পবনপত্র - পর্ব ৩৬ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          মৃন্ময়ী ক্লাস থেকে ফিরছিলো। আজ সকাল সকাল ক্লাসটা শেষ হয়ে সুবিধাই হয়েছে। সারাদিনে আর বের হওয়ার দরকার নেই। ভালো করে গোসল করে লম্বা একটা ঘুম দেওয়া যাবে। এমন সুখের দিন রোজ রোজ আসে না কেন?
মনের সুখে হাঁটতে থাকা মেয়েটার চোখ পড়লো সিনিয়র ভাইয়ের উপরে। আজ তার সাথে আর কেউ নেই, একা একা ক্লাসের দিকে যাচ্ছে।

“ভাই, আসসালামু আলাইকুম।”

হাসিব চোখ তুলে তাকালো, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম।” হাঁটা বন্ধ করে বললো, “তোর ঐ সিনিয়র কোথায়? মার্জিয়া?”

তার ভঙ্গি দেখে মৃন্ময়ীর আশঙ্কা হলো, ছেলেটা হয়তো প্রশ্নের ঝুরি নিয়েই উপস্থিত হয়েছে। সুখের দিনটা মাটি করেই ছাড়বে!

“আপু বোধহয় রুমে আছে।”

“ও তোর রুমমেট?”

“জ্বী ভাই।”

“ওদের না ক্লাস আছে এখন। রুমে কী করে?”

“আপু ক্লাস করবে না আজকে।”

“কেন? অসুস্থ?”

মৃন্ময়ী আমতা আমতা করে বলে, “আপু বাড়িতে যাবে তো। গোছগাছ করছে।”

“কেন?”

“ওনার বাবা নাকি অসুস্থ।”

“ওহ।” হাসিব মেয়েটাকে চলে যেতে ইশারা করে, “আচ্ছা, যা।”

দু'জন দু'দিকে হাঁটতে শুরু করে।

মার্জিয়ার জিনিসপত্র এখনও চৌকির উপরে ছড়ানো ছিটানো। তেমন কিছুই গোছানো হয়নি। সে নিজেও তৈরি হয়নি। চেয়ারে বসে আছে মাথায় হাত দিয়ে। মৃন্ময়ী হাত-মুখ ধুয়ে এসেও দেখে, একই অবস্থা। সে মার্জিয়ার কাছে এসে দাঁড়ায়, “আপু?”

মেয়েটা চমকে উঠে তার দিকে তাকায়। তারপর আশেপাশে চোখ বুলিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলে, “কিছুই করলাম না এখনও।”

“আমি কি সাহায্য করবো?”

“না থাক। আজকে রেস্ট নাও। প্রতিদিন তো অনেকগুলো ক্লাস থাকে তোমার।”

কথাটা সে ভুল বলেনি। তবুও মৃন্ময়ী চাইলো, অল্প হলেও সাহায্য করতে। মার্জিয়ার মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। দেখেই মায়া লাগছে। মৃন্ময়ী আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলো, তখনই দরজায় কড়াঘাত শোনা গেলো। সে দরজা খুললো। হোস্টেলের আয়া ভেতরে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে বললেন, “মার্জিয়া খন্দকার আছে নাকি?”

মার্জিয়া উঠে দাঁড়ায় “জ্বী, আছি।”

“তোমার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে।”

সে গায়ে ওড়না জড়িয়ে আয়ার সাথে বাইরে বেরিয়ে এলো। রিপন এসেছে। হলের কোয়ার্টারে দাঁড়িয়ে কথা বলছে কারও সাথে। মার্জিয়াকে লক্ষ করা মাত্রই তার ভ্রু কুঁচকে গেলো, “কী রে! চেহারার এই দশা কেন?”

“আব্বা কেমন আছেন?”

“ইশ! তোমরা বাপ বেটি একেবারে টেনশনের কারখানা! তুমি এখানে বসে দুশ্চিন্তা করলে কি তোমার আব্বা সুস্থ হবে?”

বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না মার্জিয়া।

“খাওয়া-দাওয়া করো ঠিকমতো?”

“করি।”

“আগে যেদিন আসলাম, সেদিনও তো ভালোই দেখলাম। এতো তাড়াতাড়ি স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেলো। জার্নি করতে পারবা তো?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, পারবো।”

“আচ্ছা। দুই ঘণ্টার মধ্যেই বের হতে হবে। সব রেডি করে নাও। আমি আসছি।”

মার্জিয়া মাথা দোলায়। রিপন ঘুরে গেলো, হোস্টেলের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। মেয়েটাকে বলা হয়নি, তার আব্বার ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছে। এটা না জেনেও চিন্তা করতে করতে নিজের কী হাল করে ফেলেছে!
রিপন ভাবলো মৌমিতার কথা। বড় মেয়েটাকে নিয়েই মারুফ খন্দকার বেশি দুশ্চিন্তা করতেন। সে কেমন আছে এখন?

—————

রাবেয়া গেছেন ননদের বাড়ি। হাসপাতালে তার পর্যাপ্ত বিশ্রাম হচ্ছে না। তাই একপ্রকার জোর করেই পাঠানো হয়েছে। আব্বার সঙ্গে আছে মৌমিতা। রতন বাইরে।

দুপুর আর বিকেলের মাঝামাঝি একটা শান্ত সময় তখন।
সুজয় ভিড়িয়ে রাখা দরজাটা খুলে অনায়াসে ভেতরে এসে দাঁড়ায়। মারুফ ঘুমাচ্ছেন, হা করে শ্বাস নিচ্ছেন। তার চৌকিতেই মাথা রেখে একটা টুলে বসে আছে মৌমিতা। মাথায় অন্য সময়ের মতো ওড়না নেই। চুলে খোঁপা বাঁধা, তবু একটু অগোছালো হয়ে আছে। মুখ অন্যপাশে ঘোরানো, দেখা যাচ্ছে না। তার ডান হাতটা অচেতনভাবে মাথার কাছে পড়ে আছে, মারুফের হাতের উপর রাখা সেটা। মেয়েটার ঐ হাতে একটা পরিচিত অলংকার, সোনার বালা।

সুজয় আচ্ছন্নের মতো মেয়েটার দিকে চেয়ে থাকে বহুক্ষণ। যখন বাস্তবতা তাকে স্পর্শ করে, সে হাত মুঠো করে ঠোঁটের সামনে ধরে, গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়।
মৌমিতার তন্দ্রা কাটতে সময় লাগে, সে ধীরে ধীরে চোখ খোলে। তারপর তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ায়, মাথাসহ সারা গায়ে ওড়না জড়িয়ে নেয় দ্রুত। বুকটা অস্বাভাবিকভাবে ধড়ফড় করছে। তার রাঙা মুখখানির দিকে একবার তাকিয়ে সুজয় এগিয়ে আসে মারুফের দিকে। তারপর খেয়াল করে, যে কাজের জন্য সে এসেছিলো, তা আর মনে পড়ছে না! অপ্রস্তুত ভাব লুকাতে সে কোনোমতে প্রশ্ন করে, “ওনার ঘুম ভাঙেনি?”

মৌমিতা মাথা নাড়ে, “না।”

“তাহলে যাই। আপনি রেস্ট নেন।”

সুজয় যেমন নিঃশব্দে এসেছিলো, তেমনি বেরিয়ে গেলো। পাশের ফাঁকা চৌকিটাতে বসে পড়লো মৌমিতা। হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হচ্ছে না। সেদিকে তার মনোযোগ নেই। সে খুব অপ্রয়োজনীয় একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। ছেলেটা এমন হুটহাট এসে হুটহাট চলে যায় কেন?
মেয়েটা উঠে আব্বার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। ঐ মুখটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে সে কেবিনের বাইরে এলো।

সুজয় চলে যায়নি, কারও সাথে কথা বলছে। দ্বিধা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যায় মৌমিতা। পেছন থেকে চুপচাপ তার কথা শুনতে থাকে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কম বয়সী মেয়েটাও সম্ভবত কোনো রোগীর আত্মীয়। সুজয় তাকে কিছু পরামর্শ দিচ্ছে। খুব বিনয়ের সাথে কথা বলছে। কোনো অজানা কারণে ব্যাপারটা মৌমিতার পছন্দ হলো না। রোগীর কি কোনো পুরুষ আত্মীয় নেই? তাদের সাথে কথা বলা যায় না?
মৌমিতা নিজের এমন যুক্তি বিবর্জিত ভাবনায় তৎক্ষণাৎ লজ্জিতও হলো। ছেলেটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র, রোগ আর রোগী নিয়ে যার সাথে খুশি কথা বলুক, পরামর্শ করুক। এখানে তো গায়ে লাগার মতো কিছুই নেই।

মেয়েটা নিজের খেয়ালে থাকতেই তাদের কথা শেষ হলো। সুজয় ডিউটি রুমের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করলো। মৌমিতা অনেক সংগ্রামের পর ডেকে উঠলো, “ডক্টর মাহফুজ?”

ছেলেটা ঘুরে তাকালো।

“একটা কথা জিজ্ঞেস করতাম।”

সে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ালো মৌমিতার দিকে, “জ্বী বলেন।”

“আব্বাকে ডিসচার্জ কবে দিতে পারে?”

“এখনও বলতে পারছি না। ওনার অবস্থার উপরেই ডিপেন্ড করবে।”

“ওহ।” মৌমিতা মাথা নাড়লো। ছেলেটাকে আরেকটা কথা জানাতে ইচ্ছে করছে। বলার ইচ্ছে করছে, তার কণ্ঠ অনেকটাই আব্বার মতো। কিন্তু এই কথাটা বলা ঠিক হবে না। একটু বেশিই ব্যক্তিগত আর অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। মৌমিতাকে চুপ থাকতে দেখে সুজয় নিজেই একটা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করলো, “দুপুরে খেয়েছেন?”

“জ্বী।”

উত্তর পেতেই সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চেম্বারের দিকে ফিরে গেলো। মৌমিতা ভ্রু কুঁচকালো। তার মন চাইলো ছেলেটার পিছু পিছু গিয়ে আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু মাথায় প্রাসঙ্গিক কিছু এলো না।
মেয়েটা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর চমকে উঠলো। দ্রুত পা চালিয়ে কেবিনের দিকে ফিরলো, আব্বা একা আছেন।

মারুফের ঘুম ভাঙেনি। মৌমিতা গিয়ে আরেকপাশের চৌকিটাতে বসে।
পরিবেশ একেবারে শান্ত, চুপচাপ। এরকম অবসরে অনেক ভাবনা আসার কথা। কিন্তু মাথাটা ফাঁকা মনে হচ্ছে। অস্বস্তিকর নীরব লাগছে ভেতরটা। আজকের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। এমন পরিবেশ পেলে শরীর আর কাজ করতে চায় না, অলসতা ভর করে।

মেয়েটা বিছানায় পা তুলে বসলো, দরজার দিকে তাকালো বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই।
আম্মা কখন আসবেন?
বাদলের সাথে কি আর কথা হবে না?
হবে না কেন!
ছেলেটার এই খামখেয়ালি ভাব কতোদিন টেকে, এবার সেটাই দেখার পালা। মৌমিতা নিজে থেকে আর একবারও যোগাযোগের চেষ্টা করবে না। অনেক হয়েছে! নিজেকে আর সহজলভ্য বানানো ঠিক হবে না। বাদলের যদি সত্যি সত্যিই দরকার হয়, সে নিজেই যোগাযোগ করুক। কিন্তু তার কি আদৌ দরকার আছে? আজ হঠাৎ তাকে এতো দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে কেন? এই ৬-৭ বছরে যেন তাকে ঠিকঠাক চেনাই হয়নি। মনে হয়েছিলো, চেনাজানার জন্য সারাটা জীবন পড়ে আছে। আজ না হোক, কাল হবে।
তবে সৎভাবে বললে, মৌমিতা কখনোই তাকে পুরোপুরি জানতে চায়নি। তার ঐ দুরন্ত মেঘের মতো, নাগালের বাইরে ভেসে বেড়ানোর স্বভাব—এটাই যে সবচেয়ে ভালো লাগতো মেয়েটার! আর আজ সেই ভালো লাগাটাই কাল হয়ে দাঁড়ালো।

ভয়ও ছিলো, হারিয়ে ফেলার। ভয়টা হয়তো বাস্তবে রূপ নেবে এবার। যদি বাদল অন্য কাউকে পেয়ে যায়? সে তো পেছনে পড়ে থাকা মেয়েগুলোকেও স্পষ্ট করে ‘না’ করতো না। এ কথার সত্যতা নিশ্চিত না হতে পারলেও মৌমিতা নিজের চিন্তার ধারাটাকে এদিকেই বইতে দিলো। হতেই তো পারে এমন। বাদল তো বিকল্প রাখতেই পারে। তার মতো আধিপত্যবাদী একটা ছেলে বয়সে বড় কোনো মেয়েকে নিয়ে সর্বাবস্থায় সংসার সাজাতে প্রস্তুত থাকবে—এই ভাবনাটাই তো হাস্যকর শোনায়।
কিন্তু মৌমিতা হাসতে পারলো না। কাঁপা কাঁপা একটা শ্বাস ফেললো। চোখদুটো ভিজে আসছে। ভিজুক। কিছু যন্ত্রণা নাহয় অশ্রু হয়েই বের হয়ে যাক। এতো বোঝা বয়ে বেড়ানো সম্ভব না।

দরজায় শব্দ হলো। মেয়েটা ওড়নায় দ্রুত চোখ মুছলো। রতন এসেছে। হাতে একটা কাগজের প্যাকেট। ওষুধ কিনেছে। সেগুলো টেবিলে রেখে ছেলেটা মৌমিতার দিকে তাকায়, “তোমার বিয়ের কথা হচ্ছে, শুনলাম।”

মৌমিতা খটখটে স্বরে বলে, “ঠিকই শুনেছেন।”

“কবে হচ্ছে বিয়ে?”

“জানি না।”

“তারিখ ঠিক হয়নি?”

“পাত্রও ঠিক হয়নি।”

রতন চোখের ইশারায় মৌমিতার ডান হাতের অলংকারটিকে ইঙ্গিত করে, “দেখতেই পাচ্ছি! আমাকে মিথ্যা বলছো কেন?”

মেয়েটা মুখ শক্ত করে বসে রইলো। ছেলেটা খুব সাবধানে কয়েক পা এগোয়, “বিয়েতে কি মত নেই তোমার?”

“বিয়ের কথা এখনও আসেনি। সম্বন্ধ পাকা হয়নি, বললাম তো।”

“সত্যি?”

মৌমিতা মুখ তুলে রতনের দিকে তাকালো, তার ঠোঁটের এক কোণ সামান্য বেঁকে গেলো তাচ্ছিল্যে, “আপনার এতো আগ্রহ কেন? বিয়ে কি আপনার হচ্ছে? নিজের চরকায় তেল দিতে পারেন না?”

হঠাৎ এমন স্বর পরিবর্তনে রতন বিচলিত হলো, কিন্তু অবাক হলো না। এগিয়ে এসে মেয়েটার পাশে বসলো, “চরকার দিন তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তাই তেল দিতে পারলাম না।”

মৌমিতা তাকে একেবারে উপেক্ষা করে। কেবিনটা আবার ডুবে যায় নিস্তব্ধতায়। মারুফ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন। মেয়েটা সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে। রতন ছোট একটা শ্বাস ফেলে। সে মেয়েটার হাতের উপরে হাত রাখতে গেলেই মৌমিতা তড়িৎগতিতে উঠে দাঁড়ায়, “আমার মেজাজ কিন্তু এমনিতেই খারাপ রতন ভাই!”

“ওমা!” রতন হাসলো, “আমাকে এখনও ভয় পাও নাকি তুমি?”

“ভয়? আপনাকে?” মৌমিতা আড়চোখে একবার আব্বার ঘুমন্ত মুখটার দিকে দেখলো, তারপর কণ্ঠস্বরে বিষ উগরে দিলো, “আপনাকে দেখলে আমার গা ঘিনঘিন করে।”

“কেন? আমি কি তেলাপোকা?”

মৌমিতা জবাব দেয় না। সে হনহন করে হেঁটে আব্বার শিয়রে গিয়ে দাঁড়ায়, চৌকির ধাতব রেলিংটা শক্ত করে ধরে। রতন তার গতিবিধি দেখার পর নিজেও ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়ায়, মামার দিকে তাকায় একবার।

“মৌ। আমি এমন কিছু করিনি, যেটার কারণে আমাকে ভয় পেতে হবে।”

“ভয় পাই না।”

“ঘৃণা করো?”

“আপনার যেটা মনে হয়, সেটাই।”

“তুমি এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাচ্ছো কেন? তোমার না মাস্টার্স করার কথা, চাকরির পর বিয়ে নিয়ে ভাবার কথা?”

“না। আমি এখনই বিয়ে করবো! আপনার সমস্যা?”

রতন হাসলো, “নাহ! কোনো সমস্যা নেই। তবে তোমার পছন্দের তারিফ করতে হয়। পাত্রের পরিবার বড়লোক আছে—”

“চুপ করেন! আমি আর একটা কথাও শুনতে চাই না। বের হয়ে যান।”

ছেলেটা বের হয়ে গেলো। দরজাটা বন্ধ করলো না, ইচ্ছে করেই খুলে রেখে গেলো। মৌমিতা চোখ-মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করলো, “শয়তান কোথাকার!”

—————

সন্ধ্যার দিকে রাবেয়া ফিরেছেন। এতোটুকু সময় পর মারুফকে দেখেই তিনি হতাশ হয়ে পড়লেন। কেবিনের এক কোণে বসে মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “কোনো উন্নতি দেখি না আমি। খালি অবনতি হচ্ছে।”

কথাটা পুরোপুরি মিথ্যে না। মারুফ খুব বেশি শুকিয়ে গেছেন। চোখের পাতা ফুলে উঠেছে। অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছেন, হয়তো এ কারণেই একটু অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে তাকে। চোখদুটো পুরোপুরি খুলতেও পারছেন না, ঐ আধখোলা চোখেই সবার দিকে তাকাচ্ছেন।
মৌমিতা সামনে এসে দাঁড়ালো। নিজেকে প্রফুল্ল দেখানোর চেষ্টা করলো জোর করে, “আব্বা? কেমন আছেন আপনি? ঘুম হয়েছে?”

মারুফ মাথা নাড়লেন, “হুম।”

“আপনার শরীর এখন কেমন?”

তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করলেন। তবে দুঃখের বিষয়, তিনি যা বললেন, সেটার বিন্দুমাত্র বোঝা গেলো না। তবু সবাইকে মনোযোগ দিয়ে শুনতে দেখে তিনি দ্বিগুণ উৎসাহে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলতে লাগলেন। মাঝখানে হেসেও উঠলেন। বাকিরা যখন তার সাথে তাল মিলিয়ে জোর করে হাসলো, মারুফের হাসি মিলিয়ে গেলো। তিনি যেন একদম স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারলেন, কথাগুলো কেউই বোঝেনি। আবার মাথা নেড়ে বিষয়টা মেনে নিলেন। মৌমিতা বলে উঠলো, “সব ঠিক হয়ে যাবে, আব্বা।”

ভদ্রলোক ভ্রু কুঁচকালেন। এতোক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ আলাপটা যেন মাটি হয়ে গেলো এই সান্ত্বনার বাণী শোনার পর।
মৌমিতা সোজা হয়ে দাঁড়ালো, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেবিকাকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর স্বরে বললো, “ডাক্তার কখন আসবেন?”

“এই তো... উনি বোধহয় সামনের কেবিনেই আছেন। চলে আসবেন।”

“রাত হয়ে যাচ্ছে। আব্বাকে তো খাওয়াতে হবে এখন। ওষুধ দিতে হবে। আসতে দেরি করলে তো ওষুধ দিতে—”

“সেটা স্যারও জানেন। চলে আসবেন।”

মৌমিতা মুখ ফেরালো। এই অল্পবয়সী সেবিকার নাম নাসরিন। সে কোনো কারণে ডা. মাহফুজের বিরুদ্ধে সূক্ষ্মতম অভিযোগও সহ্য করতে পারে না। এতো দরদ কিসের! ইদানিং আবার মারুফের কেবিনেই বেশি ঘুরঘুর করছে মেয়েটা। বাকি সময়টুকুর অর্ধেক কাটায় অন্যান্য কেবিনে, অর্ধেক কাটে মাহফুজের আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতে।
এসব নিয়ে মৌমিতা মাথা ঘামাতে চায় না। তবু সে নিজের অজান্তেই এতো কিছু পর্যবেক্ষণ করে ফেলেছে। অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে গবেষণা করার অভ্যেস তার নেই। নিজেকে হঠাৎ এই অবস্থানে দেখে অস্বস্তি হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি দিচ্ছে যে বিষয়টা, সেটা একাধারে লজ্জাজনকও বটে।

সে চাচ্ছে, মাহফুজের সাথে তার বারবার দেখা হতে থাকুক! এমন চাওয়ার পেছনে কোনো শক্তপোক্ত যুক্তি নেই। ছেলেটার পারফিউমের গন্ধটা আহামরি ভালো না! তবু কাছে এসে দাঁড়ালে, ঐ সুগন্ধ কোনোভাবে নাকে লাগলেই মাথাটা কেমন যেন ঘুরে ওঠে! তার কণ্ঠ আব্বার মতো শোনায়; খুব বেশিও না, সামান্য। এই তুচ্ছ কারণে তো আর কাউকে বারবার দেখার ইচ্ছে হতে পারে না।

মৌমিতা নিজের প্রতি বিরক্ত হলো। আলতোভাবে মাথা চাপড়ে পেছনে সরে গেলো। সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে রতন। তার নীরব উপস্থিতিটাও যেন ঘি ঢাললো মেয়েটার আক্রোশের আগুনে। মৌমিতা দাঁতে দাঁত চেপে ধরে তাকালো তার দিকে। এই আপদটা বিদায় হচ্ছে না কেন!
দরজা খোলার শব্দ হলো তখনই।

“আসসালামু আলাইকুম।” সুজয় সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকলো, পেছনে একজন পুরুষ কর্মচারী। মারুফ তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুচকি হেসে তার কাছে এসে দাঁড়ায় সুজয়, মারুফের কব্জিতে তর্জনী চেপে ধরে। চামড়া এখনই ঢিলে হয়ে এসেছে। হাতটা অস্বাভাবিক সরু দেখাচ্ছে। লোকটার এতে বিশেষ আগ্রহ নেই, তার সমস্ত মনোযোগ যেন সুজয়ের দিকেই।

“আজকে হাঁটাহাঁটি করেননি?”

প্রশ্ন শুনে মারুফ হা করে চেয়ে রইলেন। রাবেয়া তার হয়ে বললেন, “ওনার শরীরটা আজকে খারাপ। ঘুম থেকে উঠেছে কিছুক্ষণ আগে। কাপড়টাও বদলাতে পারিনি।”

“কাপড় বদলাতে হবে।” সুজয় পেছনে ঘুরে বললো, “আপনারা একটু বাইরে যান।”

নাসরিন মাথা নাড়ে, মৌমিতাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “ম্যাম, একটু বাইরে যেতে হবে।”

মৌমিতা কটমট করে তার দিকে তাকায়, মনে মনে বলে, “শুনেছি! কান আমারও আছে।”

—————

রাত হয়ে গেছে। ওষুধটা হয়তো আজ সঠিক সময়ে খাওয়ানো সম্ভব হবে না।
কেবিনের সামনে পায়চারি করতে থাকে মেয়েটা। আর ভালো লাগছে না। বাড়ি ফিরতে কি আরও দেরি হবে? কতো দেরি? মনটা ভীষণ ছটফট করছে। সে বন্ধ দরজাটার দিকে তাকায়। তাকে ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হচ্ছে না তো? পোশাক পাল্টাতে এতো সময় লাগার কথা নয়। রতন বেরিয়ে এলো সেই মুহূর্তে, দু'জনের চোখাচোখি হলো।

“এতোক্ষণ ধরে হাঁটাহাঁটি করছো? বসতে পারতা।”

“কাজ শেষ?”

“না। মামার পিঠের একটা জায়গার চামড়া একটু লাল হয়ে আছে। ইনফেকশন হতে পারে। এখন ওটাই দেখছে... তোমার ডাক্তার সাহেব।”

ইঙ্গিতটা মৌমিতা বুঝলো না, চোখ বড় করে বলে বললো, “ইনফেকশন!”

“হ্যাঁ।” রতন একেবারে কাছে এসে দাঁড়ালো, “কিন্তু চিন্তা নেই। এখন তো ডাক্তার আছেই... থাকবেই।”

সুজয়ও বেরিয়ে এলো। সামনের মানুষ দুটোকে অমন কাছাকাছি দেখে একটু বিব্রত হলো হয়তো।
মৌমিতা অস্থিরভাবে বলে উঠলো, “আব্বার গায়ে ইনফেকশন হয়েছে?”

“না না। এখনও ওরকম কিছু হয়নি।”

মেয়েটার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো রতন, “বললাম তো, চিন্তা নেই।”

সুজয় গলা খাঁকারি দিয়ে মৌমিতাকে বললো, “এখন ভেতরে যেতে পারেন।”

মেয়েটা দেরি করলো না। সুজয়কে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ছুটলো। সে চলে যাওয়ার পর রতন একটু সরে দাঁড়ালো। মৌমিতা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, দেখেশুনে সেখানেই পা রাখলো। অন্যমনস্ক হয়ে প্রশ্ন করলো, “মামার কি আরও মেডিসিন লাগবে?”

“বলে দেয়া হয়েছে অলরেডি।” সুজয় ফাইলের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে খুব পেশাদার ভঙ্গিতে বললো, “আমার হবু স্ত্রীর থেকে দূরে থাকবেন আপনি।”

রতন চমকে ওঠে। সুজয়ের শুধু কণ্ঠটা নয়, কথা বলার ধরনটাও যেন এবার মারুফ খন্দকারের মতো শোনালো। বছর খানেক আগে তিনিও প্রায় একই কথা বলেছিলেন ভাগ্নের উদ্দেশ্যে।
রতন ইতস্তত করলো। মুখ তুলে তাকানোর মতো সাহসটুকু পেলো না। তারপর একটা শব্দও উচ্চারণ না করে, সে করিডোর ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে শুরু করলো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp