বজ্রমেঘ - পর্ব ৪২ - ফাবিয়াহ্ মমো - ধারাবাহিক গল্প

বজ্রমেঘ - ফাবিয়াহ্ মমো
          শাওলিন কম্পিত হাতে বাতি নেভাচ্ছিল। শোয়েব নীরবে শুনছিল সে শব্দ। শাওলিনের একান্ত কক্ষে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির উন্মত্ততা দেখছিল সে। পরিবেশ বড্ড শীতল। বাতাসে ভেজা মাটির ঘ্রাণ, শ্যাওলা ও ফুলের বুনো সুবাসে শ্বাস গভীর হতে চাইছে। হঠাৎ মৃদু পদক্ষেপে কেউ প্রবেশ করল ঘরে। ধীরে সে পদক্ষেপগুলো বারান্দামুখো হচ্ছে। একসময় পেছন থেকে প্রিয় মানবীর কণ্ঠস্বরটা কানে পৌঁছল, 

  - ঘুমাবেন না? 

শোয়েব চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। টের পেল ওই পা দুটো তার পাশে দাঁড়িয়েছে। তার সুঠাম, চওড়া বুকের ওপর বৃষ্টির ছাঁট বিন্দুর মতো জ্বলজ্বল করছে। শাওলিন মেরুন শাড়ির আঁচলটা ডানহাতে তুলে এক পা এগিয়ে গেল। প্রাচীর মতো উচুঁ মানুষটার বক্ষ সংলগ্ন থামল। আজ নিজের পাঁচ ফিট পাঁচ উচ্চতাকে খাটো মনে হলো শাওলিনের। দৃষ্টি তুলে মুখ উঁচু করে তাকাতে হলো তার চোয়ালে, তার চোখে, তার কঠোর মুখে। আঁচল দ্বারা খাঁজবহুল শক্ত বুকটা মুছে দিতে লাগল শাওলিন। শোয়েবের কণ্ঠহাড় একবার উপর-নিচ হয়ে চোখের পাতা উন্মুক্ত হলো। নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে নরম হাতটা মুঠোয় তুলে নিল। শাওলিন প্রশ্নচোখে তাকালে শোয়েব প্রথমে নিজের লালচে ঠোঁটদুটো ছোঁয়াল, তারপর হাতটা টেনে নিজের গালে বসালো সে। কেউ কথা বলল না। দুজোড়া চোখ একপলকের জন্যও দৃষ্টিচ্যুত হলো না। শাওলিন এতোদিনের দূরত্ব, আজকের আঘাত, রেবেকার নিষ্ঠুরতায় ভেতরে ভেতরে ভেঙেচুড়ে গেছিল। বুঝতে দেয়নি একচুল। হঠাৎ দুহাত বাড়িয়ে শোয়েবের উন্মুক্ত বুকটায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। কঠোর বলয়ে আকড়ে শোয়েবকে জড়িয়ে ধরল নিজের মাঝে। শোয়েব প্রথমে একটু আশ্চর্য হলেও দু বাহুর ভেতর বন্দি করে নিল প্রিয়তমাকে। শাওলিন পুরোপুরি শান্ত হবার আগপর্যন্ত বাহুদ্বয় শিথিল করল না। কতটা সময় যে পেরিয়ে গেল, সে হিসেব রইল না আজ। শাওলিন মনের আগল খুলে বলল, 

  - আমি কল্পনাও করিনি, দুপুরের কলটার পর আজ রাতেই আপনাকে দেখব। এতোটা কেউ আমার জন্য করেনি!

শোয়েব বুকের মধ্যে মিশিয়ে নিল। ধীরস্বরে বলল, 

  - তুমি কাঁদার মানুষ নও। সেখানে আজ অঝোরে কেঁদেছ। ওই মুহুর্তে আমার কেমন অবস্থা ছিল তুমি ভাবতে পারবে না। 

  - আপনার অভিশাপ ছিল? কথা শুনিনি বলে? নাহলে উনি আমার গায়ে তুলবেন কেন? কখনো তো একটা ধমক দেননি। 

  - তুমি আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েছ। কিন্তু আমি তোমাকে ওসব দিইনি। শুধু কষ্ট পেয়েছিলাম তুমি আমার অস্থিরতা দেখলে না। রেবার কথা মানলে।

  - কথার বলার মতো সুযোগটা ছিল? খাবার টেবিলে নাশতা তুলে দিই। আপনি প্লেট সরিয়ে রোকেয়াকে খাবার দিতে বললেন। কফি এগিয়ে দিই। মগটা ছুঁয়ে দেখলেন না। 

শোয়েব মাথা নিচু করে রেশম কালো চুলে, ওর কপালে, গালে চুমু খেয়ে বলল, 

  - তখন আমি জানতাম না তুমি কাউকে অন্ধ ভরসা করো না। যতটুকু জানো সেটুকু থেকে সতর্ক হতে থাকবে। 

শাওলিন কিছু বলল না। দুটি চোখ বন্ধ করে প্রস্তর বুকে মিশে রইল। এই শান্তি, এই স্বস্তি, এই নির্ভারটুকু আর কোথাও পায়নি শাওলিন। কোথাও ছিল না। মায়ের পর আজ যেন স্বামীর কাছে নিজেকে নিরাপদ অনুভব করল। শোয়েব প্রতিটি সেকেণ্ডকে আর্শীবাদ হিসেবে কুড়োল। যেটুকু অভিমান তার বুকে বাসা বাঁধতে চেয়েছিল, সেটুকু বালির ঘরের মতো ঝুরঝুর করে ধসে পড়ল। 

বারান্দার গ্রিল ঘেঁষে বৃষ্টির বড়ো বড়ো ফোঁটা ঢুকছে। শাওলিনের পিঠ গ্রিল মুখো। শোয়েব ওকে ঘুরিয়ে নিজের পিঠ এগিয়ে দিল। দুটো প্রাচীর সম হাতে ঢেকে নিল ওকে। শাওলিন পেশল পিঠটা খামচে রেখেছিল। বৃষ্টির হিমবরফ পানিতে পিঠটা সিক্ত হতেই হঠাৎ মুখ তুলে বলল, 

  - ঘরে চলুন। বৃষ্টির পানিটা বরফ। ঠাণ্ডা লেগে যাবে। 

শোয়েব ঠোঁটের কোণে হাসি গেঁথে দুটো হাত আলগা করল। শোয়েব ঘরে ঢুকলে, শাওলিন বারান্দার শুকনো পাপোছটা ভেতরে এনে দ্রুত দরজা দিল। হঠাৎ কাঁধে টান পরতেই শাওলিন পিছু তাকায়। শোয়েব ওর আঁচলে মাথা, শরীর মুছে নিচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে কিছু বলল না।  

কাঁথা মেলে শুয়ে পরল শোয়েব। চর্তুদিকে মশারির আচ্ছাদন। ঘরে যেন এসির হিম নেমেছে। শাওলিন চুলে হাতখোঁপা পাকাচ্ছিল, হঠাৎ চোখ পড়ল শোয়েবের হাতে। যে হাত আসার সময় রক্তাক্ত দেখেছিল। চুল বেঁধে হাতটা তুলে নিল শাওলিন। উলটে-পালটে দেখতে লাগল। শোয়েব শুয়ে শুয়ে ওর উদ্বিগ্ন চেহারা নিরীক্ষণ করে বলল, 

  - ব্যথা নেই। 

শাওলিন তালুর মাঝখানে লম্বা ক্ষতটা আঙুল দিয়ে সাবধানে স্পর্শ করল। ঔষুধের শুকনো প্রলেপ ক্ষতর মুখ বুজে দিয়েছে। আজ হঠাৎ একটা প্রশ্ন করল শাওলিন। শোয়েবের বুকে সেলাইয়ের দাগ দেখিয়ে বলল, 

  - এই সেলাইগুলো কেন লেগেছিল? বুকের এপাশটা খুব বিপজ্জনক। আওর্টা বা পালমোনারি ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষ মারা যায়। 

মাথার নিচে হাত উলটো করে দিয়ে শোয়েব শুয়েছিল। সে ভঙ্গিতেই শুধাল, 

  - তোমার ভাগ্য ভালো, আওর্টা কাটা পরেনি। নাহলে বিয়েটা তাহমিদের সাথেই দিতো। 

শাওলিন এমন শয়তানি যুক্তি শুনে চোখ গরম করে ফেলল। ডানহাত মুঠো করে ওই জায়গাতেই ঘুষি মেরে বলল, 

  - আদি যুগে কোপ খেয়েছেন, সেই মাশুল আমার সুভাগ্য দিয়ে বোঝান? 

শোয়েব ঘুসি খেয়ে 'আহ' করে উঠেছে। কিন্তু পরক্ষণে সেই শয়তানি যুক্তি দিয়েই বোঝাতে লাগল শাওলিনকে, 

  - আদি যুগে বেঁচে না থাকলে এই যুগে ওকে বিয়ে করতে না? 

শাওলিন ঝাঁঝালো সুরে বলল, 

  - আবার ফাজলামি! 

  - সিরিয়াস। 

  - তাহলে আদিযুগে আওর্টা কাটা পরলে আপনার ফুফাতো ভাই বেঁচে থাকতো! 

  - না, এমনিতেও গুলি খেয়ে মরতো। 

শাওলিন প্রচণ্ড বিস্ময়ে বলল,

  - আপনি এভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন কেন? তার পেশাটা কী আপনি জানেন না? একজন ডিজিএফআই... 

শাওলিনের মুখের কথা ছিনিয়ে নিল শোয়েব। এবার পরিপক্ক যুক্তিতে বোঝাল, 

  - তোমাকে জানতে হবে ঘুষ না যোগ্যতা। যদি বাংলাদেশের কথা বলো, এখানে ঘুষের সিস্টেম ওপেন। যে পদ, যা যাও, যেখানে থাকবে সব সিস্টেমের আণ্ডারে আনতে পারবে, শুধুমাত্র নগদ অর্থ ঢেলে।  

শাওলিন এ তথ্য শুনে গভীরভাবে ঢোক গিলল। কপালে কুঞ্চন ছেড়ে উদ্বেগ গলায় বলল, 

  - আপনার ভাই সরাসরি যোগ্যতায় ঢোকেনি? 

শোয়েব না সুলভ দুবার মাথা নাড়াল। শাওলিন বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে অন্যমনষ্ক হলো। তার মানে তাহমিদের সবকিছুই অনৈতিক? এই দ্রুত পদোন্নতির পেছনে ঘুষ জড়িত? টাকা কার? ওর সাবেক এমপি বাবার? এটা কী রেবেকা মণি জানেন? নাকি জেনেও না জানার ভান ধরে সবকিছু লুকোছাপা করছেন? শাওলিন আর কিছু ভাবতে পারল না। বালিশে শুয়ে কাঁথা টেনে শোয়েবের দিকে ফিরে শুলো। শোয়েব কী যেন ভাবছে। সিলিং ফ্যানে তাকিয়ে সটান ভঙ্গিতে কিছু একটা গভীরভাবে চিন্তা করছে। শাওলিন একটু কাছে ঘেঁষে মৃদু গলায় বলল, 

  - ফিরবেন কবে? 

শোয়েব তৎক্ষণাৎ কিছু বলল না। একটু সময় নিয়ে নিজের ভাবনাটা আগে শেষ করল। তারপর বলল, 

  - তুমি সহ কাল ব্যাক করব। 

  - কাল? 

  - হ্যাঁ, সকালে। 

  - জাবি দেখবেন না? 

  - ভোরে দেখা যাবে না? 

  - যাবে। ছুটি কী একদিন? 

  - চারদিন। তুমি ফিরলে ভেবে দেখব।

শোয়েব তখনো অন্যমনষ্ক। চশমার ডাঁট ধরে চোখ থেকে চশমা খুলে নিল। পাশের বেডসাইড টেবিলে রাখতেই হঠাৎ স্থির হলো চোখ। হাতে তুলে নিল লক্ষবস্তু। ট্যাবলেটের পাতা। ০.৫ মিলিগ্রামের ঘুমের ঔষুধ। শোয়েব ওর দিকে ফিরে তাকায়, ট্যাবলেটের পাতা তুলে শুধায়,

  - সিডেটিভ পিল না? 

শাওলিন ঔষুধের পাতা দেখে শোয়েবের ভ্রুঁ কোঁচকানো মুখে তাকায়। কী বললে ঠিক হবে ভাবছে ও। শোয়েব ক্ষিপ্ত গলায় বলল, 

  - সাবধান করে দিচ্ছি। কোনো মিথ্যা না।

শাওলিন ঘুমের ঔষুধটা ফের দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। একটু আগের হাসিখুশি মুখটা কালো করে বলল, 

  - সবসময় না। সচরাচর। 

শোয়েব রুক্ষ মেজাজে বলল, 

  - আবার সচরাচর কেন? 

শাওলিন একবার ভাবল, সমস্যাটা নিয়ে বলবে না। কিন্তু সহসা শোয়েবের চোখ দেখে রণে ভঙ্গ দিতে হলো। ঠাণ্ডা গলায় বলল,  

  - সমস্যাটা আজকের নয়। আপনার খেয়াল থাকবে, একদিন ঘুমের ভেতর খুব ভয়ানক স্বপ্ন দেখছিলাম। আপনি আমাকে স্বাভাবিক করেছিলেন। 

শোয়েব তীক্ষ্ম চোখে কপাল কুঁচকাল। মুখে বলল, 

  - মনে আছে। খাগড়াছড়ির ঘটনা। 

শাওলিন একটু থেমে কথাগুলো মনে মনে গুছিয়ে নিল। তারপর শুরু করল অতীতের বন্ধ চাপা অধ্যায়, যা রেবেকার পর আর কারো কাছে খোলেনি। চোখের কোলে শঙ্কা মাখানো জড়তা দেখা দিল। শোয়েব ব্যাপারটা বুঝে ওকে দুহাতে বালিশ থেকে তুলে নিল। বুকের ওপর শুইয়ে গায়ে ঢেকে দিল কাঁথা। শাওলিন চোখ বন্ধ করে নিয়েছে। কানে সেলাই স্থানের নিচে হৃৎপিণ্ডের শব্দ। শোয়েবের দৃঢ়বন্ধন মনে সাহসের বুঁদ বুঁদ তুলে দিচ্ছে। শাওলিন গভীরভাবে দম টানে একবার। তারপর শুরু করল ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সাল। 

—————

ফেব্রুয়ারি ২০০৯। 

২০ তারিখ ভোরবেলা। আজিমপুরের একটি বাসা থেকে হাঁটতে বের হন মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম নেওয়াজ। আকাশে সূর্য ফোঁটার সদ্য আয়োজন। মুসল্লিরা মসজিদ থেকে টুপি মাথায় ফিরে আসছে। ফেব্রুয়ারি মাস, বিদায়ী শীতের আভাস গায়ে বিষদাঁত বসাচ্ছে। এমন সময় দেখা গেল স্কুল পড়ুয়া এক সদ্যকিশোর হেঁটে আসছে। শাহরিয়ার কিশোরের মাথায় হাত রেখে সুউচ্চ দিকটা চোখ দ্বারা মাপেন। মাত্র চৌদ্দ বছরেই পাঁচ ফিট চার হয়েছে শাহনেওয়াজ আলম শায়খ। ক্যাডেট স্কুল ও কলেজের কৃতি ছাত্র। আগামীকাল একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। শায়খ বাবার বুকে বুক মিলিয়ে আলিঙ্গন করল। দুদিনের ছুটিতে বাবা, মা, ছোটো বোনকে দেখতে চলে এসেছে। 

রান্নাঘরে সকালের নাশতা বানাচ্ছে শারমিন সুলতানা নাহার। কোমর সমান চুল জোহরা খালেক খোপা করে দিচ্ছে। জোহরা একমাস হলো এ বাড়িতে কাজ পেয়েছে। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠে। জোহরা 'আমি দেখছি' বলে দরজা খুলে দেয়। ছেলের কাঁধে হাত রেখে বাবা শাহরিয়ার গম্ভীর মেজাজে বলেন, 

  - শারমিন কোথায়? 

জোহরা ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে সরল হাসেন, 

  - শায়খের মা? কই? ছেলে যে চলে এল। 

শারমিন আটা মাখা হাত বেসিনে ধুয়ে এক ছুটে ঘরে যান। ছেলেকে দেখে খুশিতে বুকটা শীতল হয়ে যায়। এমন সময় চিৎকার দিয়ে ফ্যাচফ্যাচে কান্নার রোল উঠল। চমকে শারমিন বলে উঠলেন, 

  - শাওলিন! ... শায়খের আব্বু, মেয়েকে একটু দেখো না। আমি নাশতাটা বানাই। 

ভদ্রলোক মেয়ের কান্না শুনে ইতোমধ্যেই ছুট দিয়েছেন। স্ত্রীর কথা একটাও কানে যায়নি। শাহরিয়ার সাদা পাঞ্জাবী পরেছেন। ছুটির দিনগুলোতে পাঞ্জাবী, ফতুয়া অথবা শ্যাওলা সবুজ টিশার্ট পরেন। মেয়ের দুদিন থেকে জ্বর। জন্মের চতুর্থ দিন থেকেই ঠাণ্ডার সমস্যা নিয়ে পৃথিবীর আয়ু শুরু করেছে। শাহরিয়ার প্রায় পাঁচ বছর বয়সি বাচ্চা মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। জ্বরের তাপে সারামুখ, গা টকটকে লাল। বাবার কাঁধে মাথা রেখে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ল। ছোট্ট ছোট্ট মুঠোগুলো সাদা পাঞ্জাবী খামচে রইল। শাহরিয়ার পিঠে আদুরে চাপড় দিতে দিতে মেয়েকে নিয়ে বাড়িময় ঘুরে বেড়ান। শায়খের দিকে নজর দেন। স্ত্রীর পাশে নাশতা বানানো দেখেন। শারমিন একটু বকা দিতে চান, কেন চুলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে? কিন্তু স্বামীর চোখ দেখে কিছু বলেন না। হাসি দিয়ে কাজে মগ্ন হন। 

দুদিন ছুটি কাটিয়ে ২৩ ফেব্রুয়ারি শায়খ ফিরে গেল। শারমিন মেয়েকে জ্বরের সিরাপ খাইয়ে ঘুম পাড়াচ্ছেন। এমন সময় লক্ষ করলেন স্বামীর দৃষ্টি। দুহাত পিছমোড়া বেঁধে জানালা দিয়ে সূর্যাস্ত দেখছেন। সূর্যাস্তের কমলা আভা উনার সুশ্রী চেহারার ডান চোয়ালে পরেছে। শারমিন সর্বোচ্চ নিচু গলায় ডাকেন, 

  - শায়খের আব্বু, 

শাহরিয়ার পিছু তাকান না। শারমিন বিচলিত হয়ে আবার ডাকেন, 

  - কী হলো আপনার? মনমরা কেন? 

শাহরিয়ার এবারও উত্তর দেন না। কিছুটা সময় বিরতি কাটিয়ে অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। শব্দটা এতো ভারি, বিষণ্ণ ধরানো, শারমিন ত্রস্ত পায়ে উঠে স্বামীর ডানপাশে দাঁড়ালেন। শাহরিয়ার আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে কেমন ধীর গলায় বললেন, 

  - হঠাৎ করে ডাক পড়ল। কাল দরবার হলে কেন ডাকল, ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। 

শারমিন স্বামীর উদ্বেগে চিন্তিত হয়ে বলেন, 

  - কাল কী খালেদ ভাইরা থাকবেন না? 

  - থাকবে। কিন্তু কিছু একটা সমস্যা লাগছে। আমি তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারব না। 

শারমিন পরিবেশটা হালকা করতে বলেন, 

  - সারাক্ষণ ঝামেলার ভেতর থাকো, এখন সব কিছুতেই ঝামেলা দেখো। কিছু হবে না তো। আদা চা খাবে? একটু চা করে দিই? 

শাহরিয়ার মুচকি হাসেন। সেই প্রসঙ্গে আর কথা বাড়ান না। পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি। সেনা ইউনিফর্মে সুসজ্জিত হয়ে শাহরিয়ার আলম নেওয়াজ বিদায় নেন। মেয়েকে কোলে তুলে সারামুখে চুমু খেয়ে স্ত্রীকে বলেন, 

  - নিজের খেয়াল রেখো। 

শারমিন বহুকষ্টে হাসি ফোটান। বুকের ভেতর সবটুকু যন্ত্রণা চেপে স্বামীকে বলেন,

  - তাড়াতাড়ি আসবে। 

শাহরিয়ার একমুহুর্তের জন্যও চোখ সরান না। হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বলেন, 

  - চেষ্টা করব। 

সেদিন কেউ জানত না, এটাই ছিল তাঁর পরিবারের সঙ্গে শেষ বিদায়। ব্যাটালিয়নে সবাই তাঁকে চিনত— শাহনেওয়াজ নামে। 

টেলিভিশনের পর্দায় সারাদিন ধরে একই দৃশ্য ঘুরে ফিরে চলল। ধোঁয়া। গুলির শব্দ। উদ্বিগ্ন সংবাদ পাঠকের কণ্ঠস্বর। পর্দার নিচে লাল অক্ষরে ভেসে উঠছে "পিলখানায় সংঘর্ষ চলমান"। পিলখানার ভেতরে কী ঘটছে, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছিল না। আজিমপুরের ছোট্ট ফ্ল্যাটটায় টেলিভিশন সারাক্ষণ চলছিল। শারমিন একবার পর্দার দিকে তাকান, একবার টেবিলের ওপর রাখা ফোনটার দিকে। প্রতিবার ফোন বেজে উঠলেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে। কিন্তু ওপাশে কেউ শাহরিয়ারের খবর দিতে পারে না। 

ছোট্ট শাওলিন কিছুই বুঝতে পারে না। সে শুধু দেখে, মা আজ হাসছে না। বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে থাকছেন। ছোট্ট হাতে মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে প্রশ্ন করে,

  - মা, আব্বু?

