জবা ইরফানকে অঢেল টাকা দিয়েছে। সম্পদ দিয়েছে। স্বপ্নের প্রজেক্ট দিয়েছে। এমনকি তার সব ঋণও পরিশোধ করে দিয়েছে। যে জিনিসগুলোর জন্য একসময় ইরফান নিজের বিবেক, ভালোবাসা আর সংসারকে বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেনি। আজ সেই সবকিছুই তার হাতে।
তবু কেন যেন কিছুই আর ভালো লাগে না।
টাকার হিসাব বাড়ছে, অথচ জীবনের হিসাব শূন্য হয়ে যাচ্ছে। একসময় যে ব্যাংক ব্যালেন্স দেখে তার চোখ চকচক করত, আজ সেই সংখ্যাগুলো কেবল নির্জীব অঙ্ক মনে হয়।
যে সম্পত্তির জন্য সে এত লড়েছে, এত মিথ্যা বলেছে, এত বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আজ সেগুলো ছুঁয়েও কোনো অনুভূতি জাগে না।
কারণ অবশেষে সে বুঝতে পেরেছে। মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ব্যাংকের লকারে থাকে না। থাকে কিছু মানুষের ভালোবাসায়।
আর তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ ছিল জবা আর জারা।
একজন স্ত্রী, যে তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিল। আর এক ছোট্ট মেয়ে, যে তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা মনে করত। সেই দুজনকেই সে নিজের হাতে হারিয়েছে। আজ কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েও সে পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব মানুষ।
কারণ টাকা দিয়ে বাড়ি কেনা যায়, ঘর নয়।
টাকা দিয়ে বিছানা কেনা যায়, ঘুম নয়। টাকা দিয়ে মানুষ ভাড়া করা যায়, ভালোবাসা নয়।
রাতগুলো সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর লাগে ইরফানের।
এই বিশাল বাড়িটা একসময় জীবন্ত ছিল।
জারার হাসির শব্দে ভরে থাকত। জবার পায়ের নুপুরের শব্দ ভেসে বেড়াত। ডাইনিং টেবিলে গল্প হতো। বারান্দায় চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠত।
এখন সবকিছু আছে। শুধু মানুষগুলো নেই।
ড্রইংরুম আছে, কিন্তু হাসি নেই। ডাইনিং টেবিল আছে, কিন্তু অপেক্ষা নেই। শোবার ঘর আছে, কিন্তু ঘুম নেই। কখনো কখনো মাঝরাতে ইরফানের মনে হয় দেয়ালগুলো তার দিকে তাকিয়ে আছে। নীরবে। অভিযোগ নিয়ে।
প্রতিটা দেয়াল যেন তাকে মনে করিয়ে দেয়,
'তুই নিজ হাতে সব নষ্ট করেছিস।'
সোফার পাশে দাঁড়ালে মনে হয়, এখানে বসে জবা একদিন বই পড়ত। বারান্দায় গেলে মনে পড়ে, জারা বৃষ্টির সময় বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকত।
ডাইনিং টেবিলে বসলে মনে হয়, এখনই হয়তো জবা এসে বলবে,
'খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, চল খেয়ে নাও।'
কিন্তু কেউ আসে না। শুধু নীরবতা আসে।
আর সেই নীরবতা ধীরে ধীরে ইরফানের বুকের উপর বসে তাকে শ্বাসরোধ করে।
একসময় সে ভাবত, টাকা মানুষকে সুখী করে। আজ সে জানে,সুখ টাকা দিয়ে কেনা যায় না।
সুখ ছিল জবার চোখের সেই নির্ভরতা। সুখ ছিল জারার ছোট্ট হাতের স্পর্শ। সুখ ছিল একটা সাধারণ সংসার। যেটাকে সে তুচ্ছ ভেবেছিল। এখন আফসোস হয়। ভীষণ আফসোস।
কিন্তু কিছু আফসোসের কোনো ক্ষমা নেই।
কিছু ভুলের কোনো সংশোধন নেই। কিছু মানুষ একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না।
ইরফান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
বিশাল বাড়ি। পিছনে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃস্ব মানুষ। যে অনেক কিছু পেয়েছে।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দুটো মানুষকে হারিয়ে ফেলেছে চিরতরে।
জবা শুধু ইরফানকে অঢেল টাকা আর সম্পত্তিই দিয়ে যায়নি, দিয়ে গেছে আরও ভয়ংকর কিছু স্মৃতি। তালাকের পর ও নিজের আর জারার সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে বাবার বাড়িতে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে বাড়িটাও ইরফানের নামে লিখে দিয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এ যেন এক অসাধারণ উদারতা। কিন্তু জবা জানত, কিছু উপহার আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ।
জবা এটা ইচ্ছে করেই করেছে। এই বাড়িতে থাকা মানে ছিল প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি দরজায়, প্রতিটি জানালার কাঁচে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতির মুখোমুখি হওয়া।
জবার জন্য সেই স্মৃতিগুলো ছিল শ্বাসরোধী। এই বাড়ির প্রতিটি কোণে ইরফানের হাসি, কথা, স্পর্শ লুকিয়ে ছিল। এখানে থাকলে অতীত প্রতিদিন ওকে গলা টিপে মারত। তাই সে চলে গেছে।
কিন্তু ইরফান? ইরফানকে ও এখানেই রেখে গেছে। ইচ্ছে করেই। কারণ জবা জানত, যে মানুষ ভালোবাসার মূল্য বুঝতে পারেনি, তার জন্য সবচেয়ে বড়ো শাস্তি কারাগার নয় বরং স্মৃতি।
যে বাড়িতে তারা এক যুগ পাশাপাশি থেকেছে; যেখানে জারার প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, প্রথম স্কুলে যাওয়ার মুহূর্তগুলো জমে আছে, সেই বাড়িতে সুখী হওয়া অসম্ভব। লাখো স্মৃতি সেখানে বাসা বেঁধে আছে। দিনের আলোয়, রাতের অন্ধকারে, নিস্তব্ধ দুপুরে সবসময়।
আর সেই কারণেই বাড়িটা ইরফানের নামে করে দিয়েছে জবা। যেন সে পালাতে না পারে। যেন প্রতিদিন তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় সে কী হারিয়েছে?
এটাও জবার শাস্তির একটা অংশ। যে বাড়িতে এক সাথে এক যুগ কাটিয়েছে। লাখো স্মৃতিরা সেখানে বাসা বেঁধে আছে সেখানে আর যাই হোক ইরফানের সুখী হওয়া সম্ভব নয়। জবা সেটা জানে। জানে বলেই অঢেল টাকা সম্পত্তি আর এ স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি দিয়ে ইরফানকে আরেকটা শাস্তি দিয়েছে।
জবা নিজের সঙ্গে নিয়ে গেছে কাজের লোক, প্রিয় দুই কুকুর আর কয়েকটি বিড়াল। কিন্তু ইচ্ছে করেই কিছু প্রাণী রেখে গেছে। জারার পছন্দের খরগোশ। বারান্দায় ঘুরে বেড়ানো কয়েকটা বিড়াল। আর উঠোনের সেই পাখিগুলো, যাদের খাবার দিতে জারা প্রতিদিন সকালে ছুটে যেত। এগুলো আর প্রাণী নয়। এগুলো স্মৃতি। জীবন্ত স্মৃতি।
প্রতিবার ওদের দেখলে ইরফানের মনে পড়ে যায় জারার হাসি। মনে পড়ে যায় জবার ব্যস্ত পদচারণা। মনে পড়ে যায় সেই সংসার, যেটা একসময় তার ছিল। তারপর বুকের ভেতর কিছু একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। এমন এক ব্যথা, যার কোনো ওষুধ নেই। জবা জানে এসব দেখে প্রতিনিয়ত দগ্ধ হবে ইরফান।
ইরফান সত্যি দগ্ধ হচ্ছে। স্মৃতির আগুনে পুড়ে প্রতি নিয়ত জ্বলছে কিন্তু ছাই হয়ে নিঃশেষ হচ্ছে না। যেন কোনো জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, যার লাভা কখনো ঠান্ডা হয় না। অন্ততকালের জন্য জ্বলবে। যে শুধুই জ্বলবে যার আগুন জ্বালাবে, কিন্তু নিভে নিঃশেষ হবে না। আর ইরফানের কষ্টও কমবে না। এ জন্যই বলে অনুশোচনার চেয়ে বড়ো কোনো শাস্তি নেই।হারিয়ে ফেলার পর ভালোবাসার মূল্য বুঝতে পারাই ভয়ংকর শাস্তি।
ফোনের হঠাৎ বেজে ওঠার শব্দে চিন্তার গভীর অতল থেকে বাস্তবে ফিরে এলো ইরফান। ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলে উঠল একটি নাম, কোয়েল।
নামটা দেখেই ভ্রু কুঁচকে গেল ওর। বুকের ভেতর কোথাও যেন জমে থাকা তিক্ততা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। একসময় এই মেয়েগুলোর জন্যই নিজেকে ভাগ্যবান ভাবত সে।
আজ মনে হয়, এই মানুষগুলোর কারণেই সে নিজের হাতে নিজের জীবনটা ধ্বংস করেছে।
সংসার হারিয়েছে। জবাকে হারিয়েছে। জারা হারিয়েছে। হয়তো নিজেকেও হারিয়েছে।
প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে কল রিসিভ করল ইরফান। বলল,
'হ্যাঁ বলো।'
অপরপাশ থেকে কোয়েল রাগী কণ্ঠে বলল,
'তোমার ওয়াইফ আমার এত বড়ো ক্ষতি করল তুমি ওকে ছেড়ে দিবে।'
ইরফান জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকাল।তারপর আশ্চর্যরকম শান্ত গলায় বলল,
'আমরা অন্যায় করেছি এবং তার শাস্তি পেয়েছি। বিষয়টা এখানেই শেষ করো।'
চেঁচিয়ে বলল কোয়েল,
'শেষ করব? কী শেষ করব?'
কোয়েলের কণ্ঠে জমে থাকা ঘৃণা আর প্রতিশোধস্পৃহা ফেটে বেরোতে লাগল। বলল,
'তোমার ওয়াইফ আমার জীবনটা শেষ করেছে। আমার মা হওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। আমি তাকে ছাড়ব না।'
ইরফানের চোখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল।
'এ ভুল করো না কোয়েল।'
'কেন ভয় পাচ্ছ?'
'জবার ক্ষতি করতে গেলে আমি নিজ হাতে তোমায় মেরে ফেলব।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতায় কাটল। তারপর কোয়েল হেসে উঠল। সেই হাসি মানুষের হাসি নয়। আহত শিকারির হাসি। বলল,
'নিজের বউয়ের জন্য দরদ দেখছি উতলে উঠছে। শোনো ইরফান, হয় জবাকে ধ্বংস করতে আমার সঙ্গ দাও নাহয় আমি তোমায় শেষ করে দিব।'
'কী করবে তুমি?'
'আমি জারাকে মেরে ফেলব।'
কোয়েলের উত্তর শুনে মুহূর্তেই ইরফানের শরীরের রক্ত যেন জমে গেল। চিৎকার করে ইরফান বলল,
'ইই বিচ।'
ওর গর্জন যেন পুরো ঘর কাঁপিয়ে দিল। তারপর বলল,
'আমার মেয়ের দিকে হাত বাড়ালে আমি তোকে দুনিয়া থেকে মুছে দিব।'
কোয়েল বিন্দুমাত্র ভয় পেল না। বরং আরও শান্ত স্বরে বলল,
'আমি মরার আগেই তোর মেয়েকে শেষ করে যাব।'
তারপর বেশ শান্ত স্বরে বলল,
'ঐ মেয়েই তোর আর জবার প্রাণ ভ্রমর তাই না? ওকে শেষ করলে তোরা এমনি মরে যাবি। এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আমি এখন জবার গ্রামের বাড়ি মাধবপুরেই আছি। আজ রাতেই খেল খতম তোর মেয়ের।'
কোয়েল কল কাটল। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু সেই নীরবতা আর আগের মতো ছিল না। ইরফানের বুকের ভেতর যেন হাজারটা হাতুড়ি একসাথে আঘাত করতে লাগল। জারা। তার মেয়ে। তার পৃথিবীর শেষ আলো। ওর কিছু হতে পারে না। কিছুতেই না।
কাঁপা হাতে সঙ্গে সঙ্গে জবাকে কল দিল ইরফান।
কিন্তু জবাকে পেল না। পর পর অনেকবার কল করল। তারপর মনে পড়ল জবারা গ্রামে গেছে। সেখানে নেটওয়ার্ক তেমন নেই বললেই চলে। ঘরের ভিতরে তো একদমই নেটওয়ার্ক থাকে না। বাইরে একটু আধটু থাকে।
বুকের ভেতর আতঙ্কের কালো ছায়া আরও ঘন হয়ে উঠল। কোনো সময় নষ্ট করল না ইরফান। প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।
গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। গর্জে উঠল গাড়ি। চাকার ঘর্ষণে উঠোনের ধুলো উড়ে গেল। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আবার কল দিল জবাকে। অনবরত কল করতে লাগল। কিন্তু কল ঢুকছে না। বারবার বলছে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব না।
রাতের রাস্তা ছিঁড়ে পাগলের মতো ছুটতে লাগল ইরফানের গাড়ি। ইরফানের মাথায় তখন একটাই চিন্তা। যত বড়ো অপরাধীই সে হোক, নিজের মেয়ের কোনো ক্ষতি হতে দেবে না। কিছুতেই না। জারা বেঁচে থাকুক। তারপর প্রয়োজন হলে সে নিজেই শাস্তি ভোগ করবে।
কিন্তু জারার গায়ে আঁচড় পর্যন্ত লাগতে দেওয়া যাবে না। কখনোই না।
—————
বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে গাছের মাথা বেয়ে নেমে আসছিল। আষাঢ়ের স্যাঁতসেঁতে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল মাটির গন্ধ। দূরে কোথাও নাম না জানা পাখি ডাকছে। আর সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই জমে উঠছিল এক অন্যরকম আয়োজন।
আজ উঠানে বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করেছে ফারিস।
অনেকদিন পর জবার মুখে প্রাণখোলা হাসি দেখতে পেয়েছে সে। সেই হাসিটুকু আরও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্যই যেন এত আয়োজন।
জবা সি-ফুড ভালোবাসে। খুব ভালোবাসে।
আর সেই মানুষটার পছন্দের জন্য পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যেতে রাজি ফারিস।
তাই কুয়াকাটা থেকে বিশেষভাবে আনিয়েছে একেবারে টাটকা সি-ফুড। বড় বড় কাঁকড়া, ঝিনুক, চিংড়ি, রূপচাঁদা, টুনা, স্যামন। কিছুই বাদ যায়নি। এমনকি জবার প্রিয় অক্টোপাসও। সাথে চিকেন, বিফ তো আছেই। বহু দেশ ঘুরে, সেসব দেশের খাবার খেয়ে ফারিস অনেক দেশের রান্নাই শিখেছে। ও চমৎকার বারবিকিউ করে।
মাছ, কাঁকড়া, ঝিনুক তো সহজেই পরিষ্কার করা গেল। কিন্তু ঝামেলা করল অক্টোপাস আর স্কুইড গুলো। বড়ো সাইজের অক্টোপাসটা পরিষ্কারে বেশ হ্যাপা হয়েছে ফারিসের। জবা অক্টোপাসের কালো অংশ খায় না। সে কারণে সিদ্ধ করে সেটা ছিলে ফেলতে হয়েছে।
তাছাড়া তাজা অক্টোপাস ধরে প্যাকিং করে পাঠিয়েছে। ঠিকভাবে পরিষ্কার করে পাঠায়নি। ফলে অনেক পিচ্ছিল ছিল এবং অনেক বালি ছিল টেন্টাকলের অসংখ্য সাকারগুলোর মধ্যে। যা বেশ ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে হয়েছে।
ফারিস সব কাজই যত্ন করে করল। একটুও বিরক্ত লাগেনি। বরং অদ্ভুত এক তৃপ্তি হচ্ছিল।
যে মানুষটার হাসির জন্য এত আয়োজন, তার জন্য একটু কষ্ট করতে দোষ কোথায়?
সন্ধ্যার পর বাড়ির পাশের বিশাল বাগানে বারবিকিউ হবে। আষাঢ়ের আকাশের কোনো ভরসা নেই। কখন বৃষ্টি নামে বলা যায় না। তবুও প্রস্তুতির কমতি রাখেনি ফারিস। ত্রিফল কাগজের ব্যবস্থা করে টানিয়ে ফেলল যাতে বৃষ্টি হলে সমস্যা না হয়।
এলাকায় লোডশেডিংও প্রচুর। তাই আগে থেকেই জেনারেটরের ব্যবস্থা করে রেখেছে।
বাগানের গাছগুলোতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ছোট ছোট আলোর মালা। অন্ধকার নামলে পুরো জায়গাটা যেন রূপকথার কোনো বনভূমিতে পরিণত হবে। এদিকে উঠানজুড়ে চলছে শিশুদের রাজত্ব।
এদিকে উঠানজুড়ে চলছে শিশুদের রাজত্ব।
ইনান, জারা, ফারহানের ছেলে-মেয়েরা দৌড়ে বেড়াচ্ছে পুরো বাড়িময়। কেউ লুকোচুরি খেলছে। কেউ গাছের আড়ালে লুকাচ্ছে।
কেউ আবার হেসে কুটিকুটি হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তাদের হাসির শব্দে যেন বহুদিনের নিস্তব্ধ বাড়িটাও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সবকিছু দেখে জবার বুকের ভেতর জমে থাকা বিষণ্নতার মেঘ একটু একটু করে সরে যেতে লাগল।
আর ঠিক তখনই যেন আনন্দটাকে পূর্ণতা দিতে বিকেলের দিকে এসে হাজির হলো হাফিজা ও তার ছেলে-মেয়ে। হাফিজাকে দেখেই জবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।অনেকদিন পর ওকে আবার সেই কিশোরী মেয়েটার মতো লাগছিল। যে মেয়েটা সামান্য আনন্দেও উচ্ছ্বাসে ভরে উঠত।
দুজন পাশাপাশি বসে গল্প করছিল। চারপাশে মানুষের হাসি, শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, রান্নার ধোঁয়া আর ভেজা মাটির গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত উষ্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে। একসময় হাফিজা জবার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
'এখন কেমন লাগছে?'
জবা চারপাশে একবার তাকাল। হাসিমুখে খেলতে থাকা বাচ্চাগুলোকে দেখল।পরিবারের মানুষগুলোকে দেখল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
'তোমাদের দেখে ভীষণ ভালো লাগছে।'
'গুড।'
কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাফিজা আবার বলল,
'জবা তুই কেবল ভালো থাকাই ডিজার্ভ করিস।'
জবা চুপ করে শুনছিল। হাফিজার কণ্ঠ আরও কোমল হয়ে এলো। বলল,
'তোর মতো মানুষের সাথে খারাপ থাকা যায় না। তুই হলি ভালো রাজ্যের মহারানী। তোর ভালো থাকতেই হবে। নয়তো রাজ্য তো ভালো থাকবে না।'
জবা অবাক হয়ে তাকাল। হাফিজা হাসল। বলল,
'কারণ মহারানী যদি কাঁদে, তাহলে তার পুরো রাজ্য কাঁদে। আর তুই যদি হাসিস, তাহলে তোর আশেপাশের মানুষগুলোও হাসতে শেখে।'
কথাগুলো শুনে জবার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল জল। বুক চিড়ে বেরিয়ে আসল দীর্ঘ দিনের জমিয়ে রাখা শ্বাস। দূরে তখন সন্ধ্যার আজান দেয়নি। তবে আকাশের গায়ে নেমে এসেছে নীলচে অন্ধকার। আর বহুদিন পর জবার মনে হলো। হয়তো ভাঙা জীবনের পরেও আবার নতুন করে সুখী হওয়া যায়।
জবা হালকা করে হাসল। কিন্তু সেই হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ঠিক তখনই হাফিজার মেয়ে দূর থেকে চিৎকার করে ডাকল,
'মা...!'
হাফিজা জবার কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল,
'আসছি মা।'
বলেই মেয়ের দিকে চলে গেল। জবা একা বসে রইল। চারপাশে মানুষের হাসি, বাচ্চাদের ছুটোছুটি, বারবিকিউর ধোঁয়া আর বৃষ্টিভেজা বাতাসে মিশে থাকা মাটির গন্ধ। সব মিলিয়ে পরিবেশটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
ঠিক তখনই ছোট্ট দুটো হাত এসে জড়িয়ে ধরল ওকে। জারা। জবা নিচু হয়ে মেয়ের কপালে চুমু খেল। হেসে বলল,
'আর ইউ হ্যাপি ডিয়ার?'
জারা দাঁত বের করে হাসল। বলল,
'ইয়েস মম।'
তারপর হঠাৎ কণ্ঠটা নরম হয়ে গেল। বলল,
'মা...!'
'বলো?'
'বাবা কখন আসবে?'
জারা নিষ্পাপ চোখে তাকাল জবার পানে।সেই চোখে ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল না কোনো কষ্ট। শুধু অপেক্ষা। একটা ছোট্ট শিশুর সরল অপেক্ষা। কথাটা শুনেই জবার বুকের ভেতর যেন কেউ ধারালো কিছু বসিয়ে দিল। জারা আবার বলল,
'আই মিস হিম।'
জবার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিইয়ে গেল। চারপাশের সমস্ত শব্দ যেন দূরে সরে যেতে লাগল। বাচ্চাদের হাসি। মানুষের গল্প। সবকিছু।
শুধু মেয়ের প্রশ্নটাই কানে বাজতে লাগল।
'বাবা কখন আসবে?'
জবা জারাকে আরও শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিল। কিন্তু উত্তর দিতে পারল না।
কী বলবে? কীভাবে বলবে? কোন ভাষায় একটা শিশুকে বোঝানো যায় যে তার বাবা-মা আর একসাথে নেই?
কীভাবে বলা যায়, যে মানুষটার জন্য সে প্রতিদিন অপেক্ষা করে, সেই অপেক্ষার আর কোনো গন্তব্য নেই? জবা জানে, সত্যিটা একদিন না একদিন জারাকে জানাতেই হবে। আজ নাহয় কাল। জানাতে তো হবেই। নয়তো ও ওর বাবার অপেক্ষায় থাকবে। আর অপেক্ষা বড্ড কষ্টদায়ক। অপেক্ষা বড়ো নিষ্ঠুর জিনিস। যতদিন যায়, ততই বুকের ভেতর শেকড় গাঁথে। জবা চায় না তার মেয়ে সেই নিষ্ঠুর অপেক্ষার মধ্যে বেঁচে থাকুক।
জারাকে সত্যিটা জানাতে হবে এবং শীঘ্রই জানাতে হবে।
তবুও...! আজ বলতে পারল না। আজও না।
মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে শুধু ফিসফিস করে বলল,
'মা তোমাকে খুব ভালোবাসে, মা।'
জারা নিষ্পাপ হাসল। আর জবা মুখ ঘুরিয়ে দূরের অন্ধকার হয়ে আসা আকাশের দিকে তাকাল। চোখের কোণে জমে ওঠা জল যেন কাউকে দেখতে দিতে চাইল না।
কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো নিজের সন্তানের হৃদয় ভাঙার জন্য নিজেকেই প্রস্তুত করা।
বারবিকিউয়ের ধোঁয়া আর মশলার মোহময় ঘ্রাণে পুরো বাড়িটা যেন ভরে উঠেছে।আষাঢ়ের সন্ধ্যার নরম বাতাসে সেই ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। উঠানের একপাশে অস্থায়ী চুল্লির সামনে দাঁড়িয়ে ফারিস একমনে সি-ফুড, বিফ আর চিকেন উল্টেপাল্টে দিচ্ছে। আগুনের লালচে আভা মাঝে মাঝে তার মুখে পড়ে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা তৈরি করছে।
পাশেই হাফিজা ব্যস্ত হাতে প্লেট সাজিয়ে সবাইকে খাবার তুলে দিচ্ছে। শিশুদের হাসির শব্দ, বড়দের গল্প, আগুনে ঝলসে ওঠা মাংসের সসস শব্দ। সব মিলিয়ে বহুদিন পর বাড়িটা যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
জবা ধীরে ধীরে একটা প্লেট হাতে নিল। এক টুকরো সি-ফুড মুখে দেওয়ার আগে সে চোখ বন্ধ করে গভীর করে ঘ্রাণ নিল। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।
সুঘ্রাণেই যেন অর্ধেক খাওয়া হয়ে যায়।
প্রথম কামড়টা মুখে দিতেই চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। ধীরে ধীরে চিবোতে লাগল। ধোঁয়ার গন্ধ, মশলার ঝাঁজ, সমুদ্রের স্বাদ সব মিলেমিশে এক অনন্য অনুভূতি তৈরি করেছে।
ফারিস মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল। কী আশ্চর্য!ফারিসের মনে হচ্ছে ও এক বাচ্চার মাকে নয় বরং সেই কিশোরী জবাকে দেখছে। যে মেয়েটা হাসলে পৃথিবী একটু বেশি সুন্দর লাগত, যে মেয়েটাকে সে নিজের স্মৃতির রাজপ্রাসাদের রানি বানিয়ে রেখেছে বছরের পর বছর।
সময় বদলেছে। মানুষ বদলেছে। কিন্তু ফারিসের চোখে জবা যেন আজও ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।
ফারিস মশলার বাটিটা ইনানের হাতে দিয়ে বলল,
'নে ভালো করে মশলা মাখা। আমি আসছি।'
ও জবার পাশে গিয়ে বসে বলল,
'কেমন লাগছে?'
জবা চোখ মেলে তাকাল। মুখে তখনও খাবারের স্বাদ লেগে আছে।
'চমৎকার।'
'সত্যি! '
'ঝাল ঝাল, স্মোকি ফ্লেভার। মনে হচ্ছে জিভের স্বাদ আর পেটের ক্ষুধা দুটোই একসাথে বাড়িয়ে দিচ্ছে।'
ফারিসের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। যেন ওর কষ্ট সার্থক। ভালোবাসার মানুষকে খুশি হতে দেখলে অন্যরকম তৃপ্তি কাজ করে। বলল,
'আরও দিব?'
জবা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
'নাহ। মোটা হয়ে যাব।'
ফারিস হেসে বলল,
'আজ চিট ডে পালন কর। তাতে তোর ডায়েট খারাপ হবে না।'
জবাও হেসে ফেলল। সেই হাসিটা খুব বড় কিছু ছিল না। কিন্তু বহুদিন পর ওর মুখে এমন নির্ভার হাসি দেখে ফারিসের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এলো।
মনে হলো, এত আয়োজন, এত কষ্ট, এত পরিকল্পনা সব সার্থক। কারণ দীর্ঘদিন পর জবা সত্যিই হাসছে।
—————
জবাকে ফোনে না পেয়ে ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছিল ইরফান। একবার, দুবার, দশবার।
প্রতিবারই একই ফল। কল যাচ্ছে না।
অবশেষে সে জয়নুল আবেদিন চৌধুরীকে ফোন করল। কিন্তু কল রিসিভ করা তো দূরের কথা, তার নম্বরও ব্লক করে রাখা হয়েছে।
ইরফানের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আতঙ্ক জমতে লাগল।
স্টিয়ারিং চেপে ধরে সে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে জবাকে একের পর এক মেসেজ পাঠাচ্ছিল। কোনো উত্তর নেই।
লেবুখালি পার হয়ে রাস্তার একপাশে গাড়ি থামাল সে।
রাত ধীরে ধীরে নেমে আসছে। দূরে নদীর কালো জল অন্ধকারের সঙ্গে মিশে গেছে।
গাড়ি থেকে নেমে কয়েক ঢোক পানি খেল ইরফান। তারপর পরপর দুটো সিগারেট শেষ করল।
মাথার ভেতর একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
কোয়েল। মেয়েটা যা বলেছে, তা যদি সত্যি হয়? যদি সত্যিই জারা বিপদে পড়ে?সিগারেটের শেষ টান দিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
'হ্যাঁ, এখন আমাকে এটাই করতে হবে।'
ও ফোন হাতে কোয়েলকে কল করল। ওপাশ থেকে কয়েকবার রিং হওয়ার পর কল ধরল কোয়েল। বলল,
'কোথায় তুমি?'
'কাশিপুর বাজারে।'
ইরফানের বুক ধক করে উঠল। সেখান থেকে জবাদের বাড়ি যেতে দশ মিনিটও লাগে না। ও লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। কণ্ঠ স্থির রাখার চেষ্টা করল। বলল,
'আমি তোমার কথায় রাজি।'
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সন্দেহমিশ্রিত গলায় বলল কোয়েল,
'জবাকে শেষ করবে?'
'হ্যাঁ। আমাদের দুজনার ক্ষতি যেহেতু ও করেছে সেহেতু ওকেই শেষ করব। তারপর আমরা বিয়ে করে জবার টাকায় আরামে দিন কাটাবো। জবা আমাকে অঢেল টাকা এবং সম্পত্তি দিয়েছে।'
সন্দেহ এখনও কাটেনি কোয়েলের। বলল,
'আমাকে বোকা বানাচ্ছ না তো?'
'তুমিই বলো তোমার মতো মেয়েকে বোকা বানানো সম্ভব? '
কথাটা কোয়েলের অহংকারে মধু ঢেলে দিল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
'তা ঠিক। তা এখন কী করবে?'
'তুমি লেবুখালি আসো। জবা চৌধুরীকে ধ্বংস করা তো এত সহজ না। অনেক পরিকল্পনা করতে হবে। দুজন পরিকল্পনা করে তারপর সব ঠিক করব।'
'তোমাকে ভরসা করা যায়?'
'এছাড়া তোমার কাছে অপশন নেই। এখানে জবাকে মারলে তুমিও বাঁচবে না। জবার বডিগার্ডরা অলয়েজ ওর সাথে থাকে। আমার সাথে দেখা করে জবা কখন কী করে জেনে নাও। এবং এমন পরিকল্পনা করে আঘাত করো যাতে কেউ তোমায় আমায় সন্দেহ না করে।'
ইরফানের কথা পছন্দ হলো কোয়েলের। ও ভাবল কিছুক্ষণ এবং দেখা করতে রাজি হলো। রাতের অন্ধকারে ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে কোয়েল ছুটল ইরফানের কাছে। ততক্ষণে ইরফান ওর গাড়ির নাম্বার প্লেট খুলে ফেলল।
রাত আরও গভীর হলো। আকাশের বুক জুড়ে জমল ভারী কালো মেঘ। ভাড়া করা গাড়িতে করে কোয়েল পৌঁছাল নির্ধারিত জায়গায়। তখন রাত একটা বোধহয়।
গাড়িটা চলে যেতেই চারপাশ যেন আরও বেশি নির্জন হয়ে উঠল। ইরফান ধীরস্বরে বলল,
'চলো নদীর ঐ পাড়ে বসে কথা বলি।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
নিস্তব্ধ রাত। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। মাঝে মাঝে হাইওয়ে দিয়ে কোনো গাড়ি ছুটে গেলে তার শব্দ কয়েক সেকেন্ড ভেসে আসে, তারপর আবার সবকিছু নিস্তব্ধ। হাঁটতে হাঁটতে ওরা নদীর পাড়ের দিকে অনেকটা দূরে চলে এল।
কোয়েল খেয়ালই করল না কতটা পথ পেরিয়ে এসেছে। অবশেষে ইরফান থামল।
কিছুক্ষণ নদীর কালো জলের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
'জানো কোয়েল আমি জীবনে দুজন মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।'
কোয়েল ভ্রু কুঁচকাল। বলল,
'কে?'
'জবা আর জারা।'
বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। ইরফানের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এলো। বলল,
'ওদের কেউ ক্ষতি করতে চাইলে আমি তাকে খুণ করতেও দুই বার ভাবব না।'
কোয়েল কিছু বলার আগেই ইরফানের চোখে এক ঝলক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখতে পেল।সেই দৃষ্টি আগে কখনও দেখেনি। বরফের মতো ঠান্ডা। নির্দয়। পরের কয়েক সেকেন্ডে কী ঘটল, তা বুঝে ওঠারও সুযোগ পেল না ও।
ধারালো ছুড়িটা দিয়ে কোয়েলের কণ্ঠনালী বরাবর টান দিলো ইরফান। ছুড়িটা এতটাই ধারাল যে কোয়েল চিৎকার করারও ফুরসত পেল না। গো গো শব্দ হলো কেবল।
নদীর পাড়ে তখন কেবল বাতাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আর তারপর...। নীরবতা। গভীর, ভয়ংকর নীরবতা।
ইরফান কোয়েলের লাশটা ধরে নদীর কিনারায় নিয়ে গিয়ে লাথি মেরে লাশটা নদীতে ফেলে দিলো নদীতে। আষাঢ়ের ভরা নদীতে ঝপাত শব্দ হলো।
কয়েক মুহূর্ত পরই ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামল।মুষলধারে বৃষ্টির জল নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে যেতে লাগল।
ইরফান স্থির দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
বৃষ্টির পানি তার মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
কিন্তু তার ভেতরের ঝড়ের তুলনায় বাইরের ঝড় কিছুই নয়।
দূরে কালো নদী অন্ধকার গিলে খাচ্ছে।
আর আষাঢ়ের বৃষ্টি ধুয়ে দিচ্ছে রাতের সমস্ত চিহ্ন। ধুঁয়ে নিচ্ছে ইরফানের হাতের সকল রক্তের চিন্হ।
ছুড়িটা নিয়ে গাড়ি নিয়ে ইরফান রওনা হলো। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ যেন তার সমস্ত জমে থাকা ক্রোধ একসাথে ঢেলে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে। উইন্ডশিল্ডের কাঁচে অবিরাম আঘাত করে যাচ্ছে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো। ওয়াইপার প্রাণপণে সেগুলো সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই আবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সামনে দেখা পথ। গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে বসে আছে ইরফান।
কয়েক মিনিট আগেই ও একটা মানুষকে হত্যা করেছে। একটা প্রাণ নিভে গেছে ওর হাতে। তবুও আশ্চর্যজনকভাবে তার ভেতরে কোনো ঝড় নেই। না ভয়। না অনুশোচনা। না আতঙ্ক। বরং বুকের ভেতর জমাট বেঁধে আছে এক অদ্ভুত শীতলতা। এমন শীতলতা, যা কখনো কখনো সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষের মধ্যেও দেখা যায়।
হেডলাইটের আলো কেটে কেটে এগিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার রাস্তা। রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ বৃষ্টিতে ভিজে কালো ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি পুরো পৃথিবীকে এক সেকেন্ডের জন্য আলোকিত করে আবার গিলে খাচ্ছে অন্ধকার।
ইরফানের ডান হাতে এখনও হালকা রক্তের গন্ধ লেগে আছে। বৃষ্টির পানি অনেক কিছু ধুয়ে নিতে পারে, কিন্তু সবকিছু না। কিছু দাগ থাকে। চামড়ার ওপর না। মনের ভেতরে। কিন্তু সেই দাগও যেন আজ অনুভব করতে পারছে না সে। তার মাথায় ঘুরছে কেবল একটাই চিন্তা জারা আর জবা।
ওদের ক্ষতি করার হুমকি দিয়েছিল কোয়েল।
হয়তো সেই মুহূর্তেই ওর ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।
গাড়ি এগিয়ে চলল।
অবশেষে কীর্তনখোলা নদীর ব্রিজের উপর এসে ধীরে ধীরে থামল ও। চারদিকে গভীর রাতের নিস্তব্ধতা। শুধু বৃষ্টি। অবিরাম বৃষ্টি।
নদীর কালো পানি নিচে উন্মত্ত স্রোতে ছুটে চলেছে। বৃষ্টির আঘাতে পানির বুক কাঁপছে।
ইরফান গাড়ির দরজা খুলে বাইরে নামল।
মুহূর্তেই বৃষ্টিতে ভিজে গেল ওর পুরো শরীর।
শার্ট শরীরের সাথে লেপ্টে গেল। চুল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে চোখের উপর। কিন্তু ও নির্বিকার।
গাড়ির ভেতর থেকে ছুরিটা বের করল।
ধাতব ফলাটা বিদ্যুতের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য ঝলসে উঠল। এই ছুরিই কয়েক মিনিট আগে একটা জীবনের শেষ রেখা টেনে দিয়েছে।
ইরফান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওটার দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে ব্রিজের রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে উত্তাল নদী। গভীর অন্ধকার। অজানা। এক মুহূর্তের জন্য হাতটা থেমে গেল।
তারপর ছুড়ে দিল। ছুরিটা বাতাস চিরে নিচে নেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর ছপাৎ শব্দ হলো!
একটা মৃদু শব্দ হলো। তারপর আবার সবকিছু আগের মতো। নদী ছুরিটাকে গিলে ফেলল। যেন কখনো কিছুই ঘটেনি। ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রমাণের শেষ টুকরোটাও হারিয়ে গেল স্রোতের মধ্যে।
বৃষ্টি আরও জোরে নামছে। প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সব চিহ্ন মুছে দিতে চাইছে।
কিন্তু মানুষ যতই প্রমাণ লুকাক, কিছু সত্য কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সেগুলো অপেক্ষা করে। সময়মতো ফিরে আসার জন্য।
ইরফান আবার গাড়িতে উঠে বসল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। গাড়ি ধীরে ধীরে অন্ধকার রাস্তার মধ্যে মিলিয়ে গেল।
আর কীর্তনখোলা নদী, রাতের বৃষ্টি আর কালো স্রোত, নীরব সাক্ষীর মতো সবকিছু নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………