নির্জন সড়ক ধরে প্রাণপণে ছুটে চলেছে দুর্দমনীয় স মেয়েটি। তার চোখে নেই কোনো শঙ্কা, মনে নেই কোনো দ্বিধা। কোথায় যাবে, কী করবে—সেসবের কোনো স্পষ্ট উত্তর তার জানা নেই। শুধু একটি সংকল্পই বারবার মস্তিষ্কে আঘাত হানছে—যেভাবেই হোক, তাকে পালাতেই হবে।
সেই মানুষটার ছায়াতেও আর এক মুহূর্ত থাকতে রাজি নয় সে। কোনো মূল্যেই নয়।বুকভরা তীব্র প্রতিজ্ঞা আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে সঙ্গী করে উন্মত্ত গতিতে ছুটে চলেছে সে। সামনে কী আছে, কোন পথে যাচ্ছে—সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করারও সময় নেই। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বিজয়ের নেশায় উন্মুখ কোনো দৌড়বিদ, যে শেষ গন্তব্যে পৌঁছাতে নিজের সমস্ত শক্তি উজাড় করে দিচ্ছে।
চারপাশে তখন ভোরের পূর্বমুহূর্তের গভীর নীরবতা। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফজরের আজান ধ্বনিত হবে। নিস্তব্ধ পৃথিবী যেন তার পলায়নের জন্য আদর্শ সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগ হাতছাড়া করার প্রশ্নই ওঠে না।দ্রুতগতিতে ছুটতে সুবিধা হবে ভেবেই ব্যাগি জিন্সের সঙ্গে একটি আরামদায়ক টপ পরে নিয়েছে সে। আর নিজের কাছে থাকা সমস্ত টাকা গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশে।
আজ তার একটাই লক্ষ্য—মুক্তি।
পালিয়ে যাওয়ার আগে মনে হলো তার পেট খুবই চাচ্ছে।সে সিঁড়ি দিয়ে নেমেছিল এক বিশেষ কারণে—ক্ষুধা। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। আর খালি পেটে এতটা পথ দৌড়ে পালানো অসম্ভব।নিঃশব্দে পা ফেলে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল রাহা। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে ধীরে ফ্রিজ খুলতেই দেখতে পেল তার জন্য খাবার গুছিয়ে রাখা। খাবার গরম করার মতো ধৈর্য বা সময়—কোনোটাই তার নেই। তীব্র ক্ষুধায় ঠান্ডা খাবারই তাড়াহুড়ো করে গিলতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ করে হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়াল।এখন আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করা যাবে না।আবারও সিঁড়ি বেড়ে নিজের ঘরের বারান্দা বেয়ে নিচে নেমে গেলো। প্রতিটি পদক্ষেপে তার বুকের ভেতর ঢাকের মতো ধুকধুক শব্দ উঠছে—যদি ধরা পড়ে যায়! তবুও ভয়কে গিলে সাহস আঁকড়ে ধরে বাড়ির পেছনের দেয়াল টপকে ছুটে বেরিয়ে গেল অন্ধকারের বুকে।
কিন্তু আরেকজোড়া চোখ যে অপর বারান্দা দিয়ে তাকিয়ে আছে সেই খেয়াল কি আছে তার..!
দেয়াল টপকানো তার জন্য নতুন কিছু নয়। বরং এই কাজে সে ছিল ভীষণ দক্ষ। ছোটবেলা থেকেই বাড়ির কড়াকড়ি আর নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল এড়িয়ে বহুবার এভাবেই পালিয়ে বেরিয়েছে। কোথাও যাওয়ার অনুমতি না পেলে রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে, বারান্দা বেয়ে নিচে নেমে দেয়াল ডিঙিয়ে উধাও হয়ে যেত। আবার সময়মতো একই পথে ফিরে আসত, যেন কিছুই ঘটেনি।
তবে আজকের রাতটা আলাদা।
যত দ্রুত সম্ভব তাকে এই এলাকা, এই বাড়ি, এই বন্দিত্বের ছায়া—সবকিছু পেছনে ফেলে অজানার পথে হারিয়ে যেতে হবে। সামনে কী আছে সে জানে না, কোথায় গিয়ে থামবে তাও অজানা। কিন্তু একটি বিষয় সে নিশ্চিত জানে—
আজ তাকে পালাতেই হবে। যে কোনো মূল্যে।
নিস্তব্ধ, জনমানবশূন্য রাস্তার বুক চিরে একা ছুটে চলছিল রাহা। অবশেষে দৌড়ের গতি থেমে এলো। বুকটা যেন পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে, শ্বাস-প্রশ্বাস অস্থির হয়ে উঠেছে। ঘামে ভিজে একাকার পুরো শরীর। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ।
চারপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাতেই তার চোখে পড়ল একটি পুরোনো স্কুল মাঠ। মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি পানির কল। দৃশ্যটা দেখে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠল। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দু'হাতের আঁজল ভরে ঠান্ডা পানি তুলে পান করল সে। শীতল পানির স্পর্শে যেন কিছুটা প্রাণ ফিরে পেল ক্লান্ত দেহ।
এদিকে ফজরের আজান ভেসে উঠেছে চারদিক জুড়ে। সুরেলা সেই ধ্বনি নীরব ভোরের আবহকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। আজান শুনতে শুনতে রাহা অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
এখন কোথায় যাবে সে?বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। পেছনে ফেলে এসেছে পরিচিত সবকিছু। সামনে শুধু অনিশ্চয়তা আর অজানা এক পথ।তবে একটা সিদ্ধান্ত সে নিয়ে ফেলেছে।
সে যাবে সিলেট।নিজের পরিচয়ে বাঁচবে। একটা চাকরি করবে, পড়াশোনা চালিয়ে যাবে, নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়বে। কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে তার মনে কোনো দ্বিধা নেই—
অভ্রের কাছে সে আর কখনো ফিরবে না।
ভাবনাটা মনে আসতেই দৃঢ় হয়ে উঠল তার দৃষ্টি।
ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এলো ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দ। কুয়াশা মাখা ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ধীরে ধীরে একটি কালো প্রাইভেট কার এগিয়ে আসছে তার দিকে।রাহার ভেতরে মুহূর্তেই দ্বন্দ্ব শুরু হলো।
সাহায্য চাইবে?
নাকি অচেনা গাড়ির কাছ থেকে দূরে থাকবে?
কয়েক সেকেন্ডের ইতস্তত শেষে সাহসই জয়ী হলো।গাড়িটি তার সামনে এসে গতি কমাতেই রাহা হাত তুলে ইশারা করল।
অদ্ভুতভাবে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই গাড়িটি থেমে গেল।
কালো কাচ ধীরে ধীরে নিচে নামল।
ভেতরে বসে থাকা ব্যক্তির মুখ স্পষ্ট দেখা গেল না। শুধু একজোড়া তীক্ষ্ণ, রহস্যাবৃত চোখ অন্ধকারের আড়াল থেকে তার দিকে স্থির হয়ে রইল।
কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর গভীর, ভারী কণ্ঠ ভেসে এলো—
— "কোথায় যেতে চান, ম্যাম?"
অজানা কারণে প্রশ্নটা শুনে রাহার বুকের ভেতর হালকা কাঁপন বয়ে গেল।
ড্রাইভারটির মুখ কালো মাস্কে ঢাকা। গাঢ়, ভারী কণ্ঠস্বরটা শুনে রাহার বুকের ভেতর কেমন যেন ধাক্কা খেল। স্বরটা অদ্ভুতভাবে পরিচিত লাগছে। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল সে। কেন এত চেনা মনে হচ্ছে?
পরক্ষণেই নিজের ভাবনাকে উড়িয়ে দিল। হয়তো অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণেই এমন মনে হচ্ছে। যার কথা ভাবছে, তার কণ্ঠ এখানে শোনার কোনো কারণই নেই।
মাথা ঝাঁকিয়ে অস্বস্তিকর চিন্তাগুলো সরিয়ে দিয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “সিলেট যাবেন?”
মুখোশে ঢাকা লোকটি ঠোঁটের কোণে এক গোপন হাসি টেনে শুধু মাথা নাড়ল।
রাহার মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।লোকটা অস্বাভাবিক রকমের নির্লিপ্ত। একবারও তার দিকে ফিরে তাকায়নি। কালো হুডি, কালো মাস্ক— যেন অন্ধকারেই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে।
আবার নিজেকেই বোঝাল সে,
— “আমার কী! গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেই হলো।”
তারপর জিজ্ঞেস করল,
— “ভাড়া কত?”
লোকটি কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে নিচু স্বরে বলল,
— “আপনার জান...”বিবিজান।”
রাহা কপাল কুঁচকে তাকাল।
— “কী বললেন?”
লোকটি গলা খাঁকারি দিয়ে ভারী স্বরে উত্তর দিল,
— “আপনি যা দেবেন, তাই।”
রাহা কিছুটা দ্বিধায় চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। আশেপাশে আর কোনো গাড়ির দেখা নেই। প্রায় দুই মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও অন্য কোনো ব্যবস্থা হলো না।
হঠাৎ লোকটি শীতল কণ্ঠে বলে উঠল,
— “না গেলে চলে যাই। এই এলাকায় সহজে গাড়ি পাওয়া যায় না।”
রাহা তড়িঘড়ি করে বলল,
— “দাঁড়ান, দাঁড়ান! আসছি আমি।”
বলেই দ্রুত গিয়ে পিছনের সিটে বসে পড়ল।
গাড়ি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।আর স্টিয়ারিং আঁকড়ে থাকা মুখোশধারী মানুষটি ঠোঁটের কোণে দুর্বোধ্য, রহস্যময় এক হাসি ঝুলিয়ে নিঃশব্দে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগল— যেন সবকিছুই তার পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে।
গাড়িটা কাঁচা পথ পেরিয়ে মসৃণ পিচঢালা সড়কে উঠতেই গতি আরও স্থির হয়ে এলো।
দীর্ঘক্ষণ দৌড়ঝাঁপ আর মানসিক চাপে অবসন্ন রাহা মাথাটা সিটে ঠেকিয়ে দিল। চোখ দুটো ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছিল। কিন্তু হঠাৎই সামনের রিয়ার-ভিউ মিররে ভেসে ওঠা এক পরিচিত মুখের আভাস তার সমস্ত তন্দ্রা মুহূর্তেই উড়িয়ে দিল।
রাহা ধড়ফড় করে সোজা হয়ে বসল।
একবার... দু'বার... বারবার চোখ মুছে তাকালো সে।
না, এটা কি সত্যিই অভ্র?অসম্ভব!
যার হাত থেকে প্রাণপণে পালিয়ে এসেছে, সে এখানে কীভাবে আসবে?
রাহার বিস্ময়ভরা প্রতিক্রিয়া দেখে স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসে থাকা রহস্যময়ী চালকের ঠোঁটের কোণে কৌতুকমাখা হাসি ফুটে উঠল। ঠিক রাহার দৃষ্টি পড়ার আগমুহূর্তেই সে দ্রুত মাস্কটা মুখে টেনে নিয়েছিল।
গাড়ি তখন ঢাকার অন্যতম বিলাসবহুল পাঁচতারকা হোটেল The Westin Dhaka-এর সড়ক ধরে এগিয়ে চলেছে।
চারপাশটা দেখে রাহা কপাল কুঁচকে বলল,
— "এই... কোনদিকে যাচ্ছেন আপনি? হোটেলের রাস্তা কেন ধরলেন? আমি তো সিলেট যাব!"
রাহার কথাটা শেষ হতেই রিয়ার-ভিউ মিররে তার দিকে এক ধারালো দৃষ্টি ছুড়ে দিল।সেই দৃষ্টিতে ছিল শিকারিকে ফিরে পাওয়ার নির্মম তৃপ্তি। এক টানে মুখের কালো মাস্কটা সরিয়ে ফেলল অভ্র।
মুহূর্তেই রাহার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
অভ্র খান।
ঠোঁটের কোণে বিপজ্জনক হাসি টেনে সে নিচু, ভারী স্বরে বলল,
— "গুড মর্নিং, ওয়াইফি। পালিয়ে বেড়ানোর সফর কেমন উপভোগ করলে?”
রাহা নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল।
অভ্র আবার বলল,
— "একটা কথা কি জানিস? তুই যতবার পালাবে, আমি ততবার খুঁজে বের করব। পৃথিবীর যে প্রান্তেই লুকাস না কেন, তোর গন্তব্য শেষ পর্যন্ত আমার কাছেই এসে থামবে।"
তার কণ্ঠস্বর আরও শীতল হয়ে উঠল।
— "সিলেট যাবি বলেছিস? অনুমতি দিয়েছে কে? আমার স্ত্রী হয়ে আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাবে, আর আমি চুপচাপ বসে থাকব—এত বড় ভুল ধারণা মাথায় এলো কীভাবে?"
রাহার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
মুহূর্তের মধ্যে রাহার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হিম হয়ে গেল।
যেখানে বাঘের ভয়ে মানুষ বন এড়িয়ে চলে, সেখানে সে নিজেই এসে পড়েছে বাঘের গুহায়। ওইযে কথায় আছে না..!
যেখানে বাঘের ভয়..
সেখানেই সন্ধা হয়..
যার কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এতক্ষণ ছুটেছে, সেই মানুষটির নিয়ন্ত্রণেই এখন সে বন্দি।
রাহার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না।হাত-পা যেন অবশ হয়ে গেছে।বিশাল বিস্ফারিত চোখে সে শুধু তাকিয়ে রইল অভ্রের দিকে।
মনের ভেতর তখন একটাই আতঙ্ক ঘুরপাক খাচ্ছে
এবার কী হবে তার?অভ্র কি তাকে ক্ষমা করবে?
নাকি আজই তার সমস্ত দুঃসাহসের হিসাব চুকিয়ে দেবে?
ভয়, ক্লান্তি আর তীব্র মানসিক চাপ একসাথে আঘাত হানতেই রাহার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো।
চারপাশ ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে গেল।
পরমুহূর্তেই নিস্তেজ শরীরটা সিটের ওপর ঢলে পড়ল।সে অজ্ঞান হয়ে গেছে।
—————
সকাল প্রায় এগারোটা।
ধীরে ধীরে চেতনা ফিরে পেতেই রাহা অনুভব করল সে এক নরম বিছানায় শুয়ে আছে। ভারী হয়ে থাকা চোখ দুটো মেলে চারপাশে তাকাতেই বিস্ময়ে থমকে গেল। অভিজাত সজ্জা, দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা আর বিলাসবহুল পরিবেশ দেখে বুঝতে বাকি রইল না—সে কোনো নামকরা পাঁচতারকা হোটেলের স্যুইটে অবস্থান করছে।
তড়িঘড়ি করে উঠে বসতেই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো সামনের সোফায়।সেখানে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে অভ্র।এক হাতে জ্বলন্ত প্রিমিয়াম সিগারেট, অন্য হাতে রুবির মতো লাল রেড ওয়াইনের গ্লাস। দীর্ঘ পা দুটো নির্ভার ভঙ্গিতে সামনের টেবিলের উপর তুলে রেখেছে। সদ্যস্নাত দেহে তখনও পানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দু চিকচিক করছে। পরনে কেবল একটি সাদা টাওয়াল।
প্রশস্ত বক্ষ, দৃঢ় বাহু, সুঠাম পেশী আর পুরুষালি ব্যক্তিত্ব যেন পুরো ঘরটাকেই নিজের দখলে নিয়ে রেখেছে।অজান্তেই কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল রাহা।অভ্র ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাড়ল।
— "কি ব্যাপার, ব্রেভ গার্ল? এভাবে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছিস কেন?"
রাহা চমকে উঠল।
অভ্র ধীরেসুস্থে ওয়াইনের গ্লাসটা ঘুরিয়ে নিয়ে নিচু, কর্কশ কণ্ঠে বলল,
— "আমাকে কি অসহনীয় রকমের সুদর্শন লাগছে?"
কথাটা শুনেই রাহার বুক ধক করে উঠল। লজ্জা আর অস্বস্তিতে সে তড়িঘড়ি করে চোখ নামিয়ে ফেলল।ঠিক তখনই নিজের দিকে তাকিয়ে তার শরীর কেঁপে উঠল।পোশাক বদলানো।
মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের সমস্ত রঙ উধাও হয়ে গেল।
— "আমার... আমার ড্রেস।আমার ড্রেস কে চেঞ্জ করেছে?”
— “আমি...”
— “কীইইইইইইই?!”
রাহার বিস্মিত চিৎকার শুনে অভ্রও তার স্বর নকল করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— “কীইইইইইইই না, জ্বিইইইইইইই!”
— “মানে?!”
— “কিসের মানে?”
— “তারমানে... আপনি সব...”
অভ্র নির্বিকারভাবে কাঁধ ঝাঁকাল।
— “হ্যাঁ, দেখে ফেলেছি। তো?”
রাহার চোখ আরও বড় হয়ে গেল।
— “এটা কিন্তু ঠিক না!”
— “কোনটা ঠিক না? তুই আমার লিগ্যালি ওয়াইফ। আর সেই একটা পারফরম্যান্সের জন্য আমি কত প্রস্তুতি নিয়েছিলাম জানিস? কিন্তু ম্যাডাম তো মাঝপথেই অজ্ঞান হয়ে গেল। বল তো, এটা কি ঠিক করলি?”
রাহা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
মাথার ভেতর যেন একসাথে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
— “পা... পা... পারফরম্যান্স মানে? আমার তো কিছুই মনে নেই...”
অভ্র কপালে হাত ঠেকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “এই বউ, তোর এত ভুলে যাওয়ার রোগ কবে থেকে শুরু হলো? আমি কি একটা পাগলকে বিয়ে করলাম? হায় আল্লাহ! এ আমার কী সর্বনাশ হলো! আমি কাকে বিয়ে করলাম?”
— “ছেঃ! শালার জিন্দেগী।আমার সুন্দর জীবন-যৌবন তো এখন ঘুণে খেয়ে ফেলবে !”
রাহা এবার আর সহ্য করতে না পেরে বালিশ ছুড়ে মারল তার দিকে।
— “চুপ করুন আপনি!”
— “আরে কেন?”
— “কি সব আজেবাজে কথা বলছেন!”
অভ্র ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
— “আমি তো সত্যিই বলছি।”
রাহা রাগে-লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
— “আর কী হয়েছে আমাদের মধ্যে?"
অভ্র ভীষণ গম্ভীর মুখ করে তার দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে ধীরে ধীরে বলল,
— “এ টু জেড সব হয়েছে।”
রাহার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— “নাআআআআআআ!”
অভ্র সঙ্গে সঙ্গে সমান জোরে উত্তর দিল,
— “হ্যাঁএএএএএ!”
— “মিথ্যা!”
— “সত্যি!”
— “আমি বিশ্বাস করি না!”
— “তাহলে প্রমাণ দেখাব?”
— “প্রমাণ?!”
— “হুম, তবে দেখানোর পর আবার অজ্ঞান হয়ে যাস না যেন!”
বাকিকথাটুকু রাহার গলায় আটকে গেল।
অভ্র নির্বিকার চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে গম্ভীর স্বরে বলল,
— "বাড়ি থেকে পালানোর সময় যে সাহস দেখিয়েছিলি, সেই সাহস এখন কোথায় গেল?দেয়াল টপকানোর সময় কি একবারও মনে হয়নি আমি তোকে খুঁজে বের করব?"
অভ্র ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সরাসরি গিয়ে পড়ল রাহার চোখের উপর।
— "শুনে রাখ। পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও যদি লুকিয়ে থাকিস, তবুও তোকে খুঁজে বের করার ক্ষমতা আমার আছে।পালিয়ে বাঁচার সুযোগ তুই সেদিনই হারিয়েছিস, যেদিন আমার ভাগ্যে নিজের নাম লিখেছিস।"
রাহা কিছুক্ষন চুপ থেকে বলা শুরু করতে
দেখুন,
সব তো দেখেই ফেলেছিস। এখন আর কী দেখাবি, জান?
— “আআআআ! ভাইয়া, একদম চুপ করুন!
রাহার চিৎকারে পুরো রুম কেঁপে উঠল।
অভ্র বিরক্ত ভঙ্গিতে তেড়ে এসে বলল,
— “এই বান্দি! কী বললি তুই? এক নিমিষেই মুডের সর্বনাশ করে দিলি!”
তারপর ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে বলল,
— “যাক, এবার আসল কথায় আসা যাক...”
রাহা কৌতূহল আর অস্বস্তি মেশানো দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।ঠিক তখনই সে দেখতে পেল, অভ্র ধীরে ধীরে ড্রয়ারের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটি ধারালো চাপাতি বের করছে।
মুহূর্তেই রাহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেলো। একের পর এক ঢোক গিলছে সে, আর বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে সেই চকচকে ধারাল অস্ত্রটির দিকে।
অভ্র চাপাতিটার ফলার ওপর আঙুল বুলিয়ে অদ্ভুত এক হাসি হাসল। সেই হাসিতে ছিল শীতলতা, ছিল অজানা কোনো ইঙ্গিত।
তারপর ধীরে ধীরে ঘাড় কাত করে বিছানায় বসে থাকা রাহার দিকে তাকাল।চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই দুর্বোধ্য, গা ছমছমে হাসি ।
রাহার মনে হলো বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দন বুঝি কান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।মুখের রক্ত যেন মুহূর্তেই উধাও।মস্তিষ্কে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
এই লোকটা চাপাতি নিয়ে কী করতে যাচ্ছে?
এই মুহূর্তে অভ্রকে আর আগের মতো লাগছে না।
তাকে ভয়ংকর, অপ্রত্যাশিত বা বিপজ্জনক লাগছে। অভ্রকে এমন এক রহস্যময় ও অস্বস্তিকর উপস্থিতির মানুষ বলে মনে হচ্ছে, যার পরবর্তী পদক্ষেপ আন্দাজ করাই অসম্ভব।
আর সেই অজানাই রাহার ভয়কে কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলছে।
তারপর অভ্র ধীর পায়ে এগিয়ে এল বিছানার দিকে।চাপাতিটা এখনও তার হাতে, তবে তার মুখে সেই একই রহস্যময় হাসি।
রাহা ভয়ে বিছানার এক কোণে সরে গেল।
— “অ... অভ্র ভাই...”
কাঁপা কাঁপা গলায় নামটা উচ্চারণ করতেই গলা দিয়ে মনে হলো কথা বের হচ্ছে না এমন ভাবে শুকিয়ে আছে।
অভ্র কোনো উত্তর দিল না।
নিঃশব্দে কয়েক সেকেন্ড রাহার দিকে তাকিয়ে রইল।সেই দৃষ্টি যেন রাহার বুকের ভেতর পর্যন্ত ভেদ করে যাচ্ছে।রাহার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
মনে হচ্ছে বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা এত জোরে ধুকপুক করছে যে পুরো রুম শুনতে পাচ্ছে।
অভ্র হঠাৎ চাপাতিটা উঁচু করতেই রাহা চোখ বন্ধ করে ফেলল
— “আল্লাহ...!”
কিন্তু পরক্ষণেই—
ঠাস!
একটা শব্দ হলো।
রাহা কাঁপতে কাঁপতে চোখ খুলে দেখল, অভ্র তার পাশের টেবিলের ওপর রাখা মাঝারি সাইজের একটা তরমুজ দুই টুকরো করে ফেলেছে।
রুমে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর অভ্র ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— “দেখলি? ধার ঠিক আছে কিনা চেক করছিলাম।”
রাহা কয়েক মুহূর্ত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।বুক চেপে বসে আছে, নিজের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস ফেরানোর চেষ্টা করছে।রাগ, ভয় আর স্বস্তি—তিনটেই একসাথে কাজ করছে তার ভেতরে।
অভ্র নির্ভার ভঙ্গিতে চাপাতিটা তুলে রাহার সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে। চাপাতিটা হাতে নিয়ে বারবার এদিক-ওদিক ঘুরাতে থাকে—ধাতব শীতলতা যেন রুমের বাতাসকেও জমিয়ে দিচ্ছে।সে ক্রমশ রাহার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে—ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, ঠান্ডা হাসি স্থির হয়ে আছে।
আর রাহার পুরো শরীর যেন আতঙ্কে দ্বিগুণ কাঁপতে শুরু করেছে।মনে হাজারো অন্ধকার চিন্তা ভিড় করছে—“আজই কি তবে তার জীবনের শেষ দিন?”
অভ্র কি সত্যিই তাকে শেষ করে দেবে?
রাহা বুঝে যায়… এটা তার জন্যই আনা হয়েছে।
তাহলে কি সত্যিই আজই তার শেষ লেখা হয়ে যাবে?এভাবে? কোনো সুন্দর সমাপ্তি ছাড়াই?
এই বিভ্রান্তি, ভয় আর ভাঙা চিন্তার মাঝেই অভ্র ধীর, দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে—
“এটা দিয়ে মরার চেয়ে সহজ আর কিছু নেই জানিস?.বিশ্বাস কর, একটুও কষ্ট দেব না তোকে।”
সে সামান্য ঝুঁকে আসে, কণ্ঠটা আরও ভারী, আরও নিশ্চিন্ত—
“যতই হোক… তুই আমার একমাত্র বউ।”
“তোকে কি আমি কখনো কষ্ট দিতে পারি বল?”
কথাগুলোতে ভয় নেই, আছে এক অদ্ভুত দখলদারিত্ব আর নিশ্চয়তা—যা রাহার আতঙ্ককে আরও গভীর করে তোলে।অভ্র ভাইয়া, আমাকে মেরে ফেলবেন না প্লিজ…
আবারও “ভাইয়া” ডাকটা কানে যেতেই অভ্র ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকায়।
রাহা দ্রুত বলে ওঠে—
“না না… ভাইয়া না,সাইয়া…
এটা শুনে অভ্রের মুখে এক বক্র হাসি ফুটে ওঠে।
সে ধীরে বলে—
“এই তো… that’s like a good bou.”
অভ্র হালকা মাথা কাত করে, কঠিন হাসি দিল। তারপর ঠান্ডা, কঠিন কণ্ঠে বলে ওঠে—
"আচ্ছা তোর শাস্তি একটু কম করে দিবো
তোকে পুরো মারবোনা।শুধু পা টা কেটে ফেলব।
বাড়ি থেকে পালানোর জন্য যদি আর পা টাই না রাখি। ভালো হবে না??জান।"
কথা বল বল।
আইডিয়া টা দারুণ না
“বাড়ি থেকে পালানোর জন্য এত সাহস? তাহলে এবার শিখতে হবে, কিছু কাজের ফল কী হয়।”
সে একটু থেমে, চোখ নামিয়ে আবার তাকাল রাহার দিকে— “তোর পালানোর অভ্যাসটা এবার থামাতে হবে… নিজের চোখে।”
রাহার গলা শুকিয়ে গেল। “আমি… আমি আর পালাব না… সত্যি বলছি…”
"বাড়ি থেকে পালানোর সময় এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবারও কি ভাবিসনি? ভয় ছিল না?”
তখন তো বুকভরা সাহস নিয়ে সব ছেড়ে চলে গিয়েছিলি। এখন কী হলো? এখন কেন এই শেষ সুযোগ চাইছিস?”
রাহা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে—
“অভ্র ভাই… প্লিজ… আমাকে মেরে ফেলবেন না… এটাই আমার শেষ সুযোগ… এরপর জীবন বা মৃত্যু যাই হোক, আমি আর আপনার কাছ থেকে পালানোর কথা কখনোই বলব না… আমাকে ক্ষমা করে দিন…”
অভ্রের মুখে কোনো কোমলতা এল না, শুধু ধীর গলায় বলল," তোর জন্য শাস্তি মঞ্জুর হয়ে গেছে পাখি"
ভাইয়া প্লিজ..
"কেন রে বান্দি? বাসা থেকে এই পা দিয়ে বের হওয়ার সময় মনে ছিল না? জানের ভয় ছিল না?
তখন তো বুক ভরা সাহস নিয়ে সবকিছু ফেলে চলে এসেছিস। এখন কী হলো? এখন কেন শেষ সুযোগ চাইছিস?
অভ্রর কথা শুনে
“এ এ এ…” করে কাঁদতে কাঁদতে অভ্রের হাতে-পায়ে পড়ছে।
--"বিশ্বাস করুন, এই শেষ। আমাকে লুলা করে রাখবেন না। আমি এভাবে বাঁচতে পারবো না।"
--"তো কি হয়েছে? তোর এই অবস্থায় আমার কোনো সমস্যা নেই। তোর পা দিয়ে আমি কি করবো? বাকি সব তো ঠিক আছে।"
“আগেই তো ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম, কথা কেনো মগজে ঢোকেনি? অভ্রের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও কোন সাহসে বাড়ির বাইরে পা দিলি?
এটার শাস্তি তো তোকে পেতেই হবে, জান।”
আফসোসের সুরে “চু চু চু” আওয়াজ করেই—
ধাম করে পায়ের গোড়ালিতে বসিয়ে দিলো এক কোপ ।
আর রাহা তো ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো…
মা..........
·
·
·
চলবে……………………………………………………