আদিল মির্জাস বিলাভড - পর্ব ৪৮ - নাবিলা ইষ্ক - ধারাবাহিক গল্প

আদিল মির্জাস বিলাভড - নাবিলা ইষ্ক
          প্রধান সড়ক ধরে একটি ভাঙাচোরা গাড়ি ভয়ঙ্কর গতিতে ছুটে চলেছে। বারবার লেন বদলাচ্ছে। গতি বাড়াচ্ছে এবং বাড়িয়েই যাচ্ছে। পরিস্থিতি ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছিল। এই বুঝি গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। গাড়িটিকে পেছন থেকে ধাওয়া করে যাচ্ছে আরেকটি গাড়ি। ক্রমশ প্রচেষ্টা চলছে সামনের গাড়িটির সামনাসামনি হবার। একপর্যায়ে যখন হলো হাসান চিৎকার করে ওঠে -

'বস, বস!! স্লো ডাউন!!’

ঋণা যেমন কোনো কথাই শুনতে পেল না। ফিরে তাকাল না। ক্রমশ বেগ বাড়িয়ে ছুটে গেল নিজের মত। সামনে - পেছনে, ডানে - বায়ে কোথাও তার মনোযোগ নেই। নিজের দুনিয়াতেই মগ্ন। চোখের সামনে ভেসে উঠছে রোযা নামের মেয়েটার দাপুটে, গর্বিত মুখখানা। ওই মেয়ের বলা একেকটা কথা তীরের মতন এসে বিঁধেছে হৃৎপিণ্ডে। এতো ক্ষমতা, দাপট ওই মেয়ে কীভাবে দেখাবে যদি না আদিল মির্জা দেয়? নিজের ব্যক্তিগত, নিজের ডান হাত সাথে দিয়ে দিয়েছে!! এতো মূল্যায়ন করে ওই মেয়েকে? ভালোবাসে কী? ঋণার শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক হতে শুরু করে। কানের ভেতরে বোধহয় পোকামাকড়ের উদগ্রীব বেড়েছে। জোরেশোরে একটা বাচ্চার মিষ্টি ডাক পুনরাবৃত্তি করে চলেছে। বাচ্চাটা ডাকছে সমানে -

‘মা…মা…মম…মাম্মা!’

সে ডাকে কিছু একটা আছে। কোনো আলৌকিক শক্তি! ঋণার দুনিয়াটা এলোমেলো হয়ে এল সে ডাকে। হৃৎপিণ্ড থমকে গেল। ভেতরে চলা তান্ডব এবারে চোখমুখ, কণ্ঠে প্রকাশ পেল। হাউমাউ করে উঠল ঋণা। ঝাপসা হচ্ছে চোখদুটো। 

‘দ্যাটস মাই ফ্যামিলি! মাই হাসবেন্ড! দ্যাট ইজ…আমিরা ইজ মাই চাইল্ড! মাইন!!’

হাসান ঋণার গাড়িটার সামনে গিয়ে থামানোর প্রচেষ্টায় তখনও অব্যাহত, ‘বস, কথা শুনুন!! বস…বস…ঋণা!!’

সামনে থেকে দ্রুত গতিতে একটি পিকআপ ট্রাক ছুটে আসছে। ট্রাকটি নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ঋণার তেড়ে আসা গাড়িটি এড়ানোর। একপর্যায়ে এড়াতে পারলেও রাস্তার ডিভাইডারে ধাক্কা খায়। ঋণার গাড়ি না থামলেও হাসানের গাড়ি থামল এসে। ট্রাক চালাচ্ছিলেন এক পঞ্চাশোর্ধ ভদ্রলোক। কোনো ক্ষতি হয়নি তবে ভদ্রলোক রাগান্বিত হয়ে আছে। চেঁচাতেও পারেননি। হাসান জানালার কাচ নামিয়ে পাঁচ হাজার টাকা ভদ্রলোকের হাতে ধরিয়ে কোনোরকমে বলে গেল -

‘মাফ করবেন আংকেল।’

হাসান পুনরায় ছুটল। ইতোমধ্যে ঋণার গাড়ি প্রবেশ করেছে সওদাগর বাড়িতে। গাড়ি থামতেই ঋণা এলেমেলো চুল, বিধ্বস্ত মুখ আর নগ্ন কদমে ছুটছে ভেতরে। আলমগীর সওদাগর সবেমাত্রই সোফা ছেড়ে উঠতে নিয়েছিলেন। রাত হলো বেশ, ঘুমোতে যাবেন। এসময়ে মেয়েকে এমন অবস্থায় প্রবেশ করতে দেখে সামান্য বিচলিতই হোন -

‘এই অবস্থা কেনো? কী হয়েছে? কিছু হয়েছে?’

 ঋণা জবাব দিল না। সোজা এসেই বাবার পায়ের কাছে শব্দ করে দুহাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। হাঁটুতে ফ্লোর স্পর্শ করার কটমটে এক তীব্র শব্দ ভেসে বেড়াল। তাতে তেমন কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না ঋণার মধ্যে। ঝাপসা চোখের দৃষ্টি শূন্যে আছে। এযাত্রায় দ্রুত প্রবেশ করল হাসান। আলমগীর সাহেব তাকালেন হাসানের দিকে। ধমকে জিজ্ঞেস করলেন -

‘কী হয়েছে?’

হাসানের কিছু বলতে হলো না। ঋণার কেমন প্রাণহীন, পাথুরে কণ্ঠ ভেসে এল -

‘ড্যাড, আমি - আমি পস্তাচ্ছি। আমি ভীষণ পস্তাচ্ছি!’

বলতে ঋণা চিৎকার করে কেঁদে ফেলল, ‘ড্যাড.. ড্যাড আমি.. আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি। আমার বাচ্চা অন্যকাউকে মা ডাকছে এটা আমি সহ্য করতে পারছি না। আমি কেনো দায়িত্ব নিইনি? কেনো তখন ওকে আমি ফেলে এলাম! আমার বাচ্চা আমাকে চেনে না! আমাকে জানে না!!’

আলমগীর সওদাগরের দৃষ্টি মেয়ের ওপর থেকে নড়ল না অনেকক্ষণ। ঋণা বলে গেল কাঁদতে কাঁদতে -

‘আমি আদিল বাদে কাউকে ইম্পর্ট্যান্ট মনে করিনি। আমি শুধু ওকেই চেয়েছিলাম। ওই বাচ্চাও আমার জন্য শুধু আদিলকে পাবার রাস্তা ছিল। যখন বুঝলাম এই বাচ্চার প্রতি ওর কোনো মায়া নেই আমি দ্বিতীয় বার ভাবিনি বাচ্চাটা ফেলে দিতে। অথচ আজ যখন আমার বাচ্চাকে শুনলাম অন্যকাউকে মা ডাকতে আমি সহ্য করতে পারিনি। আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে…’

আলমগীর সওদাগরের কণ্ঠ গম্ভীর শোনাল, ‘আমি তখন তোমাকে বলেছিলাম একটা বাচ্চা পালা ওত ঝামেলার না। টাকাপয়সা খরচা হতো শুধু। কিন্তু তুমি জেদ ধরলে! এই বাচ্চা রাখবেই না।’

ঋণার মাথা নুইয়ে পড়ল বাবার পায়ের কাছে। অঝোরে চোখের জলে ভাসল ফ্লোর। কণ্ঠ থেমে এল, ভেঙে গেল -

‘আমার সাথে এমন কেনো করল ও? আমাকে বোঝাল ও বাচ্চা চায় না! অথচ যখন ফেলে এলাম ওই বাচ্চা নিয়ে গেল। এমনভাবে নিল যে আমি টের অবধি পাইনি। একটা কাকপক্ষীও জানেনি আদিল মির্জা জলজ্যান্ত সদ্য জন্মানো বাচ্চা পালছে। এমনভাবে সুরক্ষায় রেখেছে যে আমি গোটা একটা বছর পরে জানতে পারি, বাচ্চা ওর কাছে। ওই দিন আমি আজও ভুলতে পারি না ড্যাড। ওই আদিলকে আমি আজও ভুলতে পারিনি। বাচ্চাটা তো আমি জন্ম দিয়েছি। আমার পেটের বাচ্চাকে এতো ভালোবাসতে পারলে আমাকে কেনো মেনে নিতে পারল না?’

আলমগীর সওদাগর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। করুণা হল তার। নাতনি হিসেবে ওই বাচ্চার মুখও তিনি আজ অবধি দেখতে পারেননি। জানেন না দেখতে কেমন! শুনেছেন আদিলের মতো দেখতে! চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করলেন। হাতটা রাখলেন মেয়ের মাথায় -

‘এভাবে কান্নাকাটি করলে হবে? যা হওয়ার হয়ে গেছে। যা নিজের তা এভাবে এভাবে না এলে, কেড়ে নিতে হয় ঋণা। শেখাইনি?’

ঋণার কণ্ঠ বুজে এল, ‘তুমি দ্যাখোনি ড্যাড। ওই মেয়েটাকে মাথায় করে রেখেছে। কী পরিমাণ ডেসপারেট ও!! কায়সারের ভাগ্নেকে পুড়িয়ে ফেলেছে জাস্ট বিকজ ছেলেটা বাজে কথা বলেছে!!’

আলমগীর সওদাগর ধীরেসুস্থে শুধালেন -

‘কী করতে চাও এখন?’

ভেজা চোখ তুলে তাকাল ঋণা। বাবার চোখে চোখ রেখে বলে গেল -

‘ওটা আমার ফ্যামিলি। বাচ্চা, হাসবেন্ড সব আমার। আমি আমার ফ্যামিলি চাই।’

আলমগীর সওদাগর দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘তাই হবে! সব তোমার হবে। এবার ওঠো। ওই মেয়েকে সরিয়ে ফেলব।’

‘প্রটেক্টেড থাকে। কীভাবে সরাব? দেখলে না গতবার কোন পর্যায়ে গেল আদিল? কী পাগলামো করেছে?’

‘ওই মেয়ের ফ্যামিলি আছে না? কান টানলে মাথা আসবে।’

ঋণা স্বস্তি পেল না। উঠল না। শূণ্য চেয়ে আস্তে করে ডেকে গেল -

‘আদিল…আদিল… আদিল…’

ঋণার চোখে আজও পরিষ্কার ওইদিনটার সেই আশ্চর্যজনক দৃশ্য! আজও চমকে থমকে সে একাকার হয়ে পড়ে। তার পরিচিত আদিল মির্জার সাথে ওইদিনকার আদিল মির্জার কোনো মিল ছিল না। বিন্দুমাত্রও না। ওই আদিল মির্জা ছিল একজন বাবা…আমিরার বাবা!

           [ অতীতের এক টুকরো অংশ এখান থেকে শুরু – ] 

‘বস, ইম্পর্ট্যান্ট নিউজ।’

ঋণার নির্বিকার চোখমুখের পরিবর্তন এল না। পাতলা গড়নের ওপরে থাকা তামাটে রঙের পুরুষকে সরাল না। মাথাটা ঘুরিয়ে শুধু তাকাল বন্ধ দরজার দিকে। বিরক্তি নিয়ে শুধাল শুধু -

‘কার ব্যাপারে?’

‘আদিল মির্জা —’

 ঋণা থামল, নগ্ন দেহের ওপর থেকে সরিয়ে দিল পুরুষটিকে। পাশ থেকে নাইট ড্রেসটা গায়ে জড়াতে জড়াতে প্রশ্ন করে গেল -

‘কী হয়েছে? কোনো খবর?’

বলতে বলতে বিছানা ছেড়ে নামল ঋণা। তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে বেরিয়ে এল রুম ছেড়ে। দাঁড়িয়ে আছে হাসান সহ তার পার্সোনাল আরও দুটো বডিগার্ড। হাসানের দৃষ্টি নোয়ানো -

‘একটা বাচ্চাকে দেখে গিয়েছে আদিল মির্জার সাথে।’

ঋণার কণ্ঠ হিমালয় ছুঁলো প্রায় -

‘বাচ্চা?’ 

‘জি, সম্ভবত একবছরের একটা বাচ্চা।’

ঋণার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল, ‘কোথায় দেখেছিস?’

হাসান ফোন বের করল। একটা ভিডিও প্লে করে সামনে ধরল। ঋণা হম্বিতম্বি করে ফোনটা দুহাতে নিয়ে চোখের সামনে ধরল। ভিডিওতে থাকা পুরুষটিকে চিনতে অসুবিধে হলো না। কালো থ্রিপিস স্যুট পরনে লম্বাচওড়া একটা শরীর গাড়ি থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়েছে। একহাতে একটা বাচ্চা বুকের কাছে জড়িয়ে রেখেছে ভীষণ যত্নের সাথে। পরনের কাপড়চোপড় বলে দিচ্ছে, মেয়ে বাচ্চা ওটা! তাদের ওপরে ছাতা ধরে রেখেছে শান্ত। বাচ্চাটাকে নিয়ে আদিল কোম্পানিতে প্রবেশ করছে। 

ঋণার হাত থেকে ফোন পড়ে গেল। দুলে উঠল তার দুনিয়া! সে কম্পিত গলায় আদেশ করল -

‘হসপিটাল থেকে খোঁজ নে বাচ্চাটার সম্পর্কে।’

হাসান সময় নেয়নি। খোঁজখবর নিয়ে এসেছে জানাল ঋণার অনুমান সঠিক। বাচ্চা আদিল মির্জার কাছে। জন্মের পরপরই নিয়ে গিয়েছে। ঋণা ঢোক গিলল। আওড়াল -

‘এখনো কোম্পানিতে?’

‘জি, বস!’

ঋণা সময় অপচয় করে না। ওভাবেই ছুটে বেরুল বাড়ি থেকে। গাড়িতে উঠে বসল। তার গাড়ির পেছনে হাসানও বেরিয়ে পড়েছে। সময় লাগল না বেশি। ঋণার এই ফ্ল্যাট আদিলের কোম্পানির কাছাকাছি। মিনিট দশেক লেগেছে। কোম্পানি থেকে একটু দূরেই গাড়িটা আড়াল করে পার্ক করল ঋণা। তার পেছনেই হাসান। সময় গড়াল আর গড়িয়ে গেল। বিকেল ডুবল, এই বুঝি ডুবে যাবে সন্ধ্যা। ঠিক ওসময়ে তোড়জোড়ের শব্দ ভেসে এল। কোম্পানির পার্কিং লট থেকে বেরুল চারটা গাড়ি। ঋণা ফলো করল দূর থেকে। গাড়িগুলো থেমেছে একটা বেবিশপের সামনে। দোকান ভরতি বাচ্চাদের সামগ্রী। আদিল মির্জা বেরুল ফের। ঋণা স্পষ্ট সামনাসামনি দেখল এবার। গম্ভীর নয়, ভীষণ শান্ত মুখ। চোখের দৃষ্টি শক্ত নয়, ভীষণ নরম। একহাতে বুকের কাছে রাখা বাচ্চাটা বোধহয় সজাগ। শব্দ করছে, বিপরীতে মাথা নুইয়ে আদিল আওড়াচ্ছে কিছু। পুরো দলবল নিয়ে প্রবেশ করল শপে। বেরুল চার পাঁচটা ব্যাগ সহ। 

ঋণা থমকে রইল ওখানেই। কতক্ষণ ঠিক, তার জানা নেই। 

 —————

         [ অতীত শেষ…. ]

—————

শুধু ঢাকাশহর নয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আদিল মির্জার অসংখ্য সম্পত্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বিলাসবহুল বাংলো, অট্টালিকা, আধুনিক বাড়ি, মূল্যবান জমিজমার মালিক সে। শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে তার একাধিক বাসভবন আছে। এই ফার্মহাজটিও তাদের একটি। এখানে এর আগেও অসংখ্যবার আসা হয়েছে ক্লান্তর। তারপরও মন ভরে না। এতটাই আরামদায়ক জায়গা এটা!! চোখ জুড়িয়ে আসে। লেকের দিকটায় দৃষ্টি পড়তেই শুনতে পেল শান্তর আগামাথা বিহীন প্রশ্ন -
‘কী মনে হয় তোদের? বস কি পারবে? পারবে ভোজনটা পুরোপুরি করতে এবার?’

শান্তর প্রশ্নে এলেনের মুখ থমথমে হয়ে এলেও ক্লান্তর অভিব্যক্তির তেমন আহামরি পরিবর্তন এল না। এলেনের ওমন ধারাল দৃষ্টির সামনে শান্ত একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলে ফেলল -

‘কী? আমারে বেশি হ্যান্ডসাম লাগতেসে? খমখম করে দুটো চুমু খেতে চাস?’

ক্লান্ত নির্বিকার চোখমুখে আওড়াল, ‘চুমু খমখম করে আবার কীভাবে খায়?’

এলেন নাকমুখ কুঁচকে রেখেছে। শান্তর চোখমুখ দেখে এবারে আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘তুই পেরেছিস? তোর ভোজন কি কমপ্লিট?’

সিগারেট মুখে শান্ত কেশে উঠল। কেশেকুশে নিজেকে স্বাভাবিক করে বুকটা ফুলিয়ে গর্বিত হয়ে বলল -

‘ভায়া, এতো হালকা নিও না আমাকে। বিয়ের রাতেই শেষ। গাড়িতেই। বুজছো?’

এলেন মিচকে হাসল, ‘তাই? যদি মিথ্যে বলে থাকিস তাহলে আমার অভিশাপ থাকবে যে তোর কপালে কয়েক মাসের ভেতরে আর ভোজন হবে ন—’

শান্ত ধড়ফড়িয়ে গিয়ে চেপে ধরল এলেনের মুখ। দাঁতে দাঁত পিষল -

‘তোর এটা মুখ নাকি রাইফেল শ্লা!! চোপ কর। এই অভিশাপ দিলে ম রেই যাব।’

ধ্রুব শব্দ করে হাসছে। শান্ত গাড়িতে পিঠ এলিয়ে তাকাল দোতলার দিকে। জানালার পাতলা পর্দার ওপাশে দুটো শরীরের আবছায়া বোঝা যাচ্ছে। দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে সরে এল ওখান থেকে। পিছু পিছু গেল বাকিরাও। 

—————

রোযার কানের কাছটায় কথাটুকু বেজে গেল অনেকটা সময় যাবত। কী নির্দ্বিধায় লোকটা এমন কথাগুলো বলে ফেলে! দুদিনের পরিচয়ে কেউ কাউকে এতটা চাইতে পারে? সম্ভব? 

 ‘তুমি শুধু আমার.... তুমি শুধু আমার!’

রোযার এমুহূর্তে আসলেই মনে হলো সে আসলেই আদিল মির্জার। ভুল বলেনিতো। তার অধীনে, তার দায়িত্বে। রোযার আশপাশের মানুষও তার ইশারায় থাকে। রোযার জীবন চলছে তার ইশারায়। তার চলাফেরা, তার দৃষ্টির সীমানাও আদিল মির্জার চাওয়া মোতাবেক ঠিক হয়। রোযার হৃৎপিণ্ড থমকে গেল ভয়ে! তার জীবন যার হাতের মুঠোয় থাকে তাকে কীভাবে ভয় না লাগে? 
রোযার সাহসের এখানেই ভেঙেচুরে নিমিষে বিনাশ ঘটে। আদিল তখনো এগুচ্ছে। তার একেকটি দৃঢ় কদমের আক্রমণের তোপে পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই সমানে পেছাতে বাধ্য হচ্ছিল রোযা। নীরবতা ভাঙল রোযার মিহি কণ্ঠের আকস্মিক প্রশ্নে -

‘আমার চাওয়ার দাম নেই! তাইতো, মিস্টার মির্জা?’

জবাবটা এল সময় নিয়ে -

‘আছে, আপনার চাওয়ার দাম। তবে ততক্ষণ যতক্ষণ আপনার চাওয়া আমি। আমার বাইরে আপনার আর কোনো চাওয়া থাকতে পারে না, মিসেস মির্জা।’

রোযা সতর্কতার সাথে পেছাতে পেছাতে এসে পৌঁছেছে জানালার কাছে। পিঠ স্পর্শ করেছে পর্দা। আদিলের একটা হাত চলে এল রোযার ডান কাঁধের ওপরে, গিয়ে থামল পেছনে, ঠিক কাচের ওপরে। আদিল ফিসফিস করে বলে -

‘আই ওয়ান্না নো হাউ প্যাশনিট আই ওয়াজ লাস্ট নাইট, মাই বিলাভড! ক্যান ইউ ইল্যাবোরেট, প্লিজ?’

রোযা প্রস্তুত ছিল এই কথার জন্য সে জানতো তাকে ধরা হবে। জিজ্ঞেস করা হবে। কিন্তু যখন সত্যি এতো কাছ থেকে প্রশ্নটা আদিলের গম্ভীর কণ্ঠ থেকে বেরুল রোযার শ্বাস গলায় আটকে গেল। হতবিহ্বল হয়ে তাকাতেই ধূসর চোখে দৃষ্টি পড়তেই লজ্জায় গা কাটা দিয়ে উঠল। চোখমুখ বুজে কোনোরকমে আওড়াল -

‘জাস্ট আ ক্যাজুয়াল রিমার্ক!’

‘কেমন হয় এই ক্যাজুয়াল রিমার্কটাকে সত্যে রূপান্তরিত করে ফেললে?’

রোযা সরে যেতে চাইল পাশ কাটিয়ে। পারল না! আদিল আটকে ফেলল তার বাহুর মধ্যিখানে -

‘আমাকে ভয় পাচ্ছো। কেন? ওদের সামনে চোটপাট দেখানোর সময় তো বিন্দুমাত্র দ্বিধাও দেখিনি। ভয় তো দূরের বিষয়। নির্দ্বিধায় বলছিলে!’

রোযা চোখ তুলে তাকাল না। দৃষ্টি রাখল আদিলের বুকে। শার্টের কয়েকটি বোতাম খোলা। উন্মুক্ত বুক থেকে চোখ সরাল। কণ্ঠ খাদে নামল তার। জবাবটা আওড়ানোর মতো এল -

‘তাদের থেকে রক্ষা করার জন্য আপনি আছেন বলেই ভয় লাগেনি। কিন্তু আপনার থেকে রক্ষা করার মতন কেউতো নেই। তাই ভয় হয়।’ 

পিনপতন নীরবতা বয়ে গেল। রোযা থমকে ছিল। যখন কোনো প্রতিক্রিয়া শুনল না, দেখতে পেল না আশ্চর্য হল। দ্বিধা নিয়ে যখন তাকাল দেখল আদিলের হতভম্ব চোখমুখ। ওই চোখে কী হচ্ছিল জানা নেই তার! তবে নিজের সর্বনাশ ব্যতীত যে আর কিচ্ছু ছিল না। রোযা উপলব্ধি করল তার হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। তাকিয়ে থাকতে পারল না আর। দৃষ্টি নামাল। অনুভব করল সময় নিয়ে আদিলের রুক্ষ হাতটা তার গাল ছুঁয়েছে। নরম গালটা খসখসে হাতে বুলিয়ে গেল অনেকটা সময় ধরে। মাথাটা নুইয়ে এল আদিলের, কপাল থামল তার কাঁধে। কিছুক্ষণ ওমন ভাবেই থাকল আদিল। নড়ল না রোযাও। ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। চেয়ে আছে আদিলের মাথার দিকে। এলোমেলো চুলগুলো হালকা বাতাসে নড়ছে তিরতির করে। আদিলের ভারি, অদ্ভুত স্বর শোনা গেল -

‘যেই ভয় তোমাকে আমার সাথে বেঁধে রাখবে ওই ভয়টা থাকুক, রোজ-আ। শুধু আমার জন্যই থাকুক। এই দুনিয়ার কাউকে ভয় করতে হবে না তোমার। আমি আছি তাদের আগে। তোমাকে ছোঁয়ার আগে তাদের আমাকে ছুঁয়ে যেতে হবে।’

রোযা চোখ বুজল। চোখের সামনে ভেসে বেড়াল —বৃষ্টির পানি, কাদামাটিতে ভেজা পা-জোড়া মোছানো সেই আদিল। কানে ভেসে এল -

'আঠারো বসন্ত সুখের চাদরে কাটিয়ে বাকিটা বসন্ত জীবিত লা শের মতন কাটিয়েছি। স্বর্গ থেকে নেমে পড়েছি নরকের মতন এই কালো দুনিয়ায়। বাদবাকিটা জীবন কাটাতে এই নরককেই স্বর্গ বানিয়ে দেব তুমি পাশে থাকলে।'

রোযার চোখ ভিজে উঠল। জানল না কেন! অনুভবও করল না তার গাল ভেজা। শুধু বুঝল সে প্রশ্ন করছে অস্পষ্ট কণ্ঠে -

‘আমাকে কখন থেকে চেনেন?’

আদিল মাথা তুলল না। পড়ে রইল দুর্বল কাঁধটায়। যেখানে মনে হলো সুখের রাজ্য -

‘যে যে পথ দিয়ে তুমি হেঁটে এসেছো সে সব পথ আমার মুখস্থ।’

রোযার কণ্ঠ বুজে এল। কাঁপল হাত। শুধাল -

‘ক্যাফ…কোনো ক্যাফে চেনেন? এসেছিলেন কখনো?’

আদিল মাথা তুলল। তাকাল রোযার ফ্যাকাসে মুখে, ভেজা চোখে। ওই চোখে নিজের মরণ ছাড়া সে কিচ্ছু দেখতে পেল না। 

‘আয়াত তালুকদার রোযা, ক্যাশিয়ার অভ দ্য রয়্যাল ক্যাফে। ডিউটি টাইম ওয়াজ সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা নয়টা।’

ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা রোযা বুঝল সে আর কথা বলতে পারছে না। নড়তে পারছে না। মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে। ওসময়ে শান্তর ডাক পড়ল। গুরুত্বপূর্ণ কিছু, ডাকেই বোঝা যাচ্ছে। আদিল সম্ভবত হাসল। সরে এল আওড়াতে আওড়াতে -

‘বলেছিলাম না? আমি কোন পর্যায়ে যেতে পারি তোমার ধারণা নেই। আমি সব পর্যায় অতিক্রম করে তোমাকে এনেছি রোজ-আ। আমার করে নিতে।’

আদিল চলে গেলেও রোযা নড়তে পারল না। শুধু দেখল আদিল বেরিয়ে গিয়েছে। গাড়ি বেরুনোর আওয়াজ ভেসে এসেছে। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp