দহন শেষের নীল পদ্ম - পর্ব ০৩ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

দহন শেষের নীল পদ্ম - ইলমা বেহরোজ
          বিশাল ড্রয়িং আর ডাইনিং স্পেসটা একসাথে জোড়া লাগানো। ঘরের একদিকে দামি সোফা সেট সাজানো, তার ঠিক অপর প্রান্তেই বিশাল ডাইনিং টেবিল। সোফাগুলোতে জাঁকিয়ে আসন নিয়েছে ওরা সবাই। অন্যদিকে, জোহরা ও কাজলীর জন্য মাঝখানটায় দুটো সাধারণ চেয়ার টেনে দেওয়া হয়েছে। সোফায় তাদের জায়গা হলো না। 

পরিস্থিতি সামাল দিতে আলাউদ্দিনের স্ত্রী আছিয়া বেগম একরাশ অস্বস্তি নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “চেয়ারগুলো মুখোমুখি বসালাম, যাতে উনার সাথে কথা বলতে আপনাদের কোনো সমস্যা না হয়।”

জোহরা বেগম যেন এতেই ধন্য হয়ে গেলেন। তিনি গালভরে চাটুকারিতার হাসি হেসে বললেন, “কোনো সমস্যা নাই আপা। সোফা আর চেয়ার তো একই!”

মায়ের মেরুদণ্ডহীন আচরণে কাজলীর ভেতরটা রি রি করে উঠল। ও মেঝের দিকে স্থির চোখ রেখে নিজের মেরুদণ্ড একদম সোজা করে বসে রইল। তার পরনে কালো গোল থ্রি-পিস, মাথায় ওড়না দিয়ে ঘোমটা টানা। 

আছিয়া আবারও বিনীত সুরে বললেন, “উনি এখনো সকালের নাস্তা করেননি, ভেতরে খাচ্ছেন। এখুনি হাত ধুয়ে এসে যাবেন। আমি আপনাদের জন্য চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

আছিয়া চলে গেলেন। আপাতদৃষ্টিতে বড্ড হাসিখুশি আর অমায়িক এক মহিলা তিনি; মানুষকে নিয়ে ভাবেন, আপ্যায়ন করতে ভালোবাসেন। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, তার নিজের স্বামীটাই আস্ত একটা ফেরাউন! গর্ভ থেকেও জন্ম দিয়েছেন রুমেলের মতো আরেক দুশ্চরিত্র উচ্ছন্ন ছেলে। এই নরপশুদের সাথেই দিনের পর দিন জীবন পার করে দিতে হচ্ছে ভালো মানুষটাকে।

কাজলী চোখের পলক ফেলে একটু মাথা তুলতেই মুখোমুখি বসে থাকা কাশেম মিয়ার স্ত্রী ঝুনুবিবির সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। ঝুনুবিবি এমন হিংস্র চাউনিতে তাকিয়ে আছে, যেন চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে কাজলীর গালে ঠাটিয়ে একটা চড় কষিয়ে দেবে। কাজলী বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে চরম অবহেলার সাথে চোখ ফিরিয়ে নিল। ড্রয়িং-ডাইনিংয়ের চারপাশের বড় বড় কাঠের দরজা আর জানালাগুলো সব হাট করে খোলা। সকালের উজ্জ্বল আলো হুড়মুড়িয়ে ঘরে এসে আছড়ে পড়ছে। চারপাশে এত আলো দেখেই হয়তো কাজলীর মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা ভয়টা একটু হলেও কমে এসেছে।

আলাউদ্দিন সওদাগর ঘরে ঢুকতেই রুমে উপস্থিত সবাই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয়বারের মতো তাকে কোরাস গলায় সালাম দিল। শুধু নিজের জায়গা থেকে একচুলও নড়ল না কাজলী। সে যেভাবে সোজা হয়ে বসে ছিল, ঠিক সেভাবেই বসে রইল। আলাউদ্দিন সওদাগর আড়চোখে কাজলীর স্পর্ধা খেয়াল করলেন। মেয়েটা একদম তার বাপের মতোই একগুঁয়ে আর ত্যাঁদড় হয়েছে!

আলাউদ্দিন সওদাগর সোফায় বসে জোহরার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে বললেন, “আপনার শরীর ঠিক আছে জোহরা বেগম?”

প্রশ্নটা শুনে জোহরা চেয়ারে একটু নড়েচড়ে বসলেন। তিনি যে রোগে ভুগছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে জীবন্ত নরক বললেও কম বলা হয়। জরায়ুর পেশির ভেতর প্রতিনিয়ত রক্তের চাকা জমে পুরো জরায়ুটা যেন একটা পাথরের মতো শক্ত আর ভারী হয়ে গেছে। প্রতি মাসে যখন পিরিয়ডের সময় হয়, তখন জোহরার মনে হয় কোনো জল্লাদ বুঝি তার তলপেট আর কোমর হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে কুচি কুচি করে ভাঙছে। ব্যথার তীব্রতায় তিনি বিছানায় শুয়ে কুকড়ে থাকেন, চিৎকার লুকাতে বালিশ কামড়ে ধরে পশুর মতো গোঙাতে থাকেন। সেই সময় রক্ত সাধারণ তরল আকারে ফিনকি দিয়ে পড়ে না; বরং জরায়ুর ভেতর জমে থাকা বড় বড় কালচে রক্তের চাকা লিভারের টুকরোর মতো মাংসপিণ্ড হয়ে বের হয়ে আসে। কোনো দামী প্যাড বা মোটা কাপড়ও সেই রক্তস্রোত আটকাতে পারে না, পুরো বিছানা নোনা রক্তে ভিজে একাকার হয়ে যায়। সেই দুর্গন্ধময় পচা রক্ত নিজ হাতে পরিষ্কার করে এই কাজলীই!

গত তিন বছর ধরে একটানা চড়া দামের ব্যথানাশক বা পেইনকিলার খাওয়ার কারণে জোহরার পাকস্থলীতে তীব্র এসিডিটি আর আলসার হয়ে গেছে। এখন ব্যথার বড়ি মুখে দিলেই বুক-পেট আগুনে পুড়ে খাক হয়ে যায়, সাথে সাথে শুরু হয় টক আর তিতো পিত্তবমি। 

গতকাল সকাল থেকে তার পুরো শরীরটা ভেঙে আসছে, তলপেটে মারাত্মক মোচড়ানি ব্যথা হচ্ছে। বুক ফেটে গেলেও মুখ ফোটার উপায় নেই। নিজের দুটো যুবতী মেয়ের নিরাপত্তা আর মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু বাঁচাতে একটা সমাধান আজ তাকে করতেই হবে। প্রয়োজনে তিনি আলাউদ্দিনের পায়ে পর্যন্ত পড়বেন।

নিজের ভেতরের সবটুকু কষ্ট আড়াল করে জোহরা হেসে বললেন, “জি ভাইজান, আল্লাহ ভালা রাখছোইন।” 

আলাউদ্দিন হেসে মাথা ঝাঁকালেন, “ভালো থাকলেই ভালো।”

তারপর চাউনিটা কঠোর হয়ে গেল। তিনি সরাসরি কাজলীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার বলো কাজলী, তোমার কী মনে হয়? তুমি যা করেছো, ঠিক করেছো?’’

কাজলী মেঝের দিক থেকে চোখ তুলে আলাউদ্দিনের চোখের দিকে তাকাল। ওর মেরুদণ্ড আরও টানটান হয়ে উঠল। একচুলও না কেঁপে, স্পষ্ট কণ্ঠে জবাব দিল, “আপনি যদি ওই লম্পট আশিকের আসল মুখোশ সবার সামনে ফাঁস করা নিয়ে প্রশ্নটা করে থাকেন, তবে হ্যাঁ, আমি একদম ঠিক করেছি!”

“আশিক যদি অন্যায় করেই থাকে, তবে সে কথা ওর বাবা-মাকে জানাতে পারতে। তারা কি তাদের ছেলেকে শাসন করত না?

“অন্যায় যদি করেই থাকে না আংকেল, অন্যায় করেছে! আর উনাদের আমি বহুবার জানিয়েছিলাম। পাত্তা দেয়নি।” 

কাজলী সোফায় বসা ঝুনুবিবির দিকে আঙুল তুলে বলল, “উল্টো উনি বলেছেন, তোর সাত কপালের ভাগ্য যে আমার পোলা তোরে পছন্দ করে!”

“মিছা কথা! এক্কেরে বানায়া বানায়া মিছা কথা কইতাছে!” ঝুনুবিবি আসন ছেড়ে হইহই করে করে উঠলেন।

কাজলী একচুলও না দমে শান্ত গলায় বলল, “আমি আপনার মতো মিথ্যার ওপর বাঁচি না।” 

ঝুনুবিবি রাগে কাঁপতে কাঁপতে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, আলাউদ্দিনের ইশারায় বাধ্য হয়ে মুখ বন্ধ করলেন।

আলাউদ্দিন কাজলীর দিকে ঝুঁকে গম্ভীর গলায় বললেন, “বেশ, ওর বাবা-মা পাত্তা দেয়নি মানলাম। তাহলে সরাসরি আমাকে জানাতে পারতে। তুমি আমার বস্তির মেয়ে, আমি শুনতাম না? আমি কি মরে গিয়েছিলাম? তা না করে ইন্টারনেটে ভিডিও ভাইরাল করে একটা ইজ্জতদার পরিবারকে হেনস্তা করেছো। এটা কি ঠিক হয়েছে?”

“আমি ওর পরিবার নিয়ে কিছুই বলিনি।”

“কিন্তু সমাজের মানুষ তো বাবা-মাকেই কথা শোনাচ্ছে।”

“বৃক্ষের পরিচয় তো ফলেই প্রকাশ পায়।”

“বড় বড় কথা বলো না! তোমার সাথে অন্যায় হয়েছে, মানছি। সেটা বসে মিটমাট করার জন্য সমাজে আমরা অনেকেই ছিলাম। কিন্তু তুমি আমাদের গোণাতেই ধরোনি!”

কাজলী এবার নিজের ভেতরের সবটুকু ভয় ঝেড়ে ফেলে চরম সাহসে বুক বাঁধল। সে সওদাগরের মুখের ওপর বলে ফেলল, “আপনাদের কাছে আমি কোন ভরসায় আসতাম, বলুন তো? এই তো কিছুদিন আগে আশিক আর ওর মা মিলে বস্তির মেয়েটাকে সবার সামনে পিটাল! আপনারা কি সেটার কোনো বিচার করেছিলেন? ওই মেয়ের মৃত্যুর সত্য কি আপনারা খোলাসা করতে পেরেছিলেন? যেখানে একটা জ্যান্ত মেয়ে মরে যাওয়ার পরও এই দরবারে কোনো ন্যায়বিচার পায়নি, টাকা আর ক্ষমতার জোরে আপনারা সব ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছেন সেখানে হ্যারাসমেন্টের জন্য আপনারা আমাকে কী বিচার পাইয়ে দিতেন?”

কথাটা শোনামাত্রই ঝুনুবিবি সোফা থেকে স্প্রিংয়ের মতো লাফ দিয়ে উঠলেন। চিৎকার করে বললেন, “এই মাইয়া এই! ভালোয় ভালোয় কইতাছি মুখটা কম চালা! তুই দেখছস আমরা ওই মেয়েরে মারছি? কোন সাহসে অপবাদ দেছ?” 

“সবকিছু চোখে দেখতে হয় না। পুরো বস্তির মানুষ জানে, ওটা আত্মহত্যা নাকি ঠান্ডা মাথার খুন!” 

ড্রয়িংরুমে তখন পিনপতন নীরবতা। কাজলীর দুঃসাহস দেখে আলাউদ্দিন সওদাগরের ভেতরের অহংকার আর ক্ষমতা চাবুক খেল। তিনি নিজের রাগ সামলাতে না পেরে এবার জোহরা বেগমের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে হুঁশিয়ারি গলায় গর্জে উঠলেন, “জোহরা বেগম! আপনার মেয়েরে বলেন বড় বড় কথা না বলতে। বেয়াদবির একটা সীমা থাকে। হয় নিজের মেয়ের মুখ সামলান, আর না হয় এই মুহূর্তেই ওরে নিয়ে আমার বাড়ি থেকে বিদায় হোন!”

“আপনি তো আমার ওপরেই দোষ দিচ্ছেন। তাই…”

কাজলী নিজের কথাটুকু শেষ করার সুযোগও পেল না। তার আগেই জোহরা ক্ষিপ্ত পশুর মতো মেয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কাজলীর পিঠে সজোরে কয়েকটা কিল-ঘুষি বসিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “চুপ কর হারামজাদি! এক্কেরে চুপ কর!”

মেয়ের মুখ বন্ধ করে জোহরা আলাউদ্দিন সওদাগরের দিকে করজোড়ে তাকালেন। অনুনয়-বিনয় করে বললেন, “ভাইজান, ও ছোড মানুষ, দুনিয়াদারী কিছু বোঝে না। আপনি দয়া করে এই ঝামেলাটা মিটমাট করে দেন। যা হবার তো হইয়াই গেছে। ও ইন্টারনেট থেইকা সব ভিডিও, লেখা সরায়া দিব। আপনি খালি কাশেম ভাইরে একটু বুঝায়া কন, মনে যাতে কোনো রাগ-গুসা না রাখে। উনার লোকেরা সকাল-বিকাল লাঠি সোটা নিয়া বস্তিতে ঘোরে, উনাদের মনে যে অনেক রাগ, সেইটা আমি ভালো করেই বুঝছি। উনার পোলাও একটা ভুল কইরা লাইছে, আর আমার ছেড়িডাও ভুল করছে। দুইডাই তো ছোড মানুষ ভাইজান! আপনি একটু দয়া কইরা সমাধান কইরা দেন। এই দুনিয়ায় আমার দুইটা এতিম ছেড়ি ছাড়া আর কেউ নাই। আর এই ছেড়িডা, কাজলী…ও ছাড়া আমার পঙ্গু ছেড়ি আর আমার কোনো গতি নাই। ও যদি কোনো বিপদে পড়ে, তবে আমগোর রাস্তায় নাইমা ভিক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকব না। আপনি একটু মায়া করেন ভাইজান! ভুল হইয়া গেছে আমগোর, এইবারের মতো ভুলটা শুধরায়া দেন।”

বলতে বলতে জোহরা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। মায়ের অনুনয় কাজলীর বুকে তীরের মতো বিঁধল। তার ভীষণ অসহ্য আর দমবন্ধ লাগছিল, তবু মায়ের জরাজীর্ণ অসুস্থ শরীরের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভ চেপে ধরে চুপ করে রইল।

ড্রয়িং-ডাইনিংয়ের ঠিক ওপাশের আড়াল থেকে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছিয়া সব দেখছিলেন। জোহরার পরিবারটার জন্য তার মনে অনেক মায়া৷ নিজের অজান্তেই তার দুই চোখ নোনা জলে ভিজে ভারী হয়ে এলো।

আলাউদ্দিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর কাশেম মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, "কাশেম মিয়া, আশিকরে বলিও কাজলীর পিছু ছেড়ে দিতে। ওর জন্য কি দুনিয়ায় মেয়ের অভাব? আর কাজলী, তুমি এখন উনাদের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাও। তোমার ওইভাবে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া মোটেও উচিত হয়নি। এতে উনাদের সমাজে সম্মানহানি হয়েছে।”

কাশেম মিয়া হঠাৎ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে উঠলেন, “কাজলী নিজে যদি না চাইত, তয় আমার পোলা জীবনেও ওরে জ্বালাতন করত না। আসল ঘটনা তো আপনে জানেন না, ওরা দুইজন প্রেম করত।”

কথাটা শোনামাত্র কাজলী চমকে উঠল। ঘৃণায় চোখ বড় বড় করে তাকাল। 

কাশেম মিয়া আরো বললেন, “কাজলী এহন বড়লোকের পোলা ধরছে। আমার পোলার লগে বেইমানি করছে। ভালোবাসার মানুষের বেইমানি আমার পোলার সহ্য হয় নাই। নিজের বুকের ভেতর আগুন জ্বললে কার সহ্য হইব আপনিই কন? আপনার নিজের কি সহ্য হইত?”

“কী বলতেছেন এসব? কেন মিথ্যা কথা বলতেছেন?” কাজলী চিৎকার করে উঠল।

ঝুনুবিবি তাল দিল, “মিথ্যা তো তুই কইতেছস! লাজ শরম আছে তোর? পড়াশোনা করে এক্কেরে নটি হইছে একটা! এই যে ঝিলমিল আপা, মুখে কুলুপ আইট্যা বইসা আছেন কেন? কথা কন।”

ঝিলমিল আপা মুখে একটা জর্দা দেওয়া পান পুরে চিবোতে চিবোতে উদাসীন ভঙ্গিতে বললেন, “ এসব শরমের কথা কি কমু কন? মাঝেমধ্যে দুজন আমার ঘরে আসত। সময় কাটাইত। আমি তো ভাবছিলাম, পরে দুজন বিয়া শাদী করব। কিন্তু হঠাৎ শুনি কাজলীর অন্য জায়গায় বিয়া ঠিক হইছে। এরপরই তো আশিক ক্ষ্যাপল আর এই ভিডিওর কাহিনি হইলো।”

পাশ থেকে ক্যারাম আর জুয়ার আসর জমানো লম্পট লোকটা দাঁত কেলিয়ে টিপ্পনী কাটল, ‘কাজলীরে নিয়া আমার বাইক দিয়া তো আশিক কতদিন ঘুরতে গেছে! আজকালকার মাইয়াগো বিশ্বাস নাই, কতদিকে যে মন থাকে ওদের!”

কাজলীর টলটলে চোখ দুটো নোনা জলে ভিজে উঠল। মুরুব্বি গোছের মানুষগুলো একটা অসহায় এতিম মেয়েকে একা পেয়ে কীভাবে অবলীলায় এতগুলো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দিল! জোহরা বেগম এতক্ষণ মেয়ের পক্ষে অনুনয় করলেও, সবার মুখে একই কথা শুনে সন্দিহান চোখে কাজলীর দিকে তাকালেন।

কাজলীর ঠোঁট দুটো অপমানে থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে জোহরার দিকে তাকিয়ে বলল, “আম্মা! এসব মিছা কথা, আল্লাহর কসম মিছা কথা! বিশ্বাস করো আম্মা, তোমার মেয়ে এমন না! আপনারা আমার ওপর এমন অপবাদ কেন দিতেছেন? মরণের ভয় নাই আপনাদের?”

ঝুনুবিবি নাক সিটকে বললেন, “মরণের ভয় তুই কর ছুঁড়ি! এমন নষ্ট চরিত্র নিয়া কবরেও জায়গা হইব না।”

“এতক্ষণ ধরে যা যা বললেন আপনারা, একটাও কি প্রমাণ করতে পারবেন?” কাজলীর কণ্ঠ কান্নার মাঝেই ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে উঠল। 

“আমরা কি আগে থেইকা জানতাম তুই পরে অস্বীকার যাবি? জানলে তো ভিডিও-ছবি সব প্রমাণ রাখতাম! তয় আশিকের কাছে প্রমাণ আছে।” ঝিলমিল আপা পান চিবোতে চিবোতে বললেন।

“তাহলে আশিকরে ডাকেন! আমি জানি, ও এই বাড়িতেই লুকিয়ে আছে। ওরে সামনে আনেন, বলেন প্রমাণ দিতে! ও যদি একটা প্রমাণও দেখাতে পারে, আমি কোনো দিন ওর সাথে প্রেম করছি। তবে আপনারা এখানে আমাকে যে শাস্তি দেবেন, আমি মাথা পেতে নেব।”

মেয়ের আত্মবিশ্বাস দেখে জোহরা বললেন, “কোনো ভুল বোঝাবুঝি হইতে পারে কাশেম ভাই। আমার কাজলী ওমন ছেড়ি না, আমি ওরে চিনি।”

“তুমি তোমার মাইয়ারে এক আনাও চিনো না জোহরা! সকাল থেকে রাত অবধি মাইয়া তোমার বাইরে বাইরে ঘোরে। কার সাথে কোথায় কি করে বেড়ায়, তার কোনো খবর রাখো তুমি? সারাদিন তো নিজের অসুখ নিয়া বিছানায় পইড়া থাকো! মেয়ের কোন খবরটা রাখো শুনি? একটা আস্ত খান** জন্ম দিছো তুমি!”

ঝুনুবিবির মুখ থেকে বের হওয়া জঘন্য কুৎসিত গালিটা শোনামাত্রই কাজলীর মনে হলো তার দুই কান দিয়ে দাউদাউ করে আগুন বের হচ্ছে। ও আর এক মুহূর্তও ওখানে বসে থাকতে পারল না। ঝটকা মেরে নিজের চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। 

এরা চক্রান্ত করে তাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে। এখানে দাঁড়িয়ে যুক্তির খাতিরে নিজের পবিত্রতার কথা বলা আর অরণ্যে রোদন করা একই কথা। এদের ক্ষমতার দাপটের কাছে সত্য বড্ড অসহায়। ও চোখের জল মুছে জোহরা বেগমের হাতটা ধরে টান দিল। অশ্রুভেজা গলায় বলল, “আম্মা, চলো এখান থেকে। দেখতেছ না তুমি? এখানে কোনো দিন বিচার হয়নি৷ হবেও না! স্রেফ সালিশের নামে নাটক সাজিয়ে তোমার মেয়ের চরিত্রে ওরা কালি মাখাচ্ছে। চলো আম্মা!”

জোহরা বেগম চেয়ার থেকে উঠলেন না। তিনি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মুখটা তুলে কাজলীর দিকে তাকালেন। সন্দেহী চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে শুধালেন, “তুই... তুই সত্যিসত্যি আশিকের লগে কোনো সম্পর্ক করছিলি কাজলী?”

কাজলীর বুকের ভেতরের কলিজাটা যেন কেউ জ্যান্ত টেনে ছিঁড়ে ফেলল! যন্ত্রণায় তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। এই দুনিয়ার সব মানুষ তাকে নোংরা বলুক, বেশ্যা বলুক তাতে তার কিছু যায় আসত না, কিন্তু তার নিজের গর্ভধারিণী আম্মাও শেষমেশ তাকে সন্দেহ করল! সাজানো মিথ্যাটাকে বিশ্বাস করে বসল! 

পরক্ষণেই কাজলী মনে মনে হাসল। জোহরা বেগম সন্দেহ না করলে আর কে করবে? যে মা অবলীলায় বিশ্বাস করতে পারেন, কাজলী প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা বাইরে বাইরে ঘুরে নিজে একা একা ভারী চমৎকার সব নামী-দামী খাবার খেয়ে বেড়ায়, আর ঘরে ফিরে এসে মা ও পঙ্গু বোনকে স্রেফ ডাল-ভাত খাওয়ায়! যে মা নিজের ভুল ধারণার ক্ষোভে প্রতিদিন রাতের বেলা পাতিল চেঁছেপুঁছে এক দলা ভাতও অবশিষ্ট না রেখে নিজেরা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন; সেই জন্মদাত্রী মাকে যখন সমাজের চার-পাঁচ জন প্রভাবশালী ও দাপুটে মানুষ একজোট হয়ে মেয়ের চরিত্র নিয়ে এমন নোংরা কুৎসা শোনায়, তখন তার মনে তো সন্দেহের জন্ম হবেই!

কাজলী অভিমানে বলল, “তুমি থাকো এদের সাথে।”

বলেই যেই না ঘর থেকে বেরোতে গেল, অমনি রুমেল সদর দরজা আটকে দাঁড়াল। মুখে কিছুক্ষণ আগের হাসিটা ফুটিয়ে বলল, “কী ব্যাপার? প্রমাণ না দেখেই চলে যাচ্ছো যে?”

রুমেলের চোখের আকাশচুম্বী আত্মবিশ্বাস দেখে কাজলীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ একদম ফাঁকা হয়ে গেল। কিসের প্রমাণ দেখাবে? এত জোর কেন গলায়? কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝুনুবিবি পেছন থেকে এসে কাজলীর বাহুটা শক্ত করে টেনে ধরে তাকে আবার জোরপূর্বক চেয়ারটায় বসিয়ে দিল। রুমেল তার পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে কয়েকটা ছবি মেলে ধরল। ছবিগুলো দেখামাত্রই কাজলীর মাথায় আসমান ভেঙে পড়ল, চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, আশিক আর কাজলী একে অপরকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, এমন আরও বেশ কিছু আপত্তিকর ছবি! কাজলী তার জীবনে কখনো আশিকের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়ওনি, অথচ ছবিতে স্পষ্ট ওকেই দেখা যাচ্ছে! এমনকি ছবিতে ওর পরনে যে পোশাক, ঠিক একই পোশাকেই ওর ফেসবুকে ছবি আপলোড করা আছে। তবে কি ওরা প্রযুক্তির অপব্যবহার করেছে? এআই দিয়ে ডিপফেক ছবি বানিয়েছে?

কাজলী চিৎকার করে প্রতিবাদ করে করল, “এসব মিথ্যে! এসব এআই দিয়ে বানানো ফেক ছবি! আমি আমার জীবনে কখনো আশিকের সাথে ছবি তুলিনি। আমি ওর মতো একটা কুকুরের আশেপাশেও থাকতে চাই না, আর ছবি তুলব?”

ঠাস করে একটা থাপ্পড় এসে পড়ল কাজলীর ফর্সা গালে। সোফায় বসা ঝুনুবিবি এসে চড়টা কষিয়েছেন। রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “মুখ সামলে কথা ক! নয়তো জিভ টাইন্যা ছিঁইড়া দিমু। আমার পোলা যদি কুকুর হয়, তয় তুই কী রে? কুকুরের লগেই তো এতদিন শুইছস!”

একেতো অপবাদ তার উপর গায়ে হাত! কাজলী এক নিমেষে ক্ষ্যাপা সিংহীতে রূপান্তর হলো। সজোরে ঝুনুবিবির বুকে একটা ধাক্কা মেরে তাকে পেছনের দিকে ফেলে দিল। ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো গর্জে উঠে বলল, “খবরদার! এরপর যদি আমার গায়ে হাত দিয়েছেন, তবে হাত ভেঙে গুঁড়ো করে দেব!”

ধাক্কার ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে পেছনের দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেলেন ঝুনুবিবি। পা পিছলে সোজা দরজার বাইরে গিয়ে আছড়ে পড়লেন। ওপাশের ডাইনিংয়ের পর্দার আড়াল থেকে আছিয়া বেরিয়ে মহিলাকে মেঝে থেকে টেনে তুললেন। 

আলাউদ্দিন সোফা ছেড়ে বাঘের মতো চেঁচিয়ে উঠলেন, “ছোটলোকের বাচ্চা! এক থাপ্পড়ে গাল ফাটিয়ে দেব! গুরুজনকে কীভাবে সম্মান করতে হয়, তোর মা শেখায়নি?”

“উনি যখন আমার গায়ে হাত তুলল, তখন কোথায় ছিল এই গলার জোর?”

“তুই মারার মতোই অন্যায় করেছিস। এই ছবিগুলোই তার প্রমাণ!”

“এই ছবিগুলো ফেক, নকল! চক্রান্ত করে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে!”

“দুনিয়ার সব চোরই চুরি করার পর প্রথমে অস্বীকার করে।” কথাটি বলেই হাসল রুমেল।

কাজলীর বিপাকে পড়ে ছটফট করাটা সে খুব উপভোগ করছে।

কাজলীর গলা ভয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসতে লাগল। সে আড়চোখে চেয়ে দেখল, জোহরা নিজের পেটে দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে চেয়ারে কুঁকড়ে গেছেন। হয়তো জরায়ুর রক্তের চাকাগুলো আবার ভাঙতে শুরু করেছে। এই ঘরে সে বড্ড একলা। কে বাঁচাবে তাকে? নরপশুগুলো তার বিরুদ্ধে এত বড় চক্রান্ত কেন করল? এরা কি আজ তাকে মেরে ফেলবে? মেরে ফেলার আগে সবার সামনে কলঙ্কিত করে যাবে? 

কাজলী এক ছুটে রুমেলকে ধাক্কা মেরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলে ঝিলমিল আপা এসে শক্ত করে ওর হাতটা চেপে ধরল। মুখে পান চিবোতে চিবোতে বলল, “আরে যাস কোই। সমাধা না কইরা তোরে যাইতে দেব নাকি আমরা!”

কাজলী ঝিলমিল আপাকেও অন্য হাতে ধাক্কা মারতে চাইল, তার আগেই পেছন থেকে ঝুনুবিবি হিংস্র বাঘিনীর মতো তেড়ে এসে কাজলীর মাথার চুল মুঠি করে ধরে ফেলল। চুলে হেঁচকা টান মেরে চিৎকার করে বলল, “আমার পোলার খাইয়া, পোলার লগেই বেইমানি করছস! আবার ফেসবুকে ভিডিও দিয়া ওরেই পুলিশে ফাঁসাইছস! আজ এই দরবারে বিচার না লইয়া তুই যাবি কই?”

জোহরা বেগম তখন যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে চেয়ার থেকে হাত বাড়িয়ে তাদের বাধা দেওয়ার নিষ্ফল চেষ্টা করলেন। দুর্বল গলায় আকুল হয়ে বললেন, “আপা, ওর গায়ে হাত দিয়েন না। অনেক মাইর খাইছে আমার হাতে। ছাইড়া দেন ওরে। আমরা ঠান্ডা মাথায় কথা কই। ও কোনো দোষ কইরা থাকলে ওর শাস্তি হইব, আপনি ওরে ছাড়েন!”

ঝুনুবিবি কাজলীকে ছাড়ার আগেই, কাজলী নিজের সবটুকু শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে নিজের ডান হাতের কনুইটা সজোরে পেছনে থাকা ঝুনুবিবির বুক বরাবর আঘাত করে বসল। ওমন মরণজয়ী আঘাতে ঝুনুবিবি গগন কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলেন। যেন বুকের ভেতরের হাড়গোড় সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ব্যথায় নীল হয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়লেন।

আকস্মিক অভাবনীয় ঘটনাটায় ড্রয়িংরুমের প্রত্যেকে হতভম্ব হয়ে গেল। এত বড় বড় ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়েও কাজলীর মনের জোর বিন্দুমাত্র কমেনি; বরং প্রতিটা আঘাতে তার ভেতরের আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠছে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই ও'কে অত্যাধিক সাহসী, অত্যাধিক ভয়ঙ্কর করে তুলছে। নিজেকে নরপশুদের হাত থেকে বাঁচাতে ও সব করতে পারে। 

ঝিলমিল আপা আর কাশেম মিয়া একজোটে কাজলীর দিকে হিংস্রভাবে তেড়ে গেল। কাজলী এবারও না পিছিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এক কদম এগিয়ে গেল। সেখান থেকে কাচের ভারী পানির জগটা তুলে এক ঝটকায় ঝিলমিল আপার মুখ বরাবর ছুঁড়ে মারল। কাচের জগটা বাতাসে শিস কেটে গিয়ে ঝিলমিল আপার পায়ে আছড়ে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। 

কাশেম মিয়া রাগে অন্ধ হয়ে কাজলীর গলাটা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলেন। দেয়ালের সাথে চেপে ধরে 'বান্দির বাচ্চা', 'শুয়োরের বাচ্চা' বলে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে লাগলেন। জোহরা চোখের সামনে মেয়ের শ্বাসরোধ হওয়া দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। নিজের যন্ত্রণা ভুলে তিনি কাশেম মিয়ার লোহার মতো শক্ত হাত দুটো টেনে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। কাজলীর চোখের সামনে তখন সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল, দম আটকে যাচ্ছিল। মরার আগ অবধি ও হার মানবে না। কাজলী হার মানবে না৷ জগতের সব দুঃখ দেখে বড় হওয়া মেয়েটা হার মানতে পারে না।

ও নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে শরীরটাকে মোচড় দিয়ে কাশেম মিয়ার বৃদ্ধ হাত থেকে নিজেকে কোনোমতে ছাড়িয়ে নিল। এরপর টেবিল থেকে ডালের বড় কাচের ভারী প্লেটটা তুলে নিয়ে চোখের পলকে কাশেম মিয়ার মুখ বরাবর সজোরে আছড়ে মারল। প্লেটটা ভেঙে কাশেম মিয়ার মুখ রক্তাক্ত হয়ে যেতেই জোহরা বেগম আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন, “বান্দির বাচ্চা! কি করতেছস তুই এইডা? পাগল হইয়া গেছস তুই? আমগোরে তুই জেলে পাঠাইবি!”

কাজলী জোহরার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে জন্তুর মতো গর্জে উঠল, “আমার গায়ে যে হাত তুলবে, তার হাত আমি ভেঙে গুঁড়ো করে দেব! মরতে যদি হয়ই, তবে এদের মেরে তারপর মরব!”

জোহরা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলেন কাজলীর দিকে। ওর ভেজা চোখ দুটো লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। এলোমেলো চুলগুলো মুখের ওপর পড়ে আরো বিধ্বস্ত আরো ভয়ংকর দেখাচ্ছে।

কাজলী সদর দরজার দিকে তাকাল। রুমেল এখনও অবলীলায় হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। 

কাজলী আজ প্রথম কোনো পুরুষের ওপর হাত তোলেনি; এর আগেও দু-একটা বখাটেকে সে একাই পিটিয়েছে। ওর হাত বড্ড দ্রুত চলে। 

রুমেল খুব ভালো করেই জানে, ওকে কাবু করতে হলে সবাইকে একজোট হয়ে একসঙ্গে ধরতে হবে। আলাদা আলাদাভাবে একা একা ওর সামনে এলে কাজলী কীভাবে যেন নিজেকে ঠিক সেইফ করে ফেলে, নিজের আত্মসম্মানের মেরুদণ্ডটা ও কিছুতেই ভাঙতে দেয় না। 

রুমেল ঠোঁট গোল করে শিষ বাজাল। সঙ্গে সঙ্গে বারান্দা থেকে একটা পদশব্দ শোনা গেল। আশিক… আশিক আসছে! 

কাজলীর সারা শরীরে আগুন ছুটে গেল, একই সাথে ভয়ে ওর শিরদাঁড়াটা শিরশির করে উঠল। রুমেল, আশিক আর কাশেম মিয়া যদি এখন একসঙ্গে ও'কে চেপে ধরে, কিংবা নেশাখোর রুমেল একাই যদি ওর ওপর চড়াও হয়, ও পারবে না; কোনোভাবেই ওদের গায়ের জোরের সাথে পেরে উঠবে না। নিজেকে বাঁচানোর শেষ মরিয়া চেষ্টায় ও এক ছুটে ডাইনিং স্পেস থেকে পিছিয়ে গেল। সোজা আলাউদ্দিনের শোবার ঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে ভেতর থেকে খিল লাগিয়ে দিল।

ঘরের ভেতর আটকা পড়ে কাজলী বুক ভরে দম নেওয়ার চেষ্টা করল। এরপর দ্রুত কাঁপা কাঁপা হাতে কাঁধের ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল। ওর এমন কোনো আপনজন বা প্রভাবশালী চেনা কেউ নেই, যাকে একটা কল করলে ছুটে এসে নরপশুদের হাত থেকে ও'কে বাঁচাবে। দেশের সাধারণ জনগণই এখন একমাত্র ভরসা। এছাড়া কেউ এখান থেকে বের করতে পারবে না।

কাজলী এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে ফেসবুক লাইভে চলে গেল!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp