ডাক্তার আজিম সকালে এসেই দেখে গেছেন মারুফকে। রক্তচাপ একটু বেশি। তত্ত্বাবধানে রাখতে বলে গেছেন। তাকে বিদায় জানিয়ে রিপন এসে মারুফের পায়ের কাছে দাঁড়ায়, অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলে, “মারুফ ভাইয়ের শরীরটা ভালো হয়নি। আজকে যাওয়া কি ঠিক হবে? আর একটা দিন নাহয়—”
“না!”
মৌমিতা প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো। বাকিদেরকে তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমতা আমতা করলো, “কতোদিন ধরে আছি। এতোটুকু একটা কেবিন, একটামাত্র জানালা... আব্বারও অসুবিধা হচ্ছে এখানে। বাড়িতে গেলেই তো ভালো হয়...”
রিপন অসম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লো, “বাড়িতে কি ডাক্তার পাওয়া যাবে? আর দুলাভাইয়ের তো এখনও উন্নতি দেখছি না।”
তার কথার মাঝেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাবেয়া বললেন, “মানসিক শান্তির একটা ব্যাপার আছে। বাড়িতে গেলেই ভালো লাগবে। দোকানটা পড়ে আছে কতোদিন হলো। জুনায়েদ কি আর এতো সময় পায় সবদিক সামলানোর? তাছাড়া...”
তিনি আড়চোখে মারুফের দিকে তাকালেন। আর কথা বাড়ালেন না। মমতাজ খন্দকার যে হাসপাতালের বিলগুলো দিচ্ছেন, এটা মারুফকে জানানো উচিত হবে না এখন। এই ভদ্রলোক জীবদ্দশায় কখনোই বড় বোনের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করেননি। আজ সাহায্য নিতে হচ্ছে, এই সত্যটা জানলে মারুফ নতুন করে উপলব্ধি করবেন হয়তো, তার অসুস্থতা এই পরিবারটিকে ঠিক কতোটা অসহায় বানিয়ে ফেলেছে।
রিপন হাল ছেড়ে দেয়, “আচ্ছা। অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করি। আপনারা একটু তাড়াতাড়ি গোছগাছ করে নেন। বেশি দেরি করা যাবে না।”
ছেলেটা বেরিয়ে যেতেই রাবেয়া মেয়েদু'টিকে তাগাদা দিলেন, “সব গুছিয়ে রাখো তো।”
মার্জিয়া ক্লান্ত ভঙ্গিতে চৌকি থেকে উঠলো। নিজের স্যুটকেসের দিকে এগিয়ে গেলো। মৌমিতা শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
“একটু সাহায্য করো আপা।”
“এতো কাপড় কেন বের করেছিস? এখানে পুরো জীবন কাটিয়ে দেওয়ার প্ল্যান ছিলো নাকি?”
আপা পাশে এসে দাঁড়াতেই মার্জিয়া বিড়বিড় করে বলে, “তোমার জীবন কোথায় কাটবে, সেটা ভাবো। ডাক্তার বিয়ে করলে তো ঘুরেফিরে সেই হাসপাতাল—”
“ধ্যাৎ!”
“বিয়ে ঠিক হলো কীভাবে আপা? বাদল ভাই কি আর আসবে না?”
“আমি জানি না।”
“মনে হয় কোনোভাবে জানতে পেরেছে, তোমার অন্য কারও সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।”
“বিয়ে ঠিক হয়নি। তুই বেশি বুঝিস?”
মার্জিয়া মেঝেতে বসে স্যুটকেসের জিনিসগুলো ভালোভাবে গুছিয়ে নিতে থাকে। আপার প্রশ্নে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কাপড়ের মধ্য থেকে একটা ঘনক আকৃতির কালো বক্স খুঁজে পায় সে। সেটা হাতে নিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। মৌমিতা চৌকির এক কোণে বসলো, ভ্রু উঁচিয়ে বললো, “ওটা কী?”
“হুম?”
“তোর হাতে ওটা কী?”
“ঘড়ি। আব্বার জন্য কিনেছিলাম।”
দুই বোনই চুপ করে রইলো কিছুক্ষণের জন্য। তারপর মৌমিতা একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে নিজের জিনিসপত্র গোছাতে গেলো।
—————
অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করতে করতেই দুপুর গড়িয়েছে। আর দেরি করার মতো অবস্থা নেই। সবকিছু প্রস্তুত করে নেয়ার পর জিনিসপত্রগুলো গাড়িতে তোলা হয়েছে।
সবশেষে মারুফকে স্ট্রেচারে নিলো পুরুষ কর্মচারীরা। সেই সময় সুজয় উপস্থিত হলো। আজ সকাল থেকে তাকে একবারও দেখা যায়নি। একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ছেলেটা দরজার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। সে কখন এসেছে, কেউ খেয়াল করলো না। মৌমিতা ব্যতীত। আব্বাকে স্ট্রেচারে তুলতে সাহায্য করার পরে সে পিছিয়ে দাঁড়ায়, সুজয়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। প্রথমদিনের মতো আজকেও একটা নেমপ্লেট আটকানো তার অ্যাপ্রোনে। আইডি কার্ডটা গলায় ঝোলায়নি। মুখটা দেখে কেমন যেন মায়া লাগলো। যেন ঘুম থেকে উঠেই ছুটে এসেছে, কিন্তু ক্লান্তিভাব কাটেনি। চুল একটু এলোমেলো। হাতজোড়া পেছনে গুটিয়ে অসহায় ভঙ্গিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
মৌমিতার কাছে ছেলে মানুষের পরিপাটি ভাবটা হয়তো একটু অপছন্দনীয়। সেটা সে উপলব্ধি করলো এই মুহূর্তে; ঐ তরুণ চিকিৎসকের অগোছালো রূপটা দেখে। সে যদি এই ভদ্রলোকের স্ত্রী হতো, তাহলে তাকে সর্বদা এমনই হয়ে থাকতে বলতো!
সুজয় আচমকাই তাকালো তার দিকে। মৌমিতা চমকে উঠে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। ধরা পড়ে যাওয়ার মতো একটা অনুভূতি হলো তার। অপ্রস্তুত ভাবটা ধামাচাপা দিতে সে সরে দাঁড়ালো। গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখা টেবিলের জিনিসগুলোই আবার গোছানোর ভান করলো।
কেবিন থেকে মারুফের স্ট্রেচার বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় রিপনের চোখ পড়ে সুজয়ের উপর। সে হাসিমুখে বলে ওঠে, “আপনাকে আজ দেখলামই না সারাদিন।”
সুজয়ও জোর করে হাসলো, “একটু ব্যস্ত ছিলাম। যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ। অনেকদিন তো হয়ে গেলো। ভাই এখন একটু ভালো আছেন। তাই নিয়ে যাচ্ছি। আমার ভাগ্নিও অস্থির হয়ে গেছে বাসায় যাওয়ার জন্য।”
ছেলেটা আবারও মেয়েটার দিকে তাকায়। আরেকবার চোখাচোখি হয়। মৌমিতা মুখ ঘোরায়। বিব্রত হয়ে মুখের উপর থেকে চুল সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দেয়। এখানে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করা উচিত হবে না!
মারুফকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় সুজয় বেশ সাহায্য করলো। মৌমিতার পছন্দ হলো না এই ব্যাপারটা। ডাক্তার থাকবে ডাক্তারের মতো। কর্মচারীদের সাথে কাজ করে কী প্রমাণ করতে চায় ছেলেটা? মারুফ খন্দকার তার হবু শ্বশুর? এসব আদিখ্যেতা করে পুরো হাসপাতালে গুজব রটাতে হবে? এখন অবশ্য বাড়ি ফেরার সময় হয়েই গেছে। গুজব রটলেও তাতে কিছু যায় আসে না।
মৌমিতা নিজের ভাবনা নিয়ে ভাবতে গিয়ে বিরক্ত হলো। মস্তিষ্কটাকে ভালো কাজে ব্যস্ত রাখতে করতে হবে। সে ভালো কিছু ভাবার চেষ্টা করতে লাগলো, তখনই নাসরিন পাশে এসে দাঁড়ায়, “সাবধানে যাবেন ম্যাম।”
মৌমিতা শীতল স্বরে বলে, “অন্য রোগীদের আত্মীয়কেও কি আপনি ম্যাম বলে ডাকেন?”
মেয়েটা থতমত খেয়ে তার দিকে তাকায়।
“ডাকেন না। জানি। আমাকে এভাবে ডাকেন কেন?”
“না মানে...” নাসরিন আমতা আমতা করে, “ডক্টর আর ট্রেইনিদের ওয়াইফকে আমরা ম্যাম বলেই ডাকি। ঐ আরকি স্যারদের ওয়াইফ মানে আমাদের—”
“আপনার স্যারের সাথে আমার বিয়ে হয়নি।”
“হ্যাঁ ম্যাম।”
“সেজন্য আমাকে ম্যাম বলে ডাকবেন না।”
“আচ্ছা। বিয়ের পর থেকে ডাকবো।”
মৌমিতা সরু চোখে তার দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকার পর সামনে মুখ ফেরায়। এখন অ্যাম্বুলেন্সে উঠে বসতে হবে। সুজয়ের কাজ শেষ। সে আবার হাসপাতালের দিকে পা বাড়াতেই রিপন তাকে ডাকলো, “আরে আরে, শোনেন।”
“জ্বী?”
“দুলাভাই যদি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যায়? অ্যাম্বুলেন্স তাড়াতাড়ি পাবো তো?”
“হ্যাঁ। আর আমি এমনিতেও প্রতি শুক্রবার গিয়ে দেখে আসবো ওনাকে।”
বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকালো রিপন, “প্রতি শুক্রবার?”
“জ্বী। আজিম স্যার বলেছেন।”
এতো কাছে দাঁড়িয়েও রিপন ধরতে পারলো না ব্যাপারটা। ওদিকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মৌমিতা বুঝে ফেললো, সুজয় মিথ্যা বলছে। তার অস্বস্তি হলো। ছেলেটা কি খুব বেশি জড়িয়ে পড়ছে? খুব বেশিই ভেবে ফেলেছে তাদের না হওয়া সম্পর্কটা নিয়ে? তাকে বাদলের প্রসঙ্গে কিছু জানানো উচিত ছিলো। সুজয় নিজে থেকে সরে গেলে সবটা হয়তো সহজ হয়ে যাবে আবার। কিংবা হয়তো হবে না। তবু একবার চেষ্টা করতে হবে।
মৌমিতা মাথা নিচু করে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ালো। তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় সুজয় বললো, “নিজের খেয়াল রাখবেন।”
কথাটা সে এতো নিচু স্বরে বললো, যেন সোজাসুজি গন্তব্যে পৌঁছায়, আশেপাশের মানুষ বিন্দুমাত্র টের না পায়। মৌমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাসরিনকে বললো, “আসি। দোয়া করবেন।”
নাসরিনের মুখে হাসি ফুটলো অনেকক্ষণ পর, সে মাথা দুলিয়ে বললো, “আচ্ছা ম্যাম। সাবধানে যাবেন।”
আবার ম্যাম! মৌমিতাও জোর করে হেসে মাথা নাড়লো। কোনো অভিযোগ করলো না। সে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই মেয়েটা প্রবল উৎসাহ নিয়ে বলে বসলো, “আবার দেখা হবে ম্যাম!”
আর পেছন ফিরে তাকায় না মৌমিতা। মুখ শক্ত করে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর গিয়ে ঢুকে পড়ে। একবারে কিনারায় গিয়ে বসে। বুকের উপর চেপে থাকা পাথরটা নামতে গিয়েও নামলো না। নাসরিনকে বলা উচিত ছিলো, সে-ও যেন সাবধানে থাকে, ভালো থাকে। বলা হলো না। মৌমিতা চায় না, তার সাথে আবার দেখা হোক। এই আবদ্ধ জেলখানার যোগাযোগ বিহীন দিনগুলোকে সে আর কখনোই মনে করতে চায় না।
মার্জিয়া আপার পাশে এসে বসলো। সামনেই চোখ বুজে শুয়ে থাকা আব্বার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। রাবেয়া আর রিপন বসেছেন বিপরীত পাশে। সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটা চলতে শুরু করলো।
“মাহফুজ ছেলেটা ভালোই আছে। না আপা? এর সাথেই মৌয়ের বিয়ের আলাপ চলছে?”
রাবেয়া মাথা নাড়লেন, “হুম।”
“মানাবে দু'জনকে।”
বোনের নির্লিপ্ত মুখটার দিকে একবার তাকিয়ে মার্জিয়া রিপনের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, “আপনি কবে বিয়ে করবেন মামা?”
“আমি ওসব নিয়ে ভাবি না। বিয়ে মানেই ঝামেলা।”
“আপনার ভরসা নাই। দেখা গেলো, হঠাৎ একদিন বিয়ে করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।”
“এটাও ঠিক!”
“মামা, বেশি ছোট মেয়েকে যেন বিয়ে করবেন না। মামিকে কিন্তু আমাদের থেকে অনেক বড় হতে হবে।”
“অনেক বড় মানে? এখন কি আমি সিনিয়র মেয়ে বিয়ে করবো?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ করেন! ভালোই হয়। অতো ছোট মামি চাই না।”
“মাথা খারাপ? জীবন ধ্বংস করার পায়তারা—”
কথাটা মৌমিতার গায়ে লাগলো। সে হুট করে ধমক দিলো ছোট বোনটাকে, “এতো কথা বলিস কেন মার্জু? চুপ করে থাকতে পারিস না?”
মার্জিয়া চুপসে যায়, তবু বিড়বিড় করে, “এখন যে তুমি চেঁচাচ্ছো?”
“চুপ!”
—————
আজ অনেক দিন পর পাখির কিচির মিচির আওয়াজে মেয়েটার ঘুম ভেঙে গেলো। একটু গরম লাগছে। গা থেকে কাঁথা সরিয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুললো মৌমিতা। সে এখন কোথায় অবস্থান করছে—এটা বুঝতেই কিছুক্ষণ সময় কেটে গেলো। চোখের সামনে পরিচিত ঘরটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। জানালা বন্ধ। তবে কপাটের ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু আলোক রশ্মি এসে ঢুকেছে ঘরটাতে।
মৌমিতা চিৎ হয়ে শোয়। তার পাশে শুয়ে থাকা মার্জিয়া এখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
গতকাল অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। বাড়িঘরের অবস্থা একেবারে নাজেহাল হয়ে গিয়েছিলো। সেগুলো সব পরিষ্কার করতে, ঠিকঠাক করে নিতে নিতেই দেরি হয়ে গেছে।
মৌমিতা দেয়ালঘড়ির দিকে তাকায়। এতো অল্প আলোতে ঘড়ির কাঁটাগুলোর অবস্থান বোঝা গেলো না। সে ধীরে সুস্থে উঠে বসলো। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে নেমে পড়লো। দরজা খুলতেই সকালের ঝলমলে আলো এসে বিঁধলো তার চোখে। মেয়েটা আধখোলা চোখেই আবার ঘড়ির দিকে তাকায়। প্রায় দশটা বেজে গেছে। আব্বার খাওয়ার সময় তো পেরিয়ে গেছে। রিপন আর রাবেয়া মিলেই হয়তো সামলে নিয়েছেন। রান্নাঘর থেকে থালা-বাসন ধোয়ার শব্দ আসছে। আম্মা একা একা কাজ করছেন।
মৌমিতার একটু আফসোস হলো। পরক্ষণেই তার নজর পড়লো সামনের ছোট টেবিলে রাখা টেলিফোনটার উপর। সে ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে। ফোনের উপরে ধূলো জমে আছে। এটা পরিষ্কার করা হয়নি। এখনও হয়তো কারও দরকার পড়েনি। কাউকে কল দেয়া হয়নি।
ফোনের রোটারি ডায়ালে আঙুল ছোঁয়াতে গিয়েও থেমে গেলো মেয়েটা। ফোন করার চেয়ে সরাসরি মেসে গিয়ে উপস্থিত হলেই বেশি ভালো হয় না?
হাত-মুখ ধুয়ে চটপট কাপড় বদলে ফেললো মৌমিতা। আব্বার ঘরে একবার উঁকি দিলো। তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন।
মেয়েকে বের হতে দেখে রাবেয়া ডেকে উঠলেন, “মৌ? কই যাও? কতো বেলা হয়ে গেছে। মার্জুকে ডাকো তো। আমি খাবার দিচ্ছি।”
“এসে খাবো, আম্মা।”
“কই যাও? কখন আসবা?”
“এই... এখনই আসবো।”
“এতো বেলায় না খেয়ে যেও না। ইশ! এই মেয়েটা খালি অনিয়ম করে।”
“দেরি করবো না আম্মা।”
শহরের এদিকে বেশ কয়েকটা ছাত্রাবাস। একটা আরেকটার সাথে লেগে আছে যেন। মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে সেগুলোর দিকে। ধীরগতির রিকশায় বসে নামফলকে চোখ বুলিয়ে নিতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। কাঙ্ক্ষিত মেসটা পাওয়ার আগেই আবাসিক এলাকা প্রায় শেষ হয়ে এলো। মেয়েটা নিরাশ হয়ে পেছনে হেলান দেয়। বাদল কি ভুল ঠিকানা দিয়েছে?
সামনে আরেকটা ছাত্রাবাস, তুলনামূলক ফাঁকা জায়গায়। ইটের প্রাচীর দেয়া। মাঝামাঝি একটা লোহার ফটক। নামফলকে দৃষ্টি পড়তেই মেয়েটার কুঁচকানো ভ্রু যুগল সোজা হলো।
“এখানে থামেন।”
রিকশাওয়ালাকে ভাড়াটা দিয়েই মৌমিতা পেছনে ঘোরে। লোহার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে মেসটা দেখা যাচ্ছে। দোচালা টিনের ছাদ। পাশে বড়সড় একটা আমগাছ ছাতার মতো ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। তবু নভেম্বরের সোনালি রোদ এসে পড়েছে বাড়িটার হলুদাভ দেয়ালে। এখনও ভালোভাবে শীতের আগমন ঘটেনি। তবু ঝরে পড়া কিছু শুকনো পাতা জমে আছে টিনের চালে। কী অপূর্ব দেখাচ্ছে দৃশ্যটা! মেস মালিক নিশ্চয়ই খুব শৌখিন লোক।
মৌমিতা দ্বিধাগ্রস্ত হয়েই এগিয়ে গেলো। মরিচা পড়া লোহার গেইটে হাত রেখে একটু ঠেলা দিতেই সেটা অদ্ভুত একটা শব্দ করে সরে গেলো। মেয়েটা হাত না সরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। বাদল কি কখনও ফটকের এই জায়গাটা ছুঁয়েছে?
ভেতরে ঢুকতেই একটা দমকা বাতাস এসে লাগলো গায়ে। সবকিছু অবাস্তব মনে হলো, যেন কোনো সুন্দর স্বপ্ন। এখানকার হাওয়া যেন জানান দিচ্ছে, সেই মানুষটা এখানেই থাকে। মৌমিতা এগিয়ে গেলো, বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্পর্শ করলো তাকে। এই এলাকায় সব পুরুষ শিক্ষার্থীরা থাকে। এভাবে একা আসা কি উচিত হয়েছে? এখন যদি বাদলের সাথে দেখা হয়ে যায়? ছেলেটা কি খুশি হবে? নাকি সেই পুরোনো স্বভাবের জের ধরেই রাগ দেখিয়ে বলবে, “এখানে একা আসার কী দরকার ছিলো!”
একজন মধ্যবয়সী লোক চেয়ারে বসে ঝিমাচ্ছে। সামনে কাঠের টেবিল, ধারগুলো ঘুণে খেয়ে ফেলেছে। মৌমিতা একটু বিচলিত হলো। চারপাশে চোখ বুলিয়ে আর কাউকে দেখলো না। অগত্যা একটা শুষ্ক ঢোক গিলে বললো, “আসসালামু আলাইকুম।”
লোকটা যেন চমকে উঠলো। ধড়মড় করে বলে উঠলো, “কে রে?” মেয়েটার দিকে চোখ পড়তেই একটু বিস্মিত হলো সে, “কে আপনি?”
“আমি, মানে... একজনের খোঁজ নিতাম। তাই—”
“কার খোঁজ লাগবে? এই মেসের কারও?”
“জ্বী।”
“কার খোঁজ চাচ্ছেন?”
“বাদল নামের একজন এখানে থাকে। তাকে পাওয়া যাবে?”
“আমার তো নাম মনে থাকে না এতোজনের। আপনি একটু ভালো করে বলতে পারলে বলেন।”
মৌমিতা ইতস্তত করতে লাগলো, “ভালো করে কীভাবে বলি...” সে হাতের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করলো, “আরকি এমন, লম্বা। মুখটা একটু গোল। আর... হ্যাঁ! ও হাসলে গালে টোল পড়ে।”
“ওহ!” লোকটা সোজা হয়ে বসলো, “নিজের নাম ধরে কথা বলে, ঐ ছেলেটা? বাদল হ্যান করবে, ত্যান করবে!”
মৌমিতা হেসে ফেললো, “জ্বী জ্বী।”
লোকটা চোখ-মুখ কুঁচকায়, চরম বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, “এই ছেলের খালি নাম বাদে সব মনে থাকে। আপনি এক কাজ করবেন তো। ওকে বলবেন, এই মেসে যদি থাকতে চায়, যেন ভালোভাবে থাকে। আর যদি থাকতে না চায়, মেস ছেড়ে দিয়ে যেন একবারে চলে যায়। আজ আছে, কাল নাই—এসব কী! ওর জন্যে আমি ঐ ঘরটা ভাড়া দিতে পারি না। দুই দিন পরপর হাওয়া হয়ে যায়। নতুন ছাত্র খুঁজতে গেলেই কোথা থেকে যেন আবার ঠিকই উদয় হয়! ভাড়া দেয় না ঠিকমতো। যে কয়দিন থাকে, ঐ কয়দিনেরটা দেয়। কিন্তু ঘর তো নিয়ে রেখেছে। না ঘর পাচ্ছি, না ভাড়া। আমাদের কি ঐ টাকার দরকার নাই, বলেন?”
মেয়েটা থতমত খায়। বাদল তো এমনই! পুরোপুরি ধরে না, আবার ছাড়েও না। কিন্তু সবাই কি তার এসব স্বেচ্ছাচারিতা মেনে চলবে?
“আপনি ওর সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেন, আমি বুঝিয়ে বলবো।”
লোকটা মাথা নেড়ে বলে, “মেসে নাই এখন। বাইরে গেছে।”
“বাইরে গেছে!”
“হ্যাঁ।”
“কখন আসবে?”
লোকটা টেবিলের ড্রয়ার খুললো, সেখান থেকে একটা চাবি বের করে মেয়েটার সামনে তুলে দেখালো, “দেখেন। চাবি রেখে গেছে। চাইলে আজকে রাতেও ফিরতে পারে। আবার এক সপ্তাহ পরেও ফিরতে পারে। কোনো ঠিক নাই।”
একটা কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো মেয়েটার ফুসফুস থেকে। আবার কী যেন মনে পড়ে গেলো হঠাৎ। নিজের আকুলতাটুকু যথাসম্ভব চাপা দিয়ে সে বলে উঠলো, “আচ্ছা, ঘর ভাড়া দেওয়ার সময় কি আপনারা ছবি রাখেন?”
“কিসের ছবি?”
“ছাত্রদের।”
“না।”
মৌমিতা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো, তখন পেছনের ঘর থেকে একজন বয়স্ক লোক বেরিয়ে এলেন। বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে নুরুল?”
চেয়ারে বসে থাকা লোকটা গা ছাড়া ভাব নিয়ে উত্তর দেয়, “ঐ যে, বাদল নামের ছেলেটাকে খুঁজতে এসেছে।”
“বাদল?” ভদ্রলোক মৌমিতার দিকে তাকালেন, “আপনিই হাসপাতাল থেকে ফোন দিয়েছিলেন নাকি?”
মাথা দোলায় মৌমিতা, “জ্বী, আমিই দিয়েছিলাম।”
“আমার এক কর্মচারী নুরুলকে আর আমাকে বলেছিলো। ভুলেই গিয়েছিলাম। ছেলেটা যখন এখানে এসে উঠেছে, তখন তো চেহারা সুরত ভালোই ছিলো। এখন কী যে হয়েছে। খাওয়া-দাওয়া করে কিনা—সেই খোঁজটাও পাই না। মেসেও থাকে না বেশিক্ষণ। এই তো কিছুক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেলো, এখানে চাবি দিলো নুরুলকে।”
মৌমিতা হতবিহ্বল হয়ে বিড়বিড় করে, “কিছুক্ষণ আগেই?”
“হ্যাঁ। আপনি আসার একটু আগেই। ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলো।”
মেয়েটা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। কয়েক পা পিছিয়ে গেলো। তারপর দ্রুত হেঁটে ছাত্রাবাস থেকে বের হয়ে এলো।
সে যদি সকালেই ল্যান্ডফোনে একটা কল দিতো, হয়তো বাদলকে আজ পাওয়া যেতো। মেসেই ছিলো তখন, এখন নেই। একেবারে হাত ফসকে বেরিয়ে গেলো ছেলেটা! এতো কাছে এসেও তার ধরা পাওয়া গেলো না। চেহারাও নাকি খারাপ হয়ে গেছে। কে জানে, কী অবস্থায় আছে সে।
বাদল তবে খুলনায় যায়নি। চিঠিটাও পায়নি। ভালোই হয়েছে! ওখানে কী যে লিখেছিলো—মেয়েটা নিজেই মনে করতে পারলো না। আবেগের বশে নির্ঘাত উল্টাপাল্টা অনেককিছুই লিখে ফেলেছিলো।
মৌমিতার স্মৃতিশক্তি আহামরি ভালো না। তবু কিছু কিছু জিনিস তার স্পষ্টভাবে মনে থাকে। আর কিছু জিনিস হঠাৎ করে মনে পড়ে যায়। যেমন এখন মনে পড়ছে। ছয়-সাত বছর আগে শোনা একটা কথা যেন ঘণ্টার মতো বেজে চলেছে কানের কাছে।
“... যদি মনে হয়, আপনি আমাকে খুঁজে পাচ্ছেন না, তাহলে এখানে আসবেন, রেলস্টেশনে। আমি কাউকে না জানিয়ে বের হলে... সচরাচর এখানেই আসি...”
·
·
·
চলবে……………………………………………………