মাআআআআআ!
শিফা ঘরে পা রাখতেই রাহার হৃদয়বিদারক চিৎকারে তার হাতে থাকা চায়ের কাপ-পিরিচ ঝনঝন শব্দে মেঝেতে আছড়ে পড়ল।
রাহা ধড়মড় করে উঠে বসে হাঁপাতে লাগল। বুকটা যেন প্রচণ্ড বেগে ওঠানামা করছে। সকাল সকাল ঘামে একেবারে ভিজে একাকার অবস্থা। সিলিং ফ্যান পূর্ণ গতিতে ঘুরছে, তবুও কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরে পড়ছে। কপালের উপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা ছোট ছোট চুলগুলো ঘামে ভিজে ত্বকের সঙ্গে সেঁটে গেছে। মনে হচ্ছে যেন কোনো ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের বিভীষিকা এখনো তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আতঙ্কে তার মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে গেছে, চোখ দুটো ভয়ে অস্বাভাবিক রকমের বিস্ফারিত।শ্বাস নিতে গিয়েও কষ্ট হচ্ছে তার, পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। ভয়ের রেশ এতটাই প্রবল যে বাস্তবে ফিরে এসেও সে বুঝে উঠতে পারছে না—সে এখনও সেই দুঃস্বপ্নের মধ্যেই আছে, নাকি সত্যিই জেগে উঠেছে।
শিফা এক মুহূর্তও দেরি না করে ছুটে এসে রাহার পাশে বসল।
— কিরে, এভাবে চিৎকার দিলি কেন? কী হয়েছে? আর এত হাঁপাচ্ছিস কেন?
রাহা তড়িঘড়ি করে ব্ল্যাঙ্কেটটা সরিয়ে নিজের পায়ের দিকে তাকাল। পা দুটো সম্পূর্ণ অক্ষত দেখে সে গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বুকের ওপর চেপে বসে থাকা বিশাল এক পাথর যেন মুহূর্তেই নেমে গেল।
রাহার এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে শিফা কপাল কুঁচকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
— কিরে বনু, কী হয়েছে তোর? এমন ভয়ার্ত হয়ে আছিস কেন? কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছিস নাকি?
রাহা কপালে হাত রেখে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ফেলল। তার বুক এখনো দ্রুত ওঠানামা করছে, কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘামের ফোঁটা।
— ওহ শিট! কী ভয়ঙ্কর স্বপ্ন ছিল এটা! আল্লাহ...!
শিফা ভ্রু কুঁচকে রাহার দিকে তাকাল।হয়তো কোনো বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন দেখেছিস। নইলে ঘুমের মধ্যে এমন আতঙ্কে চিৎকার করে কে ওঠে? এই নে, একটু পানি খা।
রাহা পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে অর্ধেকটা খেয়ে ফেলল। তারপর কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে বসে থেকে ধীর কণ্ঠে বলল,
— হুম... দুঃস্বপ্নই ছিল। তবে দুঃস্বপ্ন বললেও কম বলা হবে। মনে হচ্ছিল একেবারে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।
তার কণ্ঠে এখনো স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ।
শিফা আরও কাছে সরে এসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
— এতটাই ভয়ংকর ছিল নাকি?
রাহা ফ্যাকাশে হেসে মাথা নাড়ল।
— ভয়ংকর না, একদম বিভীষিকাময় ছিল। আর তোমার ওই কুস্তির কথাটা? বিশ্বাস কর, স্বপ্নের মধ্যে যা করেছি, তাতে কুস্তিগীররাও লজ্জা পাবে!
কথাটা বলেই সে নিজের কপালের ঘাম মুছে নিল।
শিফা এবার একটু হেসে ফেলল।
— এহ্! বুঝেছি। নিশ্চয়ই আবার কারও সঙ্গে যুদ্ধ করতে নেমেছিলি। ছোটবেলা থেকে তো তোর স্বভাবই এমন। স্বপ্নেও শান্তি নেই!
রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— যুদ্ধ হলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু যা দেখেছি... উফ্! এখনো মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
শিফা এবার রাহার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
— আচ্ছা, আর ভাবতে হবে না। দেখ, সব ঠিকঠাক আছে। তুই নিজের ঘরেই আছিস, আমরা সবাই আছি। স্বপ্ন যত ভয়ংকরই হোক, ওটা বাস্তব না।
রাহা চারপাশে একবার তাকিয়ে গভীর শ্বাস নিল। সত্যিই, সবকিছু স্বাভাবিক। তবুও বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভারী হয়ে আছে। কারণ সে জানে, ওই স্বপ্নের কিছু দৃশ্য এখনো তার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ভাসছে।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে ধীরে ধীরে বলল,
— আচ্ছা আপু, অভ্র ভাইয়া কোথায়?
শিফার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল, ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— হুম হুম, কী ব্যাপার বনু? কালকে বিয়ে হতে না হতেই আজকে সকাল সকাল খোঁজখবর শুরু করে দিলি নাকি?ব্যাপার কী বল তো?
রাহা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভেংচি দিয়ে বলল,
— এহ্! কচু তোমার ভাইয়ের খোঁজ করব! এত শখ আমার নাই।
শিফা ঠোঁট বাঁকিয়ে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
— এহ্, বুঝি বুঝি।
ছোটবেলা তো আম্মু খাইয়েছে সুজি, তাই এখন কিছু হলেও বুঝি।
রাহা বালিশ ছুঁড়ে মারার ভঙ্গি করতেই শিফা খিলখিল করে হেসে উঠল।
— আচ্ছা শোন, মজা বাদ। ভাইয়া আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে গেছে। কাল থেকেই তো বিয়ের সব অনুষ্ঠান শুরু হবে, তাই বাসায় থাকতেই হবে। তোকে নিয়ে আজই শপিংটা সেরে ফেলতে বলেছে। যা যা লাগবে, সব আজকের মধ্যেই কিনে ফেলতে হবে। কাল থেকে একের পর এক অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেলে আর সময় বের করা কঠিন হয়ে যাবে।
তবে যাওয়ার আগে অন্তত দশবার তোর ঘরের সামনে ঘুরঘুর করেছে ,তুই উঠেছিস কিনা..!
রাহা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— আমার ঘরের সামনে কেন?
— সেটা আমি কী করে জানব? তবে যাওয়ার সময় আমাকে বলে গেছে,
রাহা ঘুম থেকে উঠলে যেন খেয়ে-দেয়ে ওষুধ খায়।তোর নাকি সারারাত জ্বর ছিল।
রাহা কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে মনে মনে বলল,স্বপ্নে মারতে এসে বাস্তবে কেয়ার দেখাচ্ছে। হু....
শিফা একটু থেমে আবার বলল,
— আব্বু আর ছোট আব্বু দু'জন মিলে দাওয়াতের পুরো বিষয়টা সামলাচ্ছেন। এরই মধ্যে বাড়ি সাজানোর লোকজনও চলে এসেছে। সকাল থেকেই সবাই এত ব্যস্ত যে কারও দম ফেলারও ফুরসত নেই।
রাহা চারপাশে তাকিয়ে অবাক গলায় বলল,
— তাই বলি! বাসাটা আজকে এত অস্বাভাবিক শান্ত কেন! সবাই তো দেখি যার যার কাজে ব্যস্ত।
— শুধু ব্যস্ত না, একদম যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি চলছে! আর এই যুদ্ধের মূল নায়িকা এখনো বিছানায় বসে হাই তুলছে।
— আহ্, নাটক করো না তো!
— নাটক আমি করছি, নাকি তুই? সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই প্রথম প্রশ্ন, "অভ্র কোথায়?"
কথাটা বলেই শিফা হাসতে লাগলো। আর রাহা লজ্জা আর বিরক্তিতে পাশের বালিশটা তুলে তার দিকে ছুঁড়ে মারল।
— শিফাআআ আপু! আজকে তোমার খবর আছে!
পুরো ঘরজুড়ে তখন দুই বোনের হাসি-ঠাট্টার শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। বাইরে বিয়ের প্রস্তুতির ব্যস্ততা, আর ভেতরে শুরু হয়ে গেল তাদের চিরচেনা খুনসুটি।
রাহা বিছানা থেকে নামার জন্য এগোতেই বাড়ির দুই দুরন্ত পিচ্চি—আয়রা আর জায়রা—দৌড়ে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
— আপু! আপু! তোমার আর অভ্র ভাইয়ার বিয়ে নিয়ে আমরা যে কতটা এক্সাইটেড, তুমি জানো?
তাদের চোখেমুখে ফুটে থাকা উচ্ছ্বাস আর আনন্দ দেখে রাহার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে স্নেহভরে দুই বোনকে বুকের মাঝে টেনে নিল।
ভুরু নাচিয়ে দুষ্টু গলায় বলল,
— কে বলেছে আমাদের বিয়ে হচ্ছে?
— বাড়ির সবাই বলেছে!
রাহা গম্ভীর মুখ করার ভান করে বলল,
— তাই নাকি? তাহলে আমার সাথে সাথে তোদের দু'জনেরও বিয়ে দিয়ে দেব!
— সত্যি বলছ আপু?
দুই বোনের বিস্ময়ে বড় হয়ে যাওয়া চোখ আর উজ্জ্বল মুখ দেখে রাহা আর শিফা একে অপরের দিকে তাকাল। পরক্ষণেই দু'জন একসাথে হো হো করে হেসে উঠল।
— হ্যাঁ হ্যাঁ, একদম সত্যি!
— ইয়া-হু! আমাদেরও বিয়ে হবে!
আয়রা আর জায়রা খুশিতে লাফিয়ে উঠতেই শিফা হেসে তাদের মাথায় আলতো টোকা দিয়ে বলল,
— আরে পাগলি, আগে বড় তো হও!
তারপর রাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আচ্ছা, এখন আর গল্প না। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়। নাস্তা করে বের হতে হবে। আজ সবাই মিলে শপিংয়ে যাব।
— শপিং...উফফ
রাহা ভুরু কুঁচকে তাকাতেই জায়রা উচ্ছ্বাসে বলে উঠল,
— হ্যাঁ! তোমার বিয়ের শপিং!
— আর অভ্র ভাইয়ারও!
আয়রার কথা শুনে রাহা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— উফ! সকাল সকাল তোরা আবার শুরু করলি?
কিন্তু তার লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠা গাল আর চোখের কোণের চাপা হাসি দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, কথাগুলো শুনে তার মনটা অদ্ভুত এক ভালো লাগায় ভরে উঠেছে।
এদিকে দুই পিচ্চিও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে নাচতে নাচতে নিজেদের রুমের দিকে ছুটে গেল। শপিংয়ের নাম শুনেই যেন তাদের আনন্দের সীমা নেই। আর তাদের কাণ্ড দেখে পুরো বাড়িটাই মুহূর্তে হাসি-আনন্দে মুখর হয়ে উঠল।
— রাহা শিফাকে ডাক দিয়ে বলল
আপু, তোমার ফোনটা দিয়ে যাও না। অবন্তিকা আর সাফাকে কল দেব। ওদেরও খবরটা জানাতে হবে! আর বলব যেন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যায়। আজকে কিন্তু ওদেরও আমাদের সঙ্গে শপিংয়ে যেতে হবে!
শিফা হেসে ফোনটা এগিয়ে দিল।
— নে, কিন্তু বেশি প্যাঁচাল পাড়িস না। ফোনে গল্প করতে করতে যেন দুপুর না করে ফেলিস।
— ওকে আপু!
বলেই রাহা তাড়াতাড়ি তার ক্রাইম পার্টনার অবন্তিকার নাম্বারে কল দিল।
কল রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো গলায় অবন্তিকা বলে উঠল,
— হ্যালো... কে?
— তোর শাশুড়ি!
— ধুর! রাহা তুই? সকাল সকাল জ্বালাতে কল দিয়েছিস কেন?
রাহা দুষ্টু হেসে বলল,
— জ্বালাতে না, সুখবর দিতে কল দিয়েছি।
ঠিক ১০টার মধ্যে সাফাকে নিয়ে বাসায় হাজির হবি। কোনো অজুহাত, কোনো বাহানা—কিছুই শুনব না।অবন্তীকা কে একটি শব্দ বলার সুযোগও না দিয়ে সে কল কেটে দিল। কারণ তাদের সে হাড়ে হাড়ে চেনে। সামান্য কথার সুযোগ পেলেই না যাওয়ার পক্ষে একগাদা অজুহাত আর নাটকীয় যুক্তি সাজিয়ে ফেলবে।
তবে আজ তাদের না আসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এমনিতেও দুজনেরই রাহার কাছে আসার পরিকল্পনা ছিল। গতকাল ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর পর থেকে তারা দুজনেই ভীষণ উদ্বিগ্ন আর অস্থির হয়ে ছিল। তাই রাহার ফোন পেয়েই আর দ্বিতীয়বার ভাবার সুযোগ পেল না। এখন শুধু সময়মতো পৌঁছানোর প্রস্তুতিই বাকি।
কথা শেষ করে রাহা বিছানা থেকে নামতে উদ্যত হতেই আচমকা সকালের সেই বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের স্মৃতি আবারও তার মস্তিষ্কে ঝলসে উঠল।
মুহূর্তেই তার পদক্ষেপ থমকে গেল।
ধীরে ধীরে সে নিজের দুই পায়ের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে পা দুটো নাড়িয়ে দেখে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল সে। তারপর বিড়বিড় করে বলল,
— উফ্! স্বপ্নেই যথেষ্ট শিক্ষা হয়ে গেছে… বাস্তবে আর সেই অভিজ্ঞতার দরকার নেই।
একবার চোখ বন্ধ করে কপালে হাত বুলিয়ে আবারও নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল সে। ধীরে ধীরে বলে উঠল,
দুঃস্বপ্নটা যেন এখনো মাথার ভেতর ঘুরছে… মনে হচ্ছে দৃশ্যগুলো এখনও চোখের সামনে ভাসছে। ধুর রাহা! যা দেখেছিস, সেটা স্বপ্ন ছিল, বাস্তব না। এসব নিয়ে ভাবলে সারাটা দিনই নষ্ট হয়ে যাবে।
—————
আজ শপিংয়ের জন্য বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা। অবশ্য অন্য কোথাও নয়, রাহার চাচ্চুর নিজের বিশাল শপিং মলেই যাবে সবাই। বিয়ের কেনাকাটার জন্য সেখানে আগেই সব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। বাড়ির প্রতিটি মানুষ এখন উৎসবের আমেজে ডুবে আছে। চারদিকে শুধু বিয়ের প্রস্তুতি আর আনন্দের ব্যস্ততা।
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে ভেসে এলো আয়রা আর জায়রার চিৎকার—
— আপু! তাড়াতাড়ি আসো! আমরা রেডি!
— আপু, দেখো না! আমি আগে রেডি হয়েছি!
— মিথ্যা কথা! আমি আগে হয়েছি!
দুই বোনের তর্ক শুনে শিফা আর রাহা দুজনেই হেসে উঠল।
শিফা মাথা নেড়ে বলল, — আল্লাহ বাঁচাক! বিয়ে তোদের হচ্ছে নাকি ওদের হচ্ছে, সেটাই বুঝতে পারছি না।
রাহা হেসে বলল, — আমার মনে হয় ওরা দুজন আমার চেয়েও বেশি এক্সাইটেড।
নিচ থেকে আবার আম্মুর ডাক এলো, — সবাই তাড়াতাড়ি নিচে আয়! নাস্তা করে বের হতে হবে। আজ অনেক কেনাকাটা বাকি।
বিয়ের আর মাত্র কয়েকটা দিন। তাই সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।রাহা গভীর একটা শ্বাস নিল। চারপাশে এত মানুষের ভালোবাসা, এত আনন্দ আর এত ব্যস্ততা দেখে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উষ্ণ অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। আর সেই অধ্যায়ের প্রতিটি মুহূর্তকে ঘিরেই এখন পুরো পরিবার ব্যস্ত, উচ্ছ্বসিত আর আনন্দে মাতোয়ারা।
ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই ,ডাইনিং টেবিলে তখন বাড়িটা যেন একেবারে স্বাভাবিক সকালের ছন্দে ভরে উঠেছে। জানালা দিয়ে নরম রোদ ঢুকে পড়েছে, টেবিলের সাদা কাপড়ের ওপর ছায়া-আলোর খেলা পড়ছে হালকা করে। বাতাসে ভেসে আসছে গরম ভাত, ডাল আর ভাজির মিশ্র সুগন্ধ।
টেবিলের এক পাশে তার বড় আম্মু ব্যস্ত হাতে খাবার সাজাচ্ছিল। মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছিল, কেউ দেরি করছে কি না। তার মুখে একধরনের প্রশান্তি। রাহাকে দেখেই,
আয় মা তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। সবার শেষ শুধু তুই বাকি।
রাহা হাসি মুখে এগিয়ে গেলো..সবাই খুশি দেখে রাহার অনেক শান্তি লাগছে।
—————
চড়ের শব্দটা যেন পুরো জায়গাটাকেই থমকে দিল।
বাঁধনকে অভ্রের কাছ থেকে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে রাহা সজোরে তার গালে এক চড় বসিয়ে দিল।
এক মুহূর্তের জন্য বাঁধন নিজের গালে হাত দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে অবিশ্বাস, অপমান আর হঠাৎ ধাক্কার মতো বিস্ময়। অভ্রও পাশে দাঁড়িয়ে ছিল—তার চোখে তখনো ঠিক কী ঘটছে সেটা বোঝার চেষ্টা।
রাহার বুকটা ওঠানামা করছে দ্রুত, কিন্তু তার দৃষ্টি একটুও কাঁপছে না। যেন বহুদিন জমে থাকা একটা সীমারেখা আজ হঠাৎ করে টেনে দিল সে।
বলতে লাগলো,
— তোর সাহস কতটা বেড়েছে যে আমার স্বামীর গায়ে হাত দিস? একটুও লজ্জা-শরম নেই তোর? জানিস না উনি বিবাহিত? নিজের সীমা কোথায়, সেটা ভুলে গেছিস নাকি? আর একবার উনার দিকে ওই দৃষ্টিতে তাকাস, চোখ তুলে নিতে বাধ্য হব।
বিয়ের আগে তোর এসব ঢলাঢলি, আদিখ্যেতা আর বাড়াবাড়ি দেখেও আমি মুখ খুলিনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা। উনি এখন আমার স্বামী, আমার জীবনসঙ্গী, আমার অধিকার।
রাহা এক পা এগিয়ে গিয়ে কঠিন স্বরে বলল,
— ভালো করে কান খুলে শুনে রাখ। উনি এখন একান্তই আমার। আমার উপস্থিতিতে তো দূরের কথা, আমার অনুপস্থিতিতেও উনার প্রতি কারও লোলুপ দৃষ্টি, অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা কিংবা সীমালঙ্ঘন আমি বিন্দুমাত্র সহ্য করব না।নিজের সীমারেখা চিনে চল। কারণ আমার ধৈর্যকে দুর্বলতা ভাবার ভুল করিস না। আমার স্বামীকে নিয়ে কোনো রকম বাড়াবাড়ি করলে তার জবাব আমি এমনভাবে দেব, যা তুই সারাজীবন মনে রাখবি।
অভ্রের তো রীতিমতো অবস্থা খারাপ। আগে যদি একবারও আন্দাজ করতে পারত যে বিয়ের পর তার শান্ত-শিষ্ট পিচ্চি বউটা এমন আগুনঝরা শেরনীতে পরিণত হবে, তাহলে হয়তো হাজারটা কৌশল, ফন্দি-ফিকির আর জেদ খাটিয়ে অনেক আগেই কট দিয়ে সবার সামনে বিয়েটা সেরে ফেলত।ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে সে পুরো দৃশ্যটা উপভোগ করছে।
আজ তার ছোট আব্বুর শপিংমলের রেস্টুরেন্টের ভেতর একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল অভ্র। তাই পুরো জায়গাটা কার্যত ফাঁকাই রেখেছিল।কিন্তু হঠাৎ করে মেয়েটি কোত্থেকে এসে অভ্র কে কথা নেই বার্তা নেই এসে জড়িয়ে ধরেছে।
আর কিছু বলার আগেই তো মেয়েটির গালে এসে পড়ল এক দাবাং মার্কা চর।
জারিফ সামনে এগিয়ে আসতেই অভ্র দুই আঙুলের হালকা ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল।তারপর টেবিলের গায়ে হেলান দিয়ে, বুকের ওপর দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি, চোখে মুগ্ধতা।সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের বউয়ের তেজি রূপটা সে একদৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে।রাহার এই অধিকারবোধ, এই আগুনে মেজাজ, এই উন্মত্ত রাগ—সবকিছুই তাকে অদ্ভুতভাবে আকৃষ্ট করছে।
মনে হচ্ছে প্রতিবার নতুন করে, আরও গভীরভাবে সে এই মেয়েটার প্রেমে পড়ছে।
অভ্র মনে মনে হেসে উঠল,
— হায় আল্লাহ! এই দেড় ফুটের ঝড়টার মধ্যে এত তেজ, এত দাপট, এত কর্তৃত্ব লুকিয়ে ছিল কে জানত!
যখন রেগে যায়, তখন মনে হয় পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে একাই যুদ্ধ ঘোষণা করে দিতে পারে।
আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, অভ্র সেই রূপটাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
তার চোখে এখন রাহা কোনো সাধারণ মেয়ে নয়; সে যেন নিজের অধিকার রক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক দুর্ধর্ষ শেরনী, যার গর্জনে আশপাশের সবাই থমকে যেতে বাধ্য।
আর অভ্র?
সে তো সেই শেরনীর প্রেমে বারবার, নির্দ্বিধায়, নিঃশর্তভাবে ডুবে যাচ্ছে। বারবার হেরে গিয়েও একই মেয়ের কাছেই নিজেকে সঁপে দিতে ইচ্ছে করছে।
বাঁধন হঠাৎই চোখ রাঙিয়ে সামনে দাঁড়ানো রাহার দিকে এগিয়ে এসে গর্জে উঠল—
“হাউ ডেয়ার ইউ! ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া হু আই অ্যাম,?
সে এক পা সামনে বাড়িয়ে আরও কঠিন গলায় বলল—
“আই অ্যাম আইরিন রহমান বাঁধন! ডটার অফ আইজাক রহমান করিম! ডু ইউ ইভেন নো হু ইউ’আর টকিং টু?”
তারপর দাঁত চেপে তীক্ষ্ণ স্বরে যোগ করল—
ওয়েয়ার ডিড ইউ গেট দ্য কারেজ টু স্ল্যাপ মি?
(আমাকে থাপ্পড় দেওয়ার সাহস কথায় পেলে?)
রাহা পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গিতে ওকে একবার দেখে বলল—
“I’m not interested in you. তোর বাবা আইজাক নাকি হাইজাক—এগুলো আমার দেখার বিষয় না। তুই কে, আর তোর কী পরিচয়—সেটা তোর কাছেই রাখ।”
বলেই সে একদম নির্লিপ্তভাবে হাত তুলে মিডল ফিঙ্গার দেখাল…
বাঁধন রেগে হাত তুলে,রাহার গায়ে আঘাত করার আগেই অভ্র তীব্র গতিতে পাশে থাকা গ্লাসটা তুলে এক ঝটকায় ছুঁড়ে মারে। মুহূর্তেই সেটা বাঁধনের হাতে গিয়ে লাগে, আর সে ব্যথায় হাত সহ কিছুটা দূরে ছিটকে যায়।
অভ্র ধীর কিন্তু ভয়ংকর ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে,
—ডোন্ট ইউ ফাকিং ডেয়ার টাচ হার।দিস ইজ দ্য ফার্স্ট অ্যান্ড দ্য লাস্ট ওয়ার্নিং।
চোখ সরাসরি বাঁধনের দিকে রেখে সে চাপা রাগে যোগ করে—
আই উইল নট টলারেট দিস শিট। নট ইভেন ফর
আ সেকেন্ড।
তার কণ্ঠ আরও নিচু, কিন্তু ভয়ংকর দৃঢ়তায় শেষ হয়—
তার দিকে হাত তোলার চিন্তাটাও যদি আবার মাথায় আসে… তার পরিণতি তুমি কল্পনাও করতে পারবি না।
রাহাকে এক ঝটকায় নিজের খুব কাছে টেনে এনে, কণ্ঠে কঠিন দৃঢ়তা মিশিয়ে অভ্র বলে উঠে
--মিসেস অভ্রের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহসও আমি সহ্য করবো না। কেউ যদি সেই সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করে, তার পরিণতি হবে নিদারুণ, নির্মম ।
বাঁধনের চোখের কোণে পানি চিকচিক করলেও সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলে উঠে—
“ আই লাইক ইট, বেবি।”।
এতে যেন রাহা আরও রেগে যায়, কিন্তু অভ্রের কথার ভেতরের অদ্ভুত শান্ত টান তাকে ভেতর থেকে নরম করে দেয়। সেই টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে রাহা ধীরে ধীরে অভ্রের হাতের নিচ দিয়ে গলে এসে এমনভাবে দাঁড়াল—যেন নিখুঁতভাবে গড়া এক কাপল শ্যাডো, পাশাপাশি, একেবারে নিখুঁত সামঞ্জস্যে।
বাঁধন মুষ্টিবদ্ধ হাত শক্ত করে সামনে এগিয়ে এসে দাঁত চেপে বলে উঠে,
—তোমাকে আমি নিজের করে নেবই, অভ্র… যে কোনো মূল্যে, যেভাবেই হোক।তুমি শেষ পর্যন্ত আমার কাছেই আসতে বাধ্য হবে—এটা মাথায় গেঁথে রাখো।
তার কণ্ঠে জেদ আর আগুনের মতো দৃঢ়তা।
চোখ সরু করে সে আরও এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে
—আমি আইরিন রহমান বাঁধন… আমার ইচ্ছা, আমার নিয়ম, আমার জেদ—এই তিনের সামনে তুমি কখনোই জিততে পারবে না।”
এক মুহূর্ত থেমে, ঠান্ডা হাসি দিয়ে সে শেষ করে
-এই বন্ধনে তুমি বাঁধা পড়বেই, অভ্র… এটা অবধারিত।
অ্যাট এনি কস্ট, আই ওয়ান্ট ইউ।
রাহা মুখটা কুঁচকে, বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল—
“তোর ওই বালের বন্ধন তুই তোর কাছেই রাখ, শালি।”
বলেই সে কিছুটা ভারসাম্য হারিয়ে অভ্রের দিকে হেলে পড়ে…
বাঁধনের চোখের সামনেই রাহা ইচ্ছে করেই একটু ভারসাম্য হারানোর ভান করে অভ্রের দিকে হেলে পড়ল।
“আআহ্…” — বলে সে ইচ্ছাকৃতভাবে আরও একটু ঢলে গেল।
অভ্র প্রথমে বুঝে উঠতে পারল না, কিন্তু পর মুহূর্তেই রিফ্লেক্সে তাকে কোলে তুলে নিল। রাহা ঠিক তখনই ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল—মুখে একধরনের জেতা হাসি। জিভ বের করে একটা ভেংচি কেটে আবারও অভ্রের গলা জড়িয়ে ধরলো।
বাঁধন দাঁতে দাঁত চেপে সামনে দাঁড়িয়ে রইল, রাগটা স্পষ্ট চোখে ফুটে উঠেছে।
তাদের সবার সামনে দিয়ে অভ্র রাহাকে কোলে নিয়েই বাইরে বেরিয়ে এলো।
—————
বাহিরে আসতেই
রাহা ছটফট করে বলল,
— নামিয়ে দিন।
অভ্র নির্বিকার গলায় বলল,
— কেন?
— মানুষ দেখছে।
— মানুষ তো সূর্যগ্রহণও দেখে, তাই বলে কি সূর্য লুকিয়ে যায়?
— কীসব আজাইরা কথা বলছেন!
— আজাইরা না, বৈজ্ঞানিক কথা।
— প্লিজ, নামিয়ে দিন। আমার লজ্জা করছে।
— না।
— কেন?
— একবার উঠিয়েছি, এখন নামালে আমার সম্মান চলে যাবে।তখন মনে ছিল না?
— কোলে নেওয়ার সাথে সম্মানের কী সম্পর্ক?
— অনেক সম্পর্ক। সবাই ভাববে, আমি আমার বউকে সামলাতে পারি না।
— আমি আপনার বউ না!
— আচ্ছা, হবু বউ।
— তাও না!
— ঠিক আছে, ভবিষ্যৎ বউ আর আমার বাচ্চার মা।
রাহা লজ্জায় বিরক্ত হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাতেই অভ্র হেসে ফেলল।
— এভাবে তাকাস না। তোর এই লুকটা খুবই বিপজ্জনক।
— নামাবেন?
— না।
— আমি লাফ দিয়ে নেমে যাব।
— নাম, দেখি।
— সত্যি নামব!
— নামলে আবার কোলে তুলে নেব।
— অভ্র ভাইয়া!
— জ্বি, মিসেস অভ্র?
— এখন কিন্তু মাথা ফাটিয়ে দেব।
– তাও মঞ্জুর জান।
তাদের দু'জনের খুনসুটিভরা কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ সামনে তাকিয়ে রাহার বুক ধক করে উঠল। বাড়ির সব মেয়েরা একদৃষ্টিতে হাঁ করে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। আর একটু দূরে বাড়ির গিন্নিরা রয়েছে।
রাহা কপালে হাত ঠুকে বিরক্ত মুখে বলল, — ধুর! নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলাম। কে বলেছিল এই খাটাসটার কোলে উঠতে? এখন তো দেখি নামানোর বদলে আরও শক্ত করে ধরে বসে আছে!
লজ্জায় তার কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে।
— অভ্র ভাইয়া, প্লিজ! সবাই দেখছে...
কিন্তু অভ্র যেন উল্টো আরও উৎসাহ পেল। ইচ্ছে করেই রাহাকে নিজের বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল।
তারপর চারপাশে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় ঘোষণা দিল,
— এই! সবার চোখ নিচে। কেউ তাকাবি না!
তার কথা শুনে সবাই চোখ নিচু করে সরে পড়ল।
রাহা অসহায় চোখে সামনে তাকিয়েই দেখল—তার মা, বড় আম্মু আর ছোট আম্মু ধীর পায়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছেন।
মুহূর্তেই তার প্রাণ ওষ্ঠাগত অবস্থা।
— প্লিজ অভ্র ভাইয়া, নামান আমাকে! আম্মুরা এদিকে চলে আসছে।
অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
— নামাব... তবে একটা শর্তে।
— আপনার হাজারটা শর্তেও রাজি আছি! আগে নামান আমাকে!
অভ্র সন্দেহভরা দৃষ্টিতে ভ্রু তুলল।
— ভেবে বলছিস তো?
— হ্যাঁ! একশোবার ভেবে বলছি! এখন নামান!
অভ্রের ঠোঁটের কোণে সঙ্গে সঙ্গে এক রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
— ঠিক আছে, পরে কিন্তু কথা থেকে সরে আসতে পারবি না। রাতে দেখা হচ্ছে তাহলে একান্তে..
কথাটা বলেই অবশেষে তাকে নামিয়ে দিল।
– আচ্ছা আচ্ছা।
মাটিতে পা রাখতেই রাহা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।অভ্রের শেষ কথাটি খেয়ালই করলো না।
রাহার মনে হচ্ছিল, অল্পের জন্য বিশাল এক বিপর্যয় থেকে বেঁচে গেছে।কারণ আর কয়েক সেকেন্ড দেরি হলেই বাড়ির বড়দের সামনে যে কী পরিমাণ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো, সেটা কল্পনা করতেই তার গাল দুটো আবার লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………