ভাঙা আয়নার আলো - পর্ব ১৭ - শারমিন আক্তার সাথী - ধারাবাহিক গল্প

ভাঙা আয়নার আলো - শারমিন আক্তার সাথী
          নীরবতা কখনো কখনো হাজারটা কথার চেয়েও বেশি শব্দ তোলে। কিছু অনুভূতি থাকে, যেগুলো মুখে বলা যায় না, শুধু চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে থাকে। আজ জবা সেই নীরব অনুভূতির মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে।

ফারিসের গোপন কক্ষে ঢোকার পর থেকেই যেন ওর ভেতরটা অদ্ভুতভাবে স্তব্ধ হয়ে গেছে। বিষয়টা এতটাই আকস্মিক যে প্রথম কয়েক মুহূর্ত ও ঠিক বুঝতেই পারেনি কী দেখছে! তারপর ধীরে ধীরে চোখ ঘুরতেই বাস্তবতাটা স্পষ্ট হলো। সারা ঘরময় জবা।

দেয়ালের প্রতিটি ইঞ্চিতে ওর ছবি। কোথাও ও হেসে আছে, কোথাও দূরে তাকিয়ে আছে উদাস চোখে, কোথাও হয়তো অজান্তেই ধরা পড়েছে ওর চুপচাপ বসে থাকার মুহূর্ত। কিছু ছবি স্পষ্ট, কিছু ঝাপসা। কিছু হয়তো খুব দূর থেকে তোলা, তবুও প্রতিটা ছবিতে একটাই জিনিস পরিষ্কার, অসীম যত্ন।

এ যেন কোনো ঘর নয়, কারও বহু বছরের জমিয়ে রাখা অনুভূতির জাদুঘর। জবার বুকের ভেতর কেমন ভারী হয়ে উঠল।
একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে এতখানি মন দিয়ে যত্ন করে আগলে রাখতে পারে, এটা ওর জানা ছিল না। ভালোবাসা যে এত নিঃশব্দ, এত গভীর, এত ধৈর্যশীল হতে পারে, সে ধারণাও কখনও জন্মায়নি ওর ভিতরে।

কীভাবে জন্মাবে? এতদিন যেটাকে ভালোবাসা ভেবেছে, তা ছিল নিখুঁত অভিনয়।
সাজানো শব্দ, হিসেবি যত্ন, প্রয়োজনমতো স্পর্শ। সবকিছু মিলিয়ে এক সুন্দর মিথ্যে।

ইরফান ওকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই স্বপ্নের ভেতরে সত্যিকারের অনুভূতি ছিল না। ছিল কেবল প্রয়োজন, স্বার্থ আর অভিনয়। আর অভিনয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো; সেটা এতটাই নিখুঁত হয় যে মানুষ সত্যিকারের অনুভূতিকে চিনতেই ভুলে যায়।

তাই আজ এই ঘরে দাঁড়িয়ে জবার মনে হচ্ছে, ও বুঝি প্রথমবার ভালোবাসাকে ছুঁয়ে দেখছে।
আসল ভালোবাসা শব্দে নয়, প্রকাশ পায় যত্নে।

কেউ কতবার ভালোবাসি বলল, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে কত নিঃশব্দে তোমাকে নিজের পৃথিবীর অংশ করে রাখল সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
ফারিস হয়তো কোনোদিন মুখ ফুটে সব বলেনি। কিন্তু এই ঘরের প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি ছবি, প্রতিটি জমিয়ে রাখা মুহূর্ত চিৎকার করে বলে দিচ্ছে, সে জবাকে শুধু ভালোবাসেনি, নিজের অস্তিত্বের ভেতর গেঁথে রেখেছে।

রুমে ঢুকেই ফারিস থমকে দাঁড়াল। নিজের গোপন কামরার মাঝখানে জবাকে দেখে তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে উঠল। যেন কাউকে এখানে দেখার কথা সে কল্পনাও করেনি। কয়েক সেকেন্ড শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
'তু...তুই এখানে?'

জবা দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। ধীরে মুখ ফিরিয়ে শান্ত গলায় বলল,
'আপনার সাথে দেখা করতে আসলাম। দেখলাম এখানের এই রুমটার দরজা খোলা। আগে কখনো এ রুম খোলা দেখিনি। ভিতরে দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। এখন মনে হচ্ছে ভিতরে আসা উচিত হয়নি। না আসলে ভালো হতো।'

শেষের কথাটুকু বলার সময় জবার কণ্ঠে অদ্ভুত এক ক্লান্তি ছিল। জবার কথায় আহত হলো ফারিস৷ ভ্রু কুচকালোও খানিক। বলল,
'কেন বেশি খারাপ লেগেছে কি এসব?'

জবা মৃদু হাসল। তবে সে হাসিতে উষ্ণতা ছিল না, ছিল নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক মানুষের নির্লিপ্ততা।
'খারাপ লাগাটা বড়ো কোনো ব্যাপার না। খারাপ লাগা কিছুদিন পর কেটে যায়। মানুষ সব খারপ লাগাই একসময় সহ্য করতে শিখে নেয়। কষ্টও পুরাতন হয়ে যায়। ভয় লাগে ভালোলাগাকে। আবেশে স্থায়ী হয়ে যায় তো ভালোলাগা। আর আবেশ... মানুষকে দুর্বল করে। আমি আর সে ভালোলাগার দুর্বলতায় জড়াতে চাই না। সেই আবেশের মোহে আর পড়তে চাই না। এ জীবন থেকে আমি আবেশ, আবেগ সব বিদায় করব। অরুচি ধরে গেছে এখন ভালোলাগায়। নিজেকে দুর্বল করার আর কোনো সুযোগ দিতে চাই না।'

ফারিস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
নীরবতাটা কেমন ভারী হয়ে ঝুলে থাকল দুজনের মাঝে। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,
'কেউ যদি অতি যত্নে তোর মনে সে আবেশ আবার ফিরিয়ে। ভালোলাগার নতুন সূচনার জন্ম দেয়। তবে কী করবি?'

জবা এবার সরাসরি তাকাল ফারিসের চোখে।
চোখ দুটো কেমন নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো শান্ত, অথচ গভীরে জমে আছে অসংখ্য ভাঙনের দাগ। বলল,
'এ জীবনে সে আধৌ আর হবে না। ভাঙা আয়না জোড়া লাগে না। ভাঙা মনও আবেগে ভাসে না।'

ফারিস হাসল। ঐ যে একরকম হাসি আছে না, যা দেখলে মনে হয় চোখ হাসছে। অথচ ঠোঁটে হাসির টান দেখা যায় না। তেমন হাসি। বলল,
'জবা, ভাঙা আয়নার জোড়া লাগানোর কোনো প্রয়োজন নেই। আয়নার প্রতিটি টুকরো একেকটা আলাদা আয়না। আয়না ভাঙলে কি তাতে দেখা প্রতিবিম্ব খন্ডিত দেখায়? না.. বরং প্রতিটি খন্ড নিজে নিজে পরিপূর্ণ একটি আয়না। যে খন্ডটা যতই ক্ষুদ্র হোক। প্রতিটা খণ্ড নিজেই একটা সম্পূর্ণ আয়না হয়ে ওঠে। ছোট্ট টুকরোটাও নিজের মতো করে পুরো আকাশ দেখাতে পারে। তুই ভেঙে দ্বিখণ্ডিত হোসনি বরং তোর ভাঙনের প্রতিটি অংশ থেকে একটা করে জবার জন্ম হয়েছে।'

কথাগুলো শুনে জবা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইল। ফারিসের এ যুক্তির উপর জবা কী যুক্তি দেখাবে ভেবে পাচ্ছে না। আসলেই তো ও তো দ্বিখণ্ডিত হয়নি বরং ওর ভেঙে যাওয়া প্রতিটি অংশ নিজে নিজে পরিপূর্ণ। ও তো শেষ হয়ে যায়নি। ভেঙে গেছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটা ভাঙনই যেন ওকে নতুন করে তৈরি করেছে।

ফারিস আবার স্বাভাবিক গলায় বলল,
'চা খাবি?'
মাথা নেড়ে সায় দিলো জবা। বলল,
'চিনি দিবেন না।'
'কেনরে তোর তো মিষ্টি পছন্দ।'

জবা এবার একটু হেসে ফেলল। অনেকদিন পর নিজের অজান্তে বেরিয়ে আসা ছোট্ট একটা হাসি,
'কী পরিমাণ মোটা হচ্ছি খেয়াল করেছেন কখনো? '
ফারিস হেসে বলল,
'তাহলে নিচে চল।'

জবা চারপাশে একবার তাকাল। দেয়ালজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নিজের অগণিত মুখের দিকে। এত যত্ন, এত নিঃশব্দ ভালোবাসার চিহ্নের দিকে। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,
'না। চা এখানে নিয়ে আসুন। আমি এখানে কিছু সময় কাটাতে চাই। যদি আপনার আপত্তি না থাকে।'

ফারিস উত্তর দিল না সঙ্গে সঙ্গে। শুধু স্থির চোখে জবার দিকে তাকিয়ে রইল। হালকা একটু হাসল। তবে সে হাসির চিন্হ ঠোঁটে দেখা গেল না। তবে চোখের ভাষা বলছে,
'তোর জন্য এ ঘরের দরজা কোনোদিন বন্ধ না, জবা।'

ফারিসের মুখে কোনো শব্দ ছিল না, তবুও জবা যেন ওর চোখের ভাষা পড়ে ফেলল। কিছু অনুভূতি উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না। নীরবতারও নিজস্ব এক ভাষা আছে, যে ভাষা কেবল খুব কাছের মানুষগুলোই বুঝতে পারে।

কিছুক্ষণ পর ফারিস চা নিয়ে ফিরে এলো। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইল। জবা চেয়ারে বসে আছে, অথচ মনে হচ্ছে সে এই ঘরে নেই। ডুবে আছে বহু দূরের কোনো চিন্তায়।

চায়ের কাপটা জবার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ফারিস নরম স্বরে বলল,
'কী চিন্তা করছিস?'
খানিক চমকালো জবা। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল,
'সবাইকে শাস্তি দেওয়ার যে পথ আমি বেঁছে নিয়েছি তা আদৌ ঠিক না! কেমন অস্থির লাগছে।'

ফারিস স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।
'অস্থিরতা কি? ন্যায় অন্যায়ের জন্য অস্থির লাগছে?'
জবা মাথা নেড়ে মৃদু হাসল। তবে সেই হাসিতে উষ্ণতার চেয়ে তিক্ততাই বেশি ছিল,
'না। আমার ফিলোসোফি আলাদা। যে আমার সাথে অন্যায় করবে তার সাথে ন্যায় করার প্রশ্নই ওঠে না।'
'জানি। ক্ষেত্রবিশেষে সেটাই সঠিক। তা কী শাস্তি দিতে চাস আমাকে বলা যাবে?'
'যাবে।'

জবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন নিজের ভেতরটা গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে সব বলতে শুরু করল। প্রতিটি পরিকল্পনা, প্রতিটি ক্ষোভ, প্রতিটি প্রতিশোধের ইচ্ছা সব। সব শুনে ফারিস বলল,
'জবা এটাকে আগুন নিয়ে খেলা বলে না, বরং আগুনে ঝাপ দেওয়া বলে৷ তুই ইট মারলে তারা পাটকেল মারবে না?'

শান্ত গলায় জবা বলল,
'অবশ্যই মারবে। তবে আমাকে আগে নিজের সেফটির খেয়াল রাখতে হবে। তবে খেলা তো আমি এটাই খেলব। যা হয় দেখা যাবে। যারা আমার বিশ্বাস ভেঙেছে তাদের এতসহজে তো ছাড়বো না আমি।'

একটু থেমে নিচু স্বরে বলল,
'আমার মেয়েটা তো বাবা হারা হবে, কষ্ট পাবে। তবে তাদের কথা কেন ভাবব আমি?'

ফারিস কোনো তর্ক করল না। শুধু ধীরে হাত বাড়িয়ে জবার মাথায় হাত রাখল। সেই স্পর্শে অদ্ভুত এক মমতা ছিল। যেন ভেঙে পড়া কাউকে নিঃশব্দে ধরে রাখার চেষ্টা।

'একটা কথা জিজ্ঞেস করি?'
'করুন।'
'প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হলে কী করবি?'
'আগেও বলেছিলাম। জারাকে নিয়ে শান্তির একটা লাইফ কাটাবো।'

ফারিসের ঠোঁট নড়ল। মনে হলো আরও কিছু বলতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলল না। কিছু কথা মানুষ ইচ্ছে করেই বুকের ভিতর আটকে রাখে৷

প্রসঙ্গ পাল্টে জবা জিজ্ঞেস করল,
'ফিরনাস কোথায়?'
'ইনানের সাথে একটু বাইরে গেছে। রোববার লন্ডন চলে যাবে ও।'

কথাটা শুনে জবার বুকের ভেতর হালকা কাঁপন উঠল। মনে করল ফারিসও চলে যাবে। ভিতরে অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভব করছে। খুব গোপনে সেটা লুকিয়ে রেখে স্বাভাবিক গলায় বলল,
'আপনিও যাবেন?'
'না। আমার এদিকে কাজ আছে।'
'এত ছোটো বাচ্চা একা লন্ড যাবে?'
'না। আমার পার্টনার হ্যারিও যাবে। হ্যারি কিছু কাজে বাংলাদেশে এসেছিল। ফিরনাসও ওর সাথেই এসেছে। এখন দুজনেই ব্যাক করবে।'
'আমার মাঝে মাঝে মনে হয় ফিরনাস আপনার নয় ববং হ্যারির ছেলে। বেশিরভাগ সময় তো তার কাছেই থাকে।'

মলিন হাসল ফারিস। বলল,
'ভুল বলিসনি। হ্যারিও ওকে নিজ সন্তানই মনে করে।'
'মিথ্যার এ যুগে এমন বন্ধু পাওয়া পরশ পাথর পাওয়ার মতো ব্যাপার।'

ফারিস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে করে বলল,
'রব আমার কাছ থেকে আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা কেড়ে নিয়েছিলেন। সে কারণে হয়তো তার আমার প্রতি দয়া হয়েছিল। তাই হ্যারির মতো একজন বন্ধু জুটিয়ে দিলেন। ভাবলেন নয়তো এ ছেলে হয়তো মরে যাবে।'

জবা নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল ফারিসের পানে। ওর কোন প্রিয় জিনিসটা কি ছিল জবা তা জানে। তবুও দুজন দুজনার চোখের ভাষা লুকানোর কী নিরন্তর চেষ্টা করছে। 

—————

ইরফান টেবিলে ছড়িয়ে থাকা হিসাবের ফাইলগুলোর দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে ছিল। গত কয়েক মাস ধরে ওকে প্রতিটি টাকার হিসাব দিতে হয় জবাকে। কোথায় কত খরচ হলো, কেন হল, সবকিছুর জবাবদিহি করতে হয় এখন!

অথচ একসময় এই ইরফানই বছরের পর বছর হিসাবহীন জীবন কাটিয়েছে। টাকা ওর হাতে পানি হয়ে ঝরেছে। কখনো ভাবতে হয়নি কত গেল, কোথায় গেল? জবা সে অধিকার ওকে দিয়েছিল। এখন সেই মানুষটাকেই মাস শেষে হিসাব মিলিয়ে চলতে হয়। এর চেয়ে খারাপ কী হতে পারে।

জবার কোম্পানিতে এখন সে কেবল একজন কর্মচারী। যার মাসিক বেতন মাত্র ত্রিশ হাজার টাকা। যে ইরফান এক রাতেই এর চেয়ে বহু গুণ বেশি টাকা ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিত, আজ তাকে সেই টাকাতেই পুরো মাস চলতে হয়। তারও অর্ধেক জবা কেটে রাখে বাড়ির থাকা খাওয়ার খরচ হিসেবে। বাকি টাকায় কোনোমতে দিন কাটে ইরফানের।

এত হিসাব করে চলে তাও মাস শেষে পকেটে টাকা থাকে না। 
ইদানীং জারার জন্যও আগের মতো দামি কিছু কিনতে পারে না। যদিও জবার কাছে মেয়ের কোনো আবদার অপূর্ণ থাকে না, তবুও বাবা হিসেবে ইরফানের বুকের ভিতর কেমন হাহাকার ওঠে। আগের মতো নিজের হাতে মেয়ের জন্য কিছু কিনে দিতে না পারার অপমানটা ওকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খায়।

অনেকবার মনে হয়েছে জবার পা ধরে ক্ষমা চাইবে, কিন্তু জানে তা করা বৃথা প্রায়শ। জবা কখনোই ইরফানকে ক্ষমা করবে না।

হিসাবের খাতায় চোখ রেখে ফাঁকফোকর খুঁজছিল ইরফান। যদি কোনোভাবে আবার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে আনা যায়।

অতিরিক্ত আরাম আর অলসতা মানুষের মস্তিষ্ক বিকলাঙ্গ করে। ইরফানের ইদানীং তেমন হচ্ছে। এত বছর হিসাব ছাড়া কাজ করে ইদানীং ব্রেইন কাজ করছে না। জবাকে কাবু করার কোনো বুদ্ধিই পাচ্ছে না।

একে একে জবা সব ছিনিয়ে নিচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য ইরফানের মাথায় ভয়ংকর একটা চিন্তা এল। জবাকে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেওয়ার। কিন্তু পরক্ষণেই সেই ভাবনা নিজেই গিলে ফেলল। না… ও সেটা পারবে না।

জবার প্রতি ভালোবাসা হয়তো কলুষিত, বিকৃত, স্বার্থপর তবুও আছে। আর জারা…। জারা তো ওর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। ইরফান নিজের ভালোবাসাকে মারতে পারলেও জারার মাকে মারতে পারবে না।

চট করে ইরফানের মাথায় একটা পরিকল্পনা আসল। জারাকে জবার কাছে যাওয়ার সিড়ি হিসাবে ব্যবহার করলে কেমন হয়?

ইরফান মনে মনে ফিসফিস করে বলল,
'আমি কখনোই জারাকে নিজ স্বার্থের জন্য ব্যবহার করতে চাইনি, কিন্তু এবার আমি নিরুপায়। সরি জারা মা।'

দরজায় টোকা পড়ল ইরফানের। টিকলি বলল,
'ভাইজান ম্যাডাম ডাকে আপনাকে।'
'যাও আসছি।'

ইরফান হিসাবের ফাইলটা বন্ধ করে আড়মোড়া ভাঙল। তারপর উঠে বাগানে গেল। বাগানের সবচেয়ে সুন্দর সাদা রঙের গোলাপটা ছিঁড়ে জবার জন্য নিয়ে আসল।

রুমে ঢুকে দেখল, জবা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। জবাকে পিছন থেকে দেখে ইরফান মুচকি হাসল। ফিটিং থ্রি-পিসে শরীরের প্রতিটি বাঁক যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পিছন থেকে তাকাতেই ইরফানের বুকের ভিতর পুরোনো নেশাটা আবার জেগে উঠল। যেন এই নারী এখনও ওকে চুম্বকের মতো টানে। 

ইরফান নিজের অনুভূতিকে অগ্রাহ্য করল না। ও জবাকে পিছন থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। শক্ত বাহুর বন্ধনে আটকে ফেলল ওকে। অবাধ্য হাত বিচরণ করতে লাগল জবার শরীরের স্পর্শকাতর অংশগুলোতে।

চিরচেনা স্পর্শে কিছু সময় স্তব্ধ হয়ে রইল রইল জবা। চোখ বন্ধ করল আবেশে। নিঃশ্বাসও ভারী হলো। চিরচেনা এ স্পর্শে কতটা মাদকতা কাজ করত তা কেবল জবাই জানে। এই স্পর্শ একসময় ওর সমস্ত পৃথিবী ছিল।

ইরফান জবার গলায়, কানে, কানের পিছনে ছোটো চুমুর বৃষ্টি ঝরাতে লাগল। এক মুহূর্তে জবাও সব ভুলে গেল। মানুষ তো ও। অনুভূতি ভালোবাসা সবই আছে। ইরফান গোলাপটা জবার গাল ছুঁয়ে বুকের কাছ থেকে টেনে এনে বলল,
'তুমি আমায় সবসময় এমন নেশার মতো টানো কেন? তোমায় দেখলেই আমার নিজেকে মাতাল লাগে।'

কথাটা বলে ইরফান জবার কানের লতিতে আলত কামড় বসালো। জবার সারা শরীরে অনুভূতির জোয়ার বইলেও ওর মারাত্মক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ঠান্ডা গলায় বলল,
'আমায় ছাড়ো ইরফান।'

ঘোর লাগা কণ্ঠে ইরফান বলল,
'প্রশ্নই ওঠে না। আমার তোমাকে এখন সম্পূর্ণ চাই। চাই মানে চাই।'

জবা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
'মনহীন শরীর ঘেটে তুমি সুখ পাও, কিন্তু আমার ঘৃণা লাগে ইরফান। আমি তোমার থেকে মুক্তি চাই।'

কথাগুলো যেন ধারালো ছুরির মতো বিঁধল ইরফানের ভিতরে। অবাধ্যভাবে জবার শরীরে চলতে থাকা ওর হাত থেমে গেল। কিন্তু জবাকে ছাড়ল না তখনও। নিজের সাথে আটকেই রাখতে চাইল। জবা নিজেই দূরে গিয়ে বলল,
'ইরফান, তোমার মনে হয় আমাদের মাঝে এসব বেমানান?'

ক্ষেপাটে ভালোবাসার উন্মাদনায় ইরফানের রাগ উঠে গেল। ভিতরের উন্মত্ততা রাগে বিস্ফোরিত হলো। ডান হাত দিয়ে জবার গাল চেপে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট বসাল। ভয়ংকর চুমুতে জবাকে কাবু করতে চাইল। জোর করে নিজের দখল প্রমাণ করতে চাইল।

জবার এবার রাগ চড়ে গেল। হাঁটু দিয়ে স্ব-জোরে আঘাত করল ইরফানের পেটে। শব্দ করে ইরফান দূরে যেতেই ঠাস করে গালে চড় বসিয়ে জবা বলল,
'আমাকে তোমার ঐসব মেয়েদের মতো মনে হয়? যারা শরীরের ক্ষুধায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে? আমার নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে তোমার চেয়ে ভালো কে জানে?'

এক পা এগিয়ে জবা আবার বলল,
'ইরফান তুমি একটা পাগলা কুকুর। যার কেবল সেক্সের জন্য নারী শরীর লাগে। আমি কোনো সেক্স টয় নই। আমি জবা চৌধুরী। আমার সাথে শরীর শরীর খেলা এ জন্মে আর কখনো তোমার হবে না। বের হয়ে যাও এক্ষুনি আমার রুম থেকে।'

ইরফানের রাগে গা থরথর করে কাপছে। ও বের হলো না। জবার কাছে এসে এক হাতে ওর ডান হাত পিছনে মুড়ে, অন্য হাতে ওর গাল চেপে বলল,
'কিসের এত দেমাগ তোর? নিজেকে বিশ্ব সুন্দরী ভাবিস? তোর চেয়ে হাজার সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করতে পারতাম আমি ইরফান। সেই ইরফান তোকে কেন বিয়ে করছে একবার ভেবে দেখেছিস? মেয়েদের পটাতে আমার তুড়ি লাগে না। আমি ইরফান তোর মতো জবা চৌধুরীকে রোজ বিছানায় নিতে পারি।'

জবা হাঁটু দিয়ে ইরফানের দু পায়ের মাঝখানে আঘাত করল। এবার ইরফান নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ব্যথায় ককিয়ে উঠে বসে পড়ল। জবা ওর চুল টেনে ধরে বলল,
'যে পুরুষত্বের দম্ভ দেখাচ্ছো তা পিষে ফেলতে আমার দুই মিনিট লাগবে। ভুলে যাচ্ছো আমি কে?'

তারপর জবা নিজেই ইরফানকে রুম থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল ইরফান। আর দরজার এপাশে…। জবা ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল।

দুই হাঁটু জড়িয়ে ধরে মাথা নিচু করতেই বুকের ভিতর জমে থাকা সব যন্ত্রণা যেন একসাথে ভেঙে বেরিয়ে এলো। শব্দহীন কান্নায় কাঁপতে লাগল ওর শরীর।

কাঁদতে লাগল পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষটির মতো। ও তো অসহায়ই। যে ভালোবাসায় প্রতারিত হয় সে সত্যি অসহায়। ভালোবাসা মানুষকে যেমন পূর্ণ করে, তেমনি ভেঙেও দেয় সবচেয়ে নির্মমভাবে।

জবার কাছ থেকে এমন প্রত্যাখান চরম অপমানিত করল ইরফানকে। অপমানিত করল ওর পুরষত্বকে। রাগে, অপমানে, দহনেই প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠল সে। সোজা চলে গেল সিনথিয়ার কাছে। চোয়াল শক্ত করে বলল, 'আমার রুমে আসো।'

ইরফানের চোখের সেই হিংস্রতা সিনথিয়ার অচেনা নয়। তবুও ওর ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটল। ধীরে ধীরে ইরফানের পিছু নিল। রুমে যেতেই ইরফান ক্ষুদার্ত হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সিনথিয়ার শরীরে। সিনথিয়া ব্যথায় ককিয়ে বলল,
'ইরফান, স্টপ বিহেভিং লাইক এ মনস্টার। ইট'স হার্টিং।'

কিন্তু ইরফানের ভিতরে তখন আর কোনো সংযম অবশিষ্ট নেই। ও যেন নিজের অপমান ঢাকতে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।
সিনথিয়ার জামাটা খোলার সাথে সাথে ওদের দরজা খুলে গেল। দুজনেই চমকে উঠল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে জবা।
হাতে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল। 
ঘরের বাতাস মুহূর্তেই বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। সিনথিয়ার মুখ রক্ত শূণ্য হয়ে গেল। ইরফানের চোখেও স্পষ্ট ভয় ফুটে উঠল।সিনথিয়া ভয়ে কাঁপতে লাগল। 

জবা হাসল। ভয়ংকর শীতল সেই হাসি। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
'এ বাড়িটাকে কি ব্রোথেল মনে হয় তোমাদের?'

কথা শেষ হতেই পর পর দুটো গুলির শব্দ হলো। দুজনার পায়েই দুটো গুলি করল জবা
সাইলেন্সার থাকায় শব্দটা খুব বড় হলো না, কিন্তু যন্ত্রণার তীব্রতায় দুজনেই মেঝেতে বসে পড়ল। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে পা বেয়ে।

সিনথিয়া পরনে তখনও জামা নেই। ব্যথায় কাঁপতে কাঁপতে নিজেকে ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। জবা একবার ঠান্ডা চোখে ওর শরীরটার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে বলল, 
'এই শরীরের প্রতি আমার স্বামীর এত নেশা?'

পিস্তলের নল দিয়ে মেঝে থেকে কাপড়টা ঠেলে সিনথিয়ার দিকে এগিয়ে দিল।
'পরে নাও। আমার বমি পাচ্ছে।'

সিনথিয়া ব্যথায় কাঁপতে কাঁপতে ড্রেস পরল। জবা পিস্তলটা ওর মাথায় ঠেকিয়ে বলল,
'এখন যদি ট্রিগার টিপ দেই কয়েক সেকেন্ডে তোমার ইহলীলা সাঙ্গ হবে। দিব?'

জবার চোখে তাকিয়ে সিনথিয়া অনেক ভয় পেল। ও বুঝল জবা মোটেও ওকে ভয় দেখানোর জন্য এসব বলছে না। ওর চোখে এমন কিছু ছিল মানুষকে বিশ্বাস করিয়ে দেয় মৃত্যু খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁপা কণ্ঠে সিনথিয়া বলল,
'প্লিজ ম্যাডাম। আমায় ছেড়ে দিন।'

জবা কোনো উত্তর দিল না। একবার ওদের দুজনের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে পুরো রুমে চোখ বুলাল। এই রুম, এই বিছানা, এই মানুষগুলো, সবকিছুতেই যেন ঘৃণার দাগ লেগে আছে। টেবিলের উপর থেকে একটা সাদা কাগজ তুলে নিয়ে সিনথিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।,
'এ কাগজে সাইন করো।'

যন্ত্রণায় থাকলেও সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল, 'কেন?'
জবা বাঁকা হেসে বলল,
'প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। সাইন করো।'

সিনথিয়া সাইন করে দিল। আরেকটা কাগজ বাড়িয়ে দিলো ইরফানের পানে। বলল,
'তুমিও সাইন করো।'

ইরফান কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। সে জবাকে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে।
জবা কোনো কারণ ছাড়া কারও মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে সাদা কাগজে সাইন নেয় না।
চোয়াল শক্ত করে বলল, 
'শুট মি। তবুও আমি সাদা কাগজে সাইন করব না। মেরে ফেললেও না।'

জবা হাসল। ভয়ংকর হাসি। বলল,
'জান, তুমি সত্যি আমায় চিনো। জানো এ কারণেই সাইন করতে চাইছো না। নো প্রবলেম তোমাকে অন্যভাবে আমি হ্যান্ডেল করব। তার আগে তোমাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করি।'

তারপর শান্তভাবে সোফায় গিয়ে বসল।পিস্তলটা এখনও ওর হাতেই। মুহূর্তখানেক নীরব থাকার পর মোবাইল বের করে অ্যাম্বুলেন্সে কল দিল। যেন কিছুই হয়নি।
যেন এইমাত্র দুজন মানুষকে গুলি করা নারীটা পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত মানুষ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp