করাঘাত পড়ল দরজায়। সাথে মৃদুস্বরে ডাক পড়ে, ‘ম্যাডাম, আসব?’
রোযা চোখ মেলে তাকাল। দম ছাড়ল। কানের কাছে সাইরেনের মতো বাজতে থাকা আদিল মির্জার কণ্ঠ সরাতে মাথা ঝাঁকাল কয়েকবারই। তার আত্মা ছিনিয়ে নেয়ার মতো ওই কথাগুলোর প্রভাব এতো দ্রুতো বুঝি যাওয়ার নয়! নিজেকে ধাতস্থ করতে কিছুটা সময় নিল। দুহাতে চোখমুখ মুছে আস্তে করে অবশেষে বলল -
‘আসুন…’
দরজা মেলে প্রবেশ করল একজন নারী। বয়সটা আনুমানিক চল্লিশের কাছাকাছি। পরনে সুতি শাড়ি। তার পেছনে দুজন কাজের লোক। তাদের একজন ঠেলে এনেছে খাবারের ট্রলি, অন্যজন পোশাকের। সামনের জন, দায়িত্বে থাকা নারী আড়চোখে একবার রোযার মুখে চেয়ে মৃদু হেসে পরিচয় দিল -
‘আসসালামু আলাইকুম, ম্যাডাম। আমি নূরজাহান। আপনার জন্য পোশাক এনেছি সাথে খাবার। ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নিন প্লিজ। দেখুন খাবার আপনার টেস্টের সাথে যায় কি-না? ভিন্ন কিছু করে আনব কী? আপনার পছন্দনীয়?’
রোযা কথা বলতে গিয়ে খেয়াল করল কণ্ঠ ভাঙা ভাঙা লাগছে। গলা শুকিয়ে কাঠকাঠ হয়ে আছে। নূরজাহান চটজলদি ট্রলিতে থাকা কাচের জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে আনল। এগিয়ে এসে বাড়িয়ে ধরল -
‘ম্যাডাম, একটু পানি পান করুন।’
রোযা পানির গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে গিলল প্রথমে। শান্ত হয়ে তাকাল ভদ্রমহিলার মুখে। সুশ্রী মুখ, লম্বাচওড়া, শ্যামবর্ণের রুচিশীল নারী। চেহারায় বিনয়ী ছাপ। সেভাবে তেমন একটা রোযার দিকে তাকাচ্ছে না। দৃষ্টি নুইয়ে রেখে কথা বলছে। রোযা খেয়াল করেছে আদিল মির্জার আশেপাশের লোকজন ভীষণ শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়। তা তার বডিগার্ড হোক অথবা বাড়ির কাজের লোক। ভয়, জড়তা তাদের ভেতর খুব কম। যা সবচেয়ে বেশি আছে তা বাধ্যতা। নূরজাহান ইশারা করতেই কাপড়ের ট্রলি ঠেলে এগিয়ে এল একজন। নূরজাহান বলল -
‘ম্যাডাম, পছন্দ করুন…’
রোযা তাকাল। যে-ধরনের কাপড়চোপড় দৈনন্দিন সে পরে তাই সাজিয়ে রাখা। এখানে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে আচমকা। একমুহূর্তের মধ্যে! এতো রাত করে নিশ্চয়ই শপিং করে আনানো হয়নি। পোশাক এল কোথা থেকে তবে? রোযার কণ্ঠ ক্লান্ত শোনাল এইপর্যায়ে -
‘কাপড়চোপড় আগে থেকে ছিল?’
‘জি, ম্যাডাম। কিনে রাখা ছিল। বক্স গুলো খোলা হয়েছে আজই।’
রোযা চোখ বুজল। চোখ মেলে যখন তাকাল সে স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে এল ট্রলির কাছে। সাজিয়ে রাখা কাপড়চোপড় গুলো স্পর্শ করল। পছন্দ মতো একটা কালো রঙের সিল্কের নাইট গাউন আর সফেদ তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। যখন বেরুল তখনো নূরজাহান দাঁড়িয়ে আছে একইভাবে। রোযা চমকে দ্রুত বলল -
‘দাঁড়িয়ে ছিলেন কেনো? বসুন বসুন, মিসেস নূরজাহান।’
নূরজাহান হাসে। বলে, 'সারাদিন তো বসেই থাকি ম্যাডাম।’
তখন রুমটা ভালোভাবে দেখতেও পারেনি রোযা। আপাতত চারিপাশে নজর বুলিয়ে শুধায় -
‘এই ফার্মহাউজের কেয়ারটেকার আপনি?’
নূরজাহান আড়চোখে তাকাচ্ছে বারেবারে। রোযাকেই দেখছে কেমন!
‘আমার স্বামী, আমিনুল রশীদ…তিনি দায়িত্বে আছেন। আমি সাহায্য করি পাশাপাশি।’
মাথা দোলাল রোযা। এসে থামল ট্রলির সামনে। প্লেটে পছন্দ মতো খাবার নিয়ে বসল সোফায়। খেতে খেতে জিজ্ঞাসাবাদ করে গেল -
‘এখানে আপনাদের স্যার তেমন আসেন না?’
নূরজাহান গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলল, ‘এদিকে কাজ পড়লে আসেন। এমনিতে সারাবছর ফাঁকা পড়ে থাকে।’
‘আপনার স্যার বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন?’
‘জি, ম্যাডাম।’
রোযার মাথায় অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যদি তাকে রয়্যাল ক্যাফে থেকে চিনে থাকে তবে কী তার মির্জা বাড়িতে কাজের জন্য আসাও আদিল মির্জার ইশারা ছিল? নাহলে হঠাৎ এমন একটা চাকরির অফার তার মতো কেউ কেনো পাবে? রোযার পেট কামড়ে উঠল। মনে পড়ল জিহাদের কথা। হঠাৎ মনে পড়ল ওইসময়ে তো সে জিহাদের কাছে ওয়াদাবদ্ধ। রোযা জিহাদকেই বিয়ে করবে তার জবান দিয়েছিল সে! কিছু একটা ভেবে রোযার গলায় ভাত আঁটকে গেল……
‘ম্যাডাম?’
ভাতটুকু গিলল রোযা। মাথা নাড়িয়ে বোঝাল, কিছু না। এসব বাদ রেখে ভাবল হৃদির কথা। কী করছে মেয়েটা তার? মাঝরাতে ঘুম ভাঙার স্বভাব আছে। ঘুমের মধ্যেই হাতড়ে হাতড়ে তাকে খুঁজে বেড়ায় বিছানা জুড়ে। না পেলেই চমকে উঠে পড়ে। চিন্তা হলো রোযার। ঘুম ভাঙল কি-না?
‘ম্যাডাম, খেয়ে বেরুবেন? লেকের পাড়টা সুন্দর! খাওয়ার পরে ডাইজেস্ট করার সময়টুকুতে না-হয় হাঁটলেন?’
রোযা আশেপাশে তাকাতে পারেনি তখন। তারও বাইরের আশপাশটা দেখার বাসনা জন্মেছে। খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল। নূরজাহান একটা চাদর এনে দিল। সেটায় দু-কাঁধ প্যাঁচিয়ে রুম ছেড়ে বেরুল রোযা। ফার্মহাউজটা সৌখিনতার সাথে বানানো। রুচিসম্মত আসবাবপত্রের ছোঁয়া ভেতর জুড়ে। ফায়ারপ্লেসের জায়গাটুকু কী চমৎকার! রোযা ফায়ারপ্লেসের সামনে এসে দাঁড়াল। জ্বলন্ত ফায়ারপ্লেসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকায় একপর্যায়ে মনে হলো আগুনে ভেসে উঠল আদিলের চোখমুখ। রোযা অবাক হলো না অবশ্য। বিড়বিড়াল শুধু -
‘আগুনের ওপরে আগুন।’
নূরজাহান কান পেতে ছিল, ‘কিছু বললেন ম্যাডাম?’
‘কিছু না।’
রোযা বেরিয়ে এল বাইরে। সিঁড়ি তিনটে বেয়ে নামতে নিয়ে খেয়াল করল চেনাপরিচিত দুটো মুখ। ক্লান্ত গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিগারেট ঠোঁটে চেপে রেখেছিল। ধ্রুব বসেছিল পাশেই। রোযাকে দেখে দুটো সটানভাবে দাঁড়িয়েছে। ক্লান্ত সিগারেট ফেলে দিয়েছে। রোযা দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকাল লেকপাড়ের দিকে। ল্যাম্পপোস্টর আলোয় স্বচ্ছ পানিগুলো কী জীবন্ত দেখতে লাগছে! ওখানে মার্বেলের বেঞ্চি রাখা বসার জন্য। রোযা অবশ্য বসল না। সে হাঁটল লেকপাড় জুড়ে। দেখতে পেল নানান রঙের পাথর। তার পেছনে নূরজাহান, ক্লান্ত, ধ্রুবও হাঁটছে। বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখেই। রোযা হাঁটতে জিজ্ঞেস করে -
‘তোমার বস কোথায় গেল এতো রাতে?’
ক্লান্ত বরাবরই নির্বিকার, ‘একটার পাখা গজিয়েছে। তা কেটে দিতে।’
রোযা ওসম্পর্কে আর জিজ্ঞেস করে না। ম্যানশনের ব্যাপারে প্রশ্ন করে -
‘ওখানে তখন আইজিপি, পুলিশ, মিডিয়া ছিল। ওরাও কি পুড়েছে?’
‘না…তারা বেরিয়ে আসতে পেরেছে।’
রোযার কপালে ভাঁজ পড়ল বেশ কয়েকটি, ‘আইজিপির ভাগ্নেটা?’
ধ্রুব দিল জবাব খানা, ‘পুড়েছে….’
রোযার মায়া কাজ করল না। ওমন অমানুষ ম রলে বরং মঙ্গল। তার চিন্তা অন্যদিকে -
‘এখন ওই আইজিপি তবে ঝামেলা করবে না?’
ক্লান্ত আড়চোখে তাকাল ম্যাডামের চিন্তিত চোখমুখে। আস্তে করে জানাল -
‘এমন আইজিপি আমার বস পকেটে নিয়ে ঘোরে। ম্যাডাম, চিন্তা করবেন না।’
রোযার চিন্তা কমল না। তবে থামল তার কদম। বুকের কাছে দুহাত বেঁধে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে বলল -
‘আর ওই মহিলা– ঋণা সওদাগর, সে ঝামেলা করবে না?’
ক্লান্ত থমকাল। তাকাল রোযার শান্ত মুখের দিকে। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে ভাবল কিছুক্ষণ। সময় নিয়ে কোনোরকমে বলল -
‘চিন্তা করবেন না ম্যাডাম।’
আকাশে অর্ধখণ্ডিত চাঁদ তখন লেকের নদীতে ভেসে উঠেছে। রোযা ওখানে চেয়ে থেকেই আচমকা শুধায় -
‘শান্তদের গ্রামে যে আক্রম ণ হলো, ওটা কি ঋণা সওদাগর করিয়েছিল?’
চমকে ওঠে ক্লান্ত, ধ্রুব। ক্লান্ত দ্রুত বলে ওঠে, ‘কীভাবে বুঝলেন ম্যাডাম?’
‘আমি তাকে দেখেছিলাম ওখানে।’
রোযা থামল। ফিরে তাকাল অবশেষে। ক্লান্তর মুখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট, দৃঢ় স্বরে শুধাল -
‘সে কি আমার মেয়েকে কোনোভাবে নিতে চাচ্ছে?’
আমার মেয়ে! কী জোর ছিল ওতে! ক্লান্তর গলায় শ্বাস আটকে আসে। চোখ তুলে তাকায় না। শুধু বলে -
‘চাইলেই কি সব পাওয়া সম্ভব?’
রোযার প্রত্যুত্তর সময় নিয়ে আসে, ‘হু, সম্ভব না।’
ক্লান্ত দৃষ্টি নুইয়ে রেখে দেখল সামনে থেকে শরীরটা চলে যাচ্ছে। মৃদু বাতাসে উড়ছে চাদর, উড়ছে চুল। রোযার পেছন পেছন নূরজাহান বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছে। এযাত্রায় ধ্রুব বড়ো করে শ্বাস টেনে নিল। বাড়ির দরজার দিকে চেয়ে ফিরে তাকাল ক্লান্তর দিকে। মুগ্ধ হয়ে আওড়াল -
‘বসের চিরসঙ্গিনী….তার মতোই।'
ক্লান্ত মৃদু হাসে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় লেকের জলে, ‘ম্যাডাম নিজেও জানতে পারলেন না তিনি প্রবেশ করতে শুরু করেছেন বসের জীবনে। এইতো শুরু…’
ধ্রুব ঠোঁট নাড়ায়, ‘শান্তিইইই!’
—————
গাড়িটা সড়কপথে চলছিল তখনো। আদিল মুখের সামনে ফোন ধরে রেখেছে। স্ক্রিনের ওপাশে হৃদি কেঁদেকেটে সদ্য ঘুম ভাঙা চোখমুখ লাল করে ফেলেছে। এখনো ফোঁপাচ্ছে। ধূসর মণিজোড়া জলে ভেসে আছে। হেঁচকি তুলে তুলে প্রশ্ন করে যাচ্ছে -
‘মম কোথায়?’
মেয়ের অস্থির মুখে চেয়ে আদিল শুধাল, ‘এসময়ে ঘুম ভেঙেছে কেনো?’
‘ঘুমের মধ্যে মমকে খুঁজে পেলাম না যে! এখন বলো হোয়্যার ইজ শি? কখন ফিরবে?’
আদিল দেখল মেয়ের ব্যাকুল হাবভাব, চোখমুখ। বলল -
‘তোমার মমের মন খারাপ। তাই তাকে ঘুরতে এনেছি। কাল চলে আসব। তুমি একদিনের জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না, সোনা?’
হৃদির চোখ দুটো বড়ো হয়ে গেল, ‘মমের মন খারাপ?’
‘হু…শি ইজ আপসেট।’
‘মম কেনো আপসেট ড্যাড? কারণ তুমি বাসায় ফেরো না? তাই?’
আদিল বরাবরই মেয়ের হিমালয়ের সমান এমন এবড়োখেবড়ো উঁচু যুক্তির সামনে নির্বিকার। এবারও তাই -
‘হ্যাঁ…. ‘
‘তুমি কেনো তাহলে বাড়ি ফিরছিলে না, ড্যাড? তুমি ফিরলে তো মা আপসেট হতো না। এখন কি মম অনেক আদর চাচ্ছে আমার মতো? বায়না করছে? প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট চাচ্ছে, আমি আপসেট হলে যেভাবে চাই তোমার কাছে?’
হৃদির কান্না থেমেছে। আগ্রহ নিয়ে চেয়ে আছে বাবার মুখে। হঠাৎ খ্যাক শব্দে নীরবতা ভাঙল। আদিল বিরক্তি নিয়ে তাকাল সামনে। শান্ত নিজের মুখ ধরে রেখেছে দু-হাতে। আদিল চোখ রাঙাতেই শান্তর মুখ গম্ভীর হলো। এই জনমের জন্য বুঝি হাসাহাসি বাদ তার জীবন থেকে! আদিল ফের স্ক্রিনে চেয়ে বলল -
‘হ্যাঁ, তাই। তাইতো নিয়ে এসেছি। তোমার মমের মন ভালো করে ফিরে আসব, হুম? তুমি কান্নাকাটি করবে না, ঠিকাছে? চোখমুখ মোছো, আমার বাচ্চা।’
হৃদি চোখমুখ মুছতে মুছতে বলল, ‘মমকে কি আদর করেছো এক্টু? মমের মন খারাপ এক্টু কমেছে?’
আদিল সাবলীলভাবে বলে গেল, ‘করেছি। শি ইজ…. উম হ্যা পি।’
ড্রাইভিং সিটের পাশে বসা শান্তর চোখ লাফাল। এলেন ঠোঁটে ঠোঁট টিপে রেখেছে! হৃদি বলে যাচ্ছে তখনো -
‘বেশি বেশি আদর করে মমের মন খারাপ দূর করে দাও ড্যাড। অ্যান্ড কাম ব্যাক অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল। আইম মিসিং ইউ অ্যান্ড মম!’
বলতে বলতে মেয়ের শুকিয়ে আসা চোখজোড়া আবারও ভিজতে দেখে আদিল দ্রুতো বলল -
‘কালই চলে আসছিই, সোনা। স্টপ ক্রায়িং! তুমি কাঁদলে তোমার মম আরও আপসেট হবে। তুমি চাও তোমার মম আপসেট হোক?’
হৃদি নাক টেনে বলল, ‘আই ডোন্ট।’
‘স্মাইল ফর মি…’
হৃদি চোখে জল নিয়ে সবগুলো দাঁত বের করে হাসল। আদিলের ঠোঁট নড়ে। নরম দৃষ্টিতে চেয়ে আওড়ায় -
‘মাই গুড গার্ল, ঘুমাও তবে এখন? ঘুম ভেঙে মমের সাথে কথা বলো, হু?’
হৃদি মাথা দুলিয়ে বলে, ‘আচ্ছা…সকালেই বলব।’
‘ওখেই, সকালেই বলো।’
হৃদি কল কাটছে না। চেয়েই আছে। আদিল জিজ্ঞেস করল, ‘কী বলবে?’
‘আমার হয়েও মমকে অনেক আদর দিও।’
‘দেব….’
কল কেটে গিয়েছে। গাড়িতে নামল নীরবতা। সেই নীরবতা হঠাৎ ভাঙল শান্তর অট্টহাসিতে। হাসতে হাসতে ড্রাইভ করা এলেনের গায়ের ওপরে হেলেদুলে পড়েছে। আদিলের হাতে যা ছিল তাই পড়ল শান্তর মাথায়।
—————
আদিল মির্জা আর ফেরেনি রুমে। রোযা ঘুমিয়েছে কয়েক ঘণ্টা। হৃদিকে নিয়ে একটা বাজে স্বপ্ন দেখায় ঘুমটা আচমকা ভেঙে গিয়েছে। ঘড়ির কাটা ছয়টা স্পর্শ করেনি। রোযা বিছানা ছাড়ল। বেড সাইড টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি খেল। রুমে পায়চারি করে এসে দাঁড়াল জানালার সামনে। পর্দা, কাচ সরাল। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এল পাখির কিচিরমিচিরের সুমধুর ধ্বনি। ঠান্ডা হাওয়া চোখমুখ ছুঁলে কী ভীষণ শান্তি লাগল! রোযার চোখ নিচে পড়ল। সূর্যটা পুরোপুরি ওঠেনি তখনো। আধো আধো আলোয় লেকের পাড়টা দেখা যাচ্ছে। কাকে একটা যেন ধরেবেঁধে, মেরেমুরে ফেলে রাখা হয়েছে। মুখ বাঁধা অজানার। কাইকুই করছে, হাত-পা নাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত। ওখানে আদিল মির্জা তার দলবল নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। সবার গায়ে স্যুট থাকলেও মধ্যে দাঁড়ানো আদিলের পরনে শুধু গতকাল রাতের প্যান্টটাই। উদোম শরীর। তার সামনে সুইং বক্সিং ব্যাগ রাখা। ঘুরে ঘুরে বক্সিং করছে। ফুটওয়ার্কের মুভমেন্টে এতো দ্রুতগতিতে হচ্ছে যে তাঁক লেগে গেল। রোযা চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই আদিলের এক রাউন্ড দেয়া শেষ। বাহুর মাংশপেশি গুলো কীভাবে ফুলেফেঁপে উঠছে! রোযা বিড়বিড়িয়ে ওঠে -
‘এইজন্যই ধরলে নড়তে পারি না। রাক্ষুসে শরীরে রাক্ষসের মতো শক্তি!’
কথাটুকু বলে রোযা নাকমুখ কুঁচকে রেখেছে। আদিল বক্সিং করতে করতে কথা বলছে কোনো ব্যাপার বোধহয়! ঘেমেনেয়ে লোকটা একাকার! ঘুমায়নি সারারাত? খায়নি? রোযা দুটোর একটাও করতে দেখেনি। এতো এনার্জি আসে কোথা থেকে? আচমকাই আদিল ঘুষি ছুঁড়তে ছুঁড়তে তাকাল। অদূর থেকেও মনে হলো রোযা ধূসর মণিজোড়া দেখছে! দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই থামল আদিল। রোযা দৃষ্টি ফিরিয়ে জানালা থেকে সরতে চাইল, তার পূর্বেই আদিল হাতের ইশারায় বোঝাল নিচে নামার জন্য। রোযা সরে এল জানালার সামনে থেকে। গতকাল রাতের চাদর গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এল রুম থেকে।
দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমিনুল রশীদ। রোযাকে আসতে দেখে একপাশ হয়ে দাঁড়ালেন -
‘গুড মর্নিং, ম্যাডাম।’
রোযা তাকাল না। বেরুতে বেরুতে আওড়াল, ‘মর্নিং…’
রোযা খেয়াল করল জখমিত অবস্থায় জমিনে যে লোকটা পড়ে ছিল সে আর নেই। ওই জায়গা পরিষ্কার, ভেজা। র ক্তের দাগও নেই। রোযাকে আসতে দেখে আদিলের আশপাশ থেকে বডিগার্ড সব সরে দাঁড়িয়েছে। আদিল চেয়ে আছে তার দিকেই। তার একেকটা কদমের দিকে। রোযার পাজোড়া হঠাৎ থেমে যেতে চাইল। মাথায় প্রশ্ন জাগল, এই লোকটার এক ইশারায় সে নেমে এল কেনো? কোন দরকারে? আশ্চর্য তো!
'মর্নিং মিসেস মির্জা!’
রোযা আড়চোখে একবার চেয়ে আর তাকাল না। আদিলের ফর্সা পেশিবহুল শরীরে ঘাম চিকচিক করছে মুক্তোর দানার মতন। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ঘামে লেপ্টে আছে কপালের দিকে। রোযা আওড়ায় -
‘মর্নিং…’
আদিল এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে। তাদের মধ্যে দূরত্ব রেখেছে বেশ খানিকটা। আদিল মিহি কণ্ঠে প্রশ্ন করল -
‘বক্সিং করবেন?’
রোযা তাকাল শক্তপোক্ত জিনিসটার দিকে। ওটায় ঘুষি বসালে তো রোযার আঙুল গুলোই ভেঙে যাবে! আদিল সম্ভবত বুঝল রোযার না বলা কথাগুলো -
‘প্রথমে ধীরে ধীরে ফিস্ট ছুঁড়তে হয়…’
রোযা সামান্য ইতস্তত করল, ‘ব্যথা পাওয়া ছাড়া এতে লাভ কী?’
রোযা স্পষ্ট শুনল আদিলের গম্ভীর কণ্ঠের চাপা হাসির শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকাতে চেয়েও তাকাল না। সেকখনো আদিল মির্জাকে হাসতে দেখেছে? মনে হয় না!
‘শারিরীক অনেক উপকারিতা আছে।’
রোযা গলাটা পরিষ্কার করে একহাতে গায়ের চাদর জড়িয়ে রেখে অন্যহাতে শক্তপোক্ত একটা ঘুষি বসিয়ে বুঝল তার হাতের আঙুল পুরোপুরি জমে গেছে। হাতের রগে টান খেয়ে হাত অবশ হয়ে গেছে। রোযার থতমত মুখ দেখে আদিলকে ফের হাসতে শোনা গেল -
‘আমার ননির পুতুল…দেখিই!’
রোযার কান গরম হয়ে এল। স্তম্ভিত হল শরীর। বলতে বলতে আদিল নিজের ঘামে ভেজা শরীরটা মুহূর্তে তার পিঠের সাথে মেশাল। থুতনি ঘাড়ে রাখল। ফর্সা হাতটা টেনে এনে নিজের হাতের মুঠোয় ভরে নিলো। রক্তিম হয়ে গেছে রোযার মুষ্টির গিট। আদিল খসখসে হাতে বুলিয়ে দিতে নিয়ে ফিসফিস করে বলে গেল -
‘বললাম না ধীরে ছুঁড়তে? ওটা শক্ত! বেশি ব্যথা করছে?’
রোযার ঘাড়ে সুড়সুড়ি লাগছে। কানের কাছটায় গরম শ্বাস পড়ছে। শুধু দেখল তার হাতের তুলনায় ভীষণ বড়ো হাতটা কেমন জড়িয়ে আঙুল গুলো বুলিয়ে যাচ্ছে। আদিল হাঁক ছাড়ল -
‘শান্ত, দেখ অ্যান্টিবায়োটিক মলম আছে কি-না!’
শান্ত সঙ্গে সঙ্গে মলমের খোঁজে চলে গিয়েছে। রোযা মুখ খুলে বলতে চাইল লাগবে না মলম। অথচ খেয়াল করল তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরুচ্ছে না। আদিল ইতোমধ্যে তাকে নিয়ে কদম বাড়িয়েছে লেকের দিকে। মার্বেলের নোয়ানো বেঞ্চিতে বসিয়ে রোযার সামনেই বসল দু-পায়ের ওপরে ভর দিয়ে। ওভাবে বসেও মানুষটা রোযার বুক বরাবর চলে এল। রোযা তাকাল মুখের দিকে। আদিলের দৃষ্টি নোয়ানো, তার হাতের ওপর। হাতটা আচমকাই নিজের ঠোঁটের সংস্পর্শে নিয়ে গেল। ঠোঁটে স্পর্শে পেয়ে রোযা মিইয়ে যায়। বিচলিত হয়ে চোখ বুজে ফেলে শক্ত করে।
শান্ত মলম নিয়ে ফিরে এসেছে। আদিলকে দিয়ে পুনরায় দূরত্বে দাঁড়িয়েছে। আদিল সময় নিয়ে মলম লাগাল রোযার আঙুলের গিটের ভাঁজে ভাঁজে। অবশেষে আওয়াজ ফিরে পেল রোযা -
‘ব্যথা করছে না।’
আদিল মাথা তুলে তাকাল। রোযা সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি নুইয়ে ফেলল। জিজ্ঞেস করল -
‘কখন ফিরব? হৃদির সাথে কথা হয়েছে? ওর মধ্যরাতে ওঠার অভ্যাস আছে।’
‘কথা হয়েছে রাতে। ঘুম থেকে উঠে কল করবে।’
‘ফিরব কখন?’
আদিল জবাব দিল না সেকথার। হাত বাড়িয়ে রোযার মুখের সামনের চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল পরম যত্নের সাথে।
—————
সকালের নাস্তা করে রোযা বসেছে বসবার ঘরে। নূরজাহান গল্প বলছিল। তার আর তার স্বামীর ভালোবাসার গল্প। রোযা মন দিয়েই শুনছিল। তখুনি শান্ত এসে ফোন ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছে। স্ক্রিনে হৃদির হাস্যোজ্বল মুখ। সবগুলো দাঁত বের করে পরীর মতন হাসছে। রোযা হতবাক। ঘুম থেকে উঠে রোযাকে না পেয়েও বাচ্চাটা হাসছে? কাঁদছে না কেনএইতো জানপ্রাণ দিয়ে মিস করে! স্ক্রিনের অপর পাশের হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখে প্রশ্ন করেই বসল -
‘তুমি হাসছো মা?’
হৃদি দাঁত বের করে বলল, 'হু! তুমি কি খুব এঞ্জয় করছো, মম?’
রোযা আশ্চর্য, ‘কী এঞ্জয় করব?’
‘ড্যাডের আদর।’
‘হোয়াট!!’
‘ড্যাড বলেছে তুমি আদরের জন্য বায়না করেছো। যেভাবে আমি করি। তোমাকে তাই স্পেশাল প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট আদর দিতে ওখানে নিয়ে গিয়েছে।’
রোযার চোখমুখ থমথম করছে। মেয়েটা তার বলছে কী? ওই অসভ্য লোক তার মেয়েকে এসব কী শিখিয়েছে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………