পবনপত্র - পর্ব ৪২ - তানসুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
“একটা কথা বলি?”

“বলো।”

“না থাক।”

“বলবা, নাকি থাপ্পড় খাবা?”

“থাপ্পড় দিতে পারলে দেন। আমার আপত্তি নাই।”

“এখান থেকে সরো তো! আমার অনেক কাজ আছে।”

“শোনেন না, পরীক্ষার পরে কি আপনি বাইরে কোথাও পড়তে যাবেন?”

“হ্যাঁ, বাইরেই যাবো। এখানে থাকবো না।”

“কতোদূর যাবেন?”

“দেখি, কোথায় চান্স হয়।”

“অনেক দূরে হলে, সেখানেই যাবেন?”

“হ্যাঁ। তুমি আর খুঁজে পাবা না, এতোদূরে যাবো।”

“হাহ! আপনি যেখানেই যাবেন, বাদলও সেখানে চলে আসবে।”

“তারপর বাদলের ডানা কেটে দেয়া হবে। মৌমিতার আশপাশ থেকে আর নড়তে পারবে না।”

“এমনিতেও কই নড়তে পারি! আচ্ছা আপনার প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস কখন শেষ হবে? চলেন না স্টেশন থেকে ঘুরে আসি—”

“আবার স্টেশন!”

“রাগ দেখান কেন? তার থেকে সরাসরিই বলতেন, বাদল আর রেলস্টেশনের সাথে খুবই খারাপ স্মৃতি আছে আপনার।”

“তুমি বেশি জানো?”

“আপনি না বললে কীভাবে জানবো?”

“এখন নাই কোনো খারাপ স্মৃতি। কিন্তু তৈরি হতে কতোক্ষণ?”

“যেটুকু আছে, সেটা খারাপ স্মৃতি না?”

“আচ্ছা, আমার কাছ থেকে তুমি ঠিক কী শুনতে চাও বলো তো? সোজাসুজি বলো।”

“সোজাসুজি বলবো? সেদিন আপনি 'হ্যাঁ' বলেননি। আবার 'না'-ও বলেননি। চুম্বকের দুই মেরুর কথাটা কিন্তু আমি এমনিই বলেছি। আপনার মনে কী আছে, সেটা স্পষ্টভাবে জানি না। কিছু বলেন নাই কখনও। তাই জানতে চাচ্ছি... আপনিও কি—”

ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠলো কাছে কোথাও। মেয়েটার ঘোর কাটলো। সে তাড়া দেখিয়ে রিকশাওয়ালাকে বললো, “একটু তাড়াতাড়ি চলেন।”

ব্যাগ থেকে তাড়াহুড়ো করে টাকা বের করলো। এখন একটা মুহূর্তও নষ্ট করা ঠিক হবে না। মৌমিতা সময় নষ্ট করলো না। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে প্ল্যাটফর্মে উঠে এলো। তবু তাকে আটকে দিলো বিপরীত দিকে হাঁটতে থাকা জনস্রোত। সামনে যাওয়ার রাস্তা নেই। এদিকে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। সে ভিড় ঠেলে কোনোমতে সামনে এগিয়ে আসে। ততোক্ষণে ট্রেনের গতি বেড়ে গেছে বহুগুণ।
তীব্র বাতাসের দাপট এড়িয়ে মেয়েটা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। তার অপলক চোখজোড়া স্থির হয়ে রইলো ট্রেনটার গতিময় জানালাগুলোতে। অস্পষ্ট মুখগুলোর মাঝে কাঙ্ক্ষিত মানুষটার খোঁজ পাওয়ার আগেই পুরো ট্রেনটা স্টেশন ছাড়িয়ে চলে গেলো।
এতোক্ষণ ধরে বিকট আওয়াজের নিচে চাপা পড়ে থাকা মৃদু কোলাহল হুট করেই শ্রুতিগোচর হলো। দেহের ক্লান্তিটাও অনুভূত হতে লাগলো। প্ল্যাটফর্মে ভিড় কমে গেছে। মৌমিতা লম্বা একটা শ্বাস ফেলে আশেপাশে তাকায়। মনে এখনও একটা ক্ষীণ আশা। সেটাকে সম্বল করেই সে ডানপাশে ঘুরে দাঁড়ায়, ধীরপায়ে হাঁটতে শুরু করে।

অনেকেই ইতোমধ্যে স্টেশন ছেড়ে বেরিয়েছে। তবু এখনও কতো মানুষ! এই জনসমুদ্রের মাঝে একটামাত্র মানুষকে খুঁজে পাওয়া কি এতোই কঠিন? হয়তো এক কোণে বসে আছে। আজও হয়তো অপেক্ষা করছে।
ছাউনির শেষ মাথায় অবস্থিত বেঞ্চটার দিকে চোখ পড়ে মেয়েটার। সে এগিয়ে আসে। বেঞ্চটা আগের মতোই আছে। তেমন কিছু সংস্কার হয়নি।
ঐ দিনটার পর প্রায় ছয় বছর কেটে গেছে। বাদলের সাথে স্টেশনে আসা আর হয়ে ওঠেনি। প্রথম দিনটাই শেষ দিন হয়ে রয়ে গিয়েছে। বেঞ্চটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা বৃষ্টিমুখর দিনের কথা মনে পড়ে গেলো। ছেলেটা সেদিন অকারণেই খুব সাহস দেখিয়েছিলো। কোনো সতর্ক সংকেত না দিয়েই হঠাৎ করে মেয়েটার ডান হাতটা চেপে ধরেছিলো। এতোদিনেও প্রথম স্পর্শের রেশটা মলিন হয়নি। অথচ সেই ডান হাতে একটা সোনার বালা ঝুলছে এখন।

মৌমিতা বেঞ্চের ডানপাশে গিয়ে বসলো। কোলাহল কমে এসেছে। যাত্রীরা বাড়ি ফিরছে। কেউ কেউ পরবর্তী ট্রেনের অপেক্ষা করছে। অন্যমনস্ক হয়ে খানিকক্ষণ বসে থাকার পর মেয়েটা উঠে দাঁড়ায়। সামনে একটা ছোটখাটো মুদির দোকান। সেদিকেই পা বাড়ায়।

“চাচা? এই ট্রেনটা কোথায় যাবে?”

বয়স্ক দোকানদার মাথা বাড়িয়ে বাইরে তাকালেন। অনিশ্চিত হয়ে বললেন, “দক্ষিণের দিকে যাবে মনে হয়।”

“খুলনায়?”

“সেটা জানি না।”

দোকানের পাশে বসে লেজ নাড়তে থাকা কুকুরটার দিকে এক ঝলক তাকায় মৌমিতা।

“এখানে পাউরুটি পাওয়া যাবে?”

“হ্যাঁ। কয়টা দেবো?”

“দুটো দেন।”

মৌমিতা কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ব্যাগ হাতড়ে টাকা বের করে। চারপাশে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নেয়। সে জানে, মানুষটা ইতোমধ্যে চলে গেছে। অনেক দূরে। তবুও মনটা মানতে চাইছে না। এতোদিন ধরে যোগাযোগ নেই। হঠাৎ যদি দেখা হয়েও যায়, কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে ছেলেটা? তার লুকিয়ে পড়ার অভ্যাস আছে। বিশেষ করে সে যখন বেশি আপ্লুত হয়ে পড়ে।

ছেলেটাকে যতো জটিল মনে হয়, সে আদতে অতো জটিল না। শুধু একটু অদ্ভুত।
মৌমিতা অনুভূতি প্রকাশে অপারগ। আর বাদল এমন মানুষ, যে অনুভূতি প্রকাশের বেলায় সংকোচ করে না। আবার এটাও আশা করে না, সামনের মানুষটা তার অনুভূতি সহজেই বিশ্বাস করবে। হয়তো কেউই তাকে বিশ্বাস করেনি কখনও।
এই বিষয়টা মৌমিতা উপলব্ধি করেছে বছর তিনেক আগে।
সারাদিন ক্লাস করে ক্লান্ত হয়ে সেদিন হোস্টেলে ফিরেছিলো সে। তারপর জানতে পেরেছিলো, একটা ছেলে ফোন দিতে দিতে সবাইকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বলাই বাহুল্য, ছেলেটা বাদল।
মৌমিতা ভেবেছিলো, বাদলের খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলার আছে। পরে যখন তাকে টেলিফোন করা হলো, সে ভীষণ ব্যস্তভাবে বলেছিলো, “হ্যাঁ, হ্যালো? শোনা যায়?”

“বলো।”

“কই থাকেন সারাদিন?”

“ক্লাস ছিলো। কী বলবা, বলো।”

“একটা কথা জিজ্ঞেস করতাম।”

“কী?”

“আমি গতকাল আপনাকে উল্টাপাল্টা কথা বললাম না? আপনার কোনো দোষ নাই। আমি এমনিই... রাগ করেছিলাম।”

“ওহ। আচ্ছা। এটাই বলার ছিলো?”

“না মানে, আপনি সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিলেন। তাই বললাম।”

“ওহ।”

“আরেকটা কথা। ঐ যে আপনার ডায়েরিতে লেখা ছিলো না? আপনি নিজেকে ঘৃণা করতেন। এখনও করেন নাকি?”

“তুমি কি ডায়েরি মুখস্থ করেছো?”

“হ্যাঁ! উত্তর দেন... হ্যালো?”

“হুম।”

“হুম কী? এখনও ঘৃণা করেন?”

মৌমিতা বেশ সময় নিয়ে উত্তর দিয়েছিলো, “যাকে তুমি ভালোবাসো, তাকে আমি কীভাবে ঘৃণা করতে পারি?”

উত্তরটা শুনে বাদল মিনিট খানেক সময় চুপ করে ছিলো। তারপর ফোন কেটে দিয়েছিলো হুট করে। তার অমন আচরণে মৌমিতা বেশ বিভ্রান্ত হয়েছিলো। সেই বিভ্রান্তি কাটতে অবশ্য খুব সময় লাগেনি।
ছেলেটা হয়তো সেদিনই প্রথম অনুভব করেছে; তাকে বিশ্বাস করার মতো, তার অনুভূতিকে সম্মান জানানোর মতোও কেউ রয়েছে এই পৃথিবীতে। এরপর থেকে তার বড় হওয়ার জেদটা বেড়ে গেলো। তার মধ্যে দায়িত্বশীলতা দেখা দিলো। নিজেকে প্রায় বদলেই ফেললো ছেলেটা। শুধু কিছু পুরোনো স্বভাব ছাড়তে পারলো না। হুটহাট অভিমান, ছেলেমানুষি আর ঐ হারিয়ে যাওয়ার প্রবণতা। এসব থেকে গেলো।

—————

মার্জিয়া ছুটে এসে দরজা খুলে দিলো। ক্রোধে একেবারে ফেটে পড়লো সে, “কয়টা বাজে দেখো! বেলা বারোটা বাজবে এখন। তুমি সকালে কিছু না খেয়ে বের হয়ে গেলা কেন? এখন দেখো, আম্মা কী করেন তোমাকে।”

মৌমিতা ক্লান্ত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকলো, “বাইরে খেয়েছি।”

“বাইরে কেন খাবা? হসপিটাল থেকে লাফাতে লাফাতে বাসায় এসেছো বাইরে খাওয়ার জন্য?”

“কানের কাছে চেঁচাবি না তো মার্জু! আমার কাজ ছিলো, তাই গেছি।”

“কাজ হয়েছে?”

মেয়েটা উত্তর না দিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে আসে। কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়েই টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ায়। ড্রয়ার হাতড়ে ডায়েরিটা বের করে।
সময়ের ব্যবধানে ডায়েরিটার চকচকে রূপালি মলাট নিজের জৌলুস হারিয়েছে। ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে। মৌমিতা মলাটের দিকে মনোযোগ দিলো না। পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে চিরকুটটা বের করলো।
চার লাইনের একটা কবিতা, বাদলের হাতের লেখা। ছেলেটার দেয়া এই একটামাত্র জিনিস আছে তার কাছে। আর কিচ্ছু নেই। এছাড়াও কিছু জিনিস তাকে দিয়েছিলো বাদল। কয়েকটা রক্তচন্দনের বীজ। সেগুলো কোথায় যে হারিয়ে গেছে! ঠিকমতো সংরক্ষণ করে রাখা উচিত ছিলো। কে জানতো, এই ছেলে আর কখনোই কিছু দিবে না? একটা চিঠি পর্যন্ত লিখবে না কোনোদিন।

কাগজটা সযত্নে আগের জায়গায় রেখে মৌমিতা ডায়েরি বন্ধ করলো।
বাদল যদি খুলনায় ফিরে যায়, সে অন্তত চিঠিটা পাবে। চিঠিতে যদিও হাসপাতালের ঠিকানা আর টেলিফোন নাম্বার উল্লেখ করা, কাজে লাগবে তবুও। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে পারবে হয়তো, মৌমিতা এখন নাটোরে ফিরেছে। জানতে না পারলেও সমস্যা নেই। এবার হোস্টেলে ফোন করলে তাকে পাওয়া যেতে পারে। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে, সেটা যে উপায়েই ঘটুক।

দুপুরের পর হতে মৌমিতা ঘর থেকে বের হয়নি। সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে বেশ শোরগোল শুরু হলো। মার্জিয়া একটা উদ্যোগ নিয়েছিলো। আব্বাকে হুইল চেয়ারে নিয়ে সে পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে দেখালো।
মারুফ অনেকটাই সুস্থ। শরীরের বাম দিকটা নিয়ে একটু অসুবিধা হচ্ছে শুধু। বাম হাত বেশি উঁচুতে তুলতে পারেন না। তাকে যখনই কেউ হাত তুলে দেখাতে বলে, তিনি ডান হাতের সাহায্য নিয়ে বাম হাতটা তুলে দেখান। চরম অসুস্থতায়ও নিজেকে অক্ষম দেখাতে রাজি নন তিনি।

বিকেলের দিকে ওসমান আর শফিকুল এসে মারুফকে দেখে গেছে। উভয়েই টলমল চোখ নিয়ে তাকে আশ্বস্ত করেছে। দোকানের ব্যাপারে যেন তিনি কোনো দুশ্চিন্তা না করেন।
এখন জহির মিঞা এসেছেন। নিতান্তই শক্ত মানুষ বলে তিনি চোখের পানি আড়াল করতে পেরেছেন।
মারুফ খন্দকার অনেক আলাপ করলেন এই চিরচেনা বয়স্ক প্রতিবেশীর সঙ্গে। জহির কিছু বুঝলেন না, শুধু হাসিমুখে মাথা নাড়লেন। হুইল চেয়ার ধরে রিপন চুপচাপ দুলাভাইয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে রইলো। সোফার পেছনে দাঁড়িয়ে মার্জিয়া মনোযোগ দিয়ে মারুফের কথা শুনছিলো। মৌমিতা কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল করেনি। বোনের উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই সে উচ্ছ্বসিত হয়ে ফিসফিস করে, “আপা! আব্বা আজকে অনেক কথা বলেছেন। দেখো, কতো খুশি খুশি লাগছে আব্বাকে।”

মৌমিতা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে, “এজন্যই বলছিলাম, হাসপাতালে অতোদিন থেকেও কোনো লাভ নেই। ফালতু পরিবেশ।”

মার্জিয়া কিছু বলতে যাবে, তখনই রিপন বলে উঠলো, “কী খবর, জুনায়েদ?”

জুনায়েদ হেসে মাথা নাড়লো, “এই তো, আছি।”

তার পিছু পিছু একটা মেয়েও এসে ঢুকলো বসার ঘরে। মাথায় ঘোমটা দেওয়া। লাজুক ভঙ্গিতে সালাম দিলো, “আসসালামু আলাইকুম।”

রাবেয়া সালামের উত্তর দিয়ে আড়চোখে মার্জিয়ার দিকে তাকালেন। মেয়েটার মুখের হাসি ম্লান হয়ে এলেও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি এখনও। বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে তাকে।
রিপন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, “উনি কে? চিনলাম না।”

জুনায়েদ নিজেই পরিচয় করিয়ে দিলো, “আমার ওয়াইফ, আসমা।”

“কী!” রিপন ভ্রু কুঁচকালো, “তুমি বিয়েও করে ফেলেছো? এটা তো খুবই খারাপ হলো, জুনায়েদ। দাওয়াতের কথা বাদ দিলাম। একবার জানালেও না!”

“দাওয়াত দেয়ার মতো অবস্থা ছিলো না। অনেক তাড়াহুড়ো হয়েছিলো তো...”

মৌমিতা অযথাই চোখ কচলাতে লাগলো। বোনের দিকে সরাসরি তাকাতে পারলো না কোনো কারণে। সোফার উপরে রাখা তার হাতজোড়ার দিকে দৃষ্টি পড়লো। মার্জিয়া কিছুক্ষণ আগেও সোফার নকশাটায় আঙুল ঘোরাচ্ছিলো। এখন হাত দুটো স্থির হয়ে আছে।
জুনায়েদ এগিয়ে আসে, হুইল চেয়ারের সামনে একটু ঝুঁকে দাঁড়ায়, “চাচা, ভালো আছেন?”

মারুফ হেসে মাথা নাড়লেন। তিনি ডান হাতটা উপরে তুললেন, ছেলেটার মাথায় রাখলেন। জহির বলে উঠলেন, “মারুফ অনেক ভালো মানুষ। এতো কিছু করেছে সবার জন্য। তার এই অবস্থায় আমরা কিছু করতে পারলাম না। দোয়া করি, তাড়াতাড়ি সুস্থ হও।”

মারুফ তেমন একটা পাত্তা দিলেন না ভদ্রলোকের কথায়। জুনায়েদ সোজা হয়ে দাঁড়ালো, “মার্জিয়া, তোমার কী অবস্থা? ভার্সিটি কেমন লাগছে?”

মেয়েটা যেন একটু চমকে উঠলো। আমতা আমতা করে বললো, “ভালোই।”

সোফার উপর থেকে হাত নামিয়ে নিলো সে। মাথা নিচু করে রইলো। ছেলেটা বলতে লাগলো, “দুই বোনেরই স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে। অতো টেনশন করো না। আর চাচার সামনেও টেনশনের কথা বলতে নিষেধ আছে।”

রিপন সম্মতি জানালো, “আমিও সেটাই বলি। টেনশন করে কোনো লাভ নেই।”

“হ্যাঁ।” জুনায়েদ আবার মার্জিয়ার দিকে তাকায়, “মার্জিয়া? আসমার সাথে তোমার পরিচয় করানো হয়নি। ও মৌমিতার ব্যাচমেট। এইচএসসির পর আর পড়তে পারেনি—”

“তোমার কাছে কিন্তু দাওয়াত বকেয়া থাকলো জুনায়েদ।”

ছেলেটার কথার মাঝখানে রিপন হস্তক্ষেপ করায় মার্জিয়ার যেন একটু সুবিধাই হলো। সে তড়িৎগতিতে ঘরের দিকে ছুটে গেলো। রাবেয়া একবার ঘুরে তাকালেন শুধু, আর কিছু করলেন না। মৌমিতা বেশ অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো খানিকক্ষণ। তারপর সে-ও ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
ঘরের বাতি নেভানো। খোলা দরজা দিয়ে সামান্য আলো এসে ঢুকেছে। মার্জিয়া বিছানার এক কোণে বসে রয়েছে। তার পাশে নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়ালো মৌমিতা। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললো, “মার্জু?”

“কী?”

মৌমিতা সহসা বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। বোনের পাশে বসে পড়লো, “মন খারাপ নাকি?”

“মন খারাপ হওয়ার মতো কিছু হয়েছে?”

“না।”

“তাহলে?”

আপা মাথায় হাত রাখতেই মেয়েটার বাহ্যিক শক্ত খোলসটা ভেঙে পড়ে গেলো। চোখ ফেটে অশ্রুর জোয়ার নামতে চাইলো। তার আগেই সে মাথা নিচু
করলো। কনুইয়ে ভর দিয়ে বসার ছল করে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেললো, “তুমি যাও। মেহমান তো যায়নি এখনও। পরে আম্মা বকবেন।”

মৌমিতা ছোট একটা শ্বাস ফেলে, “তোর মনে হয় আমি কিছু বুঝি না?”

মেয়েটা ভাঙা গলায় বলে, “বুঝলে চলে যাও।”

“যাবো পরে।”

বড় বোনের চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণ না দেখে মার্জিয়া সোজা হয়ে বসলো। চোখদুটো ইতোমধ্যে লাল হয়ে এসেছে। গলার স্বরটাও পুরোপুরি ভেঙে গেলো এবার, “আমি কত্তো বড় পাগল, তাই না? ধ্যাৎ!”

“বাদ দে। বললোই তো, টেনশন না করতে!”

“কীভাবে বললো, দেখেছো? ওনার বউয়ের সাথে কীভাবে পরিচিত হতে বললো... যেন ননদকে ভাবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে!”

“এখন কষ্ট পেয়ে কী লাভ? আমি আগে থেকেই জানতাম, এমন কিছু হবে।”

“আমাকে বলোনি।”

“অনেকবার বলেছি। তুই একবারও বিশ্বাস করেছিস?”

“না।”

“আমি বলেছিলাম, মার্জু। জুনায়েদ ভাই আমাদেরকে ছোট বোনের মতোই দেখে। ওনার তো নিজের কোনো ছোট ভাই-বোন নেই। আর আব্বাকেও অনেক সম্মান করে। তোর বয়সটা ওরকম ছিলো, তাই—”

“না, ঠিকই আছে।” মার্জিয়া চোখ মুছলো, “আমার উচিত ছিলো তোমার কথা শোনা। আমি শুনি নাই। আর এমনিতেও আমি এইটুকু জানতাম, ওনার আর আমার মধ্যে কোনোকিছু সম্ভব না। আব্বা অনেক আদর করতেন জুনায়েদ ভাইকে। কিন্তু তাই বলে একেবারে জামাই বানানোর চিন্তাভাবনা আব্বারও ছিলো না। জুনায়েদ ভাইয়েরও ছিলো না। এমন না যে আমি কখনো ভেবে দেখিনি। আমি ভেবেছি, বুঝেছি। তবুও!”

মার্জিয়ার কাঁধের পাশ দিয়ে হাত বাড়ালো মৌমিতা। নিজের দিকে খানিকটা টেনে আনলো তাকে, স্নেহমাখা গলায় বললো, “তুই যে বুঝেছিস, এটাই কি অনেক বেশি না? শুধু পছন্দই তো করেছিস। এর চেয়ে বাড়াবাড়ি কিছু করিসনি। এখন এসব নিয়ে চিন্তা করিস না।”

“তুমি জানতে, ওনার বিয়ে হয়েছে। আমাকে একবারও বলার দরকার মনে হয়নি?”

“আমি নিজেই তো দেরিতে জেনেছি, বাসায় আসার পর। আর আগে জানিয়ে কী লাভটা হতো? এমনিতেও একদিন না একদিন জানতেই পারতি।”

“একটু ভালো হতো। আজকে একেবারে হঠাৎ করে... ওনাকে এতোদিন পর দেখলাম। আরেকজনের পাশে। কিছু বোঝার আগেই আবার ঐ কথাটাও শুনলাম। আমার ওয়াইফ! আগে থেকে জানলে ভালো হতো না?”

বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মৌমিতা শান্ত গলায় বললো, “যদি আগে শুনতি, তখন মনে হতো, একবারে জানতে পারাটাই ভালো ছিলো। যা হয়েছে, হয়েছে। এখন ওসব ভুলে যা।”

মার্জিয়া দুই হাতে গাল মুছে বললো, “আমি স্বপ্নে অনেকবার এটা দেখেছি, জানো? জুনায়েদ ভাই অন্য কাউকে বিয়ে করেছে। গুরুত্ব দেইনি। দেওয়া উচিত ছিলো। আব্বাকে নিয়েও অনেক খারাপ স্বপ্ন—”

বসার ঘর থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ এলো হঠাৎ করেই। দুই বোনই চমকে উঠলো।
মারুফের খিঁচুনি হয়েছে আবার। তবে এবার, আগের বারের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp