প্রেমালাপ - নাবিলা ইষ্ক - অনু গল্প

‘মায়া? মায়া তো, রাইট? মায়া না?’

মায়া বাজারের ব্যাগটা আরও শক্ত করে ধরল। আড়চোখে চেয়ে নিজের ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মুখটা আড়াল করতে চাইল। কিছুক্ষণ তো একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। ভদ্রলোক পুনরায় ডাকল -

‘এইযে, আপনি মায়া না? হ্যালো? মায়া! মায়া!’

আপনি! কী অপরিচিত ডাকটা শোনাল! আর কথার ধরন কেমন! যেন সত্যি মায়াকে চেনেনি। আসলেই কী? হতেও পারে! যেসব অনুভূতি ভুলতে তার বছর বছর লাগল তা একমুহূর্তে ফিরে এলো চোখের পাতায়। না, ওসব আর ভাবা যাবে না। ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে আছে মায়া। রোদে পুড়ে গায়ের রং-টা বেশ কালো লাগছে আজ। কাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে এলাকার বাজার কাদামাটিতে চিটচিটে হয়ে ছিলো। সেই কাদাপানিতে হেঁটে হেঁটে বাজার সেরেছে। কাদামাটিতে পা দুটো দেখার মতো অবস্থাতে নেই। জামা-পাজামার নিচের অংশ নষ্ট হয়েছে। তারওপর আবার এক পায়ের জুতো ছিঁড়ে গিয়েছে। ছিঁড়ে জুতো পরেই খুঁড়ে খুঁড়ে হাঁটছিল সে। অথচ অপরজন ফরমাল স্যুটে বেশ ঝকঝকে পরিপাটি পুরুষটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মায়ার অস্বস্তি গাঢ় হলো। এতো চমৎকার পুরুষের সাথে কথাটুকু বলাও যেন তার মতন কাউকে মানায় না এমন বাজে অনুভূতিতে গলা রোধ হয়ে এলো। নিজের জন্য এযাত্রায় বড্ড মায়াই হলো তার। দীর্ঘশ্বাস লোকাল, জোরপূর্বক হাসল ভীষণ স্বাভাবিক ভাবে ফিরে বলল -

‘হ্যাঁ…লাবিব তো আপনি! চিনেছি। ভালো আছেন?’

লাবিব প্রশ্নের উত্তর করল না। ব্যস্ত হয়ে হাত বাড়িয়ে বাজারের ব্যাগটা নিতে চাইল -

 ‘দিন আমার কাছে দিন ব্যাগটা। আমি হেল্প করছি। কখন থেকে ডাকছিলাম, আপনি শুনছিলেন না। ভাবলাম হয়তোবা আমায় চিনতে পারেননি নাকি আমি চেনায় ভুল করলাম।’

ভীষণ স্বাভাবিক কণ্ঠ, স্বাভাবিক আচরণ! মায়া ব্যাগটা সরাল, দিলো না। লাবিবের পেছনে একটা সাদা রঙের প্রাইভেট গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে একটা সুন্দরী মেয়ে বেরিয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্রই। এযাত্রায় ডাকল -

‘লাবিব!! আর কতক্ষণ!’

মায়া এখানে আর একমুহূর্ত দাঁড়াতে পারবে না। দমটা বন্ধ হয়ে আসতে পারে। কোনোরকমে সৌজন্যে হেসে বলল -

‘আপনাকে ডাকছে। আসি তাহলে।’

মায়া ওখানে আর একমুহূর্ত দাঁড়ায় না। লাবিবের জবাবও শোনার প্রয়োজনবোধ করে না। তড়িঘড়ি করে হাঁটা ধরেছে। জুতোটা ছেঁড়া বলে দ্রুত হাঁটতে অসুবিধে হলো। যখন বুঝল লাবিব তাকে আর থামানোর চেষ্টা করেনি, আটকে রাখা দমটুকু ছাড়ল। একটা রিকশা থামিয়ে উঠে পড়ল চটজলদি। অন্যসময় হলে সে এতটুকু পথ হেঁটেই যেতো। তবে এই অবস্থায় আজ আর ইচ্ছে করছে না। রিকশা চলছে হেলেদুলে। বাতাস গা ছুঁতেই আজ আর প্রশান্তিতে ভরল না মায়ার মন। বরঞ্চ ইচ্ছে করল একটাবার ফিরে তাকাতে। কিন্তু তা সে করল না। তাকাল না। শক্ত করল নিজের মনকে। সোজা চেয়ে থাকল। হঠাৎ পাশ থেকে কেউ ডাকল -

‘মায়া!’

মায়া চমকে উঠে তাকাল। সাদা গাড়িটা তাদের রিকশার পাশে চলছে। কাঁচ নামানো। লাবিব ধীরে ধীরে ড্রাইভ করতে করতে চোখমুখ কুঁচকে চেয়ে আছে তখনো -

‘ঠিকভাবে কথাবার্তাই তো হলো না। এভাবে চলে এলেন কেনো! আপনার নাম্বারও তো দিলেন না। কতো বছর পরে দেখা হলো বলুনতো। একদিন ক্যাফেতে বসি। কফি খেতে খেতে গল্প করা যাবে।’

মায়া দ্রুতো বলল, ‘গ্রামে যাবো তো। সময় হবে না।’

‘কবে যাচ্ছেন? ফিরছেন কবে? কদিন থাকবেন? নাম্বার দিন মায়া। সময় করে একটা ডেট আপনার টাইম মতো ফিক্সড করে নেবো নাহয়।’

কী সুন্দর বাংলা বলছে লাবিব! যুবক বয়সে বেশিরভাগ সময়ে ইংরেজিতে ফটরফটর করতো। রাগলে ইংরেজি বেশি বলতো। ফর্সা চেহারা লাল হয়ে উঠতো। মায়ার তাকে রাগাতেও ভীষণ ভালো লাগতো। লাবিব তখনো জবাবের আশায় গাড়ি্র গতি ধীর করে চলেছে। মায়া এবারে ভীষণ লজ্জিত মুখে জানাল -

‘আসলে আমার বাটন ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে।’

লাবিব বোধহয় থমকেছে। বুঝেছে নিশ্চয়ই? বিরক্ত নিশ্চয়ই? আত্মসম্মানে লেগেছে খুব? লাগার কথা। মায়া তো তাই চাইল। চলে যাক। কিন্তু তা হলো না। লাবিবের বোধহয় ধৈর্য্য বেড়েছে, আত্মসম্মান কমেছে। ঘাউড়ামি করে গেলো -

‘আন্টির নেই? আপনার বাসার কেউ বুঝি ফোন চালায় না মায়া?’

মায়া স্বাভাবিক থাকল ওমন পিঞ্চ মারা কথাগুলো শুনেও। বলল, ‘বড়ো আপুর আছে।’

‘দিন তবে, আপনার বড়ো বোনের নাম্বারটাই দিন।’

মায়া সামান্য ইতস্তত করল, ‘আপু তো আমাদের সাথে থাকেন না।’

‘ঠিকাছে। আমার হাতে সময় আছে। আপনার বাসা তো মনে হয় কাছেই। বাসাটা দেখে যাই। পরে না-হয় বাসার সামনে এসে খোঁজ নেব?’

মায়া থমকাল। তাকাল সামনে তাকিয়ে রিকশার ভীষণ কাছে ড্রাইভ করতে থাকা লাবিবকে। পরিবর্তন হয়েছে খুব। চেহারা জুড়ে বাচ্চাবাচ্চা ভাবটা আর নেই। থাকবেই বা কীভাবে? কোথায় ইন্টারের যুবক আর কোথায় এখন কর্পোরেট জব করা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ! মায়া দৃষ্টি সরিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে নিজের নাম্বারটা বলল। লাবিব একহাতে ড্রাইভ করতে করতে অন্যহাতে নাম্বার তুলল তার ফোনে, কল করল। মুহুর্তে মায়ার মুঠোফোনটা বেজে ওঠে।

‘মামণি কলটা ধরো না! ও মামণি কলটা ধরো না।’

মায়ার হৃৎপিণ্ড ধড়ফড়িয়ে উঠল। ফোনটা দ্রুতো সাইলেন্ট করতে করতে লজ্জায় কিছুটা বিচলিতও হলো। বোনপুতের পছন্দের রিংটোন দেয়া নিয়ে আগে কখনো লজ্জা না লাগলেও, আজ বড্ড লজ্জা পেয়েছে সে। লাবিবের খসখসে পুরুষালী কণ্ঠের হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে কানের কাছটায়। মায়া মনেপ্রাণে চাইল, লোকটা চলে যাক। লাবিব ডাকে -

‘মায়া…’

ওই ডাকে কী ছিলো মায়ার জানা নেই। কিন্তু তার পুরো শরীর জমে গেলো। চোখের পাতায় ভাসল সহস্র স্মৃতি। চোখজোড়া ভাসা ভাসা হয়ে এলো। ভুলেও ফিরে তাকাল না। শুধু শক্ত করে ধরে থাকল বাজারের ব্যাগটা -

‘আমার কল ধরবে তুমি, মায়া। কল ধরবে তুমি। আমি কল করব রাতে। ডিড ইউ হিয়ার?’

মায়া চোখ বুজল শক্ত করে! এই কণ্ঠে ঠিক সেই আগের মতন অধিকারবোধ। যেই কণ্ঠ কলেজ জুড়ে ঘোষণা দিয়ে বেড়াতো -

‘মায়া.. মায়া আহমেদ রাত — সাইন্সের স্টুডেন্ট, রোলনম্বর ০০০ ইজ মাই ফিউচার ওয়াইফ। বয়েজ শুড মেইনটেইন দেয়ার ডিসট্যান্স ফ্রম হার। নাহলে নাকমুখ ফাটাব আমি, আমি লাবিব আজওয়াদ। মনে রাখা হয় যেন সবার।’

এইমুহূর্তে মনে হলো না বছর বছরের কোনো দূরত্ব তাদের মধ্যে ছিলো! মায়া জবাব দিলো না। উল্টো আস্তে করে রিকসাওয়ালাকে বলে -

‘মামা, দ্রুতো চলেন।’

রিকশা দ্রুতো এগুচ্ছে, পাল্লা দিয়ে প্রাইভেট গাড়িটাও। লাবিব কিছুক্ষণ একটা শব্দ উচ্চারণ করে না। যখন করে মায়ার শরীর কেঁপে ওঠে। বাধভাঙ্গা কান্নারা কণ্ঠনালীতে চেপে বসে -

'আমার থেকে ভাগতে ভাগতে আরশিনগর এসেছেন। আমি বেহায়ার মতো তাড়া তাড়া করতে করতে এখানেও এসে পৌঁছেছি। আপনি বোধহয় চান এমন তাড়া করতে করতে আমি ম রে যাই। তাইতো?’

মায়া মাথাটা বাঁকিয়ে মুখ আড়াল করে রাখল। দেখাল না চোখের জলে ভিজে যাওয়া মুখ। গাড়িটা দৃষ্টির আড়াল হতেই মায়া কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার কান্নার শব্দে চমকেছেন রিকশাওয়ালা মামা। ভদ্রলোক একবার ফিরে তাকালেন। ওমন করুণ ভাবে কাঁদতে দেখে বললেন -

‘মনোমালিন্য হইছে বুজি?’

মায়া ওড়না দিয়ে চোখ মুছল মুহূর্তে। স্বাভাবিক হয়েছে। তবে ভেতরটা অশান্ত হয়ে থাকল। যেভাবে কিশোরী মায়ার হৃৎপিণ্ড লাফাতো। ওভাবেই হৃৎপিণ্ড লাফাল। কিন্তু মায়া ত আর কিশোরীটি নেই। বাচ্চাকালের প্রেমটা আজও বুঝি এমন বুক ধড়ফড় করাতে পারে? আচ্ছা, লাবিব কী বোঝাল? ও কি এতো বছর খোঁজ নিয়ে বেড়িয়েছে তার? বিয়ে কি করেনি? পাশের মেয়েটা কি ওর স্ত্রী নয়? হতেও পারে। বয়স তো কম হলো না। ভালো পরিবারের ছেলে। বাবার অর্থসম্পদও তো ভালোই ছিলো। পড়াশোনা শেষ করে দারুণ পর্যায়ের জব করছে। আর মায়া? মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অসুস্থ বাবা, বৃদ্ধা মা আর ডিভোর্সি বোন, বোনের ছেলেমেয়ের সাথে দিন চলে যাচ্ছে কোনোরকমের। মায়ার আফসোস নেই। সে যা করেছিল, ভালোর জন্য করেছিল। লাবিবের ভালোর জন্যই। লাবিব তার মতন কাউকে ডিজার্ভ করে। মায়ার মতন এমন হতদরিদ্রদের জন্য প্রেম-ভালোবাসা তো নয়। এসব বিলাসিতা। তার রয়েছে অনেক দায়িত্ব! 

—————

শুভ্রা এসে দাঁড়াল দুয়ারের কাছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল মায়ার নিষ্প্রাণ মুখ। চেয়ারে থম মেরে বসে আছে। ফোনটা বেজে বেজে ক্লান্ত হয়ে আপনাআপনি বন্ধ হচ্ছে। ফের বাজা শুরু করেছে। আধঘণ্টা ধরে কেউ একজন সমানে, বিরতিহীন কল করে যাচ্ছে। শুভ্রা প্রবেশ করল নিঃশব্দে। এসে দাঁড়াল ছোটো বোনের পেছনে। মায়া তার অস্তিত্ব তখনও উপলব্ধি করেনি। নিজের ভাবনাতেই বিভোর। 

‘কাকে এভাবে এড়াচ্ছিস? লাবিব নাকি?’

মায়া চমকে তাকাল। ছোটোবোনের এমন ভয়াবহ আশ্চর্যান্বিত মুখ দেখে মৃদু হাসল -

‘তোকে এতো বি রক্ত লাবিব ছাড়া তো কখনো কেউ করেনি। না এতো সময় নিয়ে কলের ওপর কল করেছে। রাত, পৃথিবীটা যেমন বড্ড বড়ো মানুষের সংখ্যাও। একজন জীবন থেকে গেলে আরও বহুত অপশন থাকে চারিপাশে। এতো সময় অপচয় আজকাল কেউ একজনের ওপরে করে না রে।’

মায়ার বুকের ভেতরটা ভার হয়ে এলো। শুভ্রা বসল বিছানার এককোণে, জানালার পাশে। বাইরে চেয়ে আওড়ে গেলো -

‘আগেও দেখতাম, কল করে যেতো ততক্ষণ — যতক্ষণনা কল রিসিভ করতি। ফোন বন্ধ করে দিলে বাড়ির আশেপাশে চলে আসতো। এলাকার বাচ্চাকাচ্চা পাঠাতে থাকতো একটার পরে একটা। একদিন আমজাদ চাচার ছয় বছরের ছেলে সুমন আমার সামনে পড়ল। আমি বারবার জিজ্ঞেস করতেই বলল, একটা ভাইজান আমারে টাকা দিয়ে আদেশ করছে এখুনি গিয়ে রাত আপুকে জানাতে, সে যদি না বেরোয় দেখা করতে তাহলে বাড়িতে চলে আসবে।’

বলেই আনমনা হাসল শুভ্রা। বলে গেলো -

‘তুই আমার নয় বছরের ছোট্ট তখন। সবে ইন্টারে পড়ছিলি। লাবিবের সাথে সম্পর্কটা কতভাবে লুকোতে চাইলি, অথচ আমি বুঝতে পেরেছিলাম পরপরই। লাবিব তো লুকোনোর মতন ছেলে ছিলো না। বাইক নিয়ে একশো রাউন্ড মারতো বাড়ির আশেপাশে। সামনের দোকানে দাঁড়িয়ে দিনরাত সিগারেট খেতো। হঠাৎ হটাৎ ইঙ্গিত করে তোকে ডাকতো! তোদের দেখতাম, বাচ্চাদের প্রেম কতটা ডেসপারেট ধাঁচের হয়, ওই বয়সের যুবকরা প্রেমে কতটা পাগলাটে হয়। লাবিব ছিলো ওমন! ডেসপারেট, পজেসিভ.. কী উগ্র, বদমেজাজি! আমি হাসতাম জানিস? ভাবতাম, আরেকটু বড়ো হলে এই প্রেম পালাবে। পালাবে এতো এতো ডেসপারেশন। এই ছেলে তোর জন্য উত্তম নয় তাও আমি বলে দিয়েছিলাম। কেনো বলতাম না বল? সবাইকে এক কাঠিতে মাপতাম যে! লাবিব ছিলো বেশ ভালো ফ্যামিলির ছেলে। টাকাপয়সার কখনো চিন্তা করতে হয়নি। কখনো ভাবতে হয়নি আগামীকাল কী খাবো? ওই ছেলে কী বুঝবে? কতদিন ভালোবাসবে তোর মতন কাউকে? যার পরিবার হতদরিদ্রতার শিখরে।’

শুভ্রা ফিরে তাকাল এইবার, ‘কিন্তু আমি ভুল ছিলাম রাত। আমি ভুল ছিলাম। কতগুলো বছর গেলো বলতো! ছেলেটা এখনো তোকেই খুঁজে বেড়ায়! কী আশ্চর্যজনক তাই না? আমি আশ্চর্য হই রে। জানিস? আমি ওকে প্রায়ই আমাদের আশেপাশে দেখতাম। দেখতাম আর দেখতাম..লুকোতো কিন্তু আমি…আমি দেখতাম ওকে।’

মায়া ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলল সমানে। কান্নার শব্দে খুঁড়ে খুঁড়ে এলেন শাহাদাত হোসেন। হতবাক হয়ে দ্রুতো জিজ্ঞেস করলেন -

‘কী হইসে? মায়া এম্নে কাঁদে কেন?’

শুভ্রা হেসে বলল, ‘এইতো ছোটোবেলার কথা বলছিলাম, আব্বা। আপনি যান একটু পরে নিয়ে আসতেসি ওরে।’

বড়ো মেয়ের ইশারা বুঝলেন শাহাদাত হোসেন। চিন্তিত হলেও সরে এলেন। মায়া শান্ত হতে পারল না। কেঁদে গেলো অনেকটা সময় ধরে। একসময় কাঁদতে কাঁদতে বলে গেলো -

‘কেনো খুঁজবে আমাকে বলো আপু? কেনো? সে রাতে ওর আম্মা এতো বাজে ভাবে অপমান করে গেলেন আব্বাকে যে আমি সহ্য করতে পারিনি। পারিনি আর মাথা তুলে দাঁড়াতে। মা হিসেবে উনি তো ভুলও ছিলেন না। ছেলের জন্য মনের মতো পাত্রী চাওয়া দোষের তো না। দোষ আমার। আমি ভুল করেছিলাম। ভুলের মাশুল আমি আজও দিই।’

শুভ্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উঠে এসে হাত রাখল ছোটোবোনে মাথায়, ‘শান্ত হ। মন যা চাইবে তাই করবি এবার। কে কী ভাবল, কে কী চাইল সেসব দেখার দরকার নেই। আমি আছি আব্বা-আম্মাকে দেখার জন্য। দুটো সন্তান নিয়ে বাকিটা জীবন আব্বা-আম্মার সাথেই কাটিয়ে দেব। চাকরিটা আমার হয়ে গেছে। বেতন সাইত্রিশ হাজার। আর চিন্তা নেই…তুই – আমার সোনাপাখি। এবার নিজের সুখটুকু বুঝে না জানবাচ্চা আমার। অনেক ভেবেছিস আমাদের জন্য। এবার আমাকে ভাবতে দে, করতে দে।’

দুহাতে চোখ মুছল মায়া। নিজেকে শক্ত করল। ভাঙা গলায় বলল, ‘আমি তাকে আর ডিজার্ভ করি না।’

শুভ্রা হাসে, হেসে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, ‘এটা ওকে বলিস তো। বিপরীতে তোকে কী বলে আমাকে জানাস! যদি জানানোর মতন কিছু বলে তো!’

মায়ার মুখটা চুপসে গেলো। লজ্জায় ধীরে ধীরে রাঙা হলো গাল দুটো। মনে পড়ে গেলো আগের স্মৃতি গুলো। প্রেমিক হিসেবে কী বেয়ারা ছিলো ছেলেটা! কথাবার্তার কখনো বাউন্ডারি থাকতো না। যা আসতো মুখে তাই বলতো। মায়াকে একদন্ড যদি শান্তি পেতে দিতো। ওসময়ই নতুন করে ফের বাজতে শুরু করল মুঠোফোন। মায়া ধরল না। সে চায়, লাবিব চমৎকার কাউকে পাক জীবনে। মায়ার মতন কেউ… এমনই ঠিকাছে। একাই ঠিকাছে। মুঠোফোনটা তুলে নিলো হাতে। যেই ফোল্ডারে তেমন ঢুঁ দেয়া হয় না তাতেই প্রবেশ করল। যত্নে রাখা ভিডিওগুলো আজও আছে। একটা ভিডিও ছাড়ল মায়া। অন্ধকারে বসে থাকা ছেলেটাকে দেখা যাচ্ছে না। তবে গিটার বাজিয়ে গাওয়া গানের সুরটা ভেসে এলো -

‘যাহা তুম হোওওও, ওহি ম্যে হু…
তেরে না হোনে-সে লাগতা হ্যে ম্যে কিউ হু?
যাহা তুম হোওওও, ওহি ম্যে হু…
তেরে না হোনে-সে লাগতা হ্যে ম্যে কিউ হু?
তুহি মেরা কাল হ্যে, তুহি মেরা আজ…’

অজান্তেই মায়া দুচোখ ভরে এলো। ফিসফিস করে আওড়ানো কথাগুলো ভেসে বেড়াল -

‘তোমার মতন আমাকে কেউ কখনো চাইবে না।’

—————

মায়া বাজার শেষ করে হাঁটছিল রাস্তার একপাশে। সকালের কড়া রোদ এসে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল মুখ। গরমে ঘেমেনেয়ে একাকার মেয়েটা ভাবল একটা রিকশা নিয়ে নেওয়া যাক। রোদ সহ্যই হচ্ছে না। ওসময় হটাৎ পেছন থেকে কেউ বাজারের ব্যাগটা কেড়ে নিলো। চমকাল মায়া। মাথা তুলে দেখল লাবিব এসে দাঁড়িয়েছে। বাজারের ব্যাগ একহাতে ধরে অন্যহাতে খুব সহজে নিজের খসখসে হাতের মুঠোয় ভরে নিলো মায়ার হাতটা -

‘আপনাকে এভাবে বাজার করতে দেখলে আমার রাগ লাগে।’

মায়া ছাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল, ‘দেখতে বলল কে আপনাকে?’

‘চোখে পড়ে যায়। দেখতে তো চাই না।’

মায়া নাক ফুলালো, ‘হাত ছাড়ুন, ব্যাগ দিন।’

লাবিব ছাড়ল না। ব্যাগ দেয়া তো দূরের ব্যাপার। অফ-হোয়াইট রঙের একটা টি-শার্ট পরনে, ফর্মাল বেইজ রঙের প্যান্ট দিয়ে। মায়া আড়চোখে একবার দেখে কাটকাট গলায় বলল -

‘হাত ধরলেন কেনো? কী ধরনের অসভ্যতা এটা?’

আশেপাশে কেউ নেই। ফাঁকা রাস্তা, পাশে গাছ উঠেছে। লাবিব ফিরে তাকাল না। তবে যা বলল তাতে মায়ার মাথাটা ঘুরিয়ে উঠল -

‘যার পুরো শরীরে একসময় ঠোঁট ছুঁয়েছিলাম তার মুখে এই কথাটা ঠিক মানাচ্ছে না। ডোন্ট ইউ থিংক সো?’

মায়া আঁতকে উঠে আশেপাশে চেয়ে একঝটকায় হাত ছাড়িয়ে ব্যাগটা নিতে চাইল। যখন বুঝল শক্তিতে পারছে না ওমনি হনহনিয়ে হাঁটা ধরল সামনে। লাবিব একটা রিকশা দাঁড় করিয়েছে। ফের গিয়ে টেনে ধরল মায়ার হাতটা। পুরুষালি জোরের সামনে মায়া অসহায়। রিকশায় বসতেই লাবিব উঠে এসে পাশে বসল -

‘লাইন নাম্বার নয়, বাসা ছয়।’

মায়া হতবাক হলো। কীভাবে জানল মায়ার বাসার ঠিকানা? তবে জিজ্ঞেস করার আর মনমানসিকতা নেই। কী খারাপ পুরুষ! কী বিশ্রী একটা কথা বলে ফেলল! মুখে আটকাল না? লাবিব অবশ্য আর একটা শব্দও বলল না। বাজারের ব্যাগ হাতে একগুঁয়ে ভঙ্গিতে বসে থাকল। চেয়ে থাকল সামনে। মায়ার অভিমান আকাশ ছুঁলো! কে বলেছে তাকে সাহায্য করতে? মায়া তো বলেনি। রিকশা বাসার কাছাকাছি আসার সময়তেই লাবিব হঠাৎ জিজ্ঞেস করল -

‘কল ধরো নাই কেনো? এতবার কল দিলাম গতকাল।’

মায়াজবাবে নীরব। লাবিব ঘাঁটাল না। বাড়ির সামনে রিকশা থামলে মায়া নেমে পটল। মায়ার হাতে বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে বলল -

‘চলেন মামা।’

রিকশাটা চোখের সামনে থেকে চলে গেলেও মায়ার পা জোড়া নড়ল না অনেকক্ষণ! আজ ছুটির দিন। শুভ্রা বাড়িতেই। দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। গাছে পানি দিচ্ছিল। তার বাচ্চারা খেলা করছে। ডাকল -

‘দাঁড়িয়ে আছিস ক্যানো ওভাবে? ভেতরে আয়!’

টনক নড়ল মায়ার। ভেতরে এসে বাজারের ব্যাগ রান্নাঘরে রেখে নিজের ঘরে এসে পৌঁছাল। গোসল করে যখন পুনরায় রান্নাঘরে এলো হতবাক হয়ে পড়ল। গোটা মুরগি, চার কেজি গোরুর গোস্তো চুলায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে! 

‘এসব কী? সব রাঁধতেসো কেনো? কেউ আসবে নাকি?’

শুভ্রা এসে তখুনি তাড়া দিলো, ‘এইইই…শোন না রাত। আজ আমার সাথে বেরুবি বুঝছিস? সন্ধ্যার পরে। আমার বন্ধুর বিয়ে। চিনিস ত তুই, সোহাগের। সন্ধ্যা সন্ধ্যা সুন্দর করে তৈরি হয়ে থাকিস। শাড়ি, গহনা আমি রেখে এসেছি তোর বিছানার ওপরে। দুজনে ম্যাচিং করে পরব।’

মায়া রুমে এসে আশ্চর্য হলো। লাল শাড়ি। কী ভীষণ সুন্দর কাজ করা! ব্লাউজ, পেটিকোট সহই। ছোটো গহনা সেট। ছোটো একটা গলার নেকলেস, ছোটো ঝুমকো, টিকলি। একগাদা চুড়ি। সব স্বর্ণের মতন লাগল দেখতে! মায়া রুম থেকে চেঁচাল -

‘কবে কিনলে তুমি এসব? আর এই সেট-টা এতো সুন্দর! স্বর্ণের মতন লাগছে। এসব তো মানুষনিজের বিয়েতে পরে আপা।’

শুভ্রা দাঁতে দাঁত পিষল। চোখমুখ খুলেই চেঁচিয়ে মিথ্যে বলল, ‘স্বর্ণ কেনার সামর্থ্য কই রে? তবে এগুলোর রং উঠবে না রে। ছয় মাসের গ্যারান্টি আছে। আর মানুষ বিয়েতেই এভাবে সাজে। রোজ রোজ তো পরা যায় না। আমার বড্ড শখ হচ্ছিল। দু-বোন মিলেমিশে পরব। ছবি তুলব।’

মায়া হাসল। মন্দ হয় না। তাদের দু-বোনের ভালো ছবি নেই। এবারে তোলা হবে তবে। মায়া ছুঁয়ে দেখল শাড়িটা, সেটটা। কী চমৎকার! তার এখুনি পরার বড্ড লোভ হলো। তবে তখুনি পরল না, বিকেলের অপেক্ষা করল। মায়া সন্ধ্যার দিকেই তৈরি হয়ে ফেলল। টিকলিটা অবশ্য পরেনি। কেমন বউবউ লাগছিল! মায়া ভাবল গিয়ে দেখবে আপা তৈরি হয়েছে কি-না তখুনি শোরগোলের শব্দে চমকে উঠে সে। বড্ড চেনা এক কণ্ঠ বলছে - 

‘আসসালামু আলাইকুম আংকেল, ভালো আছেন?’

ধড়ফড়িয়ে ওঠে মায়ার হৃৎপিণ্ড। ছুটে এসে দাঁড়াল দরজার সামনে। লাবিব দাঁড়িয়ে আছে ড্রয়িংরুমে। পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি, সাদা রঙের। পাশে তার মা-বাবা, ছোটো ভাই, ছোটো ভাইয়ের বউও এসেছে। মায়ার যা বোঝার বোঝা হয়ে গিয়েছে। সে ফিরে এলো রুমে। কী অস্বাভাবিক ভাবে হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে বেড়াল। তখুনি রুমে এলেন এক ভদ্রমহিলা, তাকে চেনে মায়া। লাবিবের মা, রেহানা করীম। মায়া দাঁড়াল হকচকিয়ে। ভদ্রমহিলা এসেই ধরলেন মায়ার হাত দুটো। পাশে নিয়ে বসলেন। 

‘কেমন আছো? তোমাকে এখনো কিন্তু পিচ্চিটাই দেখায়। মায়ের মতন ছোটোমোটো গড়ন পেয়েছো যে!’

মায়া হাসতে পারল না। মাথাটা নুইয়ে রাখল। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভদ্রমহিলা। মায়ার মাথায় হাত রাখলেন। বললেন -

‘আমার ছেলের সাথে বাকিটা জীবন সুখে কাটাও এই কামনাই করি এখন। বয়স হয়েছে! এখন আর পছন্দের পুত্রবধূ চাই না। চাই ছেলের সুখ, তার পছন্দের পুত্রবধূ।’

রেহানা বেগম চলে গেলেন অনেকক্ষণ। মায়ার অভিমানে বুক ভার হয়ে এলো। যখন আপা এলো তাকে নিতে, মায়া গেলো না। বলে দিলো -

‘আমি বিয়ে করব না।’

জোর করে না শুভ্রা। বলে, ‘ওহ, আচ্ছা।’

হতবাক হলো মায়া। শুভ্রা চলে গিয়েছে। মায়ার চোখ ভরে এলো। শব্দ পেয়ে তড়াক করে মাথা তুলে তাকিয়ে হতভম্ব হলো। লাবিব রুমে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়েছে। সুঠাম দেহে কী চমৎকার ভাবে মিশে আছে পাঞ্জাবিটা। হাত দুটো গুটিয়ে রাখা। চোখমুখ কী শক্ত করে রেখেছে! মায়ার অভিমান গাঢ় হলো। অন্যপাশে মুখ ফিরিয়ে রাখল। নীরবতা বইল অনেকটা সময়। সেই নীরবতা ভাঙে মায়ার অভিমানী স্বরে -

‘আমি বিয়ে করব না।’

উত্তর পেলো না সে কথার। শুধু অনুভব করল লাবিব এসে দাঁড়িয়েছে সামনে -

‘কাকে করবেন? অন্য কোনো পুরুষকে? লজ্জা করবে না?’

মায়া বুঝতে পারল বাজে ইঙ্গিত দেয়া কথাটুকু। উঠে দাঁড়াল মুহুর্তে। রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল। পারল কোথায়! লাবিব একটা কাজ করে বসল! আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো মায়াকে। 

‘কতো আদর করতাম তোকে, মনে নেই? আমার আদরে কীভাবে গলে যেতি! সেই আদর গায়ে মেখে আমি ছাড়া আর কার হবি? কী মনে হয়, হতে দিতাম? আমি সেই লাবিবই আছি। যা আমার তা আমার করেই রাখি। এতোগুলা বছর চোখে চোখে রেখেছি তো আমার করতেই।’

লাবিব বলে গেলো শক্ত গলায়, ‘বিয়েটা হতে দেন জাস্ট। পুতুলের মতন সাজিয়ে রাখব শুধু বাসায়, ছুঁবো না। কাছে ঘেঁষব না। আপনাকে তড়পাব, যেভাবে আমি তড়পেছি। কী কষ্ট আমাকে দিয়েছেন তার এক পার্সেন্ট তো আপনারও উপভোগ করা উচিত!’

লাবিব বেরিয়ে গেছে রুম ছেড়ে। মায়ার দুচোখ মুছল। হাতটা লাল করে ফেলেছে চেপে ধরে। হাড়েবজ্জাত একটা! শুভ্রা এলো ফের। চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে -

‘আসেন আসেন। কাজি ত সারাদিন বসে থাকবে না।’

 মায়া এগুতে এগুতে আপনমনে আওড়াল -

‘হুঁ, এতো সোজা? আমি কাছে গেলে না ছুঁয়ে কীভাবে থাকবে আমিও দেখব।’
·
·
·
সমাপ্ত……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp