“কিরে থার্ড পার্টি…!”
কথাটা কানে যেতেই মাহাদীর ঠোঁটের কোণের হাসিটা মিলিয়ে গেল। এক মুহূর্তে সে থমকে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে অভ্রের দিকে তাকাতেই
দু’জনের চোখে চোখ পড়ে। চারপাশের কোলাহল যেন আচমকা স্তব্ধ হয়ে যায়।
মাহাদী ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। তারপর বলে উঠল—”থার্ড পার্টি তুই নাকি আমি..?
সময় হলেই দেখবি। তখন কেঁদে কুল পাবিনা।
শুনেছি কুকুরের লেজ নাকি কখনও সোজা হয় না। তুইও ঠিক তেমনই একটা মানুষ।
আমার পিছনে ঘেউ ঘেউ না করে, চুপচাপ আমার পা চাট। তাহলে হয়তো তোর পেটের ক্ষুধাটা মিটিয়ে দিব।”
কথাগুলো বলার সময় মাহাদীর চোখেমুখে ছিল তীব্র বিদ্রূপ আর স্পষ্ট অবমাননা। তার দৃষ্টি সরাসরি অভ্রের চোখে স্থির, যেন ইচ্ছে করেই তাকে উসকে দিচ্ছে।
আর সেই মুহূর্তেই অভ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। মুঠোবন্দী হাতের রগগুলো পর্যন্ত ফুলে ওঠে প্রবল রাগে।
অভ্রের মুখের ভাব মুহূর্তেই পাল্টে গেল। চোখেমুখে নেমে এলো কঠোরতা আর দমবন্ধ করা রুক্ষতা।
এক ঝটকায় সে মাহাদীর কলার চেপে ধরে গলা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ঠেলে পিছিয়ে নিতে নিতে সোজা দেয়ালের সাথে গিয়ে আটকে ফেলল।
দেয়ালে ধাক্কা লাগার শব্দে চারপাশ থমকে যায়। অভ্র ঝুঁকে এসে দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে থাকে মাহাদীর চোখের দিকে, আর অভ্রর বুক রাগে ওঠানামা করতে থাকে দ্রুত।
অভ্রের রাগ দেখে মাহাদীর ভেতরে এক ধরনের বিকৃত শান্তি কাজ করছিল। ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি টেনে সে অভ্রের চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল, যেন ইচ্ছে করেই আগুনে ঘি ঢালছে।
কিন্তু হঠাৎই অভ্র হেসে উঠল। সেই হাসিতে উষ্ণতা ছিল না, ছিল ঠান্ডা তাচ্ছিল্য।
মাহাদীর কলার ছেড়ে দিয়ে সে মুখটা তার একেবারে কাছে এনে বলল—
“কুকুরের স্বভাবও তোর মতো কিছু মানুষের চেয়ে হাজার গুণ ভালো, রাসকেল। ওরা অন্তত মালিকের সাথে বেইমানি করে না… পেছন থেকে ছোবলও মারে না।”
আবার বলল,
— “আর তুই? তুই তো মশার সমানও না। মশা অন্তত কামড় দিয়ে রক্ত নিয়ে উড়ে যায়। আর তুই শুধু রক্ত খেয়েই নয়, রক্তের ভিতর সাঁতার কাটতে চাস। এটাই তোর আসল ব্যক্তিত্ব।
তোর মতো একটা বা*লের কথায় আমার কিছুই যায় আসে না। কারণ তোর অস্তিত্বটাই আমার কাছে আবর্জনার চেয়েও নিকৃষ্ট। অন্তত আবর্জনা চোখের সামনে পড়ে থাকে, তুই তো মানুষের পিঠ পিছনে লুকিয়ে ছোবল মারিস।
তোকে তো আমি দুই হাতে চাপড় মেরে এক মুহূর্তেই শেষ করে দিতে পারি। তাই আগেই বলছি, আমার আর রাহার থেকে দূরত্ব বজায় রাখবি। আর বাকিদের সাথে আমার কোনো লেনা দেন নেই।
দাঁতে দাঁত চেপে কথা গুলো ছুঁড়ে দিয়েই অভ্র জোরে একটা ধাক্কা দিল মাহাদীকে। তারপর আর একবারও পিছনে না তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ভেতরে চলে গেল।
এতিমখানার ভেতরে ঢুকতেই অভ্র দেখলো,
কাপড় বিলানো শেষ—চারপাশে কিছু শিশু নতুন পোশাকে ছোটাছুটি করছে, কারও মুখে হাসি, কারও চোখে কৌতূহল।
এক পাশে কাজের ব্যস্ততা থেমে গেছে, শুধু শেষ মুহূর্তের গুছানোর শব্দ ভেসে আসছে।
টেবিলে আলাদা করে রাখা তিনজনের খাবার—রাহা, অভ্র আর মাহাদীর জন্য। আরাফ শিকদার আগেই খাওয়া শেষ করে একপাশে বসে আছেন, শান্ত ভঙ্গিতে পুরো পরিবেশটা পর্যবেক্ষণ করছেন। সব মিলিয়ে জায়গাটা নীরব হলেও একটা ব্যস্ত দিনের পরের প্রশান্ত ভারী আবহে ভরে ছিল।
আরাফ শিকদারের এতিমখানায় আসতে সবসময়ই এক ধরনের আলাদা টান কাজ করে। বাইরের ব্যস্ত পৃথিবীটা এখানে ঢুকলেই যেন একটু থেমে যায়।
ছোটবেলাতেই এতিম হয়ে যাওয়ার কারণে এই পরিবেশটা তাঁর কাছে শুধু একটা জায়গা না—এটা এক ধরনের স্মৃতি, এক ধরনের ফিরে পাওয়া অনুভব। বাচ্চাদের হাসি, তাদের ছোট ছোট দৌড়ঝাঁপ, এমনকি নিরব কোণায় বসে থাকা নিঃশব্দ মুখগুলোও তাঁর কাছে পরিচিত লাগে।
আগে সুযোগ পেলেই তিনি এসে সময় কাটাতেন। কখনও বাচ্চাদের সাথে বসে কথা বলতেন, কখনও তাদের ছোট ছোট আনন্দ ভাগ করে নিতেন। তাদের চোখের সরলতা দেখলে নিজের ভেতরের ভারও কিছুটা হালকা হয়ে যেত।
খাওয়া শেষ হলে তিনি সাধারণত পুরো এতিমখানাটা একবার ঘুরে দেখেন। কোথাও কোনো সমস্যা আছে কি না, বাচ্চাদের প্রয়োজন ঠিকমতো পূরণ হচ্ছে কি না—সবকিছু এক নজরে দেখে নেন। তারপর ধীরে ধীরে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নেন, কিন্তু তখনও মনটা কিছুক্ষণ এখানেই থেকে যায়।
তার বাসা থেকে বিশমিনিটের রাস্তা। কাছে হওয়ায় প্রতি শুক্রবার বিকেলে একবার হলেই এসে সময় কাটিয়ে যান
রাহা খেতে চায়নি, কিন্তু তবুও তবারক নাকি অল্প হলেও খেতে হয় তার মা বলেছে।
সে চেয়ার টেনে বসতেই যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পাশে এসে বসে পড়ে মাহাদী।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই অভ্র এগিয়ে আসে। এক ঝটকায় রাহার হাতটা ধরে তাকে নিজের দিক টেনে নিয়ে একটু দূরে সরিয়ে নেয়। তারপর দ্রুত আরেকটা চেয়ার টেনে এনে তাকে বসিয়ে দেয়, আর নিজেও পাশের চেয়ারে বসে পড়ে।
রাহার একহাত ধরে টান দেয়ার সময় অপর হাত গ্লাসে লেগে গ্লাসভর্তি পানি গিয়ে পরে মাহাদীর শার্টে।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যায় যে রাহা পুরোটা বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তটি শেষ হয়ে যায়।
রাহা তখনও বুঝে উঠতে পারছে না কী হলো..!—চোখ বড় বড় করে শুধু একবার অভ্রের দিকে, আরেকবার পাশে তাকায়।
তার দৃষ্টিতে বিস্ময়, অস্বস্তি আর প্রশ্ন মিশে একসাথে জমে থাকে, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বের করে না।
আর এদিকে মাহাদী রাগে জ্বলতে জ্বলতে টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ে।
ঠিক তখনই অভ্র একটি প্লেটে খাবার তুলে রাহার সামনে এগিয়ে দেয়।
“ফাস্ট খাইয়ে দেয…!”
হঠাৎ এমন কথায় রাহা পুরোটা থমকে যায়। অবাক চোখে ডাগর ডাগর দৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘন পাপড়িযুক্ত চোখ দুটো কখনও বড় হয়ে খুলছে, কখনও আবার পলক পড়ছে দ্রুত।
এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অভ্র হালকা ধমকে বলে ওঠে—
“এই গাধী। এভাবে তাকিয়ে থাকতে বলেছি?
নাকি খাওয়াতে বলেছি!”
রাহা চারপাশে একবার চোখ বুলায়—বাড়ির কেউ খেয়াল করছে কি না দেখার জন্য। দেখে, সবাই সামনে ব্যস্ত, কেউই এদিকে মনোযোগ দিচ্ছে না।
একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে প্লেটের দিকে এগোতেই…
—“এই গাধী!
তোর হাত ধোয়া??”
রাহা চোখ গোল গোল করে বলল—
—“সময় দিয়েছেন ধুতে??”
অভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই রাহা আবার খাবার এগিয়ে দিল।
—“তাই বলে এই ময়লা হাতেই খাইয়ে আমার পেট খারাপ করার চিন্তা ভাবনা করছিস নাকি..?”
—“একটু পেট খারাপ হলেই কি বা হবে?”
—“তুই কি চাস তোর বাবুর আব্বুর পেট খারাপ হয়ে ছটফট করুক??”
কথাটা শুনেই রাহা হঠাৎ বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করল।
—“খুকখুক… ক-কী বললেন আপনি…?!”
অভ্রও বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি গলা খাঁকারি দিল। তারপর স্বাভাবিক ভান করে বলল—
—“মানে… এই যে… ভবিষ্যতে যখন বিয়ে হবে, তখন তো বাবু-টাবুর আব্বুই হব! সেই কথাই বললাম।”
রাহা কড়া চোখে তাকিয়ে বলল—
—“তাহলে এটা বলেন কেনো যে আমার বাবুর আব্বু?”
অভ্র এক মুহূর্ত থেমে গেল। তারপর হালকা হাসি টেনে খুব স্বাভাবিকভাবে বলল— “আমি পাগল নাকি..? যে তোর বাবুর হবো।
আমার বাবুর হবো। চুপ করে খাওয়া গাধী।”
অভ্র ফিসফিস করে বলল—
—“এমনি তো চাইবি না তোর ভালোবাসায় ছটফট করি। যদিও আমি শুধু তোর ভালোবাসাতেই মিশে আছি।”
কথাটা শেষ হতেই অভ্র আর দেরি না করে রাহার ডান হাতটা আলতো করে টেনে নিল। পানির নিচে নিয়ে ভালো করে ধুয়ে দিতে দিতে শান্ত গলায় বলল—
—“নে, জলদি খাওয়ানো শুরু কর।”
রাহা ভদ্রভাবে অভ্রকে খাইয়ে দিচ্ছে, আর অভ্রও আরাম করে খেয়ে নিচ্ছে—মুখে একদম সন্তুষ্টির ভাব। তৃপ্তি সহিত খাচ্ছে নিজের প্রিয়
জানের হাতে।
রাহাও ভদ্র মেয়ের মতো খাইয়ে দিচ্ছে অভ্র ও নিজের প্রাণ আর পেট ভরে আয়েশে খাচ্ছে।
আর মাহাদীকে দেখিয়ে দেখিয়ে মুখের এক্সপ্রেশন দিচ্ছে, উফস সেই মজা।
জাস্ট লুকিং লাইক অ্যা ওয়াও।’
ওদিকে মাহাদী দূর থেকে তাকিয়ে আছে,এসব দেখে রীতিমতো ফুলছে চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি আর বিরক্তি।
কখনো চুপ, কখনো মুখ শক্ত করে ফেলছে—ভেতরে ভেতরে যেন ফেটে যাচ্ছে।
অভ্র সেটা খেয়াল করেই হালকা বাকা হাসি দিল। তারপর শান্ত কিন্তু টানটান গলায় বলল—
—“তোর জ্বলবে, আমার তাতেই চলবে।’
হায় তোর জ্বলবে ,আমার তাতেই চলবে।”
রাহা এক মুহূর্ত থমকে অভ্রের দিকে তাকাল,
আর ভাবছে এই লোকটা পাগল হয়ে গেলোনাতো?
কি আবল তাবল বকছে…!
অভ্র রাহার দিক তাকিয়ে মেকি হাসি দিয়ে আবার স্বাভাবিক হয়ে খাবার খেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল—যেন কিছুই হয়নি, শুধু খেলাটা তার নিজের নিয়ন্ত্রণেই চলছে। এই কাহিনী গুলো সে বেশ এনজয় করেছে।
অভ্র রাহার দিকে তাকাতেই শান্ত গলায় বলল—
—“এভাবে তাকানোর কি আছে? খাবারটা তো সত্যিই অনেক সুন্দর।”
রাহা একদম একই ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল।
তারপর অভ্র একটু কড়া গলায় বলল—
—“এই তুই ,কি মনে করলি?
তোকে বলেছি? আমার বয়েই গেছে তোকে বলতে। তোর মতো বিচ্ছিরি আছে নাকি একটাও!”
অভ্র কিছু বলার আগেই রাহা মুখ ভেংচি দিয়ে তারই নকল করে বলল—
—“তোর মতো বিচ্ছিরি আছে নাকি একটাও!”
বলেই সে খাবার রেখে ঝট করে উঠে দাঁড়াল, তারপর হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বলল—
—“ঠিক আছে, সুন্দরীদের হাতেই খেয়ে নিন। আমি গেলাম।”
রাহার অভিমানটা বুঝতে পেরে অভ্রের মুখে আপনাতেই হালকা হাসি ফুটে উঠল। তার ভেতরে একধরনের শান্তি কাজ করছিল—রাহার এই ছোট ছোট রাগগুলোও যেন তারই দিকে টানছে।
রাহা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বেসিনের দিকে গিয়ে হাত ধুতে ধুতে নিচু স্বরে বিরবির করল—
—“শালা, খিবীশ। নিজেই ডেকে এনে আবার নিজেই এমন করিস। পরে কিছু বলিস আবার, তখন মুখ ভেঙে দিবো। আমি তো সুন্দর না, তুই সুন্দর নিয়েই থাকিস। তোর কপালে খবিস বউ ঝুটবে দেখিস। আমাকে বিচ্ছিরি বলা তাই না। তোকে যদি আমি পুকুরের পানিতে না চুবিয়েছি আমার নাম ও রাহা নয়। হু….বলেই চলে যেয়ে নিতেই..।
পেছন থেকে অভ্র স্বাভাবিক গলায় বলে উঠল—
—“কথায় আছে, পড়ল কথা গায়ের মাঝে, যার কথা তার গায়েই লাগে।”
কথাটা শুনেই রাহা তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
আর ঠিক তখনই অভ্র হালকা হাসি দিয়ে তার দিকে একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দেয়।
রাহা এক সেকেন্ড থেমে গেল। তারপর রাগ আরও বাড়িয়ে মুখ ঘুরিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়—কিন্তু চোখে রাগের আড়ালে লুকোনো অস্থিরতা স্পষ্ট।
রাহা মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতেই কয়েকটা মুহূর্ত অভ্র চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে সেই হালকা হাসিটা তখনও রয়ে গেছে।
সে ধীরে ধীরে বেসিনের দিকেই তাকাল, তারপর শান্ত গলায় নিজের মনে বলল—
—“রাগলে আমার জানটাকে আরও বেশি সুন্দর লাগে।”
রাহা গটগট পায়ে হেঁটে এসে এক কোণায় দাঁড়াল। মুখটা ফুলে ছোট্ট বাচ্চাদের মতো হয়ে আছে। হাত দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে নিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
অভ্র দূর থেকেই তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। তার চোখেমুখে স্পষ্ট দুষ্টুমি।
হঠাৎ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট একটা মেয়ে রাহার ওড়না টেনে বলে উঠল, “আপু… আপনি রাগ করছেন?”
রাহা জোর করে হাসল। “না তো।”
বাচ্চাটা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “মিথ্যা। রাগ করলে আমার আম্মুও এমন মুখ বানায়।”
কথাটা শুনে আশেপাশের কয়েকজন বাচ্চা হেসে উঠে। রাহা অপ্রস্তুত হয়ে যায়।
আর এদিকে অভ্র হাসি চেপে রাখতে না পেরে মাথা নিচু করে ফেলে।
রাহা সাথে সাথে কটমট করে তাকায় তার দিকে। সেই চোখ দেখেও অভ্রের হাসি যেন আরও বেড়ে যায়।
এর মাঝেই তরিকুল নামের একটা ছেলে এসে বলে উঠল, “ভাবি… ভাই তো আর খাচ্ছে না। আপনি চলে আসার পর থেকে শুধু প্লেট নাড়াচাড়া করছে।”
ছেলেটির মুখে “ভাবি” ডাকটা শুনে রাহার মুখটা একেবারে হাঁ হয়ে গেল।
চমকে উঠে সাথে সাথেই সে বলে উঠল— “এই ছেলে, এসব কি বলছো?”
ছেলেটি বলে ঠিকই বলেছি..বলেই দৌড়।
পাজি ছেলে তোকে একবার পাই হাতে কাছে..!
রাহা ভ্রু কুঁচকে তাকাল অভ্রের দিকে। দেখল সত্যিই লোকটা চুপচাপ বসে আছে। তবে চোখ ঠিকই তার দিকেই।
রাহার বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে আসে। কিন্তু মুখে রাগ বজায় রেখেই ধীর পায়ে এগিয়ে গেল।
অভ্র তাকে আসতে দেখেই ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল, “ওমা… সুন্দরী আবার ফেরতও আসে নাকি?”
রাহা দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল, “আর একটা কথা বললে এই প্লেট মাথায় ভাঙব।”
“ভাঙ। তোর হাতে মার খেতেও শান্তি লাগে।”
রাহা থমকে যায়। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখের রাগটা কেমন এলোমেলো হয়ে পড়ে। আমি না বিচ্ছিরি..!
আবার সুন্দরী বলেন কেনো..?
অভ্র তখন একটু ঝুঁকে নিচু স্বরে বলে, “রাগ করলে তোকে আরও বেশি সুন্দর লাগে উফস না না বিচ্ছিরি।”
রাহা এবার সত্যিই লজ্জা পেয়ে যায় সাথে একটু অভিমান ফুটে উঠে। অভ্রের আচরণগুলো রাহার কাছে আর আগের মতো সাধারণ লাগে না।
সে না বললেও, না বোঝানোর চেষ্টা করলেও—অভ্রের ছোট ছোট ইঙ্গিতগুলো রাহার চোখ এড়িয়ে যায় না।
কখনো তার একটু বেশি খেয়াল রাখা, কখনো অকারণে কাছে চলে আসা, আবার কখনো হালকা রাগ-ঠাট্টার ভেতরে লুকিয়ে থাকা যত্ন—সবকিছুই রাহার মনে আলাদা একটা ভাব তৈরি করে।
রাহা পুরোপুরি বুঝে ফেলে না, তবু অনুভব করতে পারে—অভ্রের ভেতরে তার জন্য কিছু একটা আছে, যা সে ঠিক প্রকাশ করছে না।
আর এই না বলা কথাগুলোই ধীরে ধীরে রাহার মনেও একটা অদ্ভুত টান তৈরি করে দিচ্ছে।
রাহা চারপাশে তাকিয়ে দ্রুত চেয়ারে বসে পড়ে। তারপর গম্ভীর মুখ করে খাবার এগিয়ে দেয় অভ্রের দিকে।
“চুপচাপ খান।”
অভ্র বাধ্য ছেলের মতো মুখ খুলে খেতে থাকে। তবে পুরো সময়টা তার চোখ ছিল শুধু রাহার মুখে।
দূর থেকে মাহাদী পুরো ঘটনাটা চুপচাপ দেখছিল একনাগাড়ে। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু ভেতরের চাপটা স্পষ্ট—চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, আর হাত দুটো অজান্তেই মুঠো হয়ে গেছে। ভেতর থেকে চাপা একটা রাগ নিয়ে মাহাদী নিজেই নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলো—
“কালকের মধ্যে তোকে আমি দেখাচ্ছি আসল মজা।”
—————
সবাই মিলে এতিমখানা ঘুরে দেখার পর ফেরার সময় গেটের বাইরে আইসক্রিমের স্টলটা দেখে রাহার চোখ থেমে গেল।
অভ্র সেটা খেয়াল করেই শুধু একবার তাকাল, তারপর কোনো কথা না বলে গাড়িটা একটু ঘুরিয়ে বলল,
“ভিতরে নিয়ে আসো।”
বিক্রেতা একটু অবাক হলেও রাজি হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটা ভেতরে এসে থামল। বাচ্চারা হঠাৎ এমন দৃশ্য দেখে কৌতূহলে চারপাশে জড়ো হয়ে গেল।
অভ্র নিজে সামনে দাঁড়িয়ে সবকিছু সামলাতে লাগল। একে একে আইসক্রিম বের করে বাচ্চাদের হাতে দিতে শুরু করল। ছোট ছোট মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল, কেউ আনন্দে লাফাচ্ছে, কেউ আবার লাজুকভাবে চুপচাপ খাচ্ছে।
রাহা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল। অভ্র শুধু তাকে না, পুরো বাচ্চাদের জন্যই মুহূর্তটা সুন্দর করে তুলছে—এটা দেখে তার চোখে অজান্তেই নরম একটা ভাব চলে এল।
রাহা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল। অভ্র শুধু তাকে না, পুরো বাচ্চাদের জন্যই মুহূর্তটা সুন্দর করে তুলছে—এটা দেখে তার চোখে অজান্তেই নরম একটা ভাব চলে এল।
অভ্রকে বাচ্চাদের মাঝে আইসক্রিম বিলাতে দেখে তার পরিবার কিছুক্ষণ চুপ হয়ে গেল।
বাবা দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে চশমাটা একটু ঠিক করলেন। মুখ শক্ত থাকলেও চোখে অবাক ভাব স্পষ্ট। ধীরে বললেন,
“এটা ও নিজে করছে ?”
মা প্রথমে একটু চমকে গেলেও পরে বাচ্চাদের হাসি দেখে তার মুখ নরম হয়ে এলো। তিনি নিচু স্বরে বললেন,
“আমার ছেলেটা এমনও হতে পারে।”
সাথী বেগম পাশে দাঁড়িয়ে সবটা দেখে হালকা হাসলেন।
“অভ্রকে এভাবে আগে তো দেখিনি।ছেলেটার মধ্যে এই দিকটাও আছে বুঝিনি।”
আরেক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আসান খান। তিনি কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। অভ্রের এমন আচরণে তার ভেতরে প্রথমে বিস্ময়, তারপর একটা সন্তুষ্টি মিশে গেল। ধীরে ধীরে বললেন,
“ছেলেটা শুধু নিয়ম জানে না।মানুষও বুঝতে শিখছে।”
অভ্র বাচ্চাদের মাঝে আইসক্রিম বিলাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই হঠাৎ ভেতর থেকে ছোট ছোট পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আয়রা আর জায়রা দূর থেকে আইসক্রিমের গাড়িটা দেখে আর থেমে থাকতে পারল না। দু’জনই হেসে ছুটে এল, চোখে মুখে উচ্ছ্বাস—যেন এই মুহূর্তটাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ।
“আইসক্রিম! আইসক্রিম!”—ছোট ছোট গলায় তারা একসাথে বলে উঠল।
অভ্র তাদের দিকে তাকিয়ে একটু থামল, তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই দুটো আইসক্রিম হাতে তুলে দিল। আয়রা-জায়রা পেয়ে খুশিতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠল।
আর অভ্র তখনও বাচ্চাদের মাঝে ব্যস্ত, যেন পরিবারের সেই নীরব নজরদারিটাও তার অজানা।
আয়রা-জায়রার হাসি আর বাচ্চাদের ভিড়ের মাঝখানে হঠাৎই অভ্রের পরিবার এগিয়ে এলো।
পরিচিত মুখগুলো সামনে আসতেই অভ্রের আচরণ পাল্টে গেল। আগের সেই স্বাভাবিকতা মিলিয়ে গিয়ে মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল, চোখে যেন একটা দূরত্ব নেমে এলো।
সে খুব স্বাভাবিক কিন্তু ঠান্ডা গলায় রাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাকি গুলো তোর।”
বলেই গাড়ীর দিক চলে যায়।
রাহা কিছুটা চমকে গেল। মুহূর্ত আগে যেখানে সবকিছু সহজ আর হালকা লাগছিল, এখন আচমকাই পরিবেশটা কেমন বদলে গেছে।
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, মনে মনে ভাবল—
“এখনই তো সব ঠিক ছিল। হঠাৎ করে এমন কী হয়ে গেল?”
—————
আষাঢ়ের উন্মাদ বর্ষণ তার বাঁধ ভেঙে বয়েই চলেছে। আকস্মিক মেঘের গর্জনে ধরণী ভেদকরে নামতে শুরু করলো বৃষ্টির ধারা। নিজের বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের পানে মুখ তুলে চোখ বন্ধ করে সেই মুহূর্ত অনুভবে ব্যস্ত রাহা।
তার মনে হচ্ছে পিছন থেকে দুটি হাত এসে তার মেদহীন কোমরখানা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। আকস্মিক এহেন কাণ্ডে কারো এতো কাছাকাছি আসার সংকেত তার স্নায়ুতে সংকেত পেতেই রাহার বক্ষপিঞ্জরে অবস্থিত হৃদপিণ্ডটি চলন্ত ট্রেনের ন্যায় বাঁধনহারা হয়ে ছুটছে। রাহা রেলিং ধরা হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরলো।
তৎক্ষণাৎ আকস্মিক একটা থাপ্পড় এসে গালে পড়ল.,
ঠাস……..
·
·
·
চলবে……………………………………………………