মার্জিয়া সকাল থেকে ক্লাস করতে করতে ক্লান্ত। ঘুম থেকে ভোরেই উঠেছে। এখনও তেমন বেলা হয়নি। তবু অসহ্য লাগছে সবকিছু। একটা ক্লাস না করেই সে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে এলো। বাড়িতে একবার ফোন দিতে হবে, খোঁজ নেয়া দরকার। মনটা কেমন যেন কু ডাকছে, অস্থির অস্থির লাগছে। রোদ তেমন চড়া হয়নি এখনও, তাই মেয়েটা খোলা মাঠের ভেতর দিয়েই হাঁটতে শুরু করলো।
ছাতা আনা উচিত ছিলো। হল পর্যন্ত যাওয়ার আগেই গরমে অবস্থা কাহিল। চোখ মেলে তাকানোও গেলো না। সামনের বিভাগীয় ভবনটাতে কোনোমতে ঢুকে পড়লো সে। অন্ধকার দেখা যাচ্ছে সব।
কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর উপলব্ধি করা সম্ভব হলো যে শরীরটা আসলেই বেশ অসুবিধায় পড়েছে। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ঘোলা চোখে বাইরে তাকিয়ে রইলো মেয়েটা। এভাবে কতোক্ষণ কেটে গেলো, সে জানে না। আশেপাশের ব্যস্ত মানুষগুলো তাকে সেভাবে খেয়াল করলো না হয়তো, একজন ব্যতীত।
“কী হয়েছে?”
মার্জিয়া এক হাতে মাথা চেপে ধরে ছিলো। ছেলেটার দিকে তাকাতে বেশ সময় লাগলো তার। তবু কোনো উত্তর দেওয়া সম্ভব হলো না। হাসিব একটু এগিয়ে এলো, ভ্রু কুঁচকে বললো, “কোনো অসুবিধা?”
মেয়েটা একপ্রকার বাধ্য হয়েই বলে, “তোমার কাছে পানি হবে?”
হাসিব খুব তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ হাতড়াতে যায়, তারপর তার মনে পড়ে, বোতলে পানি ভরানো হয়নি। নিজের এই উদাসীনতায় প্রথমবার প্রচণ্ড বিরক্ত হলো সে। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বললো, “এদিকে আয়—”
মার্জিয়া অনিচ্ছা নিয়েই অনুসরণ করলো ছেলেটাকে। তার কথা অনুযায়ী একটা বেঞ্চে বসে পড়লো। হাসিব কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে পানি জোগাড় করে এলে দিলো। তারপর কোনো অনুমতি ছাড়াই পাশে বসে পড়লো, নামমাত্র দূরত্বে। মার্জিয়া অতোকিছু খেয়াল করলো না। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হতেই সে একটু হেলান দিলো বেঞ্চে।
“হলে পৌঁছে দিয়ে আসবো?”
বোতলটা ফিরিয়ে দিয়ে মাথায় দোলায় সে, “লাগবে না।”
“সঙ্গে আর কেউ আছে? নাই তো। একা কেমনে যাবি?”
মার্জিয়া উত্তর দিলো না।
“রেস্ট নে একটু। তোকে দেখেই অসুস্থ মনে হচ্ছে।”
কথাটুকু বলে হাসিব নির্লিপ্ত হয়ে বসে রইলো। মার্জিয়ার ইচ্ছে করলো, এখনই এখান থেকে উঠে হনহন করে বেরিয়ে পড়তে। তবে এমন কিছু করা গেলো না। শরীরটা এ মুহূর্তে অমন হঠকারিতার জন্য প্রস্তুত নয়। সে দুর্বল। খাওয়া-দাওয়া নিয়ে অবহেলা করলে আর চলবে না।
ভেতরের জগৎ থেকে বেরিয়ে মার্জিয়া অবশেষে চারপাশে দেখলো। সবাই যেভাবে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে—তা লক্ষ করতেই বিব্রতবোধ করলো। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। হাসিবও উঠলো, আড়মোড়া ভেঙে বললো, “কোন হলে থাকিস তুই?”
“আমি একা যেতে পারবো।”
“বলতে কী সমস্যা?”
“তোমাকে জানতে হবে না।”
হাসিব অকারণে হাসলো। মার্জিয়ার পাশাপাশিই হাঁটতে লাগলো সে। মুখে অস্বীকৃতি প্রকাশ করলেও বাইরে বিশেষ বাধা দিলো না মার্জিয়া।
উভয়েই ধীরে ধীরে হেঁটে হলের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভদ্রতার খাতিরে মেয়েটা ঘুরে তাকায়, স্বল্প হেসে বলে, “ধন্যবাদ। আমার জন্য এতো কষ্ট করার দরকার ছিলো না।”
“কষ্ট হয়নি।”
মার্জিয়া আর কথা না বলে হলের ভেতরে চলে এলো। সে এতোটাও অবুঝ না। ছেলেটার মনে কী চলছে–তা সে টের পাচ্ছে। বেশি মনোযোগ দিলেই তো সমস্যা। একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যাবে হয়তো। আজ কষ্ট হয়নি, একদিন তো হতেও পারে।
—————
সকাল সাড়ে ১০টা।
মৌমিতা মোটামুটি ভগ্ন হৃদয়েই রিসিভারটা কানে ধরে আছে। গত রাত থেকে মেসের এই নাম্বারে সে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েছে। একটা লোক ফোন ধরেছে প্রতিবারই, জানিয়েছে, বাদল বাইরে গেছে।
এই ছেলে কি সারা দিনরাত বাইরে থাকে! কাল চলে যাওয়ার আগেও সে একটা কথা বললো না। এখন অবধি কোনো খোঁজখবর পাওয়া গেলো না তার। মেসের লোকটাও আর ফোন ধরছে না।
মৌমিতা হতাশ হয়ে রিসিভারটা রেখে দেয় ঠাস করে। দুশ্চিন্তা হচ্ছে, মেজাজটাও বিগড়ে যাচ্ছে। কোনোকিছু না জানিয়ে এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার অর্থটা কী?
মারুফ নিজের ঘর থেকে বসার ঘরে এলেন। মৌমিতা তার উপস্থিতি টের পেলো, তবু ইচ্ছে করেই উপেক্ষা করলো। যদি ঘুরে তাকাতো, আব্বার হাঁটার ধরনটা দেখে হয়তো সে আতঙ্কে চমকে উঠতো।
মারুফ ক্ষীণ স্বরে ডাকলেন, “মৌ মা?”
মেয়েটা কোনো দিকে না তাকিয়ে দ্রুতপায়ে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলো। দরজা চাপিয়ে দেওয়ার সময় মনে হলো, ঘাড়ের কাছের মাংসপেশিতে টান লেগেছে। সে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় মাথা কাত করে ঘাড়ে হাত দেয়। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ায়। চোখদুটো খুব জ্বালা করছে। তার মাথার মাঝে অনেককিছু চলতে শুরু করলো একসাথে। কাল রাতে বাদলের চলে যাওয়া, সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, আব্বার অসুস্থতা, পাত্রের মায়ের দেয়া সোনার বালা...
মৌমিতা বিছানায় গিয়ে বসলো। ঘাড়ের ব্যথাটা একটু কমেছে বোধহয়। পুরোপুরি যায়নি যদিও। রক্তনালীর স্পন্দন ভীষণ বাজেভাবে অনুভূত হচ্ছে সেখানে। ঘাড়ে কয়েকবার হাত বুলিয়ে মৌমিতা চুপ করে রইলো।
রাবেয়া উঠোনের দিকে যাচ্ছিলেন। মারুফকে সোফায় নিস্তেজ হয়ে বসে থাকতে দেখে তিনি ওদিকেই এগিয়ে গেলেন। উদ্বিগ্ন হয়ে বলে উঠলেন, “মৌয়ের আব্বা? শরীরটা খারাপ লাগছে?”
মারুফ অস্ফুটে শব্দ করলেন, “হুম।”
“দেখি... আসেন তো, ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকেন একটু।”
রাবেয়া স্বামীর কাঁধ জড়িয়ে টেনে তুললেন তাকে, ঘর পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। লোকটাকে খাটে শোয়ানোর পর চিন্তিত ভঙ্গিতে পাশে বসে রইলেন। বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে শুরু করলেন। তারপর মারুফের কপালে ফুঁ দিলেন তিনি। তার নিজের বুকটাও ধড়ফড় করছে।
তখনই, বসার ঘরে ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলো। রাবেয়া যেতে চাইলেন না। কিন্তু আওয়াজ আসতে থাকলো অনবরত।
পাশের ঘরের মেয়েটা প্রায় ছুটে যায় সেদিকে। ফোন ধরেই গলা দিয়ে অনেক কষ্টে শব্দটা বের করে, “হ্যালো, কে?”
“আপা? কেমন আছো তুমি?”
মৌমিতা শুষ্ক ঢোক গিললো, “এই তো, আছি।”
“আব্বা কেমন আছেন?”
“আব্বার শরীরটা ভালো নেই। খুব অসুস্থ।”
“কী হয়েছে?”
“ঐ যে, মাথাব্যথা।”
“আব্বাকে একটু দেওয়া যাবে?”
মৌমিতা পেছন ফিরে আব্বার ঘরটার দিকে তাকায়। লোকটার সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছে নেই তার! অভিমান জন্মেছে অযথাই। কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সে মুখ ফেরালো, তুলনামূলক শীতল স্বরে বললো, “আব্বা শুয়ে আছেন। বিশ্রাম নিচ্ছেন।”
“ওহ।” মার্জিয়া আশা ছেড়ে দেয়, “আচ্ছা থাক। পরে কল দেবো নাহয়—”
“ঠিক আছে।”
ছোট বোনটাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মৌমিতা খট করে রিসিভার নামালো। মানসিকভাবে খুব বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে সে। কোনোকিছুই ঠিক মনে হচ্ছে না। টেলিফোনের আশেপাশেই পায়চারি করতে শুরু করলো মেয়েটা। তার নজর পড়লো নিজের ডান হাতের বালাটার দিকে। হঠাৎ করেই খুব রাগ হলো, কার উপর—তা সে জানে না। বালাটা খুলে ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু এই সামান্য কাজটুকু করার শক্তিও তার নেই।
দুপুরের খাওয়ার পর মারুফ শুয়ে পড়েছিলেন। সন্ধ্যার দিকে ঘুম থেকে উঠলেন। আগের থেকে বেশ সুস্থবোধ করলেন তিনি। হালকা নাস্তা সেরে আবার ঘরে ফিরে গেলেন, টেবিলের সামনে চেয়ার নিয়ে বসলেন।
ড্রয়ারে একটা পুরোনো ডায়েরি আছে। সাধারণত এই জিনিসটা এখানে থাকে না, তোশকের তলায় থাকে। ডায়েরিটা জোড়াতালি দেওয়া, কালো রঙের মলাটখানির অনেকটা জায়গা ছিঁড়ে ফেটে একাকার হয়েছে। অদক্ষ হাতে খন্দকার সাহেব নিজেই সেলাই করেছিলেন।
মারুফ সযত্নে পাতা ওল্টালেন। চোখে চশমা পরলেন। অনেকদিন যাবৎ কিছু লেখা হয় না। আজ হঠাৎ অনেককিছুই লিখতে মন চাইলো। তবে কলম ধরে লিখতে যাওয়ামাত্র হাতটা কাঁপাকাঁপি করতে শুরু করলো। তিনি হাল ছাড়লেন না। কাগজের উপর শখের বলপয়েন্ট কলমটা ঠেসে ধরে ধীরে ধীরে লিখলেন, প্রায় এক পাতা। চশমার নিচে আঙুল দিয়ে চোখ মুছলেন কয়েকবার।
“মৌয়ের আব্বা?”
চেয়ারের পেছনে রাবেয়া এসে দাঁড়িয়েছেন, তিনি বুঝতে পারেননি। স্ত্রীর ডাকে খুব একটা বিচলিত হলেন না। অন্য সময় হলে হয়তো ডায়েরিটা লুকানোর চেষ্টা করতেন, আজ সেটাও করলেন না। তার মস্তিষ্ক যেন ইতোমধ্যে অন্য জগতে চলে গেছে।
“আপনার শরীর এখন কেমন?”
মারুফ মাথা নাড়লেন, “ভালো।”
“মাথাব্যথা আছে?”
“একতু আছে।”
রাবেয়া একটু ঘাবড়ালেন, “আপনার কি অসুবিধা হচ্ছে কথা বলতে?”
ভদ্রলোক সতর্কতা অবলম্বন করলেন। এবার মুখে কিছু উচ্চারণ করলেন না, ডানে-বামে মাথা নাড়লেন।
“মার্জু কথা বলতে চেয়েছিলো। কথা বলবেন?”
সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন মারুফ। তারপর আর কোনো কথা শোনার অপেক্ষা করলেন না। দুই হাতে টেবিলে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। তখনই বুঝলেন, সর্বপ্রকার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন তিনি। তার কণ্ঠনালী হতে একটা চাপা আর্তনাদ বেরোয় কোনোমতে। খন্দকার সাহেব শক্ত করে চেয়ারটা ধরার চেষ্টা করলেন, হাত ফসকে গেলো।
“মৌ! মৌ, তাড়াতাড়ি আসো—”
মায়ের এমন চিৎকার শুনে মৌমিতা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাশের ঘরে দৌড়ে আসে। ওড়নাটাও ঠিকমতো পরতে পারে না। কোনো কারণে অনেকক্ষণ ধরেই তার মনে হচ্ছিলো, হুট করে কিছু একটা হবে, প্রস্তুত থাকতে হবে। তবু চোখের সামনের দৃশ্যটা দেখে সে বাকশক্তিও হারিয়ে ফেলে।
মারুফ মেঝেতে পড়ে আছেন, ঠোঁটদুটো আলগা হয়ে খুলে আছে, চোখ বন্ধ। আর রাবেয়া দু'হাতে ধরে আছেন তাকে, জাগানোর চেষ্টা করছেন, “মৌয়ের আব্বা!”
মৌমিতা ছুটে এসে আব্বার মাথাটা মেঝে থেকে কোলে তুলে নেয়। মুখে-মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকতে থাকে, “আব্বা! আব্বা, চোখ খোলেন...”
রাবেয়া টেবিলের উপরে রাখা পানিভর্তি জগটা আনলেন, লোকটার চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে দিলেন। ব্যস্ত হয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি জুনায়েদকে ডেকে আনো।”
মারুফের মাথার নিচে একটা বালিশ রেখে মেয়েটা আবার বাইরে ছুট দেয়। ওড়না মাথায় দেওয়ার খেয়ালটুকু এলো না। কোনোদিকেই তাকানোর অবস্থা রইলো না তার। চারপাশ কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। পা দুটোকে পর্যন্ত অনুভব করা যাচ্ছে না। তবুও সে প্রাণপণে ছুটলো। চৌকাঠে ধাক্কা খেলো সজোরে, ব্যথা লাগলো কিনা, সেটাও বুঝলো না।
স্বামীর হাত মালিশ করতে থাকেন রাবেয়া। জোরে জোরে দোয়া পড়তে গিয়ে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। লোকটার শরীর অস্বাভাবিকভাবে ঘেমে যাচ্ছে। ফ্যানের গতিটা কি একটু বাড়িয়ে দিতে হবে?
ততোক্ষণে জুনায়েদ দৌড়ে এসে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে, আতঙ্কিত হয়ে ডাকতে থাকে, “চাচা? চাচা?” মারুফের কাঁধ ধরে হালকা ঝাঁকানোর চেষ্টা করে, “চাচা, কী হয়েছে আপনার?”
জহির পাশে দাঁড়িয়ে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, “হাসপাতালে নিতে হবে।”
রাত তেমন গভীর হয়নি। কিন্তু গাড়ি জোগাড় করতে বেশ বেগ পেতে হলো। হাসপাতাল মূল শহরে। তেমন পরিচিত কেউ নেই সেখানে। অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষা করলে দেরি হয়ে যাবে।
মৌমিতা ঘরে ঢুকলো। কাপড় বদলানোর মতো অবস্থা নেই। আলমারিতে বোরকা রাখা আছে বোধহয়। সেটা কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে নিলেই কাজ হয়ে যাবে। আলমারি খুলে কালো বোরকাটা খুঁজতে শুরু করলো সে। এইটুকু কাজ করতে গিয়েও মেয়েটার শ্বাস নিতে কষ্ট হলো। সবকিছু সে এখনও বিশ্বাস করতে পারেনি। যা ঘটছে, তা যে দুঃস্বপ্ন নয়—এমন সেটারই বা নিশ্চয়তা কী?
বোরকায় ডান হাতটা ঢুকছে না, খাঁজকাটা স্বর্ণের বালায় সুতা আটকে গেছে। মেয়েটার শরীর কাঁপছে। ঘোর কাটছে দ্রুত। দুঃস্বপ্ন নয়, সব বাস্তব। মৌমিতা নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেও সফল হলো না। তার পাপের শাস্তি কি আব্বা পাবেন! সে বিড়বিড় করে ওঠে, “খোদা, আমি কী করলাম! এটা কী করলাম আমি!”
বাহির থেকে জুনায়েদের চিৎকার ভেসে এলো, “গাড়ি পাওয়া গেছে চাচি।”
—————
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
রাত ২টা।
মারুফকে একটা কেবিনে রাখা হয়েছে। এখানে পাশাপাশি দুটো ধাতব চৌকি। একটাতে তিনি শুয়ে রয়েছেন। অন্যটাতে বসে আছেন তার স্ত্রী, সন্তান। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক চিকিৎসকের নাম আজিম। রোগীর মুখটা নিরীক্ষা করে তিনি জুনায়েদের দিকে ঘুরলেন, “রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। তবে আমার মনে হয় না, ভয়ের কিছু আছে। ওনার শরীর দুর্বল, তাই অজ্ঞান হয়ে গেছেন। বাহির থেকে আপাতত বড় কিছু মনে হচ্ছে না।”
জুনায়েদ বাধা দেয়, “অজ্ঞান হওয়ার আরও কারণ থাকতে পারে। নাটোরের হাসপাতালে নিয়েছিলাম। ওনারা তো বললেন, রাজশাহীতে নিতে হবে যতো দ্রুত সম্ভব। ব্রেইনে কিছু হয়েছে, এমন আশঙ্কা করছিলেন।”
“এখানে এসে ভালো করেছেন। পেশেন্ট এখন ভালো আছে। চিন্তার কিছু নেই। আর রিপোর্ট আসুক, তারপর দেখা যাক বাকিটা। ভোরের মধ্যেই রিপোর্ট পেয়ে যাওয়ার কথা।”
ডা. আজিম কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। তাকে সাময়িক বিদায় জানিয়ে জুনায়েদ আবার ভেতরে এলো। একটা বড় শ্বাস ফেলে বললো, “ভাগ্যিস, ঠিক সময় অ্যাম্বুলেন্সটা পেয়ে গেছি। নাহলে এতো রাতে... কী যে হতো এখানে আসতে না পারলে। এখন আড়াইটার মতো বাজে। রিপোর্ট দিতে বেশিক্ষণ লাগবে না।”
চারজন মানুষই অনেকক্ষণ নীরব থাকে। পরিবেশটা শান্ত হয়ে আসে।
জুনায়েদ কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো আবার। রাবেয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৌমিতার উদ্দেশ্যে বললেন, “মার্জুকে এখনই কিছু জানানোর দরকার নেই। পরে জানালেও হবে। একা একা আছে ওখানে। হঠাৎ এসব শুনলে ভয় পাবে।”
মৌমিতা মাথা দোলায়, “রিপন মামাকে জানাতে হবে।”
“হ্যাঁ। আর মমতাজ আপাকেও। জুনায়েদ তো আর এখানে বেশি থাকতে পারবে না। রতনকে পাঠিয়ে দিলে সুবিধা হবে।”
মেয়েটা কিছু বললো না। একদৃষ্টে আব্বার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলো। রাবেয়া তাড়া দিলেন, “মৌ, যাও তো, রতনকে পাওয়া যায় কিনা দেখো। পারলে তোমার মামাকেও জানাও। যাও, ওঠো মা।”
সে উঠে দাঁড়ায়। করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে কাউন্টারের কাছে পৌঁছে যায়। লাল রঙের টেলিফোনটার দিকে নিশ্চুপ হয়ে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করে। খানিকটা দূরত্বেই মহিলাদের বিশ্রামাগার। মৌমিতা সেখানেই গেলো। নলের পানি কনকনে ঠাণ্ডা। ঐ ঠাণ্ডা পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে নেয় সে। তাতে চোখ বেয়ে নেমে আসা অশ্রু অদৃশ্য দেখালেও, কণ্ঠ চিরে বেরোতে চাওয়া চিৎকারটিকে রুখতে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরতে হলো। মেয়েটার দেহ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো।
প্রবল অপরাধবোধ ঘিরে ধরলো তাকে। ঘোলাটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিটা সিদ্ধান্ত, প্রতিটা পদক্ষেপ, এমনকি নিজের অস্তিত্বটাও ঘোলাটে, অস্পষ্ট, তুচ্ছ মনে হলো।
এভাবেই অনেকটা সময় কেটে যায়। আরেকজন মহিলা ভেতরে আসতেই মৌমিতা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মুখে কয়েকবার শীতল পানির ঝাপটা দিয়ে সমস্ত অসহায়ত্ব আড়াল করে ফেলে।
সকাল ৮টা।
কেবিনের অন্য চৌকিটাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো মৌমিতা। রাবেয়ার ঘুম হয়নি। তিনি প্রায় পুরো সময়টা জেগে ছিলেন। স্বামীর নিষ্পাপ চেহারার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। মেয়েটার ঘুম ভাঙলে তিনিও একটু নড়েচড়ে বসলেন। দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ঘড়িটার দিকে একবার দেখলেন, “এখন রিপোর্ট দিয়েছে মনে হয়। একটু দেখো তো মৌ।”
মৌমিতা হাত-মুখ ধুয়ে কেবিনের আশেপাশেই নিরুপায় হয়ে ঘুরঘুর করতে লাগলো। জুনায়েদ সে সকাল সকাল কোথায় বেরিয়েছে, অন্তত রিপোর্টের ব্যাপারটা তার দেখা উচিত ছিলো। কিংবা কাউকে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেও কাজ হতো। যেচে দায়িত্ব নেওয়ার পরে এভাবে অবহেলা করবে কেন!
মেয়েটা বেঞ্চের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। একজন সেবিকাকে দেখে পরিচিত মনে হলো তার, গতরাতে বোধহয় সাহায্য করেছিলো। তাই মৌমিতা তাকে উদ্দেশ্য করেই বললো, “আচ্ছা, ডক্টর আজিম কোথায় আছেন? একটা রিপোর্টের ব্যাপারে আপডেট লাগতো।”
“কোন রিপোর্ট?”
“এই যে... এই কেবিনে অ্যাডমিট আছেন, মারুফ খন্দকার।”
“ম্যাডাম, আজিম স্যার তো এখন এখানে নেই, বাইরে গেছেন। আপনি ওনার জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে কথা বলতে পারেন।”
“অ্যাসিস্ট্যান্ট?”
“হ্যাঁ। নিউরোলজি বিভাগে দেখুন। আপনার রোগীর সব ফাইল ওনার কাছেই আছে।”
“কোথায় পাবো ওনাকে?”
“ডক্টর আজিম স্যারের চেম্বারে।”
মৌমিতা অস্থিরতা দেখায়, “কোথায় সেটা?”
“আট নম্বর ওয়ার্ডের ডিউটি রুমে পেয়ে যাবেন।”
“আচ্ছা, ধন্যবাদ।”
মৌমিতা খুঁজে খুঁজে ডা. আজিমের চেম্বারে পৌঁছায়। দরজা সামান্য খুলে বলে ওঠে, “আসসালামু আলাইকুম।”
চেম্বারের একপাশে বই এবং ফাইল রাখা সারি সারি আলমারি, সেদিক থেকেই একজন বলে ওঠে, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ভেতরে আসতে পারেন।”
মেয়েটা জড়োসড়ো হয়ে ভেতরে আসে। সাদা অ্যাপ্রোন পরিহিত তরুণ, যে সম্ভবত ডা. আজিমের সহকারী, সে বলে ওঠে, “জ্বী বলুন, কোনো সমস্যা?”
মৌমিতা থতমত খায়। ছেলেটার কণ্ঠ... কেমন যেন পরিচিত। কার মতো কণ্ঠটা? আব্বার মতো নাকি! চেম্বারে ছড়িয়ে থাকা মৃদু সুবাস, সেটাও যেন পরিচিত। অভিভূত মেয়েটার মনে হতে থাকে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকেও সে চেনে। যদিও সে জানে না, সৃষ্টিকর্তা এই মানুষটির সাথেই তার ভাগ্যের সুতো গেঁথে রেখেছেন।
মৌমিতা তার অ্যাপ্রোনের উপরে থাকা নেমপ্লেটে চোখ বোলায়, সেখানে লেখা—‘মাহফুজুর রহমান, এফসিপিএস ট্রেইনি’।
তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সুজয়ও নিজের নেমপ্লেটের দিকে তাকায়, তারপর আবার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কাউকে খুঁজছেন?”
মাথাটা সামান্য ঝাঁকিয়ে মৌমিতা বলে, “আমি আরকি... আচ্ছা, মারুফ খন্দকার নামে কারও ফাইল কি আছে আপনার কাছে?”
“একটু অপেক্ষা করুন।” সুজয় টেবিল থেকে চট করে একটা ফাইল তুলে নেয়, মাথা দুলিয়ে নিশ্চিত হওয়ার ভঙ্গিতে বলে, “জ্বী—”
“কী হয়েছে ওনার?”
সুজয় সরাসরি উত্তর না দিয়ে শান্তভাবে জিজ্ঞেস করে, “উনি আপনার কে হন?”
এই সহজ-সরল প্রশ্ন শুনেও মৌমিতার বুকটা ধক করে ওঠে। সে আমতা আমতা করে বলে, “কেন? কী হয়েছে?”
ছেলেটা মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করে, “বড় কিছু না। মাইনর স্ট্রোক। দুশ্চিন্তার কিছু নেই।”
“স্ট্রোক...!”
মৌমিতা পাশে রাখা চেয়ারের উপরে হাত রাখলো। দাঁড়িয়ে থাকাটা ভীষণ কষ্টকর লাগলো তার কাছে। সুজয় এবারও খুব শান্ত স্বরে বলে, “বসতে পারেন।”
মেয়েটা বসে না। তার মাথায় এখন অনেক প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা হলো, গতদিন বাদল আর মারুফের মধ্যে এমন কী কথা হয়েছিলো—যার কারণে মারুফ এমন অসুস্থ হয়ে পড়লেন, আর বাদল নিখোঁজ হয়ে গেলো?
সুজয় ফাইলটাতে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিজের কাজে ফিরে গেলো। তার আগে হয়তো আড়চোখে একবার তাকালোও মৌমিতার দিকে, মেয়েটা খেয়াল করলো না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………