নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - পর্ব ০৬ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া
          দুপুরের প্রথম দিক, চারপাশে যোহরের আযান পড়েছে। মাথার ওপর উত্তপ্ত সূর্য। সূর্যের তেজ যেন দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। একটুখানি বাতাসও নেই যে ছুঁয়ে দিবে সান্ত্বনাস্বরূপ। বাতাসও যেন আজ কার্পণ্য করছে। এই প্রকৃতির মুখ ফিরিয়ে নেয়া মরশুমেও শুটিং থেমে থাকেনি। ডিরেক্টরের প্রচুর তাড়া। গরম কমার জন্য বসে থাকার সময় নেই। যে করেই এই শুটিং শেষ করতেই হবে। সেটে একেকজন কর্মী ঘেমে-নেয়ে জুবুথুবু। যেহেতু স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী প্রখর রোদে শট নিতে হবে তাই কেউ প্রতিবাদও করতে পারল না।

 ইফরা চোখ-মুখ বিকৃত করে ছাউনিতে বসা। তার সামনে চলছে টেবিল ফ্যান। হাতেও একটা মিনি ফ্যান, যেটা মুখের ওপর ধরা। মেকআপ আর্টিস্ট তার মেকআপ সেট করতে ব্যস্ত। তিনিও ঘামে জর্জরিত। কিন্তু মুখে বিরক্তির রেশ নেই। প্রফেশনালিজম ধরে রেখেছেন মুখজুড়ে। ইফরার পাশেই তার কো-আর্টিস্ট বসা। সেও গরমে বেশ কাহিল। ইফরা পাশ ফিরে দেখল, মুখটা লাল হয়ে আছে। ইফরা তো মেকআপের কথা ভুলে মুখে বরফ দিয়েছিল, এই ভদ্রলোক তাও করেনি। ইফরা ভদ্রতা সহিত বলল,
--"আপনারও বরফ দেওয়া দরকার ছিল সেলিম ভাইয়া।"

সেলিম মৃদু হাসল। অন স্ক্রিনে রোমান্টিক হিসেবে তাদের জুটিটা বেশ জনপ্রিয়। অথচ ক্যামেরার পিছে তারা একে অপরকে ভাইয়া-আপু সম্বোধন করে। দর্শক শুনলে বেশ হতাশ হবে হয়তো। কিন্তু এতে কিছু করার নেই। তাদের মধ্যকার সম্পর্কটাই এমন স্বচ্ছ, যেখানে প্রেম বাদেও সুন্দর একটা সম্পর্ক আছে। সম্মানের সম্পর্ক।

 সেলিমের গার্লফ্রেন্ড আছে। ইফরা তো প্রায়ই মিট করে, মেয়েটা প্রায়ই তাদের শুটিং দেখতে আসে। মেয়েটা ইফরার থেকে কিছুটা ছোটো তবে তাদের সম্পর্ক ভালো। সেলিম ঠান্ডা পানির বোতলে চুমুক দিয়ে বলল,
--"নাহ, সমস্যা নেই। শুটিং তো বেশিদূর নেই।"

ইফরা ক্লান্ত গলায় বলল,
--"আর কতক্ষণ আছে?"

--"কয়েক মিনিটের। এরপর তো আবারও লোকেশন চেঞ্জ হবে।"

আরও কয়েক মিনিটের জন্য সূর্যমামার অত্যাচার সহ্য করতে হবে, ভাবলেই কেমন গা জ্বলে উঠল তার। তবে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। অভিনয় তার প্যাশন, প্যাশনের জন্য একটু তো কম্প্রোমাইজ করতেই হয়। সে মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে রাখল। সেলিম প্রশ্ন করল,
--"ভালো কথা, তুমি না বললে তোমার বোন আসবে শুটিং দেখতে?"

--"হুঁ, তবে ওকে বিকালে আসতে বলেছি। তখন তো এসির নিচে বসেই শুটিং হবে।"

--"হুঁ। ভালো করেছ এখানে না ডেকে।"

ইফরা ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরপর গায়ে বডি সানস্ক্রিনটা রি-এপ্লাই করে আবারও অভিনয়ের এর জন্য প্রস্তুত হলো। স্ক্রিপ্টও দেখে নিল সেলিমের সাথে।
--"তোমার আপু ম্যারিড না?"

--"জি।" ইফরা অনাগ্রহী গলায় উত্তর দিল। যেন সেলিম কী করে জেনেছে সে নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই। সে বলবেই বা কীভাবে তার দুলাভাই তার থেকেও ছোটো? হাস্যকর জীবন।

--"আগামী মাসে মি. শাহ স্যারের পক্ষ থেকে পার্টি আছে। ইনভাইটেশনের কথা শুনেছি।"

ইফরা এবার স্ক্রিপ্ট থেকে মাথা তুলল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
--"ইনভাইটেশন? কিসের?"

--"সে কি, জানো না? ওনার ছেলের বার্থডে। তুমিও সম্ভবত ইনভাইটেশন পেতে পারো। পাবলিক ফিগারদের ভেতরে এ নিয়ে চর্চা হচ্ছে বেশ।"

ইফরা স্বাভাবিক গলায় বলল,
--"ওহ আচ্ছা। ইনভাইটেশন আসলে বুঝব নাহয়।"

ইফরার গলায় আবারও অনাগ্রহ। পাশের মানুষটা জানেই না যার জন্মদিন নিয়ে চর্চা চলছে সে ইফরার আপন দুলাভাই। অথচ ইফরার গলায় সে নিয়ে কৌতুহল পাওয়া গেল না। যেন সাহিদ যে তার দুলাভাই এ নিয়ে তার কোনোপ্রকার মাথা ব্যথা নেই। হয়তো সে-ই জগতের এমন শালী, যার দুলাভাই নিয়ে উচ্ছ্বাস কিংবা উত্তেজনা নেই। উলটো সে তার কম বয়সী দুলাভাইকে অপছন্দ করে। কেন করে জানে না, তবে এটুকু জানে তার বোনের সাথে ওই জুনিয়র অন্যায় করেছে। আর তার জনদরদী আপু তা মুখ বুঝে মেনেও নিচ্ছে। অন্যায় হবে না? কে আজকাল একটা ইমম্যাচিওর ছোটো ছেলের সাথে বড়ো মেয়ের বিয়ে দেয়? এটা তো চরম অবিচার। সে সাহিদকে অপছন্দ করে অথচ সাহিদের সাথে সে কখনো সরাসরি দেখা করেছে কিনা সে নিয়েও বেশ সন্দেহ আছে।

সেলিম বুঝল, মাথা নাড়ায়। আর কথা-বার্তার সুযোগ হলো না, ওরা উঠে পড়ে। ডিরেক্টর তাড়া দিচ্ছে।

—————

সাহিদ তার প্ল্যান অনুযায়ী মাওয়া এসেছে বন্ধুদের নিয়ে। সবারই নিজস্ব বাইক আছে। সেই বাইকে করেই এতদিন পর আসা৷ মাওয়ার এই দিকটায় কয়েকটা টিনের ভাতের হোটেল। তাজা ইলিশ ভাজার সুঘ্রাণে চারপাশ মৌ মৌ করছে। সাহিদের কাছে এসব অস্বাস্থ্যকর মনে হয়, একবার তো সে এখানের খাবার খেয়ে বেশ কঠিন পেটের অসুখে পড়েছিল। আসলে এসব সাহিদের অতি স্বাস্থ্যকর পেট সইতে পারেনি, এই কথাটা সাহিদের বন্ধুরা ঠাট্টার ছলেই বলে। ওরা বাইরের কিংবা ফুটপাতের খাবারে চরম আগ্রহ দেখালেও সাহিদ সেসব সবসময় এড়িয়েই গিয়েছে।

 এদিকটাই মাওয়ার কাছাকাছি মাহফুজ সাহেব একটা ভিলা করলেন। এখানে কাজের লোক, কেয়ারটেকার, রান্নার বাবুর্চি সবই আছে। তাদের আগে থেকে জানিয়ে দেওয়ার কারণে তারা ভোর থেকেই সমস্ত আয়োজনে নেমে পড়েছিল। ইলিশ মাছ আস্ত রাখে তিনটা। এছাড়াও নদীর আরও দুই পদের মাছ রেখেছে। সাহিদরা আসতেই আকিব মাছ কাটা মহিলাকে বুঝিয়ে দিল কীভাবে মাছের পিস করবে। এসব দেখাশোনার দেওয়া হয় আকিবকেই। আকিব জানে সবার পছন্দের ব্যাপারে। সাহিদ তো এসবের ধারও ঘেঁষে না, মাছের গন্ধে তার মুখে রুমাল চেপে রাখতে হয়। 

এই ভিলাটা দোতলার, তবে কাঠ আর টিন মিলিয়ে খুবই আধুনিকতার সাথে তৈরি করা। যেন ছুটি কাটানোর জন্য এই ভিলা পার্ফেক্ট। দোতলায় দুটো বেডরুম আছে তবে নিচে বড়ো হলরুম, রান্নারঘর আর একটা বাথরুম। এই পুরো ভিলার মূল আকর্ষণ হচ্ছে হলরুমের সাথে লাগোয়া বারান্দা। এটা বেশ বিস্তৃত এবং শক্ত কাঠের বাঁধ দেওয়া। এখানে আরামদায়ক সোফা আছে কয়েকটা, সাথে একটা ছোটো টেবিল। বন্ধুরা সবাই এই বারান্দাতেই ভীড় করেছে। সবাই রেলিং-এ গা ঠেকিয়ে দাঁড়ানো। এখান থেকে পদ্মা নদীর ভিউ সুস্পষ্ট। সাথে অদূর থেকে ভেসে আসা সরিষার তেলে ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ। এই ঘ্রাণে সকলের খালি পেটে ভীষণ নাড়া দিচ্ছে। কত কষ্টে যে দোকানগুলাকে এড়িয়ে এসেছে। ওখানে গেলেই লোভে জিভে জল চলে আসার উপক্রম। কাজের ছেলেটা তখন ওদের লেবুর সরবত করে দিয়ে গেল। টি-টেবিলে ঠাঁই পেল ট্রে-ভর্তি কোল্ড লেমোনেড। কেউই এটা হাতছাড়া করল না। আকিবও ওদের দিক-নির্দেশনা দিয়ে ফিরে এলো। বলে এসেছে ইলিশ ভাজার আগে ডেকে দিতে। কিন্তু দেখল তার জন্য রাখা গ্লাসটা খালি। ওটা সাহিদ মে রে দিয়েছে। সে বেশ তৃষ্ণার্ত ছিল। আকিব বিশ্রী এক গালি ছুঁড়ে বলল,
--"হারামি! এখন আমি কি খাব? তোর মাথা?"

সাহিদ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
--"আরেক গ্লাস বানিয়ে দিতে বল।"

আকিব সাহিদকে বকা দিতে দিতে তাই করল। কিন্তু সাহিদের এই সুখ বেশিক্ষণ টিকল না। টিকতে দিল না তার বেস্টফ্রেন্ড নামক নতুন শত্রু, সাব্বির।

 সাহিদের কখনোই এখানে আসলে বিরক্তি আসে না। তবে আজ আসছে৷ সে মুখ গম্ভীর করে একপাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। সাব্বির তখন তার বন্ধুর বউর প্রশংসা করতে ব্যস্ত। তাও আবার "ভাবীইইই" সম্বোধন করে। রসকষ মিলিয়ে যত পারা যায় বলে যাচ্ছে। এদিকে তার বাকি হারামি বন্ধুরাও ভীষণ মনোযোগ দিয়ে সব শুনছে। এত মনোযোগ যদি ভার্সিটির ক্লাসগুলোতে দিত। সিজি ভালো হতোই হতো। কিন্তু তারা শুনছে সাহিদের বউয়ের গীত। 

রুশান জিজ্ঞেস করল,
--"কি বলছিস? সত্যিই ভাবী দেখতে ইয়াং? সাহিদটায় আবার আমাদের এজ বেশি বলে বোকা বানাতে চাচ্ছে না তো?"

সাব্বির হো হো করে হাসতে হাসতে বলল,
--"নাহ। আমিও শুরুতে এটাই ভেবেছিলাম। পরে বুঝলাম যে আসলেই তার বয়স ত্রিশ ছুঁইছুঁই। কিন্তু বিশ্বাস কর, দেখলে বোঝাই যায় না, মনে হয় আমাদের বয়সী।"

সাহিদ এবার ধৈর্যহারা হয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
--"ইচ্ছে তো করছে পদ্মা ব্রিজ থেকে তোদের সবকটাকে ঠেলে ফেলে দিই।"

আকিব বলল,
--"কেন বন্ধু, জ্বলে? জ্বলবে তো আমাদের! আমাদের আগে সুন্দরী বিয়ে করে বসে আছিস, নিয়মিত রান্না খাচ্ছিস, আবার ভাব ধরিস এমন যেন বউকে পাত্তা দিস না? ছিহ, শেইম অন ইউ।"

সাহিদ একটা অদ্ভুত কাজ করে বসল। আকিবের ফোনটা হাতের কাছেই ছিল। সাহিদ ফোন নিয়ে সোজা আকিবের গার্লফ্রেন্ডকে কল দিল। মেয়েটাও সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করেছে। সাহিদ ঝটপট বলল,
--"আকিব তোমাকে নিয়ে খুশি না, নতুন কারো জন্য ডেসপারেট মেইবি। ইউ শুড কিপ আই অন হিম। চিট করলে আমাদের দোষ দিয়ো না।"

আকিবের চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম, আর বাকিদের চোখ কপালে। সাহিদ ফোন আকিবের দিকে ছুঁড়ে মা র ল। আকিব অভিজ্ঞ হাতে তা ক্যাচ করল। স্পিকার অন থাকায় স্পষ্ট মেয়েলি কণ্ঠের গা লা গাল ভেসে আসছে। সাব্বির ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসি আটকে আছে আকিবের এই অসহায়ত্ব দেখে। আকিব যেন চোখ দিয়েই সাহিদকে খুন করে দিবে। কিন্তু সাহিদ মোটেও এদিকে তাকাচ্ছে না। সে বসের মতো করে আরেকটা সিগারেট ধরাল, সুখ টান দিল মুহূর্তেই। অন্যের ঘর নিয়ে আফসোস করলে নিজের ঘর তো নড়বড়ে হবেই। সেখানে সাহিদের ঘরে চোখ দিয়েছে ওরা, তাদের ঘরে আগুন জ্বা লানো সাহিদের কর্ম। আকিব বেচারা ভেতরে চলে গেছে গার্লফ্রেন্ডকে ঠান্ডা করতে, এক্সপ্লেইন করতে। বন্ধুদের সামনে যা মান-সম্মান যাওয়ার গেছে তার, তবে তার গার্লফ্রেন্ড রাহাকে শান্ত করতে হবে। মেয়েটাকে নির্ঘাত ভালোবাসে সে, নয়তো কবেই এই বিপদটাকে দূরে ছুঁড়ে দিত। যেতে যেতে আকিব সাহিদের দিকে গরম চোখে তাকিয়ে মিনমিন করে বলল,
--"তোর ঘরে আগুন ধরানো আমারও ফরজ হয়ে গিয়েছে, বন্ধু।"

গার্লফ্রেন্ডকে ধরে বুঝানো, কৈফয়ত দেওয়া এসব বেশ লেইম লাগে সাহিদের। এটাকে ইগো হার্টের মতোই লাগে তার। সে কারো জীবনে হস্তক্ষেপ করে না বিধায় সে এসব নিয়ে মুখ খুলে না। সম্পর্কের ব্যাপারগুলো বুঝতে এখনো কাঁচা সাহিদ। তাই তো তার নিজের বিবাহিত জীবনই উচ্ছন্নে আছে। সে সর্বদা নিজের ইগো, অহং-কেই গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। এই ইগোর দেয়াল খুবই শক্ত, যে কেউ তা ভাঙতে পারবে না। এই ইগো না দেয় সাহিদকে কারো সাথে মিশতে, আর না দেয় কারো অনুভূতি বুঝতে। সে নিজের মতো করেই নিজের দুনিয়াকে সাজিয়ে নিয়েছে। যেখানে বাস্তবতা নেই, সংগ্রাম নেই, নমনীয়তা নেই এবং কম্প্রোমাইজও নেই। তার ভেতরে আছে নিয়ন্ত্রণের খুদা। ক্রাইম করলে আসো নয়তো উলটো দিকে হাঁটো, অতি সৎ মানুষও সাহিদের দু'চোখের বিষ। যেমনটা ইসমাত। অথচ আবার সেই সাব্বিরের কাছে স্বীকার করেছিল, ইসমাত সৎ, কৃত্রিম নয়।

সাব্বির সাহিদের কপালের ভাঁজ দেখেই বুঝে গেল তার অসন্তুষ্টির কারণ। তার মনে পড়ে গেল তার স্কুল জীবনের প্রথম ভালোবাসা রাইসার কথা। মেয়েটার এই এক শব্দের নামটা ছাড়া আর কিছুই জানত না সে। মেয়েটা দেশের কোন চিপায় আছে কে জানে, সেই প্রথম ভালোবাসাকে না ভুলতে পারার আক্ষেপও তার নেই। বন্ধুর কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে সাব্বির বলল,
--"ভালোবাসায় ইগো হার্ট বলে কিছু নেই দোস্ত। ভালোবাসা ইগোর থেকেও সুন্দর। তোর কাছে হয়তো এগুলা লেইম লাগছে, কিন্তু একজন পার্টনারকে এসব এক্সপ্লেইন করাটা বেহায়াপনা নয়, গুরুত্ব দেওয়া। আকিব মেয়েটাকে গুরুত্ব দেয়, গুরুত্ব দেওয়াটাও ভালোবাসার সংজ্ঞা। যা তোর মতো মাথামোটা বুঝবে না।"

সাহিদ গরম চোখে তাকাল। সাব্বিরের পিঠে একটা থাবা বসাতে যাবে তখনই কেয়ারটেকার ডেকে গেল ওদের। এখনই মাছ ভাজার প্রক্রিয়া শুরু হবে। ওরা দেরী না করে সেদিকে গেল, কাছ থেকে লোভনীয় ইলিশ ভাজা দেখার মজাই অন্যরকম। সাথে মাতাল করা সুঘ্রাণ তো আছেই।

 ভিলার অপরদিকেই খোলা মাঠ আছে। সেখানেই দুটো লোহার চুলা বসানো। চুলোর উপর বেশ বড়োসড়ো দুটো প্যান। স্থানীয়রা এটাকে "তাওয়া" বলে। তার কাছাকাছি বাকি সবকিছু তৈরি। মশলা মাখা ইলিশ, আরেক পদের মাছ, বেগুন আর সরিষার তেল। ওরা আসতেই বাবুর্চি তখনই তেল ঢেলে দিল। আরেক পাশে বসে দুজন মহিলা ভর্তা বানাচ্ছে। একজন ইলিশ মাছের লেজ ভর্তা করছে আর অন্যজন বাদবাকি ভর্তা। তাদের মালিকের হুকুম, সব সতেজ এবং তাজা খাবার হওয়া চাই। সেসব নিয়েই ব্যস্ত তারা। এই অল বয়সী ছেলেদের খুশি করলে ডাবল বখশিশ তো আছেই। 

জিভে জল নিয়ে ওরা মাছ ভাজা দেখল। তবে সাহিদ এখানে বেগড়া দিল। কেন ইলিশ মাছের থেকে ডিম আলাদা করা হলো না? ডিমসহই কেন কেটে ভাজা হচ্ছে? সাহিদ তো আস্ত ডিম খাওয়ার পরিকল্পনায় ছিল। এ নিয়ে লাগল হুলুস্থুল। বাকি কাজের লোকেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল সাহিদের আদেশ মানতে। ওরা ছুটল নতুন করে ইলিশ কিনতে, সেখান থেকে ভালো ভালো আস্ত মাছের ডিম অল্প সময়ের মধ্যেই যোগাড় করতে হবে। না করলেই যেন গর্দা ন যাবে। এরা প্রচুর ভয় পায় সাহিদকে। সেবারও তো কয়েকজনকে কাজ থেকে বের করে দিল। হাত-পা ধরেও বিশেষ লাভ হয়নি। 

সাব্বির পাশ থেকে দেখল সাহিদের সিংহের আচরণ। সে বেশ বুঝতে পারছে তাদের রাগই সাহিদ কাজের লোকেদের ওপর ঝাড়ছে। যার ফলস্বরূপ তাদের এই তৃপ্তিময় দৃশ্য প্রাণ ভরে দেখার সুযোগও ছিনিয়ে নিল।

সাহিদ দমল তখন, যখন প্রথম ভাতের লোকমা মুখে পুড়েছে। বাকি বন্ধুরাও তখন সব ভুলে তৃপ্তির শব্দ তুলে খাচ্ছে। সাহিদও খেল, তবে ভর্তা খায়নি। ভর্তা বড়োই অপছন্দের তার, অস্বাস্থ্যকর লাগে তার কাছে। অথচ তার বন্ধুরা গপাগপ করে খাচ্ছে, যেন কোনো অমৃত। সে শুধু ইলিশ মাছের ডিম, মাছের পিস, সবই তৃপ্তি সহকারে খেল। মুহূর্তেই তার সমস্ত একগুঁয়ে আচরণ, রাগ, জেদ সব পানি পানি হয়ে গেল। এখনো চারপাশে ইলিশ ভাহার সুঘ্রাণ। রুশান তো এত সুন্দর পরিবেশনের ছবিও তুলল কটা। ইন্সটাগ্রামে পোস্ট না দিলে চলে নাকি? সেল্ফিও তুলল সবার সাথে খাবার টেবিলে বসেই। সেলফিতে সবার মুখে তৃপ্তির হাসি থাকলেও সাহিদের ছিল চোয়াল শক্ত। এতে বিশেষ পাত্তা দেয়নি রুশান। ছবি হলেই হলো।

সাব্বির তো একফাঁকে বলে বসল,
--"সামনের বার ভাবীকে নিয়ে আসিস। আমি শিওর ভাবী এসব আপ্যায়নে খুশি হবে।"

সাহিদ চোখ রাঙানো ছাড়া কিছুই বলল না। আকিব নিজের রাগ জিভের আগায় রেখে বলল,
--"হানিমুনে আসতে বেচারা মেয়ে মানুষের মতো ভয় পাচ্ছে। তার তো আবার সবেতেই কুয়ারা।"

সাহিদ কোনোদিকে না চেয়ে আকিবের দিকে বোতল ছুঁড়ে মারল। আকিব এতে দমে যাওয়ার পাত্র নয়।
--"এখন থেকে আমাকে আর চুপ করাতে পারবি না শয়তান! তোরে আর ছাড় দিব না আমি! কত বড়ো সাহস আমার সংসারে আগুন লাগাতে আসে।"

—————

পরবর্তী শুটিং স্পটে ইসমাত পৌঁছালো সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে। তখন ইফরা শুটিং-এ ব্যস্ত। ইসমাতকে সেটের কয়েকজন চিনতে পেরে তাকে কিছুটা দূরে বসতে দিল, ঠান্ডা মোজো দিল। ইসমাত সেটা খেতে খেতেই ইফরার অভিনয় দেখল। মেয়েটা যেন চরিত্রে ঢুকে গিয়েছে। ইসমাত মুগ্ধ চোখে দেখছে। এ যেন আলাদা ইফরা। 

অবশেষে ইফরা শুটিং থেকে নিস্তার পেল আধঘণ্টার মতো। এখন বাকি চরিত্রদের শুট নেওয়ার পালা। বোনের সাথে সময় কাটানোর বেশ ভালো সুযোগ পেল সে। ইসমাতের পাশে বসে একজনকে বলল দুই কাপ চায়ের জন্য। ছোটো ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে দ্রুত চলল দুই কাপ চায়ের ব্যবস্থা করতে। ইফরা টিস্যুতে কপালের ঘাম আলতো করে মুছতে থাকল। তা দেখে ইসমাত বলল,
--"এসিতেও ঘামছিস?"

--" প্রেশারে থাকলে এসিতেও ঘাম ছুটে। তুই বল, ছুটি মিলল তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে?" শেষ বাক্যটা ব্যঙ্গ করেই বলল। ইসমাত আবার বোনের ব্যাঙ্গাত্মক প্রশ্নে খুব একটা মাথা ঘামায় না। মেয়েটার স্বভাবই এমন।

--"কেন? মিলেছে শুনতে খুশি হবি?"

--"তা তো হবোই। তা নাকউঁচুটা কোথায়?"

ইসমাত উদাসীন গলায় বলল,
--"মাওয়া গেছে বন্ধুদের সাথে।" 
--"আরে বাবা, বউ অফিসে কামলা দেয় আর উনি হাওয়া লাগাতে যায়। বাহ!"

ইসমাত এবারও ইফরার ত্যাড়া কথায় পাত্তা দিল না। ইফরা থেমে আবার বলল,
--"শুনলাম এই এরোগেন্টের নাকি সামনে বার্থডে?"

--"হুঁ।"

--"তা ইনভাইটেশন কী হিসেবে পাব? সেলেব্রিটি নাকি শালী হিসেবে?"

--"তুই যেটায় খুশি হবি সেটাই।"

--"বিরক্ত হচ্ছিস কেন?"

--"তো হবো না? এতদিন পর আসছি তোর কাছে মেন্টাল পিসের জন্য, কিন্তু না! তুই তো ঝামেলা করায় এক্সপার্ট। ত্যাড়ামি থামানোর সময় নেই তোর। আগে বলতি, আসতাম না।"

ইফরা বুঝল তার বোনের মেজাজ খারাপ আজ। তাই সে আর ত্যাড়ামি করল না। এবার বাধ্য মেয়ের মতো চুপ মেরে গেল। হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
--"আচ্ছা আপু, সরি। আর কিছু বলব না। এবার তুমি আমাকে বলো, কি হয়েছে? কী তোমাকে বিরক্ত করছে? সাহিদ কিছু করেছে? করলে বলো, আমি ওর মাথাটা ফাটিয়ে দিয়ে আসি। জানো তো, তোমার জন্য আমি জেলেও যেতে রাজি।"

ইসমাত তাকাল তার বোনের দিকে। এই বলল বাধ্য হয়ে থাকবে আবার পরমুহূর্তেই কেমন গুণ্ডি আচরণে চলে গেল। ইসমাতের কড়া নজরে ইফরা জিভ কাটল। বুঝল আবারও সে উলটো পালটা বলে ফেলেছে। চা আসতেই দুজনের মধ্যে গুমোট ভাবটা আর থাকল না। ইসমাত ধীরে ধীরে যতটুকু শেয়ার করা দরকার সেসব বোনের কাছে ঝেড়ে দিল। কিছু ব্যাপার ব্যক্তিগতই রাখল। যা বলল বেশিরভাগই অফিস নিয়ে। 

সাথে এও বলল, সোহান নামের ছেলেটার চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। রমজান সাহেব নিজে এই উদ্যোগ নিয়েছেন। ইসমাত যতটুকু বুঝেছে সম্ভবত তাকে ঘিরেই এই কাণ্ড। আর যাই হোক, মালিকের বউমাকে নিয়ে কোনো কর্মচারীর ছেঁড়াছিঁড়ি কে-ই বা সহ্য করবে? ইসমাতের অবশ্য লাভই হয়েছে, একটা বোঝা ঘাড় থেকে নেমেছে। ইসমাত সাহিদের জন্মদিনের প্রোগ্রাম নিয়ে মাহফুজ সাহেবের মাথা ব্যথাও বিস্তারিত জানাল। এত এত আয়োজন চলছে, অথচ যার জন্মদিন তার হুঁশ নেই। এদিকে পাড়া-পড়শীর ঘুম নেই। 

ইসমাত ভেবেছিল যে সব আয়োজনের ভার রমজান সাহেবের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তবুও কিছু কিছু দায়িত্ব ইসমাতের ওপরও অপর্ন হয়েছে। মাহফুজ সাহেব চান তার বউমা সাহিদের পছন্দ অনুযায়ী অনুষ্ঠানের ব্যাকগ্রাউন্ড ডেকোরেশন সিলেক্ট করুক, যা ইসমাতের জন্য বেশ বড়ো দায়িত্ব। এতেই সে বেশি বিরক্ত। 

ইফরা সব শুনল, ভাবল কিছু। প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলল,
--"তুমি কি গিফট দিচ্ছ আপু?"

ইসমাত চুপসে গেল। গিফটের ব্যবস্থা সে আগেই করে রেখেছে। বাইরের দেশ থেকে অর্ডার করেছে। আশা রাখছে পরিচিত একজনের মাধ্যমে সাহিদের জন্মদিনের আগেই উপহার চলে আসবে। সাহিদ উপহার গ্রহণ করবে কিনা এ নিয়েও মাথা ব্যথা নেই তার। দেওয়ার তো ইচ্ছেই ছিল না, তবুও ভদ্রতা বলে তো একটা ব্যাপার আছে। ইসমাত তো সাহিদের বউ, সে উপহার না দিলে কেমন দেখায়? ইসমাত আনমনেই বলল,
--"কিছু একটা।"

ইফরা শুনতে চাইল আগ্রহী গলায়,
--"কিছু একটা? সেটা কি? ওই নাকউঁচুটার পছন্দ হবে?"

ইফরার প্রশ্নের জবাব দেওয়া হলো না ইসমাতের। এর মাঝেই তার ফোন ভাইব্রেট করে উঠল। আননোন নাম্বার, অর্থাৎ সাহিদের নাম্বার। ইসমাত স্ক্রিনে তাকিয়ে মেসেজটা পড়ল,
--"যেখানেই থাকেন দুই মিনিটের মধ্যে আসবেন। আমি শুটিং এরিয়ায় আছি। রাস্তার মোড়ে।"

ইসমাত চমকে গেল এই মেসেজ দেখে। ইফরাও জোরপূর্বক মেসেজটা দেখল। অবাক হয়ে বলল,
--"এই না দুলাভাই মাওয়াতে গেছে?"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp