হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ২৯ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          আয়না! আরেকটা পার্সেল? এটা কী হচ্ছে? তোমার সমস্যা কী বলো তো? মানুষ একবার না করলে কি বুঝতে এত কষ্ট হয়? আমি গত একমাসে কতবার বলেছি, একটু থামো। একটু ধীরে চলো। সবকিছু দেখলেই কিনতে হয় না। তারপরও তোমার একই অবস্থা!

সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে মাহিরের স্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এক হাতে তার অফিস ব্যাগ, অন্য হাতে একটা মাঝারি সাইজের পার্সেল।

সকালে অফিসে যাওয়ার আগে একটা পার্সেল। গত সপ্তাহে তিনটা। তার আগের সপ্তাহে দুইটা। এখন আবার এটা! সত্যি বলছি, তোমার জন্য আলাদা একটা গুদাম ভাড়া নেওয়ার সময় হয়ে গেছে!
রাগে রাগে গজগজ করছে সে৷ নাহ! সহ্যের সীমা পার হয়ে গেছে। আজ একটা এসপার নাহয় ওসপার হবেই।

-তোমার কি জিনিসপত্র না কিনলে ঘুম আসে না? আমি জানতে চাই। কোনো মানুষের এত প্রয়োজন কীভাবে হতে পারে?

চিলেকোঠার দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই সে বলল, না, আজকে আমি কিছু শুনব না। একদম না। আজকে আমাকে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করবে না। কারণ আমি আগে থেকেই বলে রাখছি, আমি কোনো যুক্তি মানছি না।।

ল্যাপটপের সামনে বসে থাকা আয়না মাথা তুলে তাকাল। মুখে তার চাপা হাসি। এই দৃশ্য এখন আর ওর কাছে নতুন না। সে ল্যাপটপ একপাশে সরিয়ে রেখে বলল, কী হয়েছে, বলবে তো?

-কী হয়েছে মানে!

মাহির পার্সেলটা বিছানার উপর ছুড়ে দেওয়ার মতো করে রাখল, এই হয়েছে।

আয়না প্যাকিং বাক্সটার দিকে তাকিয়েই ভেতরের জিনিসটা চিনে ফেলল। তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরো গভীর হলো, ওহ। এসে গেছে?

-ওহ এসে গেছে!
 মাহির অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, ব্যস? এটাই তোমার রিঅ্যাকশন?

-আর কী বলব?

-তুমি বলতে পারতে, সরি মাহির, তুমি ঠিক ছিলে। আমার আসলেই একটু সংযম শেখা উচিত। আর এমন করব না।

-আচ্ছা?

-হ্যাঁ, আচ্ছা।

আয়না এবার ল্যাপটপ পুরো বন্ধ করল। বিছানার ওপর একটু ঝুঁকে বসে বলল, তাহলে খুলে দেখি?

-না, খুলবে না।

-কেন?

*কেন আবার কি! কারণ আমি প্রতিবাদ করছি।

-কিসের প্রতিবাদ?

-এই লাগামহীন পরিস্থিতির প্রতিবাদ।

আয়না শব্দ করে হেসে ফেলল, ইশ! তুমি খুব বাড়িয়ে বলছ।।

-আমি?
 মাহির নিজের বুকে আঙুল ঠেকাল, আমি বাড়িয়ে বলছি!

-জি হ্যাঁ।

আয়না প্যাকেট থেকে নতুন টি-শার্টটা বের করতেই মাহির দুহাত ভাঁজ করে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। তার মুখে বিরক্তির ছাপ, কিন্তু চোখদুটো দেখলে খুব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে রাগ ধরে রাখতে তাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।

আয়না প্রিমিয়াম লিনেনের কাপড়টার ওপর নিজের মোলায়েম হাত বুলিয়ে বলল, দেখো না, কত সুন্দর! ছবিতে ভালো লেগেছিল, কিন্তু সামনাসামনি তো আরও সুন্দর লাগছে।

-অবশ্যই সুন্দর লাগবে। কারণ দামটাও সুন্দর।

-আবার শুরু করলে?

-আমি শুরু করেছি? আয়না, তুমি কি জানো গত তিন মাসে আমার জন্য কতগুলো জিনিস কিনেছ?

আয়না একটু ভুরু কুঁচকে চিন্তা করার ভান করল, খুব বেশি না তো।

-খুব বেশি না!
 মাহির এমনভাবে ওর দিকে তাকাল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অবাস্তব আর অদ্ভুত কথা শুনেছে, গত মাসে ইলিয়েন থেকে দুইটা দামি পাঞ্জাবি কিনলে। ইলিয়েন! কোনো মানে আছে?

-কি হয়েছে তাতে? তুমি নিজে তো পছন্দ হলেও নিতে না।

-কারণ এটা অপচয়!

-হতে পারে। কিন্তু আমার ভালো লাগে তোমার ওপর স্পেন্ড করতে। ইউ ডিজার্ভ অল দ্যা লাক্সারি অফ দা ওয়ার্ল্ড।

মাহির কথার খেই হারিয়ে ফেলে। এই মেয়ের বাকপটুতার সামনে সে বরাবর অসহায়।

-তার আগের মাসে তিনটা অফিস শার্ট। একটা আস্ত টাই সেট। তারপর জুতা। তারপর পারফিউম। তারপর….

সে আঙুল গুনে হিসাব করতে গিয়ে নিজের হাতটা নামিয়ে নিয়ে নিজেই হাল ছেড়ে দিল, আল্লাহ জানেন আর কী কী কিনেছ।

আয়না বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত না হয়ে বলল, তুমি এমন বলছ যেন আমি তোমার বড়সড় কোনো সর্বনাশ করে ফেলেছি।

-সর্বনাশ না, কিন্তু আমার চরম সন্দেহ হচ্ছে তুমি আমাকে কোনো অদ্ভুত পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছ।

-কী পরীক্ষা?

