দুপুরের পর থেকে মৌমিতার সময় কেটেছে ভয়ানক উৎকণ্ঠায়। পাত্রের নাকি আসার কথা। এখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, কেউ আসেনি। মেয়েটা তবু নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। এসবের সাথে আরও একটা দুশ্চিন্তা যুক্ত হয়েছে। মারুফ সাহেবের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, মাথাব্যথা বেড়েছে।
মৌমিতা আদা দিয়ে চা বানিয়েছে। সেটা হাতে নিয়েই দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো সে, “আব্বা, আসবো?”
মারুফ টেবিলে বসে মনোযোগ দিয়ে লিখছিলেন কিছু একটা। মেয়ের ডাক শুনে যেন চমকে উঠলেন, তড়িঘড়ি করে খাতাটা বন্ধ করলেন, “আসো।”
আব্বার অপ্রস্তুত ভাবটা দেখেও না দেখার ভান করলো মৌমিতা। চায়ের পেয়ালা সাবধানে টেবিলে রাখলো, শীতল গলায় বললো, “শরীরটা এখন কেমন?”
“ভালোই।”
মারুফ চশমা খুলে চোখ কচলাতে লাগলেন। পেয়ালার দিকে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। মৌমিতা ছোট একটা শ্বাস ফেলে, “আপনাকে একটা কথা বলতাম।”
মারুফ বেশ আগ্রহ নিয়ে ঘুরে বসলেন, “হ্যাঁ বলো। তোমার কোনো পছন্দ আছে?”
প্রশ্ন শুনে মৌমিতা একেবারে ভড়কে গেলো। সে এই প্রসঙ্গে কথা বলতে এসেছিলো বটে, তবে আব্বার সরাসরি জিজ্ঞাসা তাকে বিচলিত করলো। সে মাথা নেড়ে বলে ফেললো, “না! না মানে... আমি—”
“আজকে তো ছেলেটার আসার কথা ছিলো। এলো না কেন জানি।”
মারুফ চায়ে চুমুক দিলেন। মৌমিতা মাথা নিচু করেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। বসার ঘর থেকে ফোন বেজে ওঠার আওয়াজ আসছে। মেয়েটা বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখে, রাবেয়া ইতোমধ্যেই রিসিভার তুলে নিয়েছেন, “জ্বী, কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে হয়তো কোনো উত্তর আসেনি। তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে রাবেয়া ফোন কেটে দিলেন। তিনি চলে যাওয়া মাত্র মৌমিতা প্রায় ছুটে এসে দাঁড়ালো সেখানে। একদৃষ্টে চেয়ে রইলো টেলিফোনটার দিকে।
যে আগন্তুক ব্যক্তি ফোন করেছিলো, সে যদি বাদল হয়ে থাকে; তাহলে ফোনটা আরেকবার বেজে উঠবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোন বেজে উঠলো। মৌমিতা চট করে রিসিভার তুলে কানে ধরলো, “হ্যালো।”
“আমি। বাদল।”
“হ্যাঁ... বলো।”
“নাটোরে পৌঁছালাম কিছুক্ষণ আগে। আপনি বাড়িতে?”
“এতো তাড়াতাড়ি চলে এসেছো? তোমার না পরীক্ষা ছিলো?”
“হুম। পরীক্ষা আগেই শেষ। তাই, চলে এসেছি।”
“সত্যিই?”
“হ্যাঁ!”
মৌমিতা বাম কান থেকে সরিয়ে ডান কানে ধরে রিসিভার, “দেখা করবো?”
“আজকে না। এখন তো সন্ধ্যাই হয়ে গেছে।”
“হ্যাঁ। তুমি পারলে একবার বাসায় এসো... আচ্ছা, কালকে দেখা করি?”
“কালকে কখন?”
“ভোরে। যদি উঠতে পারো তুমি!”
বাদল কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর উত্তর দেয়, “ঠিক আছে। কোথায় আসবেন?”
“স্টেশনের পাশের ঐ... চায়ের দোকানে।”
“আচ্ছা। এখন রাখলাম।”
ফোন কেটে গেলো। রিসিভার নামিয়ে মেয়েটা নিজের ঘরে ফিরলো। হঠাৎ অধৈর্য হয়ে উঠলো সে।
বাদল কি খুব বেশি বদলে গেছে? ঐ রেলস্টেশন, কলেজ ক্যাম্পাস, পেছনের গলিটা, শহরের এককোণের ঐ কৃষ্ণচূড়া গাছ, স্টেশনের পাশের চায়ের দোকানটার কথা ভাবলে মৌমিতা যেমন অনুভব করে, ছেলেটাও কি সেভাবে অনুভব করে? নাকি এসব তার কাছে কিছুই না? বাদলের উপহার দেয়া প্রতিটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্মৃতি, তার সাথে সময় কাটানো স্থানগুলো মৌমিতার কাছে যতোটা বিশেষ, ছেলেটার কাছেও কি তেমন?
ছয় বছর আগে বাদল নিজ হাতে মৌমিতার কবিতাটা লিখে একটা বইয়ের সাথে তাকে উপহার দিয়েছিলো। কাগজের ঐ টুকরোটা মৌমিতা আজও সযত্নে তুলে রেখেছে একটা ধূসর ডায়েরির ভাঁজে। বাদলও কি মেয়েটার দেয়া চিঠিগুলো এভাবেই যত্ন করে রেখে দেয়? নাকি ফেলে দেয়? ডায়েরিটা কি এখনও তার কাছে আগের মতোই মূল্যবান? ফেরত তো দেয়নি। হারিয়েই ফেলেছে কিনা!
মৌমিতা জানালার কপাট লাগিয়ে এসে বিছানায় বসলো। চাকরির প্রস্তুতির জন্য রাখা বইটা নিয়ে শুয়ে পড়লো ঠিকই, তবে পড়াশোনায় মন দেওয়া এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। সুতরাং বইটাকে মুখের উপর ধরেই সে চোখ বন্ধ করলো।
মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা পর সে আবার দেখবে মানুষটাকে, চোখের সামনে। ছেলেটার একটা ছবি নিয়ে রাখতে হবে এবার। এতোদিন এভাবে না দেখে থাকা যায় নাকি! চোখ বুজলে তার মুখখানি স্পষ্টভাবে স্মরণও করা যায় না। দুইটা বছর তো আর কম সময় নয়। কাল নাহয় দেখা হবে। তারপর আবার করে দেখা হবে, কে জানে?
—————
নভেম্বর মাসের বৃষ্টি। অল্প অল্প শীত পড়েছে। চারপাশ অনেকটাই কুয়াশার মতো ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। রাস্তায় তেমন লোকজন নেই।
মৌমিতা একটা চায়ের স্টলের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে আছে। স্টলটা এখনও খোলা হয়নি, এতো সকালে এদিকে কোনো দোকানই খোলা হয় না। এ কারণেই মৌমিতার কাছে এটা অপেক্ষা করার উপযুক্ত জায়গা।
ছেলেটা বেশিক্ষণ অপেক্ষা করায়নি অবশ্য। কুয়াশার বৃষ্টিতে আবছা আবছা তাকে দেখে মৌমিতা, দৌড়ে দোকানের দিকে আসছে। সে যতো কাছে আসে, মৌমিতা ততো নিশ্চিত হয়, ওটাই বাদল। সে লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে নিজের অস্থিরতা আড়াল করে।
বাদল দোকানটার কাছাকাছি এসে দৌড়ের গতি কমালো, মুখ তুলে তাকালোও না কোনো কারণে। ছাউনির নিচে এসে দাঁড়ালো সে, বৃষ্টিতে মাথার চুল, পরনের কাপড় ভিজে গেছে খানিকটা। মৌমিতা একটু পিছিয়ে যায়। উভয়েই একটা অস্বস্তিকর সংকোচের মাঝে দুলতে থাকে। পাশাপাশি দাঁড়ালেও পরস্পরের দিকে তাকানোর মতো অবস্থা যেন নেই কারও। তবে সংশয় কাটিয়ে ছেলেটা নিজেই কথা শুরু করলো, “কখন এসেছেন?”
মেয়েটা তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো, প্রশ্নটা একপ্রকার উপেক্ষা করলো। ভেতরের দ্বিধাটুকুর তোয়াক্কাও করলো না। সে গায়ের চাদরটার নিচ থেকে হাত বের করলো, বাদলের চুল ঝেড়ে দিয়ে বললো, “জ্বর ধরাতে চাও?”
মৌমিতার এলোমেলো করে দেওয়া চুলগুলো বাদল নিজেই ঠিক করতে করতে বলে, “ঠাণ্ডা পড়েছে, ভালো হয়েছে। এতোদিন যে গরম ছিলো! ওদিকে বোধহয় আরও বেশি গরম...”
ছেলেটা নিজের শার্ট থেকেও পানি ঝাড়তে থাকে। নানান বিষয় নিয়ে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে যায় সে। মৌমিতা তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে। কথা বলার সময় এখনও তার গালে টোল পড়ে। চাপদাড়ি ভেদ করে তা দৃশ্যমান হলো মেয়েটার চোখে।
এখন এতো কাছাকাছি, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। সবসময় কেন আটকে রাখা যায় না এই মানুষটাকে?
“বলেন তো, এতোক্ষণ কী বললাম আমি?”
বাদলের প্রশ্নে মৌমিতা চমকে ওঠে, আমতা আমতা করে বলে, “এতোক্ষণ? ঐ... ঐ তো..."
বাদল ভ্রু কুঁচকে বললো, “কিছুই শোনেন নাই?”
মৌমিতা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসলো, “তুমি কি বড় হবা না বাদল?”
“নাহ!”
মেয়েটা এবার সত্যি সত্যিই হেসে ফেলে। বাদল শুকনো মুখে বলে, “আমি কী করলে আপনার মনে হবে যে আমি বড় হয়েছি?”
“বড়দের মতো কথা বলো।”
“আমি যেটাই বলি, আপনি সেটাতেই হাসেন। আমি বড়দের মতো কথা বললেও এভাবে হাসবেন?”
একটু গম্ভীর হয়ে যায় মৌমিতা, “হাসাতে হবে না। তুমি বড় হও তাড়াতাড়ি। একটা চাকরি শুরু করো। নাহলে কিন্তু আমার জন্য পাত্র তৈরি আছে!”
“আচ্ছা? তাই বুঝি এতো খুশি আপনি!” মৌমিতা রেগে যাওয়ার আগেই সে প্রসঙ্গ বদলে ফেললো, “আমার কাছে এমনিতে... সিভি আর ছবি থাকেই সবসময়। চেষ্টা তো করছিই। এইদিকে ইন্টারভিউ দেবো এক জায়গায়...” বাদল আঙুল দিয়ে নিজের নাকের বামপাশটা দেখিয়ে বলে, “আপনার নাকফুল? পাল্টে ফেলেছেন?”
মৌমিতা হকচকিয়ে গেলো। সে ঠিকঠাক মনে করতে পারলো না, নাকফুল শেষ কবে বদলানো হয়েছে। কাজেই কোন নাকফুল নিয়ে কথা হচ্ছে, সেটাও বোঝা গেলো না। তবু সে মাথা নাড়লো, “হুম।”
ছেলেটা হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো। কিন্তু বলতে পারলো না। হঠাৎ করেই টের পেলো, কতোটা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। বাতাসে তার চাদরের পাড় উড়ছে, সেটা বাদলের বাহুতে এসে লেপ্টে যাচ্ছে বারবার।
মৌমিতাও কোনো কথা বলে না, অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সড়কের পাশে, ছাউনির নিচে থাকা কচুপাতায় বৃষ্টির স্বচ্ছ পানি জমেছে, সেখান থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছে কর্দমাক্ত রাস্তায়।
বাদল তার দৃষ্টি অনুসরণ করে কিছুক্ষণ ঐ কচুপাতার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর শান্ত স্বরে বলে ওঠে, “আপনাকে একটু অপেক্ষা করতেই হবে। আমার চাকরির তো অনেক দেরি।”
মৌমিতা বাদলের দিকে তাকায় না, ছোট একটা শ্বাস ফেলে, “অপেক্ষা করা আমার কাজ না। তুমিই করতে থাকো অপেক্ষা! আমার জন্য পাত্র খোঁজা শুরু হয়ে গেছে। পাত্রের মা আমাকে বালা পরিয়ে দিয়ে গেছে। তুমি কি আদৌ বুঝতে পারছো, কী হতে পারে?”
বাদল ব্যঙ্গ করে বলে ওঠে, “কী হতে পারে! আপনি আবার বনলতা সেন থেকে বেলা বোস হয়ে যাইয়েন না!”
“নাটোরে থাকলেই কি মানুষ বনলতা সেন হতে পারে? আর বেলা বোস হওয়ারও দরকার পড়বে না। তুমি আব্বার সাথে দেখা করো।”
বাদল চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ সে আঙুল দিয়ে ইশারা করে বলে, “এখানে একটা হোটেলে অনেক ভালো তেহারি পাওয়া যায়। ঐসব চিন্তা এখন ছাড়েন। আর বলেন, তেহারি খাবেন, না অন্যকিছু?”
মৌমিতা রেগে গেলো, হাত তুলে বলে উঠলো, “ঠাস করে একটা চড় দিবো! পাগল কোথাকার! আমি মরে যাচ্ছি বিয়ের চিন্তায়, আর ওনার মাথায় খাওয়া-দাওয়ার চিন্তা। আব্বার সাথে দেখা করবা কিনা বলো?”
“এতো তাড়াহুড়ার কী আছে? যাবো নাহয় একদিন।”
মৌমিতা হতাশ হয়ে পড়ে, “যা ইচ্ছা করো!”
বাদল থতমত খেয়ে দ্রুত পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলো, মৌমিতার দিকে তা এগিয়ে দিয়ে বললো, “আমার টেলিফোন নাম্বার। আরকি, আমি যে মেসে উঠেছি, সেখানকার—”
কাগজটা হাতে নিয়ে মৌমিতা প্রশ্ন করে, “তোমার মেসটা কোথায়?”
“দেখেন ওখানে, ঠিকানাও লেখা আছে।”
“হাতের লেখাটা... তোমার?”
“না। আমার লেখা হলে আপনি পড়তেই পারতেন না! একজন লিখে দিয়েছে।”
মেয়েটা যেন আহত হলো একটু। বিড়বিড় করে বললো, “তুমি বোধহয় শপথ নিয়েছো, নিজে থেকে কিছুই লিখে দিবা না আমাকে।”
বাদল পকেটে হাত ঢুকালো, আগের চেয়েও শান্ত তবে শীতল স্বরে বললো, “কী লিখবো? সেই তো ছিঁড়েই ফেলবেন!”
মৌমিতা চুপ করে থাকে, প্রতিবাদ করে না। এতো পুরোনো অভিমান ছেলেটা এখনও জমিয়ে রেখেছে! এসব পুরোনো কথা তুলে আনার মানে কী? এটার উত্তর দেওয়ার মতো ভাষাই বা কোথায়?
সে কাগজের টুকরোটা মেলে ধরে দেখতে থাকে। তার হাতে ঝলমল করতে থাকা সোনার বালার দিকে চোখ পড়ে ছেলেটার। মৌমিতার মুখের দিকে এক ঝলক দেখে আবার বালার দিকে তাকিয়ে বাদল বলে, “এই বালাটাই কি... আপনাকে...”
“হ্যাঁ।”
“খুলে রাখেননি কেন?”
মৌমিতা চিরকুট থেকে চোখ সরায় না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, “খুলে রাখলে অসম্মান করা হয়। যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে সম্বন্ধ ভেঙে যাবে, সেদিন এটা খুলে ওনাকে ফেরত দেবো।”
“অসম্মানের কী আছে? যাই হোক, আপনার ইচ্ছা।”
কিছুক্ষণ কেউ আর কোনো কথা বললো না। মৌমিতা কাগজটা ব্যাগে রাখে, তারপর নাক-মুখ কুঁচকে বলে ওঠে, “তুমি কি সিগারেট খাও নাকি?”
বাদল অপ্রস্তুত হয়ে বলে, “সিগারেট? আমি?”
“হুম, আমি গন্ধ পাচ্ছি।”
“না না—” বাদল আড়চোখে আবার স্বর্ণের বালাটার দিকে তাকায়। ভেতরে ভেতরে সে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও, বাহির থেকে কেবল তার অসহায় মুখখানা ব্যতীত কিছু দেখা গেলো না।
মৌমিতা বড় একটা শ্বাস ফেলে বলে, “আমাকে সব কথা বলা যায় না, তাই না?”
“কোন কথা? আমি এরকম কিছু বলেছি?”
মেয়েটা টের পেলো, আবার ঝামেলা করতে যাচ্ছে বাদল। এই সুন্দর মুহূর্তটা নষ্ট করা ঠিক হবে না। মৌমিতা তার দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমার একটা ছবি দিও তো।”
“কেন?”
“আমার ছোট বোন তোমাকে দেখতে চেয়েছে।”
“মার্জিয়া? আচ্ছা দেবো নাহয়। আপনার কোনো ছবিও তো নাই আমার কাছে।”
“আমার ডায়েরিটা কি... এখনও আছে?”
“থাকবে না কেন? বরং আপনার থেকে আমার কাছেই বেশি ভালো আছে ওটা।”
“আচ্ছা?” মেয়েটা মিষ্টি হেসে অন্যদিকে তাকায়।
—————
আজ মৌমিতার মনটা কিছুতেই ঘরে টিকছে না। বাইরে বেরোনোর জন্য উড়ু উড়ু করছে। সকালে বাদলের সাথে এতোক্ষণ কাটানোর পরেও সেটাকে যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। হাতটা নিশপিশ করছে তার দেওয়া নাম্বারটাতে কল করার জন্য। কাগজে লেখা ঠিকানা অনুযায়ী মেসে গিয়ে ছেলেটাকে চমকে দিলে কেমন হয়? যদি দেখা যায়, বাদল ওখানে নেই, বাইরে গেছে?
ছেলেটাকে কবে নাগালের ভেতরে পাওয়া যাবে? ইচ্ছেমতো অধিকার খাটানো যাবে? বাদল কি তখনও ছটফট করবে বাইরে যাওয়ার জন্য? নাকি তার মনটা একটু হলেও স্থির হবে তখন?
“মৌ?”
আম্মার ডাক শুনে মৌমিতার ভাবনায় ছেদ পড়ে। সে ওড়নাটা কোনোমতে গায়ে পেঁচিয়ে রান্নাঘরে ছুটে যায়।
রাবেয়া বললেন, “মা, কয়েকটা জিনিস শেষ হয়ে গেছে। একটু কিনে আনতে পারবা?”
মেয়েটা ফুরফুরে মেজাজে মাথা দোলায়, “হ্যাঁ। অবশ্যই!”
বিকেল হয়ে গেছে। সূর্যটা ঢলে পড়েছে আকাশের একদিকে।
বাজারের ব্যাগ হাতে মৌমিতা একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ ভিড় এখানে। একটু একটু করে বিরক্তি আসতে শুরু করেছে মাত্র। তখনই পাশের মেয়েটা ঠেলা দিয়ে বললো, “ভাই, আলুর কেজি কতো করে?”
কণ্ঠটা পরিচিত মনে হলো, বিধায় মৌমিতা ভালোভাবে তাকালো। মেয়েটাও তাকালো, আর তৎক্ষণাৎ মৌমিতার পিঠ চাপড়ে বললো, “মৌ! কতোদিন পর দেখলাম।”
বিস্ময় কাটিয়ে উঠে মৌমিতা মাথা দোলায়, “হ্যাঁ। অনেকদিন পর—”
সুরাইয়া তার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়, “অনেক সুন্দরী হয়ে গেছিস তুই। দুলাভাই আসেনি সাথে?”
“দুলাভাই কোত্থেকে আসবে? বিয়ে হোক আগে!”
“ও আচ্ছা আচ্ছা!”
“তোর কী খবর? তুই বিয়ে করেছিস?”
সুরাইয়া মাথা নাড়ে, “হুম... আছে এদিকেই, দেখা করাচ্ছি। আচ্ছা, তামান্নার কী অবস্থা?”
“জানি না।” মৌমিতার মুখটা বিষণ্ণ দেখায়, “এইচএসসির পর সেই যে ঢাকায় গেলো, আর কোনো খোঁজ পাইনি ওর। চিঠি দেওয়ার কথা ছিলো। কিচ্ছু দেয়নি। ঠিকানাও জানি না, নাম্বারও নেই।”
সুরাইয়া একটু ভাবুক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। যদিও তার গম্ভীর ভাব বেশিক্ষণ টিকলো না। সে মৌমিতার হাত ধরে বললো, “ওদিক থেকে ঘুরে আসি, চল। একজনের সাথে দেখা করিয়ে দেই।”
ভিড় ঠেলে তারা বাইরে আসে।
মোটরসাইকেলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি তাদের দেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মৌমিতা চোখ বড় বড় করে, আঙুল উঁচিয়ে একটু অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলে, “আমজাদ না?”
সুরাইয়া তার বাহুতে হালকা খোঁচা দেয়, “না রে, দুলাভাই বল!”
ওরা দু'জনই হেসে ওঠে। তবে পরিস্থিতি অনুধাবন করতে মৌমিতার একটু সময় লাগে এবার। আমজাদকে চিনতে পারাটা মোটেও সহজ ছিলো না। আগের থেকে অনেক বড় দেখাচ্ছে তাকে, মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কেমন একটা দায়িত্বশীল ভাব এসেছে চেহারায়। সে মৌমিতার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে, “মৌমিতা খন্দকার নাকি?”
সুরাইয়া কৃত্রিম বিস্ময় দেখায়, “ভালোই মনে আছে দেখছি।”
“থাকবে না? আমার এক জুনিয়র রুমমেট ছিলো, মনে আছে? হায়রে! এমন পাগল ছিলো মৌমিতার জন্যে। ওর জন্যে এই নাম আমি এতোবার শুনেছি জীবনে!”
“ও হ্যাঁ হ্যাঁ। বাদল। মনে আছে।” সুরাইয়া মৌমিতার দিকে ঘুরলো, “ঐ পিচ্চির কী হলো পরে?”
মৌমিতা প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে একটু, তারপর ছোট একটা শ্বাস নেয়, “খুলনা ভার্সিটিতে পড়ছে।”
বাকি দু'জন হয়তো হতভম্ব হলো খানিকটা। সুরাইয়া অবাক হয়েই হেসে জিজ্ঞেস করলো, “ওর সাথে তোর যোগাযোগ আছে এখনও?”
“হ্যাঁ।”
“দারুণ ব্যাপার তো! এখনও ওরকম পাগলামি করে নাকি?”
মৌমিতা উত্তর দিলো না, প্রসঙ্গটা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। হঠাৎ করেই বেশ জড়তা যেন ঘিরে ধরলো তাকে।
“পড়া ছাড়া এমনিতে কী করে? পার্ট টাইম জব, বা অন্যকিছু?”
“টিউশনি করে ওখানেই, খুলনায়।”
“আচ্ছা... মেয়েদেরকেও পড়ায় নাকি? বাদল কিন্তু ভালোই দুষ্টু আছে রে! আর চেহারাও তো ভালো। দেখিস একটু। টিউশনি করাতে গিয়ে আবার মেয়ে পটিয়ে ফেলবে!”
মৌমিতা এবারও হাসলো, তবে হাসিতে আর তেজ রইলো না তেমন।
আমজাদ মাথা নেড়ে বললো, “ওর পেছনে মেয়েরাও পড়ে থাকতো! আমরা যখন পাশ করে বের হলাম কলেজ থেকে, বাদলরা তো তখন সেকেন্ড ইয়ারে। একটা মেয়ে ওর জন্যে কতো কাণ্ড করতো, কী বলবো! বাদল সরাসরি 'না' বলতো না, আবার 'হ্যাঁ'ও বলতো না। ভালোই বদমাইশ ছিলো।
তবে এটা ঠিক, ও মৌমিতা ছাড়া কিছু বুঝতো না।
এইচএসসির পরেও ওর সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো অনেকদিন। আর... আরেকজন, রাশেদ। ভালো ছাত্র, ভালোই করেছে, মেডিকেলে পড়ে এখন।”
না চাইতেও মৌমিতার ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হলো। সে প্রাণপণে চেষ্টা করলো, মুখের হাসিটা ধরে রাখার। যদিও ইচ্ছে করছে, আমজাদকে বাদলের ব্যাপারে আরেকটু জেরা করতে। মেয়েদেরকে ওভাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাতো অসভ্যটা!
এই আমজাদ আর বাদল একসময় একসাথেই থাকতো। অনেক ভাব ছিলো ওদের মধ্যে। নিঃসন্দেহে তারা একে অপরের ব্যাপারে অনেককিছুই জানে, যা মৌমিতা জানে না। জানার কথাও না।
সে সাহস করে এই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলো না। এতোদিন পর তথাকথিত পরিচিত মানুষগুলোর সামনে নিজেকে সহজ করতে পারলো না।
তবে... বাদলের সাথে সম্পর্কিত সবকিছুই ভীষণ পছন্দ তার। সুরাইয়া আর আমজাদকে বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে কিছু খাওয়াতে মন চাইলো। কিন্তু সেটাও মুখ ফুটে বলতে পারলো না মেয়েটা।
মৌমিতা পুরোনো বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে বললো, “বিয়ে করে ফেললি, জানালি না কিছুই।”
সুরাইয়াকে একটু গম্ভীর দেখায়, “ওভাবে তো হয়নি... তাই। বিয়ে খুব তাড়াহুড়ো করে হয়েছে। এই যে আমজাদ, বেয়াদবটার কোনো ধৈর্যই নেই!”
“আমজাদ কী করছে এখন?”
ছেলেটা নিজেই বলতে লাগলো, “একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করছি। ভালোই চলছে।”
সুরাইয়া খোঁটা দেয়, “ওর মতো ফাঁকিবাজ যে চাকরি পেয়েছে, সেটাই অনেক!”
মৌমিতা জোর করে হাসলো একটু, “এখন আসি তাহলে। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।”
“হুম, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। তোর বাড়িতে ভালো আছে সবাই?”
“হ্যাঁ, আছে আলহামদুলিল্লাহ। আবার কথা হবে। ভালো থাকিস—”
“দোয়া করিস। আর তোর বিয়েতে কিন্তু দাওয়াত দিবি। আমি না থাকলে বাদল তো কখনো জানতেই পারতো না, তুই মৌমিতা খন্দকার!”
মেয়েটা চলে যেতে যেতেই পেছনে ঘুরলো, হাসিমুখে বললো, “আচ্ছা আচ্ছা। ইনশাআল্লাহ।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………