকালে ধরার জন্যেই পাঠাইছে নাকি বুঝতেছিনা। তোর পা বেসামাল হলেই আমার ভূতের মতো এসে হাজির হতে হয়। এ কেমন ডিউটি? তারবদলে ডিরেক্ট তোর ঠ্যাং বানাইয়া পাঠালেইতো পারতো। ধরাধরির সিন নাই। ঝামেলাই শ্যাষ!'
রুদ্র সেকথায় পাত্তা না দিয়ে গা ঝড়তে ঝাড়তে বলল, ' তুই এখানে পৌঁছলি কীকরে?'
' জাদুটোনা করে।' পুনরায় কৌতুক ফিরে এসেছে উচ্ছ্বাসের চোখে।
ওদিকে সম্রাটের লোকেরাও তার শেল্টারে দাঁড়িয়ে গেল। সম্রাট চেষ্টা করল পুনরায় উঠে দাঁড়াতে, কিন্তু সম্ভব হলোনা। গলগল করে র*ক্ত বের হচ্ছে বাহু দিয়ে। ক্ষত চেপে ধরে ভয়ানক এক দৃষ্টিতে উচ্ছ্বাসের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকেই জ্ঞান হারাল ও। জ্ঞান হারানোর আগে বিড়বিড় করে বলল, 'শু**র বাচ্চা।'
সম্রাট তাজওয়ারের লোকেরা কোনমতে অজ্ঞান সম্রাটকে নিয়ে পালাল সেখান থেকে। রুদ্র আর উচ্ছ্বাস মিলে দ্রুত গেল রঞ্জুর কাছে। বেচারা তখনও কাতরাচ্ছে। নিজের রুমাল দিয়ে শক্ত করে জায়গাটা বেঁধে দিল রুদ্র। উচ্ছ্বাস ততক্ষণে বাকিদের নির্দেশ দিল লাশকটা জঙ্গলে পুঁতে ফিরে আসতে। অতঃপর রুদ্র আর উচ্ছ্বাস রঞ্জুকে নিয়ে ফিরে গেল জীপের কাছে। রঞ্জুকে পেছনে বসিয়ে নিজেরা সামনে বসল। লম্বা শ্বাস ফেলে জীপ স্টার্ট দিল রুদ্র। আজ সম্রাট তাজওয়ারের মুভটা সত্যিই স্মার্ট মুভ ছিল। উচ্ছ্বাস ঠিকসময় না পৌঁছলে সামাল দিতে পারতো কিনা জানেনা ও। কিন্তু প্রশ্ন এখনো থেকেই যায়। সম্রাট কীকরে জানল রুদ্র কখন, কোন রোড দিয়ে কীভাবে ঢাকা ফিরছে?
জীপ হাইওয়েতে উঠল ওদের। অন্ধকার কেটে ধীরে ধীরে ভোর হচ্ছে। সাদা কুয়াশা আরও বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। শীতে জমে আসছে শরীর। রঞ্জু চোখ বুজে ঘুমোনোর চেষ্টা করে পায়ের যন্ত্রণাকে ভুলতে চাইছে। এদিকে চারপাশ দেখতে দেখতে মৃদু স্বরে শিস বাজাচ্ছে উচ্ছ্বাস। রুদ্র সামনের কুয়াশাঘেরা রাস্তায় চোখ রেখেই বলে উঠল, 'বললি না যে এখানে কীকর পৌঁছলি তুই? আমিতো রওনা দেওয়ার আগে একমাত্র কাকাকেই ডিটেইলস পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছে? আর সে বললেও তুই জঙ্গলের লোকেশনে কীকরে পৌঁছলি?'
উচ্ছ্বাস হেসে বলল, ' ঐযে বললাম, ম্যাজিক।'
' আমি সিরিয়াস।'
' দূর তোর সিরিয়াস। এতো সিরিয়াস হয়ে কী ছিঁড়ছিস জীবনে?'
রুদ্র ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। এ ছেলের সঙ্গে কথা বলা মানে নিজের মাথাব্যথা বাড়ানো। রুদ্রর নিঃশব্দ পরাজয়ে হো হো করে হেসে উঠল উচ্ছ্বাস। ওর হাসির শব্দে ছমছম করে উঠল নির্জন, কুয়াশাঘেরা শীতল সরু হাইওয়ে।
******
৭ জানুয়ারি, ২০২১। দুপুর তখন বারোটা। মির্জাদের অফিসে এসে আজ হাজির হয়েছে করিম তাজওয়ার। জরুরি এবং সংক্ষিপ্ত মিটিং। ব্লাক হোল থেকে কেবল করিম তাজওয়ার থাকলেও, ডার্ক নাইট থেকে উপস্থিত আছে শওকত মির্জা, শান মির্জা এবং পলাশ মির্জাও।
করিম তাজওয়ারের চোখমুখ গম্ভীর। চেহারায় বয়সের ছাপ আরও গভীরভাবে পড়েছে আজ। একরাতে যেন আরও বেশি বুড়িয়ে গেছে লোকটা। হাতে মদের গ্লাস। করিম তার ধূসর চোখজোড়া শওকত মির্জার দিকে ফেলল। শীতল স্বরে বলল, 'মেয়ে কোথায় আপনার?'
শওকত সিগারেট টানছিল আনমনে। করিমের প্রশ্নে ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে বলল, 'বাড়িতেই। বলেছিলাম আসতে। বলল আজ আসতে চায়না।'
' সম্রাটযে হসপিটালাইজড, সে খবর জানে আপনার মেয়ে?'
' জানে।'
' তাও একবার দেখতে অবধি গেলোনা? দেখাতো দূর, খোঁজটাও নিলোনা!'
ভ্রুকুটি করল মির্জা। পুনরায় সিগারেট ঠোঁটে গুজে বলল, ' ও নিজের মর্জির মালিক করিম। জানো তুমি সেটা।'
পলাশ কথা ঘোরাতে বলে বসল, ' আচ্ছা সম্রাট আর রাণী যখন উপস্থিত নেই। আজ মনে হয় জরুরি কোন আলোচনা না করাই ভালো। যেকোন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ওদের মাথা আমাদের প্রয়োজন।'
সে কথা কানেও তুলল না করিম। তার শীতল দৃষ্টি এখনো শওকতের দিকে। গলা ঠান্ডা গলায় বলল, ' আমি যেমন আপনার মেয়েকে জানি। আপনি তার চেয়েও ভালোভাবে জানেন। এটা নিয়ে সন্দেহের কোনরকম অবকাশ নেই, রুদ্র আমেরের প্রেমে মজে গেছে আপনার মেয়ে। আর আজ আমাদের যে দুর্ভোগ, তার কারণ শুধু এবং শুধুমাত্র রুদ্রর প্রতি ওর অতিপ্রেম।'
শওকত কিছু বলতে যাচ্ছিল। করিম থামিয়ে দিয়ে বলল, 'না মির্জা! অস্বীকার করতে চেয়ে লাভ নেই। আকাশের ঐ সূর্যটির মতোই এটা স্পষ্ট, রাণী রুদ্রকে ভালোবাসে। আমার ছেলের প্রতি ওর আর কোন টান নেই। হ্যাঁ, মানছি ওর সাহায্যেই আরা চরম সফলতার মুখ দেখেছিলাম। ওর বুদ্ধি, কৌশল, শ্রম আমাদের অসম্ভব লাভ দিয়েছে। এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই। কিন্তু এটাও এখন সত্যি যে, আমাদের পতনের কারণটাও ও-ই। এবং বিনাশের কারণটাও ও-ই হবে যদি এভাবে চলতে থাকে। সেই বিনাশ খুব বেশি দূরে নয়। বড়জোর সপ্তাহখানেক। একথা যে মিথ্যে নয়, তা আমার চেয়েও ভালোকরে আপনি জানেন। যদি বিনাশকেই মেনে নিতে হয়, তবে সেই সাময়িক সফলতার প্রয়োজন কী ছিল?'
নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল শওকত। চোখমুখ ভয়ানক শান্ত তার। খানিকক্ষণ চিন্তা করল সে। অতঃপর শান্ত স্বরেই বলল, ' বিনাশ হওয়ার জন্যে জীবনের এতোটা পথ পেরোইনি আমি করিম। বিনাশতো আমি হবনা। আর সেই বিনাশের কারণ যদি আমার নিজের ঔরসজাত কন্যাও হয়। সেই কারণটাকে উপড়ে ফেলার আগে আমি দু'বার ভাবব না।'
চমকে তাকাল করিম আর পলাশ। এমন কথা আশা করেনি ওরা। শান হতভম্ব হয়ে বলে উঠল, 'বাবা..'
শক্ত চোখে ছেলের দিকে তাকাল শওকত, ' আবেগী হয়োনা। এ জগতে আবেগি হয়ে টেকা যায়না। রাশেদ আমেরের মতো মানুষই পারেনি। আমরা কোন ছাতা?'
নিস্তব্ধ হয়ে গেল রুমটা। কারো মুখে কোন কথা নেই।
******
আমের ফাউন্ডেশনের মিটিংরুমে থমথমে নীরবতা। এক টু শব্দও নেই। রুমে উপস্থিত রুদ্র, উচ্ছ্বাস, জাফর আর জয়। রঞ্জু রেস্টে আছে। আপাতত একটা শব্দও করছেনা উপস্থিত কেউ। খানিকবাদে কেবল জাফরের ঘনঘন শ্বাস ফেলার আওয়াজ শোনা গেল। হাত-পা অস্বাভাবিক কাঁপছে তার। চোখদুটো ছটফট করছে। মনে হচ্ছে শ্বাস নেওয়ার জন্যে সংঘর্ষ করতে হচ্ছে তাকে। অনেকক্ষণ পর নিজেকে ধাতস্থ করে রুদ্রর দিকে চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল জাফর। কেঁপে যাওয়া গলায় বলে উঠল, 'প্রিয়তা মা?'
রুদ্র ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝাল কেবল। জাফর ঢোক গিলল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সামলাতে চাইল নিজেকে। হ্যাঁ, ইন্ডিয়া থেকে ফিরে জাফরকে প্রিয়তার সত্যিটা বলে দিয়েছে রুদ্র। লুকিয়ে রাখার আর কোন কারণ নেই। পরবর্তী অর্থাৎ অন্তিম প্লানটা সাকসেসফুল হলে আমের ভিলার বাকি সদস্যদেরও জানিয়ে দেওয়া হবে সব সত্যি। এই ছলনা, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণার খেলা আর না। যদিও তখন সত্যিটা তখন জানা, না জানা একই কথা হবে। কারণ তখন প্রিয়তা_
রুদ্রর ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে গলা ঝাড়ল উচ্ছ্বাস। জাফরের কাঁধে হাত রেখে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। রুদ্র গম্ভীর গলায় বলল, ' এখন ইমোশনাল হওয়ার সময় না, কাকা। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে আমাদের হাতে।'
জাফর অসহায় চোখে তাকাল রুদ্রর দিকে, ' কিন্তু.. কিন্তু মেয়েটা এমন করল? আমার ভা-ভাইজানকেও_'
রুদ্র আবেগহীন গলায় বলল, ' কষ্ট পেলে সত্যিটা বদলে যাবেনা, কাকা। মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।'
' এজন্যই এতোদিন এসব...'
' হ্যাঁ।'
আবার কিছুক্ষণ নীরব রইল ঘরটা। পরিবেশটা একটু স্থিতিশীল হতেই রুদ্র এবার বলতে শুরু করল, ' ইন্ড্রিরা নাইন এবং বার্মা নাইন থেকে এডভান্স আমি পেয়েছি পঞ্চাশ কোটি। তোমাদের হিসেব অনুযায়ী গতসেলে পাওনা শোধ করে আমাদের প্রফিট পয়ষট্টি কোটি। আজ রাতে ব্লাক ডিউন অর্থাৎ রায়ান খলিফার সঙ্গে অনলাইন মিটিংয়ে একটা ডিল কনফার্ম হয়ে গেলে প্রায় একশ কোটি আসবে। বাকিসব মিলিয়ে যা আসবে তা দিয়ে ভ্লক আর্মেক্স আর কস্ট আর্মের টাকা কালকের মধ্যেই আমরা শোধ করে দিতে পারব। সুতরাং রাতের মিটিং এবং কালকের পেমেন্টের প্রপার এরেঞ্জমেন্ট লাগবে।'
জাফর কিছু বলল না। তার বলার মতো অবস্থা আছে বলে দেখে মনে হলোনা কারো। ধাক্কা খেয়েছে সে একটা। আর জয় আপাতত অনুগত লোক। যা বলবে তাই। কিন্তু উচ্ছ্বাস গাল চুলকে বলল, 'কালকেই কেন?'
' দরকার আছে।'
ছোট্ট জবাব দিল রুদ্র। বলল না, কালকের মধ্যে পেমেন্ট করে দিতে পারলেই ডার্ক নাইট আর ব্লাক হোলের কাছে পরবর্তী মাল পাঠানোর সব তথ্য ওর কাছে পাচার করবে ভ্লক আর্মেক্স আর কস্ট আর্মস। কারণ মাল আসবে ওখান থেকেই। আর সে তথ্য দিয়েঈ ওদের ওপর অন্তিম এবং মারণ প্রহারটা করতে পারবে রুদ্র আমের। যাতে ওদের শেষ শতভাগ নিশ্চিত। ওদের কফিনে সেই শেষ পেরেক মারবে রুদ্র। ধীরে, গোপনে, কাউকে না জানিয়ে। দুবাইয়ের মিটিং থেকে শুরু করে কালকের পেমেন্টের মাধ্যমে তথ্য চুরি। শত্রুকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলায এই গোটা পরিকল্পনার
রুদ্র একটা নাম দিয়েছে। 'DEADLOCK GENESIS'.
·
·
·
চলবে……………………………………………………