-একজন মানুষকে কতটুকু প্যাম্পার করলে সে অস্বস্তিতে পড়ে, সেটা নিয়ে তুমি বোধহয় ঘরে বসে গবেষণা করছ।

আয়না এবার চোখ দুটো সরু করে হেসে ফেলল। হাসলে মেয়েটার চোখদুটো একটু চিকন হয়ে যায়, নাকের ডগায় এক অদ্ভুত লালিমা ফুটে ওঠে। মাহিরের জীবনের অন্যতম ভীষণ পছন্দের দৃশ্য এটি।

-তুমি এত নাটক করো কেন, মাহির?

-নাটক আমি করছি? 

মাহির এবার দেয়াল ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, আয়না, আমি সিরিয়াস। তুমি যে পরিমাণ টাকা আমার পেছনে খরচ করছ, এটা নরমাল না। তোমার জীবনের নারী সঙ্গের অভাবটা একদম বোঝা যায়। তারা তখন তোমাকে বোঝার তো যে নিজের টাকা এভাবে ওড়াতে হয় না। 

-তাহলে কারটা ওড়াবো? 

-আমারটা! 

-আমারগুলোর কি হবে?

-নিজের জন্য রাখবে।

-তো নিজের জন্যই তো স্পেন্ড করছি। তুমি আমি তো একই, তাই না? আচ্ছা, তাহলে তোমার মতে নরমাল কী?

-নিজের জন্য কিছু কিনবে। নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা রাখবে। সেভিংস করবে। ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য জমাবে।

-আমি সেগুলোও করছি।

-তারপরও।

-তারপরও কী?

-তারপরও আমার খারাপ লাগে, আয়না।

আয়নার শার্ট গোছানোর হাতটা মাঝপথেই একদম থেমে গেল। সে এবার বেশ মন দিয়ে মাহিরের দিকে তাকাল। এই কথাটা সে আগেও কয়েকবার বলেছে। আজও একইভাবে বলছে, ঠিক একই অসহায় আর অনুতপ্ত মুখে।

-খারাপ লাগে কেন?

মাহির কিছুক্ষণ নিঝুম ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে চুপ রইল। তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বসা গলায় খুব নিচু স্বরে বলল, কারণ আমি জানি এই জিনিসগুলো কিনতে তোমাকে কতটা হার্ডওয়ার্ক করতে হয়।

-মাহির….

-না, শুনো।

সে এবার ধপ করে বিছানার কনারে বসে পড়ল। গলার টাইটা টান দিয়ে আলগা করে ফেলেছে। সারাদিন অফিস করার তীব্র ক্লান্তি ওর মুখে স্পষ্ট। 

-আমি জানি তোমাকে রাত জেগে ক্লায়েন্টের ডেডলাইন মেইনটেইন করতে হয়। জানি কতবার ওখান থেকে খিটখিটে মেজাজের রিভিশন আসে। জানি একটা প্রজেক্ট একদম স্ক্র্যাচ থেকে শেষ করতে তুমি ল্যাপটপের সামনে কতটা সময় দাও।

আয়নাও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বুকের ভেতরটা মিষ্টি মায়ায় মুচড়ে উঠল তার। এতটা খেয়াল রাখে মাহির তার! 
সে মাহিরের একদম সামনে এসে দাঁড়াল, আচ্ছা, একটা কথা বলি?

-বলেন ম্যাম।

-তুমি কি সত্যি বুঝতে পারছ না? আমি এগুলো কেন কিনি?

মাহির কোনো উত্তর দিল না। সে জাস্ট চোখ বুজে রইল। আয়না ওর সামনে দাঁড়িয়ে একটু নিচু হয়ে মৃদু হাসল,তুমি আমার জন্য কত কিছু করো, সেগুলোর কোনো হিসাব আছে?

-ওটা আলাদা। আমি পুরুষ, আমার দায়িত্ব…

-আমার কাছেও এটা আলাদা, মাহির।

মাহির মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল৷ নিজের স্ত্রীর এই সরাসরি অকপট স্বীকারোক্তি আর সমর্পণ শুনে ওর নিজেরই একটু আড়ষ্ট আর অস্বস্তি লাগছে। আয়না সেটা দেখে মনে মনে আরও বেশি নরম হয়ে গেল। ও ওর মোলায়েম আঙুল দিয়ে মাহিরের হাতটা একটু ছুঁয়ে বলল, আর তুমি এমনভাবে বলো যেন আমি তোমার জন্য রাজপ্রাসাদ বা হীরার সেট কিনে ফেলেছি।

সে নতুন টি-শার্টটা মাহিরের চোখের সামনে তুলে ধরল, এটা স্রেফ একটা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট।

-এই একটা টি-শার্ট' দিয়েই তো শুরু হয়। তারপর আরেকটা টি-শার্ট আসে।

-হুম।

-তারপর একটা অফিস শার্ট আসে। তারপর একটা জুতা আসে। মানে নিজে কিনলে আমার আরো পাঁচ বছর লাগতো।

-জি কারণ নিজের জন্য কিছু কেনার সময়ই তোমার মনে হয়, না থাক এই টাকাটা অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে।

মাহির হাসল, আর তারপর আমার অবাধ্য স্ত্রী আমার পুরো ওয়ারড্রোব নিজের দখলে নিয়ে নেয়।

আয়না এবার হাসতে হাসতে মাহিরের ঠিক পাশে বিছানায় বসে পড়ল, তোমার ওয়ারড্রোব এমনিতেও বড্ড করুণ আর শোচনীয় ছিল, মাহির আহমেদ।

-আমার ওয়ারড্রোবের বিরুদ্ধে এভাবে বানোয়াট অপপ্রচার কোরো না।

অপপ্রচার না, একদম সত্যি কথা।

 আয়না ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে টিপ্পনী কেটে বলল, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে একই একঘেয়ে রঙের শার্ট-টি-শার্ট পরে আসা মানুষকে আমি ফ্যাশনের বিষয়ে অন্তত বিশ্বাস করি না।

-ওগুলো খুব ভালো আর আরামের শার্ট ছিল।

-ওগুলো জাদুঘরে রাখার বয়সও অনেক আগে পার করে ফেলেছিল।

ঘরের নিঝুম আর আবছা হলুদ আলোয় দুজনে তখন বড্ড নিবিড় হয়ে বসে ছিল। আয়না আর কোনো কথা না বাড়িয়ে হুট করেই এক কদম এগিয়ে এল। মাহির কিছু বুঝে ওঠার বা নিজের ফিনান্সিয়াল লেকচার পুনরায় শুরু করার সুযোগ পাওয়ার আগেই, আয়না এক ঝটকায় মাহিরের গায়ের শার্টটার নিচের অংশ মুঠো করে ধরল।

-কী-কী করছ, আয়না? 
মাহির পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। উচিত না যদিও, এই দিনগুলোতে আয়নার আগ্রাসী ভালোবাসার সাথে ভালোমতো পরিচয় হয়েছে তার। 

-চুপচাপ সোজা হয়ে বসো! খালি বকবক করে! 

 আয়না ধমক না দিয়ে পারলো না। সে কোনো কথা না শুনেই কাপড়টা মাহিরের মাথার ওপর দিয়ে টেনে তুলতে শুরু করল।
এক সেকেন্ড আগে যে পুরুষটা স্ত্রীর টাকা বাঁচানোর মতো সিরিয়াস টপিকে জ্ঞান দিচ্ছিল, পরের সেকেন্ডেই সে আবিষ্কার করল তার স্ত্রী স্রেফ গায়ের জোরে ওর জামা বদলে দিচ্ছে, কারণ নতুন শার্টের ফিটিং দেখার জন্য তার আর এক মিনিটও তর সইছে না! 

পরিস্থিতি মাহিরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। আয়না ওকে বিছানার ওপর আলতো করে চেপে ধরে সোজা করে বসিয়ে দিল, তারপর নতুন লিনেন শার্টটার হাতা আর কলার গলিয়ে দিল ওর চওড়া শরীরে।

পুরো প্রসেসটাতে আয়নার ধ্যান-জ্ঞান ছিল শুধু নিজের কাজে, যেন ও কোনো এক মহৎ মিশন কমপ্লিট করছে। আর মাহির? সে স্রেফ বোকার মতো চোখ বড় বড় করে নিজের স্ত্রীর এই অভূতপূর্ব কাণ্ডকারখানা দেখছিল।

কাজ শেষ হতেই আয়না দুই কদম পিছিয়ে দাঁড়িয়ে বড্ড নিখুঁত নজরে নিজের কাজের ইন্সপেকশন করল। শার্টের ফিটিংটা সত্যি বলতে অসাধারণ হয়েছে। মাহিরের চওড়া কাঁধ আর কাঠামোর সাথে এই কালারটা বড্ড বেশি মানিয়েছে।

তবে এই ধস্তাধস্তির চক্করে মাহিরের ট্রিম করা চুলগুলো পুরো ওলটপালট হয়ে পাখির বাসার মতো বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।
আয়না সহজাত প্রবৃত্তি থেকে ওর আঙুলগুলো খুব আলতো করে মাহিরের এলোমেলো চুলের ভেতর বিলি কেটে ওগুলোকে পেছনের দিকে গুছিয়ে দিতে লাগল, ইউ লুক সো হ্যান্ডসাম! 

বিয়ের শুরুর দিনগুলোতে আয়না নিজের চারপাশে যে আড়ষ্টতার পর্দা ঝুলিয়ে রাখত, তাতে এমন একটা অধিকারবোধের ছোঁয়া কল্পনাও করা যেত না।

সে শুধু স্থির দৃষ্টিতে ওপরের দিকে তাকিয়ে আয়নার মনোযোগে মগ্ন মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মেয়েটার অকপট, উন্মুক্ত ভালোবাসার রূপটা। ও যে নিজের সবটুকু সুরক্ষার দেয়াল ভেঙে মাহিরের সামনে এতখানি সমর্পিত হতে পেরেছে, এটাই মাহিরের জীবনের সবচেয়ে বড় অ্যাচিভমেন্ট।

আয়না ওর চুল গোছানো শেষ করে ওর কলারটা একটু সোজা করে দিয়ে বলল, তুমি সবসময় এই পরিবারের সবার খেয়াল রাখো। সবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছ। নিজের শখ, নিজের আরামের কথা তুমি কখনো চিন্তাই করো না। তাই আমার খুব ইচ্ছে করে, অন্তত এই পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ থাকুক যে স্রেফ তোমার খেয়াল রাখবে। তোমাকে একটু প্যাম্পার করবে, একটু স্পয়েল করবে। এটাকে ভালোবাসা বলে মাহির! বলো তো সে কে?

আয়নার এই সোজাসাপ্টা বয়ানের পর মাহিরের বুকের ভেতরটা এক তীব্র সুখে মুচড়ে উঠল। ও আর কথা বাড়ানোর ভাষা খুঁজে পেল না। সে স্ত্রীকে কাছে টেনে কোলে বসিয়ে কাজের মাধ্যমে আয়নার প্রশ্নের উত্তর দিল। 

—————

মাহিরের বাড়ি ফিরতে সচরাচর বেশ রাত হয়। নতুন অফিসটা বাসা থেকে বেশ দূরে, আর প্রতিদিনের ওই নরকগুলজার ট্র্যাফিক জ্যাম ঠেলে বাড়ি পৌঁছানোটা রীতিমতো এক একটা যুদ্ধের মতো। কিন্তু আজ দিনটা শুরু হয়েছিল আকস্মিক আনন্দের মধ্য দিয়ে। 

অফিসে একটা ইন্টারনাল ইভেন্টের কারণে হুট করেই হাফ-ডে ডিক্লেয়ার করা হয়েছে। মাহির এই কোম্পানিতে নতুন জয়েন করায় আগে থেকে ব্যাপারটা জানত না। হুট করে এই মাঝদুপুরে ছুটির নোটিশ পেয়ে মনটা এক নিমেষে ভালো হয়ে গেল তার।

বাসায় ফেরার পুরোটা পথ জুড়েই ওর মাথায় শুধু একটা চিন্তাই ঘুরছিল,আয়না।
আজকাল কাজের ব্যস্ততায় দুজনে একদমই সময় পায় না। একে অপরের সাথে দুটো শান্তিতে কথা বলা কিংবা একটু নিরিবিলিতে বসার ফুসরত মেলে না। মাহির মনে মনে প্ল্যান সাজাতে লাগল, আজ বিকেল হওয়ার আগেই আয়নাকে নিয়ে কোথাও বের হবে। কোনো একটা ছিমছাম জায়গায় বসে দুজনে এক কাপ চা খাবে, একটু হাঁটবে। আর সবচেয়ে বড় কথা সামনের ঈদের ছুটিতে আয়নাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য সে মনে মনে যে কক্সবাজার ট্যুরের প্ল্যানটা সাজাচ্ছে, সেটা আজই ওকে জানাবে।

এইসব মিষ্টি চিন্তাভাবনা মাথায় নিয়ে যখন সে বাড়ির সদর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। পুরো বাড়িটা তখন একদম নিঝুম। দুপুরের অলসতা ছড়িয়ে আছে চারপাশের বাতাসে। সবাই যার যার ঘরে বিশ্রাম করছে।

মাহিরের চোখ দুটো স্বভাবতই ঘরে আয়নাকে খুঁজল। কিন্তু ও কোথাও নেই।
রান্নাঘরের দিক থেকে শব্দ শোনা মাত্রই কেন যেন মাহিরের বুকের ভেতরটা খচখচ করে উঠল। চাপা অস্বস্তি ওর মাথার রগে গিয়ে ঠেকল।

সে ধীর পায়ে শব্দটা অনুসরণ করে রান্নাঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

আয়না মেঝেতে প্লাস্টিকের টুলের ওপর বসে আছে। ওর সামনে স্তূপ করে রাখা এক পাহাড় শুকনো লাল মরিচ। ও পুরো মনঃসংযোগ ঢেলে দিয়ে শিল-পাটায় সেই মরিচগুলো বেটে পেস্ট বানাচ্ছে।

চারপাশের বাতাসে ঝাঁঝালো মরিচের গুঁড়ো উড়ছে। তীব্র ঝালে আয়নার আঙুলের ডগাগুলো পুরো টকটকে লাল হয়ে আছে, এমনকি এতক্ষণ ধরে বাটতে বাটতে ওর হাতের তালুর অনেকাংশও লালচে হয়ে উঠেছে। চুলের একটা অবাধ্য গোছা ক্লিপ থেকে পিছলে ওর ফর্সা গালে লেপ্টে আছে। ও নিজের কাজে এতটাই মগ্ন যে দরজায় এসে দাঁড়ানো মাহিরের ছায়াটাও ওর চোখে পড়ল না। 

মাহির স্তব্ধ হয়ে বেশ কয়েক সেকেন্ড জাস্ট দাঁড়িয়ে রইল। আর ধীরে ধীরে, ওর বুকের ভেতরের সেই খচখচানিটা একটা তীব্র যন্ত্রণায় রূপ নিতে লাগল।
প্রথমে ও নিজেই বুঝতে পারছিল না ওর ঠিক কোথায় আঘাত লাগছে। 

মাহির এমন একটা সত্য আবিষ্কার করল, যা আসলে গত কয়েক মাস ধরেই ওর চোখের সামনে একদম দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল।
এই বাড়িতে যখনই সে আয়নাকে কোনো ঘরের কাজ করতে দেখেছে, ও সবসময় এই মেনিয়াল আর খাটুনির কাজগুলোই করেছে। সবসময়!

ওকে কখনো মেইন রান্নাটা করতে দেওয়া হয় না, কিংবা আজ কী রান্না হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আলোচনাতেও ও থাকে না। এই সংসারের কোনো বড় বা কর্তৃত্বপূর্ণ বিষয়ে ওর কোনো মতামত চাওয়া হয় না। ও শুধু করে যায় পেছনের ছাইপাঁশ কাজগুলো।

যে কাজগুলো সবার চোখ এড়িয়ে যায়। যে কাজগুলোর কোনো ক্রেডিট নেই। যে কাজগুলো স্রেফ অদৃশ্য খাটুনি।

এই নিষ্ঠুর বোধোদয় মাহিরের মনের ভেতর সিসার মতো ভারী হয়ে চেপে বসল। আয়না মাথা তুলে দরজার দিকে তাকাতেই মাহিরকে দেখে চমকে উঠল। ওর বড় বড় চোখ দুটোতে স্পষ্ট চমক, তুমি? এত তাড়াতাড়ি?

মাহির কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই আয়না শিল-পাটা ছেড়ে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। ওর নিজের হাত জ্বলছে, কিন্তু ও ব্যস্ত হয়ে পড়ল মাহিরকে নিয়ে, লাঞ্চ করেছ? অফিসে কিছু খেয়েছিলে? দাঁড়াও, আমি হাত ধুয়ে আসি, তোমার জন্য খাবারটা একটু গরম করে দিচ্ছি।

নিজের খাটুনি নিয়ে একটাও অভিযোগ নেই। হাত যে মরিচের ঝালে থরথর করে কাঁপছে, তা নিয়ে একটাও শব্দ নেই। মুখে শুধু মাহিরের জন্য এক বুক দুশ্চিন্তা।
এই জিনিসটাই মাহিরকে আরও বেশি অপরাধী বানিয়ে দিল। সে নিজের গলার ভেতরের দলা পাকানো রাগটা চেপে ধরে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, তুমি এটা করছ কেন?

আয়না চোখের পলক ফেলল, চোখ জ্বলতে পারে। তুমি ওপরে যাও? 

-এই কাজটা। মরিচ বাটার কাজটা তুমি কেন করছ?

আয়না বোকার মতো সামনের মরিচের পাহাড়টার দিকে তাকাল, এই প্রশ্নের উত্তরটা দুনিয়ার সবচেয়ে সহজ ব্যাপার, কারণ তরকারির জন্য বাটতে হবে। মসলা শেষ।

ওর উত্তরের এই সরলতা মাহিরের ভেতরের ক্ষোভটাকে আরও এক ডিগ্রি বাড়িয়ে দিল। সে এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করল, তুমি দুপুরের খাবার খেয়েছ?”
আয়না মাহিরের বিগড়ানো মেজাজ ধরতে পারল। সে মাথা নাড়ল, না। এই বাটনাটা শেষ করে তারপর খেতাম। এখনই খাবো। তখন ক্ষুধা ছিল না।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে মাহিরের ভেতরটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, এতক্ষণে এই বাড়ির বাকি সবার খাওয়া-দাওয়া শেষ। সবাই যার যার ঘরে গিয়ে ফ্যান এতক্ষণে দুপুরের আরামের ঘুমে মগ্ন। আর এই মেয়েটা! 
মাহির চোয়াল শক্ত করে বলল, আর করতে হবে না। রেখে দাও।

আয়না একটু ইতস্তত করে আবার পাটার দিকে হাত বাড়াতে চাইল, শেষ তো! আসছি এক্ষুনি আরে আর সামান্য একটুখানি বাকি আছে-

-আমি বললাম রেখে দাও! 

মাহিরের গমগমে স্বর কঠিন শোনাল, হাত ধুয়ে ঘরে আসো।

ওর গলার স্বরে তীব্র কর্তৃত্বপূর্ণ শুনে আয়না মাঝপথেই দমে গেল। ও একটু থমকে মাহিরের মুখের দিকে তাকাল। কিছু একটা ভুল হয়েছে। ভীষণ ভুল হয়েছে। ও আর কোনো তর্ক না করে চুপচাপ সিঙ্কের কলে হাত ধুয়ে ওর পেছনে পেছনে ওপরে চলে এল।
ঘরে আয়নাকে বসিয়ে রেখে মাহির নিচে নেমে এল। সে খুব স্বাভাবিক ভাবে মিনি কে ডাকল! মেয়েটা বিন্দুমাত্র বুঝতে পারল না তার ভাই আসলে তার কাছ থেকে কী জানতে চাইছে।

সে খুব অবলীলায়, না ভেবেই একটার পর একটা তথ্য দিতে লাগল,
হ্যাঁ ভাইয়া, ভাবী তো প্রায়ই এসব কাজ করে। গতকালও তো ভাবী স্টোররুমের সব বয়াম নামিয়ে পরিষ্কার করছিল। গত সপ্তাহে ফ্রিজটা ভাবীই একা হাতে পরিষ্কার করেছে। আর বাসন তো ভাবী মাঝে মাঝেই মাজে, রহিমন বুয়া কামাই করলে তো ভাবীই সব সামলায়।

তার কথাগুলো বলছিল বড্ড স্বাভাবিকভাবে। তার অবচেতনেই সেট হয়ে গেছে যে, আয়না ঘরের শান্তি রক্ষার্থে এই উচ্ছিষ্ট কাজগুলোই করবে।

কিন্তু প্রতিটা উত্তরের সাথে সাথে মাহির ভেতর থেকে ক্রমশ এক্কেবারে নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এই প্যাটার্নটা যে কতটা কুৎসিত, তা আর অস্বীকার করার কোনো উপায় ওর কাছে রইল না।

চিলেকোঠায় ফিরে সে আয়নার মুখোমুখি বসল। মাহির নিজে তার হাতের দিকে ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এই দুর্দশার জন্য কি সে নিজে দায়ী নয়?

আয়না ওকে বোঝানোর ভঙ্গিতে খুব শান্তভাবে বলল, আরে মাহির, তুমি শুধু শুধু রাগ করছ। আমাকে কেউ জোর করেনি। কেউ আমাকে হুকুম দিয়ে এই কাজ করায় না। আমি যদি আজ না-ও করতাম, অন্য কেউ করত। আমি স্রেফ হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না, তাই নিজের ইচ্ছায় করেছি। আমরা তো এই এক ছাদের নিচেই থাকবো, তাই না? একটু-আধটু মানিয়ে চলতেই হয়। প্রত্যেকটা যৌথ পরিবারের নিজস্ব কিছু ডায়নামিকস থাকে, এগুলো নিয়ে ছোটখাটো খিটখিট করলে সংসার অশান্ত হয়। তার চেয়ে চুপচাপ করে ফেলাটা অনেক শান্তির। 

আয়না যতবার নিজের কাজের ফিরিস্তি দিচ্ছিল, মাহিরের বুকের ভেতরের ক্ষতটা তত বেশি চওড়া হচ্ছিল। কারণ এই মেয়েটা সত্যিই বিশ্বাস করে ও যা বলছে তা ঠিক! ও অলরেডি এই টক্সিক সিস্টেমটার সাথে নিজেকে অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছে। ও মেনে নিয়েছে যে এই সংসারে টিকে থাকতে হলে ওকে এই অদৃশ্য সেবাদাসের রোলটাই প্লে করতে হবে। কেন টিকতে হবে? মাহিরের জন্য, মাহিরকে ভালোবেসে।

মাহির একপর্যায়ে ওর কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলল, তুমি শুধু কাজটার দিকে তাকাচ্ছ, আয়না। কিন্তু আমি অন্য জিনিস দেখছি। সমস্যাটা মরিচ বাটা বা বাসন মাজা নিয়ে নয়, আয়না। সমস্যাটা হলো মেন্টালিটি নিয়ে। ওনারা তোমাকে কখনো এই পরিবারের একজন করে নেননি, একটা বাড়তি মানুষ ঘরে এসেছে, তাকে কীভাবে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করা যায়, ওনারা সেটাই করছেন। তুমি সবার আরামের জন্য মানিয়ে নিলেও, কিন্তু কেউ তোমার জন্য এই সংসারে সম্মান বা অথরিটির একটা ইঞ্চি জায়গাও ছেড়ে দেয়নি।

আয়না এবার আর কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। কারণ ওর অবচেতনের কোথাও না কোথাও একটা সত্যির খোঁচা গিয়ে লাগল। সে মাহিরকে বিধ্বস্ত দেখতে একদম পছন্দ করে না। এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে ভাবতে দিতেও চায় না।

মাহির আবার আয়নার হাতের দিকে তাকাল। সেই লালচে হয়ে থাকা চামড়া, মরিচের ঝালে উসখুস করা আঙুলের ডগাগুলো। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিয়েও সে শান্তি পল না।

বছরের পর বছর ধরে ও নিজে এই একই অজুহাত দিয়ে এসেছে। নিজের মনকে বুঝিয়েছে পরিবারের শান্তির খাতিরে এইটুকু অপমান সহ্য করা যায়, এগুলো নিয়ে কথা বলার কোনো মানে হয় না। আসলেই তো তার বাবার জন্য সবাই ভুগছে। 

 ও নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে এসেছে শুধু এই তথাকথিত শান্তি বজায় রাখার জন্য। আর আজ, ওর চোখের সামনে ওর ভালোবাসার মানুষটাও ঠিক একই ভুল করছে।

এই রিয়ালাইজেশনটা মাহিরকে এক তীব্র চপেটাঘাত করল। ও নিজেই এই পরিবেশটাকে এতদিন প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে। নিজেকে নিজের কাছেই বড্ড কাপুরুষোচিত মনে হতে লাগল। শান্তি বজায় রাখাটা আর কোনো মহানুভবতা নয়, ওটা আসলে এক ধরণের ভীরুতা।

সন্ধ্যা নামার আগেই মাহির নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। ওর চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে উঠেছে, চোখে দৃঢ় সংকল্প।

সে ধীর পায়ে নিচে নেমে সোজা দাদীর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দাদীর ঘরের এসিটা কয়েকমাস আগে কিনে দিয়েছে সে। এক রুমে এসি থাকায় সবাই এখানে একত্রিত হয়। আয়নাকে কেউ ডেকেছে কোনোদিন? 

মাহির ভেতরে ঢুকতেই কেউ আঁচ করতে পারল না যে পরের মুহূর্তে কী ঝড় আসতে চলেছে। মাহির খুব শান্তভাবে দাদীর খাটের পাশে গিয়ে বসল। তারপর একদম পাথরের মতো দৃঢ় গলায় বলল, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সবাই কৌতুহলী হয়ে ওর দিকে মাথা তুলে তাকাল। আর ঠিক তখনই মাহির তার জীবনের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বোমাটা ফাটাল, আমি আর আয়না কাল সকালেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমরা আলাদা থাকব।

পরের কয়েক সেকেন্ড ঘরের ভেতরের সময়টা যেন এক জায়গায় থমকে গেল। কেউ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। পুরো ঘরে একটা পিনপতন, ভয়ঙ্কর নীরবতা নেমে এল। তারপরেই চারদিক থেকে একসাথে প্রশ্নের তুবড়ি ছুটল, 

কী বলছিস মাহির? কী হয়েছে? হুট করে আলাদা থাকার কথা আসছে কেন? মাথা খারাপ হয়েছে তোর? কীসের জন্য যাবি?

ঘরের সবার জন্য শকটা ছিল আকাশ ভেঙে পড়ার মতো। কারণ এই ছেলেটা মাহির! এই বাড়ির সবচেয়ে বাধ্য, সবচেয়ে ধৈর্যশীল আর আপোশপ্রিয় ছেলে। যে ছেলেটা নিজের কোনো শখ বা দাবির কথা মুখে আনে না, যাকে সবাই ধরে নিয়েছিল ও আজীবন এই সংসারের জোয়াল একাই টেনে যাবে সে আজ হুট করে বাড়ি ছাড়ার কথা বলছে!

মাহির খুব শান্ত গলায় স্পষ্ট করে দিল, আমার দায়িত্বের কোনো নড়চড় হবে না। আমি প্রতি মাসে যেভাবে সংসারের খরচের টাকা দিতাম, ঠিক সেভাবেই পাঠাব। ওনাদের কোনো ইমার্জেন্সি হলে আমি এক ডাকে আসব, সব দায়িত্ব নেব। আমার কোনো কর্তব্য থেকে আমি পালাচ্ছি না। শুধু একটা জিনিস বদলাবে। আয়না আর এই বাড়িতে থাকবে না।

শারমিনআরা নিজের স্বভাবসুলভ ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল, তিনি বাঁকা গলায় বললেন, ওহ! এতক্ষণে বোঝা গেল আসল ঘটনা! বলি, বউ এসে কান ভারী করেছে বুঝি? আমি তো আগেই জানতাম, ওই কালনাগিনী এই ঘরের শান্তি ছারখার করতে এসেছে! ঘর আলাদা করার বুদ্ধি দিচ্ছে!

এতদিন ধরে ওনার দেওয়া প্রতিটা নীরব অপমান মাহির মুখ বুজে সহ্য করেছে। কিন্তু আজ আয়নার বিরুদ্ধে এই নোংরা অভিযোগটা শোনার সাথে সাথে মাহিরের ভেতরের ধৈর্যের বাঁধ এক ঝটকায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ওনার এই একটা কথা বারুদে শেষ আগুনের ফুলকি হিসেবে কাজ করল।

মাহির নিজের জায়গা থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো তখন রাগে আর অপমানে জ্বলজ্বল করছে। বুক ফুলিয়ে নিজের স্ত্রীর ঢাল হয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
-চাচী!
 মাহিরের গলার গর্জন পুরো ঘরের এসি-র ঠাণ্ডা বাতাসকে এক নিমেষে তপ্ত করে তুলল, মুখ সামলে কথা বলুন! সে এখানে নেই, আমি আছি।

মাহিরের চড়া গলার আওয়াজ দাদীর ঘরের দেয়ালগুলোতে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। শারমিন আরা বুক চেপে ধরে দুই পা পিছিয়ে গেলেন, ওনার মুখে তখন রাগের বদলে ভয়ের ছাপ। ঠিক তখনই দাদী খাট থেকে প্রায় কুঁজো হয়ে উঠে বসলেন। ওনার ঝুলে পড়া চামড়ার মুখটায় এক চরম হতাশা আর আকুলতা ফুটে উঠল। তিনি দুই হাত বাড়িয়ে ধরা গলায় বলে উঠলেন, মাহির তুই কি পাগল হয়ে গেলি? 

-এতদিনে সুস্থ হয়েছি দাদী।

তার চাচা বললেন, 
কী বলছিস তুই বাপ? এতগুলো বছরে কত কত ঝড়তুফান, বালা-মুসিবত গেল, কোনোদিন তো এমন কথা মুখে আসে নাই তোর। এই হাতেই তো বড় করছি তোরে, কখনো তো এমনে চোখ তুলে বেয়াদবি দেখি নাই। তাহলে আজ এইসব কেন বাপ? নিজের ঘর কেউ এভাবে ধ্বংস করে? তুই নিজে সারা জীবন সবর করেছিস আর ওরে বুঝাতে পারছিস না? আমি তো আর নিতে পারতেছি না বাপ!

বৃদ্ধার গলার সেই কান্নামিশ্রিত আকুতি এতদিনের চেনা নিয়মে মাহিরকে নিমেষে গলিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ আর তা হলো না। আজ মাহিরের চোখে চোখ রাখতে পারছে না কেউ। ঘরের বাতাস যেন এক অদৃশ্য চাপে ভারী হয়ে উঠেছে। এই পুরুষটা কি সত্যিই তাদের বাড়ির সেই আদর্শ, মুখ বুজে সব সহ্য করা ধৈর্যবান মাহির? এটা কি সত্যিই মায়মুনার সেই নির্বিকার ছেলে?

মাহিরের চোয়াল রাগে থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু তার গলার স্বর ছিল পাথরের মতো নিরেট আর অকাট্য। সে দাদীর দিকে সোজা তাকিয়ে একদম সোজাসাপ্টা স্বরে বলল, সম্ভব না। অনেক হয়েছে, আর না। আমি নিজে ধৈর্য ধরব, সবর করব তাও শুধু আমার নিজের জন্য। আমার স্ত্রী এই সংসারে আর কোনো সবর রাখবে না। না সে কোনো দুর্ব্যবহার সহ্য করবে, আর না কারো স্বার্থে মানিয়ে নিতে গিয়ে নিজের আত্মসম্মান নত করবে। কারণ ওর ওই নত হওয়াটা আজ আমার নিজের ভেতরের শেষ ধৈর্যের বাঁধটাকেও ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। আর আমার সেই বাঁধ যদি একবার সত্যি সত্যি ভেঙে যায়, তবে তা এই বাড়ির কারো জন্যই ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

মাহিরের মুখের ওপর দেওয়া এই ধারালো জবাবটা শুনে শারমিনআরা গম্ভীর গলায় বললেন, মাহির, তুমি একটু বেশি রিয়্যাক্ট করছ না? সংসারে একটু-আধটু কথা কাটাকাটি, মান-অভিমান তো সব পরিবারেই হয়। তাই বলে হুট করে ঘর আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কি কোনো ম্যাচিউর ছেলের কাজ? লোকসমাজে আমাদের একটা সম্মান আছে।

মাহির তাকে অগ্রাহ্য করে তার চাচার দিকে ঘুরে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের স্মিত হাসি ফুটে উঠল, আপনারা খুব সুন্দর একটা সিস্টেম বানিয়ে নিয়েছেন, তাই না? কাজের বুয়া না আসলে আয়না বাসন মাজবে, মসলা ফুরিয়ে গেলে আয়না পাটায় পিসবে, আর দিনশেষে বাকিরা ড্রয়িংরুমে বসে সোফায় পা তুলে গল্প করবেন। কেউ ওকে জোর করে না, খুব সত্য কথা! ও নিজের মন থেকে কাজগুলো করে। কিন্তু আপনারা ওরে একটা বারের জন্যও বলেন না যে মা, তুমি অনেক করেছ, এবার গিয়ে একটু জিরিয়ে নাও, নিজের খাওয়াটা খাও। এই বাড়িতে ও শুধু সবার আরামের জন্য খাটবে, আর অধিকার বা সম্মানের বেলায় ও থাকবে একদম বাইরের একজন? এই নোংরা সিস্টেম আমি আর আমার ঘরে চলতে দেব না।

শারমিন আরা এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে আবার চেঁচিয়ে উঠলেন, আহা! কী আমার সতী সাধ্বী বউ রে! উনি তো মেমসাহেব, ওনার গায়ে একটু হাত লাগালে ফোস্কা পড়ে যায়! আমরা কি এই বয়সে খাটিনি? আর ও কী এমন রাজকার্য করে শুনি? 

মাহির এবার শারমিন আরার দিকে পুরো ঘুরে দাঁড়াল। ওর চোখের সেই দীপ্ত চাহনিটা ওনার মুখের ওপর স্থির রেখে শান্ত অথচ মারাত্মক ভারী গলায় বলল, 
চাচী, ও ওই ল্যাপটপ নিয়ে ঘরে বসে যে কাজটা করে, সেই কাজের প্রতিটা ডলার স্রেফ ওর নিজের মেধার জোরে আসে। ওর এই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জার্নিটার পেছনে এই বাড়ির কোনো মানুষের একটা পয়সার অবদানও নেই। ও কারো দয়ায় বাঁচেনি, আর আজীবন ও নিজের একার জেদে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। ওর মতো একজন স্বাবলম্বী, সম্মানীত মেয়েকে আপনারা এই ঘরে এনে স্রেফ একটা অদৃশ্য চাকরানি বানিয়ে রাখবেন সেই সুযোগ আমি আপনাদের আর দেব না।

ও আর কোনো কথা বাড়ানোর প্রয়োজন বোধ করল না। সে দাদীর দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো মাথা নিচু করে বলল, আমি আমার দায়িত্ব থেকে এক চুলও নড়ব না, দাদী। প্রতি মাসের ১ তারিখে এই সংসারের যা খরচ, তা আপনাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে। আপনাদের যেকোনো বিপদে আমি এক ডাকে হাজির হবো। কিন্তু কাল সকালেই আমি আর আয়না এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এটাই আমার শেষ কথা।

বলেই মাহির এক মুহূর্ত আর সেখানে দাঁড়াল না। সে হনহন করে ঘর থেকে বের হয়ে সোজা ওপরে নিজের চিলেকোঠার ঘরের দিকে পা বাড়াল। ঘরের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতা থমকে রইল। কেউ আর ওকে ডাকার বা আটকানোর সাহসটুকু পেল না।
মাহির যখন ওপরে এসে নিজের ঘরের দরজাটা খুলল, দেখল আয়না বিছানার এক কোণায় চুপচাপ বসে আছে। এতক্ষণের নিচের সমস্ত চেঁচামেচি আর ঝড়ের আওয়াজ ওর কানেও গেছে।

মাহির ঘরের দরজাটা বন্ধ করে সোজা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর এতক্ষণের সেই কঠিন পুরুষালি চেহারার ভেতরের সমস্ত রাগ আর কঠোরতা আয়নাকে দেখা মাত্রই এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। তার নিজের বুকের ভেতরট তীব্র অপরাধবোধ আর মায়ায় মুচড়ে উঠল।
সে আর কোনো কথা না বলে, নিজের সমস্ত সংযম হারিয়ে সরাসরি হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসল। তারপর আয়নার দুটো মোলায়েম হাত নিজের চওড়া, উষ্ণ হাতের তালুর ভেতর পরম আদরে টেনে নিল।
 আয়না খুব নিচু গলায় ফিসফিসিয়ে উঠল, মাহির! কি করলে তুমি?

ওর চোখের কোণটা কেন যেন হুট করেই ভারী হয়ে এসেছে। মাহির ওর হাতের তালুতে নিজের তপ্ত ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে ওর বসা গলায় বলল, প্যাকিং শুরু করো, আয়না। আমরা কাল সকালেই চলে যাচ্ছি।

 
সাতাশ বছরের জীবনে নিজে অমানবিক ব্যবহার সহ্য করেও যে দায়িত্ব পালন থেকে পিছিয়ে পড়েনি। বাবার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করবে বলে কোনোদিন এই বাড়ি ছাড়ার কথা ভাবেনি, সে আজ কি করে এই ভয়ানক সিদ্ধান্ত নিল, তা সে রাতে আহমেদ নিবাসের বাসিন্দারা কেউ ভেবে পেল না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp