রাহা এক ঝটকায় নিজের হাতটা মাহাদীর হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল। চোখে-মুখে তীব্র বিরক্তি আর ক্ষোভ স্পষ্ট।
—আপনার দুঃসাহস সত্যিই সীমাহীন! এখানে পর্যন্ত চলে এসেছেন? এতটা আত্মসম্মানহীন কীভাবে হতে পারেন আপনি? নাকি আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিত্ব—এসব শব্দ আপনার অভিধানে নেই?
মাহাদী একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত অথচ গভীর স্বরে বলল,
—তোমার ক্ষেত্রে শুধু আত্মসম্মান নয়, কোনো নিয়ম, কোনো যুক্তি, কোনো বাধাই আমার ওপর কাজ করে না, শুভ্রপরী।
—চুপ করুন! সবকিছু কি আপনাকে মুখে মুখে বুঝিয়ে বলতে হবে? আমি কোনোদিনই আপনাকে সেই দৃষ্টিতে দেখিনি। আপনার প্রতি আমার কোনো অনুভূতি নেই, কোনো আকর্ষণ নেই, কোনো আগ্রহ নেই। এবার অন্তত বিষয়টা বুঝুন।
মাহাদীর দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে উঠল।
—তোমার নেই, কিন্তু আমার আছে। ভীষণভাবে আছে। আমি তোমাকে ভালোবাসি, রাহা। একবার অন্তত আমার অনুভূতিটা বোঝার চেষ্টা করো। তুমি যেমন মানুষ চাও, আমি ঠিক তেমনই হয়ে যাব। তোমার পছন্দ, তোমার অপছন্দ, তোমার চাওয়া—সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে বদলে ফেলব।
রাহা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
—মানে? একেবারে সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো? নিজের কোনো সত্তা থাকবে না? কোনো ব্যক্তিত্ব থাকবে না? শুধু অন্যের ইচ্ছেমতো চলবেন? মানুষ হয়ে ছায়া হয়ে বাঁচতে চান নাকি?
—যদি তুমি সেটাই চাও, তাতেও আমি রাজি। এই আইজান শিকদার মাহাদী তোমার জন্য নিজের সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত। শুধু একবার বলেই দেখো, শুভ্রপরি।
রাহা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি।
—আর এটাই আমার সবচেয়ে অপছন্দের বিষয়, স্যার। একজন পুরুষের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মান আর দৃঢ়তা থাকা উচিত। কারও কথায় নিজের ইচ্ছা, সিদ্ধান্ত আর সত্তাকে বিসর্জন দেওয়া—এসব আমার একদমই ভালো লাগে না। সত্যি বলতে, আমি এই মানসিকতাকে ঘৃণা করি।
রাহার কথাগুলো যেন ধারালো অস্ত্রের মতো গিয়ে আঘাত করল মাহাদীর বুকে। মুহূর্তেই তার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে এল। চোখের গভীরে নেমে এলো চাপা বিষণ্নতার ছায়া।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে মৃদু স্বরে বলল,
—মেয়েরা তো কোমল হয়, শুভ্রপরি। তাদের প্রতি কঠোরতা দেখিয়ে কী লাভ? যাকে ভালোবাসি, তার সামনে অহংকার আর দাপট দেখিয়ে কি ভালোবাসা অর্জন করা যায়?
কথাটা শুনেই অদ্ভুত এক অনুভূতি খেলে গেল রাহার ভেতর।তাহলে সেই মানুষটার রুক্ষ স্বভাব, তীব্র ব্যক্তিত্ব আর অদম্য কর্তৃত্ব কেন তার মনে এত গভীর ছাপ ফেলে?কেন তার উপস্থিতি আশপাশের সবকিছুকে ম্লান করে দেয়?কেন তার অসংখ্য অগ্রহণযোগ্য আচরণও অজান্তেই গুরুত্ব পেয়ে যায়?কেন তার একটি মাত্র দৃষ্টি বুকের ভেতর অকারণে ঝড় তুলে দেয়?
প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খেলেও রাহা সেগুলো প্রকাশ করল না।
নিজেকে সামলে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—আপনি ভুল করছেন, স্যার। আমার কাছ থেকে আপনার জন্য কোনো আশা, কোনো প্রত্যাশা, কোনো সম্ভাবনা রাখবেন না। কারণ শেষ পর্যন্ত আপনি শুধু হতাশই হবেন।
কথা শেষ করেই সে সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল।কিন্তু মাহাদী এত সহজে হার মানার মানুষ নয়।রাহার দূরে সরে যাওয়া অবয়বের দিকে তাকিয়ে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখে জ্বলে উঠল একগুঁয়ে সংকল্পের আগুন।
সে রাহাকে চায়।আর সেই চাওয়া এখন আর শুধু অনুভূতি নয়, একরকম নেশায় পরিণত হয়েছে।
ভালোবাসা দিয়ে যদি না হয়, তবে অন্য কোনো পথ খুঁজবে।ধৈর্য দিয়ে যদি না হয়, তবে কৌশল প্রয়োগ করবে।প্রয়োজনে নিজের প্রতিটি সীমা অতিক্রম করবে।কারণ তার বিশ্বাস—একদিন না একদিন রাহাকে সে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করবেই।
এদিকে মাহাদীও এত সহজে পিছু হটার মানুষ নয়। রাহাকে নিজের জীবনের অংশ করে নেওয়ার সংকল্পে সে অটল। যেকোনো মূল্যে, যেকোনো উপায়ে তাকে অর্জন করতেই হবে—প্রয়োজনে সময়, ধৈর্য কিংবা কৌশলের আশ্রয় নিয়েও। আর যদি সেই পথে অভ্র তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায়, তবে তাকে পরাজিত করতেও মাহাদী এক মুহূর্ত দ্বিধা করবে না। কারণ তার কাছে এখন একটাই লক্ষ্য— রাহা।
—————
কিছুক্ষণ আগে….
সব গণ্যমান্য অতিথির বরণ, শুভেচ্ছা ও বক্তব্য পর্ব শেষ হতেই শুরু হলো মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। চারপাশ ভরে উঠল সুর, তাল আর উচ্ছ্বাসে।
কিন্তু পুরো সময়টাতে মাহাদী যতক্ষণ মঞ্চে ছিল, রাহা একবারের জন্যও তার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি।
কেন তাকাবে সে? রাহা এতটাও অনভিজ্ঞ নয় যে একজন পুরুষের দৃষ্টির ভাষা বুঝবে না। ছোট আব্বুর বন্ধুর ছেলে বলেই এতদিন নীরব ছিল। আর এখন তো সে তার শিক্ষকও। সেই সম্মানের সীমারেখা রাহা ভালো করেই জানে।
তবে নীরব থাকা মানেই যে সে কিছু বোঝে না, তা নয়।কারণ রাহার হৃদয়ের দুয়ার বহু আগেই একজনের জন্য খুলে গেছে। বলা যায়, প্রথম দেখাতেই। এক ঝলক দেখার সেই ক্ষণিক মুহূর্তেই কিশোরী মনে অদ্ভুত এক আলোড়ন জেগেছিল। বুকের ভেতর বয়ে গিয়েছিল অচেনা অনুভূতির ঝড়। কিন্তু সেই অনুভূতির কথা কখনো বান্ধবীদের কাছেও প্রকাশ করেনি সে।
বরং ভাগ্যের পরিহাসে সেই মানুষটির হাতেই একদিন থাপ্পড় খেয়ে অপমানিত হয়েছিল। অথচ সেদিন থেকেই যেন আরও গভীরভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল তার অস্তিত্বের সঙ্গে।রাহা শুধু সেই মানুষটিকেই চায়।সেই দুর্বিনীত, একরোখা, বদমেজাজি, ভয়ংকর ব্যক্তিত্বময় পুরুষটিকে।
যার চোখে আগুন, কথায় তীক্ষ্ণতা, আচরণে দাপট, আর উপস্থিতিতেই চারপাশ থমকে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। লোকটা তার ভাবনায়, অনুভূতিতে, শ্বাসে-প্রশ্বাসে, অস্তিত্বের প্রতিটি কণায় মিশে গেছে।
এমনভাবে মিশে গেছে যে, এখন তাকে ছাড়া অন্য কাউকে কল্পনা করাও রাহার কাছে অসম্ভব।
আয়াতের ডাকে চিন্তার ঘোর কাটল রাহার।
—এই, কোনদিকে তাকিয়ে আছিস? দেখ, এখনই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হবে!
আয়াতের কথায় চমকে উঠে সামনে তাকাল রাহা। পুরো স্টেজ তখন সরগরম। অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা শিক্ষার্থীরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কেউ সাউন্ড চেক করছে, কেউ স্টেজ সাজানোর কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে, আবার কেউ নিজেদের পারফরম্যান্সের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। চারপাশে উৎসাহ, উচ্ছ্বাস আর কৌতূহলের এক প্রাণবন্ত আবহ ছড়িয়ে আছে।
হঠাৎই রাহার মনে হলো তার একটু ওয়াশরুমে
যাওয়া দরকার। তাই আয়াতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—আপু, আমি একটু আসছি।
আয়াতও সঙ্গে যেতে চাইল, কিন্তু রাহা মাথা নেড়ে তাকে থামিয়ে দিল।
—তুমি ওদের নিয়ে বসো। আমি ঠিক চিনে নিতে পারব।
কথা শেষ করে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। ধীর পায়ে স্টেজের পাশ ঘেঁষে এগিয়ে যেতে লাগল।
কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল অপ্রত্যাশিত কিছু।
স্টেজের পাশ দিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আচমকাই শক্ত এক টানে নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে অনুভব করল রাহা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেউ তাকে দ্রুত ভেতরের দিকে টেনে নিল।
পরের মুহূর্তেই দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল।হকচকিয়ে গিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল রাহা। চোখ তুলে চারপাশে তাকাতেই বুঝতে পারল,
সে একটি নির্জন ও খালি কক্ষে এসে পড়েছে—যেটি ঠিক স্টেজের সঙ্গেই সংযুক্ত।মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কায় ধুকপুকানি বেড়ে গেল। কে তাকে এখানে টেনে আনল? আর কেন?
—————
বর্তমান….
রাহার তিক্ত কথাগুলো কানে যেতেই মাহাদী কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময়, শয়তানি হাসি ফুটিয়ে হঠাৎই রাহার হাত শক্ত করে ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেল মঞ্চের ওপর।
ঘটনার আকস্মিকতায় রাহা যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে—কিছুই বুঝে ওঠার সুযোগ পেল না সে।
অন্যদিকে মাহাদীর মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল এক কুটিল পরিকল্পনা। সে চেয়েছিল এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে, যাতে উপস্থিত সবার নজর তাদের দু'জনের ওপর গিয়ে আটকে থাকে। চারদিকে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ুক, মানুষ কানাঘুষা করুক, আর তাদের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হোক।
চলমান নৃত্য পরিবেশনার মাঝখানেই মাহাদী রাহাকে নিয়ে মঞ্চের কেন্দ্রস্থলে এসে দাঁড়াল। কিন্তু দাঁড়িয়েও থামল না। তার হাতের দৃঢ় বাঁধনে রাহাকে বারবার নিজের চারপাশে ঘুরিয়ে নিতে লাগল। রাহা প্রাণপণে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু মাহাদীর শক্ত আঁকড়ে ধরা হাতের সামনে তার সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল।
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো হলরুমে বিস্ময়ের ঢেউ বয়ে গেল। নৃত্যরত শিক্ষার্থীরাও তাল হারিয়ে থেমে গেল। শত শত দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দু'জন মানুষের ওপর।
ফিসফাস, বিস্ময় আর কৌতূহলের গুঞ্জনে চারপাশ ভারী হয়ে উঠল। সুযোগ বুঝে কয়েকজন সংবাদকর্মীও দ্রুত ক্যামেরা তাক করে একের পর এক ছবি ধারণ করতে শুরু করল।
এদিকে আয়াত, সাফা, অবন্তিকা আর শিফা দৃশ্যটা চোখে পড়তেই প্রায় এক ঝটকায় নিজেদের আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময় আর উদ্বেগ।রাহা মঞ্চে কেন?
স্যার তাকে এভাবে টেনে নিয়ে গেলেন কেন?
আর সবার সামনে এমন আচরণের অর্থই বা কী?
প্রশ্নের পর প্রশ্ন মাথার ভেতর ঝড় তুললেও কোনো উত্তর খুঁজে পেল না তারা। শুধু অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মঞ্চের দিকে।
যখনই মাহাদী রাহাকে থামিয়ে নিজের দিকে টেনে নিতে উদ্যত হলো, ঠিক তখনই বজ্রগতিতে এগিয়ে এলো এক শক্তপোক্ত হাত। মুহূর্তের মধ্যে ছোঁ মেরে রাহাকে নিজের আড়ালে সরিয়ে নিল সে। রাহা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। বড় বড় চোখে একবার মাহাদীর দিকে, আরেকবার আগন্তুকের দিকে তাকালো। তার যেন কিছুই বোধগম্য হচ্ছিল না। একের পর এক ঘটনায় সে সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
রাহাকে নিরাপদে নিজের পেছনে সরিয়ে রেখে আগন্তুক ব্যক্তি জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো ক্রোধ নিয়ে তাকাল মাহাদীর দিকে। তার চোখের দৃষ্টিতেই যেন তাণ্ডবের পূর্বাভাস স্পষ্ট।
গর্জে উঠে বলল—
— “ইউ বাস্টার্ড! হাউ ডেয়ার ইউ টাচ হার?” “আই উইল কিল ইউ!”
তার কণ্ঠে জমে থাকা ক্রোধ যেন মুহূর্তেই চারপাশের বাতাস ভারী করে তুলল।সে এক পা সামনে এগিয়ে এল, চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে ক্রোধে।
— “ডোন্ট ইউ এভার ডেয়ার টু লে আ ফিঙ্গার অন হার এগেইন!শি বিলংস টু মি।ওয়ান মোর স্টেপ টুওয়ার্ডস হার, অ্যান্ড আই স্ওয়েয়ার।ইউ ওন'ট ওয়াক আউট অফ হিয়ার অ্যালাইভ!”
কথা শেষ হতেই সজোরে একটি ঘুষি বসিয়ে দিল মাহাদীর মুখে। প্রচণ্ড আঘাতে মাহাদী কয়েক কদম টলতে টলতে পিছিয়ে গেল।তবে মাহাদীও চুপ করে থাকার মানুষ নয়। চোখে রক্তিম ক্রোধ নিয়ে সেও ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলো
ঠিক তখনই আতঙ্কিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল রাহা,
— “প্লিজ! থামুন আপনারা!”
তার কণ্ঠে ছিল অনুনয়, উৎকণ্ঠা আর অসহায়তার মিশ্রণ।
— “এটা একটা ভার্সিটির ফাংশন! আপনারা কী করছেন? চারপাশে সবাই দেখছে!”
রাহার কণ্ঠে এমন তীব্র আবেদন ছিল যে মুহূর্তের জন্য চারপাশের উত্তপ্ত পরিবেশও যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।শত শত বিস্মিত দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো তাদের ওপর।
মাহাদীও হাত তুলতেই রাহার তীক্ষ্ণ কণ্ঠে উচ্চারিত কথায় সে মুহূর্তেই থেমে যায়। অন্য শিক্ষকরা দ্রুত ছুটে এসে তাকে টেনে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও সে একদম পাথরের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে—নড়ার কোনো ইচ্ছেই নেই।
এদিকে অভ্র রাহার সেই কথাগুলো শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে দৃষ্টি স্থির করে। তার চোখের তীব্রতা এমন—যেন পুরো পরিবেশটাই মুহূর্তে ভস্ম করে দিতে পারে।
রাহা ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে ফেলে। অভ্র ধীর, কিন্তু ভয়ংকরভাবে তার দিকে এগোতে থাকে। প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠে। রাহা আতঙ্কে পিছু হটতে থাকে, পা কাঁপতে থাকে থরথর করে। কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে সে বলে ওঠে—
“অভ্র ভাই… প্লিজ… আপনি যা ভাবছেন, সেটা একদমই ভুল। আমি সত্যিটা বলছি, আমি আপনাকে সবটা বুঝিয়ে দিচ্ছি।”
কিন্তু তার কথাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে অভ্র একেবারে বরফশীতল, কঠিন গলায় বলে উঠল
— কি বোঝাবি আর..?তোর ফাকিং ব্যাখ্যা শোনার ইচ্ছা আমার নেই।”
“অভ্র ভাই… প্লিজ… আমি… আমি আর…”
অভ্র নিচু, কাঁপা নয়—বরং বরফ ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে,
— “আর একটা শব্দও না, বেয়াদব।”
ধমকে রাহা চোখ বন্ধ করে ফেলে, গলা শুকিয়ে আসে। হাতটা এখনও অভ্রর কবজির ভেতর আটকে, কিন্তু সে টান দেওয়ার সাহসও পায় না।রাহার বুক আতঙ্কে ধকধক করছে। ভয়ের চাপে গলা শুকিয়ে আসে, চোখের পলক ভারী হয়ে যায়। হাতটা এখনও অভ্রর শক্ত মুঠোয় আটকে, সে আর কোনো প্রতিরোধ করতে পারে না।
ঠিক তখনই মাহাদী আবার এগিয়ে আসে। মুখে রাগের আগুন, চোখে অপমানের আগুন মিশে আছে।
— “তুই ভাবিস কি নিজেকে? ওকে ছেড়ে দে!”
অভ্র তখন রাহার দিকেই তাকিয়ে আছে
রাহার ঠোঁট কাঁপে আর বলতে চেষ্টা করে.
— “অভ্র ভাই… আমি… আমি কিছু করিনি…”
স্টেজের শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই অভ্র এক মুহূর্তও দেরি না করে রাহার গলা শক্ত হাতে চেপে ধরে। তার আঙুলগুলো যেন লোহার শিকলের মতো—নরম কোনো সুযোগ রাখে না। মুহূর্তেই টেনে সামনে এনে ফেলে, চারপাশের শব্দ যেন থমকে যায়।
অভ্রের চোখে তখন আগুনের মতো তীক্ষ্ণ
শীতলতা—রাগ আর নিয়ন্ত্রণের ভয়ংকর মিশেল।
সে নিচু, কঠিন স্বরে বলে ওঠে—
— “এক পা আর না… বুঝতে পারছিস?”
রাহা শ্বাস আটকে কাঁপতে থাকে, চোখে ভয় আর অবিশ্বাস জমে ওঠে।অভ্র আরও একটু কাছে ঝুঁকে, গলা আরও দৃঢ় করে ধরে বলে—
— “যা দেখেছি, সেটাই শেষ কথা। এখান থেকে আর কোনো নাটক না।”
রাহা ছটফট করতে থাকে, বাঁধনের ভেতর নিজের শরীরটাকে মুক্ত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালায়। মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তেই সে নিজেকে ছিঁড়ে বের করে ফেলবে। তার চোখ দুটো বিস্ফারিত, রক্তিম ক্রোধ আর আতঙ্কে টলমল করছে, গাল বেয়ে অবিরাম অশ্রুধারা নেমে আসছে।
ঠিক তখনই শিফা ছুটে এসে তার ভাইকে সরানোর চেষ্টা করে।
“ভাইয়া প্লিজ থামো! এমন করোনা। ওকে ছেড়ে দাও।কষ্ট হচ্ছে ওর।"
শিফার কণ্ঠ কাঁপছিল, চোখে আতঙ্ক।
কিন্তু অভ্র এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে দিলো আর
রাহার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গর্জে উঠল—
“কী রে! বেয়াদবের বাচ্চা। এখন মুখে কথার খই ফুটছে? ওকে মারতে গেলাম বলে তোর এত বুক ফেটে যায় ? আমাকে থামালি কেন, শালী!” জানের ভয় নেই তোর..?—
এক ঝটকায় পাশে থাকা মাইকটা তুলে নিল সে। মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। সাংবাদিকদের দিকে চোখ তুলে এমনভাবে তাকাল, যেন এক দৃষ্টিতেই সবাইকে থামিয়ে দিতে পারে।
তারপর রাহাকে এক টানে নিজের পাশে এনে দৃঢ়, কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে ঘোষণা করল—
“সবাই ভালো করে শুনে রাখুন। ভালো করে ছবি তুলে রাখুন। এই মেয়ে আমার—শুধু আমার।”
তার কণ্ঠ আরও নিচু, আরও হুমকিসূচক হয়ে উঠল
“আজকের পর যদি কেউ এই বান্দির দিকে একটুও ভুল দৃষ্টিতে কেউ চোখ তোলে, তবে সে নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনবে—এটা নিশ্চিত।
তার পরিণতি হবে এমন ভয়ংকর, নির্মম আর অচিন্তনীয়, যে তা কল্পনাতেও সহ্য করার মতো নয়।”
একটা মুহূর্ত সে থেমে চারপাশে তীক্ষ্ণ, শীতল দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর আরও কঠোর, বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বলল—
“আর ওই বাস্টার্ডটার সাথে যদি কোথাও কোনো ছবি, কোনো প্রমাণ, কোনো চিহ্ন—এমনকি সামান্য ছায়াও থেকে থাকে—সবকিছু মুছে ফেলতে হবে, একেবারে নিঃশেষ করে দিতে হবে। আজ রাতের মধ্যেই আমি ক্লিয়ার রিপোর্ট চাই।”
তার কণ্ঠ যেন ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে উঠল—
“আর কালকের পত্রিকায় আমি আমাদের দুজনের ছবি দেখতে চাই। এটা অনুরোধ না… এটা নির্দেশ।”
কথা শেষ হতেই সে একটানে রাহাকে কাঁধে তুলে নিল, যেন তার সিদ্ধান্তের সামনে আর কোনো বাধাই নেই।চারপাশের ক্যামেরার ঝলকানি, মানুষের গুঞ্জন—সবকিছু উপেক্ষা করে সে ধীর কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির সামনে এনে রাহাকে নামিয়ে দিল, একদম নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এক কঠিন নীরবতা নিয়ে।
সে রাহাকে সবার সামনে কাঁধে তুলে নিল—একটুও দেরি না করে, একদম দৃঢ়, নির্মম ভঙ্গিতে।
ভিড়ের চোখের সামনে দিয়ে তাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।তারপর গাড়ির সামনে এনে এক ঝটকায় নামিয়ে দিল।
অভ্র চলে যেতে, পুরো পরিবেশে নেমে আসে এক অস্বাভাবিক নীরবতা। কে এই ছেলে!আর এভাবে কেন তুলে নিয়ে যাচ্ছে..! সবার চোখে-মুখে একটাই বিস্ময়, একটাই প্রশ্ন।
কাঁধ থেকে মাটিতে নামতেই রাহা যেন ভেঙে পড়ল। ব্যথা, ভয় আর চরম অপমান মিলে তার চোখে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ছে। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা—বাড়ির লোকজন যদি দেখে ফেলে, জানতে পারে তাহলে সবাই তাকে কী চোখে দেখবে! তার ভেতরের আতঙ্ক আর লজ্জা একসাথে গলা চেপে ধরছে।
অভ্রর দিকে তাকিয়ে সে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল—
“ছাড়ুন আমাকে… কী করছেন আপনি? কী অধিকার আছে আপনার আমাকে সবার সামনে এভাবে অপমান করার?”
অভ্র ঠান্ডা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর, অথচ ভয়ংকর শান্ত গলায় বলল—
“আচ্ছা,অধিকার? ঠিক আছে, আজ তোকে আমি দেখাবো অধিকার কী জিনিস।”
বলেই সে গাড়ির দরজা খুলে একরকম ধাক্কা মেরে রাহাকে ভেতরে বসিয়ে দিল। পর মুহূর্তেই নিজে ড্রাইভিং সিটে উঠে স্টার্ট দিল। গন্তব্য একটাই— কাজী অফিস।
এদিকে ঠিক শেষ মুহূর্তে ইভান সেখানে এসে পৌঁছায়। দূর থেকেই অভ্র আর রাহাকে একসাথে দ্রুত চলে যেতে দেখে সে এগিয়ে যেতে চাইলেও ততক্ষণে তারা দৃষ্টির আড়ালে মিলিয়ে গেছে।
ইভান ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল।
— "কী হলো ব্যাপারটা? অভ্র রাহাকে এভাবে নিয়ে কোথায় গেল? তাও আবার এত রাতে?"
মনে একগাদা প্রশ্ন নিয়ে সে ভেতরে ঢুকতেই শিফা, অবন্তিকা, সাফা আর আয়াত দৌড়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। তাদের পেছনেই ছিল জারিফ আর জায়ান।হঠাৎ জারিফের চোখ গিয়ে পড়ে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অভ্রের বাইকের ওপর।
সে চারপাশে একবার তাকিয়ে বুঝতে পারল, অভ্র নিজের বাইক ফেলে রেখে গেছে। তারা দুইজন প্রাইভেট গাড়িতে এসেছিল। সম্ভবত রাহাকে সঙ্গে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে গাড়িতেই বেরিয়ে গেছে।
ঠিক তখনই জারিফের ফোনে একটি মেসেজ এসে ঢোকে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখেই তার ভ্রু কুঁচকে যায়। মেসেজটা খুলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার চোখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে ওঠে।
মুহূর্তের মধ্যে মুখের রঙ বদলে যায়। সে অবিশ্বাস নিয়ে আবারও মেসেজটা পড়ে,
— "দুই ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় গিয়ে যেন দেখি কাজী রেডি।"
মেসেজটা যে অভ্র পাঠিয়েছে, বুঝতে তার এক সেকেন্ডও লাগল না।পরক্ষণেই সে আর কোনো কথা না বলে অভ্রের বাইকে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।
তখনই অবন্তিকা এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল
— "আমরাও যাব।"
শিফা, সাফা, আয়াত সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সবার মুখের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর দৃঢ়তা দেখে জারিফ আর না করতে পারল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে দূরে ছুটে যাওয়া গাড়িটার শেষ ঝলক চোখে পড়তেই সবাই দ্রুত নিজেদের গাড়িতে উঠে বসল।
জারিফ যখন জায়ানকে বলল,
— “ওদের নিয়ে ঢাকায় চলে আয়।”
তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইভান হঠাৎ বলে উঠল,
— “আমিও যাব।”
ইভানের কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা। পরিস্থিতি যতই জটিল হোক, সে এই মুহূর্তে তাদের একা ছাড়তে রাজি নয়।
জারিফ একবার তার দিকে তাকাল। ইভানের চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল উদ্বেগ আর অদম্য সংকল্প। তাই আর কোনো আপত্তি করল না সে। শুধু সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নেড়ে বলল,
— “ঠিক আছে, চলুন।”
এরপর আর দেরি না করে জায়ানকে নিজের সাথে করে ,আর বাকিদের ইভানের গাড়ি করে সবাই দ্রুত ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিলো।
ইঞ্জিনের গর্জন তুলে গাড়ি দুটো ছুটে চলল রাতের অন্ধকার চিরে—
অভ্র আর রাহার পিছু ধরে।
ভার্সিটির পুরো ক্যাম্পাসে তখন আগুনের মতো গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ছে—কে কী দেখেছে, কে কী বলছে, সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।
মাহাদীও আর দেরি না করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তার মনে একটাই ভাবনা—কাজ শেষ, সব ঠিক হয়ে গেছে।
কিন্তু সে একবারও বুঝতে পারল না—ভেতরে ভেতরে আসল খেলাটা এখনো শুরুই হয়নি। রাহার জন্য সামনে অপেক্ষা করছে এমন এক অপ্রত্যাশিত ঝড়, যা কেউ কল্পনাও করেনি।
—————
কাজী সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
— “দেনমোহর কত ধার্য করব?”
অভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “দেনমোহর দিয়ে কী হবে?”
কাজী শান্ত স্বরে বুঝিয়ে বললেন,
— “এটা স্ত্রীর হক। স্বামীর পক্ষ থেকে তার প্রাপ্য। আর যদি কোনোদিন স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে চলে যেতে চায়, তাহলে এই দেনমোহরের টাকাটাও সে পাবে।”
কথাটা শেষ হতেই—
ধাম!
অভ্র এমন জোরে টেবিলে হাত আঘাত করল যে চারপাশ কেঁপে উঠল।
চেয়ার ছেড়ে সামনের দিকে ঝুঁকে আগুনঝরা চোখে কাজীর দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
— “এই! আমার বউ আমাকে ছেড়ে যাবে কেন?”
মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ নিস্তব্ধ।
কাজী সাহেব ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে চুপ মেরে গেলেন।
অভ্র আবার ধমকে উঠল,
— “বল! কথা বন্ধ কেন? জলদি বল!”
কাজী তোতলাতে তোতলাতে বললেন,
— “সে-সেটা তো... যদি আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে থাকতে না চান...”
— “থাকতে চাইবে না কেন?”
অভ্রের কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
— “আমি কম কিসে? কোন দিক দিয়ে আমার ঘাটতি আছে? এমন কী কারণ হবে যে আমার বউ আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………