মমতাজ হাসপাতালে এসেছেন বিকেলের খানিক পরে। খাবার রান্না করে এনেছেন। সাথে রতন।
মারুফকে হাসপাতাল থেকে নির্দিষ্ট কিছু পথ্য দেওয়া হয়েছে। এগুলো তার ভারী অপছন্দ। কিছুতেই খেতে চান না। আজ যেন তার জেদের পরিমাণ আরও বেড়ে গেলো। রাবেয়া জোর করে খাওয়াতে গেলে তিনি একেবারে রাগ দেখাতে শুরু করলেন। মার্জিয়ার খাওয়া শেষ হলে সে-ও গিয়ে চেষ্টা করলো আব্বাকে কিছু খাওয়ানোর। মারুফ আগ্রহ দেখালেন না। এদিকে মৌমিতাও খায়নি, তার নাকি রুচি নেই, খেতে ইচ্ছে করছে না। সব মিলিয়ে রাবেয়া মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। হাল ছেড়ে দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
মার্জিয়া এঁটো হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, অন্যমনস্ক হয়ে আব্বার দিকে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ। তারপর কেবিন থেকে বেরিয়ে পড়ে। হাত ধুয়ে আসার সময় আপাকে সে কাউন্টারের সামনে খুঁজে পেলো। ম্যানেজারের সাথে কথা বলছে।
“ফোন আসলেই আমাকে ডাকবেন। আমি এখানেই, এই যে...” মৌমিতা আঙুল দিয়ে দেখায়, “তিন নম্বর রুমে—”
ম্যানেজার মাথা দোলালেন, “জ্বী আচ্ছা।”
মার্জিয়া অল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে ঐ কথোপকথনের শুধু এতোটুকুই শুনলো, অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিরে। মৌমিতা পেছনে ঘুরতেই তাকে খেয়াল করলো, অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাছে এসে বললো, “কী হয়েছে মার্জু? কিছু লাগবে?”
“আপা, তুমি একটা মানুষ একসাথে কতো চাপ সামলাবা? এইসব চিন্তা ছেড়ে দাও তো।”
“কোন চিন্তা?”
“কিছু না। বাদ দাও। আর, খেয়ে নাও এখন।”
“খাবো না।”
“কেন? আশ্চর্য!”
“বিকালের নাস্তা করলাম সন্ধ্যায়। পেটে জায়গা থাকতে হবে তো।”
“তোমার পাকস্থলী আরও ছোট হয়ে যাবে না খেয়ে থাকতে থাকতে। অতোটুকুতে নাকি পেট ভরে গেছে! আসো, খাও।”
“সত্যিই খেতে পারবো না মার্জু।”
“দুই লোকমা হলেও খেতে হবে।”
“পারবো না।”
“আব্বা কিছুই খাননি। কতো জোর করলাম, মুখই খুললেন না।” মার্জিয়া অনুরোধের সুরে বললো, “তুমি আব্বার সামনে গিয়ে অল্প একটু হলেও খাও। তাহলে আব্বাও খাবেন।”
বোনের এমন আবদারে মৌমিতা ভ্রু কুঁচকালো। তবে উপায়ান্তর না দেখে রাজিও হলো।
মমতাজ খন্দকারের রান্নার হাত ভালো। খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, তবু একটা লোভনীয় ঘ্রাণ আসছে। যদিও এ ঘ্রাণে মেয়েটা খুব বেশি প্রলুব্ধ হলো না, তার রুচির উদ্রেকও ঘটলো না। সে আব্বার পায়ের কাছে গিয়ে চৌকির কিনারা ঘেঁষে বসলো।
মার্জিয়া হাতে খাবার তুলে মারুফকে বললো, “এবার মুখ খোলেন দেখি।”
মারুফ মুখ সরিয়ে নিলেন। মৌমিতা ভাত মেখে কোনোমতে খেতে আরম্ভ করলো। আজ ফুপুর রান্নাও কী ভয়ানক বিস্বাদ লাগছে! এই খাবার পুরোটা গলা দিয়ে নামবে তো? মেয়েটার মুখ কুঁচকে গেলো, তবে তার অভিব্যক্তি কেউ খেয়াল করলো না।
রাবেয়া মার্জিয়ার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি উৎসাহ নিয়ে স্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন, “ঐ দেখেন মৌ খাচ্ছে। আপনিও হা করেন তো।”
মারুফ আড়চোখে বড় মেয়েটার দিকে তাকালেন। মার্জিয়া বলে উঠলো, “আপনি না খেলে কিন্তু আপাও খাবে না।”
“হু?” চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তিনি ছোট মেয়ের দিকে মাথা ঘোরালেন। মার্জিয়া হেসে বললো, “আপনি খান, তাহলে আপাও খাবে। তাই না আপা?”
মৌমিতা অপ্রস্তুত হয়ে একটা ঢোক গিললো। তারপর উপর-নিচে মাথা নাড়লো। এই দৃশ্য দেখে ভদ্রলোক ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। পুনরায় মার্জিয়ার দিকে তাকালেন, নিরুপায় দৃষ্টিতে।
তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝেছেন, তাকে না খাইয়ে মেয়েদুটো হাল ছাড়বে না। আর তিনি না খেলে মৌমিতা হয়তো সত্যি সত্যিই না খেয়ে থাকবে।
মারুফ অসহায় হয়ে একে একে সবার মুখের দিকে দেখলেন। কীভাবে বোঝাবেন? সামান্য পানি গিলতেও যে তার প্রাণটা বেরিয়ে যায়। শরীরে ঐটুকু শক্তিও নেই। তার অক্ষমতার কারণে কি তবে মেয়েটাকেও না খেয়ে থাকতে হবে?
“মও মা?”
“হ্যাঁ আব্বা।”
“কাও।”
“আপনি খান। তারপর আমি খাবো।”
মারুফ আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে খুঁজলেন, “আবেয়া?”
রাবেয়া দ্রুত পাশে এসে দাঁড়ালেন, “হ্যাঁ, বলেন?”
আঙুলের ইশারায় বড় মেয়েটাকে দেখিয়ে মারুফ অস্থির হয়ে বললেন, “মও...”
“হ্যাঁ, মৌ কী?”
মারুফ মেয়েটার হাতে থাকা খাবারের থালা নির্দেশ করলেন। রাবেয়া তার নির্দেশনা অনুসরণ করলেন। তারপর মার্জিয়ার হাত থেকে খাবারের পাত্রটা নিলেন, তুলনামূলক কঠোর স্বরে বললেন, “মৌ খাবে না। যদি আপনি না খান। অল্প অল্প করে দিচ্ছি। নেন, মুখ খোলেন।”
মৌমিতা ছোট একটা শ্বাস ফেলে আবার ভাত মাখলো। তার রুগ্ন মুখখানির দিকে চেয়ে মারুফ মুখ খুললেন। রাবেয়া সযত্নে একটা লোকমা তুলে দিলেন তার মুখে। কেবিনের গুমোট পরিবেশটা মুহূর্তেই হালকা হয়ে এলো। মমতাজ খন্দকার খুশি হয়ে বললেন, “ভালো বুদ্ধি বের করেছো তো! বাপ-মেয়ে দুইজনই কুপোকাত! হা হা! কার বুদ্ধি এটা?”
মার্জিয়া পেছনের টেবিলে হেলান দিলো, বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা নিজেকে দেখিয়ে বিজ্ঞের মতো বললো, “কার আবার? আমার!”
—————
তখন রাত ১০টা বাজে।
ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে; রাবেয়া, মৌমিতা আর মার্জিয়াকে মমতাজ নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবেন। মারুফের দেখাশোনার জন্য রাতে হাসপাতালে থাকবে রতন আর রিপন। এ নিয়ে এখনও কেউ দ্বিমত পোষণ করেনি। কিন্তু রওনা দেওয়ার কথা উঠতেই মৌমিতা বেঁকে বসলো।
সব গোছগাছ শেষ। তবু চৌকির এক কোণে পাথরের মতো বসে রইলো মেয়েটা। উঠতে চাইলো না। রাবেয়া বিরক্ত হলেন, “ঝামেলা করো না তো মৌ। চলো, সবাই যাচ্ছি।”
মেয়েটা মনোযোগ দিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে বলে, “উঁহু, যাবো না।”
“আচ্ছা, এখানে কোথায় থাকবা তুমি? এই খাটে রতন আর তোমার মামা থাকবে।”
“স্টাফ রুমে গিয়ে থাকবো। নাসরিনের সাথে।”
“আমাকে রাগিয়ে দিও না মৌ। এখনই বের না হলে আর গাড়ি পাওয়া যাবে না।”
মৌমিতা মারুফের দিকে তাকায়। তিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মুখে এক শান্তির ছাপ, এতো যন্ত্রণার পরেও। ঐ নিষ্পাপ চেহারাই যে মেয়েটার দুঃস্বপ্নে তাড়া করে বেড়ায়। হঠাৎ করে যদি আব্বার বুকের ছন্দময় ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়? ঐ মানুষটা যদি চিরকালের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে?
এসব চিন্তা এলেই মাথায় ভারী ভারী একটা অনুভূতি কাজ করে। সব ছেড়েছুড়ে এখানেই খুঁটি গেড়ে বসে থাকতে ইচ্ছা করে, আব্বার কাছাকাছি। বাকি সবকিছু তুচ্ছ মনে হয়। তবে এর চেয়েও বেশি আতঙ্ক বোধ হয় এটা ভাবলে, এমন নিকৃষ্ট কিছুর মাহেন্দ্রক্ষণে মৌমিতা যদি পাশে থাকতে না পারে?
সারাটা জীবন দূরে দূরে থাকার পরেও আব্বার শেষ মুহূর্তে পাশে থাকার মতো মহৎ সুযোগটা কি সৃষ্টিকর্তা দিবেন তাকে? আব্বার আগেই যদি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে কোথাও পালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো, সেটাই হয়তো বেশি সহজ হতো!
“মৌ! উঠবা না তুমি?”
চমকে উঠে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে মেয়েটা। হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়াতেই তার চারপাশ দুলে উঠলো। আপত্তি জানানোর শক্তি নেই আর। সে আম্মার সাথে সুরসুর করে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো।
রতন সিএনজি ডেকেছে। মেয়েদুটোকে দেখতেই সে বলে ওঠে, “আমিও যাই, পৌঁছে দিয়ে আসি।”
মৌমিতা সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলে, “লাগবে না।”
“এতো রাতে—”
“আমি রাজশাহীতেই ছিলাম প্রায় চার বছর। বাড়িতে ফেরার বেশিদিন হয়নি। এতোটুকু আমি নিজেও ম্যানেজ করতে পারবো।”
“অন্তত একজন পুরুষ মানুষ তো থাকা উচিত।”
মৌমিতা চোয়াল শক্ত করে সিএনজি চালকের দিকে দেখলো। লোকটা পান চিবোচ্ছে, আর অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রয়েছে। রতন যেন এই লোকটাকে শুনিয়ে শুনিয়েই কথাগুলো বললো। সে যখন এতোই উদ্বিগ্ন, তবে একটু নিচুস্বরে বলতে পারতো না? উল্টো এমন আচরণ করছে, যেন চালকের মাথায় জোর করে কুবুদ্ধি চাপিয়ে দেয়াটাই তার লক্ষ্য!
রতন তাড়া দেখালো, “বুঝেশুনে কথা বলো মৌ—”
মার্জিয়া ঝাঁঝালো স্বরে বললো, “যাবেনই যখন, উঠে বসেন। কে মানা করেছে! নাকি আপার কাছ থেকে পারমিশন লাগবে আপনার?”
ছেলেটা কিছু বলার আগে, রাবেয়া মমতাজকে সাথে করে নিয়ে এলেন, মেয়েদুটোকে বললেন, “ব্যাগ সব গুছিয়ে নিয়েছো?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ।” মার্জিয়া বিরক্তি দেখায়, “এতো দেরি করছেন কেন? শুরুতে আপা দেরি করলো, এখন আপনারা দেরি করলেন।”
মমতাজ হেসে বললেন, “আমার চশমাটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না রে মা। এখন উঠে বসো তোমরা। অনেক রাত হয়েছে।”
সিএনজিতে জায়গার সংকট। তবু কোনোমতে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হলো। রতন ফিরে গেলো হাসপাতালে। ক্লান্ত শরীরে ভেতরে ঢুকলো বাকি চারজন মানুষ।
রিতা বাড়িতে নেই, তার পরীক্ষা নাকি শেষ হয়নি এখনও। তাই রিতার ঘরটা গুছিয়ে নিলো মৌমিতা আর মার্জিয়া, রাতটা তারা এখানেই কাটিয়ে দিবে। ভোর হলে আবার হাসপাতালে ছুটতে হবে।
জানালার কাচ সরিয়ে পর্দা মেলে দিলো মৌমিতা। বৈদ্যুতিক বাতি নেভানোর পরেও ঘর জুড়ে একটা মৃদু আলো রয়ে গেলো। তারপর সে বিছানায় গিয়ে পা তুলে বসলো। অন্যজনকে উদ্দেশ্য করে বললো, “সর এখান থেকে। আমি শুবো।”
“ঘুমাবা?”
“না। সাঁতার কাটবো! সর।”
মার্জিয়া মুখ ভোঁতা করে আপার পায়ের দিক থেকে সরে এলো। পাশে এসে বসলো, “ঘুমাও তুমি। আমি ঘুমাবো না।”
মৌমিতা ততোক্ষণে গায়ে কাঁথা দিয়ে শুয়ে পড়েছে, “কেন?”
“ঘুম আসছে না।”
“ওহ।”
“তোমার কতোখানি ঘুম ধরেছে?”
“নিরানব্বই পার্সেন্ট।”
“আমার দশ পার্সেন্ট।”
“চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাক।”
মার্জিয়া কাঁথার নিচে ঢুকে পড়লো। সাধারণত দেয়ালের দিকে মুখ না ঘোরালে তার ঘুম আসে না। তবে এবার সে ইচ্ছে করেই আপার দিকে কাত হয়ে শোয়, বিড়বিড় করে বলে, “এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলে?”
“উঁহু।”
“আপা... আমি না খুব খারাপ স্বপ্ন দেখি ক'দিন ধরে।”
“কেমন স্বপ্ন?” মৌমিতা জোর করে চোখ খুললো, “জুনায়েদ ভাই বিয়ে করে ফেলেছে, এসব?”
“ধুর! আব্বাকে দেখি।”
“কী দেখিস?”
“বলতে পারবো না।”
মৌমিতা বিরক্ত হলো, “না পারলে ঘুমা!”
বড় বোনকে আবার নিদ্রায় তলিয়ে যেতে দেখে মেয়েটা অস্থির হয়ে উঠলো। তবে সে বেশ ভালোভাবেই জানে, আপার এই ঘুম কীভাবে উড়িয়ে দেয়া যেতে পারে।
“বাদল ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে?”
“মার্জু, আমি ঘুমাবো!”
মার্জিয়া আশাহত হলো, আহত স্বরে বললো, “আচ্ছা ঘুমাও।”
“না। কথা হয়নি।” চোখ বন্ধ করেই জবাব দেয় মৌমিতা, “একবার খালি খোঁজ পাই, ওর গায়ের একটা হাড্ডিও আস্ত রাখবো না আমি। হতচ্ছাড়া একটা!”
আপার ক্ষুব্ধ প্রলাপ শুনে মার্জিয়া বেশ মজা পেলো, “হ্যাঁ, শাস্তি তো পাবেই বাদল ভাই। আমার আপাকে এমন চিন্তায় রাখার জন্য।” আরও কাছে ঘেঁষে বললো, “ওনাকে নাহয় একটা চিঠি লেখো আপা।”
মৌমিতা চোখ খোলে, রাগ দেখিয়ে বলে, “খেয়েদেয়ে কাজ নেই? ঐ বেয়াদবটাকে আর কখনোই চিঠি লিখবো না।”
“তাহলে কেমনে জানবে, তুমি এখানে আছো? ওনার বাড়ির ঠিকানায় একটা চিঠি দাও। হয়তো ওখানে গিয়ে লুকিয়ে আছে।”
“ও বাড়িতে যায় না তেমন। ওখানে কেউ নেই, শুধু ওর চাচারা আছে।” মৌমিতা একটু দ্বিধা নিয়ে বললো, “যেতেও পারে। কিন্তু আমি ঠিকানাটা সেভাবে জানি না।”
“সিংড়ায় না?”
“হ্যাঁ। কিন্তু সিংড়ার কোথায়, এটা জানি না।”
“বলেনি কখনও? আচ্ছা উনি এমন কেন? অন্তত ঠিকানা তো বলা উচিত ছিলো—”
“বলেনি। কিন্তু...” মৌমিতা বালিশটা ঘাড়ের নিচে টেনে নিয়ে তাতে ভালোভাবে মাথা রাখলো, “ও আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। ওর বাড়িতে।”
“বাড়িতে?”
“হ্যাঁ। প্রায়ই নিয়ে যেতে চাইতো।” বাদলের নকল করেই বললো মেয়েটা, “বলতো... আরে চলেন না একদিন! বেশিক্ষণের রাস্তা না তো। ঘুরতেও বেশিক্ষণ লাগবে না। খালি যাবেন আর আসবেন। আমার সাথে সাথে থাকবেন, সমস্যা কী?”
মার্জিয়া ফিক করে হেসে ফেলে, “ইশ! গেলে না কেন?”
“ঐ পাগলের সাথে যাবো আমি! পরে দেখা যাবে, আমাকে এক জায়গায় রেখে উনি নিজেই উধাও হয়ে গেছেন!”
এবার মেয়েটা আরও জোরে হেসে উঠলো। মৌমিতা ভ্রু কুঁচকালো, তবে কোমল স্বরেই বললো, “ঐ ঘর থেকে কিন্তু সব শোনা যায়। অবশ্য... বকা আমিই খাবো। তোর কী!”
“আহা! যাই হোক, তুমি একবার গেলেই পারতে। এমনিই দেখে আসতে।”
মৌমিতা হাতের তালু দ্বারা চোখ ঘষে বলে, “সাহস হয়নি। বাদল সবার সাথে খুব দুষ্টুমি করতো। আমার সাথে করেনি, তবু ভয় লাগতো। ওর ছোট ছোট কথাও খুব গায়ে লাগে আমার। ভয়ই হয়... আমাকে যেন বাকিদের মতো সস্তা না ভেবে ফেলে। এমনিতে ও আমাকে আঘাত করে কথা বলে না। কিন্তু আমাদের মধ্যে যে দূরত্বটা আছে, সেটা আমি বিয়ের আগে ভাঙতে চাই না।”
মার্জিয়া মাথা দোলায়, “সেটাই ভালো।”
“ও নিজের ফ্যামিলি, নিজের এলাকা নিয়ে অনেক গল্প শুনিয়েছে। ওর বাড়ি নাকি একটু গ্রামের দিকে। ওদিকেই একটা হাইস্কুলে পড়েছে। ছোটবেলা থেকেই খুব মারামারি করতো। পরে তো ওকে সদরে পাঠিয়েছে। এখানে এসেও খুব একটা ভদ্র থাকতে পারেনি। কারও না কারও সাথে ঝামেলা করতোই। ভার্সিটিতে গিয়ে এখনও তো ঝামেলা করে। ওখানে আবার রাজনৈতিক ব্যাপার স্যাপার আছে। কতোবার রাগ করলাম—”
“ভার্সিটিতে সবাই ওরকমই আপা। মারামারি করে, জুনিয়রদেরকে র্যাগ দেয়, বেয়াদবিও করে। কিন্তু ভালোভাবে পরিচয় না থাকলে, শুধু এতোটুকু জেনে কাউকে খারাপ বলা যায় না—”
“বাদলকে আমি চিনি। ও অতো ভালো ছেলে না।”
“তাহলে ভালোবাসো কেন?”
“ঘুমা!”
বোনকে ধমক দিয়েই মৌমিতা পাশ ফিরে শোয়। মনে মনে আবার নিজেকেই প্রশ্ন করে—‘কেন ভালোবাসি?’
কোনো উত্তর পাওয়া যায় না।
জোর করে চোখ বুজলো মৌমিতা। বাদলের মুখটা স্মরণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করলো।
আশ্চর্য! এমন ঝাপসা কেন দেখাচ্ছে তাকে? স্পষ্টভাবে মনে পড়ছে না কিছুতেই।
মেয়েটার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো। সে বড় বড় শ্বাস নিয়ে এবার ঘুমানোর চেষ্টা শুরু করলো।
—————
হাসপাতালে পৌঁছানোর মিনিট দশেক হয়ে গেছে।
মারুফের ঘুম ভাঙেনি। রাবেয়া খাবার প্রস্তুত করছেন। পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করছে সেবিকা নাসরিন। মার্জিয়া চৌকিতে বসে রয়েছে, তার চোখজোড়া এখনও ঢুলুঢুলু। গত রাতে ভালো ঘুম হয়নি। দেরিতে শুয়েছে। ভীষণ বাজে একটা স্বপ্ন দেখেছে। তারপর আর ঘুমাতে পারেনি। তবে দুঃখজনক বিষয়, স্বপ্নের বিষয়বস্তু এখন আর মনেই পড়ছে না।
মৌমিতা পানির বোতল নিয়ে কেবিনে ফিরছিলো। পথিমধ্যে সুজয়ের সাথে তার দেখা হয়ে গেলো। কেউই ভ্রুক্ষেপ করলো না। শুধু পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় ছেলেটা জিজ্ঞেস করলো, “ভালো আছেন?”
মেয়েটা সামান্য চমকায়, পেছন ফিরে মাথা নেড়ে বলে, “জ্বী। আপনি?”
সুজয় থেমে দাঁড়ায়, “দেখে তো মনে হচ্ছে না, ভালো আছেন।”
“তাহলে কী মনে হচ্ছে?”
“মনে হচ্ছে, আমার একটু সাহায্য করা উচিত।”
“মানে?”
মৌমিতার হাতে থাকা দুই লিটারের বোতলটাকে ইঙ্গিত করলো সুজয়, “ওটা আমাকে দেন। আমি রেখে আসছি।”
“লাগবে না।”
“অনুমতি চাইনি! বললাম, বোতলটা আমাকে দেন।”
মৌমিতা সরু চোখে ছেলেটার মুখের দিকে চেয়ে রইলো। নিজের ক্রমবর্ধমান হৃদস্পন্দনকে তোয়াক্কা করলো না। বোতলটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরে আবার হাঁটতে লাগলো। সামান্য কারণেই হঠাৎ খুব হাসি পেয়ে গেলো তার।
কিছু মানুষ কেবল মৌখিক বুলি দ্বারাই সৌজন্যতা দেখায়। ছেলেটার উচিত ছিলো, তার হাত থেকে বোতলটা জোর করে ছিনিয়ে নেয়া! তবেই মৌমিতা বিশ্বাস করতো, সে সত্যিই সাহায্য করতে চায়। হয়তো সে সাহায্য করতে চায়, কিন্তু ছেলেটার ভদ্রতার খোলস বেশ শক্ত। সবসময় এমন থাকে কী করে? বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ আছে নাকি? অভদ্র রূপে কেমন দেখাবে তাকে!
রাবেয়া চেঁচিয়ে উঠলেন, “আরে মৌ, সাবধানে!”
মেয়েটা নাক-মুখ কুঁচকে কোনোমতে বোতলটা টেবিলে নামিয়ে রাখে। অসতর্কতাবশত দরজার সাথে ধাক্কা খেয়ে পায়ে দুর্দান্ত চোট লেগেছে!
রাবেয়া চিন্তিত হয়ে বললেন, “একটু দেখে হাঁটবা না?”
মৌমিতা হেসে ফেললো।
“পাগলি একটা!” রাবেয়া নিজ কাজে মন দিলেন, “দাও তো, ওষুধ রেডি করে দাও।”
ওষুধের বাকশো টেবিলে রাখা। পাশে কালো রঙের ফাইলে রাখা প্রেসক্রিপশন। মৌমিতা ওষুধগুলো বের করে প্রেসক্রিপশনে চোখ বোলাতে থাকে। কিছু নতুন ওষুধ যোগ হয়েছে। উপরের দিকে ডা. আজিম লিখেছেন। নিচের কয়েকটা ওষুধের নাম লিখেছে ডা. মাহফুজ। মেয়েটা অন্যমনস্ক হয়ে সেগুলোর দিকেই তাকিয়ে থাকে।
ডাক্তারের হাতের লেখা এতো স্পষ্ট হয়ে লাভ কী? যেখানে মানুষটা নিজেই দুর্বোধ্য!
·
·
·
চলবে……………………………………………………