হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ২৬ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          বাবা-মা চলে যাওয়ার পর থেকেই মাহিরের একটা অদ্ভুত স্বভাব তৈরি হয়েছিল। আহমেদ নিবাস প্রথমদিনগুলোতে মা'র সাথে যে ঘরে থাকতো, তাতে পরে আর ছয়-সাত মাস থাকতে পেরেছিল। রায়হানের আলাদা রুম লাগবে, মিনি-দিনাকেও স্পেস দিতে হবে সব মিলিয়ে মাহিরের জায়গা হয় চিলেকোঠায়। তবে চাচা তার জন্য সে ঘরটা ভালো মতো পরিস্কার করে দেয়। মাহিরের খুব খারাপ লাগে না। এখানে একটু নিরিবিলি পাওয়া যায়। একা একা ভয় লাগে প্রথম প্রথম, পরে মানিয়ে নেয় নিজেকে।

যখনই তার খুব জ্বর আসত, সে কখনো কাউকে ডাকত না। অন্যদের মতো কেঁদে কেটে বাড়ি মাথায় করা বা দাদুকে ডেকে জড়াতে তার কেমন যেন লাগত। সে খুব ছোটবেলাতেই বুঝে গিয়েছিল, এই বড় পরিবারে সে আর পাঁচটা বাচ্চার মতো নয়। তার একটু বাড়তি অসুখ বা ঝামেলা মানেই সবার বিরক্তি বাড়ানো। সে কারোর ওপর বোঝা হতে চাইত না।

তাই তীব্র জ্বরে যখন শরীর কাঁপত, ছোট্ট মাহির নিজের হাতটা ঘুরিয়ে নিজের পিঠে নিজেই হাত বুলিয়ে দিত। নিজে নিজেই নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করত - ঠিক হয়ে যাবে মাহির, আর একটু পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে। 
নিজেকে একা আর পরিত্যক্ত ভাবার হাত থেকে বাঁচতে সে এই নিয়মটা নিজেই শিখে নিয়েছিল। নিজের জ্বর, নিজের কষ্ট একাই সহ্য করে নেওয়াটাই তার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।

আর সবকিছুর চেয়ে মাহির সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করত মানুষের ‘দয়া’ বা করুণাকে। আহমেদ নিবাসে আসার পর থেকেই সবার চোখে সে নিজের জন্য একটা সস্তা করুণা দেখে এসেছে। কেউ যখনই তার মাথায় হাত রাখত, সেই হাতের মাঝে স্নেহের চেয়ে দয়ার ভাগটাই বেশি থাকত। স্কুলে যখন সে ভালো রেজাল্ট করত, তখন রায়হান বেশ জোড় গলায় বলত, ও তো এতিম, এরজন্যই টিচাররা দয়া করে ওরে বেশি নাম্বার দেয়।

এই একটা কথা মাহিরের মনে খুব শক্তভাবে লেগেছিল। তার নিজের যোগ্যতা, নিজের খাটুনি সবকিছুকে মানুষ স্রেফ এক ফোঁটা দয়া দিয়ে সস্তা বানিয়ে দিত। সে মনে মনে ঠিক করেছিল, জীবনে যা-ই হয়ে যাক, সে কখনো কারো কাছে দয়া ভিক্ষা করবে না। নিজেকে এমনভাবে রাখবে যাতে কেউ তাকে করুণার পাত্র ভাবার সুযোগ না পায়। তাই অসুস্থ হলেও সে নিজেকে লুকিয়ে রাখত। দাদী বা বাড়ির কেউ যদি জানতে পেরে মাথায় জলপট্টি দিতেও আসত, সেই যত্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দয়াটা মাহির নিতে পারত না। তার চেয়ে নিজের জ্বরে নিজে একা পড়ে থাকাও অনেক ভালো ছিল।

কিন্তু আজ… আজ সেই চেনা অতীতটা যেন হুট করেই ওলটপালট হয়ে গেল।

ভোর হওয়ার ঠিক আগে আগে মাহিরের ঘুমটা আবার ভেঙে গেল। গায়ের উত্তাপটা আবার একটু একটু করে বাড়ছে। চোখের পাতা দুটো এখনো ভীষণ ভারী হয়ে আছে।
চারপাশটা এখনো আবছা অন্ধকার। একটা চেনা হাতের ঠান্ডা স্পর্শ সে নিজের কপালে টের পেল।
আয়না এখনো বসে আছে। এত কিছুর পরও সে এক চুল নড়েনি। রুমাল ভিজিয়ে পরম যত্নে সে এখনো মাহিরের মাথায় জলপট্টি দিয়ে যাচ্ছে।

মাহিরকে চোখ মেলতে দেখে আয়না হাতের রুমালটা বাটিতে রাখল। ওর মুখের ওপর একটু ঝুঁকে এসে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল, 

এখন কি একটু ভালো লাগছে? শরীরের টেম্পারেচার তো মনে হচ্ছে আবার একটু বাড়ছে।

মাহির সাথে সাথে কোনো উত্তর দিল না। সে চোখ সরিয়ে নিল না, বরং আধবোজা চোখে খুব গভীরভাবে আয়নার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটা তার কি সর্বনাশ করেছে তা কি আদৌ জানে! 

 সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই আবছা আলোতেও আয়নার চোখের আসল ভাবটা পড়তে। সে দেখতে চাইছে এই গভীর রাতের এত যত্নের পেছনেও কি তবে অন্য সবার মতো কোনো দয়া লুকিয়ে আছে? আয়নাও কি তাকে অসহায় ভেবে এই সেবাটুকু করছে?

যদি আয়নার চোখেও সে আজ ওই চেনা দয়া দেখতে পায়, তবে সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারবে না। এই মানুষটার কাছ থেকে সে আর যা-ই হোক, করুণা নিতে পারবে না।

বুকের ভেতরের সেই পুরোনো ভয় আর খচখচানিটা আর চেপে রাখতে পারল না মাহির। সে সন্দিহান গলায় সরাসরি আয়নার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, দাদী তোমাকে আমার মা-বাবার সব কাহিনী বলেছে, তাই না?

আয়না থমকে যায়। মাহিরের মস্তিষ্ক সচল হচ্ছে। সে শান্ত স্বরে বলে, হ্যাঁ বলেছেন কয়েকদিন আগেই। তুমি কি এতে আপসেট? 

মাহির তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল, ওয়েল দ্যাট মেইকস সেন্স। 

আয়না তার বিদ্রুপ ধরতে পেরে বলল, ডোন্ট বি লাইক দিজ! আমি নিজে পিটি অপছন্দ করি। অনুভূতিতে স্বচ্ছতা না থাকলে তা বিষে পরিণত হয়। তাহলে তেমনটা আমি তোমার সাথে কেন করব? 

মাহির কোনো উত্তর করল না। আয়না অধীর হয়ে বলল, তুমি তবে আমাকে একটুও চিনতে পারোনি। আমার তোমার প্রতি সম্মান বেড়েছে, সহমর্মিতা জেগেছে। ইউ আর দ্যা মোস্ট সেল্ফ সাফিসিয়েন্ট পার্সন আই হ্যাভ এভার মেট। আমি দয়া দেখানোর মানুষ নই, আর তুমিও করুণা পাওয়ার মতো কেউ নও।

আয়নার অকাট্য যুক্তিগুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধল মাহিরের বুকে। তার তাসের ঘরের মতো সাজানো ভয় এক নিমেষে গুঁড়িয়ে গেল। তার জীবনে শুনে করুণার আর বদলে সম্মান বোধের সত্যটা এত সহজ ভাষায় তার সামনে আগে কেউ কখনো এনে দাঁড় করায়নি।

​কিন্তু মাহির সাহেবের ভেতরের অভিমান এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সে চোখ দুটো সরিয়ে নিয়ে দেয়ালের দিকে তাকাল। অভিযোগ আর অসহায়ত্বের নীরব, ক্লান্ত আকুতি দুজনকে ঘিরে ধরেছে।

আয়না আদুরে স্বরে বলে, 
এটা কি ফেয়ার? রাগ কার করার কথা ছিল? আমার মুখ ফিরিয়ে রাখার কথা সেটা কি ভুলে গেছো? একদিনে দুইবার! দুই বার তুমি আমার সাথে রাগ করেছ। ধমকে একশেষ করেছো। তাও কোল্ড শোল্ডার শেষ হওয়ার নামে নাম নেই। সবশেষে দিনার সামনে দরজার ওপার থেকে ওমন করে বললে, প্রয়োজন ছাড়া যেন কেউ ডিস্টার্ব না করে! আমি কি শুধু তাই করি, মাহির? 
অথচ এখন এমন একটা মুখ করে আছ, যেন সব দোষ শুধু আমার একার!

​মাহির ধীরে ধীরে মুখটা ঘোরাল।তার চোখের কঠোর চাউনিটা ধুয়ে-মুছে গিয়ে সেখানে এক রাশ তীব্র অসহায়ত্ব ফুটে উঠল। সে বলল,
 আমি তো সর‍্যি বলতেই আসতাম! তোমার কষ্টের উপার্জন থেকে এতো বড় একটা এমাউন্ট এভাবে খরচ করবে তাতে আমি নিজেকে ইউজলেস লাগছিল। তারপর আমি ঘরে এসে দেখি তুমি নেই। মিনি বলল তুমি কেমন অস্থির হয়ে বাইরে চলে গেছ। তোমার ফোনটাও বন্ধ আসছিল। আমি... আমি আসলে আর কোনো যুক্তি খাটাতে পারিনি তখন।

​যখন তোমায় পাচ্ছিলাম না, আমার শুধু বারবার মনে হচ্ছিল মানুষ তো আসলে এভাবেই হুট করে হারিয়ে যায়। আমার মা-ও তো….তুমিও বোধহয় আমাকে ওই একই ট্রমার মধ্যে ফেলে চলে গেছ। আমার ভয় করছিল, আয়না... আমি রাগ করিনি, আমি আসলে অসহায় হয়ে পরেছিলাম।

আয়নার বুকের সমস্ত অভিযোগ নিমেষে উধাও হয়ে গেল। কি মনে করে যেন সে ছুটে নিচে নেমে গেল। মাহির সেদিকে তাকিয়ে রইল।

তীব্র জ্বরের ঘোরে সে যখন কাঁপছিল, তখন খুব নরম একটা স্পর্শ নেমে এসেছিল তার কপালে। আয়না তার খুব কাছে ঝুঁকে এসেছিল। প্রথমে তার কপালে, তারপর তার দুটো চোখের পাতায় খুব আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়েছিল সে।
​শুধু কি তাই? আয়না তার কানের কাছে মুখ এনে কাঁপানো গলায় কী যেন বলেছিল!

​​কথাগুলো মনে পড়তেই মাহিরের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। সে কি আসলেই পাগল হয়ে যাচ্ছে? এই তীব্র জ্বরের ঘোরে কি সে কোনো অবাস্তব হ্যালুসিনেশন দেখছিল? যে মেয়েটা তাকে সারাক্ষণ এড়িয়ে চলে, নিজের চারপাশে দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে রাখে, সে এসে তার চোখে-কপালে চুমু খাবে? অমন করে ভালোবাসার কথা স্বীকার করবে? এটা কীভাবে সম্ভব!

​মাহির বারবার ভাবার চেষ্টা করল, কিন্তু মন কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারছে না। সে বড্ড দ্বিধায় পড়ে গেল। মেয়েটা কি আসলেই এসব বলেছিল, নাকি মাহির নিজের মনের অবদমিত ইচ্ছাটাই জ্বরের ঘোরে স্বপ্ন হিসেবে দেখেছে? যদি সত্যিও বলে থাকে, তবে সেই কথার মানে কী ছিল?

—————

বেশ কিছুক্ষণ পর সে যখন ওপরে ফিরে এল, তখন তার হাতে একটা খাবারের প্লেট।​সে আবার এসে মাহিরের পাশে বসল। প্লেট থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে। আয়না চামচ দিয়ে খাবারটা নাড়তে নাড়তে বলল, আমি এটা খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে রেঁধেছি। পাতলা খিচুড়ি খেতে আরাম লাগবে ও দেখবে সর্দি-জ্বর চট করে নেমে যাবে। এখন একদম চুপচাপ গরম গরম পুরোটা খেয়ে নাও।

​এবার আর সে মাহিরের কাছে কোনো অনুমতি চাইল না, কিংবা খাবে কি খাবে না সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও ওকে দিল না। এই মানুষটার যত্ন নেওয়া, একে আগলে রাখাটা এতক্ষণে আয়নার সহজাত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সে নিজে থেকেই খাবারটা একটু মেখে প্রথম লোকমাটা মাহিরের মুখের সামনে তুলে ধরল।
​মাহির সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল, চামচটা চোখের সামনে আসতেই সে আয়নার দিকে তাকাল। ওর মুখটা তখনো কিছুটা গোমড়া। সে মুখটা ওপাশে ঘুরিয়ে নেওয়ার ভান করে খুব নিচু গলায় গজগজ করল, এখন আর খাওয়ার ইচ্ছে নেই। তিতে লাগছে মুখটা।

​-মুখ তিতে লাগলেও খেতে হবে। হা করো?

আয়না বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে চামচটা ওর ঠোঁটের কাছে আরেকটু এগিয়ে দিল। ​মাহির আর না করতে পারল না। অবাধ্য ছেলে বাধ্য হয়ে মুখ খুলল। আয়না ওকে এক এক করে লোকমা খাইয়ে দিতে লাগল, আর মাহির প্রতিবার মুখ খোলার আগে দু-একটা ছোটখাটো অস্ফুট অভিযোগ করেই গেল। কিন্তু ভেতরের সত্যিটা হলো, আয়নার হাত থেকে এভাবে খাবার খাওয়ার মধ্যে সে পরম শান্তি খুঁজে পাচ্ছিল। এত বছর ধরে যে একাকীত্ব আর অবহেলার দেয়াল নিজের চারপাশে তুলে রেখেছিল, সে আজ আর নিজেকে একা ভাবার সুযোগ পাচ্ছিল না।

​খাওয়া শেষ হতেই আয়না টেবিল থেকে ওষুধের প্যাকেটটা টেনে নিল। ট্যাবলেটটা মাহিরের সুস্থ হাতের তালুতে দিয়ে পানির গ্লাসটা ওর মুখের সামনে ধরল। কড়া কড়া ট্যাবলেটের দিকে তাকিয়ে মাহির যখন তিতকুটে একটা মুখ করল, তখন আয়না এক প্রকার জোর করেই গ্লাসটা ওর ঠোঁটে ঠেকিয়ে দিল, কোনো বাহানা শুনব না, এক ঢোকে গিলে নাও।

​মাহির ওষুধটা গিলে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আয়না মাহিরের ঠোঁটে লেগে থাকা পানির ফোঁটা মুছে দিল।

মাহির কোনোরকম দ্বিধা ছাড়া তার দিকে এক রাশ কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে। আয়নার এখন আর মাহিরের দৃষ্টিতে অস্বস্তি হয় না, উল্টো মনে প্রজাপতিরা উড়াউড়ি করে বেরায়। 

-ডিড ইউ মিন ইট?

আয়না চমকে তাকায়। ভদ্রলোকের দৃষ্টি এখন তীক্ষ্ণ যেন আয়নার অন্তরকে পরখ করে নিতে চায়।

মাহির আবারো বলে? ডোন্ট মেস উইথ মি! সত্যি করে বলো? কোনো সান্ত্বনাসূচক কথা শুনতে চাই না। আমি হুঁশে ছিলাম না কিন্তু তুমি কি সজ্ঞানে বলেছিলে কথাগুলো? এমন কোনো কথা আমাকে বলবে না যা নিয়ে তোমার মনে এক বিন্দু পরিমাণও সংশয় আছে।

​হুঁশিয়ারি শুনে আয়না বেশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। সে ভুরু কুঁচকে ভাবার চেষ্টা করল মাহির ঠিক কোন কথার কথা বলছে। কিন্তু পরক্ষণেই ওর মাথায় বজ্রপাতের মতো সত্য এসে আঘাত করল। ওর সারা শরীর এক নিমেষে জমে পাথর হয়ে গেল। মাহির আসলে ওই আধো-সচেতন অবস্থায় শোনা কথাগুলোর জবাব চাইছে! তীব্র জ্বরের ঘোরে কাঁপতে থাকা মানুষটার কপালে আর চোখের পাতায় ঠোঁট ছুঁইয়ে সে ফিসফিস করে নিজের ভেতরের সমস্ত দেয়াল ভেঙে স্বীকারোক্তি দিয়েছিল। বলেছিল সে দুনিয়ার যেখানেই যাক না কেন, দিনশেষে ঠিক এই ঘরেই ফিরে আসবে, কারণ মাহির আহমেদই তার একমাত্র ঘর!

​এই আকস্মিক উপলব্ধিতে আয়না স্পষ্ট ঘাবড়ে গেল। ওর চেহারায় তীব্র মানসিক টানাপোড়েন ফুটে উঠল। গভীর রাতের নিঝুম অন্ধকারে, একটা মানুষ যখন জ্বরের ঘোরে প্রায় অচেতন, তখন অবচেতনের টানে ওই কথাগুলো বলে ফেলা সহজ ছিল, শান্তিদায়ক ও স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখন ভোরবেলার এই আলোয়, এই শক্ত তপ্ত পুরুষের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সেই ভয়ঙ্কর সুন্দর সত্যিটা স্বীকার করা যে কতটা কঠিন, তা শুধু আয়না নিজেই জানে। ওর ভেতরটা ভয়ে, লজ্জায়, তীব্র অস্থিরতায় কাঁপতে লাগল।

—————

​কিন্তু মাহির এবার এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। যে মানুষটা তার জীবনের প্রতিটা মোড়ে শুধু প্রিয়জনদের হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে এসেছে, তার কাছে ভালোবাসার এই দোলাচল, এই অনিশ্চয়তা এক ধরণের জীবন্ত মৃত্যুর মতো। সে শান্ত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও ওর ভেতরের অস্থিরতা ওকে পাগল করে তুলছিল। সে একটা চূড়ান্ত, স্পষ্ট উত্তর আয়নার কাছে দাবি করল ।

​আয়না যখন কোনোমতে দৃষ্টি এড়িয়ে প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য বিছানা থেকে উঠতে চাইল, মাহির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে চট করে হাত বাড়িয়ে আয়নার নরম কবজিটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তারপর টান দিয়ে ওর হাতটা এনে রাখল নিজের বাম বুকের ঠিক মাঝখানটায় যেখানটায় হৃৎপিণ্ড অবাধ্য ঘোড়ার মতো ছুটছে! 

​মাহির ওর চোখের দিকে তাকাল রুদ্ধশ্বাসে। কাতর গলায় বলল, ক্যান ইউ ফিল ইট ওয়াইফ? ইট'স গোয়িং ম্যাড এন্ড রেস্টলেস ফর ইউ! 

মাহিরের নিশ্বাস তপ্ত উষ্মার মতো আয়নাকে বিঁধছে। 
নিজে জ্বলছে সাথে তাকেও আবেশের দহনে পোড়াচ্ছে।

আয়না হাত সরিয়ে নিতে পারল না। মাহির আরো জোরে টেনে ধরল। মাহিরের বুকের উন্মাদ স্পন্দন আয়নার হাতের স্পর্শে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। প্রতিটি ধকধকানি বুঝিয়ে দিচ্ছে আয়নার একটুখানি সান্নিধ্য মাহিরের সারা শরীরে কতটা প্রলয় ঘটিয়ে দিতে পারে।

-অনুভব করতে পারছ তোমার ওই কয়েকটা কথা আমার এই ভেতরটায় কী তুলকালাম ঘটিয়ে দিয়েছে? ওই কথাগুলো শোনার পর আমি কীভাবে শান্ত থাকব, আয়না? 

​মাহিরের আকুলতার সামনে দাঁড়িয়ে আয়না অবশেষে নিজের ভেতরের সমস্ত আবেগ আর ধরে রাখতে পারল না। এত বছরের জমে থাকা ভয়, চাপা ক্ষোভ একবারে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল। ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
​সে মাহিরের বুকের ওপর থেকে নিজের হাতটা টেনে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে আর্ত গলায় বলে উঠল, 
ডু ইউ রিয়েলাইজ ওয়াট ইউ আর আস্কিং ফ্রম মি? 

​সে ফুঁপিয়ে উঠে বলতে লাগল, 
“তুমি আমার কাছ থেকে সেই শিল্ড কেড়ে নিতে চাচ্ছ, যা আমাকে বছরের পর বছর ধরে বাইরের সমস্ত আঘাত থেকে বাঁচিয়ে এসেছে, আমাকে একা শক্ত হয়ে বেঁচে থাকতে শিখিয়েছে। 

-কেড়ে নিতে চাইছি না তো। তুমি নিজে ত্যাগ করে দাও তা চাইছি।

আয়না বলতে থাকল,
তুমি চাইছো আমি আবার একদম অসহায় হয়ে পড়ি। আমি নিজের সমস্ত পাহারা তুলে দিয়ে একটা মানুষকে এতটা গভীরভাবে বিশ্বাস করি, যেন সেই মানুষটা চাইলে যেকোনো দিন আমাকে এক নিমেষে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়ে চলে যেতে পারে!

-কাউকে ভালোবাসা বুঝি এত এত ভয়ঙ্কর আয়না? 

-অবশ্যই। আশেপাশে প্রতিনিয়ত কি হচ্ছে তুমি দেখ না? 

-ভালোবাসা তো পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্টের মতোও হতে পারে, তাই না? প্রতিনিয়ত ইম্পাওয়ারও তো করতে পারে। এই যে প্রতিদিন সকালবেলা তোমার ঘুমন্ত মুখ দেখে অফিসে গিয়ে দশ ঘণ্টার শিফট টানার শক্তি পাই এটা কি মোটিভেশন না? এই যে বাড়িতে এসে তোমার চিন্তিত মুখ দেখলে সকল ক্লান্তি নিমেষে দূর হয়ে যায় এটা কি এম্পাওয়ারিং না? 
এই যে আমি সপ্তাহে ছদিন ফুল টাইম জব করছি, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করছি এটা কি ভালোবাসার জন্যই না? 

আয়না আদ্র চোখে তাকাল। মাহির একটু পরপর তার চোখের পানি মুছে দিচ্ছে। সে প্রশ্ন করল, ডু ইউ লাভ মি, মাহির?

মাহির হাসল তার কথা শুনে। এতো সুন্দর হাসি আয়নার মতে পুরো পৃথিবীতে আর কারো নেই। এত সুন্দর! এত মায়াময়! এত স্নিগ্ধ!

মাহির ফিসফিস করে বলল, ফ্রম দ্য ভেরি ফার্স্ট মোমেন্ট মাই ওয়াইফ! তোমার আমার জন্য অপেক্ষা করা, ঘুমিয়ে আছি ভেবে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, আমার সাথে এইরকম বাড়ির চিলেকোঠায় সংসার করা, আমার স্ট্রাগলগুলো কে নিজের করে নেওয়ার প্রতি মুহূর্তগুলোতে আমি তোমাকে একটু একটু করে ভালোবেসেছি। এটা যে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকবে তা আমি জানি। কারণ এই মুহূর্তে তোমাকে কাঁদতে দেখেও একটু ভালবাসতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু না! এবার আমার নিজের কানে শোনা চাই। বলো? বলো?

আয়না তার বুকে মাথা লুকালো। মাহির হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, আর তুমি যে প্রশ্নটা করেছিলে, হ্যাঁ আমি জানি আমি তোমার কাছে কি চাইছি। আমি রফিক সরকার নই, আমি মাহির আহমেদ।
নিজেকে আমার সামনে সম্পূর্ণ মেলে ধরতে বলছি। পুরো দায়িত্ব নিয়ে বলছি। আমি আমার ওয়াইফকে কোনরকম ব্যারিয়ার ছাড়া দেখা ডিজার্ভ করি। তবে আমি তাকে তেমনভাবে ভালবাসতে পারব, যেমন ভাবে সে ডিজার্ভ করে।  

আয়না মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি তোমাকে ভালবাসি মাহির। আই লাভ ইউ। ইউ ব্রিং পিস টু মাই হার্ট। তুমি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে আমার খুব কষ্ট হয়। মনে হয় নিঃশ্বাস নেয়াও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। শুনেছ? হয়েছে শান্তি? 

আয়নার আদুরে ভাব নিয়ে মুখ ফুলিয়ে রাখা দেখে মাহির হাসি থামাতে পারে না। 

আয়না ওর দু-হাত বাড়িয়ে মাহিরের শার্টের কলারটা খপ করে মুঠো করে ধরল, যেন এই মানুষটা হাত ফস্কে গেলেই সে অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে।

​এতটা বছর ধরে নিজের ভেতরে চেপে রাখা সমস্ত নেতিবাচক অনুভূতি এক লহমায় পেছনে ফেলে সে নিজেই এবার প্রথম বাড়িয়ে দিল নিজেকে। মাহির কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আয়না এক বুক মরিয়া আকুলতা নিয়ে সরাসরি ওর ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো চেপে ধরল।
​মাহির মুহূর্তের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। এটা ওর কল্পনারও বাইরে ছিল। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য মাহির যেন জড় পদার্থে পরিণত হলো।

​কিন্তু সেই ঘোর কাটতে এক পলকও সময় লাগল না। আয়নার ঠোঁটের অবাধ্য কাঁপন আর ওর শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে রাখা হাতের আকুলতা মাহিরের ভেতরের পুরুষটাকে জাগিয়ে তুলল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
​খুব তীব্র গতিতে মাহির আয়নার এই চুম্বনের প্রত্যুত্তর দিল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp