কাজী সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
— “দেনমোহর কত ধার্য করব?”
অভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “দেনমোহর দিয়ে কী হবে?”
কাজী শান্ত স্বরে বুঝিয়ে বললেন,
— “এটা স্ত্রীর হক। স্বামীর পক্ষ থেকে তার প্রাপ্য। আর যদি কোনোদিন স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে চলে যেতে চায়, তাহলে এই দেনমোহরের টাকাটাও সে পাবে।”
কথাটা শেষ হতেই—
ধাম!
অভ্র এমন জোরে টেবিলে হাত আঘাত করল যে চারপাশ কেঁপে উঠল।
চেয়ার ছেড়ে সামনের দিকে ঝুঁকে আগুনঝরা চোখে কাজীর দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
— “এই! আমার বউ আমাকে ছেড়ে যাবে কেন?”
মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ নিস্তব্ধ।
কাজী সাহেব ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে চুপ মেরে গেলেন।
অভ্র আবার ধমকে উঠল,
— “বল! কথা বন্ধ কেন? জলদি বল!”
কাজী তোতলাতে তোতলাতে বললেন,
— “সে-সেটা তো... যদি আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে থাকতে না চান...”
— “থাকতে চাইবে না কেন?”
অভ্রের কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
— “আমি কম কিসে? কোন দিক দিয়ে আমার ঘাটতি আছে? এমন কী কারণ হবে যে আমার বউ আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?”
কাজী সাহেব অসহায় চোখে চারপাশে তাকালেন। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো সাহস বা যুক্তি—কোনোটাই তার কাছে নেই।
ঠিক তখনই জারিফ নিজের ফোনটা অভ্রের সামনে ধরল।কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে পুরো বিষয়টা বুঝতে পারল অভ্র।
চোয়াল শক্ত করে গভীর শ্বাস নিল সে। তারপর
নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
— “হুম... আচ্ছা।”
এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল,
— “যদিও আমার যা কিছু আছে, সবকিছুর অধিকারিণী আমার বউ-ই হবে... তবুও লিখুন—”
তার কণ্ঠে ছিল অটল দৃঢ়তা।
— “এক কোটি এক লক্ষ এক হাজার একশত এক টাকা।”
কাজী দ্রুত হাতে কলম চালাতে শুরু করলেন।
কিন্তু অভ্রের কথা তখনও শেষ হয়নি।সে মাথা উঁচু করে সামনে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল এক অদ্ভুত, হিমশীতল কঠোরতা—যে দৃষ্টি মুহূর্তেই চারপাশের সব শব্দ স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। উপস্থিত সবাই যেন অজান্তেই নিঃশ্বাস আটকে রাখল।
অভ্র ঠোঁট শক্ত করে বলল,
— “আর একটা কথা... যদি কোনোদিন আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, আমি তাকে কখনো বাধা দেব না। তার পথ আগলে দাঁড়াব না, তাকে আটকে রাখার চেষ্টাও করব না।”
এরপর সে মাথা কাত করে রাহার দিক তাকিয়ে এমন এক কণ্ঠে বাকিটা বলল, যার শীতলতা উপস্থিত সবার বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিল—
— “কিন্তু... যে মানুষটার কাছে যাওয়ার জন্য সে আমাকে ছেড়ে যাবে, তার শেষ বিদায়ের আয়োজন আমি নিজ হাতে করব। কাফনের কাপড় থেকে শুরু করে জানাজার কাতার পর্যন্ত—সবকিছুর ব্যবস্থা থাকবে আমার।”
তার কণ্ঠে কোনো চিৎকার ছিল না, কোনো উত্তেজনাও ছিল না।আর সেই নীরব, নির্মম উচ্চারণটাই কথাগুলোকে আরও ভয়ংকর করে তুলল।
কাজীর হাতে ধরা কলম হঠাৎ কেঁপে উঠল।
তিনি একবার অভ্রের দিকে, একবার কাগজের দিকে তাকালেন।
আর জারিফ মনে মনে বলল,
— “আল্লাহ বাঁচাও! দেনমোহর থেকে শুরু হয়ে সরাসরি জানাজা পর্যন্ত পৌঁছে গেল!”
এসব কথা শুনে রাহা যেন আরও ভেঙে পড়ল। তার কান্নার শব্দ মুহূর্তেই দ্বিগুণ তীব্র হয়ে উঠল। চোখের জল থামার কোনো নাম নেই।আর কাজী সাহেবের অবস্থা তো আরও করুণ। তিনি থরথর করে কাঁপছেন। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, আর মনে মনে আউড়াচ্ছেন—
— "হে আল্লাহ! আমি কোথায় এসে পড়লাম? এরা কোন জগতের মানুষ! আমার অফিস আর আমার নিজেরতো বারোটা নয়, সরাসরি তেরোটা বাজিয়ে ছাড়ছে!"
অভ্রের হুমকিতে উপস্থিত সবাই বুঝে গিয়েছে তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আর একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস কারও নেই।ঠিক তখনই সবাই বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াতেই রাহা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—
— “আমি কবুল বলব!
বলব আমি কবুল!”
মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে সবার পদক্ষেপ থেমে গেল।
আর অভ্র...
তার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময়, শয়তানি তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে রাহার পাশে গিয়ে বসে জারিফের দিকে ইশারা করল।
ইশারা বুঝতেই জারিফ দ্রুত কাজীর দিকে ফিরে বলল—
— “কাজী সাহেব, আর দেরি নয়। শুরু করুন।”
কাজী সাহেব শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা কণ্ঠে সামনে এগিয়ে এলেন। তারপর নিকাহনামার পাতা খুলে পড়তে শুরু করলেন—
— “ঢাকার নিবাসী, খান বাড়ির জনাব আমান খানের একমাত্র পুত্র, জনাব জিহাদ খান অভ্রের সঙ্গে, জনাব আসাদ খানের একমাত্র কন্যা আশফিয়া খান রাহার সহিত,’এক কোটি এক লক্ষ এক হাজার একশত এক টাকা মাত্র,দেনমোহর ধার্য করিয়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া।”
কথাটা শেষ করেই কাজী সাহেব আবার কাগজের দিকে তাকালেন। পরের লাইন পড়তেই তার কণ্ঠ আরও দুর্বল হয়ে গেল।
— “এবং বিশেষ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হইল, যদি স্ত্রী স্বেচ্ছায় স্বামীকে ত্যাগ করিয়া অন্য কারও সহিত জীবন গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে তাহার কাফনের কাপড় ক্রয়ের অর্থও পূর্বনির্ধারিত ধার্য থাকিবে...”সব কিছু মানিয়া লইয়া,,
কথাগুলো শুনে উপস্থিত সবার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শীতল স্রোত বয়ে গেল।
আর অভ্র?
সে তখনও একইভাবে বসে আছে। ঠোঁটের কোণে সেই ভয়ংকর স্থির হাসি, চোখে অদম্য অধিকার আর অশুভ নিশ্চয়তার ছাপ।
কাজী সাহেব কাঁপা গলায় শেষবারের মতো রাহার দিকে তাকিয়ে বললেন—
— “বলো মা... কবুল?”
রাহার মাথা যেন পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। বাড়িতে ফিরে সে কী বলবে? তার মা যদি জিজ্ঞেস করে, কী উত্তর দেবে? একটার পর একটা প্রশ্ন তাকে ভেতর থেকে চেপে ধরছে।
ঠিক তখনই অভ্র ধীরে তার দিকে ঝুঁকে এলো আর বলতে লাগলো,
— “তুই কি মনে করেছিস, বোকা মেয়ে? তোকে আমি ছেড়ে দিবো..!
হা হা হা...
তুই আমার না হলে, তোকে শেষ করবো... আমি নিজেও শেষ হবো।"
এই বরফশীতল হুমকি শুনে রাহার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল।ভীত, আতঙ্কিত চোখে সে অভ্রের দিকে তাকাল।
আর যা দেখল, তাতে তার শরীরের রক্ত যেন মুহূর্তেই হিম হয়ে গেল।
অভ্র তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ঠোঁটে লেগে আছে এক ভয়ংকর, রহস্যময়, অস্বাভাবিক হাসি—যে হাসি কোনো সুস্থ মানুষের হতে পারে না।
চারপাশের সব শব্দ যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগল।
এক পর্যায়ে দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর, কাঁপতে কাঁপতে রাহার ঠোঁট নড়ল।
— “ক...কবুল...”
চোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।
— “কবুল...”
কণ্ঠ আরও ভেঙে গেল।
— “কবুল...”
শব্দটা উচ্চারণ করেই সে প্রায় ঢলে পড়ল।
পরক্ষণেই অভ্র তাকে শক্ত করে নিজের বুকে আগলে নিল। যেন বহু বছরের অপেক্ষার পর নিজের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা অবশেষে পেয়ে গেছে।
তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক তৃপ্ত, বিজয়ী হাসি।
সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দ্বিতীয়বার বিয়ে করা স্ত্রীর দিকে।
অথচ তার নিষ্পাপ, হতভম্ব বউটা জানতেও পারল না—যাকে সে আজ দ্বিতীয়বার বিয়ে করল, সেই মানুষটিই আসলে তার দ্বিতীয়বার বিয়ে করা স্বামী।
এদিকে কাজী সাহেব কাঁপা গলায় বললেন,
— “এবার বর কবুল বলুন।”
অভ্র মুখ খুলল ঠিকই, কিন্তু বলার আগে হঠাৎ থেমে গেল।
তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— “জারিফ, তাড়াতাড়ি ভিডিও অন কর।”
সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার বলল,
— “নইলে এই মেয়ে যেই ধানিলঙ্কা পরে বলবে, নিজে দেখেনি, তাই বিয়ে মানে না। আর বাসায়ও তো প্রমাণ দেখাতে হবে।”
কথাটা শুনে উপস্থিত অনেকেই বিব্রত হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।
ঠিক তখনই জায়ান হালকা কাশি দিয়ে বলল,
— “বস, সেই চিন্তা বাদ দেন। আমি প্রথম থেকেই পুরো ঘটনা ভিডিও করছি।”
বাহ! গুড জব!
উম্মাহ বলে একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিল।
জায়ান সঙ্গে সঙ্গে কেশে উঠল। অভ্রের এমন নির্লজ্জ অথচ আত্মবিশ্বাসী কাণ্ড দেখে সে যেন মুহূর্তের জন্য কী প্রতিক্রিয়া দেবে বুঝতেই পারল না।
অভ্র ধীরে ধীরে তার বাহুতে আশ্রয় নেওয়া রাহার মুখখানি নিজের দু'হাতের একটিতে আলতো করে তুলে ধরল। তার দৃষ্টিতে তখন ছিল গভীর মমতা, অধিকার আর অব্যক্ত ভালোবাসার তীব্রতা। কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে তাকিয়ে থেকে সে গম্ভীর অথচ আবেগময় কণ্ঠে বলে উঠল—
— “কবুল... কবুল... কবুল...”
চারপাশ যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
অভ্র ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে আবার বলল—
— “ তুমি আমার বেগম... আমার জীবনের একমাত্র পরিপূর্ণতা... আমার হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি... আমার আত্মার প্রশান্তি... আমার অস্তিত্বের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ।”
কথাগুলো বলেই সে সবার সামনেই রাহার কপালে এক গভীর, স্নেহমাখা চুম্বন এঁকে দিল।
সবাই তৎক্ষণাৎ মাথা নত করে ফেলল, চোখও নিচের দিকে ঝুঁকে গেল। কারও সাহস হলো না আর একবারও অভ্রের দিকে তাকানোর।
আয়াতের বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক শূন্যতায় ভরে উঠছিল। জীবনে প্রথমবার কারও প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেছিল সে। কিন্তু মাঝপথেই সবকিছু এমন মোড় নেবে, তা কখনো কল্পনাও করেনি। তবুও নিজের অনুভূতিকে নীরবে চাপা দিয়ে মনে মনে বলল—তারা যদি ভালো থাকে, তাদের সুখ দেখেই সেও শান্তি খুঁজে নেবে।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কাজীকে তার প্রাপ্য সম্মান ও পারিশ্রমিকের চেয়েও বেশি দিয়ে বিদায় জানানো হলো। কাজী যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
এরপর অভ্র কোনো কথা না বলে রাহাকে শক্ত বাহুতে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। তার পদক্ষেপ ছিল দৃঢ়, কর্তৃত্বময় ও অবিচল।
ঠিক তখনই ইভান সামনে এগিয়ে এলো।
অভ্র তার দিকে একবার তাকিয়ে গম্ভীর, শীতল কণ্ঠে বলল,
— “আমার জিনিসকে আমি আজ সম্পূর্ণভাবে আমার করে নিয়েছি। আশা করি, এ নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের জটিলতা বা আপত্তি সৃষ্টি হবে না।”
অভ্রের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে ইভানের এক মুহূর্তও লাগল না।
কারণ সে জানত, তার বাবা-মা বহুদিন ধরেই রাহাকে তাদের পুত্রবধূ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। আর আগামীকাল এই খবর জানার পর তার মা যে পুরো বিষয়টা সহজভাবে নেবেন না, সেটাও অনুমান করা কঠিন ছিল না।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে ইভান স্থির কণ্ঠে বলল,
— “সেটা আমি সামলে নেব, ইনশাআল্লাহ। তবে একটা কথা বলব... আমার বোনটা এখনও অনেকটাই সরল, আবেগপ্রবণ। কখন কী করে বসে, অনেক সময় সে নিজেও বুঝতে পারে না।”
একটু থেমে সে রাহার দিকে তাকাল, তারপর আবার অভ্রের দিকে দৃষ্টি স্থির করে বলল,
— “তাকে বোঝার, আগলে রাখার আর ভালো রাখার দায়িত্ব আজ থেকে আপনার। আমি বিশ্বাস করতে চাই, আপনি শুধু তার স্বামীই নন, তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ও হবেন। আশা করি, আমার এই বিশ্বাসকে কখনো ভাঙতে দেবেন না।”
অভ্র ধীর, স্থির দৃষ্টিতে ইভানের দিকে তাকাল। তার চোখের গভীরতা যেনো চারপাশের বাতাসকেও ভারী করে তুলছে। ইভান সেই দৃষ্টি অনুভব করেই অস্বস্তিতে একটু নড়ে উঠল।
অভ্র ঠান্ডা, দৃঢ় স্বরে বলে উঠল—
— “রাহা এখন আমার স্ত্রী। আমার ঘরের চাঁদ। আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন ।আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তাকে নিয়ে আর কারও চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই ওর জন্য যথেষ্ট।"
আশা করি বুঝতে পেরেছো। এখন চল, বাসায় ফিরি।
ইভান নমনীয় কণ্ঠে জবাব দিল—
— “না ভাইয়া, কুমিল্লা যেতে হবে। ওখানকার ব্যাপারটা সামলাতে হবে।”
অভ্র এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে শান্ত কিন্তু কঠোরভাবে বলল-
— “তাহলে আয়াতকে রেখে যাও। অনেক রাত হয়ে গেছে।”
তখনই আয়াত দ্রুত বলে উঠল, কণ্ঠে স্পষ্ট জেদ আর সিদ্ধান্ত—
— “না না অভ্র ভাইয়া, আমিও ভাইয়ার সাথে বাসায় চলে যাব। পরে আবার আসব।
তারা বিদায় নিয়ে চলে যায় ।
—————
এদিকে অবন্তিকা, সাফা, জারিফ আর জায়ান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। চারপাশের পরিস্থিতি এতটাই ভারী আর শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠেছিল যে, একসময় অবন্তিকার শরীর টাল সামলাতে না পেরে কেঁপে উঠল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলে সে ঢলে পড়তে যাচ্ছিল।
সাফা তাকে ধরার জন্য হাত বাড়ানোর আগেই—
“অবন্তিকা!”
আতঙ্কমিশ্রিত চিৎকার দিয়ে জারিফ মুহূর্তের মধ্যে এগিয়ে এসে তাকে নিজের বাহুতে আগলে নিল।
হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনায় সাফা পর্যন্ত চমকে উঠল। দুই বান্ধবীর এমন বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে সে পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়ল।তাকে একটি বেঞ্চের উপর শুইয়ে দেয় হলো,দ্রুত পানি এনে মুখে ছিটিয়ে দেওয়া হলো। কয়েক মুহূর্ত পর অবন্তিকার নিস্তেজ, আধবোজা চোখ ধীরে ধীরে খুলতে লাগল। দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই সবার আগে সামনে ঝুঁকে থাকা জারিফকে দেখতে পেল সে।
তার মাথার পাশে উদ্বিগ্ন মুখে বসে ছিল সাফা। আর জায়ান তড়িঘড়ি করে গাড়ি আনতে চলে গেছে।
জারিফ তখনও অবন্তিকার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল। তার মুখজুড়ে ছিল স্পষ্ট উৎকণ্ঠা আর অস্থিরতা। বারবার দু'হাতে অবন্তিকার গাল আলতো অথচ ব্যাকুলভাবে চেপে ধরে ডাকছিল—
— “অবন্তিকা! শুনতে পাচ্ছেন? চোখ খুলুন... প্লিজ, চোখ খুলুন!”
কণ্ঠের কম্পন, চোখের অস্থিরতা আর আচরণের ব্যগ্রতা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছিল, এই মুহূর্তে অবন্তিকার অবস্থা তাকে ভেতর থেকে
ভয়ংকরভাবে বিচলিত করে তুলেছে।কিছুক্ষণ পর অবন্তিকার সামনে পুরো ঘটনাটা পরিষ্কার হতেই সে যেন এক মুহূর্তও দেরি না করে—দুই হাত প্রসারিত করে, সামান্য উঁচু হয়ে জারিফকে আঁকড়ে ধরে ফেলল, গলার চারপাশে দুই বাহু শক্ত করে পেঁচিয়ে নিল।
অন্যদিকে জারিফ তখন পুরোপুরি স্তব্ধ। এক হাতে পানির বোতলটা শক্ত করে চেপে ধরে , আর অন্য হাতটা অর্ধউঠানো অবস্থায় থেমে গেছে—কিন্তু ছোঁয়ার সাহস পাচ্ছে না। তার গলা শুকিয়ে কাঠ, বারবার শুকনো ঢোক গিলছে; অ্যাডামস অ্যাপেলটা অস্থিরভাবে ওঠানামা করছে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে—অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে ধকধক করছে। নিজের ভিতরেই অচেনা এক দুর্বলতা তাকে গ্রাস করছে—যে মানুষ কখনো চোখ না পিটিয়ে প্রাণ নেওয়ার সাহস রাখে, সেই মানুষটাই আজ নীরব, স্থির, থমকে গেছে।
সাফা পুরোপুরি বিহ্বল। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছে যেন। সামনে দৃশ্যটা বিশ্বাসই করতে পারছে না—অবাক, স্থবির, নির্বাক হয়ে শুধু তাকিয়ে আছে দুইজনের দিকে।
জায়ান তখন এসে দৃশ্যটা দেখে প্রথমে হালকা হাসি চেপে রাখতে পারে না। কিন্তু সাফার দিকে চোখ পড়তেই তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে যায়। মনে প্রশ্ন জাগে—যে সন্দেহটা সে কিছুদিন ধরে মনে মনে আঁচ করছিল, তবে কি সেটাই সত্যি?
অন্যদিকে অবন্তিকা জারিফকে আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে চলেছে। ভয়ে, আতঙ্কে পুরোটা কেঁপে উঠেছে সে। এমনভাবে জারিফকে জড়িয়ে ধরেছে, যেন এক মুহূর্তের জন্যও তাকে ছেড়ে দিলে সে হারিয়ে যাবে—নিজেকে জারিফের ভেতরেই মিলিয়ে দিতে চাইছে।
চারপাশের বাতাসও যেন থেমে গেছে—শুধু অনুভূতির এক তীব্র, ভারী ঢেউ সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলেছে।
কিছুক্ষণ সেই স্তব্ধতা ভেঙে উঠতে দেরি হলো।
অবন্তিকার কান্নার শব্দটা ভারী হয়ে উঠছিল, বুক ফেটে আসা চাপা কান্না—যা আর আটকে রাখা যাচ্ছে না। জারিফ তখনও একদম স্থির। অবন্তিকার হাতের আঁকড় যেন তার শরীরের ভেতরেও একটা কম্পন ছড়িয়ে দিচ্ছে।
জারিফ ধীর গতিতে নিঃশ্বাস নিল… তারপর খুব সাবধানে জারিফ কাঁপতে থাকা হাতটা একবার অবন্তিকার পিঠে আলতো করে রাখল, তারপর ধীর, দৃঢ় গলায় বলে উঠল—
“রিলাক্স… কিছু হয়নি।”
অবন্তিকার শরীর এখনো থরথর করে কাঁপছে, কান্নার তীব্র স্রোতে তার বুক বারবার ভেঙে পড়ছে। সময় একটু এগোতেই সে ধীরে ধীরে সরে এল—নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার এক ব্যর্থ কিন্তু দৃঢ় চেষ্টা। আশ্চর্যের ব্যাপার, আজ তার ভেতরে যেন কোনো জড়তা কাজ করছিল না; সব বাধা যেন একে একে গলে যাচ্ছে।
চোখের সামনের সেই দৃশ্য দেখে সাফার চোখে বাঁধভাঙা জল গড়িয়ে পড়ল—নিঃশব্দ, তীব্র, অবিরাম। সে আর আটকাতে পারল না। তবে মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল, কষ্ট গিলে ঠোঁটে এক টুকরো জোরপূর্বক হাসি টেনে নিয়ে এগিয়ে গেল অবন্তিকার দিকে।
ধীরে, সতর্কভাবে, শান্ত অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে সে অবন্তিকাকে তুলে নিল এবং গাড়ির দিকে রওনা দিল।অবন্তিকা যাওয়ার পথে একবার পেছনে তাকাল—জারিফের দিকে। তার চোখে ছিল ভাঙা আবেগ, অনুচ্চারিত হাজার কথা, কিন্তু দৃষ্টি ছিল স্থির, অটল। তারপর সে আবার সামনে ফিরে হাঁটল।
আর জারিফ? সে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল—নির্বিকার, অনড়, যেন তার উপস্থিতিই সেখানে একটি ভারী নীরবতা তৈরি করে রেখেছে।
এই দৃশ্য দেখে জায়ান হালকা কাশি দিয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠল—
“চল, তোরও বিয়ে করিয়ে নিয়ে আসি। কী বলিস? পাত্রী তো রেডি আছে।”
জারিফ এক পা নড়ে, কণ্ঠ ঠান্ডা কিন্তু কাটা কাটা—
“জাস্ট শাট আপ। তাড়াতাড়ি আয়।”
জায়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বাইকে উঠে পড়ল, মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল—
“উচিত কথা বললেই শাট আপ…”।
·
·
·
চলবে……………………………………………………