পবনপত্র - পর্ব ১৬ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          স্কুল থেকে ফিরেই মার্জিয়া একটা নতুন ধরনের শরবত বানিয়ে ফেলেছে। তিনটা লেবু আর দুই গ্লাস পানি খরচ হয়েছে এতে। এরপর লবণ, মরিচসহ আরও হাবিজাবি মশলাও মিশিয়েছে। বেশ ভালোই সময় লেগেছে কাজটা করতে। রাবেয়া অনেকক্ষণ ধরে তাকে গোসলে যাওয়ার তাগাদা দিচ্ছেন। কিন্তু সে যেতে পারছে না। স্কুলের পোশাকটা পর্যন্ত বদলায়নি এখনও। অধীর আগ্রহে সে মৌমিতার জন্য অপেক্ষা করছে। আগে আপা আসবে, এই গুরুপাক পানীয় চেখে দেখবে, মতামত জানাবে, তারপর অন্যান্য কাজে মনোযোগ দেওয়া যাবে। আজকে আপা ফিরতে একটু বেশিই দেরি করছে। মার্জিয়ার ধৈর্যের বাঁধ যখন ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখন বারান্দার দরজায় শব্দ হলো। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মৌমিতা ঘরে প্রবেশ করলো। তার চোখ দুটো মেঝের দিকে স্থির।

“আপা?”

ছোট বোনের ডাক একপ্রকার উপেক্ষা করেই সে নিজের ঘরে গেলো। পুরো রাস্তা হেঁটে আসতে হয়েছে। মনটাতে একটু আঘাত লাগলেই তার শরীরটাকেও কষ্ট দিতে ইচ্ছে করে। তবু যেন এখন তৃষ্ণাটা কমে এসেছে, পায়ে কোনো রকম ব্যথা অনুভূত হচ্ছে না। বাহ্যিক কোনো কষ্টের অনুভূতি কাজ করছে না। দেহটা আরও কতোখানি বিধ্বস্ত হলে ভেতরের যন্ত্রণাটা পুষিয়ে নেয়া যাবে?

মার্জিয়া দমলো না। শরবতের গ্লাসটা হাতে নিয়ে হাসিমুখে আপার পিছু পিছু ঘরে এলো সে। মৌমিতা ব্যাগটা রাখার জন্য চেয়ার পর্যন্ত যাওয়ার শক্তি পেলো না। শরীরটাও এবার হাল ছেড়ে দিয়েছে। সে বালিশের মাঝে মুখটা গুঁজে কোনোমতে শুয়ে পড়লো। মার্জিয়া এসে তার মাথার কাছে দাঁড়ায়, কিছু বলার মতো খুঁজে পায় না। খাটের একদিকে বসে মৃদুস্বরে ডাকে, “আপা, কী হয়েছে?”

“মাথা ব্যথা।”

দায়সারা কথাটা বলতে গিয়েও মৌমিতার গলা ধরে এলো। সে মুখ তুললো না। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, নিজের প্রতি এই অযত্ন বৃথা। সে কোনো বড় দোষ করেনি। অপরাধবোধ কমলো না তবু। একটা ভুল মানুষকে সে একটু বেশিই মনোযোগ দিয়ে ফেলেছে। এটার শাস্তিস্বরূপ এমন বিশ্রীভাবে অপদস্থ হতে হলো তাকে। খুব ছোট একটা ভুল হিসেবে শাস্তিটা একটু বেশিই ভারী হয়ে গেলো না? মেয়েটা নিজেকে বোঝালো, তার নিজের ভুলটাও মোটেও ছোট নয়, বরং অপ্রীতিকর ঘটনাটা না ঘটলে এই ভুল ফুলে ফেঁপে এমন কিছু ঘটাতো, যা থেকে ফিরে আসার কোনো পথ থাকতো না।

“শরবত খাও।”

মৌমিতা এবার উঠে বসলো। বাধ্য মেয়ের মতো গ্লাসটা হাতে নিলো। এক চুমুক খেয়ে মুখ কুঁচকে বললো, “এটা কী?”

“ভালো হয়নি?”

“হুম।”

মার্জিয়া তার আপার উত্তর ভালোভাবে বুঝলো না, তবু আগ্রহ নিয়ে বলতে লাগলো, “তোমাদের কলেজের ঐদিকে ইয়ে পাওয়া যায় না? ঐ যে... বিট লবণ? কালকে আনতে পারবা একটু?”

“কালকে যাবো না।”

মার্জিয়া মাথা নাড়লো, “ওহ।”

দুপুরের রান্না যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন মারুফ বাড়িতে ফিরলেন। হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ। ছোট মেয়ের জন্য ক্যালকুলেটর কিনেছেন। জিনিসটার দাম চোখের পলকেই অনেক বেড়ে গেছে। তিনি জিলাপিও এনেছেন। গতকাল দুপুরে মৌমিতা জিলাপির খোঁজ করেছিলো, তার হয়তো খেতে ইচ্ছে করেছে। মেয়েটা সহজে মুখ ফুটে কিছু চায় না।
টেবিলের উপরে ব্যাগটা রেখে তিনি মেয়েদের ডাকলেন। ছোট মেয়েটা ঘর থেকে বের হতেই তিনি বললেন, “দেখো তো ক্যালকুলেটর ঠিক আছে কিনা?”

মার্জিয়া ব্যাগ থেকে তা বের করে উল্টেপাল্টে দেখলো, হাসিমুখে বললো, “হ্যাঁ, একদম ঠিক আছে।”

“আর এই যে, গরম গরম জিলাপি। তোমার আপাকে ডাকো।”

মৌমিতাকে ডাকতে হলো না, সে নিজেই কোনো কাজের উদ্দেশ্যে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলো। মারুফ তাকে ডেকে বিগলিত হেসে বললেন, “মা, জিলাপি এনেছি—”

সে কোনো আগ্রহ দেখালো না। টেবিলে রাখা মিষ্টান্নের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে শুষ্ক মুখেই রান্নাঘরে চলে গেলো। মারুফের মুখ থেকে হাসিটুকু মিলিয়ে যায় ধীরে ধীরে। দুপুরবেলা এসব আনাটা বোকামিই হয়েছে। এখন ভাত খাওয়ার সময়। বিকেলের দিকে জিলাপি আনলে ভালো হতো, এগুলো এখন ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। এটা কোনো বড় ব্যাপার নয়, তবুও মারুফ আফসোস করলেন।

মৌমিতা একবারও খুশি হলো না। বিষণ্ণ মুখে দুপুরের খাবারটা খেয়েই উঠে গেলো। মেয়েটা কি অসুস্থ নাকি? মাঝে মাঝেই তার মুখটা অত্যন্ত ফ্যাকাসে দেখায়।

খাটে শুয়ে শুয়ে অনেককিছুই ভাবলেন মারুফ। চোখদুটো বারবার বন্ধ হয়ে আসতে চাচ্ছে। এই সময়ে খুবই ঘুম আসে। দোকানে যাওয়ার ইচ্ছাই করে না। তবে এভাবে তো আর চলতে পারে না। দোকানের ব্যাপারটা এখন আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না কোনোমতেই। মেয়ে দুটো ছোট, তাদের প্রতিষ্ঠিত হতে এখনও অনেক দেরি। পড়াশোনা বাকি আছে অনেক দূর। মাথার উপর কোনো অভিভাবক নেই তিনি ছাড়া। তিনি যদি এতো দ্রুত হাল ছেড়ে দেন, সংসারটা স্রোতে ভেসে যাবে। শরীর সায় না দিলেও মারুফ উঠে বসলেন। পাশের বাড়ির জহির মিঞা বয়সে তার চেয়ে অনেক বড়। এই বয়সেও তিনি এতো সামর্থ্যবান, প্রাণোচ্ছ্বল। সেখানে মারুফের কাছে নিজের ঝিমিয়ে পড়া সত্তাকে এতো আশকারা দেওয়া ঠিক মনে হলো।

রাবেয়া কাজ শেষ করে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলেন, জিজ্ঞেস করলেন, “আজকে দোকানে একটু ভালো বিক্রি হয়েছে। তাই না?”

অসহায়ের মতো মাথা নাড়লেন মারুফ, “না। খুবই খারাপ দিন যাচ্ছে, বুঝেছো? হাতেও আর বেশি টাকা-কড়ি নেই। দোকানের পুরোনো কাপড়গুলো বিক্রি হচ্ছে না। নতুন কিছু যে কিনে আনবো, সে পয়সাও নেই।”

রাবেয়া পাশে এসে বসলেন। তার কপালে ভাঁজ পড়লো, উদ্বেগ প্রকাশ করলেন, “তাহলে এখনই এসব কিনলেন কেন? মৌয়ের জিনিসপত্র দিয়েই তো মার্জু দিব্যি কাজ চালিয়ে যেতে পারতো। আপাতত এসবের দরকার ছিলো না। আর জিলাপিই বা কেন আনতে গেলেন?”

মারুফ উত্তর দিলেন না। খাট থেকে নেমে গিয়ে টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন, উপরে রাখা একটা হিসাবের খাতার দিকে তাকালেন। রাবেয়া আক্ষেপের সুরে বললেন, “অযথা টাকা খরচ করার অভ্যেসটা যাবে না আপনার। আর এতোগুলো টাকা হুট করে কোথায় পেলেন? ধার দিয়েছে কেউ?”

“আরে ওটা কোনো ব্যাপার না। চিন্তা কোরো না তো।”

মারুফের কণ্ঠে সামান্য অভিমান মেশানো। তিনি টেবিল থেকে স্ত্রীর চিরুনিটা নিয়ে নিজের মাথায় এলোপাথাড়ি কয়েকবার আঁচড়ে সেটা আবার টেবিলে রাখলেন। অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

“দোকানে যাওয়ার আগে পানি খেয়ে যাবেন, যে গরম পড়েছে—” স্বামীর হাতের দিকে তাকিয়ে রাবেয়া আঁতকে উঠলেন, “আপনার ঘড়িটা কোথায় গেলো?”

এমন আকস্মিক জিজ্ঞাসায় মারুফ থতমত খেয়ে তার দিকে তাকালেন। তারপর হাতটা লুকানোর বৃথা চেষ্টা করে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসলেন। রাবেয়া হাত টেনে ধরলেন, কণ্ঠ থেকে বিস্ময়ের রেশ কাটেনি এখনও, “দোকানে ফেলে এসেছেন নাকি?”

“না না—”

“হারিয়ে ফেলেছেন?”

মারুফ সহসা উত্তর দিতে পারলেন না, আমতা আমতা করতে লাগলেন। রাবেয়া ভ্রু কুঁচকে ক্ষীণ স্বরে বললেন, “বিক্রি করে দিয়েছেন?”

এবার আর ভণিতা করলেন না মারুফ। জোর করে হাসলেন একটু, তার কণ্ঠে উপচে পড়লো স্বভাবসুলভ সারল্য, “হ্যাঁ। পুরাতন ঘড়ি তো, দুইদিন পর পর নষ্ট হয়ে যায়। তাই বিক্রি করে দিলাম।” নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলেন স্ত্রীর মুঠো থেকে, “আসি তাহলে। অনেক কাজ পড়ে আছে।”

রাবেয়া কিছু বলতে গিয়েও চুপ হয়ে রইলেন। গলার কাছে দলা পাকিয়ে রইলো কথাগুলো। হাতঘড়িটা তার একেবারেই অপছন্দ ছিলো। তাই বলে সেটা থেকে এভাবে নিস্তার পেয়ে যাবেন, এমনটা তিনি আশা করেননি। লোকটার খালি হাতের দিকে তাকিয়ে তার চোখ ছলছল করে উঠলো। তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

—————

রাশেদকে ব্যাগ ঘাড়ে নিতে দেখে আমজাদ বাদলের দিকে তাকালো, তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, “কী রে বাদল? তুই যাবি না টিউশনে?”

বাদল জানালার দিকে মুখ করে চৌকিতে শুয়ে আছে। চাদরের কিনারা খুঁটে যাচ্ছে একনাগাড়ে, সুতো বের করে ফেলেছে! আমজাদ ভাইয়ের প্রশ্নটা সম্ভবত তার কানে যায়নি। গেলেও এতো সহজে সাড়া দেয়ার মানুষ সে নয়।

“ও আজকে যাবে না।”

রাশেদ কথাটা এমনভাবে বললো যেন তা বাদলের কানে না যায়। আমজাদ ঘুরলো, নিচু স্বরে বললো, “কেন? কী হয়েছে? অসুস্থ?”

এই সময়ে আমজাদ ভাইকে পুরো ঘটনা শোনানো সম্ভব নয়, রাশেদ শুধু একটা শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলো, “যে মেয়েটা আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিলো, সে মৌমিতা খন্দকার। ডায়েরির মেয়েটা।”

“ওরে! তাই নাকি? তাহলে তো ভালোই হলো।”

“কিসের ভালো হলো? বাদল তার সাথে কেমন আচরণ করলো, দেখেননি?”

“তাতে কী? ডায়েরি ফেরত দিতে আবার ভালো আচরণ করা লাগবে নাকি?”

রাশেদ কথা বাড়ালো না। মৌমিতা খন্দকারের প্রতি বাদলের একপাক্ষিক অনুভূতি সম্পর্কে আমজাদ অবগত নয়। সে জানে না, ব্যাপারটা আর ডায়েরি দেয়া-নেয়ায় সীমাবদ্ধ নেই, বাদল অন্যকিছু দিয়ে ফেলেছে মেয়েটাকে।

গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকছে ঘরে। বৈদ্যুতিক বাতিটা নেভানোর পরেই তা আরও ভালোভাবে দৃশ্যমান হলো। বাদল ঘুরে দেখলো, রাশেদ আর আমজাদ ভাই—উভয়েই বেরিয়ে গেছে। ঘরে এখন সে একা। একেবারে চোখের উপর রোদ এসে পড়েছে। পর্দাটা একটু সরাতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু উঠতে ইচ্ছা করছে না। সে পা বাড়িয়ে পর্দা সরানোর চেষ্টা করলো, নাগাল পেলো না। অগত্যা অন্যপাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়লো। তারপর বালিশের সেলাই খোঁচাতে শুরু করলো।

মৌমিতার মুখটা মনে পড়ছে বারবার। তার চোখে যে বিদ্বেষ বাদল দেখেছে, তা এখনও বুকে কাঁটার মতো বিঁধছে। অমন জঘন্য কথাটা বলার কী দরকার ছিলো? মেয়েটা যদি মৌমিতা না হয়ে অন্যকেউ হতো, তবুও তো এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য হতো না। সেখানে মেয়েটা স্বয়ং মৌমিতা খন্দকার! যখন চেনা হয়নি, তখনও তার উপেক্ষা সহ্য হতো না। আর এখন?

রতন নামের ঐ ফুপাতো ভাই কি এর থেকেও কোনো খারাপ কথা বলেছিলো কখনও? বাদল পা গুটিয়ে নেয়, বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে পড়ে থাকে। আশ্চর্য! মৌমিতার সবচেয়ে অপছন্দের মানুষের সাথে নিজেকে তুলনা দিতে হচ্ছে, নিজের প্রাপ্য ঘৃণাটুকু পরিমাপ করার জন্য। মেয়েটার অপছন্দের তালিকায় নাম লিখিয়ে নেওয়া নিশ্চয়ই খুব সহজ। সে তো নিজের ডায়েরিতেও লিখে রেখেছে, মানুষকে কারণ ছাড়াও ঘৃণা করা যায়। আর বাদলকে ঘৃণা করার মতো যথেষ্ট কারণ আছেই। এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার কোনো উপায় খুঁজে পেলে না সে। মৌমিতার ভেতরটা সে ভালোভাবে জানে। তবু সামনাসামনি দেখে তাকে অহংকারী ভেবে নিতে সময় লাগেনি। যারা জানে না, তাদেরকে কি আর দোষ দেওয়া যাবে?

মেয়েটার মনে একটা বিশেষ জায়গা পাওয়ার খুব সাধ তার। অথচ পছন্দের তালিকায় স্থান পাওয়ার মতো কোনো বিশেষত্ব রইলো না। উপলব্ধি করলো, জায়গা সে ঠিকই পেয়েছে। তবে তার কাঙ্ক্ষিত স্থান নয়, মেয়েটা তাকে হয়তো ঘৃণা করবে আজ থেকে। আগে কথা বলতো না, এখন আর ফিরেও তাকাবে না।

বাদল নিজের হাতের উপরেই সজোরে একটা ঘুষি মেরে উঠে বসে। বাস্তবতা আর মেনে নিতে পারছে না সে। কিন্তু সবকিছু ঢেলে সাজানোও সম্ভব নয়। কিছু একটা তো করতেই হবে। অন্তত মৌমিতার কাছে সে কোনো ঘৃণ্য ব্যক্তি হয়ে থাকতে চায় না। ইতোমধ্যেই অনেক ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছে। এবার সাবধান হতে হবে। মৌমিতা খন্দকারের মনের ভেতরে একটা খুঁটি গাড়তেই হবে, হোক সেটা নড়বড়ে। বাদলের মনে সে আসন গেড়ে বসে আছে, তার মনে বাদল স্থান পাবে না কেন?

টেবিলের উপরে নীল ডায়েরিটা রাখা। আশেপাশের বইগুলো ছেঁড়া-ফাটা। কোনো কোনোটার মলাটও নেই। সব এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অনাদরে রাখা সব বই-খাতা, আসবাবের ভিড়ে জ্বলজ্বল করছে যত্নে রাখা একখানি আমানত। বাদল নিজের মাঝে থাকা প্রায় সবটুকু মমতা দিয়ে আগলে রেখেছে ঐ নিষ্প্রাণ রত্ন ভাণ্ডারটাকে। তার গুরুতর কোনো দাবি নেই। সে কেবল ডায়েরির পাতাগুলোর একটিতে নিজের নামটা দেখতে চায়। ঝড় বাদল হিসেবে নয়, শুধু বাদল হিসেবে। এ শখ পূরণের জন্য তাকে ডায়েরির মালিকের মনেও জায়গা দখল করতে হবে।

ছোট শ্বাসটা ফুসফুস থেকে বের করে দিয়ে সে পাতা ওল্টালো। মেয়েটাকে দেওয়ার মতো কি কিছুই নেই তার কাছে? শেষ পৃষ্ঠা অবধি যেতে হলো না। তার আগেই মনে পড়লো মৌমিতা একটা বইয়ের সন্ধান পায়নি এখনও।
বাদল ডায়েরি বন্ধ করলো। নিজের সামর্থ্যের কথা ভেবে সময় নষ্ট করতে চাইলো না। চাবি ঘুরিয়ে ড্রয়ারটা খুললো। এটা ছাড়া আর কোনো রাস্তা সে দেখছে না। জমানো টাকা গুনে আবার তালাটা ঝুলিয়ে রাখে। অন্যমনস্কভাবে আওড়ায়, “বহুব্রীহি?”

—————

তামান্না মাঝখানের সারির একটা বেঞ্চে বসেছে, গালে হাত দিয়ে, ভীষণ হতাশ ভঙ্গিতে। কথার ঝুরি পেশ করার মতোন কোনো মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না। সচরাচর সে-ই অনুপস্থিত থাকে। আজ মৌমিতা অনুপস্থিত। এতোগুলো কথা সাজিয়ে এতোদিন পর কলেজে এলো তামান্না। এদিকে তার সাথে গল্প করার মানুষটা নেই। একঘেয়ে ক্লাসের শেষে টিফিনের ঘণ্টা পড়লো। শ্রেণিকক্ষ তখন নানাবিধ কোলাহলে পূর্ণ। তামান্না ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো। মানবিক শাখায় তার আরেক বান্ধবী আছে, সুরাইয়া। এমনিতে বন্ধু-বান্ধবের অভাব নেই। তবে সবার সাথে কথা বলে সে আরাম পায় না। তার চিন্তা ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ সবার সাথে মেলে না।

মানবিকের ক্লাসগুলোতে কয়েকবার উঁকিঝুঁকি দেয়ার পর সে বুঝলো, সুরাইয়াও আজকে আসেনি। তামান্না মনে মনে ঠিক করলো, আগামী এক সপ্তাহ সে কলেজে অনুপস্থিত থাকবে। খুব বিরক্তি নিয়ে সে মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। খিদেও পেয়েছে। খাবারের ভ্রাম্যমান দোকানগুলো সব মূল ফটকের দিকে। সেদিকেই পা বাড়ায় মেয়েটা। প্রচণ্ড রোদ, তার মাঝে দোকানের চারিদিকে ভিড় দেখে সে ভবনের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়ায়। পানির বোতলটা সঙ্গে আনা উচিত ছিলো। শরীর থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় সব পানি বেরিয়ে যাচ্ছে।

“আপু?”

সে পাশে ঘুরতেই দেখে, জুনিয়র ছেলেটা অল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। নামটা মনে করা গেলো না। খুব জটিল নাম তামান্না মনে রাখতে পারে, সোজাসাপ্টা নাম মনে রাখার জন্যই কসরত করতে হয়। সে ভ্রু উঁচিয়ে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলো, “কী?”

“আপনার কাছে কি হুমায়ূন আহমেদের বহুব্রীহি বইটা আছে?”

“সেটা জেনে কী হবে? ওটা লাগবে তোমার?”

“এমনি, জানতে চাচ্ছি।”

“নেই আমার কাছে। তবে কিনবো।”

“ওহ।” বাদল মাথা দোলায়, “আচ্ছা। কিনলে আবার ওনাকে দিয়েন না।”

তামান্না কথাটা বুঝলো না। কিছুটা এগিয়ে এসে বললো, “কাকে দেবো না?”

ছেলেটা ইতস্তত করলো। কথাটা সে মুখ ফসকে বলে ফেলেছে। আর বলেই যখন ফেলেছে, সেটাকে ধামাচাপা দেওয়ার উপায় নেই।

“ঐ যে, আপনার ঐ—” কথাটা কীভাবে বলা যায়, সে কিছুতেই তা গুছিয়ে তুলতে পারলো না। হাত দিয়ে অযথা চোখ কচলে আমতা আমতা করে, “ঐ একজন আছে... মানে আরকি, কোনো বান্ধবীকেই দেওয়ার দরকার নাই! চললাম।”

ছেলেটা ঘুরেই বড় বড় পা ফেলে ভবনের আরেকপাশে চলে গেলো। তামান্না সেদিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে। একাদশ শ্রেণির ছেলেগুলো একেকটা আশ্চর্য নিদর্শন! বিশেষ করে এই ছেলেটা। মুখখানা দেখলে মায়া হয়, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে ঠিকই। কিন্তু আচরণ আবার বিদঘুটে। কথার কোনো আগামাথা নেই। হঠাৎ কোথা থেকে যেন উদয় হয়, উল্টোপাল্টা বকে, তারপর হাওয়া হয়ে যায়। তামান্না তার বই কাকে দেবে, কাকে দেবে না, এই সিদ্ধান্ত ঐ ছেলেকে নিতে কে বলেছে?

মারুফ সোফায় বসে রয়েছেন। চোখে চশমা। ভ্রুজোড়া বাঁকিয়ে একমনে লিখে যাচ্ছেন কিছু একটা। বারান্দায় শব্দ হতেই তিনি সেদিকে তাকালেন। সাত-পাঁচ না ভেবেই বলে উঠলেন, “কে? জুনায়েদ নাকি?”

তামান্না ভেতরে উঁকি দেয়। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলে, “আসসালামু আলাইকুম। আমি মৌয়ের বান্ধবী।”

সালামের উত্তর দিয়ে মারুফ মৃদু হেসে বললেন, “ভেতরে এসো।” তিনি মাথা ঘুরিয়ে মেয়েকে ডাকলেন, “মৌ মা?”

ঘর থেকে একটা ক্লান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “জ্বী আব্বা?”

“তোমার বান্ধবী এসেছে।”

মৌমিতা বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে ছিলো। আব্বার কথা শুনে সে উঠে বসলো। এ সময়ে কোন বান্ধবী তার বাড়িতে আসতে পারে? আসার কারণই বা কী? ঘর থেকে বের হতে ইচ্ছে করেই একটু গাফিলতি করলো সে। যতো কাছের মানুষই হোক না কেন, প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে উঠতে তার অনেকটা সময় লাগে। প্রয়োজন না থাকলেও মৌমিতা মাথায় কাপড় দিয়ে বেরিয়ে আসে। তামান্নাকে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে, “তুই এই সময়ে?”

“হ্যাঁ। এমনি খোঁজ নিতে আসলাম। তুই সুস্থ আছিস কিনা, সেটা জানতেই—”

“আমি ঠিক আছি।”

“ওহ। টিউশন ক্লাসে যাবি আজকে?”

মৌমিতা নেতিবাচক উত্তর দিতেই যাচ্ছিলো, তখন খেয়াল করলো, মারুফও এই প্রশ্নের উত্তর জানতে তার দিকে কৌতূহল নিয়ে চেয়ে আছেন। সে কাঁচুমাচু করে তামান্নার দিকে তাকালো, অদ্ভুত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। উত্তরটা তামান্না স্পষ্ট বুঝতে পারলো না, “যাবি না?”

মৌমিতা বললো, “যাবো।”

“আচ্ছা, তাড়াতাড়ি আসিস।”

মৌমিতা মাথা কাত করে। তামান্না বেরিয়ে গেলেই মারুফ গম্ভীরভাবে বললেন, “ওকে বসতে বলা উচিত ছিলো না?”

“এখন বসে কী হবে? বাসায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপার আছে। আবার টিউশন ক্লাসও আছে কিছুক্ষণ পরে।”

মারুফ কথাটা শোনেননি, তিনি কাজে ব্যস্ত। মৌমিতা ভেবে দেখলো, তার জায়গায় অন্যকেউ থাকলে নিশ্চয়ই বসতে বলতো। হয়তো এক কাপ চা বানিয়েও এনে দিতো, নাস্তা করার জন্য জোরাজুরি করতো। নিজের প্রতি রাগ হলো তার। এই অসামাজিকতা সে কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না। টিউশনে যেতে সম্মতি জানানোটা হয়েছে আরেক বোকামি। বাইরে বের হওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই তার। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেককিছু ভাবার পর সে হঠাৎ প্রশ্ন করলো, “আব্বা? আপনি কি তামান্নার মাকে চেনেন?”

“কোন তামান্না?”

“এখনই যে আসলো? ওর মায়ের নাম আয়েশা।”

মারুফ কাগজে খসখস করে কোনো একটা হিসাব টুকলেন। চশমাটা একটু উপরে তুললেন আঙুলের ঠেলায়, “এই নামের তো অনেককেই চিনি।”

মৌমিতা আর কোনো প্রশ্ন করলো না। রান্নাঘর থেকে খাবারের সুঘ্রাণ আসছে। রাবেয়া হয়তো এখনই সবাইকে খেতে ডাকবেন। এখন ঘরে গিয়ে কাজ নেই। একবার ঐ শোয়ার ঘরে ঢুকলেই এখানে ফিরে আসতে আবার অলসতা কাজ করবে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp