নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - পর্ব ১৪ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া
          দূর্ঘটনার ঠিক তিন ঘণ্টা আগে প্রকাশিত হয় সাহিদ আর ইসমাতের বিয়ের সম্পর্ক। এই অনাকাঙ্খিত খবরটা যেখানে সহজে কারো হজম হচ্ছিল না, জুনিয়র ছেলে আর সিনিয়র মেয়ের বিয়ে কিভাবে সম্ভব ইত্যাদি বলে বলে যেখানে অবিশ্বাসের চর্চা হচ্ছিল, তর্ক ধাওয়া পালটা ধাওয়া হচ্ছিল তখন আরও এক অনাকাঙ্খিত খবর শিরনামে দেখাল। তিনশো ফিটে সাহিদ মুস্তাহাব এবং তার বন্ধুর গুরুতর দূর্ঘটনা। সঙ্গে জানানো হয়, সাব্বির আহমেদের স্পট ডে থ। সাহিদ এখন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। বর্তমানে আইসিইউতে আছে। 

 তিনশো ফিটে এই ধরণের দূর্ঘটনা বিরল নয়। মাসে কয়েকটা করে এরকম শিরোনাম পাওয়া যায়। কত পরিবার তাদের আদরের ছেলেদের হারায়, তা হিসাবহীন। যেমনটা আজ হারালো সাব্বিরের পরিবার।

 ইসমাত আইসিইউ'র বাইরে শক্ত হয়ে বসা। বুকজুড়ে প্রচন্ড ব্যথা। সে কান্না করতে চায় না, তবুও তার চোখ-জোড়া লাল হয়ে আছে, মুখটাও বেশ ফ্যাকাশে। পরিবারের অবস্থা করুণ। শাহেলা নিজেও এই খবর শুনে হাসপাতালে ভর্তি। একা হাতে ইসমাত সবদিক দেখছে। মাহফুজ সাহেব তখন ব্যস্ত ছেলেকে নিয়ে। 

সাব্বিরকে হারিয়ে তার পরিবারের অবস্থা দেখার মতো না! এইতো, কিছুদিন বাকি ছিল সাব্বিরের বড়ো ভাইয়ের বিয়ের। বাড়িটা কেমন উৎসবমুখর ছিল। সাব্বির কতটা উচ্ছ্বাসে ছিল। সেই যেন ছিল এই বিয়ের প্রাণ। নিজে গিয়ে কত আত্নীয়র বাড়িতে বিয়ের কার্ডও দিয়ে এলো। খুশির কোনো কমতি ছিল না। এই খুশিতেই বুঝি নজর লেগে গেল।

  এই দূর্ঘটনা মুহূর্তেই বিয়েবাড়ি থেকে মৃ ত বাড়িতে রূপান্তর হলো। এক বন্ধু পরাপারে চলে গিয়েছে, আরেক বন্ধু হাসপাতালে মৃ ত্যুর সাথে লড়ছে। এই কঠিন মুহূর্তে দুই পরিবার যেন দুই পরিবারকে সঙ্গ দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করল। তাদের জানাশোনা অনেকদিনের। মাহফুজ সাহেব ছেলের দিকটাও দেখছেন আবার সাব্বিরের বাড়িও দেখছেন। চোখ লাল ওনার, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই চেহারায় যেন বয়সের ভাজটা বেশি বোঝা যাচ্ছে। মাহফুজ সাহেব কখনোই এতটা অসহায় অনুভব করেননি। কতবার পা জোড়া টলমল করেছিল, ব্যালেন্স হারিয়েছিলেন, কিন্থ রমযান সাহেব পাশে থেকে তাকে সামলে যাচ্ছেন। তিনিই চিকিৎসার দিক, মিডিয়া, ও বাড়ি লক্ষ্য রাখছেন।

  মাহফুজ শাহকে জীবন এতটা খারাপ দিন দেখাবে কখনো ভাবনাতেও ছিল না। ওনার বারবার মনে হচ্ছে, তার দুই ছেলের জায়গায় তিনি কেন ছিলেন না? কেন সাব্বিরের অকালে প্রাণ হারাতে হলো? সাব্বিরকে তিনি কখনো অন্য চোখে দেখেননি। সবসময় তাকে অন্য ছেলে বলে ডাকতেন। সাব্বিরের বাবা একবার যখন চরম বিপদে পড়েছিলেন, তিনিই সবার আগে এগিয়ে গিয়েছিলেন। ছেলেটা কত তার বাড়িতে ছুটেছে, খেলেছে। অথচ দেখো, জীবন কত অনিশ্চিত।

সাহিদের অন্য দুই বন্ধুর অবস্থাও করুণ। ওরাই মূলত দুজনকে হাসপাতালে এনেছে। সাব্বিরের লা শ অবশ্য সকালেই তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ছেলের মৃ ত মুখটা দেখে সাব্বিরের মা স্ট্রোক করেন। ওনাকে নিয়েও ছোটাছুটি কম হয়মি। সাব্বিরের বাবা খাটিয়ার পাশে বসে বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করছেন। বড়ো ভাই মেহেদীও একপাশে কান্না লুকাচ্ছে। হায় আফসোস! এই দৃশ্য যদি প্রতিটা ছেলে আগেই দেখত, তবে কখনোই বাইকের স্পিড বাড়িয়ে চালানোর সাহস হতো না। অপমৃ ত্যু শুধু একজন মানুষকেই কেড়ে নেয় না। পুরো একটা পরিবারকেও লা শ করে দেয়। জীবন্ত লা শ। 

আকিব, রুশান এখন সাব্বিরের বাড়িতে। তারা আজ কাঁদছে। একই সাথে দুই বন্ধু। সাব্বিরের অবস্থায় তারা নিজেদের দোষারোপ করছে। কেন তারা এগিয়ে গিয়েছিল? তারা ওদের সাথে থাকলে কি এরকম কিছু হতো? সব তাদের দোষ। এজন্য বারবার সবার সামনে কেঁদে-কেটে মাফ চাইছে, নিজেদের দোষের কথা বারবার আওড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাব্বিরের বাবার সেই অবস্থা নেই ওদের দিকে খেয়াল করবেন। চোখের সামনে ছেলের নিথর দে হ থাকলে কোন বাবার হুঁশ থাকে? স্ত্রীর দুশ্চিন্তা তো সাথে আছেই। নিজেকেই সামলাতে পারছেন না, স্ত্রীকে কিভাবে ধরবেন?

 আত্নীয়-স্বজন, প্রতিবেশি সবাই ভীড় জমিয়েছে ওদের বাড়ি। ওদের এই আবাসিক এলাকার রাস্তাটা মানুষের জন্য ব্লক করে রাখা। আপাতত খাটিয়া বিল্ডিং-এর নিচ তলায়। পুলিশ এসেছিল, কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে চলে গেছে। টুকটাক মিডিয়াও এটা সেটা জেনে আবার চলে যাচ্ছে। ক্যামেরা নিয়ে ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই, দারোয়ান আটকে দিচ্ছে।

মানুষের মৃ ত্যুর পর তার শত্রুও বলে মরহুম ভালো ছিল। এখানের পরিস্থিতিও এরকমই। কতজনের চক্ষুশূল ছিল সাব্বিরের অবাধ চলাফেরা, খোচানো স্বভাব। কেউ তো আবার পিঠ-পিছে বলে বেড়াচ্ছে, "ঠিকই আছে। ম র তেই তো গেছিল। কেউ এভাবে বাইক চালায়? ওটা কি উড়োজাহাজ?"

আবার কারো কারো অকালে প্রাণ ঝরার দুঃখও হচ্ছে অনেক। তাদের ছেলেদের বয়সী ছেলেটা। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এখন আল্লাহর মেহমান। আসলে জীবন যার যেমন লেখা থাকে। মানুষ কি আর দীর্ঘশ্বাসে, কান্নাকাটিতে ফিরে আসে?

—————

ইসমাত খেয়াল করল তার পাশে এক কালো পোশাকধারী এসে দাঁড়িয়েছে। ইসমাত মাথা তুলে তাকাতেই দেখল লম্বা-চওড়া বডিগার্ডের মতো একজন। ইসমাতের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো, তার সাব্বিরের কথা মনে পড়ছে। অথচ সে না সাব্বিরকে দেখতে পারত না? এটা কি আদৌ সত্যি ছিল? ছেলেটা আর যাইহোক, সাহিদের মতো অভদ্র ছিল না। তাকে বেশ সম্মান দিয়েছে। তাদের বাড়ি তো ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে কার্ডও দিয়ে গিয়েছিল। কত হাসি-খুশি ছিল সে। আল্লাহ কেন ভালো ছেলেটাকে নিয়ে গেল? একটা মিরাকেল হলে কি খুব মন্দ হয়ে যেত? ছেলেটার তো এখন প্রাণ খুলে বাঁচার বয়স ছিল।

 আরেকজন লড়ছে মৃ ত্যুর সাথে। ডাক্তাররা এখনো বিশেষ কিছু বলতে পারছে না। সবাই বলছে দোয়া করতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেন সাহিদের জ্ঞান ফিরে। নয়তো অবস্থা আরও ভয়াবহ হবার সম্ভাবনা আছে। এই খবরে আরও ভেঙে পড়েছে ইসমাত। সাহিদের সাথে তার সাপে-নেউলে সম্পর্ক হলেও সে কখনো কারো মৃ ত্যু কামনা করেনি। সে এখনো এক কাপড়ে বসা, গতকাল রাত থেকেই। বাড়ি পর্যন্ত যায়নি। যেন সাহিদকে চোখের আড়াল হতে দেওয়া যাবে না। ইসমাত কোথাও না কোথাও নিজেকেও দোষারোপ করে। সে কেন কড়া করে ধমক দিয়ে বাইকের চাবি নিয়ে নিল না? তার শাশুড়ি তো পইপই করে বারণ করেছিল যেন ছেলেকে বাইকের চাবি না দেয়। কিন্তু ইসমাতের কথা সাহিদ কখনো শুনেনি, নিজের মতো চলাফেরা করে গেছে। 

 অল্পবয়সী যুবক, যে বডিগার্ডের পোশাকে— সে ইসমাতের দিকে তাকাল না। সে মেরুদণ্ড শক্ত করে সোজা হয়ে দাঁড়ানো। কানে তার ব্লুটুথ, সে চোখের ইশারায় আরও কয়েকজন বডিগার্ডকে কিছু একটা ইশারা করতেই এপাশটায় তারা পাহারা দিতে দাঁড়িয়ে গেল। ইসমাত এখনো নাম জানে না তার। সে দু'হাতে মুখ চেপে কেঁপে কেঁপে কাঁদছে, কিন্তু সেই কান্নায় শব্দ নেই। মিনমিন করে বলছে,
--"সাহিদ, তুমি ফিরে আসো প্লিজ। আমাদের সবার জন্য। তোমাকে আমার প্রয়োজন। আমি তোমার বডিগার্ড হবো, তাও তুমি ফিরে আসো। আমার ভুলগুলো শুধরে নিব, সাহিদ। প্লিজ।"

ইফরা আর মমতাজ বেগম তখনই আসলেন। ওনারা গতকাল রাতে এসে আবার ভোরে ফিরে গিয়েছিল। মমতাজ বেগম আর বোনকে দেখতেই এবার ইসমাতের কান্নার দমক বেড়ে গেল। সে গিয়ে পড়ল তার দাদীর বুকে। হুঁ হুঁ করে কাঁদছে সে। মুখটা এমন ভাবে চেপে রেখেছে যেন বেশি কান্নার শব্দ প্রকাশ না পায়। মমতাজ বেগম নাতনিকে নিজের সাথে আগলে রাখলেন, ইফরাও পেছন থেকে বসে বোনকে শান্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মমতাজ বেগম পুরো রাতেও নাতনিকে এতটা কাঁদতে দেখেননি। শেষ এমন কাঁদতে দেখেছিলেন ওনার ছেলে আর ছেলের বউমার এক্সিডেন্টের সময়ে। তাদেরটা কার এক্সিডেন্ট ছিল। একই ঘটনা আবারও ঘুরেফিরে ইসমাতের জীবনে এসেছে। এবার তার হাসবেন্ড। মেয়েটার মধ্যে দিয়ে কি যে যাচ্ছে তিনি কল্পনাও করতে পারছেন না। এমন কঠিন মুহূর্তেও তিনি বিড়বিড় করে তসবিহ পড়া বাদ দিচ্ছেন না। ঘণ্টাখানেক নাতনিকে সামলে ইফরার হাতে ইসমাতকে হস্তান্তর করে ভদ্রমহিলা চলে গেলেন শাহেলার খোঁজ নিতে। শাহেলার কাছেই তিনি বেশিক্ষণ থাকবেন।

ইফরা নানা কথা বলে বোনকে সামলানোর চেষ্টা করব যাচ্ছে। ইসমাত তখনো ইফরার কাঁধে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে। ইফরা মাথা তুলে বডিগার্ডের দিকে তাকিয়ে বলল,
--"আপনি..."

বডিগার্ড এবার মুখ খুলল,
--"আমি উৎসব! আমাকে আপনি করে বলার দরকার নেই ম্যাম।"

--"ঠিক আছে। আমি খাবার এনেছি, একটু প্লেট আর মিনারেল ওয়াটারের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।"

ইসমাত বাঁধ সাধল,
--"আমি কিছু খাব না ইফরা।"
--"নিজের কি হাল করেছ দেখেছ আপু? না খেলে কীভাবে চলবে?"

অনেক বলেও ইফরা ইসমাতকে খাওয়াতে পারল না। তার গলা দিয়ে আর খাবার নামবে না। ইফরাও তাই ব্যর্থ চেষ্টা ছেড়ে দিল। দূর থেকে সবকিছু দেখল তর্ষা। তার চোখেও জল। এই প্রথম তার ইসমাতকে নিয়ে হিংসে হচ্ছে না। বরং আজকে তারা সবাই এই কারণে দুঃখিত। সবাই একই দোয়া করছে।

—————

দুপুর নাগাদ ইসমাত উৎসবের সাথে গেল সাব্বিরের বাড়িতে। উৎসব এখন থেকে সাহিদের বডিগার্ড হিসেবে থাকবে। সে আগে দুই বছর এক মন্ত্রীর অধীনে ছিল। কিন্তু কীভাবে যেন তার চাকরি ছুটে যায়। তাকে আবার মাহফুজ সাহেব এক সপ্তাহ আগেই চাকরি দিলেন। কিন্তু সাহিদকে যে উৎসবের কথা জানাবেন, সেই সুযোগ ছিল না। ছেলের আবার বডিগার্ড/সেক্রেটারিদের প্রতি বেশ বিতৃষ্ণা। কিন্তু এখন থেকে সাহিদের জন্য বডিগার্ড বাধ্যতামূলক।

সেখানে গিয়ে দেখল পরিস্থিতি শোচনীয়, খাটিয়া দেখেই তার বুক ছিদ্র হয়ে গেল। সেখানে কাফনে মোড়ানো সাব্বির। মুখটা এখনো আহত, চোখ বন্ধ। কেমন স্নিগ্ধ লাগছে। ইসমাতের মনে হচ্ছে এই বুঝি ছেলেটা উঠে এসে তাকে ভাবী বলে ডাক দিবে, সাহিদকে তার পাশে খুঁজবে। চোখটা ছলছল করে উঠল তার। মৃ ত বাড়িকে ইসমাত খুব ভয় পায়, তার ট্রমা আছে। মূলত ছোটবেলার আঁধার নিয়েই। তবুও সে এসেছে। ইসমাতকে দেখতেই সাব্বিরের ছোটো বোন সাবা ঝাপিয়ে পড়ল বুকে। হুঁ হুঁ করে কাঁদছে ইন্টার পঁড়ুয়া মেয়েটা। শপিং এ কয়েকবার দেখা হয়েছিল তাদের, সেই থেকেই ইসমাতের বেশ ভক্ত হয়ে গিয়েছিল। দুইবার তো অফিসে গিয়ে দেখাও করে এসেছিল।
--"ভাবী ভাবী, দেখেন। আমার ভাই রাগ করে চলে গেছে। আর কখনো ফিরবে না। মাও স্ট্রোক করেছেন। এখনো জ্ঞান ফিরে নাই।"

বলে সাবা চেঁচিয়ে কাঁদছে। ইসমাতের চোখ আবারও ভরে গেল। এই কঠিন পরিস্থিতিতে, কাউকে হারানোর পরের সান্ত্বনাটুকু কেমন হতে পারে? কীভাবে দেয়? আদৌ পৃথিবীতে এমন কোনো শব্দ বা বাক্য আছে? যেটা প্রিয়জন হারানোর ব্যথা ভুলাবে, সান্ত্বনা দিবে? তার বেলাতে তো কেউ পারে না, সে আরেকজনকে তবে কি বলবে? 

 ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সাহিদের জ্ঞান ফিরলে সাব্বিরের জানা জা পড়ানো হবে, দা ফন করা হবে। কিন্তু বরফ দিয়ে লা শ চব্বিশ ঘণ্টার বেশি রাখা সম্ভব হলো না। সাহিদের এখনো জ্ঞান ফিরেনি। আর ফিরলেই বা কি? সাহিদ তো হাতে পায়ে এসে তার বন্ধুকে দা ফ ন করার মতো অবস্থায় নেই। এজন্য মাহফুজ সাহেব বুকে পাথর রেখেই বললেন যেন দা ফনের কাজ সেরে ফেলে। নিথর দে হটাকে আর কতই বা কষ্ট দিবে? এখন তার শেষ যাত্রার পালা। ওখানেই যে চিরন্তন ঠিকানা। আগে পরে আমাদের সবাইকেই সেই মাটির ঠিকানায় আজীবনের জন্য চলে যেতে হবে। 

 সেই মোতাবেক পরেরদিন সকাল আটটায় জানাজা পড়ানো হলো, সেই জানাজায় সাব্বিরদের ভার্সিটি, কলেজের অনেকেই এসেছে। জানাজা শেষেই রওনা দিল ক বরস্থানের উদ্দেশে। বাবার কাঁধে সন্তানের ওজন আজ খুবই ভারী লাগছে। যেই কাঁধে করে ছেলেকে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছিল বাবা, সেই বাবাই আজ যাচ্ছেন ছেলেকে শেষ বিদায় জানাতে। আজকের পর আর ছেলেকে চোখের দেখা দেখতে পাবেন না। ছেলে আর এটা সেটার আবদার করবে না, টাকা চাইবে না, বাড়ি মাতিয়েও রাখবে না। সাব্বিরের বাবার বারবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। 

সাব্বিরকে দা ফনের কয়েক ঘণ্টা পরেই সাহিদের জ্ঞান ফিরল। সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। নড়াচড়া করতে পারল না, সেই শক্তি তার নেই। ডাক্তার, নার্স তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একজন গেল তার পরিবারকে সুসংবাদ জানাতে। সাহিদ এখন বিপদমুক্ত। তাকে তার শারীরিক এবং মানসিক ভাবে এখনো সেরে ওঠা বাকি। শরীরের ক্ষত নাহয় মুছে যাবে, কিন্তু মানসিক ক্ষত মুছবে কেমন করে?

একজন শুধু তার সাথে দেখা করার অনুমতি পেল। তাই ইসমাত এলো, শাহেলা ওষুধ নিয়ে তখন অন্য কেবিনে ঘুমাচ্ছিলেন, তিনি অবশ্য কিছুটা সুস্থ। ইসমাত দেখল, অতি চঞ্চল, শক্তপোক্ত দেহটা কেমন সাদা ব্যান্ডেজে বন্দী হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। সাহিদকে এতটা করুণ কখনোই দেখেনি সে।

 সাহিদের হঠাৎ-ই নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে গেল, সে যেন উঠতে চাইছে, কোথাও যেতে চাইছে। ইসমাত এসে শক্ত করে সাহিদের হাতটা ধরল। সাহিদ বেশি উত্তেজিত হওয়ার আগেই ডাক্তার তাকে ইনজেকশন পুশ করে দিল। মুহূর্তেই মিইয়ে গেল শক্তপোক্ত, আহত শরীরটা। সাহিদের চোখের কোণ দিয়ে স্বচ্ছ অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ইসমাত ঝাপসা চোখে দেখল অক্সিজেন মাস্কের সাহিদের কম্পিত ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। যেন কিছু বলছে। ইসমাত দ্রুত তার কান এগিয়ে দিল সাহিদের মুখের সামনে। সাহিদ খুব কষ্টে কটা শব্দই উচ্চারণ করতে পারল,
--"আমাকে সাব্বিরের কাছে নিয়ে চলুন। আমার.. বে..বেস্ট..ফ্রে.."

সাহিদ মুহূর্তেই ঘুমিয়ে পড়ল। ইসমাত সাহিদের ক্যানলা লাগানো হাতে কপাল ঠেকিয়ে নীরবে কাঁদতে শুরু করল। কীভাবে বলবে এই পাগল ছেলেটাকে, তার বন্ধুকে সে আর কোনোদিনও দেখতে পারবে না। শেষ দেখাও দেখার সুযোগ নেই। ঘুমের মাঝেই সাহিদের চোখের কোণ বেয়ে আরেক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp