রবিবার। মার্জিয়া খিচুড়ি রান্না করেছিলো। ভোর থেকেই সে খুব ব্যস্ত। রাবেয়া কয়েকবার এসেছিলেন সাহায্য করতে, সে রাজি হয়নি। যদিও এসব করতে খুব আলসেমি হচ্ছে। বাসন মাজা শেষ করতে করতেই সাড়ে নয়টা পেরিয়ে গেছে। মেয়েটা ঘরে এলো হাত মুছতে। আপা এখানে নেই। সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চলে এলো।
“আপা, দুই ঘণ্টা ধরে এখানে হাঁটাহাটি করছো তুমি! আচ্ছা, কী হয়েছে বলো তো? কালকে থেকেই তোমার হাবভাব ঠিক লাগছে না আমার কাছে।”
মৌমিতা প্রথমে উত্তর দিলো না। পায়চারি থামিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টি বাইরের দিকে।
“আপা? কী করছো তুমি?”
“পস্তাচ্ছি।” সে ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে বলে, “আম্মা বলতেন না সবসময়, এই চুপ থাকা স্বভাবের কারণে একদিন পস্তাতে হবে? এই তো, এখন পস্তাচ্ছি।”
“কী হয়েছে?”
“বাদল ফোন দিয়েছিলো কালকে।”
মার্জিয়া অবাক হয়ে বলে উঠলো, “একবারও বললা না তো! তুমি সবকিছু নিজের মধ্যে চেপে রাখো কেন আপা? যাই হোক, বাদ দাও। কী বললো বাদল ভাই?”
“বললো, ও আমাকে ঘৃণা করে।”
মেয়েটা হতভম্ব হয়ে আপার মুখের দিকে চেয়ে রইলো। কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পেলো না। খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর সে-ও মৌমিতার দৃষ্টি অনুসরণ করে উঠোনের দরজার দিকে তাকায়। ক্ষীণ স্বরে প্রশ্ন করে, “সত্যিই এটা বলেছে?”
“বলেছে। তবে আমার মনে হয় না সত্যি বলেছে।” মার্জিয়ার দিকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায় মৌমিতা, “তোকে একটা কথা বলি। আমি রাগে এতোটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে এটাও ভাবিনি, বাদল কীভাবে যোগাযোগ করবে আমার সাথে? ওর যা করার ছিলো, সব করেছে। শুধু একটা জিনিস বাদে।
আমি যখন যখন ওর মেসে ফোন দিয়েছি, তখনই ও বাইরে গেছে। মেস মালিক ওকে নিজে থেকে কিছু বলেননি। ও জিজ্ঞেস করেনি এতোদিন। আর এদিকে আমি ভেবেছিলাম...”
মৌমিতা অন্যমনস্কভাবে বাইরে তাকায় আবার। মার্জিয়া অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করে, “কী ভেবেছিলে?”
“ভেবেছিলাম, বাদল বোধহয় আর ফিরবে না। আব্বার সাথে কথা বলার পর থেকেই ও একেবারে হাওয়া হয়ে গিয়েছিলো। দু'জনের মধ্যে কী কথা হয়েছিলো, কিচ্ছু জানি না। ধরে নিয়েছিলাম, আব্বা ওকে সরে যেতে বলেছেন, আর ও সরে গেছে। আমি ওকে আর কখনোই ফিরে পাবো না।
তাই আমি নিজে থেকেও আর চেষ্টা করিনি। নিজের দিকটা স্পষ্ট করতে চেয়েছি, যেন বাদল কোনো পিছুটান না রাখে। একটা চিঠি পাঠিয়েছিলাম। ওখানে লিখেছিলাম, ও যেন আমাকে ভুলে যায়।”
মার্জিয়া মাথা নাড়ে, “তারপর?”
“কালকে ফোন দিলো। জানালো, ও অনেক চেষ্টা করেছে যোগাযোগ করার। বাসায় পর্যন্ত এসেছিলো। ও... অনেক অনুরোধ করেছিলো আমাকে, অন্তত একটা কথা বলার জন্য। আমি কিছু বলতে পারিনি। শেষে গিয়ে, ফোন কাটার আগে ও বলেছে, আমাকে ঘৃণা করে।”
“তুমি একটাও কথা বলোনি!”
“না! কী বলতাম? আমি তো ভাবিইনি ওর সাথে আবার কখনও কথা হবে। ধরে নিয়েছিলাম, ও আব্বার কথা শুনে চলে গেছে। ওর কণ্ঠ শুনেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। একেবারে ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। মুখ দিয়ে একটাও কথা বের হচ্ছিলো না। নাহলে তো ও-ই একমাত্র মানুষ, যাকে আমি যা খুশি তাই বলতে পারি।
বাদল আগে কখনোই আমার উপরে রাগ দেখায়নি। অভিমান করেছে, কিন্তু ওর মুখ থেকে উল্টাপাল্টা কোনো কথা শুনিনি। কাল প্রথম শুনলাম।
আর... আমার মাথায় তখন এই চিন্তাই ছিলো। আমার তো বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। পাত্রের মা আমাকে ছেলের বউ হিসেবে মেনেই নিয়েছেন! আমিও প্রায়... মেনে নিয়েছি সব। এটাও ভেবে নিয়েছি, বাদল তো অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখী হতেই পারে। কী বোকামিটা করেছি!”
মার্জিয়া হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে, “তাহলে এখন?”
“আসুক। আসলে বাকিটা দেখা যাবে।”
“কে আসবে? বাদল ভাই?”
“হ্যাঁ। ডায়েরি ফেরত দিতে চেয়েছে।”
“কী?” মেয়েটার মুখখানি নিরাশায় ছেয়ে গেলো, “বাদল ভাই ডায়েরি ফেরত দিবে! সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু... তার মানে, সত্যিই তোমার সাথে অনেক রাগ করেছে। নাহলে তো—”
মৌমিতা অল্প হেসে মাথা নাড়লো, “করেছে অবশ্যই। কিন্তু আমি তো ওকে চিনি। ও যখন আমাকে প্রথমবার প্রস্তাব দিয়েছিলো, আমি রিজেক্ট করেছিলাম। ওর লেখা চিঠিটা টুকরো টুকরো করে ওর মুখের উপরে ছুঁড়ে ফেলেছিলাম।”
“ইশ!” মার্জিয়া আফসোসের সুরে বলে, “তুমি এই কাজ করেছো, তবু বাদল ভাই তোমার পেছনেই পড়ে আছে?”
“পুরো কথা বলতে দে। যাই হোক, ও অনেক অপমানিত হয়েছিলো। আমার সামনে এসে দাঁড়ানোর কিংবা কথা বলার সাহস ছিলো না। তখন ও কী করেছিলো, জানিস?”
“না, জানি না!”
মার্জিয়ার মাথায় আলতো চাটি মারলো মৌমিতা, “ভালোভাবে কথা জানতে পারিস না?”
“ভালোভাবেই তো... আচ্ছা তুমি বলো, কী করেছিলো?”
“ডায়েরি ফেরত দিতে চেয়েছিলো। তখন তো ভেবেছিলাম, সত্যিই ফেরত দিবে। কিন্তু পরে একদিন নিজেই বললো, ডায়েরিটা ও ফেরত দিতে চায়নি। ওটার বাহানায় আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলো। আর তো কোনো উপায় ছিলো না।
আজকেও দ্যাখ, ও হয়তো ভাবছে, আমি ওকে ধোঁকা দিয়েছি। ভাবছে, আমি অন্যকাউকে বিয়ে করবো। ওর যদি কিছু বলার থাকে, তাহলে একটা অজুহাত লাগবে। ডায়েরি ফেরত দেওয়া—একটা অজুহাত।
বাদল অনেক জেদি। আমাকে এতোবার অনুরোধ করার পরেও আমি কথা বলিনি। ও এতো সহজে হাল ছাড়বে না। দেখিস, ঠিকই চলে আসবে।”
মেয়েটা কথা শেষ করে উঠোনের দরজার দিকে তাকায়।
মার্জিয়া কিছু একটা ভাবলো। বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বললো, “আজকে তো ঐ ডাক্তার সাহেবও আসবেন। পরিবারসহ।”
“হ্যাঁ। আসুক। আজই একটা এসপার-ওসপার হয়ে যাক।” বাম হাতের মুঠোয় সোনার বালাটা চেপে ধরলো মৌমিতা, “আজকে আমি এটা খুলে ওনাকে ফেরত দেবো। ওনারা সবাই ভালো মানুষ। আমি নিশ্চিত, কেউ কিছু মনে করবেন না। বিষয়টাকে ভালোভাবেই মেনে নিবেন। আর আমিও তো কোনো অসম্মান দেখাচ্ছি না। ঐ পরিবারের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এর থেকে বেশি কিছু করার নেই, আর বিয়ে... সম্ভব না।
অনেক চেষ্টা করে দেখেছি মার্জু, বাদলের জায়গাটা আমি কাউকে দিতে পারবো না। বাদলের মতো কেউ হবে না। ডক্টর সুজয় ভালো মানুষ। অনেক ভালো মানুষ। কিন্তু আমি... ভালো মানুষ চাই না, আমি বাদলকেই চাই। বাদল যেমন, সেভাবেই চাই।”
আপাকে এতো সোজাসাপ্টা কথা বলতে খুব কমই দেখেছে মার্জিয়া। বড় বোনটাকে এভাবে ভেঙেচুরে যেতে দেখে তার চোখদুটো অযথাই আর্দ্র হয়ে আসে। সে মৃদু মাথা দোলায়, “ঠিক। এতো বছরের সম্পর্ক এভাবে ভেঙে দেয়া ভুল হবে। সবটাই যেখানে ভুল বোঝাবুঝি ছিলো। কিন্তু বাদল ভাইয়ের ফিন্যান্সিয়্যাল অবস্থা—”
“ওসব কিছু না। আমি যেকোনো পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে পারবো। আমার শুধু বাদল হলেই চলবে। কী হবে সর্বোচ্চ? মরে তো আর যাবো না! আর আমি... আয়েশা হয়ে বাঁচতে চাই না।”
“মানে?”
“কিছু না।” মৌমিতা দুই হাতে মুখ মুছতে লাগলো, “এখন শুধু ও চলে আসুক।”
সে আবার পায়চারি করতে শুরু করলো। মার্জিয়া ফটকের দিকে তাকায়। অস্থির ভঙ্গিতে নখ কামড়াতে শুরু করে। সে হুট করেই বলে ওঠে, “আপা? তুমি কি শিওর, আসবে? যদি না আসে? এমনও তো হতে পারে, বাদল ভাই রাগের মাথায় ডায়েরি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছে। হয়তো সত্যি সত্যি ফেরত দিতে চায় না।”
মৌমিতা ভ্রু কুঁচকালো। পায়চারি বন্ধ করে অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
“ওনার মেসে গিয়ে খোঁজ নিলে হয় না? কারও ভরসায় বসে থেকো না আপা। আর সময় নষ্ট করা যাবে না। আজকে বিকালেই ছেলেপক্ষ আসবে, পাঁচটার দিকে। যা করার, তাড়াতাড়ি করতে হবে।”
মেয়েটা হঠাৎ অধৈর্য হয়ে উঠলো, বিড়বিড় করে বললো, “বাদল যদি না থাকে মেসে? কী করবো? কয়টা বাজে, দ্যাখ তো।”
মার্জিয়া জানালার সামনে গিয়ে ভেতরে উঁকি দিলো, বসার ঘরে ঝোলানো দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, “প্রায় দশটা বাজে।”
“আমি যাই। ভালো লাগছে না। যা হওয়ার হবে।”
“সাবধানে যাও।”
মৌমিতা ইতস্তত করলো, আপনমনে বললো, “সত্যিই যাবো? যদি বাদল... এখনও রাগ করে থাকে—”
“এতো চিন্তা করছো কেন? সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহর উপরে ভরসা রাখো।”
“আচ্ছা। কাপড় বদলে আসি।”
আঙিনার দরজাটায় আওয়াজ হলো। দুই বোনই দৃষ্টি ফেরালো সেদিকে। এক মধ্যবয়সী লোক ভেতরে এলো। মার্জিয়া তার আপার দিকে তাকিয়ে তাড়া দেখায়, “যাও, তুমি রেডি হও তাড়াতাড়ি।”
মৌমিতা আরেকবার উঠোনের দিকে তাকিয়ে ভেতরে ঢুকলো।
লোকটা বড় বড় পা ফেলে বারান্দার কাছে চলে আসে, ফ্যাসফেসে গলায় বলে, “মৌমিতা খন্দকার আছেন?”
