ইউসুফের সবচেয়ে ছোট বোন, অর্থাৎ ওর ঠিক আগের জনের বয়সই বত্রিশ বছর। সবচেয়ে বড় বোনের বয়স পয়তাল্লিশ। ওদের জন্মদাত্রী মায়ের বয়স ষাট ছুঁয়েছে। টানা ছয়টি কন্যাসন্তানের পর কোল আলো করে আসা একমাত্র ছেলে ইউসুফ। তাই ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই ওর চারপাশটা মায়া-ভালোবাসা আর অতিরিক্ত আদিখ্যেতার নিরেট দেয়ালে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। যার কারণে বাস্তব পৃথিবীর কোনো রুক্ষ, কঠিন বা মলিন বাতাস কোনো দিন ওকে স্পর্শ করতে পারেনি।
শৈশব থেকে কৈশোর, এমনকি যৌবনের দোরগোড়ায় এসেও ইউসুফ কখনো একা পথ হাঁটেনি। স্কুলে যাওয়ার বয়সে যখন পাড়ার অন্য ছেলেরা একা একা রাস্তা পার হতে শেখে, সমবয়সী বন্ধুদের সাথে মারামারি করে ধুলোবালি মেখে বীরের মতো বাড়ি ফেরে; তখন ইউসুফ স্কুলে যেত মা আর বড় বোনদের শাড়ির আঁচল ধরে। কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে যখন তার বয়সী অন্য ছেলেরা দুনিয়া জয়ের স্বপ্ন দেখছে, আড্ডা দিচ্ছে, তখন ইউসুফের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকত তার বিবাহিত বা অবিবাহিত বোনেরা। তার কী লাগবে, সে কখন খাবে, কোন জামাটা পরবে সবকিছু মুখ ফুটে বলার আগেই হাজির হয়ে যেত।
এই অতি-সুরক্ষিত আর রাজকীয় বলয়ের ভেতরে থেকে ইউসুফ কোনো দিন অভাব কিংবা লড়াই শব্দটার মানেই বোঝেনি। এটাও শেখেনি যে নিজের শক্ত মেরুদণ্ডের ওপর ভর করে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর অনুভূতি কেমন হয়। সে আসলে বড় হয়েছে একটা বিলাসবহুল খাঁচার ভেতর। খাঁচার প্রতিটি শিক খাঁটি সোনার তৈরি, বড্ড আরামদায়ক আর নিরাপদ, কিন্তু দিনশেষে খাঁচা তো খাঁচাই! খাঁচার পাখি কোনো দিন খোলা আকাশে ডানা মেলার সাহস পায় না।
একটা শিশুর আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব তৈরি হয় ভুল করার মাধ্যমে, পথ চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে আবার নিজে নিজে উঠে দাঁড়ানোর মাধ্যমে। অথচ ইউসুফকে ওর জীবনে কখনো একটা ছোট্ট হোঁচট খেতেও দেওয়া হয়নি। মা আর বোনদের অতি-সুরক্ষা ওর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশকে ভেতরে ভেতরে পঙ্গু করে দিয়েছে। যখনই ও বাস্তব জীবনের কোনো ছোটখাটো সমস্যার মুখোমুখি হতে যেত, তার আগেই কোনো না কোনো বোন বা মা এসে ওর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে সেই সমস্যার সমাধান করে দিত। ফলে, কোনো সংকটে পড়লে কীভাবে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে একা একা তা পার হতে হয়, সেই মানসিক পেশি বা লড়াকু মানসিকতাটাই ওর ভেতরে কখনো তৈরি হয়নি। সবসময় অন্যের অধীনে এবং ইশারায় চলায় ওর অবচেতন মন একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, ও একা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা কারো সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলার যোগ্যই নয়। এই কারণেই বাইরের মানুষের সামনে গেলে গুছিয়ে দুটো কথা বলতে পারে না; ওর অবদমিত মনে সব সময় ভয় কাজ করে, সবাই বোধহয় ভুল ধরবে, উপহাস করবে বা শাসন করবে। তাই কথা বাড়িয়ে উল্টো ঝামেলা তৈরি করার চেয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখাকেই উত্তম মনে করে।
রাত এগারোটার দিকে কাজলী যখন ছাদ থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, তখন শেষবারের মতো একবার ফিরে তাকিয়েছিল পাথরের মতো বসে থাকা ইউসুফের দিকে। বলেছিল, “কুঁজো হয়ে হাটবেন না। বস্তির সবাই হাসাহাসি করে৷ সোজা হয়ে হাঁটবেন।”
কাজলী চলে যেতেই ইউসুফ ছাতাটা বন্ধ করে অবশ হয়ে যাওয়া মেরুদণ্ডটা এক ঝটকায় সোজা করে টানটান হয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিল। এখানেও সে নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং অবচেতনভাবেই অন্য একজনের, অর্থাৎ কাজলীর কথায় নিজেকে পরিবর্তনের একটা ব্যর্থ চেষ্টা করল।
বাড়ির সামনে এসে দেখল, তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে। ওর সবক'টা বোন নিজ নিজ বরসহ বাপের বাড়ি এসে হাজির। এদের সবার বিয়ে হয়েছে এই আশেপাশের এলাকাতেই, তাই সামান্য কিছু হলেই ফট করে বাপের বাড়ি চলে আসে।
ইউসুফকে দেখামাত্রই একসঙ্গে এতগুলো নারী ওর দিকে পিলপিল করে ছুটে আসতে লাগল। এত মানুষের আচমকা হুলস্থুল আর চিৎকারে ইউসুফ ভেতরে ভেতরে থতমত খেয়ে গেল। ওর সোজা হওয়া মেরুদণ্ডটা আবার একটু কুঁজো হয়ে পড়তে চাইল।
ইউসুকে প্রায় পাঁজকোলা করে ধরাধরি করে বাড়ির ভেতর ড্রয়িংরুমে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসানো হলো। চারপাশ থেকে উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত আর আশঙ্কায় ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখগুলো ওর দিকে ঝুঁকে পড়ল। শুরু হলো বুলেটের মতো ধেয়ে আসা প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
সবচেয়ে বড় বোন ওর কপালে হাত দিয়ে বলল,, “কোথায় ছিলি তুই? মোবাইল বন্ধ কেন? হারিয়ে ফেলছস? নাকি ছিনতাই হইছে? আমাদের কি তুই মারতে চাস?”
মেজো বোন ওর ভেজা শার্টের হাতা টেনে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল, “তোর চুল ভেজা কেন? বৃষ্টিতে ভিজেছিস ? ঠাণ্ডা লেগে যদি আবার নিউমোনিয়া হয়ে যায়, তখন কী হবে চিন্তা করছস?”
আরেক বোন ওর রেইনকোটের বোতাম আলগা করতে করতে আতঙ্কিত গলায় শুধাল, “তোরে কি কেউ জোর করে ধরে নিয়ে গেছিল? বস্তির গুণ্ডাগুলো কোনো ঝামেলা করছে তোর সাথে?”
সেজো বোন ওর হাত-পা টিপে টিপে পরীক্ষা করে বলল, “কেউ কি তোর কোনো ক্ষতি করতে চাইছিল? শরীর খারাপ লাগতেছে তোর? মাথা ঘুরায়?”
মা সাবিনা নিজের আঁচল দিয়ে ইউসুফের ভেজা মুখটা মুছতে মুছতে বললেন, “কই ছিলিরে বাপ? বিকেল থেকে তোর কোনো খোঁজ নাই। পেটের ভেতর খিদায় আগুন জ্বলতাছে না? ও বড় বুজি, তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে ওর জন্য গরম দুধ আর স্যুপ নিয়া আয়।”
চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা এমন অজস্র প্রশ্নে ইউসুফ হতভম্ব হয়ে বোকার মতো চেয়ে রইল। তখন ওর বাবা আল-মুরতাজা সাহেব পেছন থেকে একটু ভারী গলায় গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “সরো সবাই! ছেলেটাকে দম আটকায়া মারবা নাকি? আমি ওর সাথে কথা বলতেছি।”
বোনেরা খানিকটা জায়গা করে পিছিয়ে যেতেই আল-মুরতাজা সাহেব এসে সরাসরি ছেলের সামনে দাঁড়ালেন। তিনি এক পলক তাকালেন ইউসুফের মা সাবিনা বেগমের দিকে। সাবিনা বেগম তখন দুই হাতে মুখের আঁচল চেপে ত্রস্ত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। নিশ্চয়ই আদরের ছেলের ওপর কোনো জ্বীনের আছর দেখতে পাচ্ছেন!
সাবিনা এক নামকরা কবিরাজের মেয়ে, তাই জীবনের যেকোনো অস্বাভাবিক বা অদ্ভুত ঘটনাতেই তিনি সবার আগে অলৌকিক জ্বীন-ভূতের ছায়া খুঁজে পান। সামান্য কিছু হলেই কবিরাজ ডেকে এনে ঘরের ভেতর তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন। বড় মেয়েগুলোও হয়েছে ঠিক মায়ের মতো। উগ্র কুসংস্কারে বিশ্বাসী। পুরো পরিবারে শুধু সবচেয়ে ছোট মেয়ে সিমরানই যা একটু বাস্তববাদী আর আলাদা ধাতুতে গড়া।
মুরতাজা সাহেব ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, “কোথায় ছিলে তুমি?”
বাবার জমাট বাঁধা বরফের মতো শীতল কণ্ঠকে ইউসুফ বড্ড ভয় পায়। ও মাথা নিচু করেই সামনে আঙ্গুল তুলে বলল, “আসাদুল চাচার বাড়ির ছাদে।”
ওদের পাঁচ তলা বাড়ির জানালা দিয়ে ওই অসমাপ্ত সাত তলা বিল্ডিংটা পরিষ্কার দেখা যায়। ইউসুফের মুখ থেকে ওই জায়গার নাম শুনামাত্রই শিউরে উঠলেন সাবিনা। অনেকেরই ধারণা, বহু বছর ধরে কাজ বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা ওই ভুতুড়ে দালানটা অশুভ আত্মাদের আস্তানা, ওখানে খারাপ কিছুর ছায়া আছে। এমন জায়গায় ইউসুফ কেন গেল?
সাবিনা রুদ্ধশ্বাস গলায় বলে উঠলেন, “ও আমার আল্লাহ! তুই ওই বিল্ডিংয়ে কেন গেছিলি আব্বা?”
ইউসুফ নিচু স্বরে বলল, “জানি না।”
“জানো না মানে? এতক্ষণ ছাদে কী করছিলে?” মুরতাজা ধমক দিয়ে বললেন।
“বসে ছিলাম।”
“একা একা? বৃষ্টির মধ্যে?”
ইউসুফ যান্ত্রিকভাবে মাথা ঝাঁকাল। একাই ছিল। এই প্রথম সবার সামনে মিথ্যা বলল।
ছেলের একা একা ছাদে বসে থাকার কথা শুনে সাবিনা এবার আঁচলে মুখ চেপে হুহু করে কেঁদে উঠলেন। তিনি মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওরা এখন আমার সোনার ধনরে চায়! বাতাসই আমার ছেলেরে টাইন্যা নিয়া গেছে! ওদের নজর পড়ছে আমার চাঁদের টুকরার ওপর!”
মুরতাজা স্ত্রীর কুসংস্কারাচ্ছন্ন কান্নাকাটিতে বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে ফেললেন। তিনি আবারও ছেলের দিকে তাকিয়ে জেরা করার ভঙ্গিতে বললেন, “তুমি কেন ওখানে গেছো নিজেই জানো না? এটা কেমন কথা? হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়া কেন গেলে ওখানে? কী করছিলে? সত্যি করে বলো, নেশাপানি ধরেছো বন্ধুদের চক্করে পড়ে?”
বলতে বলতে মুরতাজা নিজের মুখটা ইউসুফের গায়ের কাছে ঠেকিয়ে ঘ্রাণ শুঁকলেন। সিগারেট বা মদের কোনো গন্ধই তো ওর শরীর থেকে বের হচ্ছে না! কোনো প্রমাণ না পেয়ে তিনি কিছুটা হতাশ ও বিভ্রান্ত হয়ে বললেন, “কোনো গন্ধ তো নেই। তাহলে কেন গিয়েছিলে ওখানে?”
ইউসুফ এবারও রোবটের মতো মাথা নিচু করে একই জবাব দিল, “জানি না।”
সাবিনার কান্নার দমক এবার আরও বেড়ে গেল। মায়ের দেখাদেখি বাকি বোনদের চোখেমুখেও দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে এলো। তাদের এই অমূলক ভয়ের অবশ্য একটা পুরনো কারণ আছে। বছরখানেক আগে ওই বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে এক দম্পতির একমাত্র কন্যাসন্তান সুইসাইড করে মারা গিয়েছিল। এরপর থেকেই আশেপাশের অনেক মানুষের বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে যে, ওখানে অশুভ অতৃপ্ত শক্তি ঘুরে বেড়ায়। সেই অশুভ শক্তি নাকি বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে কিংবা একমাত্র মেয়েদের সম্মোহন করে টেনে নিয়ে যায়। ইউসুফও তো তাদের একমাত্র ভাই, ছয় বোনের পর কোল আলো করে আসা অতি আদরের একমাত্র ছেলে!
ঝুম বৃষ্টির রাতে, কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে রাত এগারোটা অবধি তাদের ভাই একা একা কেন ওই বিল্ডিংয়ের ছাদে গিয়ে বসে থাকবে? তাও আবার ছেলেটা মুখ ফুটে কোনো কারণ বলতে পারছে না, বারেবারে বলছে ওর নাকি কিছু মনেই নেই! কেন গেছে, তা নাকি ও নিজেও জানে না! সাবিনার আর বুঝতে বাকি রইল না, তার ছেলের ওপর অশুভ বাতাস ভর করেছে। তিনি আর এক মুহূর্তও দেরি না করে তড়িঘড়ি করে তাদের পারিবারিক কবিরাজকে ডেকে পাঠালেন। অন্যসব বড়লোক পরিবারে জরুরি দরকারে পারিবারিক ডাক্তার থাকে, আর তাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবারে সর্বক্ষণের জন্য আছে এক পারিবারিক কবিরাজ। নাম তার হাকীম আলহাজ্ব খাজা পীর পাগলা বাবা ল্যাংটা শাহ্। ওরফে কুতুব আলী কদু কবিরাজ। এলাকার মানুষ আড়ালে-আবডালে উনাকে 'কদু কবিরাজ' বলেই ডাকে। উনার বিশেষ এক রোগ নিরাময় পদ্ধতি আছে, যেখানে উনি রোগীদের মাথার ওপর আস্ত একটা কচি লাউ বা কদু রেখে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেন! সাবিনা বেগম অবশ্য উনাকে ভীষণ ভক্তি করেন।
মধ্যরাতে কদু কবিরাজ নিজের জবরজং ঝুলি, পুরনো ছেঁড়া কিতাব, কিছু শুকনো শেকড়-বাকড় আর ধূপ-ধুনোর হাঁড়ি নিয়ে ইউসুফদের ড্রয়িংরুমে এসে হাজির হলেন।
কাজলী ঘরে ঢুকেই প্লাস্টিকের চেয়ারটায় একদম এলিয়ে পড়ল। দরজাটা খুলে দিয়েছিল মারিয়াম। অন্য সময় হলে নিশ্চিত গাল কাঁপিয়ে জেরা করত, ফিরতে এত দেরি হলো কেন?
কিন্তু আজ ও বোনের ওপর প্রচণ্ড রেগে আছে, তাই একটাও বাড়তি কথা জিজ্ঞেস না করে চলে যেতে নিল। কাজলী ধপ করে চেয়ারটায় বসে পড়ার পর পুরো শরীরটা অবশ হয়ে আসতে লাগল। পরনের কালো বোরকাটা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে আছে। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে একটানা দীর্ঘ পাঁচটা ঘণ্টা ভেজা কাপড়ে ছাদে বসে থাকার কারণে শরীরটা আর ধকল নিতে পারেনি, ভেতরে জ্বর এসে ভর করেছে। দুই চোখ জবা ফুলের মতো লাল, মাথার রগ দুটো ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। পেটের ভেতর ক্ষুধার চিতাটা দাউদাউ করে জ্বলছে। কাজলী ভাঙা গলায় বলল, “আপা... দুটো ভাত দিবি?”
কাজলীর মরণাপন্ন মানুষের মতো দুর্বল কণ্ঠস্বর শুনে মারিয়ামের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছ্যাৎ করে উঠল। চট করে হুইলচেয়ারটা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। তাকিয়েই স্তব্ধ হয়ে গেল। পাথর কেটে শক্ত করা কাজলী কেমন অসহায় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে দুটো ভাতের জন্য! সারা শরীরের সমস্ত শক্তি যেন বিলীন হয়ে গেছে ওর, হাত-পা দুটো ছেড়ে দিয়ে চেয়ারের সাথে ঝুলে আছে শরীরটা। চোখ দুটো পিটপিট করছে। চোখের পাতা মেলে রাখার জোরটুকুও পাচ্ছে না।
মারিয়াম নিজের সব রাগ ভুলে উৎকণ্ঠা নিয়ে দূর থেকেই শুধাল, “কী হইছে তোর? এমন করতাছস কেন?”
“আপা... ভাত খাব। অনেক ক্ষুধা লাগছে রে আপা।” কাজলীর কণ্ঠস্বর আরও ক্ষীণ শোনাল।
মারিয়ামের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সব ঝগড়া-বিবাদ ভুলে তড়িঘড়ি করে হুইলচেয়ারের চাকা ঠেলে রান্নাঘরে চলে গেল। পাতিল থেকে ঠাণ্ডা ভাত বেড়ে নিয়ে চটজলদি একটা ডিম ভেজে প্লেট সাজিয়ে নিয়ে এলো।
কাজলী তখন নিজের বোরকাটা কোনোমতে গা থেকে খুলে মেঝের ওপর ফেলে রেখে, চেয়ারের পেছনে মাথাটা ঝুলিয়ে চোখ বুজে পড়ে আছে। মারিয়াম একটু কাছে গিয়ে নিচু স্বরে ডাকল, “কাজলী... এই কাজলী, ওঠ। ভাত আনছি, খাইয়া এরপর ঘুমা।”
কাজলী কোনো উত্তর দিল না, শুধু অবশ হয়ে আসা হাতটা সামান্য একটু নাড়াল। ঠোঁট জোড়া নড়ে উঠলেও কী বলল, মারিয়াম তার একবিন্দুও বুঝতে পারল না। ও ভয় পেয়ে হাত বাড়িয়ে কাজলীর হাতটা নিজের মুঠোয় নিল। ওমনি চমকে উঠল। এ তো জ্যান্ত আগুন, হাতটা প্রচণ্ড গরম! মারিয়াম কাজলীর কপালে হাত ঠেকাল। পুরো গা পুড়ে যাচ্ছে, জ্বর হু হু করে চড়ছে!
ও বকা দেয়ার সুরে বলল, “তোর যহন মেঘের পানি সহ্যই হয় না, ভিজতে গেলি কেন?”
“আপা... অনেক ক্ষুধা।” কাজলী বিড়বিড় করে উঠল।
কাজলীর এমন রূপ মারিয়ামের বড্ড অচেনা। লড়াকু মেয়েটা কখনো এভাবে নিজের মুখ ফুটে ক্ষুধার কথা বলে না, কারোর কাছে হাত পেতে এক লোকমা ভাত পর্যন্ত চায় না। আর এখন, দুই হাত ছেড়ে দিয়ে একদম নিথর হয়ে পড়ে আছে।
মারিয়াম অনেক চেষ্টা করে একটা নরম বালিশ টেনে কাজলীর মাথার নিচে গুঁজে দিল, যাতে ওর ঝুলে থাকা ঘাড়টা সোজা হয়ে চেয়ারে একটু আরাম পায়। কাজলী চোখের পাতা দুটো পিটপিট করে তাকাল।
মারিয়াম ভাত আর ডিম ভাজি ভালো করে মেখে এক লোকমা ভাত কাজলীর মুখে তুলে দিল। ক্ষুধার্ত কাজলী প্রথম লোকমাটা মুখে দিতেই আর নিজের ভেতরের অবদমিত কষ্টটা ধরে রাখতে পারল না, ওর দুই চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ল। ও খেতে খেতেই বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। মারিয়াম ওর মুখে পরের লোকমাটা তুলে দিতে দিতে বকা দেওয়ার ছলে বলল, “তুই কি এখনো ছোট বাচ্চা আছস? সামান্য জ্বরে কেউ এমন কইরা কান্দে?”
“আপা... ফারাজ বিয়েটা ভেঙে দিছে।”
বলতে বলতে কাজলী নিজের ঠোঁট দুটো কামড়ে ভেঙে চুরমার হওয়া শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। কথাটা শোনামাত্রই মারিয়ামের হাতটা মাঝপথেই থমকে গেল। কত খুশি ছিল কাজলী বিয়েটা নিয়ে! প্রতিদিন টিউশনি থেকে ফিরে মারিয়ামের কোলে মাথা রেখে বলত, ফারাজ ওর কত যত্ন করে, ফারাজ ও’কে কত সম্মান দেয়। অবশেষে ওর ছন্নছাড়া জীবনেও একজন ভালোবাসার মানুষ এসেছে। বলতে বলতে ও সারা ঘরে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে উড়ত।
মারিয়াম বলল, “কেন? কেন এমন করল?”
কাজলী মারিয়ামের এই কেন'র কোনো সরাসরি উত্তর দিল না। সে জ্বরের ঘোরে শূন্যে চোখ মেলে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “যদি ওরে নাই-ই পাব... এত স্বপ্ন কেন চোখে বাসা বাঁধল, আপা? যদি উড়তেই না পারব, কেন ও আমারে ওই রঙিন আকাশটা দেখাল?”
কাজলী এখন আর বাস্তব জগতের স্বাভাবিক চেতনায় নেই। মারিয়াম আলতো করে কাজলীর মাথার ভেজা চুলগুলো নরম কাপড় দিয়ে মুছে দিল। তারপর একটা প্যারাসিটামল ওর মুখে দিয়ে গায়ে ভারি কম্বল টেনে ভালো করে ঢেকে দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজলী ঘুমিয়ে পড়ল। ও'কে ঘুমাতে দেখে মারিয়াম হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে জোহরা বেগমের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
শেষরাতে হঠাৎ জানালার ওপাশ থেকে কেউ ডেকে উঠল, “কাজলীইইই... ও কাজলীইইইই…”
বেশ কয়েকটা ডাকে কাজলীর জ্বরে আচ্ছন্ন ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। ও জ্বরে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে অবচেতন মনেই শুধাল, “কে?”
ওপাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমার আশিক, সোনা!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………