শারমিন উত্তর দিতে পারেন না। শুধু মেয়েকে বুকের ভেতর টেনে নেন। এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন যে শাওলিন অবাক হয়ে যায়। একসময় রাত নামে। তারপর আরেকটা কালরাত। ঘড়ির কাঁটা চলতে থাকে, কিন্তু বাড়ির সময় যেন থেমে যায়। কেউ ঠিকমতো খায় না। ঘুমোয় না। ফোন বেজে উঠলেই সবাই একসঙ্গে চমকে ওঠে। আটচল্লিশ ঘণ্টা পর আবার ফোন বেজে উঠল। কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দই বের হয় না শারমিনের মুখ থেকে। যেন কথারও মৃত্যু হয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর হাত থেকে রিসিভারটা মেঝেতে পড়ে যায়। একটা আর্তনাদ ভেঙে দেয় পুরো বাড়ির নীরবতা। জোহরা দৌড়ে এসে তাকে ধরে ফেলেন। তবু শারমিন যেন কারো হাতেই ধরা পড়েন না। তিনি শুধু একটাই কথা বলতে থাকেন, 

  - না . . না . . শায়খের আব্বু বলে গেছে... তাড়াতাড়ি ফিরবে। আমাকে যা তা খবর দেয় কেন! জোহরা আপা... আপা! ওরা কী বলে? 

মায়ের অবস্থা দেখে শাওলিন ভয়ে কেঁদে ওঠে। সে বুঝতে পারে না কেন সবাই কাঁদছে। ছোট্ট পায়ে মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে,

  - মা... আব্বু কই? 

শারমিন উত্তর দিতে পারেন না। মেয়েকে জড়িয়ে ধরতেই হাউমাউ করে ভেঙে পড়েন। সেই কান্নার স্বর প্রতিবেশীরা শুনতে পায়। একটু পর ঘরে ভরে যায় লোকজন। শাওলিন বিস্মিত চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে মায়ের চোখের পানি মুছতে থাকে।

  - মা, কেঁদো না। আব্বু.. আসবে। আব্বু... ছিরাপ আনতে গেছে। 

ঘরে উপস্থিত মানুষগুলো ঠোঁট কামড়ায়। কিন্তু পরমুহুর্তে কেউ চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। ক্যাডেট স্কুল থেকে ছুটে আসে শায়খ। বাড়িতে ঢুকেই সে বুঝে যায়, পৃথিবীটা আর আগের মতো নেই। সব বদলে গেছে। মানুষে ভরা ঘর। চাপা কান্না। বাতাস ভারি। নিঃশ্বাস নিতে এতো কষ্ট হচ্ছে! এতো নিঃশব্দ মুখ! শায়খ পাথরের মতো তাকিয়ে থাকে। সে আর কিছু জিজ্ঞেস করে না।

ধীরে ধীরে মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শারমিন ছেলেকে দেখেই মেঝে উঠে দৌড়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরেন। বাতাস ভারি করে আবার ভেঙে পড়েন তিনি। শায়খ প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে, এই কান্নার কোনো সান্ত্বনা নেই। বাবা আর ফিরবেন না। সে মায়ের কাঁধে হাত রাখে। হাতটা এতো কাঁপছে! ঠোঁট কাঁপছে বারবার। কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। চৌদ্দ বছরের একটি ছেলে, সেদিন এক মুহূর্তেই বড় হয়ে যায়। মাকে আগলে নিতেই, তার ডান হাতের আঙুল ধরে ছোটো বোন। শায়খ ঝাপসা চোখে তাকাল। চোখে এতো অশ্রু, পুতুলের মতো বোনটার মুখ দেখতে পেল না। শাওলিন কচিকণ্ঠে শুধায়, 

  - ও দাদা, আব্বু...
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp