কালান্তরের কন্যা - পর্ব ০৭ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

কালান্তরের কন্যা - ইলমা বেহরোজ
          কাজলী ভড়কে গেল। শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। ওর মনে হলো, জানালার কাঠের পাল্লা দুটো বুঝি এখনই মড়মড় করে ভেঙে আশিক ঘরের ভেতর ঢুকে পড়বে। বিছানা হাতড়ে যখন কাউকে পেল না, জ্বরে পুড়ে খাক হওয়া দুর্বল শরীরটা আতঙ্কে আরও বেশি কুঁকড়ে গেল।

আশিকের ফিসফিসে কণ্ঠ ভেসে এলো, “কামডা ভালো করস নাই কাজলী। দেশের মানুষের সামনে আমগোর অনেক বড় অসম্মানি করছস। এতদিন একলা নিজের কইরা চাইছিলাম তোরে, এহন হাটে নিয়া নিলামে তুলমু! খেলা তো কেবল শুরু হইল। কয়টা দিন মনডা ভইরা ঘুমায়া নে। কেউউউউ তোরে বিরক্ত করব না। শান্তির মায়রে নিয়া মনডা ভইরা ঘুমা। আমি কয়দিন পড়েই আইতাছি। তহন আমার লগে, আমগো সবার লগে ঘুমাবি।”

বলেই আশিক শয়তানের মতো হেসে উঠল। গা হিম করা সেই হাসি৷ ওর হাসির সাথে যোগ দিল আরও একটা চেনা কণ্ঠের খিলখিল শব্দ। রুমেল! ওরা তবে দুজন একসাথে এসেছে! কাজলীর শেষ মনোবলটুকু গুঁড়িয়ে দিতেই ওদের আগমন। যাতে প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা মুহূর্ত কাজলী আতঙ্কে কাটায়। একটা মুহূর্তের জন্যও যেন শান্তিতে চোখের পাতা এক করতে না পারে। ওদের পায়ের শব্দ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতেই কাজলী ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। শরীরটা টেনে কোনোমতে পাশের ঘরে গেল। সেখানে ঘুমিয়ে থাকা মা আর বোনের পায়ের কাছে সামান্য একটু ফাঁকা জায়গায় ও কাচুমাচু হয়ে কুঁকড়ে শুয়ে পড়ল।

বুকের ভেতরটা তখনো হাপরের মতো ওঠানামা করছে। একে তো জ্বরে শরীরটা ভেঙে আসছে, তার ওপর ফারাজের বেইমানির পর মনটাও বড্ড ভঙ্গুর আর সংবেদনশীল হয়ে আছে। এর মধ্যে আবার নিশিরাতের অন্ধকারে আশিকের রক্তহিম করা হুমকি! নিজের অজান্তেই গা শিউরে উঠছে। 

ঠিক কী ধরনের পরিকল্পনা করছে ওরা? যদি দলবল নিয়ে একযোগে বাড়িতে হামলা করে? কিংবা যখন প্রতিদিনের মতো টিউশনিতে যাবে, তখন যদি পথ থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়? যদি মুখে এসিড ছুড়ে মারে?

ওর স্মৃতিতে হঠাৎ ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর ওরই কলেজ ক্যাম্পাসে সংঘটিত খাদিজা আক্তার নার্গিসকে চাপাতি দিয়ে নির্মমভাবে কোপানোর ঘটনাটি চলে এলো। তৎকালীন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলম প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় খাদিজাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছিল। যদি এমন কিছু তার সঙ্গেও ঘটে? ভাবতেই কাজলীর হাত-পা ঝিম ধরে গেল। কাল সকালেই থানায় গিয়ে এদের নামে একটা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে আসবে।

জ্বরে কাজলী তখন থরথর করে কাঁপছে। গায়ের পাতলা কম্বলটা ভেদ করে হিমশীতল স্রোত হাড়ের ভেতর গিয়ে বিঁধছিল। একটা ভারী লেপ বা কম্বল প্রয়োজন। কিন্তু কে এনে দেবে? আলমারির ভারী ডালাটা খুলে কম্বল টেনে বের করার মতো শক্তি ওর শরীরে নেই। পাশেই পঙ্গু বোন আর অসুস্থ মা-টা পরম শান্তিতে ঘুমোচ্ছে। এত যন্ত্রণা নিয়েও ওদের ডাকতে কাজলীর মন সায় দিল না। দমবন্ধ করা অসহায়ত্ব ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল।

যদি কেউ একজন থাকত, খুব মায়া নিয়ে খুব শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরত, কপালে হাত রেখে ফিসফিসিয়ে বলত, “ভয় নেই কাজলী, আমি আছি তো!” তাহলে হয়তো শরীরের মরণ-কাঁপুনিটা থেমে যেত। মনের ভেতর জমে থাকা পাহাড়সম ভয়টাও কর্পূরের মতো উবে যেত। হায়রে অবুঝ স্বপ্ন! হায়রে নির্লজ্জ, অবাধ্য মন!

এই এক জীবনে মানুষ আসলে খুব বেশি কিছু চায় না, কেবল একটা বিশ্বস্ত মানুষই চায় নিজের করে। যে দুঃখ-কষ্টের দিনে, অবহেলা আর অপমানের তপ্ত মরুভূমিতে একটু শীতল আশ্রয় হয়ে পাশে দাঁড়াবে। দুর্ভাগ্যবশত, জীবনের সবচেয়ে সহজ এই চাওয়াটুকুই অনেকের কপালে জুটে না।

ইউসুফের ছোট বোন সিমরান যেমন অসম্ভব সুন্দরী, তেমনি প্রখর বুদ্ধিমতী। বত্রিশ বছর বয়স হলেও ওকে দেখতে ঠিক তেইশ-চব্বিশ বছরের তরুণীর মতো লাগে। সে দুই হাত কোমরে রেখে, চোখ দুটো সরু করে তীক্ষ্ণ নজরে ইউসুফকে দেখছে। 

সিমরান তথাকথিত ঝাড়ফুঁক কিংবা উপরি বাতাসে বিশ্বাস করে না। সেজন্য মা আর বাকি বোনদের সাথে কুসংস্কার নিয়ে ওর সারাক্ষণই একটা না একটা তর্কবিতর্ক লেগেই থাকে। 

এই মুহূর্তে পাশের ঘরে কদু কবিরাজ ইউসুফের মা সাবিনা আর বাকি বোনদের নিয়ে অতি গোপন বৈঠকে বসেছেন। কবিরাজ মহাশয় তার বিদ্যা খাটিয়ে রায় দিয়েছেন, ইউসুফের ওপর নাকি ইতিমধ্যেই ভয়ঙ্কর এক অশুভ বাতাসের ছায়া ভর করেছে! তবে রক্ষে এই যে, সেই অপদেবতার আত্মা এখনো পুরোপুরি ওর ঘাড়ে চড়ে বসেনি, কেবল ছোঁয়া লেগেছে। এখন অশুভ বাতাস থেকে আদরের ছেলেকে কীভাবে মুক্ত করা যাবে, তা নিয়েই পাশের ঘরে আলোচনা চলছে।

সিমরান ইউসুফের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ইউসুফ আড়চোখে বোনকে এগিয়ে আসতে দেখে মনে মনে বেশ ভড়কে গেল। সিমরানকে ওর বিখ্যাত গোয়েন্দা ফেলুদার বংশধর মনে হয়৷ দুনিয়ার সবকিছুতেই সন্দেহ করা ওর মস্ত বড় বাতিক। নিজের যে বরের সাথে দশ বছর চুটিয়ে প্রেম করে আজ সাত বছর ধরে সুখে সংসার করছে সেই আপন বরকেও সে ২৪ ঘণ্টা গোয়েন্দার মতো চোখে চোখে রাখে আর সন্দেহ করে। এমন সন্দেহবাজ নারীর সামনে দাঁড়িয়ে ছোটখাটো মিথ্যা বলতে গেলেও ইউসুফের বুকটা ভয়ে দুরুদুরু কাঁপতে থাকে।

সিমরান ইউসুফের ঠিক পাশে এসে বসল। পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে বলল, “এইযে ভোলা মিয়া! এবার অন্তত ঝেড়ে কাশ। ব্যাপারটা কী? অত রাত অবধি তুই ওই বিল্ডিংয়ের ছাদে কেন ছিলি?”

ইউসুফ তোতা পাখির মতো বলল, “জানি না আপু।”

“খবরদার ইউসুফ! আমার সামনে দাঁড়িয়ে একদম মিথ্যা বলবি না। আমি কিন্তু তোর ওই মা বোনদের মতো বাতাসে-টাতাসে বিশ্বাস করি না।” সিমরান নিজের গলার স্বর আরও চড়িয়ে ধমকের সুরে বলল, “ওখানে কী করছিলি, সত্যি করে বল। কেন গিয়েছিলি ওখানে? নয়তো ঠাটিয়ে এক থাবড় মেরে তোর চেহারা পাল্টে দেব!”

“সত্যি বলছি আপু, জানি না।”

“একেবারে কান ফাটিয়ে দেব কুত্তার বাচ্চা! সত্য বল।”

সিমরান ঝুঁকে পড়েছে। ইউসুফ কোনো উপায় না পেয়ে সামনে চোখ তুলে তাকাল। ঘরের এক কোণে জামিল চুপচাপ বসে আছে। ও ছোটবেলা থেকেই আশ্রিত হিসেবে এই বাসাতে বড় হয়েছে। জামিল ইউসুফকে ইশারায় মাথা নেড়ে বারণ করল, মুখ ফুটে ভুলেও যেন কাজলীর নাম না বলে। বন্ধুর ইশারা পেয়ে ইউসুফ আরও জোর গলায় বলল, “আমি সত্যিই জানি না আপু। ওখানে গিয়ে কেন যে অতক্ষণ বসেছিলাম! শুধু মনে হচ্ছিল, ওখানে বসে থাকতে ভালো লাগছে, শান্তি পাচ্ছিলাম।”

“ও বাবা! শান্তি পাচ্ছিলি? সাথে কে ছিল যে এত শান্তি লাগছিল?”

সিমরানের চোখ দুটো এবার সন্দেহে আরও ছোট হয়ে এলো।

“কে... কে আর থাকবে? আমি একাই ছিলাম।”

ইউসুফ আমতা আমতা করে কথা জড়িয়ে ফেলল।

“তোর চেহারার মধ্যে একটা চোর চোর ব্যাপার দেখতে পাচ্ছি! চোর একটা! কথা চোর। বোনের থেকে কথা লুকাচ্ছিস? চটকান….”

তখনই পাশের ঘরের দরজা খুলে কদু কবিরাজ, সাবিনা বেগম এবং বাকি পাঁচ বোন বেরিয়ে এলো। চোখেমুখে তাদের টানটান উত্তেজনা। সিমরান আর কথা বাড়াল না। সে খুব ভালো করেই চেনে তার মা আর বোনদের। এদের অন্ধবিশ্বাসের মাঝে যুক্তি খোঁজা আর মরুভূমিতে পানি খোঁজা একই কথা। কদু কবিরাজ ইতিমধ্যেই তার মন্ত্রপড়া চশমাটা নাকের ডগায় ঝুলিয়ে ঘোষণা করেছেন, ইউসুফকে অশুভ বাতাস থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি এখনই মহাধ্যানে বসবেন। সিমরান এক বুক বিরক্তি নিয়ে ফুঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের শোবার ঘরের দিকে চলে গেল। যাবার আগে ইউসুফকে চোখ দিয়ে হুমকি দিয়ে গেল। তার লন্ডন প্রবাসী বর বাংলাদেশের মধ্যরাতে কাজ থেকে বাড়ি ফেরে। এখন বরের সাথে ফোনে কিছুক্ষণ শান্তিতে কথা বলে নিজের গরম হয়ে থাকা মাথাটা একটু ঠান্ডা করবে।

ড্রয়িং রুমে হাকীম আলহাজ্ব খাজা পীর পাগলা বাবা ল্যাংটা শাহ্ (ওরফে কুতুব আলী কদু কবিরাজ) সাহেব নিজের জবরজং ঝুলি থেকে একটা শুকনো লাউয়ের খোল বের করে মেঝেতে খটখট করে বাড়ি মেরে তার চূড়ান্ত মহানিদান বা সমাধান দিলেন। তিনি চোখ বন্ধ করে গম্ভীর গলায় বললেন, “শোনো সাবিনা মা জননী! এই অশুভ বাতাস বড্ড ত্যাঁদড় কিসিমের। সূর্য ওঠার ঠিক আগে, যখন পাখিরা প্রথম কিচিরমিচির শুরু করবে তখন এই তল্লাটের চার রাস্তার মোড়ে নিয়ে গিয়ে সাত পুকুরের পানি দিয়ে ইউসুফ বাবাজিকে একনাগাড়ে গোসল করাতে হবে। তবেই ওই খবিস আত্মা ইউসুফকে ছেড়ে যাবে।”

সাবিনা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না। মাঝরাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেই তিনি চার-পাঁচ জন কাজের লোককে হুকুম দিয়ে বালতি হাতে পাঠিয়ে দিলেন চারপাশের সাতটা আলাদা আলাদা পুকুরের পানি সংগ্রহ করতে।

ভোররাতে চার রাস্তার মোড়ে ইউসুফকে নিয়ে যাওয়া হলো। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস, টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে বেচারাকে জোর করেই খালি গা করে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। এরপর সাত পুকুরের মিশ্রিত পানি একে একে ইউসুফের মাথায় ঢালা শুরু হলো। পানি মাথায় পড়া মাত্রই ইউসুফ দাঁতে দাঁত লেগে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। 

কবিরাজের শিখিয়ে দেওয়া নিয়ম মেনে সাবিনা আর তার মেয়েরা সমস্বরে চোখ বন্ধ করে জপতে লাগল,

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম...
কদু বাবার অলৌকিক বাণী,
খবিস আত্মা তুই হ পানি পানি!
ছাদের পেত্নী আর বনের ভূত,
ছাড়িয়া পালা সোনার পুত!

কাজলীদের ঘরের ভাঙা জানালাটা দিয়ে চার রাস্তার মোড়টা পরিষ্কার দেখা যায়। কাজলীর ঘুম-ঘুম আধো আধো চোখে ছোট আকারে সেই দৃশ্যটি ধরা পড়ল। সে অবাক হয়ে চেয়ে দেখল, অবান্তর কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণা থেকে মুক্ত করতে বড়লোকের আদরের রাজপুত্রকে ঘিরে ভোররাতে কতগুলো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে! 

আর এদিকে ও? এক বুক হাহাকার আর জ্বর নিয়ে একা একা কাতর হয়ে পড়ে আছে, কপালে একটা ভেজা জলপট্টি দেওয়ার মতোও কেউ নেই! গর্ভধারিণী মা-টা অসুস্থ। বোনটার নিজের চলার মতোই পা নেই, নিজেই অন্যের ওপর নির্ভরশীল। 

কাজলী শূন্যে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, সৃষ্টিকর্তা এতো নিষ্ঠুর কেন? যাকে দেন, তাকে দুনিয়ার সব সুখ-আহ্লাদ, সুরক্ষা একসাথেই ঢেলে দেন; আর যাকে দেন না, তাকে এক্কেবারে শূন্য হাতে একাকী নরককুণ্ডে ফেলে রাখেন!

এলাকার ওসি সকাল সকাল এসে বসে আছেন আলাউদ্দিন সওদাগরের ড্রয়িংরুমে। গতকাল ফেসবুক লাইভের পর গণরোষের মুখে লোক দেখানো গ্রেপ্তার করলেও, মেয়র, কমিশনারের এক ফোনেই কাজ শেষ। গতকাল রাতেই আলাউদ্দিন সওদাগর সসম্মানে জামিন নিয়ে নিজের বাসায় চলে এসেছেন। আজ বিকেলের মধ্যেই কাশেম, ঝিলমিল আর ঝুনুবিবিও হাজত থেকে ছাড়া পেয়ে যাবে।

ওসির দায়িত্ব ছিল নির্যাতিতা কাজলীর পাশে দাঁড়ানো, অথচ সে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে উল্টো আলাউদ্দিনকে বুদ্ধি দিচ্ছে, “সওদাগর সাব, ওই মেয়ের নামে একটা বড় অঙ্কের মানহানির মামলা ঠুকে দেন! আইসিটি অ্যাক্টেও ফাঁসানো যাবে। বাকিটা আমি দেখব। ওই মাগীবাজ মেয়েকে জেলের ভাত খাইয়ে বাপের নাম ভুলাতে না পারলে আমার নাম পাল্টিয়ে দেব।”

আলাউদ্দিন ওসির দিকে তাকিয়ে মাথা দোলালেন। চুরুটের ধোঁয়া বাতাসে ভাসিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। সোফায় আরও আরাম করে বসে বললেন, “বুদ্ধিটা চমৎকার ওসি সাহেব। তবে ও মেয়ের নামে মামলা ঠোকার আগে একটু সময় নিতে হবে। আমি এই জেনারেশনের না হলেও ফেসবুক আর ভাইরাল টপিকটা ভালোই বুঝি। ফেসবুকে মানুষ কয়দিনই বা লাফায়? সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন দিন, তারপর সব শেষ। এই যে দেশে এতো এতো ধর্ষণ হয়, এতো খুন হয় কোনোটার কি শেষমেশ ঠিকঠাক বিচার হয়েছে ? প্রথম কয়দিন ফেসবুকে জাস্টিস জাস্টিস বলে কান্নাকাটি, বড় বড় পোস্ট, মোমবাতি জ্বালানো, মিমস শেয়ার আর আন্দোলন চলে! এর পর একটা নতুন ভাইরাল টপিক আসলেই ব্যস, সবাই ওই আগের ঘটনা ভুলে যায়। যে যার জীবন, চাকরি, সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কাজলী ভাবতেছে ফেসবুক লাইভ করে ও আমাদের সিংহাসন উল্টায়া ফেলছে! ও ছোট মানুষ। মাথায় জ্ঞান কম, আগুন বেশি। আমজনতার মেমোরি বড্ড শর্ট। মিডিয়া কয়েকদিন চেঁচিয়ে অন্য টপিক পেয়ে যাবে, তখন ওই মেয়েকে কাটারির নিচে ফেললেও কেউ দেখতে আসবে না।”

সওদাগরের দূরদর্শীতায় মুগ্ধ হয়ে ওসি মাথা নেড়ে বলল, “খাঁটি কথা বলছেন সওদাগর সাব। পাবলিকের ইমোশন বাতির সুইচের মতো, আজ অন তো কাল অফ।”

“ঠিক এই কারণেই আমি ও মেয়েকে শুধু জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ছি না।” 

আলাউদ্দিনের চোখের মণি দুটো ক্রূরতায় ছোট হয়ে এলো। 

তিনি ওসির সামনেই নিজের বখাটে ছেলে রুমেলকে ডেকে পাঠালেন। রুমেল ড্রয়িংরুমে আসতেই তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার মায়ের আলমারি থেকে টাকা নিয়ে আসো। আশিকরে নিয়ে আজই কক্সবাজার চলে যাও। কয়টা দিন যেন দুজনরে এই শহরের সীমানায় না দেখি।”

“আব্বা…”

“যা বলছি, তাই করো! চারপাশটা একটু ঠান্ডা হোক। এরপর ওই মেয়েরে তোমরা যেভাবে ইচ্ছে, যে উপায়ে ইচ্ছে কুচি কুচি করে ফেলো। কেউ আটকাবে না। যাও।”

রুমেল ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে সোজা বারান্দায় চলে গেল। আশিক অস্থির পায়ে পায়চারি করছিল। রুমেল গিয়ে আশিকের কাঁধে হাত রাখল। বলল, “কয়টা দিনের জন্য নিজের ভেতরের আগুনডারে দমায়া রাখ আশিক। ওই আগুনে কাজলীরে পুড়ায়া ছাই করে দেয়ার ব্যবস্থা আমি করে দিব। আমি তোর সাথে আছি। আমার খালি ওর প্রেগন্যান্ট বোনটারে চাই।”

বলেই রুমেল চোখ টিপল। ওর ভেতরের বিকৃতি কল্পনারও বাইরে। গর্ভবতী মেয়েদের ওপর ওর খুব আকর্ষণ কাজ করে। এই তো কিছুদিন আগে আশিকের ছোট ভাই আসিফের যে প্রেগন্যান্ট প্রেমিকাটাকে ঘরের আড়ার সাথে ঝুলিয়ে খুন করা হয়েছিল, তাকে মারার আগে রুমেলই ধর্ষণ করেছিল। পেটের বাচ্চাটাকে বাঁচানোর জন্য গর্ভবতী মেয়েগুলো যেভাবে রুমেলের পা জড়িয়ে ধরে আহাজারি করে, কান্নায় ভেঙে পড়ে, সেই দৃশ্যটা দেখতেই ওর সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয়! ওর পিশাচ মানসিকতার একমাত্র খোরাকই হলো গর্ভবতী নারীদের কান্না। 

আশিককে সাহায্য করার পেছনের কারণটাও, মারিয়াম। মারিয়ামের মতো সুন্দর মেয়ে মানুষ ও ওর জীবনে দেখেনি। তার ওপর আবার প্রেগন্যান্ট!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp