জোবেদা এমনিতে খারাপ না। তবে সে একটু বেশিই কথা বলে, সেগুলোর মধ্যে আবার অধিকাংশই অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা। প্রথমে দুই মেয়ে নালিশ জানিয়েছে, রাবেয়া গুরুত্ব দেননি। তবে খুব তাড়াতাড়ি তিনিও অতিষ্ঠ হয়ে গেছেন।
খন্দকারদের বাড়ির দিকে আসছিলো জুনায়েদ। বাঁশের কঞ্চি দ্বারা তৈরি দরজাটা মৃদু ঠেলা দিয়ে সে উঠোনে পা রাখলো। জোবেদা ঝাড়ু দেয়া বন্ধ করে তাকে দেখে, ঝাঁটা হাতে নিয়েই তীক্ষ্ণ স্বরে বলে, “তোমারে তো সারাদিনই এদিকে ঘুরঘুর করতে দেখি। আর কোনো কাজকাম নাই?”
জুনায়েদ বিস্ময় প্রকাশ করলো, “মাত্রই তো আসলাম। এরকম গুজব রটাবেন না তো!”
“এমনি এমনি আসো, তাই কইলাম।”
“এমনি আসিনি। একটা কাজে এসেছি।”
রিপন তাকে ডেকেছিলো। কোনো এক বিষয়ে সলাপরামর্শ করা হবে। বিষয়টা মোটামুটি গোপনীয়।
মার্কেটিংয়ের ব্যাপারে মারুফ তেমন জ্ঞান রাখেন না। যতোটুকু জানেন, সেটাও ঠিকমতো কাজে লাগান না। দোকানে যেন কোনো লোকসান না হয়, এ নিয়েই তিনি তটস্থ। লাভের জন্য তাকে সেভাবে ভাবতে দেখা যায়নি কখনও। ষোলআনা পরিশ্রম করলেও লোকটা পাওনা আদায়ের বেলায় বেজায় উদাসীন।
তিনি জানেন না, তাকে এবং তার ব্যবসাকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে সর্বদাই তৎপর থাকে তার ছোট শ্যালক আর একজন প্রতিবেশী। প্রকাশ্যে কোনো সাহায্য করা সম্ভব হয় না। কেননা রিপনের হস্তক্ষেপ তার কাছে অপছন্দনীয়। ছেলেটা রাজনীতি করে। এই এক রাজনীতি সে সবকিছুতেই টেনে আনে। এছাড়া তার কথা বলার ধরনটাও মারুফের পছন্দ নয়।
দুলাভাই সম্পর্কে রিপনেরও অদ্ভুত একটা ধারণা আছে। তার মতে, এতো নরম, শান্তশিষ্ট মানুষের ব্যবসা করা উচিত নয়। এই কাজের জন্য চপল হতে হয়। মাঝে মাঝে চতুরও হতে হয়। বিশেষ করে ব্যবসা যখন জীবিকার একমাত্র পন্থা হয়ে দাঁড়ায়।
জুনায়েদকে দায়িত্ব দিয়ে মারুফ নিজের অজান্তেই প্রচারের কাজটা সহজ করে দিয়েছেন। ভালো মানুষ হিসেবে এলাকায় এমনিতেও বেশ সুখ্যাতি রয়েছে তার। ইদানিং ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিতি বাড়ছে। অনেক বছর ধরেও তিনি এই কাজটা করতে পারেননি, তা এখন ধীরে ধীরে সম্ভব হচ্ছে।
রিপনের ঘরটা ছোট। দেয়াল ঘেঁষে রয়েছে ছোট্ট চৌকি। অপরপ্রান্তে বই পুস্তকের টেবিল। জুনায়েদ ঘরে ঢুকলো। মাথার উপরে থাকা স্বল্প পাওয়ারের বাল্বের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বললো, “এই বাল্বটা চেঞ্জ করো তো রিপন। এটার দিকে তাকালেই মাথা ধরে যায়।”
“বাল্বের দিকে তাকাতে যাও কেন? এখানে বসো।”
রিপন চৌকির এক কোণে সরে বসলো, জুনায়েদকে জায়গা করে দিলো, “আজকে কী অবস্থা?”
“কাস্টমার আবার কমেছে। তবে গত মাসের চেয়ে ভালোই চলছে।”
“তা তো চলবেই। দোকানে আরেকটা সেলসম্যান লাগবে, বুঝলা? ওসমান খালি ঝিমায়। আর মারুফ ভাইয়ের মতো লোকের জন্য সবকিছুতে সমস্যা। উনি যেমন বোকা, তেমন অলস!”
“না। চাচা সহজ-সরল মানুষ। অলসতা না থাকলেও ওনার হতাশা বেশি। বারবার অল্পতেই হাল ছেড়ে দেন।”
“হতাশা তো থাকবেই। মৌয়ের মতো ঘাড়ত্যাড়া মেয়ে থাকলে সুস্থ মানুষও হতাশ হয়ে যাবে! কয়েকদিন হলো মৌ-টা খুব জ্বালাতন করছে।”
“মৌমিতা আবার কী করলো?”
“তেমন কিছু না। মাঝে মাঝে ওর মাথা খারাপ হয়, সেটাই হয়েছে আবার—”
“বয়সের জন্য। আরেকটু বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।”
“শোনো। তুমি আরেকটা ছেলে দেখো তো। ওসমানকে আমার পছন্দ হচ্ছে না।”
“তা নাহয় দেখলাম, তবে... ওসমান ফাঁকিবাজ হলেও বিশ্বস্ত। আগেরজনের মতো চোর নয় অন্তত। আর ভালো ছেলে খুঁজে পাওয়াটাই তো কঠিন। তোমার ভালো অভিজ্ঞতা আছে, তুমিই তো চাইলে দোকানে বসতে পারো।”
“দুলাভাইয়ের দোকানে আমি বসবো না। আত্মনির্ভরশীল হোক!”
রিপনের কথায় জুনায়েদ হেসে ফেললো। দুলাভাইকে সে স্বনির্ভর দেখতে চায় ঠিকই, তবে দোকানের কাজ থেকে দূরে থাকার কারণ ভিন্ন। সে জানে, মারুফ তাকে পছন্দ করেন না।
পরবর্তী আলাপে যাওয়ার আগেই মার্জিয়া দরজায় টাঙানো পর্দাটা সরিয়ে উচ্চস্বরে বলে, “মামা, চা বানিয়েছি—” জুনায়েদকে দেখে সে তব্দা খায়, “ওহ, আপনিও আছেন!”
জুনায়েদ হাসিমুখেই বলে, “আমি চা খাবো না। আমার জন্য কিছু করতে হবে না। এখনই বের হবো।”
“ওহ। কী নিয়ে কথা বলছিলেন আপনারা?”
রিপন পেছনে রাখা বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দেয়, “গাছের কামরাঙা পেকে গেছে। দেখেছো না? জুনায়েদ পরশু এসে ওগুলো গাছ থেকে পেড়ে দিয়ে যাবে।”
জুনায়েদ চুপচাপ তার দিকে তাকালো। মুখ অভিব্যক্তিহীন।
এজন্যই মারুফ চাচা রিপনকে পছন্দ করেন না! এই ছেলেটা কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই কখন কাকে কীভাবে কোথায় ফাঁসিয়ে দিবে, সে নিজেও জানে না।
মার্জিয়া ফিরে এলো। নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। শব্দ শুনে মৌমিতা তাকালো সেদিকে। বোনের চেহারায় রক্তিম আভা দেখে সে অনুমান করলো, জুনায়েদ ভাই এসেছে।
মেয়েটা একটু বেশিই হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। তাকে টেনে এবার মাটিতে নামানো উচিত। সে বাস্তব আর দিবাস্বপ্নের মাঝে পার্থক্য করতে পারছে না। জুনায়েদ তাদের স্নেহ করে বটে, তবে তা ছোটবোন হিসেবেই। অন্য কোনো দৃষ্টিতে সে মার্জিয়াকে দেখেনি। যদিও তার আচরণ কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর মনে হয়। সেটাকে বিশেষ কিছু ভাবলে ভুল হবে। মার্জিয়া প্রতিনিয়ত সেই ভুলটাই করে চলেছে।
তাকে বোঝানোর সাধ্য নেই মৌমিতার। তাদের মধ্যকার যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড়, কেউই মাফ চাইতে রাজি নয়। তবে, লড়াইয়ের কারণটা কোনো পক্ষই যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারবে না।
রাবেয়া দরজা খুললেন। বিছানার উপরে রাখা অবিন্যস্ত জামা কাপড়ের দিকে তাকিয়ে আশাহত হলেন, “মৌ? তোমাকে না বললাম, কাপড়গুলো গুছিয়ে রাখতে?”
“আমার পড়া আছে।”
“পড়া কি সারাদিন পড়তে হবে? মায়ের কাজে একটু সাহায্য করলেই কি তোমার পড়া লাটে উঠবে?”
“চেঁচাচ্ছেন কেন?”
“ভালো করে বললে কি তুমি কথা শোনো? আমড়া কাঠের ঢেঁকি একটা!”
রাবেয়া চলে যাচ্ছিলেন, তখনই মার্জিয়া খুব নিরীহ ভঙ্গিতে বললো, “আম্মা, আজকে রাতে কী রান্না করবেন?”
“সবজি করবো খালি। এই এক সবজি কাটতেই জোবেদা কতো ঘণ্টা লাগালো!”
মৌমিতা শীতল দৃষ্টিতে ছোট বোনের দিকে তাকায়। সে যখনই গুরুতর বকা খায়, মার্জিয়া নিজেকে একেবারে নিষ্পাপ শিশু হিসেবে উপস্থাপন করে। আহ্লাদী কণ্ঠে এমন সব বোকা বোকা প্রশ্ন করে যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। মৌমিতার তখন ইচ্ছা করে, ওর কানের নিচে ঠাস করে একটা থাপ্পড় দিতে, কিংবা শূন্যে তুলে আছাড় মারতে।
কল্পনায় বোনটাকে আচ্ছামতো তুলোধুনো করতে পারলেও বাস্তবে কিছু সম্ভব হয় না। বরং পরে আবার ভাবও হয়ে যায় দু'জনের। তবে মৌমিতা ভেবে রেখেছে, এবার এতো সহজে গলবে না সে। কথাই বলবে না মার্জিয়ার সাথে। কিছুতেই বলবে না।
—————
তামান্নার মুখটা থমথমে। ক্লাসে ঢোকার পর থেকেই এখানে-ওখানে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে। শরীরটা হয়তো এখনও খারাপ।
মৌমিতা বেশ প্রস্তুতি নিয়ে তাকে প্রশ্নটা করলো, “তোর কি রাতে ঘুম হয়নি?”
সে আমতা আমতা করে, “হ্যাঁ। হয়েছে মোটামুটি।” একটু বিরতি নিয়ে বলে, “এইচএসসির পর আমরা ঢাকায় চলে যাবো। আর দেখা হবে না।”
মৌমিতা ছোট একটা শ্বাস ফেললো। কলেজ জীবন শেষে অনেকের সাথেই আর দেখা হবে না। যোগাযোগ থাকবে না। এসব নিয়ে সে কখনও ভাবেনি। ভাবাটা দরকারি মনে হয়নি।
তামান্না গালে হাত দিয়ে জানালার বাইরে তাকায়, “আমি তোকে চিঠি পাঠাবো। তুইও পাঠাবি। আচ্ছা?”
“আচ্ছা।”
“আমার মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। ভালো লাগে না।”
মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালো, “কেন?” নড়েচড়ে বসলো সে, “আচ্ছা, তোর কী হয়েছে বল তো? চোখদুটো এমনভাবে ফুলে আছে, কান্না করেছিলি?”
“এই আরকি...” তামান্না অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসে, “তোকে একটা কথা বলি?”
“বল।”
“বলা উচিত না। তবু বলি। আর কাউকে তো কিছু বলতে পারি না। খুব একা একা লাগে... জানিস? বাসায় কোনো শান্তি নেই।
ভাইয়া মারা যাওয়ার পর থেকে আব্বু কেমন যেন হয়ে গেছে। দেরি করে বাসায় ফেরে। আম্মুর সাথে খুব ঝগড়া করে। মাঝে মাঝে... মারেও।”
মৌমিতা এবার দেরি করলো না, সব ধরনের সংকোচ ঝেড়ে ফেলে মেয়েটার হাত ধরলো। অহেতুক অভয় বাণী শোনালো, “চিন্তা করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তামান্না আশ্বস্ত হলো না। তার চোখমুখ ইতোমধ্যেই লালবর্ণ ধারণ করেছে। চঞ্চলতার ঐ মুখোশটা খসে পড়েছে।
তার বড় ভাইয়ের নাম ছিলো তুষার। অল্প বয়সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছে। তখন থেকে এই মেয়েটি মা-বাবার একমাত্র সন্তান। বাহির থেকে দেখলে বেশ সাজানো, গোছানো, পরিপাটি একটা সংসার তাদের। ভেতরটা তার থেকেও বেশি অসুন্দর।
মৌমিতাকে তামান্না আগেও একদিন বলেছিলো, পুত্রশোকে তার বাবা পাগলপ্রায়। কিন্তু ঘটনা এতোদূর গড়িয়েছে, মৌমিতা ভাবতে পারেনি। স্ত্রীকে মারধর করা কোনো সুস্থ লোকের বৈশিষ্ট্য নয়। আয়েশার কপালে থাকা দাগটার কথা মনে পড়ে গেলো তার। ভেতরটা শিউরে উঠলো। এর কোনো প্রতিকার আছে কিনা—তার জানা নেই। শুধু প্রিয় সহপাঠীকে একটু আশ্বাস দিতে চাইলো সে। সেটা সম্ভব হলো না। সাধারণ পরিস্থিতিতেই সে কথা গুছিয়ে নিতে পারে না। এখন তো রীতিমতো একটা পাথর চেপে বসেছে বুকের উপর।
তামান্না উঠে দাঁড়ালো। গালে হাত ঘষতে ঘষতে বললো, “আমি মুখটা একটু ধুয়ে আসি, মৌ।”
আজ টিফিনের সময় দু'জনে একসাথে লাইব্রেরিতে গেলো। পুরোনো বইগুলোতে আবার চোখ বোলানোও হয়ে গেলো আরেকবার। সময়টা মন্দ কাটলো না। বরং অন্যান্য দিনের চেয়ে কয়েকগুণ ভালো কাটলো। বিস্ময়করভাবে, তামান্না খুব স্বাভাবিক হয়ে গেলো কিছুক্ষণের ব্যবধানে। তার হাসি ঠাট্টা, কথা বলার ধরন দেখে ভেতরের অবস্থা আঁচ করা মুশকিল।
ছুটির সময় মৌমিতাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করলো খানিকক্ষণ। তারপর ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিলো। ঠোঙাভর্তি ভাজা বাদাম কিনে বাড়িতে ফিরলো সে।
তামান্নাকে বিদায় জানিয়ে মৌমিতা রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে রইলো। নিজের জীবনের অসুবিধে গুলোকে ভীষণ তুচ্ছ মনে হলো তার কাছে। ভেতরে বিষাদের পাহাড় পুষেও মানুষ এতোটা হাসিখুশি থাকতে পারে!
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে মৌমিতা। আশেপাশে তাকায় অভ্যাসবশত। আজ কিছু একটা ঘটেনি, যা প্রতিদিনই ঘটে। কোনো একটা নিয়মের ব্যতিক্রম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
মনে পড়লো, আজ পুরোটা সময় জুড়ে বাদলের সাথে দেখা হয়নি। লাইব্রেরিতে এতোক্ষণ অবস্থান করার পরেও ছেলেটা দেখা দেয়নি। একাদশ শ্রেণির ছুটি হয়ে গেছে। হোস্টেলের দিকে যেতে থাকা ছেলেগুলোর মাঝেও তার দেখা মেলেনি।
মৌমিতা দ্বিধায় পড়ে যায়। পরমুহূর্তেই একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে সে। অবশেষে আপদটাকে বিদায় করা সম্ভব হয়েছে। ভালো একটা শিক্ষা পেয়েছে বেয়াদবটা। বেশ হয়েছে!
জোবেদা রান্নাঘরের এক কোণে বসে বটিতে সবজি কাটছে অনেকক্ষণ ধরে, “বুঝলেন গো ভাবী? মাইয়াই ভালা। ব্যাটা মানুষ বিয়ার পর বাপ-মায়ের কথা ভুইলা যায়। আমার গেরামের এক পোলায় বিয়া কইরা শহরে আসলো। তার বাপ মরলো, মা-ও মরলো। দেখতেও যায় নাই। তারে আর দেখলাম না গেরামে যাইতে। কোনো খোঁজ-খবর নাই। কেমন একটা শরমের বিষয় হইলো, কন তো! সেজন্যেই কইলাম, বেটি বেশি ভালা। আপনে কষ্ট পাইয়েন না। ব্যাটা নাই তাতে কী হইছে? এখনকার যুগে বেটিরাই সব করে।”
রাবেয়া পরিশ্রান্ত চিত্তে চামচ দিয়ে তরকারি নাড়ছেন। হাতের তালুতে সামান্য ঝোল নিয়ে যাচাই করলেন, লবণ হয়েছে কিনা। তারপর শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছলেন তিনি, “মেয়েদেরকে নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, আমি তাতেই খুশি। আর এটাতেই ভালো—”
“কিন্তু ব্যাটারও দরকার আছে ভাবী। বেটি বিয়া দিলে একা একা থাকা লাগবে। সেবা যত্নের মানুষ পাওন যাইবো না। আর আপনে যাই কন, জামাই কিন্তু কখনোই নিজের পোলার মতোন হইবো না। তখন এই আদরের মাইয়াগুলাও আর বাপ-মায়ের কাছে আসতে পারবো না। আর জামাই যদি খারাপ হয়—”
“তোমার কাজ শেষ হয় নাই? ঐটুকু জিনিস কাটতে এতোক্ষণ লাগে!”
“কথা কইতাছি, এজন্যে—”
“কথা বলছো কেন? কাজটা শেষ করো আগে। মৌয়ের আব্বা আসবেন এখনই। রান্নাবান্না তো কিছুই হলো না।”
আকাশে মেঘ ডাকছে। বাতাস বইছে জোরে জোরে। অন্ধকার হয়ে এসেছে। এরই মাঝে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ শোনা গেলো। রাবেয়া চেঁচিয়ে উঠলেন, “মৌ? বাহির থেকে কাপড় তুলে আনো। ভিজে যাবে।”
মার্জিয়া ছুটে গেলো উঠোনে। তাড়াহুড়ো করে সব কাপড় তুলে নিয়ে এলো।
তারপর মুষলধারে বৃষ্টি। টিনের চালে তীব্র আওয়াজ তুলছে দ্রুতগতির জলধারা।
ঘরে দড়ি টানানো হলো। ভেজা কাপড়গুলো ঝুলিয়ে দেয়া হলো বৈদ্যুতিক পাখার নিচে। খাওয়ার ঘরের ছাদে কোথাও ছিদ্র হয়েছে। মেঝেতে টপ টপ করে পানি পড়ছে। রিপন একটা গামলা এনে রাখলো সেখানে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, “দুলাভাই আসবে কেমনে? ছাতা তো নিয়ে যায় নাই।”
মৌমিতা ঘরের জানালা বন্ধ করে দিয়েছে। বৃষ্টির পানি ঢুকছিলো ভেতরে। সাথে জামা-কাপড়ের পানিতেও মেঝে ভিজে যাচ্ছে। সে বিছানায় এসে বসলো।
মাথার উপরে ক্যাচক্যাচ শব্দে ফ্যান ঘুরছে। ভেজা পরিচ্ছদের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘরে। দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা নেই, ঘর জুড়ে কেবল দড়ি আর জামা কাপড়।
মেয়েটা হাই তুললো। বৃষ্টিটা না কমলেই ভালো হয়। তাহলে আর টিউশনে যেতে হবে না আজকে। গায়ে চাদর জড়িয়ে একটা গল্পের বই সাবাড় করা যাবে। এমন আবহাওয়ায় ভৌতিক গল্প সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত।
মৌমিতা পড়ার টেবিলে বই খুঁজতে লাগলো। মোটামুটি সবই সে পড়ে ফেলেছে। বাকি বলতে কিছু নেই। ধার করে আনা বইগুলোও মুখস্থ। অগত্যা সে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। একটা কপাট সামান্য খুলে দেয়। পানির খুদে খুদে কণার সাথে ঘরে শীতল বাতাস ঢোকে হু হু করে। সে বাইরেই তাকিয়ে থাকে। সন্ধ্যেবেলার মতো অন্ধকার আকাশ।
কপাটটা আরেকটু সরাতেই মেয়েটার মুখ ভিজে যাওয়ার উপক্রম হয়। সে কয়েকবার চোখের পলক ফেলে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। মাথায় কোনো চিন্তা নেই তার।
মার্জিয়া ঘরে ঢুকে বড় বোনের কাণ্ড দেখে হতবাক হয়ে গেলো। চরম বিরক্তি প্রকাশ করে সে বললো, “আয় হায়! পুরো ঘর ভিজে গেলো। পানি ঢুকছে তো।”
বোনের কাছ থেকে আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া না পেয়ে সে আরও ক্ষুব্ধ হলো। কাপড়গুলো জানালা থেকে দূরে সরাতে লাগলো, “কোনো কাজে সাহায্য তো করবেই না। উল্টো সব নষ্ট করবে। পরে আম্মা বকলেও সমস্যা—”
মৌমিতা ঠাস করে দুটো কপাটই খুলে দিলো। দমকা বাতাস আর পানির ঝাপটা এসে আছড়ে পড়লো ঘরে। তার পরনের কাপড়টাও ভিজে গেলো পুরোপুরি। মার্জিয়া হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। আর কিছু বলার চেষ্টা করলো না। ঘর থেকে চুপচাপ বেরিয়ে গেলো সে।
অন্যজনের বৃষ্টিবিলাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
শীঘ্রই আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলো। সূর্যের সোনালি আলো ঝিলিক দিতে লাগলো অবশিষ্ট শুভ্র মেঘগুলোর ফাঁকে ফাঁকে।
বৃষ্টি থেমেছে টিউশন ক্লাসের এক ঘণ্টা আগে। মারুফ তখন বাড়ি ফিরলেন। ভেজা শার্ট বদলে খেতে বসলেন।
জোবেদা হাসিমুখে বললো, “তরকারি কেমন হইছে মারুফ ভাই?”
“ভালোই হয়েছে।”
“কইতেছিলাম, মাসের শুরুর দিকে দুইটা টাকা পয়সা দিতে পারবেন? আমার জন্যে একটু সুবিধা হইতো।”
মারুফ স্ত্রীর দিকে তাকালেন, “কাজ কেমন হচ্ছে? ঠিকঠাক?”
রাবেয়া ইতস্তত করলেন। কাজের মহিলার সামনেই কি তার নামে অভিযোগ তোলা ঠিক হবে? তিনি একটু সংকোচের সাথে উত্তর দিলেন, “কাজ সব ঠিকঠাক আছে। তবে... কাজের সময় কথা বেশি বলে। বাকি সব ঠিক আছে—”
টেবিলে বসে থাকা বাকি মানুষগুলোও ইশারায় সম্মতি প্রকাশ করে। মারুফ হাসলেন, “ঐ বাড়িতে মেয়ে মানুষ নেই তো। কথা বলার মানুষ পায় না। সেজন্য হয়তো এখানে এসে সবার সাথে গল্প করতে চায়। সমস্যা তো দেখছি না। শোনো জোবেদা, এই মাসের শুরুতে কিছু দিতে পারবো না। মাস শেষ হলে একবারে বেতন নিও।”
—————
রিকশা থেকে নামতে বেশ কষ্ট হলো। রাস্তা পানিতেই অর্ধেক ডুবে আছে। স্যান্ডেল ভেদ করে মৌমিতার পা ভিজে যাচ্ছে। সে ত্যক্ত মুখে রিকশাভাড়া বের করলো ব্যাগ থেকে। তা মিটিয়ে দিয়েই তাড়াহুড়ো করে ক্লাসে ঢুকলো। তামান্না আজ অনুপস্থিত। আবার কতোদিন পর দেখা হবে, কে জানে?
রবিউল স্যার এসেই খাতা বের করতে বললেন। মৌমিতা খাতা থেকে একটা সাদা পাতা বের করলো, লেখার প্রস্তুতি নিয়ে বসলো। তার চোখ পড়লো বেঞ্চের কোণে।
এখানে বাদলের নাম লেখা ছিলো। 'মৌমিতা' নামটার উপরেই। কিন্তু কেউ খুব নিষ্ঠুরভাবে কালি ঢেলে দিয়েছে সেখানে। নিচের নামটাতে কালির ছিটেফোঁটা যায়নি। কিন্তু উপরে থাকা নামটা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
মৌমিতা এখন স্বাধীন, আপদমুক্ত। তবু সে কালিমাখা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা হারিয়ে ফেললো হয়তো!
দৃষ্টির আড়ালে থাকা নামটার উপরে আঙুল বোলায় মেয়েটা। জানালার ঐপাড়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।
রাস্তাটা সুনসান। মানুষের আনাগোনা সীমিত। কৃষ্ণচূড়া গাছের পাতাগুলো থেকে কি পানি ঝরছে আজকেও?
এখান থেকে তো ঝকঝকে রোদ দেখা যাচ্ছে কেবল। বোঝার উপায় নেই, কিছুক্ষণ আগে কী ঝড়টাই না হলো! অথচ এখন বাতাসও নেই তেমন। প্রকৃতি শান্ত। ঝড় থেমে গেছে। থামার আগে হয়তো কোথাও রেখে গেছে নিজের কিছুটা অংশ, অভ্যেস হিসেবে। কিংবা বদঅভ্যেস।
·
·
·
চলবে……………………………………………………