মার্জিয়া সাত-পাঁচ না ভেবেই মাথা ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “আপা?”
মেয়েটা মাঝরাস্তা থেকে আবার বারান্দায় ছুটে এলো, “কী?”
বোনের দৃষ্টি অনুসরণ করে সে-ও অজ্ঞাত ব্যক্তির দিকে তাকায়। লোকটা বলে, “আপনি মৌমিতা খন্দকার?”
“জ্বী।”
“একটা পার্সেল আছে আপনার নামে।”
মৌমিতা গ্রিলের দরজা খুলে হাত বাড়ালো, দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে জিনিসটা হাতে নিলো। খবরের কাগজে মোড়ানো বই সদৃশ কিছু—তা দেখতেই মার্জিয়ার মুখটা কালচে বর্ণ ধারণ করলো। শঙ্কিত দৃষ্টিতে বড় বোনের দিকে তাকালো। কিন্তু আপার চোখে-মুখে খানিকটা বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই দেখলো না সে।
মানব মস্তিষ্ক যখন জটিল সব চিন্তাভাবনায় অভ্যস্ত হয়ে যায়; তখন সে আকাশের মেঘের মাঝে নানান আকৃতি দেখে, মেঘটাকে দেখে না।
“টাকা দিতে হবে?”
লোকটা ডানে-বামে মাথা দোলায়, “না। দেওয়া আছে।”
মৌমিতা জিনিসটা উল্টেপাল্টে পর্যবেক্ষণ করলো, “কে পাঠিয়েছে? নাম-ধাম কিচ্ছু লেখা নেই।”
“আমি আসি ম্যাডাম?”
“আচ্ছা।”
মার্জিয়া অপ্রস্তুত হয়ে কপাল চুলকায়, আপার হাতে থাকা জিনিসটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকে, তার আশঙ্কা যেন সত্য না হয়।
মৌমিতা আরেকবার নেড়েচেড়ে দেখলো সেটাকে। ভ্রু কুঁচকে পত্রিকার মোড়ক সরালো। বই নয়! সম্ভবত একটা ডায়েরি। নীল মলাটে সেলাইয়ের কারুকাজ। কাগজের আবরণটা পুরোপুরি সরানোর দরকার পড়লো না। তার আগেই মেয়েটার হৃৎপিণ্ড থমকে গেলো।
আজ থেকে সাত বছর আগে সে যেভাবে যত্ন করে খবরের কাগজে মুড়িয়ে এটা আবর্জনার মাঝে ফেলে এসেছিলো, ঠিক যেন সেই অবস্থায়ই তার কাছে ফিরে এলো ডায়েরিটা।
মৌমিতা আর কিছু ভাবতে পারলো না। আশেপাশের সবকিছু তার কাছে অন্ধকার দেখালো। সে খানিকটা পিছিয়ে যায়, ধীরে ধীরে নাকের কাছে ধরে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদটাকে, বড় একটা শ্বাস নেয়।
বাদল! ছেলেটার স্পর্শ লেগে আছে মলাটজুড়ে। এতোটা যত্ন করে পত্রিকা মুড়িয়েছে মলাটের চারপাশে। ফিরিয়ে দিয়েছে। নিজে আসেনি। ঘৃণা যখন করেই, এতো যত্ন দেখানোর প্রয়োজন কী ছিলো!
বাদল আজ আর জেদ করলো না, একটিবার দেখা করার জন্য অস্থির হয়ে ছুটে এলো না, অজুহাত দিলো না। ছেলেটা তবে সত্যি সত্যিই বড় হয়ে গেলো? বড় হওয়ার খুব তাড়াহুড়ো ছিলো বুঝি?
মেয়েটা এবার সর্বপ্রকার নিয়ন্ত্রণ হারালো, ডুকরে কেঁদে উঠলো। মার্জিয়া এগিয়ে আসতে উদ্যত হলে সে হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দিলো, “ঠিক হয়েছে! আমার সাথে এমনই হওয়া উচিত। ওর মুখ দেখার কোনো অধিকার নেই আমার।”
তার চোখের পানিতে ডায়েরির উপরের পত্রিকা ভিজতে লাগলো। মৌমিতা কনুইয়ের ভাঁজে চোখ মুছলো দ্রুত। কাঁপা হাতে সন্তর্পণে ডায়েরিটা ঢেকে দিলো খবরের কাগজে। তারপর বেশ শান্ত ভঙ্গিতে ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
সে দৃষ্টির আড়াল হতেই মার্জিয়া বারান্দার গ্রিলে হেলান দেয়। মনটা খুব ভার হয়ে আছে। কেন এমন হচ্ছে? সবকিছু কি ঠিক হতে পারে না? কবে হবে?
মৌমিতা ঘরে ঢুকেই দরজা ভিড়িয়ে দিলো। ডায়েরিটা বুকের মধ্যে চেপে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ধীরে ধীরে দু'হাতে আবার চোখের সামনে ধরলো ডায়েরিটাকে। ছেঁড়া পত্রিকা ভেদ করে নীল রঙের মলাটখানি দেখা যাচ্ছে। ভীষণ পরিচিত, তবু আর আপন মনে হলো সেটাকে।
মেয়েটার কেমন পাগল পাগল লাগলো নিজেকে। সে ডায়েরিটা খাটের উপর ছুঁড়ে ফেললো।
ছেলেটা তবে সত্যিই তার মুখ দেখতে চায় না। সত্যিই ঘৃণা করে! শুধু নীরব থাকার জন্যই এই এতো বড় শাস্তি? এই দীর্ঘ সময়েও কি বাদল তাকে চিনলো না?
মৌমিতা ধীরপায়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো।
তার বইয়ের তাকে রাখা আরেকটা ডায়েরি। এটার মলাটের রঙ রূপালি। এখন অবশ্য ধূসর দেখাচ্ছে। সে বইয়ের মধ্যে থেকে ডায়েরিটা বের করলো। পাতা ওল্টালো। দ্বিতীয় পাতার এক কোণে কালো রংয়ের একটা মেঘ আঁকা। কালির আড়ালে নামটা লেখা আছে। ঐ দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়লো হঠাৎ। সবকিছু কতোই না সরল ছিলো তখন। ছেলেটা একেবারে হাতের নাগালে ছিলো। নাম ধরে ডাকতে না ডাকতেই উড়তে উড়তে হাজির হয়ে যেতো! কারও কথা শুনতে চাইতো না। অল্পতেই ঝামেলা বাঁধিয়ে ফেলতো যে কারও সাথে। অথচ মৌমিতার একটা চোখ রাঙানিতেই বাধ্য ছেলের মতো সব ছেড়েছুড়ে চলে আসতো।
মানুষ কেন বদলায়?
বাদল বদলায়নি। যে মানুষটা বদলে গেছে, সে মৌমিতা নিজেই। ছেলেটার প্রতি ভরসা রাখতে পারেনি সে। আগ বাড়িয়ে বাদলকে ভুল বোঝার কী দরকার ছিলো?
পৃষ্ঠার ভাঁজে পড়ে আছে পুরাতন একটা চিরকুট। ডায়েরির ভেতর থেকে সাবধানে সেটা বের করে নিলো মৌমিতা। ভাঁজ খুলতে খুলতে গিয়ে দাঁড়ালো খোলা জানালার সামনে। বাতাস বইছে। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস।
“ঠিকানা তোমার হারিয়ে ফেলেছি,
উড়োচিঠি বাকি আর নেই।
জানা অজানার ভিড়ে কেন তবু
বারবার খুঁজি তোমাকেই?”
বাদলের হাতের লেখা। খুব সময় নিয়ে এমন গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছিলো বোধহয়। মৌমিতা বিড়বিড় করলো, “সত্যিই হারিয়ে ফেললাম বাদল। তোমার ঠিকানা। আর তোমাকেও।”
সে খুব ধীরে সুস্থে কাগজটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললো। অশ্রুর তেজ বেড়ে গেলো বহুগুণ, “এই ভয়েই আমাকে চিঠি পাঠাতে না তুমি। তাই না? আমি ছিঁড়ে ফেলবো বলে। তোমার কেন মনে হলো, আমি ছিঁড়ে ফেলবো? আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিলো আমাকে ‘প্রতারক’ বলার? তাহলে এটাও মনে হওয়ার কথা, তুমি যেভাবে আমাকে বললে—ঘৃণা করি, সেভাবে আমিও বলতে পারি?”
চিরকুটের টুকরোগুলো মুঠোয় পুরে মেয়েটা জানালার বাইরে হাত রাখে। আঙুলগুলো একটু আলগা করতেই কাগজের ছোট ছোট টুকরো বাতাসে উড়তে শুরু করে। মৌমিতা হাতটা মেলে দেয়। কোনোকিছু ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত শক্তি আর অবশিষ্ট নেই।
“আমি পারবো না বাদল। ঘৃণা... তোমাকে? আমার দ্বারা হচ্ছে না। তুমি পেরেছো, ভালো হয়েছে। ধোঁকা তো আমিই দিয়েছি। তুমি এই প্রতারকের কোনো চিহ্ন রাখলে না নিজের কাছে। আমিও নিজের প্রতারণার কোনো চিহ্ন রাখতে চাই না।
মরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বেঁচেই যখন থাকবো, এতো কষ্ট সহ্য করতে পারবো না। আর ভালো লাগছে না।”
—————
দুপুরের খাবার খাওয়ানোর পর মারুফকে বিছানায় শোয়ানো হয়েছে। মৌমিতা বসে রয়েছে পায়ের কাছে। তার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, ঠাণ্ডা লেগেছে বলে এমন দেখাচ্ছে। কিন্তু রাবেয়া প্রথম দেখাতেই ব্যাপারটা একটু আধটু বুঝে ফেললেন। কাছে এসে দাঁড়ালেন, মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “একটু শুয়ে থাকো, রেস্ট নাও।”
মেয়েটা নিচু গলায় প্রতিবাদ করে জানায়, “আমি ঠিক আছি।”
“হাত-মুখ ধোও। গরম পানি করে দিচ্ছি, কেমন?”
“আচ্ছা।”
“কী পরবা মা? ঐ জামাটা বের করে দেবো? নাকি শাড়ি পরবা?”
মৌমিতা সরল বিস্ময়ে মায়ের দিকে তাকায়, “কেন?”
“সুজয়রা আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে। রেডি হয়ে থাকো।”
“ওহ!”
সে উপর-নিচে মাথা নেড়ে বড় একটা শ্বাস ফেললো। উপলব্ধি করলো, জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ থেকে এতো সহজে মুক্তি মিলবে না। হৃদয়ের ক্ষতস্থানটা নিয়েও অনেক টানাহেঁচড়া চলবে এখন। ওখানে জবরদস্তি অন্য কারো নাম লেখালে কি ক্ষত সারবে?
যদি সারে, তাহলে আর দেরি কেন? আব্বাও তো এটাই চেয়েছিলেন। উপায়ান্তরও দেখা যাচ্ছে না।
“শাড়িই পরবো।”
রাবেয়া বললেন, “আচ্ছা। তাহলে জিনিসপত্র সব গুছিয়ে দিচ্ছি। তুমি এসে রেডি হও।”
তিনি বেরিয়ে যেতেই মার্জিয়া নিজের কাজে মনোযোগ দেয়। আপার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে ওষুধগুলো গুছিয়ে রাখতে শুরু করে। মৌমিতার নজর স্থির হয়ে থাকে আব্বার মলিন মুখটার দিকে।
মারুফ কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আপন মনে কম্বলের পাড়ে আঙুল বোলাচ্ছেন। ডান হাতটা অস্বাভাবিক হারে কাঁপছে। দেখতে দেখতে এখন সবার অভ্যেস হয়ে গেছে।
বাম হাতটা আর নড়াচড়া করে না। কতোদিন হলো আব্বা 'মা' বলেও ডাকেন না। কোনো একদিন অমূলক রাগের বশে মানা করা হয়েছিলো বলেই? সবারই এতো অভিমান!
পাশের ঘর থেকে মৃদু শব্দ আসছে। আম্মা আলমারি থেকে শাড়ি বের করছেন হয়তো। মৌমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
সুজয়ের কণ্ঠস্বর কিছুটা মারুফের মতো। কথা বলার ধরনেও সামান্য মিল আছে। নিয়তি তবে বিকল্প রেখেছে!
ঐ নির্দয় নিয়তি কি জানে, এই হৃদয়ের জমিন একবার শূন্য হলে, তাতে নতুন করে কিছু রোপণ করা যায় না? অনুভূতিগুলো অনুর্বর হয়ে পড়ে।
তার আব্বা, তার বাদল, তাদের বিকল্প তৈরির মতো নির্বুদ্ধিতা কেউ কেন করবে?
মৌমিতা কাঁপা স্বরে ডেকে উঠলো, “মার্জু?”
“কী?” মার্জিয়া ছুটে এলো, “কী হয়েছে?”
“দ্যাখ...”
মারুফের বাম পায়ের আঙুল নড়ছে। মার্জিয়া অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সেদিকে। তারপর উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠলো, “আব্বা!”
সে পায়ের তলায় আলতো করে আঙুল বোলাতেই মারুফ পা সরানোর চেষ্টা করলেন। এই অবিশ্বাস্য ঘটনা মেয়েদুটোর দৃষ্টি এড়ালো না। দীর্ঘদিন পর মারুফের বাম দিকের কোনো অঙ্গকে এতোটা সক্রিয় দেখলো ওরা। মার্জিয়া তার আপাকে জাপটে ধরলো, “আপা! আব্বা বাম পা নড়াতে পারেন। দেখেছো?”
“হ্যাঁ... সব ঠিক হয়ে যাবে।” বোনকে এটুকু বলে পরবর্তী কথাটা মৌমিতা মনে মনে আওড়ালো, “সবকিছুর বিনিময়ে যদি আব্বাকে সুস্থ দেখি। তবে আমি সব হারাতে রাজি।”
—————
শাড়িটা জলপাই রঙের। মৌমিতাকে এই রঙ মানায় না। কিন্তু আজ কোনো কারণে তাকে এ শাড়িতে ভীষণ মানিয়েছে।
মার্জিয়া বেশ আগ্রহ নিয়ে আপার চুল বেঁধে দিচ্ছে। মৌমিতা খোঁপা বাঁধতে চেয়েছিলো, কিন্তু সে কিছুতেই তা করতে দিলো না আপাকে। খোলা চুলের সামনের দিকটা যত্ন করে বেঁধে দিলো। কপালের উপরে থাকা থুতনি-সমান করে কাটা একগোছা চুল তবু মেয়েটার মুখের দু'পাশে পড়ে রইলো।
রাবেয়া এসে ঢুকতেই মার্জিয়া বলে উঠলো, “আম্মা, দেখেন তো, সুন্দর লাগছে না?”
বড় মেয়ের চিবুকে আঙুল ছুঁয়ে রাবেয়া তার মুখটা উঁচু করে ধরলেন। মৌমিতা এভাবে সাজগোজ করে না বহুদিন হলো। অথচ শুধু একটু কাজল দিলেও তাকে ভারী সুন্দর দেখায়। চোখ ফেরানো যায় না। গায়ের রঙটা যদিও আগের চেয়ে তামাটে হয়েছে। তবু ঐ জ্বলজ্বলে চোখদুটো তার মুখশ্রীতে খুঁত খোঁজার পথ রাখে না। তাদেরকে জ্বলজ্বলে দেখানোর পেছনে আরেকটা কারণ আছে।
বর্ষায় উপচে পড়া টইটুম্বুর দিঘীর ন্যায় টলমল করছে মেয়েটার চোখজোড়া।
“মুখটা অমন গোমড়া করে রেখেছো কেন মৌ? একটু হাসো।”
মৌমিতা অনেক চেষ্টা করেও হাসতে পারলো না, হাসার অভিনয় অবধি করতে পারলো না। রাবেয়া তাকে কাছে টেনে নিলেন, “অনেক সুন্দর লাগছে আমার মৌকে।”
ঘড়িতে যখন পাঁচটা বেজে দশ মিনিট, তখন শাহানা সুলতানা তার পরিবার নিয়ে হাজির হলেন খন্দকার বাড়িতে। আজকেও তিনি পুত্রবধূ রূপাকে সাথে এনেছেন। সুজয়ের বাবা আব্দুর রহমান এসেছেন।
রিপন কিছুক্ষণ আগেই দোকান থেকে ফিরেছে। অতিথিদের নিয়ে সে এখন মারুফ খন্দকারের ঘরে।
মৌমিতা নিজের ঘর থেকে বের হয়নি। তার মধ্যে অস্বাভাবিক অস্থিরতা কাজ করছে। ঘরজুড়ে একনাগাড়ে পায়চারি করতে করতে মাথাটাও কেমন ঘুরতে শুরু করেছে। সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, বাদলের সঙ্গে তার বিয়ে হবে না। এই কথা মেনেও নিতে পারছে না। কয়েকটা দিন আগেও তো বাদল তারই ছিলো।
আজ হয়তো তার হাত থেকে এই স্বর্ণের বালাটা সরানো সম্ভব হবে না। বরং চিরদিনের জন্য স্থায়ী হয়ে যাবে এটা। সাথে স্থায়ী হবে কিছু নতুন সম্পর্ক।
মেয়েটা ধপ করে খাটের এক কোণে বসে পড়লো। এই সবকিছুকে স্রেফ একটা দু্ঃস্বপ্ন বলে চালিয়ে দেয়া যায় না? এমনও তো হতে পারে, সময়টা এখনও সেই ১৯৯১ সাল। বাকি সব ভুয়া।
আব্বা সুস্থ আছেন। বাদলও তার সেই কলেজের হোস্টেলে রয়েছে। ওদিক দিয়ে হাঁটতে গেলেই হয়তো দোতলার বারান্দা থেকে ডেকে উঠবে, “ম্যাডাম! বাদলকে খুঁজছেন নাকি?”
মার্জিয়া দরজা খুলে ভেতরে এলো। গমগমে কণ্ঠে নির্দেশ দিলো, “আপা চলো, তোমাকে ডাকছে।”
মৌমিতা যান্ত্রিক ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়। চোখে-মুখে আবেগের ছিটেফোঁটা নেই। বোনের পিছু পিছু বসার ঘরে চলে আসে।
চোখ তুলেই সবার আগে অচেনা লোকটাকে দেখলো সে। মাথায় কাঁচা-পাকা চুল। দাড়িও তেমন। মুখে একটা অমায়িক হাসি। মেয়েটাকে দেখে সেই হাসি আরও চওড়া হলো। ভদ্রলোক আন্তরিক স্বরে বললেন, “আসসালামু আলাইকুম মা।”
মেয়েটা চমকে উঠলো, অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। এবারও সালাম দেয়া হলো না। আগেরদিন না দেয়াটা ইচ্ছাকৃত ছিলো। তবে আজ তার মানসিক অবস্থা তাকে বেশ বিপাকে ফেললো। সে আমতা আমতা করলো, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
লোকটা সুজয়ের বাবা। আব্দুর রহমান। তিনি বললেন, “বসো মা, ওখানেই বসো।”
শাহানা হাসিমুখে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছেন হবু পুত্রবধুর দিকে। মুগ্ধতার আড়ালে তার চোখে একটা প্রচ্ছন্ন দম্ভ। স্বর্ণ বিনিয়োগ করে হীরে পেয়ে গেলে উদ্যোক্তার যেমন দম্ভ হয়, তেমনই। তিনি সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন, “কেমন আছো মৌ?”
“আলহামদুলিল্লাহ।” মেয়েটা খুব জোর করে নিজের মুখ থেকে কয়েকটা শব্দ বের করলো, “আপনারা ভালো আছেন?”
“জ্বী মা। আলহামদুলিল্লাহ, সবাই ভালো আছি। তোমার আব্বাকে দেখলাম। উনি কিন্তু বেশ ইম্প্রুভ করছেন। চিন্তার কিছুই নেই। তাই না সুজয়?”
দু'জনের চোখাচোখি হলো প্রথমবার। সুজয় হ্যাঁ-বোধক মাথা নেড়েই দৃষ্টি নামিয়ে ফেললো। মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে রইলো, ব্যথিত নয়নে।
এতো নিখুঁত একজন মানুষ তার জীবনে এসেছে। ভুল সময়ে। যখন অন্তরে এতোটুকু জায়গাও বাকি নেই তাকে দেয়ার মতো। এই ছেলেটাও তার প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছে!
মৌমিতা শিউরে উঠলো। ওদিক থেকে চোখ সরালো।
রূপা নামের মেয়েটা মিষ্টি হেসে বললো, “তোমরা কথা বলো না কেন? লজ্জা পাও নাকি!”
শাহানা গম্ভীর হলেন, “এক কাজ করো, তোমরা অন্য কোথাও গিয়ে কথা বলে এসো। একটু পরিচিত হও।”
আব্দুর রহমান যোগ দিলেন স্ত্রীর সাথে, “বিয়ে কিন্তু অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত। একে অপরকে ভালোভাবে চিনতে হবে। সারাজীবন একসঙ্গে থাকতে হবে।”
“হ্যাঁ। যাও তোমরা।” শাহানা সুজয়ের দিকে তাকালেন, “ওঠো।”
সোফার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মার্জিয়া তার আপার কাঁধে হাত রাখলো, একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললো, “যাও আপা। আগে কী হয়েছে, ওসব ভুলে যাও। এখন সবকিছু সুন্দর হোক।”
মৌমিতা আর সুজয়—উভয়েই দ্বিধা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো একসঙ্গে। ছেলেটা দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। মেয়েটা মাথা নিচু করে তার পিছু নিলো।
বাইরে শীতল হাওয়া বইছে তীব্র বেগে। গাছপালাগুলো আন্দোলিত হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।
বাড়ির পেছনটা সুনসান, নীরব। পশ্চিম দিগন্তে অস্তমান সূর্যটার আশেপাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে। আকাশটা এতো অন্ধকার কেন? বেলা পড়ে যাচ্ছে, এজন্য? নাকি কোনো ঝড়ের পূর্বসংকেত?
পুকুরের ধারে গিয়ে সুজয় হাঁটা থামায়। তার থেকে নিরাপদ দূরত্বে এসে দাঁড়ায় মৌমিতা। কারও মুখে কোনো কথা নেই। কেবল শন শন ধ্বনি তুলে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে চলেছে পেছনের ফসলের মাঠটা জুড়ে। সামনে থাকা পুকুরটার পানিতেও মৃদু ঢেউ ওঠে।
মেয়েটা তার গায়ের চাদর আরেকটু ভালো করে জড়িয়ে নেয়। সুজয় আড়চোখে তার গতিবিধি খেয়াল করে, তারপর আগের মতোই দাঁড়িয়ে থাকে। অযথা শার্টের কলার ঠিক করার ভান করে সে, “কিছু বলতে চাইলে বলতে পারেন।”
মৌমিতা সরে আসে তার দিকে। সে জানে, বেশি জোরে কথা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয় আপাতত। সুজয়ের কানে তার কথা পৌঁছাবে না। সে নকশা আঁকা চাদরের ধারটা শক্ত করে চেপে ধরে, ছোট একটা শ্বাস ফেলে, “আগে কি কারও সাথে কোনো সম্পর্ক ছিলো আপনার?” ছেলেটা উত্তর দেওয়ার আগেই সে যান্ত্রিক তবে ক্লান্ত স্বরে বলে, “আমার ছিলো।”
সুজয় মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়, ভ্রু যুগল কুঁচকে যায়। প্রাথমিক বিস্ময় কেটে যেতেই সে একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। গলা খাঁকারি দিয়ে আবার পুকুরের দিকে তাকায়, “ওহ। এখন নেই?”
“না।”
“খুব সিরিয়াস ছিলেন?”
“হু।”
“তাহলে সম্পর্ক টিকলো না কেন?”
ছেলেটার আহত কণ্ঠস্বরের নিচে লুকিয়ে থাকা চাপা অভিমানটা মৌমিতা ধরতে পারলো না। সে একটা শুকনো ঢোক গিলে ফ্যাসফেসে গলায় বললো, “ছেলেটা বয়সে আমার চেয়ে ছোট। স্টুডেন্ট। পারিবারিক সমস্যাও ছিলো একটু। তাই আমিই সরে এসেছি। আবেগ দিয়ে তো সব... চলবে না!”
সুজয় ঘাড় নামিয়ে নিজের পায়ের দিকে তাকায়। অনেককিছুই ঘুরঘুর করছে তার মাথায়, কিন্তু কোনোকিছুই মুখে আসছে না। সে পায়ের পাশ ঘেঁষে চলতে থাকা কালো পিঁপড়ের সারির দিকে চেয়ে থাকে চুপচাপ। পিঁপড়ে গুলো নিজেদের মতো এগিয়ে যাচ্ছে, পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বিষণ্ন প্রাণীদুটোর অস্তিত্বের প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না ওরা।
অনেকটা সময় কেটে গেলো নীরবতার। মৌমিতা নিচুস্বরে আবদার করলো, “আপনার যদি মনে হয়, আমাকে বিয়ে করলে ভুল হয়ে যাবে, আপনি আপত্তি জানাতে পারেন! জোর করে রাজি হবেন না। আপনার সম্পূর্ণ অধিকার আছে বিয়েটা ভেঙে দেয়ার।”
সুজয় মেয়েটার হাতে থাকা সোনার বালার দিকে তাকায় আড়চোখে, “আপনার কি কোনো আপত্তি নেই? আপনি জোর করে রাজি হননি তো?”
“জানি না।”
সে পাশে ফিরে মৌমিতার দিকে একটু সরে আসে, “ঐ ছেলেটাকে ভুলতে পারেননি?”
আবারও একটা শুষ্ক ঢোক গিলে মেয়েটা বলে, “মনে হয় না।”
“তবুও রাজি হলেন, বিয়ে করলে ভুলতে পারবেন বলে মনে হয়?”
মৌমিতার মুখ এবার সামান্য কুঁচকে গেলো, “আপনার যদি আপত্তি থাকে, বিয়েটা ভেঙে দিতে পারেন।”
“আমার আপত্তি নেই।” সুজয় সামনে তাকায়, “আপনি চাইলে এই অতীতের প্রসঙ্গ আমার কাছ থেকে লুকাতে পারতেন। কিন্তু লুকাননি। নাহলে আমি বিষয়টাকে অন্যভাবে দেখতে পারতাম। আপনি নিজের জায়গায় ঠিক আছেন। এমনিতে... কেমন সম্পর্ক ছিলো আপনাদের?”
মৌমিতা ঠিক করলো, সুজয়কে একটু কাটছাঁট করে বলবে। এই মানুষটার সামনে নিজেকে আর ছোট করতে ইচ্ছে করলো না তার।
“বছরখানেকের সম্পর্ক। কলেজে একসাথে পড়েছিলাম। তারপর ও... খুলনায় চলে গেলো। আমি ওকে চিঠি পাঠাতাম। ও পাঠাতো না। টেলিফোনে কথা হতো। কিন্তু আমাদের সামনাসামনি দেখাই হয়নি কয়েক বছর।”
“ওহ। তাও ভুলতে পারছেন না?”
“আমি... আসলে—”
“আমাকে আপনার পছন্দ তো? এমনিতে কয়েকবার দেখা হয়েছে। কথাও মোটামুটি হয়েছে। কোনো ডিসিশন নেওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট। আর যদি মনে হয়, আগের সম্পর্ক ভুলতে পারবেন না, কিংবা আমাকে ভালো লাগছে না... দেখেন কী করবেন।”
মেয়েটা মনের ভেতর উত্তর হাতড়াতে লাগলো। বিয়ের পর কোনো পরপুরুষকে হৃদয়ে লালন করা নিঃসন্দেহে খুবই ন্যক্কারজনক একটা ব্যাপার। কিন্তু সে অস্বীকৃতি জানাতে পারলো না। যদি ভুলক্রমে তা মিথ্যে প্রমাণিত হয়?
তবে যে ছেলেটার জন্য সে হবু স্বামীর সামনে বিব্রত হচ্ছে, যাকে ভুলতে পারবে না বলে দাবি করছে, তার সাথে তো সম্পর্ক চুকে গেছে। তিক্ততা দিয়ে। মৌমিতাকে বলা তার শেষ কথাই তো এমন ছিলো—‘আমি আপনাকে ঘৃণা করি।’
“পারবো। ভুলে যাবো।”
“আমি কিন্তু জোর করছি না।”
“আপত্তি করছেন?”
“সেটাও করছি না। আমার সিদ্ধান্ত আমি জানিয়েছি। এবার আপনি জানাবেন।” একটু বিরতি নিয়ে বললো সুজয়, “আমার আগেও এক জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়েছিলো। মেডিকেল কলেজের এক জুনিয়রের সাথে। কথাবার্তা অনেকদূর গিয়েছিলো, অনেক সিরিয়াস ছিলাম। তারপর জানতে পারলাম, ওর আরেকজনের সাথে সম্পর্ক আছে।
মেয়েটা আমাকে অনেক অনুরোধ করলো, যেন আমি ওদের বাড়িতে ওর এই সম্পর্কের কথা না বলি।
বলিনি। তবে বিয়েটা ভেঙে দিয়েছি। ওর ফ্যামিলি জানে না, রিজেক্ট আমিই করেছিলাম। আর যোগাযোগ রাখিনি। বাসায় তখনও কেউ জানতো না যে আমাদের মধ্যে সব শেষ, আর কোনো সম্পর্ক নেই। মেয়েটা পরে ঐ প্রেমিকের সাথেই পালিয়ে গেছে। আর, আমি ঠিক করেছিলাম, কখনো বিয়েই করবো না।”
মৌমিতা দুই চোয়াল শক্ত করে চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। সুজয় নিজের যে অবস্থার কথা বলছে, তা যে মৌমিতার অনুভূতির কাছে কতো সামান্য, সেটা কি তাকে বোঝানো সম্ভব? যখন একজন প্রকৃতপক্ষেই ধোঁকা দিয়েছে, তাকে ভুলে যাওয়া নিতান্তই সহজ কাজ। কিন্তু যেখানে স্বয়ং পরিস্থিতি ধোঁকা দিয়ে গেছে, অপরপক্ষকে দোষী মনে না হয়ে উল্টো নিজেকেই প্রতারক মনে হচ্ছে, তখন করণীয় কী?
বাদলের প্রসঙ্গ না আনলেই বুঝি ভালো হতো। তাহলে সুজয়ের থেকেও এসব শুনতে হতো না। ঐ মেয়ে আর মৌমিতার মধ্যে তফাৎ কী? সুযোগ পেলে তো মৌমিতাও পালিয়ে যেতো!
এটাও সত্যি, সুজয়কে তার ভালো লেগেছে। এই মানুষটা এতো অল্প সময়েই তার মনের অলিগলিতে যাতায়াত শুধু শুরু করে দিয়েছে। কীভাবে? বাদল তো মুছে যায়নি পুরোপুরি। কিন্তু সে সরে গেছে। তার কাছে ফিরে যাওয়ার রাস্তা অথবা শক্তি—একটাও অবশিষ্ট নেই। তাকে বোঝানোর মতো অবস্থাও রইলো না।
মেয়েটা তাই নিজেকেই বোঝালো। হয়তো আরেকটু সময় পেলেই বাদলকে ভুলে যাওয়া সম্ভব। সব নতুন করে শুরু করা সম্ভব। বাদলও সুখেই থাকবে। তার জীবনে যে নতুন মানুষটা আসবে, সে যেন হাজার গুণে ভালো হয়।
মৌমিতা আর ভাববে না তাকে নিয়ে। যাকে আর পাওয়া হবে না, তার জন্য পুড়তে হবে কেন? ঐ দহন যন্ত্রণা কেন আজীবন সইতে হবে?
সুজয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, “ভেতরে চলেন। অনেকক্ষণ সময় নিলাম আপনার কাছ থেকে। এখন বের হতে হবে।”
সে ধীরপায়ে হাঁটতে শুধু শুরু করলো। ক্ষণিকের মধ্যেই অপরজনকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। মৌমিতার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো একবার। বাতাসের শনশন শব্দ ভেদ করে সে কেবল একজন মানুষের পদধ্বনি শুনতে পারলো।
আরেকটা সম্পর্কে আটকা পড়লো সে! নতুন একটা অনিশ্চিত সম্পর্ক। এতো অনিশ্চয়তা নিয়ে বেঁচে থাকার ক্ষমতা কোথায় তার!
“ডক্টর সুজয়?”
সুজয় দাঁড়ায়। তবে পেছনে ঘোরে না। তার মনে হতে থাকে, এখন ঘুরে তাকালে সেই কথাটা মৌমিতা আর বলবে না, যা বলার জন্য এমন আকুলভাবে ডেকেছে।
তার ধারণা পুরোপুরি ভুল না। কথা বলার জন্য মেয়েটাকে নিজের সাথে ভীষণ সংগ্রাম করতে হলো।
একটা সুযোগ দরকার। নিশ্চয়তা দরকার। যে নিশ্চয়তা আব্বা চেয়েছেন। যে নিশ্চয়তার লোভে মৌমিতা সব বিসর্জন দিয়েছে, তার জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকেও হাতছাড়া করে ফেলেছে। বাকি সব অবলম্বন তো ভেঙে গেছে। এ ছাড়া আর উপায় কী?
প্রায় আধ মিনিটের ব্যাপক প্রস্তুতির পরেও মৌমিতা নিজেকে রক্ষা করার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পেলো না।
ঠিক কী বললে কোনো সন্দেহের অবকাশ না রেখেই একটা সুযোগ পাওয়া যাবে? পৃথিবীতে অমন জাদুকরী শব্দ কি আদৌ আছে, যা সব বদলে দিতে পারে?
“মৌমিতা! মিথ্যে হলেও একবার শুধু বলেন, আপনি আমাকে ভালোবাসেন... এরপর আর কখনোই কিছু চাইবো না আপনার থেকে। শুধু শেষবারের মতো একটা মিথ্যা শুনতে চাচ্ছি, শুধু একটা শব্দই তো...”
মৌমিতা ঘনঘন পাতা ফেলে চোখ মেললো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুজয়ের অস্পষ্ট অবয়বটা আরও ঝাপসা দেখালো এবার। মেয়েটা ঐ ঝাপসা মানুষটার পানে চেয়েই কাঁপা গলায় মিথ্যেটা উচ্চারণ করলো, “আমি আপনাকে ভালোবাসি।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………