সন্ধ্যার সময় ইসমাত এবং সাহিদ অপেক্ষায় ছিল আইফেল টাওয়ারের বাতি জ্বলার। যখন আকাশে আলো আবছা হয়ে এলো, চারপাশে কিছুটা আঁধার নামতে শুরু করল তখনই আইফেল টাওয়ার তার নিজের রঙে জ্বলে উঠল। নিজের সমস্ত উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে দিল চারপাশ। আইফেল টাওয়ারের মাঝে তারার মতো ঝিকিমিকি আলো জ্বলছে। সে কী সুন্দর দৃশ্য, যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। সেইন নদীতে আইফেল টাওয়ারের প্রতিচ্ছবি ইসমাত অবাক চোখে দেখে গেল। সঙ্গে একটা চাঁদও দেখা যাচ্ছে। ঠিক আইফেল টাওয়ারের পিছে। মেঘেরা কেমন চাঁদের আশেপাশে আসর জমিয়েছে। বিদেশের মাটিতে বুঝি এই প্রথম তার পূর্ণিমা দেখা?
সাহিদের চোখে-মুখে সেরকম উচ্ছ্বাস কিংবা বিস্ময় নেই। সে অনুভূতিশূন্য হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে।
সাহিদের মুখজুড়ে চিরচেনা শয় তানি হাসি কিংবা ধারালো নজর কিছুই নেই। যেন আইফেল টাওয়ারকে সে আগেও বহুবার দেখেছে। অথচ এবারই প্রথম। ইসমাত মাথা তুলে পাশে তাকাল একবার। এরপর আবারও মুখ ফিরিয়ে আইফেল টাওয়ারের দিকে তাকাল। ছবি তুলল কটা। ছবি তোলা শেষে পাশে তাকাতেই দেখল সাহিদ নেই, সে নদীর পাশ ধরে হাঁটছে। ইসমাত ছুটল তার পিছু পিছু। সন্ধ্যা হয়ে এতক্ষণে আঁধার নেমেছে, তবুও কোথাও আযানের শব্দ নেই। এই প্রথমবার ইসমাত কিছুটা হতাশ হলো। এই ভিনদেশে আযানের আশা করাটাও বোকামি। এখানে সবাই নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। সাহিদকে পিছু ডাকল ইসমাত। কিছু সময়ের মাঝে দুজন আবারও পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
--"আমাকে ছেড়ে যাচ্ছিলে কোথায়? যদি হারিয়ে যাই?"
--"আপনি হারাবেন না।" সাহিদ উদাসীন গলায় বলল।
--"তো বলছ তুমি হারিয়ে যাবে?"
সাহিদ থেমে গেল। কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। সে তো উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে গিয়ে খেয়ালই করেনি তার সাথে মোবাইল নেই। মোবাইল ছিল ইসমাতের হাতে। ইসমাত না হারালেও সে সত্তর শতাংশ নিশ্চিত, সে হারাতই। কিন্তু এটা বললে কি সাহিদের মান থাকবে? তাই তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল,
--"কখনোই না। আমি পথ চিনি!"
--"কোন দিক দিয়ে এসেছি বলো তো?"
সাহিদ এর উত্তর দিতে পারল না। তার কখনো পথঘাট চিনতে অসুবিধা হয় না। একবার এক অচেনা পথ দিয়ে গেলেও সে ঠিকই চিনে যায়। কিন্তু প্রতিবারের থেকে এবারের ব্যাপারটা ব্যতিক্রম। সাহিদ খুবই অন্যমনস্ক এবং উদাসীন থাকছে। তার এসবে মন নেই। তাই তো বলতে পারবে না কোন পথ দিয়ে এসেছে আর কোন পথে ফিরবে। সে কিছুতেই মনোযোগ পাচ্ছে না। মন যে পড়ে আছে সেই অতীতের স্মৃতিতে। মনে পড়ছে সেদিনের কথা, যেদিন সাব্বির তাকে জিমে মানাতে এসেছিল জান্নাতের বিষয়ে।
জান্নাত তাদেরই একজন বান্ধবী ছিল। তবে তার সাহিদের সাথে লাগোয়া স্বভাব ছিল। সবসময়ই সে সাহিদকে খুঁজত, বাকিদের সাথে সাহিদের বাড়ি আসত। একমাত্র জান্নাতই হয়তো ওদের সার্কেলে আসার সুযোগ পেয়েছিল। সাব্বিরদের জন্য। রুশানের সাথে জান্নাতের কলেজ জীবন থেকে পরিচয় ছিল— এই যা।
জান্নাতকে সবসময়ই এড়িয়ে যেত সাহিদ। সাহিদ সবসময় বন্ধু, গেম, ট্যুর আর বাইকের প্রতিই জান-প্রাণ দিয়ে বসা ছিল। তার কখনো মেয়েলি দিকে নজর দেওয়ার সুযোগই হয়নি। জান্নাত তার সাথে কথা বলতে এলেও হু হা জবাবেই থেমে যেত। জান্নাতকে নিয়ে তার কখনো ভাবারও প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু জান্নাত তার এই হু হাতে কখনোই সন্তুষ্ট ছিল না। সে সর্বদা, উন্মাদের মতো চেয়েছে সাহিদের এটেনশন। এর জন্য তার চেষ্টাও ছিল সর্বোচ্চ। তবে বিশেষ লাভ হয়নি। এ রকম চলতে চলতে সাহিদের গোপনে বিয়ে হয়ে গেল। এই বিয়ের ট্রমাই ছিল তার বহুদিনের। মাসখানেকের মতো সে স্বাভাবিকই হতে পারেনি। দিন-রাত অনলাইন গেমে মজে ছিল। নীরবে গেমের লেভেল বাড়িয়ে বাড়িয়েই যেন রাগ ঝাড়ছিল। এই কটাদিন বাইরের কোনো খোঁজই তার ছিল না। বন্ধুরা কতবার জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু সাহিদ এই বিষয়ে মুখ খোলেনি।
এরপর ইসমাতকে নিয়ে সে আলাদা হলো, দুজন দুজনার জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল বিয়ের ব্যাপারটা লুকিয়ে। কয়েক মাসের মাথাতেই সাহিদের কানে ভাসা ভাসা কিছু গুজব এলো। সে গুজবে কখনোই কান দেয় না, যতক্ষণে না শোনে জান্নাত ছড়াচ্ছে যে— তার আর জান্নাতের মধ্যে খুব ক্লোজ রিলেশনশিপ আছে। তাদের মধ্যে খুবই রসালো সম্পর্ক। জান্নাত নিজে বিভিন্ন গিফট কিনে সেসব ইন্সটাতে ডে দিত যে, সাহিদ তাকে সেসব দিয়েছে। এসব সাহিদের চোখে ধরা পড়তে খুব বেশি সময় লাগল না। সে চেয়েছিল বিষয়টা নিয়ে নীরব থাকতে। কান দিতে চায়নি। কিন্তু সে যত সময় গেছে তত টের পায় এসব নিয়ে তার ভেতরে ভীষণ অস্থিরতা কাজ করছে। রাগটাও কেমন নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না।
সে দেরী না করে সেই রাত বারোটায় রুশানের বাড়ি ডাকে তাকে। জান্নাত তো হাসতে হাসতেই চলে আসে। ভেবে নেয়, এবার বুঝি সাহিদ তাকে মেনে নিবে। আজ তো সে সরাসরি প্রপোজও করে ফেলবে। কিন্তু না— তা হলো না। জান্নাত তাকে প্রস্তাব দিতেই সাথে সাথে এক শক্ত চড়ে জান্নাত মেঝেতে গিয়ে পড়ে। সাহিদের রাগ বরাবরই প্রচন্ড। রাগে নিয়ন্ত্রণহীন হওয়া তার জন্য মুশকিলের ছিল তখন। ইসমাতের সাথে বিয়ের ব্যাপারটায় ছিল আরও আপসেট। সেখানে জান্নাত কোন সাহসে এত বড়ো মিথ্যা বলে যাচ্ছে দিনের পর দিন? সাহিদ মিথ্যা জিনিসটা বড্ড অপছন্দ করে। সেদিন এক বিশ্রী গা লি দিয়ে জান্নাতকে সাবধান করে, সে যা যা ছড়িয়েছে সেসব যেন জান্নাত নিজে থেকে সমাধান করে। ভুল করেও যেন তাদের চার বন্ধুর ধারেও ঘেঁষার চেষ্টা না করে। আর তার বন্ধুদেরকেও সাবধান করে, যদি কেউ এই মেয়ের সাথে যোগাযোগ রাখে তাহলে যেন তারা সাহিদের সাথে বন্ধুত্ব ভুলে যায়।
মেয়েলি ব্যাপারে সেদিনই প্রথম, সবাই সাহিদকে এতটা রাগতে দেখেছিল। সাহিদ নিজের বিয়ের রাগ নাকি অন্যকিছু, সেদিন সব একসাথেই ঝেড়ে দিয়েছিল। জান্নাতের মতো মেয়েদের জন্য জমে যায় তীব্র ঘৃণা। জান্নাত তার পা ধরেও কোনো সুরাহা করতে পারেনি। উলটো সাহিদের রাগের তোপে পড়ে যায়।
ওদের কাছে এই বিষয়টা খুবই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। এত ক্ষুদ্র বিষয়ে রাগ করার কি আছে? তাই তো সাহিদের হুমকি কেউ অত গুরুতর চোখে দেখত না। সাব্বিরও তাই। দূরত্ব রেখেছে ঠিকই তবে জান্নাতের সাথে তাদের প্রায়ই কথা হতো। জান্নাত ওদের কাছে খুব অনুরোধ করেছে যেন সাহিদকে বোঝায়, সে তো ভালোবেসেই এমনটা করে ফেলেছে। কিন্তু বন্ধুরা বুঝিয়েও বিশেষ লাভ হয়নি। উলটো ওরাও গরম লাভার মুখে পড়েছিল। কিন্তু সাব্বির যখন বুঝতে পারল জান্নাতের ব্যাপারটা সাহিদের মনে ঠিক কি প্রভাব ফেলেছে, এরপর থেকে সেও সবাইকে বারণ করেছে জান্নাতের সাথে যেন যোগাযোগ না করে।
এই বিষয়ে যেই মানুষটা সাহিদকে সবার আগে বুঝেছিল, আফসোস! এখন সেই মানুষটা নেই।
—————
বাস্তবে ফিরল যখন সাহিদের জুতোয় নদীর পানি ঝাপটে পড়েছে। সবেই একটা রিভারক্রুস গেল। ইসমাত সেটা দেখে মুখ টিপে হাসল।
--"আহারে, ভাবনায় এত ব্যস্ত ছিলে যে নদীর এত কাছে চলে গেছ? শুকর করো শুধু জুতোই ভিজেছে। আমি তো ভাবলাম ডুব দিবে।"
সাহিদ গরম চোখে তাকাল ইসমাতের দিকে। কিড়মিড় গলায় বলল,
--"মজা নিচ্ছেন?"
হঠাৎ-ই ঠান্ডা বাতাস ছুঁয়ে দিল ইসমাতকে। সে জ্যাকেট আনেনি। কোনো রকম টপস আর জিন্স পরেই বেরিয়েছে। দু'হাতে বাহু ঘঁষে বলল,
--"নিলাম নাহয় একটু।"
ইসমাত দেখল রিভারক্রুসের জন্য লাইন বড়ো, এছাড়া তাদের বাড়িওয়ালিও বলেছিলেন যেন ভাটা পড়লে রিভারক্রুসে না চড়ে। এজন্য সেই ভাবনা ইসমাত আর মাথায় আনল না। কিছুক্ষণ বাদেই শাবাব এলো। সে ইচ্ছাকৃতই দেরী করে এসেছে। তার বসের নির্দেশ.. যতটা সম্ভব ইসমাত আর সাহিদকে একাকী রাখতে হবে। শাবাব এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করেনি। তার কৌতুহল হলেও দমিয়ে রেখেছে। তার চাকরি আগে। বসের জন্যই ফ্রান্সে এত আরামের সুযোগ পাচ্ছে সে।
--"সরি স্যার, একটু দেরী হয়ে গেল।"
ইসমাত মুহূর্তেই কথা ঘুরাল,
--"ভালো স্ট্রিট ফুড সাজেস্ট করবেন তো। নিয়ে যান আমাদের।"
সাহিদ বলল,
--"আনহেলদি.."
ইসমাত ফোড়ন কেটে বলল,
--"এটা বাংলাদেশ না।"
সাহিদ যেতে চাইল না। সে ভেজা জুতো বদলাতে চাইল। ভীষণ বিরক্ত সে। শালার জুতো ভেজার আর সময় হলো না? শাবাব দুজনের ঝগড়ার মাঝে এইটুকুন হয়ে গেল। টুকটাক বুঝতে পারছে বস কেন ওদের দুজনকে একা সময় দেওয়ার কথা বলেছে।
ইসমাতের নজর কেন যেন আইফেল টাওয়ারের থেকে কাটছিলই না। দিনের থেকে রাতের সৌন্দর্য যেন বহুগুণ। কিন্তু কিছু করার নেই। তাদের যেতে হচ্ছে একটা ব্র্যান্ডে। সেখান থেকেই মূলত সাহিদ তার জুতো নিবে।
সাহিদের সাথে এবারই বুঝি ইসমাতের প্রথম শপিং-এ আসা। সে দেখল এই ছেলের সকল খুঁতখুঁত। কত ধরণের জুতো যে সে ট্রায়াল দিল। শুধু ট্রায়ালেই সীমাবদ্ধ রইলো না। আয়নায়, নিজে ঘুরে ফিরে দেখল। ইসমাত নাক কুঁচকে এই ছেলের কর্ম-কান্ড দেখছে। এই ছেলে কি মেয়ে? চয়েজের ক্ষেত্রে কোন ছেলে এত দোনামনা করে? বাপের জন্মেও কোনো ছেলেকে সে এত নাটক করতে দেখেনি। অবশ্য, এই বিষয়ে সে বিশেষ কিছু বলতেও পারল না। সাহিদের ড্রেসিং সেন্স ভালো, এটা সে অস্বীকারও করতে পারে না।
--"মেয়েদের মতো এত নাটকের কি আছে? একটা নিয়ে নাও না।"
সাহিদ আয়নায় ইসমাতকে দেখে বলল,
--"আর ইউ জেলাস, ইসমাত? আমার জুতো আমি দেখেশুনেই সিলেক্ট করব।"
ইসমাত মুখ বাঁকাল, আর কিছু বলল না। জুতো কেনার কথা ছিল এক জোড়া। শাবাবের হাতে এখন তিনটা শপিং ব্যাগ। নতুন এক জোড়া তার পায়ে। কিছুক্ষণ আগের জুতোটা সে ডাস্টবিনে ফেলেছে। এটা খুবই দৃষ্টিকটু লেগেছে ইসমাতের।
--"জুতোটা নতুন ছিল।"
--"সো হোয়াট?"
--"এভাবে ওয়ান টাইম ইউজ করে কি মানুষও ফেলো নাকি?"
ইসমাতের এহেম কথায় সাহিদ থমকে দাঁড়াল। কিছু যেন ভাবছে সে। সময় নিয়ে ইসমাতের দিকে তাকাল। ধীর গলায় বলল,
--"না, ফেলি না। তবে হারাই, মানুষ।"
বলেই সাহিদ লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটতে শুরু করল। ইসমাত হিল পরে সাহিদের হাঁটার গতির সাথে পারল না। শীতও করছে তার বেশ। কেন যে জ্যাকেটটা ফেলে চলে এলো। সাহিদ কি ভাবে দাঁড়াল। পিছে ঘুরে চাইল ইসমাতের দিকে। এই রাস্তাটা খুবই ব্যস্ত, কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। নিজেদের মধ্যেই তারা হাঁটা-চলায় মনোযোগী। বিদেশিরা খুব একটা সময় অপচয় করতে পছন্দ করে না। তাই কেউ কারো দিকে ফিরে ফিরে তাকায়ও না।
সাহিদ অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছে ইসমাত শীতে কাঁপছে, মিইয়ে যাচ্ছে। সে অবশ্য প্রিপারেশন নিয়েই এসেছিল। তবে লম্বা কোটটা এখনো হাতেই, পরার মতো সুযোগ হয়নি। সে শুধু নীরবে এগিয়ে দিল কোটটা। যেন কিছু একটা তাকে বারবার বলছে, ইসমাতকে কোটটা দেওয়া উচিত। এটাকে বিবেক বলে কিনা কে জানে? আগে কখনো কারো প্রতি এরকম কিছু মনে হয়নি। সাব্বির চলে যাওয়ার পরেই হয়তো সাহিদের এই সত্ত্বাটা প্রকাশ পাচ্ছে।
কোট এগিয়ে দিলেও সাহিদ মুখে কিছু বলল না। ইসমাত অবাক হয়ে দেখল একবার সাহিদকে তো একবার কোটটাকে৷ বিস্ময় কাটছে না যেন তার।
--"নিবেন নাকি হাঁটবেন? চুজ ওয়ান।"
ইসমাত নীরবে কোটটা নিল, গায়ে জড়াল। ঘোরের মাঝেই হেঁটে যায় প্যারিসের ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে।
—————
আজ সাইকোলজিস্ট এসেছিল ঠিক লাঞ্চটাইমে। কিন্তু সাহিদ গিয়েছিল অত্যন্ত রেগে। সে পইপই করে নিষেধ করেছে যেন কোনোপ্রকার সাইকোলজিস্ট তার সামনে না আসে। সে ডিস্টার্বড হলেও পাগল না। এই প্রভাবটা খুব বাজে ভাবেই পড়ল সাহিদের ওপর। সে সারাদিন চেঁচামেচি করল ইসমাতের সাথে। ইসমাত তাকে বিভিন্ন ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও বিশেষ লাভ হয়নি। ইসমাত টের পায় সাহিদ ঠিক নেই, তার ঠিক থাকার কথাও না। এটা সাহিদের জন্য খুবই সংবেদনশীল দূর্ঘটনা। তার মতো মানুষের ট্রমা হয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেশের ডাক্তাররাই দিয়েছিল। আজকের তীক্ষ্ণ ব্যবহারও সেই প্রমাণই দেয়।
এ নিয়ে ওদের মাঝে ঝগড়া হলো। ঝগড়ার এক পর্যায়ে সাহিদ হাতের কাছের ফুলের টব ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে রুমে গিয়ে দরজা লক করে দিল। ইসমাত অনেকবার ডেকেও সাহিদের সাড়া পায়নি।
ঘটনা আবার খুবই মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন সাইকোলজিস্ট মি. হ্যারেন দেখলেন। ভাষা না বুঝলেও ওনার দক্ষ চোখ দ্বারাই তিনি সবটা বুঝে নিলেন। ইসমাতকে তিনি একপাশে ডাকলেন। খুবই শান্ত গলায় বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,
--"ওনাকে আরেকটু সময় দিন। যতটুকু বুঝলাম ওনার ব্যাপারটা গুরুতর। এই ধরণের মানসিক রোগীরা কাউন্সিলিং এর কথা শুনলেই খুব হাইপার হয়ে যায়। এটা ওনার জন্য আরও বিপদজনক। তাকে ঠান্ডা মাথায় আরেকটু বোঝানোর চেষ্টা করুন, জোর করবেন না। আমি মি. সাওবাবকে আগামী এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে রাখব, তার আগে ওনাকে সামলে নিন। বর্তমানে ওনার যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে সঙ্গ। আ পার্টনার জাস্ট লাইক ইউ। সে যতই তিনি একা থাকতে চান না কেন। আমি বোধ হয় তার সিন্ড্রোমস গুলা ধরতে পারছি। ঠিকঠাক কাউন্সিল করালে ঠিক হয়ে যাবে।"
বিদেশি হওয়ায় তিনি সঠিকভাবে শাবাবের নামটা উচ্চারণ করতে পারেননি। ইসমাত দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বলল,
--"থ্যাঙ্কস মি. হ্যারেন।"
--"মাই প্লেজার। চেষ্টা করবেন ওনাকে মেন্টালি ফোর্স না করতে। হুঁ? গুডবাই, ফর নাও।"
সাইকোলজিস্ট খালি হাতেই ফিরে গেলেন। ইসমাত ঘণ্টাখানেক বসে থাকল সাহিদের অপেক্ষায়। যখন সে বেরুলো না, সে চলে গেল শাবাবের সাথে ব্যবসার কাজে। একটু তো সাহিদকে সময় দেওয়াই যায়। মেইডদের বলে গেল তাকে আপডেট জানাতে।
ইসমাত ফিরল রাতে। রাতে এসেই থমকে গেল। সাহিদ ঘরের দরজা খুলেছে, এখন সে টেরেসে বসে আছে। তার মাথা টেবিলে, হাতের ওপর। হাতের কাছেই কয়েকটা খালি ওয়াইনের বোতল, একটা ডায়মন্ড কাটের গ্লাস। তার পেছনেই আইফেল টাওয়ারটা জ্বলজ্বল করছে। আজও উঁকি দিচ্ছে মধুময় চাঁদটা, ঠিক আইফেল টাওয়ারের পেছনেই। রাতের দৃশ্য আরও সুন্দর, কিন্তু সাহিদের ক্ষেত্রে না। ছেলের এলোমেলো কালো শার্ট, চুল, মুখের অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ভালো রকমের নেশা চড়েছে। ইসমাত ভেবে পেল না এতগুলা বোতল পেল কই? শাবাব কি এগুলা আলাদা করে রেখেছিল সাহিদের জন্য? কি অদ্ভুত। মেইডরা নেই, ওরা সন্ধ্যাতেই চলে গেছে। চলে গেছে বলতে তারা বেশি দূরে থাকে না। এখান থেকে ওখানে তাদের বাসা। দুজন একসাথে থাকে সম্ভবত।
সাহিদের হুঁশ নেই। সে ওভাবেই পড়ে আছে। আগেরবারের মতো সাহিদকে ফেলে দিল না ইসমাত। তার কানে বেজে যাচ্ছে ড. হ্যারেনের বলা বাক্যটা। সাহিদের ইসমাতকে প্রয়োজন। ইসমাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেল সাহিদের দিকে। তার কাঁধে হাত রেখে সাহিদ বলে ডাকল। কিন্তু কয়েকবার ডেকেও সাহিদের সাড়া পেল না।
যখন দেখল নরম সুরে ডেকেও লাভ হচ্ছে না, তখন ইসমাত আশাহত হলো। কি করবে তা ভাবল কোমরে হাত গুঁজে। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে উদ্যত হলো সাহিদকে টেনে তুলতে। টেনেটুনে সাহিদের ভার নিজের ওপর নিল। মুহূর্তেই ইসমাত টাল হারিয়ে পাশের দেয়ালের সাপোর্ট নিল। ভাগ্যিস একটুর জন্য পড়েনি। ছেলেটা কি ভারী! ওজন ইসমাতের থেকে কয়েক গুণ বেশি। নেশা করে ওজন বুঝি আরও বেড়েছে। কোনোরকমে একে ধরে সে রুমে নিয়ে গেল। এটুকু হাঁটতেই ইসমাতের দম বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। এত কাহিল লাগছে তার।
সাহিদ আচমকাই চোখ মেলে তাকাল। লাল, ফোলা চোখে ইসমাতকে দেখল। ইসমাত ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। ছেলেটা কি নীরবে-নিভৃতে কেঁদেছে?
সাহিদ নড়েচড়ে দূরে সরে যেতে চাইল। সে চোখে সব ঝাপসা দেখছে। ইসমাতও চেহারাও ঝাপসা, কিন্তু অনুভব করতে পারছে তার পাশের সুবাসিত মেয়েটা ইসমাত। সাহিদ পায়ে পা বাজিয়ে পড়ে যেতে নিলে ইসমাত তাকে টেনে ধরল। কিন্তু সে সাহিদের কাছে নিতান্তই পিঁপড়া। সাহিদকে নিয়ে ধপ করে পড়ল নরম বিছানায় কম্ফোর্টারের ওপর। সাহিদ মাথাটা তুলল না এবার। ইসমাতের গলায় মুখ গুঁজে রইলো, বেহুঁশ সে। কোথায় কার সাথে আছে কোনোকিছুরই জ্ঞান নেই তার। সাহিদের ক্লিন শেভ চোয়ালটা ঘঁষল ইসমাতের গলায়। ইসমাত স্থির হয়ে গেল, গায়ে কেমন কম্পন দিল। কিছু বলার বা ভাবার সুযোগ পেল না সে। মুহূর্তেই সাহিদের ঠোঁটজোড়া তার গলায় উষ্ণ ছোঁয়া দিতে লাগল। মিনমিন করে, অস্পষ্ট করে আওড়াচ্ছে,
--"ভ্যানিলা স্মেল। আইসক্রিম? উম.. সো ইয়াম্মি।"
ইসমাত চেঁচাল,
--"সাহিদ! কি হচ্ছে, ছাড়ো! হোয়াট দ্য হেল!"
সাহিদের কান অবধি সেই বাঁধা পৌঁছাল না। এমনকি তাকে ঠেলেও দূরে সরানো যাচ্ছে না। আইসক্রিম ভেবে সাহিদ কলারবনের কাছটায় এক কামড় দিয়ে বসল। মুহূর্তেই ইসমাতের গায়ে কেমন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে একপ্রকার আঁতকে উঠেই এক শক্ত চড় দিয়ে বসল সাহিদের গালে। সাহিদ এটুকুতেই কেমন ছিটকে পড়ল, বিছানার অন্য পাশে। নড়চড় ছাড়া অভাবেই ঘুমিয়ে পড়ল। ইসমাত সেই অবস্থায়, কলারবনে হাত গুঁজে আতঙ্কিত হয়ে স্থির হয়ে বসে রইলো। বুক কাঁপছে তার। এই ধরণের পরিস্থিতিতে ঠিক কী ধরণের রিয়েকশন দিতে হয় তার জানা নেই। এই পরিস্থিতি তার জন্য নতুন। সাহিদের এই অবস্থা খুবই সোচনীয়। সে হতভম্ভ চোখে সাহিদের গালটা দেখল। তিন আঙুলের লাল ছাপ পড়েছে ফর্সা গালটায়, কিন্তু বান্দার হুঁশ নেই।
·
·
·
চলবে……………………………………………………