শাড়ি বদলে মৌমিতা আবার সালোয়ার-কামিজ পরেছে। এখন মুখে একটু পানির ঝাপটা দিয়ে সাজটাও তুলে ফেলতে হবে। সব কেমন যেন খচখচ করছে, কাঁটার মতো বিঁধছে। সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কাজলটা চোখের অনেক নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। নিজেকে দেখে তার নিজেরই কেমন যেন ভয় করলো।
কিছুক্ষণ আগেই বিয়ের কথা স্থির হয়েছে। সুজয়ের সাথে।
ছেলেটা বেজায় ভালো। আর এজন্যই মৌমিতার আফসোস হচ্ছে। সে মনে মনে এটাই চাচ্ছে, তার মন থেকে যেন বাদল পুরোপুরি মুছে যায়। আর বাদলের মন থেকে সে। এখন পর্যন্ত যা হওয়ার, হয়ে গেছে। অন্তত ভবিষ্যৎটা যেন সুন্দর হয় সবার।
বিশেষ করে বাদলের।
তার অতীত যথেষ্ট পীড়াদায়ক। সে কোনো স্বাভাবিক পরিবারে বড় হয়নি। ছোটবেলা থেকে ঝগড়াঝাটি, মারপিট আর বিশ্বাসঘাতকতা দেখেই সে অভ্যস্ত। সারাক্ষণ মানসিক যাতনায় ভুগেছে। তবু বারবার ভুল রাস্তায় পা বাড়াতে গিয়েও ঠিকই ফিরে এসেছে।
যখন সে একটু একটু করে সেরে উঠেছে, নিজের সত্যিকারের একটা পরিবার গড়ার স্বপ্ন দেখেছে, তখন সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে মৌমিতাই।
এই অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত সে কীভাবে করবে? সে যে নিজেও ভীষণ ক্লান্ত। এক পা সামনে এগিয়ে যাওয়ারও শক্তি নেই।
“আপা, এইদিকে আসো।”
মৌমিতা পেছনে ঘুরলো, “কী?”
“তোমাকে কতোকিছু দিয়েছে, দেখো।”
“তুই দ্যাখ।”
মার্জিয়া খাটের এককোণে রাখা জিনিসগুলো সাবধানে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো।
ভীষণ সুন্দর একটা জামদানি শাড়ি উপহার দেয়া হয়েছে তার আপাকে। নীলচে সবুজ কাপড়ের উপর সাদা সুতোয় সূক্ষ্ম কারুকাজ করা। আপাকে এখনই এই শাড়িটা পরিয়ে দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে!
পাত্রের পরিবার বেশ কিছু গয়নাও দিয়েছে। স্বর্ণের ভারী একটা হার, কানের দুল।
মার্জিয়া সেসব থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বোনের দিকে তাকালো। আপা মনমরা হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই খুব মায়া লাগলো। সে আপার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে যাবে, তখনই মৌমিতা ঘুরে দাঁড়ায়, “খেয়ে আসি, চল। খিদে পেয়েছে।”
“খাও। তুমি তো বিকালে কিছুই খাওনি। আর, মেহমানদের জন্য যতো খাবার ছিলো, আমিই সব সাবাড় করেছি!”
“তাহলে আমি যাই। তুই পরে খাবি?”
“হুম। আপা, এটা দেখো। এই দুলটা... একবার পরে দেখাও না—”
“এখন ভালো লাগছে না।”
মৌমিতা বেরিয়ে এলো বসার ঘরে।
মারুফ একা একা খবর দেখছেন টেলিভিশনে। পেছনে হেলান দিয়ে, হুইল চেয়ারের হাতলে ডান হাতটা বেশ জমিদারি কায়দায় তুলে রেখেছেন।
দৃশ্যটা দেখতেই মেয়েটার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটলো। সবসময় শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা এই মানুষটার প্রতি আজকাল খুব ভীষণ স্নেহ কাজ করে। কে যেন বলেছিলো—বয়স বাড়লে মানুষ আবার শিশু হয়ে যায়। ভুল বলেনি।
টেলিভিশনের দিকে চোখ পড়তেই মেয়েটার বুকটা ধক করে উঠলো। সে দ্রুত সামনে ছুটে গিয়ে সুইচ চাপলো, টেলিভিশন বন্ধ করলো। মেজাজটা একেবারে বিগড়ে গেলো। মৌমিতা চেঁচিয়ে উঠলো, “আম্মা! এখানে যে আব্বা একা বসে আছেন। আপনাদের খেয়াল নেই?”
রিপন ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, কপাল কুঁচকে বললো, “কী হয়েছে?”
“টিভি ছেড়ে দিয়ে গেছেন, একটু খেয়াল রাখবেন না? কতো অ্যাক্সিডেন্টের খবর দেখায়। আব্বার এসব দেখা যাবে না।”
“ওহহো!” মারুফের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো রিপন, “ব্যাপার না। দুলাভাই? ওসব নিয়ে ভাববেন না। চলেন, ঘরে যাই।”
সে হুইল চেয়ারটা ধরে মারুফের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। মেয়েটা প্রবল বিরক্তি নিয়ে চেয়ে রইলো সেদিকে। বিরক্তির পাশাপাশি আরেকটা অনুভূতি কাজ করছে তার ভেতরটা জুড়ে, অস্বস্তিকর কোনো অনুভূতি। সে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারলো না। কেবল বুকের বামপাশটা হঠাৎ কেমন যেন খালি খালি মনে হলো।
সে আরেকবার উঁকি দিলো আব্বার শোয়ার ঘরে। তারপর মুখ ধুতে গেলো।
—————
সোমবার।
ভোরের দিকে বৃষ্টি হয়েছিলো। উঠোনটা এখনও স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে। মার্জিয়া একবার ঝাড়ু দিয়েছে। তারপর গোসল সেরে নিয়েছে। আজ কোনো কারণে তার মনটা তুলনামূলক ফুরফুরে।
সে আর রিপন মামা মিলে সকালে আব্বাকে খাইয়েছে। মারুফ বেশ কয়েকবার বাম পা নাড়িয়েছেন। তিনি হয়তো এবার সেরে উঠবেন। আবার কথা বলবেন, হাঁটাচলা করবেন। মার্জিয়া হাতঘড়িটা আব্বাকে পরিয়ে দিবে তখন। আব্বার পছন্দ হবে তো? পছন্দ না হোক, আব্বা শুধু একবার পরে দেখলেই মার্জিয়া খুশি।
সে ঘরে ঢুকলো। আজ মৌমিতা এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। কম্বলটা তার শরীরের সাথে পেঁচিয়ে গেছে।
আপার পায়ের দিকটা ভালোভাবে ঢেকে দিলো মার্জিয়া। অন্যমনস্ক হয়ে এদিক-ওদিক তাকালো। করার মতো কোনো কাজ খুঁজে পেলো না। নিরাশ হয়ে আবার সামনের দিকে ঘুরলো। তারপরই খাটের উপর উঠে আপাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “আপা ওঠো না! কতো ঘুমাবা—”
মৌমিতার শরীরটা গরম। বেশ গরম। কম্বলের উপর থেকেও অস্বাভাবিক একটা তাপ আঁচ করা গেলো।
“আপা?”
মৌমিতা ঘুমের মাঝেই ভ্রু কুঁচকায়। একটু নড়াচড়া করে আরও গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকে।
বাহির থেকে রাবেয়া ডেকে উঠলেন, “মার্জু? তোমার আপাকে ডাকো। এতো বেলা করে সকালের নাস্তা করলে তো অসুস্থ হয়ে যাবে।”
মার্জিয়া বিড়বিড় করলো, “হয়ে গেছে!” কম্বলটা আরেকটু ঠিকঠাক করে সে কোমল স্বরে বললো, “আপা? ওঠো। ভাত খাও। সামনে বিয়ে, এখন অসুস্থ হওয়া যাবে না!”
মৌমিতা চোখ ঘষতে লাগলো। বোনের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বললো, “তাতে তোর কী? যার বিয়ে তার হুঁশ নাই, পাড়া-পড়শির ঘুম নাই!”
“বাহ! তুমিও আম্মার মতো প্রবাদ বলতে শুরু করেছো। ভালোই।” মার্জিয়া খাট থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, “আর শোনো, পাড়া-পড়শি নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নাই। তোমারও থাকা উচিত না!”
হাতে ভর দিয়ে উঠে বসে মৌমিতা, “আশ্চর্য! আমি তোর প্রতিবেশীর কথা কখন বললাম?”
“যেটাই বলো। এখন যে অসুখ ধরিয়ে বসে আছো। ডাক্তার বিয়ে করবে জন্যে একেবারে রোগী হয়ে যেতে হবে?”
“এতো চেঁচাচ্ছিস কেন? কানে লাগছে। পাশের ঘরে আব্বা আছেন।”
“জানি আমি।” মার্জিয়া আবার ঝাঁপ দিয়ে বিছানায় বসে পড়লো, “আব্বা আজকে অনেকবার পা নেড়েছেন। একদম এইভাবে—”
মেঝে থেকে নিজের পা খাটের উপর তুলে অভিনয় করে দেখালো সে। মৌমিতা অবিশ্বাসের সুরে বললো, “সত্যিই?”
“হ্যাঁ। বিশ্বাস না হলে চলো আমার সাথে। দেখাই... ও হ্যাঁ! তুমি তো এখনও খাওনি। এতো অনিয়ম করো কেন? এখন যে জ্বর এসে গেলো।”
“তাই?”
“নয়তো কী? থার্মোমিটার এনে দিচ্ছি। তুমি নিজেই দেখো।”
“থাক। লাগবে না।” মৌমিতা গায়ের উপর থেকে কম্বল সরালো, খাট থেকে নামতে নামতে ক্ষীণ স্বরে বললো, “আমি যে বেঁচে আছি, এটাই অনেক।”
ঘড়িতে প্রায় ১১টা বাজে।
রাবেয়ার মেজাজ তেমন খারাপ না। নতুবা এতোক্ষণে একটা তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়তেন। তার এই অমনোযোগিতার সুযোগ নিয়ে মৌমিতা আরও অনিয়ম করলো। সকালের খাবার না খেয়েই সোজা গোসলে ঢুকে পড়লো। দীর্ঘ সময় পর বেরিয়ে এলো।
সর্দি লেগেছে আগেই, এবার গলাব্যথাও যুক্ত হলো।
মেয়েটা কাউকে কিছু জানালো না। নিজের অসুস্থতা সে বরাবরই উপভোগ করে। তাছাড়া আজ নিজের প্রতি আরও নিষ্ঠুর হতে ইচ্ছে করছে তার।
মেয়েটা যতোক্ষণে গোসল সেরে বেরিয়েছে, ততোক্ষণে মারুফ আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাই আব্বার পায়ের নড়াচড়া সে দেখতে পারলো না। নিজের ঘরে ফিরে এলো।
মার্জিয়া তখন বসার ঘরে। টেলিফোনে কারও সাথে কথা বলছে।
জানালা পুরোপুরি খোলা। আজ আবহাওয়াটা ভীষণ সুন্দর। মিষ্টি রোদ উঠেছে। সোনালি বর্ণের রোদ এসে ঢুকেছে ঘরে। ঐ রোদের আলোয় বাতাসে ভাসতে থাকা ছোট ছোট ধূলিকণাগুলোকে দেখা যাচ্ছে। বাইরের দখিনা বাতাস ঘরের ভেতরে এসেও ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে।
মৌমিতা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটায় তার শরীরটা শিরশির করে উঠলো। অসুস্থতা, বিয়ে, চাকরি... মেয়েটা এক ঝটকায় সব ভুলে গেলো।
কী আশ্চর্য! বাদল এখন আর তার নয়। অবশেষে তাদের সম্পর্কের ইতি ঘটে গেছে আনুষ্ঠানিকভাবে। ফিরে যাওয়ার কোনো রাস্তা রাখেনি মৌমিতা। অথচ এতো বছর ধরে তার হৃদয়ে খোদাই করে রাখা ঐ একটা নাম। বাদল।
হয়তো এই মানুষটা একদিন অন্যকারোই হয়ে যাবে, হয়তো হবে না। কিন্তু সে আর কখনোই মৌমিতার হবে না। বাদলের যেমন জেদ! এই রাগ ভাঙানো কি আদৌ সম্ভব? তাছাড়া, মৌমিতার হাতের স্বর্ণের শিকলটাও তো স্থায়ী হয়ে গেছে।
বাদলও কি কখনো কাউকে বিয়ে করবে? নাকি একাই থাকবে?
হয়তো কোনো ভাগ্যবতী নারী তাকে পেয়ে যাবে। রোজ রোজ তার ঐ হাসিটা দেখার সৌভাগ্য পাবে। মন চাইলেই তাকে ছুঁতে পারবে। তার কণ্ঠ, ঐ ছেলেমানুষী আর অভিমান মাখানো আদুরে কথাগুলো একেবারে কাছ থেকে শোনার অধিকার পেয়ে যাবে কেউ না কেউ।
মৌমিতা আর পাবে না কখনোই। সর্বপ্রকার অধিকার সে হারিয়ে ফেলেছে।
যে না চাইতেই বাদলকে পেয়ে যাবে, সে কি কোনোদিন বুঝবে, ঐ মানুষটার জন্য একটা আস্ত হৃদয় পুড়তে পুড়তে ছাই হয়ে গেছে? আজীবন এভাবেই পুড়বে হয়তো। ছাই তো দ্বিতীয়বার পোড়ে না। কিন্তু মেয়েটা পুড়বে। আত্মা নামক ঐ কেরোসিন তার দেহে যতোদিন থাকবে, সে ততোদিন পুড়বে।
আর ফেরা হবে না। তবুও কিসের যেন অপেক্ষায় মৌমিতা এখনও স্বস্তি পাচ্ছে না।
বাদলকে পেয়ে যাওয়া সেই ভাগ্যবতী জানবে না, তার মালিকানায় থাকা মানুষটিকে একবার দেখার জন্য কারও চোখজোড়া চিরকাল চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত রয়ে যাবে।
বাদল তখন অন্য কাউকে ভালোবাসবে! তাকে ঘিরে মৌমিতার যতো স্বপ্ন ছিলো, সেই স্বপ্নগুলো হয়তো পূরণ হবে। কিন্তু মৌমিতা নিজেই আর অংশীদার থাকবে না তাতে।
বাদল কি তখন সেই মেয়েটার দিকেও অমন করেই তাকাবে, যেভাবে মৌমিতার দিকে তাকাতো? তাকেও কি ওভাবেই হৃদয় নিংড়ে বলবে... ‘ভালোবাসি’?
মৌমিতা চাদরটা গায়ের চারপাশে ভালোভাবে মুড়িয়ে নেয়। মুখের উপর থেকে ভেজা চুলগুলো সরায়। নাকটা শিরশির করছে, হাঁচি আসছে না। চোখে পানি আসছে। অস্বস্তি হচ্ছে।
সে তো নিজেই অন্যকারও হয়ে যাচ্ছে, তাহলে ছেলেটাকে আরেকজনের সাথে ভাবতে অসুবিধা কোথায়?
বাদলকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে মৌমিতার। কতোদিন হলো দেখা হয় না তার সাথে। বাদলের কি আর ইচ্ছে হয় না, প্রাক্তনকে আরেকবার দেখার? হয় না হয়তো। ঘৃণাই তো করে!
ছেলেটা কেমন আছে, কী করছে—জানার অধিকার এখন মৌমিতার নেই। তবু, অন্তত একবার যদি ঐ মুখখানি দেখা সম্ভব হতো, দূর থেকে হলেও। ভেতরটা একেবারে খাঁ খাঁ করছে।
“আপা?”
মৌমিতা দ্রুত চোখ মুছে পেছনে তাকায়, দরজার দিকে। মার্জিয়া সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা হাতে থাকা খবরের কাগজ লুকানোর চেষ্টা করলো। তারপরেই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে সেটাকে আবার সামনে ধরে আপার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
মৌমিতা এগিয়ে যায়, “কী হয়েছে?”
মার্জিয়া যথাসম্ভব স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করে, “আপা, ঐ যে... আমি... মানে—”
মৌমিতা বুঝলো, কিছু একটা নিয়ে মেয়েটা চাপের মধ্যে আছে। তাই সে নিজ দায়িত্বে ছোট বোনের হাত থেকে পত্রিকাটা নেয়।
মার্জিয়া এক মুহূর্তের জন্য তাকে বাধা দিতে গিয়েও শেষমেশ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে। আপাকে এই খবরটা জানানো ঠিক হবে কিনা—সে বুঝতে পারছে না।
মৌমিতা শিরোনামে চোখ বোলায়, বিড়বিড় করে পড়ে, “ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত চার, নিখোঁজ বারো, আহত অর্ধশতাধিক... হ্যাঁ, কালকে নিউজেও দেখলাম—”
কথা বলতে বলতে সে চোখ তুলে তাকায়। মার্জিয়ার চোখে-মুখে লেপ্টে থাকা আতঙ্ক দেখে অনুমান করে, বিষয়টা হয়তো আরেকটু জটিল। মৌমিতা আবার পত্রিকায় দৃষ্টি ফেরায়।
নাটোর থেকে খুলনাগামী ট্রেন দুর্ঘটনায় ৪ জন মারা গেছে। ৪ জনের মধ্যে ২ জনের ছবি ছাপানো হয়েছে। আর ঐ দুইজনের মধ্যে একজন... বাদল?
বড় শিরোনামটার নিচেই ঘোলাটে সাদাকালো ছবিতে জ্বলজ্বল করছে চেনা মুখটা, নিচে এক শব্দের নাম—‘বাদল (আনুমানিক ২২)’।
“আপা, আমি... আমি তো ওনাকে দেখিনি। ট্রেনটা খুলনায় যাচ্ছিলো, তাই... আমি বুঝতে পারছি না। ওটা কি সত্যিই... বাদল ভাই?”
মৌমিতা নিজে বিশ্বাস করলো না, মার্জিয়ার কথার উত্তরেও ডানে-বামে মাথা নাড়লো। সে মুখ তুলে আবার ছোট বোনটার দিকে তাকাতে চাইলো, পারলো না।
সাদাকালো ছবিটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে। পায়ের নিচের মাটি কেঁপে ওঠে, মেয়েটা নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু মার্জিয়া তাকে ধরে ফেলার আগেই তার দুর্বল শরীরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
—————
“তারপর... আমার আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
সুস্মিতা বিস্ফারিত নয়নে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।
সে একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো। জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিলো, বাদল এখন কোথায়, কী করে, বিয়ে করেছে কিনা, তার সাথে আবার দেখা হয়েছিলো কিনা...?
ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি, মানুষটার জীবন ওখানেই থেমে গেছে।
কাঁপা গলায় কোনোমতে বলে ওঠে মেয়েটা, “মারা গেছে?”
মৌমিতা মাথা নাড়লেন, “হুম।”
একটা অচেনা, অজানা মৃত ব্যক্তির প্রতি সুস্মিতার হঠাৎ প্রচণ্ড মায়া হলো। আর সামনে বসে থাকা চিরচেনা মানুষটার প্রতি এলো আরেক ধরনের অনুভূতি। সম্ভবত... রাগ!
মায়ের ভাবলেশহীন মুখটা থেকে তার দৃষ্টি সরলো না, “তোমার একটুও খারাপ লাগেনি?”
তিনি বাম হাতের তালুতে ভর দিয়ে একটু হেলে বসলেন, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, “খারাপ লাগলেও কী করতাম? যার আয়ু শেষ, তাকে তো ফিরিয়ে আনতে পারতাম না।”
সুস্মিতার অনেক কষ্টে চেপে রাখা কান্নাটা চাপা আর্তনাদ হয়ে বেরিয়ে আসে, “তাই বলে তুমি... কীভাবে... এতো সহজে বলছো এই কথা!”
সে ছোট বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে ফেলে। মায়ের দৃষ্টি থেকে এই দুর্বলতা লুকানোর ছোট্ট একটা চেষ্টাও করে, দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলে। মৌমিতা টের পেলেন, মেয়েটার বাহ্যিক কঠিন আবরণটা হঠাৎ ভেঙে পড়েছে। সে সর্বদাই তার অনুভূতিগুলো খুব নিখুঁতভাবে লুকিয়ে রাখতো, কিন্তু আজ সে ব্যর্থ হলো। মা-মেয়ের মাঝখানের অদৃশ্য দেয়ালটা হঠাৎ বিকট আওয়াজে খসে পড়লো।
মৌমিতা মেয়ের দিকে সরে এসে বসলেন, “সুস্মিতা? মা, শান্ত হও।”
“আমাকে শান্ত হতে বলছো?” মেয়েটা ব্যথাতুর দৃষ্টিতে আম্মুর দিকে তাকায়, “আমি তো ওনাকে চিনতামও না। তুমি চিনতে। তোমার একটুও কষ্ট হয়নি?”
“হবে না কেন! পাগল হয়ে গিয়েছিলাম প্রায়। কতো যে ভয়ঙ্কর কেটেছে ঐ দিনগুলো, তা কেবল আমিই জানি। কিন্তু এখন আর ওসব নিয়ে ভাবি না। যা হওয়ার, হয়ে গেছে। কিছু করার নেই।”
“এখন আর খারাপ লাগে না? সত্যি সত্যিই পাথর হয়ে গেছো?”
“হয়তো।” মৌমিতা মেয়েটার অশ্রুভেজা মুখের উপর থেকে চুল সরিয়ে দিলেন, চোখের পানি মুছে দিলেন সযত্নে। সুস্মিতা একটু শান্ত হলো, “উনি মারা না গেলে কি তুমি আব্বুকে বিয়ে করতে না?”
মৌমিতা হাসলেন, “আমার ভাগ্যে তোমার আব্বুই ছিলো। সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছিলাম। বললাম তো।”
“কিন্তু... তুমি কাকে চেয়েছিলে?”
“হয়তো, যার সাথে আমার কোনো ভবিষ্যত নেই, তাকেই চেয়েছিলাম। তবে আব্বার ঐ ডায়েরিটা পড়ার পর, আমি প্রথমবার নিজের আবেগ ভুলে সবটা যুক্তি দিয়ে ভাবলাম। আব্বা সুস্থ না থেকেও আমার পাশে ছিলেন। মন তবু এদিক-ওদিক ছুটছিলো।
যখন সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলো, তখন আমি এটাই মেনে নিলাম।
ধরে নিলাম, বাদলের জীবনেও কেউ আসবে, তার সুন্দর একটা সংসার হবে। একটা ফুটফুটে মেয়ে হবে।
বাদল একদিন নিজেও বাবা হবে, ঐদিন হয়তো সে আমাকে ক্ষমা করে দিবে। কিন্তু আল্লাহ ওকে আর অপেক্ষা করালেন না। একটা মানুষ আর কতোই অপেক্ষা করবে?
বাদল চলে গেলো। আমাকে ক্ষমা করলো না। আমার উপর ঘৃণা নিয়েই... চলে গেলো।”
দুপুর হয়ে এসেছে। ফ্যানের বাতাসে কাজ হচ্ছে না। খুব গরম!
সুস্মিতার অনেক খিদে পেয়েছিলো একটু আগে। তবে এখন তার আর কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না। সবকিছু কেমন যেন তুচ্ছ মনে হচ্ছে। সে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলো। দুই গালে অশ্রুর দাগ পড়ে গেছে।
তাকে এমন নিস্তব্ধ দেখে মৌমিতা মিইয়ে গেলেন। ভয় হলো, এবার মেয়েটাও তাকে ভুল বুঝবে। তার ছোটখাটো কাজের পেছনে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা খুঁজবে, অতীত টেনে আনবে।
তিনি বড় একটা শ্বাস নিলেন। শাড়ির ভাঁজ ঠিক করার ভান করে চাপা স্বরে বলতে লাগলেন, “আমি জীবনে কখনোই কারও কাছে ভালো হতে পারলাম না সুস্মিতা। না মেয়ে হিসেবে, না জীবনসঙ্গী হিসেবে। অন্তত মা হিসেবে আমি খারাপ হতে চাইনি। কিন্তু হয়ে গেছি—”
“আম্মু।” সুস্মিতা বিড়বিড় করে, “তুমি আর যা-ই হও, মা হিসেবে নিজেকে খারাপ ভেবো না। আমি নিজেই তো কখনো তোমাকে বোঝার চেষ্টা করিনি। অনেক কষ্ট দিয়েছি, কখনও 'সরি' পর্যন্ত বলিনি। ভাবতাম, তুমি কষ্ট পাও না!
তোমাকে আমি রাগ করতে দেখেছি। হাসতে দেখেছি। কখনও কাঁদতে দেখিনি। আগে তো বোঝার উপায় ছিলো না। যার জীবনে এতো ধরনের দুঃখ, সে কোনো ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে কাঁদতে পারবে না, এটাই তো স্বাভাবিক।”
মৌমিতা মেয়ের দিকে তাকালেন না। তবে মনোযোগ দিয়ে শুনলেন কথাগুলো। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো শাড়ির কুচিতে। চোখদুটো জ্বালা করছে, বহুদিন পর!
রান্না করতে গিয়ে পেঁয়াজের ঝাঁঝে কিংবা অন্য অনেক কারণেই চোখ জ্বালা করেছে। কিন্তু আজকের অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
“আম্মু? একটা কথা বলো তো। আব্বুকে বিয়ে করে তোমার আফসোস হয়নি?”
মৌমিতা চোখের পাতা ফেললেন কয়েকবার। মাথা নেড়ে বললেন, “উঁহু। বরং আমার একটা ভুল ধারণাও ভেঙে গেছে ঐ ঘটনার পর।”
মায়ের শুষ্ক চোখজোড়ার দিকে তাকালো মেয়েটা, রক্তলাল হয়ে উঠেছে সেগুলো। কান্নাকাটি করার অভ্যেস অনেক আগেই চলে গেছে। হয়তো এ কারণে মায়ের চোখদুটো অশ্রু ফেলার পদ্ধতিও ভুলতে বসেছে।
সুস্মিতা নড়েচড়ে বসলো, অদম্য কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করলো, “ক... কোন ঘটনা?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………