পবনপত্র - পর্ব ২৭ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
২০১৫ সাল।
বনানী, ঢাকা।

সুস্মিতার যখন ঘুম ভাঙলো, ঘড়িতে তখন নয়টা বাজে। সকাল বেলার ঝকঝকে আলো ছড়িয়ে পড়েছে ঘর জুড়ে। বাইরে এখনও হালকা বৃষ্টি। জানালার কাচে পানির ফোঁটা, বাহিরটা ঝাপসা দেখাচ্ছে। ফ্যানটা চলছে অল্প গতিতে, ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ হচ্ছে।
মেয়েটা কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসে। এতোক্ষণ ঘুমানোর পরেও, দুই পা মেঝেতে ঝুলিয়ে আবার বিশ্রাম নেয় খানিকক্ষণ। আজকের জন্য অনেক পরিকল্পনা ছিলো তার। দুটো বই শেষ করার কথা ছিলো। জলরঙে একটা ছবি আঁকার কথা ছিলো, পাহাড়ি ঝর্ণার ছবি। কিন্তু মাথাটা এখন একেবারেই খালি হয়ে গেছে। সেখানে উঁকি দিলেই কেবল একটা বৃষ্টিভেজা পুরোনো রেলস্টেশন দেখা দিচ্ছে। নাটোর রেলস্টেশন।

মৌমিতা এ পর্যন্তই শুনিয়েছেন। তারপর কী হয়েছিলো—সেটা বলেননি। তিনি ডায়েরিটা কীভাবে ফেরত পেয়েছিলেন, তা-ও বললেন না। এমন অসম্পূর্ণ বিষয় ভীষণ অস্বস্তি দেয় সুস্মিতাকে। তবে আম্মুকে কিছু জিজ্ঞাসা করতেও সংকোচ কাজ করে। সে তবু চুপ করে থাকবে না এবার। মনের ভেতর অসংখ্য প্রশ্ন ছোটাছুটি করছে। সেগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সে শান্তি পাবে না।

সুস্মিতা হাত-মুখ ধুয়ে আবার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। আব্বু-আম্মু হয়তো জাগেননি এখনও। তাদের ঘরের দরজা বন্ধ। ভেতরে ফ্যান চলছে—এতোটুকুই বোঝা গেলো। তবে সৌম্য উঠেছে, খুটখাট শব্দ আসছে তার ঘর থেকে।

সুস্মিতা নিজের ঘরে ঢুকলো। টেবিল থেকে ধূসর ডায়েরিটা নিয়ে ঠেস দিয়ে বসলো বিছানায়। দ্বিতীয় পাতায় আঁকা কালচে মেঘটা এখনও অমলিন। শুধু কালিটা একটু ছড়িয়ে গেছে। সে ডায়েরিটা আরও কাছে এনে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে নিচের নামটা দেখার চেষ্টা করে। নামের কোনো অস্তিত্বই নেই!
জিনিসটা বালিশের পাশে রেখে সে আবার শুয়ে পড়লো। পরিবেশ ঘুমানোরই উপযোগী।
চোখ বুজতেই একটা প্রশ্ন আসে মাথায়। আদিবের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা কি ঠিক হবে? বড় একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। সেটা মিটিয়ে নেয়া উচিত নয় কি? একদিন সাহায্যের উদ্দেশ্যে দেওয়া একটা ছাতার বিনিময়ে সে অপমান উপহার দিয়েছে ছেলেটাকে। কিন্তু এমন কিছু করার তো কোনো কথাই ছিলো না। আদিব ভুল বুঝেছে, কষ্টও পেয়েছে নিশ্চয়ই। তাকে জানানো দরকার, সবটা ভুলবশত হয়ে গেছে, ইচ্ছাকৃত না।

তবে আম্মুর মতো দুঃসাহস নেই সুস্মিতার। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, পরিবারের কথা না ভেবে, একটা জুনিয়র, অভদ্র ছেলেকে মন দেওয়া, প্রশ্রয় দেওয়া—এগুলো মোটেও ঠুনকো কোনো বিষয় নয়। তাও আবার এতো বছর আগে, নব্বইয়ের দশকে।
একটা অনিশ্চিত সম্পর্কের জন্য সুস্মিতা কখনোই এতো ঝুঁকি নিতে পারতো না। আর মৌমিতার মতো এতো বিচক্ষণ মানুষ কৈশোরে কেবল আবেগের বশে এমন ভয়াবহ সব কাজ করেছেন, এটাও বিশ্বাস হতে চাইলো না। সুস্মিতার মনে হচ্ছে, উভয়েই বেশ একনিষ্ঠ ছিলেন তাদের অনুভূতির ব্যাপারে। তবুও বিচ্ছেদ হলো কেন? আর... বাদল এখন কোথায়?

রমজান মাস শেষের দিকে। শহর ফাঁকা হতে শুরু করেছে। রাজধানী ছেড়ে মানুষ নিজ নিজ জন্মস্থানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। সড়কে যানজট নেই, কোলাহল নেই।
সৌম্য সোফায় পা তুলে জানালার ধারে গিয়ে বসলো। মৌমিতা পত্রিকায় চোখ বোলাচ্ছেন। তাকে উদ্দেশ্য করেই ছেলেটা বললো, “ঈদে এবার কোথায় যাবো, আম্মু?”

“কোথায় যেতে চাও?”

“নানাবাড়িতে যাওয়ার কথা ছিলো। ডিসিশন কি চেঞ্জ হয়েছে?”

“ডিসিশন তো নেয়াই হয়নি এখনও। দেখি, কোথায় যাওয়া যায়।”

“সবাই বাড়িতে গেছে। ঢাকায় একটা প্রাণীও নেই, আমরা ছাড়া।”

“আমরাও থাকবো না। যাও, ব্যাগ গুছিয়ে রাখো।”

“এহ! এমনভাবে বলছো যেন এখনই রওনা দিতে হবে। ডিসিশন নাও আগে। ততোক্ষণে আমি একটু ঘুরে আসি।”

মৌমিতা খবরের কাগজটা টেবিলে রাখলেন, “কোনো ক্রিকেট খেলা হবে না এখন। বাসায় থাকো। ঈদের আগে অনেক কাজ করতে হবে। হেল্প করো যাতে তাড়াতাড়ি সব কাজ শেষ হয়। তাহলে তাড়াতাড়ি যেতেও পারবে।“

সৌম্য গোমড়া মুখে আবার সোফায় বসে। স্থির হয়ে কোথাও জড় পদার্থের মতো পড়ে থাকতে তার ভালো লাগে না। রোজা রাখা অবস্থায় বেশি দৌড়ঝাঁপও করা যায় না। জলদি খিদে পেয়ে যায়। তার অস্থিরতা লক্ষ করে মৌমিতা বললেন, “যাও, গোসল করে নাও। তারপর ছাদে যেও একবার।”

“ছাদে গিয়ে কী হবে? আশেপাশের কেউ নেই। শাওনরাও গ্রামের বাড়িতে গেছে।”

মুখে অস্বীকৃতি জানালেও মায়ের আদেশটা অবজ্ঞা করলো না সৌম্য। সোফা থেকে উঠে গোসল করতে চলে গেলো।

—————

বিকেল ৪টা।
ঈদের বেশি দেরি নেই। বিধায় সিদ্ধান্ত নিতেও দেরি করা হলো না খুব একটা। নাটোরের টিকেট কাটা হয়ে গেছে। পরশুদিন ট্রেন।

সুজয়ের সাথে সৌম্য বেরিয়েছে ইফতার কিনতে। মৌমিতা রান্নাঘরে। প্রেশার কুকারের সিটি বেজে চলেছে একনাগাড়ে। সুস্মিতা প্রথমে একবার উঁকি দেয় ভেতরে, তারপর মায়ের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। লম্বা করে কেটে রাখা শশাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে, “পরশুদিন কখন ট্রেন?”

“বিকালে।”

মৌমিতার সংক্ষিপ্ত উত্তরে মেয়েটা আরও জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ায়। সে অন্যকিছু জানতে এসেছে। তা জিজ্ঞেস করার জন্য অনেকক্ষণ ধরে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। ওড়নার কিনারা ধরে সে খুব মনোযোগ দিয়ে নকশাটা দেখতে লাগলো। যেন এই জিনিস আগে কখনোই চোখে পড়েনি।

“আম্মু... তুমি কি এখনও ঐ ছেলেটাকে... পছন্দ করো?”

গামলা থেকে চাল ধোয়া পানি নিংড়ে নিতে নিতে মৌমিতা হাসলেন, “আমাকে এতো খারাপ মনে হয়?”

সুস্মিতা চুপসে গেলো। মাথা নিচু করে ওড়নার সেলাইয়ে নখ খোঁচাতে লাগলো। আম্মুর উপরে এই বিষয়ে তার অশেষ আস্থা। আব্বুকে তিনি ঠকাতে পারেন না! কিন্তু মন থেকে সন্দেহও ঝাড়তে পারছে না মেয়েটা। একটা মানুষের স্মৃতিকে এতো যত্ন করে আগলে রেখেও কি অন্য কাউকে ভালোবাসা যায়?
পুরো কাহিনী অবশ্য সুস্মিতা জানতে পারেনি এখনও। মানুষ সবসময় বিশেষ ঘটনা মনে রাখে। সেই ঘটনা ভালো লাগার হতে পারে। নয়তো সেটা জীবনের সবচেয়ে ঘৃণ্য ঘটনা হয়েও জোর করে স্থান নিয়ে রাখে মস্তিষ্কে। ভালোবাসা কিংবা ঘৃণার কথা মনে থাকে না। কেবল অনুভূতির তীব্রতাটুকুই দাগ রেখে যায়।

মাগরিবের নামাজের পর সাধারণত সুস্মিতা নিজের ঘর থেকে বের হয় না। মাঝে মাঝে ছিটকিনি আটকেও বসে থাকে। কিন্তু আজ তাকে ঘরে ঢুকতে দেখা গেলো না। মায়ের পেছনে ঘুরঘুর করে টুকটাক কাজে সাহায্য করলো। রাতে খাবার রান্না হওয়ার পর ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসলো। ক্লান্ত হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু সে ফুরফুরে মেজাজে সোফায় বসে খবরের কাগজ হাতে নিলো। খুব বিজ্ঞের মতো সংবাদ শিরোনামে চোখ বোলাতে লাগলো। যদিও তার মনটা অন্য কোথাও অবস্থান করছে। গরম পড়েছে। ফ্যানের বাতাসটা গায়ে লাগছে না। রাতে আরেকবার গোসল করতে হবে।
সুজয় মেয়েকে প্রশ্ন করলেন, “সুস্মিতা, পড়াশোনার কী অবস্থা?”

তিনি ভালো করেই জানেন, এই প্রশ্নটা সুস্মিতার পছন্দ নয়। তার মতে, সে এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। প্রতিদিন তিন বেলা করে পড়ার খোঁজ জানানো নাকি এখন শোভা পায় না। তাই কিছু জিজ্ঞেস করলেও সে উত্তর দেয় না কখনোই, চুপ করে থাকে।
আজ অবশ্য তার নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটলো। সে মুখের সামনে থেকে পত্রিকা নামিয়ে রেখে আব্বুর দিকে তাকালো, শান্তভাবে বলতে লাগলো, “ভালোই মোটামুটি। ছুটির পর স্কুল খুললেই পরীক্ষা শুরু হবে।”

মৌমিতাকে টেবিলে প্লেট সাজাতে দেখে সে চটজলদি উঠে মায়ের কাছে গেলো। হাতে হাতে সাহায্য করার চেষ্টা করলো। সুজয় এই দুর্লভ দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। তারপর সোজা হয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন।

আজকাল অনেক রাত পর্যন্ত যানবাহনের শব্দ শোনা যায়। রমজান মাসে এই সময়েই ব্যবসা জমজমাট হয়ে ওঠে।

মৌমিতা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, ঘরের আলোটা নেভানো। ব্যস্ত সড়ক থেকে নানান ধরনের আলো এসে ঢুকছে ঘরে। জানালার কাচে তার অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। তিনি বাইরের দৃশ্য থেকে মনোযোগ সরালেন, নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালেন। মুহূর্তেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠলো, সুজয় সুইচে চাপ দিয়ে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো মাত্রই। মৌমিতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পেছনে ঘুরলেন। তারপর পর্দা সরিয়ে জানালার অপরপাশটা ঢেকে দিলেন, বললেন, “তোমার কাপড়গুলো গুছিয়ে রেখেছি। দেখো তো, কোনগুলো নিতে হবে।”

বিছানায় ভাঁজ করে রাখা জামা-কাপড়ের দিকে তাকালেন সুজয়, তারপর খাটের অপরপ্রান্তে গিয়ে বসলেন, “এতো তাড়াতাড়ি গোছগাছ? ট্রেন তো পরশুদিন।”

“আগে গুছিয়ে রাখলেই ভালো। ওখানকার কয়েকজনের জন্যেও তো কেনাকাটা করা হয়েছে। আম্মার জন্য শাড়ি নেবো, মার্জিয়ার বাচ্চা-কাচ্চারাও আছে। অনেক কাজ। আজকে ঠিকঠাক করে রাখলে জার্নির আগেরদিন আর তাড়াহুড়ো করতে হবে না।”

সুজয় মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলেন। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখালেন না। মৌমিতা একটু বিরক্তি দেখালেন এবার, “এখন শুধু তুমি আর সৌম্যই বাকি আছো। একটু সাহায্য করো আমাকে। বলো কী কী নেবো?”

মৌমিতা এগিয়ে এলেন, মেঝেতে রাখা স্যুটকেসের চেইন খুললেন। সুজয় জিজ্ঞেস করলেন, “সুস্মিতা সব গুছিয়ে নিয়েছে?”

“হ্যাঁ। ও তো সবার আগেই ব্যাগ-ট্যাগ রেডি করে বসে আছে। আমি গুছিয়ে দেই প্রতিবার। এবার ও নিজেই করেছে সব—”

“হুম। মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে।”

স্যুটকেসের এক কোণে নীল রঙের শার্টটা সযত্নে তুলে রাখলেন মৌমিতা। সেটার দিকে তাকিয়েই অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। বিড়বিড় করে বললেন, “বড় তো একদিন হতেই হবে।”

—————

“এতকাল জীবনটা কাটিল উপগ্রহের মত। যাহাকে কেন্দ্র করিয়া ঘুরি, না পাইলাম তাহার কাছে আসিবার অধিকার, না পাইলাম দূরে যাইবার অনুমতি। অধীন নই, নিজেকে স্বাধীন বলারও জোর নাই।”
[শ্রীকান্ত: ৪]

প্রথম কয়েকটা লাইন পড়েই সুস্মিতা বই বন্ধ করে রাখলো। আজ তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙেছে। মাত্র ৮টা বাজে। অথচ তার খিদে পেয়ে যাচ্ছে। সে মাথা ঘুরিয়ে টেবিলের দিকে তাকালো। পুরোনো ধূসর ডায়েরিটা সবচেয়ে উপরের তাকে রাখা। ড্রয়ারের ভেতর আরও অসংখ্য ডায়েরি রয়েছে তার, সাথে নোটপ্যাড, খাতাপত্র। প্রায় সব নতুন।
সুজয় ওষুধের কোম্পানিগুলো থেকে প্রতিবছরই অনেকগুলো করে ডায়েরি, কলম পেয়ে থাকেন। সেগুলোর বেশিরভাগই সুস্মিতা নিজের কাছে নিয়ে রাখে। কোনোটাতে আঁকাআঁকি করে, কোনোটাতে পড়া টুকে রাখে। অথচ ব্যক্তিগত কথাগুলো সংরক্ষণের জন্য সে বাছাই করেছে মায়ের অব্যবহৃত পুরোনো ডায়েরিটা। এর কারণ হলো মৌমিতার লেখা একটা লাইন।

“আজকে আমার মেয়ের জন্মদিন।”

সুস্মিতার মনে হয়েছিলো, যেখান থেকে তার জীবন শুরু হয়েছে, সেখান থেকেই চলতে থাকুক। সে জানতো না, ঐ বাক্য থেকে তার মায়েরও জীবন শুরু হয়েছে নতুন করে। মৌমিতা আবার বাঁচতে শুরু করেছেন সেখান থেকেই। সুস্মিতার আগে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। গর্ভেই মৃত্যু হয়েছিলো তার। তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন। নিজের সমস্ত ক্ষত জোড়াতালি দিয়ে বাঁধাই করে তুলে রাখলেন, একটা কাঠের আলমারির বাম পাশে। চাবিটা বেঁধে রাখলেন নিজের আঁচলে। এরপর প্রায় ষোলোটা বছর কেটে গেছে।

পুরোনো আলমারির ঐ রুদ্ধ অংশে কী রয়েছে, সুস্মিতা জানে না। তবে এখন সে একটু একটু অনুমান করতে পারছে। বাদল সম্পর্কিত কিছু থাকতে পারে কি?

গলির কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করছে। রাস্তাটা এখন আগের মতো ব্যস্ত নয়। নইলে কোনো সুশীল ব্যক্তি কুকুরগুলোকে পিটিয়ে তাড়িয়ে দিতো এতোক্ষণে।
সুস্মিতার বান্ধবীরা কুকুর ভয় পায়। তবে এই প্রাণীগুলোর প্রতি সুস্মিতার ভয় তেমন কাজ করে না। মৌমিতা তাকে ছোটবেলা থেকেই বুঝিয়েছেন, কারও সাথে খারাপ আচরণ না করলে কেউ ক্ষতি করবে না কখনোই। কুকুর দেখলে কখনোই ভয়ে ছোটাছুটি করা যাবে না, নাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে, কুকুর আরও বেশি ধাওয়া করতে পারে তখন।

ছোটখাটো বিষয়বস্তু নিয়ে মায়ের এই দৃষ্টিভঙ্গির কল্যাণে, পাড়ার প্রায় সব কুকুরই সুস্মিতা আর সৌম্যর পরিচিত। দু'জনই ওদেরকে নিয়মিত খাবার দেয়। উভয়েরই শৈশব থেকে এটা অভ্যেস হয়ে গেছে।
সুস্মিতার কাছে মাকে অনেক বিশেষ মনে হতো এসব কারণে। অথচ এই ছোট এবং সামান্য ব্যাপারটাও মৌমিতা নিজ থেকে অনুধাবন করেননি। দুই দশক আগে শোনা, কোনো এক অনাত্মীয় ব্যক্তির তুচ্ছ পরামর্শকে তিনি মনেপ্রাণে ধারণ করে চলেছেন আজও। বাদল কি এটা জানে?

সুস্মিতা খাট থেকে নেমে পড়লো। ইফতারের এখনও অনেক দেরি। এতো তাড়াতাড়ি খিদে পেয়ে গেলে ভালো দেখায় না। সে দরজা খুলে বাইরে তাকালো। সৌম্য হয়তো আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। বাড়িটা সেজন্যই এতো শান্ত। সুজয় একটু আগেই বেরিয়ে গেছেন।
সুযোগ বুঝে সুস্মিতা আব্বু-আম্মুর ঘরে ঢুকে পড়লো।

মৌমিতা মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে বসেছেন, সামনে জামা-কাপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মার্জিয়ার ছোট ছেলেটার জন্য নিজ হাতে একটা কাঁথা সেলাই করেছিলেন তিনি, সেটাতেই শেষ ফোঁড়টা দিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। সুস্মিতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, আমতা আমতা করে বলে, “তুমি কি ব্যস্ত?”

মৌমিতা ডানে-বামে মাথা দোলালেন, তারপর দাঁত দিয়ে সুতো কাটলেন। সুস্মিতা অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মায়ের সামনে বসে পড়লো। সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আলমারিটার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে খাটে হেলান দিলো। আম্মুকে একটা প্রশ্ন করতে চায় সে। কিন্তু সাহস পাচ্ছে না। মৌমিতা একটা ছোট শ্বাস ফেলে নিজেই প্রশ্ন করলেন তাকে, “কিছু বলবে?”

সুস্মিতা অযথা কপাল চুলকে বলতে লাগলো, “না, মানে ঐ—”

“এই কাপড়গুলো একটু গুছিয়ে দাও তো মা। এই একটা কাঁথা সেলাই করতেই কতোক্ষণ সময় চলে গেলো। সব তাড়াতাড়ি করতে হবে এখন...”

একটু আশাহত হলো সুস্মিতা, কিছুটা বিরক্তও হলো। তবু খুব কষ্টে কয়েকটা অগোছালো কাপড় নিজের দিকে টেনে নিলো। ফ্যানের বাতাসে সেগুলো ভাঁজ করতে আরেকটু কষ্ট হলো। মেয়েটা কেবল মনে মনে চাইলো, আম্মু যেন হঠাৎ উঠে চলে না যান। অন্তত কথা গুছিয়ে নেয়ার সময়টুকু যেন সে পায়।

মৌমিতা উঠে দাঁড়ালেন। আলমারির ডান পাশের কপাটটা খুললেন। ভেতরের সামগ্রীগুলো সুস্মিতার অপরিচিত নয়। তবু সে হা করে চেয়ে রইলো। গয়না রাখার বাকশো থেকে একজোড়া কানের দুল বের করলেন মৌমিতা। মেয়ের দিকে সেগুলো এগিয়ে দিয়ে বললেন, “দেখো তো, কেমন এটা? তোমার জামার সাথে মানাবে না?”

সুস্মিতা হাত পেতে দুল দুটো নেয়। তার চোখজোড়া ওগুলোর দিকে, কিন্তু ভাবনা অন্যকিছু নিয়ে। সে মায়ের দিকে তাকায়, আঙুল দিয়ে আলমারির অপরপাশটা দেখায়, “ঐপাশে কী আছে, আম্মু?”

মৌমিতা মাথা ঘুরিয়ে সেদিকে তাকালেন, সামান্য হেসে বললেন, “দরকারি কিছু না। এমনিই, হাবিজাবি।”

হাবিজাবি? কথাটা সুস্মিতার বিশ্বাস হলো না। তবে বলার ধরন দেখে এটাকে মিথ্যে ভাবাও সম্ভব হলো না। সে যথেষ্ট সতর্কতার সাথেই জিজ্ঞেস করলো, “দরকারি না হলে রেখে দিয়েছো কেন?”

সুস্মিতা ভেবেছিলো, এবার আম্মু একটু হলেও রেগে যাবেন। তবে এমন কিছু হলো না। তিনি বেশ সহজভাবে বললেন, “ফেলে দিয়েই বা লাভ কী?”

ভাঁজ করা জামাটা পাশে রেখে সুস্মিতা সোজা হয়ে বসলো। তার কণ্ঠ হঠাৎ করেই গম্ভীর শোনালো, “তারপর কী হয়েছিলো? স্টেশনে তোমাকে ওভাবে কথাটা বলার পর, কী করেছিলে তুমি? আর... ডায়েরিটা কখন ফেরত দিলো? নাকি দেয়নি?”

মৌমিতা ক্লান্ত স্বরে বললেন, “আরেকদিন বলবো। আজকে হবে না, গলাটা একেবারে শুকিয়ে গেছে। শোনো তো, সৌম্য ঘুম থেকে উঠলে ওকে দোকানে যেতে বোলো। চিনি শেষ হয়ে—”

“আম্মু?” সুস্মিতা অধৈর্য হয়ে বলে, “এতোটুকু না জানলে আমার ঘুম হবে না। অন্তত এটাই বলো, ডায়েরি কবে ফেরত দিলো? কেন দিলো? দিতে তো চায়নি। সত্যিই কি ডায়েরিটা তোমার কাছে আছে?”

“হুম।”

“তাহলে বলো।”

“আচ্ছা, শোনো—”

“না, এভাবে না। আমার আরও প্রশ্ন আছে। আব্বুর সাথে তোমার দেখা কীভাবে হলো? আর তুমি আব্বুকে বিয়ে করলে, ওনার সাথে বিয়ে হলো না কেন? পছন্দ তো... করতে।”

মৌমিতার ভ্রু কুঁচকে গেলো। মেয়ের এমন অন্যায় জেদ দেখে তার মেজাজটা প্রায় বিগড়েই যাচ্ছিলো, তিনি নিজেকে শান্ত করলেন। মাদুরের এক কোণে গিয়ে বসলেন সুস্মিতার মুখোমুখি। শরীরটা অকারণে শিউরে উঠলো খানিকটা। এসব স্মৃতি ঘাঁটতে ভীষণ অনীহা তার। তবু তিনি বলবেন। শুরু যখন করেছেন, শেষ করবেন। মেয়েটাও জানুক, ঠিক কী কারণে তার মা অতীত থেকে পালিয়ে বেড়ান। সে কি নিজের মাকে বিচার করবে? করলে... করুক‌।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp