নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - পর্ব ০৭ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া
--"এই না দুলাভাই মাওয়াতে গেছে?"

ইসমাত চমকালেও তা মুখে প্রকাশ করল না। ফোনের স্ক্রিনে চেয়েই গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
--"বাপের ঠেডানি খেয়েছে মনে হয়। নয়তো বউকে পিক-ড্রপ করার মতো মানসিকতা এই ছেলের নেই।"

--"কেন, তুমি গাড়ি নিয়ে আসোনি?"

--"নাহ, উবার ডেকেছিলাম৷"

--"তোমার কী মনে হয়, সোজা মাওয়া থেকে এখানে এসেছে? অবশ্য এখান থেকে মাওয়া বেশি দূরের না। আমাদের এই শুটিং লোকেশন থেকে আধঘণ্টার কম সময়ের পথ। "

ইসমাত উদাসীন গলায় বলল,"অসম্ভব না।"

শুটিং সেরে সেলিম এলো। সালাম দিল ইসমাতকে, তখন ইসমাত ছিল যাওয়ার তাড়ায়। বেচারি চা-ও পুরোটা খেতে পারেনি। সাইড টেবিলে অবহেলায় এঁটো কাপটা পড়ে আছে।

 সেলিমের আন্তরিকতায় ইসমাতের দাঁড়াতে হলো। সে হাসি-মুখেই সালামের উত্তর দিল। সেলিম হেসে বলল,"ইফরা বলেছিল আপনি আসবেন। শুটিং প্রায়ই শেষ। আসেন আজ আপত্তি না থাকলে ডিনারে যাই?"

সেলিমের এত সুন্দর প্রস্তাবে ইসমাতের না করার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু তখনই আবারও সাহিদের অধৈর্য মেসেজ এলো, "আপনি দেখছি আজকাল আমার কথাকে অমান্য করতে শিখেছেন ইসমাত। দুই মিনিটের জায়গায় সাত মিনিট হতে চলল। ইজ ইট আ গেম ফর ইউ?"

ইসমাত টের পেল সাহিদ অসম্ভব রেগে আছে। কথাগুলো বেশ ঝাঁঝাল আর ধারালো লাগছে তার কাছে। সাহিদ কখনোই এত বড়োসড়ো মেসেজ টাইপ করে না, নির্ঘাত অঘটন ঘটেছে। মাহফুজ সাহেব কি আবারও এই ছেলেকে রাগিয়ে দিয়েছে নাকি? 

ইসমাত না পেরে সেলিমের দিকে তাকাল। চিন্তাকে আড়াল করে মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তাড়া দেখিয়ে বলল, "এক্সট্রেইমলি সরি সেলিম। আজ তাড়া আছে, আমার এখনই যেতে হবে। অন্য একদিন শিওর! সেদিন ডিনার আমার পক্ষ থেকে, ডিল? বেস্ট অফ লাক। আসি।"

ইসমাত আর এপাশ ওপাশ তাকানোর সুযোগ পেল না। হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে ঠকঠক শব্দে বেরিয়ে গেল। হিল না পরলে হয়তো দৌড় দিত। বোনের এই তাড়া দেখে ইফরা নাক কুঁচকাল। মিনমিন করে আপনমনে আওড়ায়, "জীবনেও বিয়ে করব না।"

ইসমাত রাস্তায় এসে দেখল সাহিদ বাইক ঘেঁষে একপাশে দাঁড়ানো। এক হাত তার প্যান্টের পকেটে আরেক হাতে জলন্ত সিগারেট। সন্ধ্যা নেমেছে অনেক আগেই। ছেলেটার সামনের চুল উষ্কখুষ্ক, চোয়াল শক্ত। ইসমাত দ্রুত পায়ে সাহিদের দিকে এগোলো। এতক্ষণে সাহিদ অসংখ্য মেসেজে তার মোবাইল হ্যাং করে দিয়েছে। অথচ এখন দেখো, এমন ভাবে দাঁড়িয়ে যেন সে কাউকে বিরক্ত করতেই পারে না, উলটো তার আশেপাশে থাকা বাতাসও যেন তার জানের শত্রু। 

ইসমাত কপালের ঘাম মুছে সাহিদের দিকে আগাল। সাহিদ তার দিকে ফেরার আগেই ইসমাত বলল,
--"কী এমন হয়েছে যে চেঁচিয়ে মাথায় উঠেছ? হোয়াট হ্যাপেন্ড?"

সাহিদ গরম চোখে দেখল ইসমাতকে। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
--"সেটা তো আপনারা বলতে পারবেন। হ্যাভ ইউ ফরগ্যাটেন দ্যাট আই ওয়াজ ইন সামহোয়্যার এলস! সেটা আপনার পেয়ারা শ্বশুরকে বলতে পারেননি? সে কেন আমাকে আপনার কাছে আসতে বাধ্য করল? আর ইউ আ কিড? নাকি আমি আপনার বডিগার্ড? আপনার এতই যদি দরকার হয় বাবাকে বলে বডিগার্ড রাখেন। হোয়াই ডু ইউ অলয়েজ বোদার মি?"

সাহিদ রাগের মাথায় একপ্রকার চেঁচামেচি করছে। ইসমাত দু'হাত মুঠিবদ্ধ করে, মুখ শক্ত করে সেসব শুনে যাচ্ছে। সাহিদকে প্রচন্ড ফ্রাস্ট্রেটেড লাগছে। যেন এখানে ক'টা লা () শ ফেললে সে ক্ষান্ত হবে। কিন্তু সে তো ধারণাও করতে পারে না, কথার মাধ্যমে সাহিদ কতটা তাকে আ ঘা ত করেছে। সাহিদ চোখ-মুখ শক্ত করে কয়েকবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল, আশপাশের মানুষরা তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সাহিদ নিজ গালে হাতের তালু ঘঁষল, বাইকের কাছ ধরেই একটু হাঁটাহাঁটি করল। শেষমেষ রাগ নিয়ন্ত্রণ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
--"বাইকে উঠুন, আমি সোজা মাওয়া থেকে এসেছি।"

 ইসমাত সাহিদের সাথে লাগল না। সে তাকে এড়িয়ে মুখের সামনে দিয়ে একটা সিএনজি ডাকল। একটা ঠিকানা বলে সোজা উঠে গেল। ঠিকানাটা সাহিদের কান অবধি এলো। এটা তো ইসমাতের ফ্যামিলির এড্রেস। সাহিদ নাক ফুলিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
--"হোয়াট দ্য!"

সাহিদ তার এলোমেলো চুলে হাত গুঁজে মিনমিন করে বলল, "ড্যাম ইট, ইসমাত!"

সাহিদ একাই ফিরে এলো বাড়িতে। বন্ধুদের ফোনকল থেকে শুরু করে কিছুতেই তার মন বসছে না। আজ কথা ছিল মধ্যরাতে ফেরার। বন্ধুরা সবাই বারবিকিউর ব্যবস্থাও করেছিল। কিন্তু বিকাল হতেই মাহফুজ সাহেব কল দিয়ে তার বোঝাময় দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলো। সাহিদ অবাধ্য হতে চাইলে মাহফুজ সাহেব দিলেন এক ধমক, ওতেই সাহিদ রেগেমেগে অস্থির। এটা কি চাকরি নাকি যে ম্যাডামকে রোজ পিক এন্ড ড্রপ করতে হবে? এত ঠ্যাকা নাকি তার?

বাসায় এসে সাহিদ তুচ্ছ নজরে ইসমাতের বদ্ধ ঘরটা দেখল। তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে বলল,
--"বাপের বাড়িই যদি যাবে শুধু শুধু আমাকে ডিস্টার্ব করে কেন? আশ্চর্য!"

বলেই সে রুমে গিয়ে লম্বা এক শাওয়ার নিল। পরপর বসে গেল গেম খেলতে। আপাতত এই গেমই তার সমস্ত রাগ ধুঁয়ে দিতে পারবে। গেম তার ফার্স্ট লাভ বলে কথা। কিন্তু আধঘণ্টাও হয়নি, এর মাঝেই বাবার কল। আড়চোখে মোবাইলের দিকে চেয়ে সাহিদ মাথা আবারও এলোমেলো হয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে চেঁচাল,
--"নট এগেইন!"

কিন্তু কল রিসিভ করে শুনল মায়ের গলা। শাহেলার কণ্ঠস্বর শুনে সাহিদ চেয়েও মুখের ওপর কল কেটে দিতে পারল না।

—————

ইসমাত তার দাদীর খপ্পরে পড়েছে। দাদী মমতাজ তার মুখোমুখি বসা। বৃদ্ধার ভাজ পরা চোখ-মুখ শক্ত। পরনে রূপো কালারের সুতি শাড়ি, হাতে তসবিহ। যেন সবেই এশার নামাজ পড়ে উঠেছেন। নামাজের খিমারটা কাছাকাছি রাখা। বৃদ্ধা এই বয়সে এসেও ভীষণ শক্তপোক্ত, বিচক্ষণ। ওনার চলন-ধরণে একটা রাজকীয় ভাব আছে। শাড়ি থেকে শুরু করে মাথার চুল সবকিছুই ওনার নিজের পছন্দ অনুযায়ী। তার বয়সী মানুষরা মূলত ডাক্তারের কাছে যেতে ভয় পান কিন্তু মমতাজ বেগম বেশ ব্যতিক্রম। তিনি প্রতি মাসে নিজেই তার মেইডকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যান। চেকআপের পর যে রিপোর্ট আসে সেটাও সময় মতো ছবি তুলে দুই নাতনির ফোনে হোয়াট'সঅ্যাপে দিয়ে দেন। ওনার এতকিছুর মধ্যে একটা বদভ্যেস আছে। তিনি প্রচুর ক্যাটক্যাট করেন। এত বেশিই কথা শোনান যে সামনের মানুষটার বিতৃষ্ণা ধরে যায়। এই বিতৃষ্ণা থেকেই তো ইসমাত সাহিদকে বিয়ে করেছে। দাদীর কীর্তি না থাকলে সে কখনোই বিয়ের নামও নিত না। কখনো প্রেমের ধার ঘেঁষা হয়নি তার, বলতে গেলে সুযোগ হয়নি৷ তবুও সে জানে, যদি কখনো সে প্রেমে পড়ত তাহলে তার প্রেমের সবচেয়ে বড়ো ভিলেইনটা এই দাদীই হতেন।

মমতাজ বেগম তসবিহতে চুমু দিয়ে সেটা একপাশে রাখলেন। নড়েচড়ে বসলেন, জিভ যেন প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসমাতকে কড়া কথা শোনানোর। ইসমাতও প্রস্তুতি নিয়েই বসা। ভাবনা অনুযায়ী মমতাজ বেগম এবার মুখ খুললেন। গলার ঝাঁঝই ওনার অন্য রকম।
--"এখানে এসেছ কেন?"

--"আসতে পারি না?"

--"ও বাড়ির কারো পারমিশন নাওনি শুনলাম। হুট করে আসার কারণ কি? তোমার শাশুড়ি কেন আমাকে কল করবে?"

ইসমাত বিরক্ত হয়ে বলল,
--"খবর এ বাড়ি চলেও এসেছে?"

--"আসবে না কেন গর্ধব? তোমাকে বারবার বলেছি সব অদেখা করে থাকবে, কোনো সমস্যা হলেও এ বাড়ির মুখোমুখি হবে না। তুমি মানিয়ে নিবে না তো কে নিবে?"

--"সব সময় আমি কেন মানিয়ে নিব দাদী? আমি কতদিক সামলাব? আমি রোবট? আমার ভালো লাগা, মন্দ লাগা নেই?"

মমতাজ বেগম কিছুটা দমে গেলেন ইসমাতের ক্ষেপে যাওয়া দেখে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
--"আমাদের মেয়ে মানুষের জীবনই এমন, মানিয়ে নিতে নিতেই নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়।"

--"ওসব অসহায় নারীদের জন্য! আমি অসহায় নই।"

এবার দাদী চোখ রাঙালেন,
--"এখানে তুমি অসহায় নয়! সাহিদের মতো ছেলে লাখে একটা!"

ইসমাত তাচ্ছিল্য করে বলল, "হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। লাখে একটা। কিন্তু ভালোর গুণে নয়, মন্দ গুণে। এত বড়ো হয়েছে অহমিকা ছাড়া এর মাঝে আর কিছু নেই?"

--"তুমি বড়ো, তোমাকেই ওকে সামলাতে হবে।"

--"আর কত দাদী? বিয়ে যেহেতু দিবেই বড়ো দেখেই দিতে, কেন এই অভদ্রকেই আমার ঘাড়ে ঝুলাতে হলো?"

মমতাজ বেগম আবারও ধমকালেন,
--"এই, তোমাকে আমি এসব শিখিয়েছি? ছোটো হোক বা বড়ো, স্বামীকে কেউ এভাবে বলে বোকা? সময় ফুরিয়ে যায়নি। সাহিদ একদিন ঠিক হয়ে যাবে।"

--"কবে ঠিক হবে, কীভাবে ঠিক হবে?"

--"একটু আগে বললাম না, তুমি সাহিদের বড়ো। ওর অন্যায় আবদার মানতে যাবে কেন? বড়ো হওয়ার ফায়দা তো জানোই। কি বলছি বুঝতে পারছ?"

ইসমাত দাদীর ইশারা-ইঙ্গিত না বোঝার মতো অবুঝ নয়। বিয়ের পর এই প্রথম দাদীর প্রতি তার বিতৃষ্ণা আসছে না। মহিলা খিটখিটে মেজাজের এবং চরম বিরক্তিকর হলেও মাঝেমধ্যে এমন এমন পরামর্শ দিবে, যা খুবই প্রশংসাজনক। ইসমাত থেকে বলল, "ভেবে দেখব।"

কাজের মেয়েটা এসে মমতাজ বেগমকে বলল,
--"ম্যাম, ডিনার রেডি।"

দাদী আড়চোখে নাতনিকে দেখে বলল,
--"আসো, এসেছ যেহেতু খালি মুখে তো ফিরিয়ে দিতে পারি না। কালকে সকালে যেন ফিরে যেতে বলা না লাগে।"

ইসমাত ডাইনিং-এ বসে বলল, "ইফরা আসবে না?"

--"ওর আসতে আসতে রাত দেড়টা দুইটা বাজে। আমি ওকে জানাইনি তুমি এখানে। জানোই তো অল্পতেই কেমন চান্দি গরম করিয়ে ফেলে।"

ইসমাত নীরবে খাওয়া শুরু করল। এতদিন পর নিজের বাড়ির খাবার পেয়ে সে পেট ভরে খেল। ইসমাত খাওয়া শেষে নিজের রুমে চলে গেল। একটু আগেই চেঞ্জ করতে এসেছিল, তখনই দেখেছে তার ঘরটা এখনো আগের মতোই গোছানো। ইসমাত এসি অন করে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। আহ! বাপের বাড়ির আরাম বুঝি এটাকেই বলে। 

কিন্তু এই আরাম বেশিক্ষণ টিকল না তার! এ মাঝে এলো সাহিদের কল। পরপর বাইরে থেকে বাইকের হর্ন। ইসমাত চোখ কপালে তুলে উঠে বসল। ফোনের স্ক্রিনে তো একবার বারান্দার দিকে তাকাল। সাহিদ একের পর এক কল করেই যাচ্ছে। অবশেষে ইসমাত কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে সাহিদ কঠোর গলায় বলল,
--"আমি এসেছি আপনাকে নিতে। কাম ফাস্ট!"

ইসমাতের কথাটা বিশ্বাস হলো না। সে দ্রুত বারান্দায় ছুটল। গিয়ে তার চোখ ছানাবড়া। সত্যিই সাহিদ বাড়ির সামনে বাইকে বসা। ইসমাত মিনমিন করে বলল,
--"যাব না।"

--"নিচে আসুন।"
--"কেন? কি চাই তোমার এখানে? ফিরে যাও। যাব না আমি।"

সাহিদ রাগ নিয়ন্ত্রণ করল,
--"আমি এক কথা সেকেন্ড টাইম রিপিট করা পছন্দ করি না ইসমাত, রাগাবেন না।"

জেদি ইসমাত চুপ রইলো, সে যেন আজ তার কথাতে অনড়। সাহিদ এবার মাথা তুলে বিল্ডিং এর বারান্দায় তাকাল। ইসমাত এক ঝটকায় আড়ালে দাঁড়ায়। সাহিদ অত্যন্ত ভয়াবহ গলায় বলল,
--"আপনি কি চান আমি গিয়ে আপনার নেইবরদের সামনে হাঙ্গামা করি? ডোন্ট ফরগেট, আমি ঝামেলা লাগাতে ওস্তাদ আছি। যদি আপনি আমার ওস্তাদি না দেখতে চান নেমে আসুন!"

--"তুমি ছোটো হয়ে আমাকে হুমকি দিচ্ছ?"

--"সাহিদ হুমকিতে যায় না ইসমাত, সোজা একশন করে। ওয়ানা সি ইট? ওকে, আ'ম কামিং! আপনার ওই ইউজলেস দাদীও খুব এঞ্জয় করবে আমার শো।"

ইসমাত তার ধমকিতে পরোয়া করল না, মুখের ওপর কল কেটে দিল। কিন্তু অপ মান মুখ বুজে সহ্য করার পাত্র যে সাহিদ মুস্তাহাব নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড়ের মতো তাদের এপার্টমেন্ট দরজায় জোরে বিরতিহীন থাবা বসেছে। ওপাশ থেকে সাহিদের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। দাদী আর কাজের মেয়েটা ভড়কে এসে দরজা খুলে। ততক্ষণে ইসমাতও চমকে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে। অন্য ফ্ল্যাটের ভাড়াটেরাও ততক্ষণে ভড়কে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে, কী হয়েছে তা দেখার জন্য। সেসবের দিকে ইশারা করে সাহিদ বাঁকা হেসে বলল,
--"খামাখা সিনক্রিয়েট করালেন। বউ নিতে এসেছি এটা আবার মানুষকে দেখানো লাগছে, সো ডিসেপয়েন্টিং!"

মমতাজ বেগম এতক্ষণ হতভম্ভ হলেও এবার আসল কারণ বুঝতে পারলেন, অন্য ভাড়াটেরাও বিমূঢ়। দাদী হাসার চেষ্টা করে পরিস্থিতি অনুকূলে আনার চেষ্টা করলেন। ইসমাতের দিকে তাকালেন,
--"এইতো দাদুভাই, এসে বসো ভেতরে। চা-নাস্তা.."

সাহিদ ওনার কথায় ফোড়ন কেটে বলল,
--"আপনার নাতনিকে পাঠান, সেই নাহয় আমার বাড়িতে গিয়ে চা-নাস্তা করে দিবে। আমার তাড়া আছে কিনা, গেম মাঝখানে রেখে এসেছি।"

ইসমাত রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তখনই ঘরের জামা চেঞ্জ করে হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। সাহিদের মান-সম্মানের পরোয়া না থাকলেও তার আছে। সে এই মুহূর্তে মান-সম্মান আরও ডোবানোর কোনো মানে হয় না, তাই ইসমাত আর পারল না জেদ দেখাতে। এছাড়া ওর মতো মাথায় সমস্যা ওয়ালা মানুষ এতকিছু বোঝে নাকি? ফাঁকা কলশি একটা। 

মমতাজ বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। এই ছেলে যে কেমন ঝালমরিচ তিনি ছোটো থেকেই জানেন। যাক, ইসমাত চলে গেছে— এই শান্তি। মাঝখান দিয়ে সাহিদ নামের সুপুত্র কত বড়ো তামাশাও করে গেল। নিচে এসে ইসমাত বলল,
--"তোমার এই ইউজলেস বাইকে করে আমি যাব না।"

সাহিদ সে কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল,
--"হিল খুলুন।"

--"হোয়াট??"

--"লাস্ট টাইম আপনার হিল আমার টিমিতে স্ক্র‍্যাচ বসিয়েছিল। আমার টিমির গায়ে একটা আঁচড়ও আমি সহ্য করব না মিসেস ইসমাত।"

সাহিদের প্রিয় বাইকের নাম টিমি। সে টিমি ডাকে তার বাইককে। গেমের পর তার দ্বিতীয় ভালোবাসা হচ্ছে এই টিমি। ইসমাত দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
--"অপমান করবে বলে এনেছ এত হাঙ্গামা করতে?"

সাহিদ তখনও তার হিলের দিকে তাকিয়ে। ইসমাত এবার না পেতে হিল খুলে একহাতে নিয়ে উঠে বসল। মিনমিন করে বলল,
--"বাইকের জন্য যদি এতই দরদ তাহলে বাইককেই বিয়ে করতে? মাঝে দিয়ে আমার জীবন নষ্ট করার মানে কি?"

সাহিদ বাড়ি ফিরতেই ইসমাতকে হুকুম করে বলল,
--"কফি প্লিজ?"

ইসমাতের আগুনে ঘি পড়ল যেন।
--"তোমার সিনিয়র আমি, হুকুম করছ কোন স্পর্ধায়?"

সাহিদ ফ্রিজ থেকে পানির বোতল নিতে নিতে বলল,
--"হু কেয়ার্স? হাইটের দিক থেকে তো আমিই বড়ো, রাইট?"

--"বেশি হচ্ছে!"

--"হুঁ, রাইট। বেশি চিনি দিবেন না কফিতে। আপনার দাদীকে তো বলে এসেছি আপনাকে চা-নাস্তা বানাতে নিয়ে আসছি, নাও ডু ইওর ওয়ার্ক।"

বলেই সাহিদ তড়িঘড়ি করে নিজের ঘরে চলে গেল তার অসম্পূর্ণ খেলা সম্পূর্ণ করতে। ইসমাত ততক্ষণে তার হাতে থাকা হিল অদূরে ছুঁড়ে মা র ল। সব জায়গাতে অশান্তি। ভেবেছিল আজ নিজের ঘরে সুখের ঘুম দিবে, কিন্তু এই বদমায়েশের তার সুখ সহ্য হয় না। ঠিকই অপমান-অপদস্ত করে নিয়ে এলো। ইসমাত দুহাতে নিজের চুলের ফাঁকে আঙুল গুঁজল। নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করল। এই ছেলের যা হাবভাব, ইসমাতের তো তর্ক করার কোর্স নিতে হবে। 

ইসমাত সাহিদকে কফি করে দিল ঠিকই, কিন্তু চিনিতে ভরপুর। সাহিদ চুমুক দিয়ে আবারও সেসব মগেই ফেরত গিয়েছে। সাহিদ দাঁতে দাঁত চেপে মনিটর থেকে নজর সরিয়ে কফির মগে তাকাল। মিনমিন করে আওড়ায়, 
--"ওয়েল প্লেইড, ইসমাত।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp