পবনপত্র - পর্ব ৪৯ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
   ১২ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮ সাল।
   বৃহস্পতিবার।
   নাটোর, সদর।

বাংলা দিনপঞ্জি অনুসারে আজ মাঘ মাসের শেষ দিন। তবে এই দিনটার আরেকটা বিশেষত্ব হলো, আজ মৌমিতা খন্দকারের বিয়ে।
তারিখ পেছাতে পেছাতে এই দিনে এসে থেমেছে।
গতদিন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। এতো আয়োজনের মাঝেও কনেকে একটিবারের জন্যও হাসতে দেখা যায়নি। এটা নিয়ে কানাঘুষা হচ্ছে। কিন্তু খন্দকার সাহেবের বড় মেয়ের কোনো দিকে মন নেই। এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়ে এসেও সে নির্লিপ্ত, উদাসীন। আগের মাসের চেয়ে তবু বেশ উন্নতি হয়েছে বলা যায়। একটু একটু করে জ্ঞান ফিরেছে তার।

দুপুর গড়াচ্ছে। এখনও শীতের প্রকোপ স্পষ্ট। প্রকৃতিতে অদ্ভুত কিছু বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্য দেখা দিচ্ছে ক'দিন হলো। কিছু কিছু গাছের প্রায় সব পাতা ঝরে গেছে, এদিকে আবার ফুল ফুটেছে।
শীতকাল চলে যাচ্ছে, বসন্তকে আসার সুযোগ করে দিয়ে।

মার্জিয়া দরজা খুলেই খাটের দিকে তাকালো। আপা দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে রয়েছে। দেয়ালে একটা অস্পষ্ট ফাটল আছে। সেটার উপর দিয়ে আঙুল ঘোরাচ্ছে। তার হাতে মেহেদী। আঙুলের কিছু অংশ কালচে লাল রঙে রাঙানো।

“আপা?”

মৌমিতা আঙুল ঘোরানো বন্ধ করলো। জবাব দিলো না।

“ওঠো। তোমাকে সাজাতে বলেছে।”

সে ফ্যাসফেসে গলায় বলে উঠলো, “কে বলেছে?”

“আপা! ওঠো।”

“তুই বল গিয়ে, বিয়ে যেন আরও পিছিয়ে দেয়। নাহলে আমি বিয়ে করবো না।”

“তাহলে কী করবা? তুমি তো মাস্টার্সও শুরু করতে পারলা না। পড়তেও পারছো না, আবার বিয়েও—”

মেয়েটা মুখ ঘোরালো, “আশ্চর্য! বিয়ে করলেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে? আর ঐজন্যই তো সময় চাচ্ছি। আমি এখনও প্রস্তুত না।”

“সেটা তোমার হবু শাশুড়িকে গিয়ে বলো, তুমি প্রস্তুত না। উনিই তো সব তাড়াতাড়ি করতে চাচ্ছেন—”

মৌমিতা উঠে বসলো, কঠোর গলায় বললো, “ওনাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করিস তো, উনি কেন একটা খুনির সাথে নিজের ছেলের বিয়ে দিতে চাচ্ছেন?”

“আপা! এসব আবোলতাবোল কথা বন্ধ করো প্লিজ। এইসব ভাবতে ভাবতে আরও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছো তুমি। কতোবার—”

দরজা খোলার শব্দ হলো। হাসিমুখে ভেতরে এলো রিতা, “আরে মৌ? এখনও রেডি হওনি? বরযাত্রী কিন্তু মাগরিবের পরপরই এসে পৌঁছাবে।”

মৌমিতা গোমড়া মুখে জবাব দেয়, “তাতে? এখনও অনেক দেরি আছে।”

“রেডি হতে সময় লাগবে তো। আর সব মেহমান চলে এসেছে, তোমাকে দেখতে চাচ্ছে। আসো, আমি সাজিয়ে দেই।”

“না!”

মার্জিয়ার মনটা ধক করে উঠলো। আপা যদি আবার কোনো উল্টাপাল্টা কথা বলে বসে, একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যেতে সময় লাগবে না। দুশ্চিন্তায় সে নিজের অজান্তেই নখ কামড়াতে শুরু করেছিলো। মৌমিতার কঠোর স্বরে 'না' শোনার পর সে সটান দাঁড়িয়ে বলে উঠলো, “রিতা আপা, তুমি যাও। আমি দেখছি।”

“তুমি একা একা কী করবা?”

“এখনও অনেক সময় আছে আপা। তবু, যদি সমস্যা হয়, আমি তোমাকে ডাকবো।”

রিতা আর দ্বিরুক্তি না করে বেরিয়ে যায়। মার্জিয়া ঘুরে তাকায় বড় বোনের দিকে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লান্তির সুরে বলে, “আপা, ওঠো।”

মৌমিতা পা ঝুলিয়ে খাটেই বসে রইলো। তাকে আর জোরাজুরি না করে মার্জিয়া আলমারির দিকে এগিয়ে গেলো। ভেতর থেকে শাড়ি, গয়না আর সাজগোজের জিনিসপত্র বের করতে লাগলো।

“আমি যদি বিয়েটা না করি, কারও ক্ষতি হবে?”

“তুমি ছেলে মানুষ হলে হয়তো কারও ক্ষতি হতো না। কিন্তু মেয়ে হয়ে অবিবাহিত থাকবা কীভাবে? তাও এমন একটা মানুষের জন্য, যে এখন এই পৃথিবীতেই নাই।”

“আর যদি বিয়ের পরেও ঐ মানুষটাকে ভুলতে না পারি? সমাজের ক্ষতি হবে না। কিন্তু আমার তো হবে! আমার সাথে যে সংসার করবে, তারও ক্ষতি হবে।”

“আপা... জীবন কারও জন্য থেমে থাকে না। হ্যাঁ, তোমার মানিয়ে নিতে সময় লাগবে, এটা ঠিক। কিন্তু তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভালো। আর তুমি তো জানোই, তোমার বিয়ে নিয়ে আব্বার কতো চিন্তা। তিনিও নিশ্চিন্ত হবেন।”

মৌমিতা উঠে দাঁড়ালো। তার কাছে যুক্তির অভাব নেই, কিন্তু শক্তির বড়ই অভাব। সে এখন পর্যন্ত নিজের অসুবিধাগুলো কাউকে বোঝাতে পারেনি। বলতে পারেনি, এই স্থানে সে শুধু একজনকে কল্পনা করেছে। নিজের কল্পনা কিংবা পরিকল্পনা—কোনোটারই বিরুদ্ধে যাওয়া সম্ভব না তার পক্ষে। তবু নিজেকে সমাজের কাছে পুতুল বানাতে হবে। আব্বাকে আশ্বস্ত করতে হবে। ভালো থাকার অভিনয় করতে হবে ততোদিন পর্যন্ত, যতোদিন মৃত্যু নিজে এসে কড়া না দিচ্ছে দুয়ারে।

মার্জিয়া লাল বেনারসীর ভাঁজ খুললো ধীরে ধীরে। মৌমিতা শূন্য দৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে রইলো।

“আমি বোধহয় কখনও স্বাভাবিক হতে পারবো না মার্জু। এখন শুধু আরেকটা পরিবারকে ধ্বংস করতে যাচ্ছি।”

“সব বদলে যাবে আপা। ঠিক হয়ে যাবে—”

“বদলে যাবে? একটা জিনিস কয়বার বদলায়?” মেয়েটা ক্রুর হেসে বলে, “বাদল আমার জীবনে এসে অনেক কিছুই বদলে দিয়েছিলো, জানিস? আমি ডায়েরিতে লিখেছিলাম, নিজেকে ঘৃণা করি। ও এটা মনে রেখেছে। সবরকম চেষ্টা করেছে, আমাকে আমারই ঘৃণা থেকে রক্ষা করার জন্য।
ওর সাথে দেখা না হলে কখনোই বিশ্বাস করতাম না, আমার মতো একটা অধমকেও এমন করে কেউ ভালোবাসতে পারে।
কিন্তু আমি তো এতোকিছুর যোগ্য ছিলাম না। তাই ওকে ধরেও রাখতে পারিনি। ওর এতো চেষ্টা, এতো ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে আমি শুধু... ধোঁকা দিয়েছি।

তবে হ্যাঁ! এতে ওরও দোষ আছে। ও খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছিলো। ভুলটা ছিলো, আমাকে নিজের গুরুত্ব বুঝতে বাধ্য করা। আমি... নিজেকে এতোটা গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছিলাম যে ওকেই ছুঁড়ে ফেলেছি জীবন থেকে!

ওর কাছে কিছুই ছিলো না। একটা ভালো পরিবার, নিজের উপার্জন, মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু—কিচ্ছু ছিলো না। বাদলের কাছে শুধু ওর মৌমিতা ছিলো। সেই মৌমিতা ওকে ধোঁকা দিলো। নিজে ভালো থাকার জন্যে আমি এমন একটা মানুষকে খুন করে ফেললাম মার্জু, যে এমনিতেও মারা যেতো দুটো দিন পর! বাদলটা দুইবার মারা গেলো আমার জন্য।”

“আপা, এভাবে বলতে হয় না—”

“ওকে আমি আর কোত্থাও খুঁজে পাবো না। কীভাবে বিশ্বাস করি? এখনও মনে হয়... ও কোথাও লুকিয়ে আছে। আমার সাথে অভিমান করেছে। যদি ফিরে এসে দেখে, আমার বিয়ে হয়ে গেছে, তাহলে তো—”

“বাদল ভাই আর ফিরবে না আপা।”

মৌমিতা চুপ করলো। শূন্য দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে চেয়ে রইলো।
মার্জিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। গত দুই মাসে আপার কাছে প্রতিনিয়ত এই কথাগুলো শুনতে হয়েছে তাকে। অভ্যেস হয়ে গেছে। তবুও আজ মনটা খারাপ হয়ে গেলো। সে ভেবেছিলো, আপা ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। একদিন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। আজ প্রথমবার সন্দেহ হলো, এই মানুষটার পক্ষে আদৌ সেরে ওঠা সম্ভব?

“চলো আপা। হাত-মুখ ধুয়ে আসো।”

আসরের নামাজের খানিক পরে রাবেয়া এলেন মেয়েদুটোর ঘরে।
রিতা আর মার্জিয়া মিলে তার বড় মেয়েটাকে সাজাচ্ছে। কাজ প্রায় শেষের দিকে। মেয়েটার পরনে লাল বেনারসী। বিষণ্ণ চোখদুটোতে সুন্দর করে কাজল দেয়া। খোলা চুলগুলো পিঠের উপর ছড়িয়ে আছে। স্বাস্থ্যটা এমন খারাপ না হলে তাকে নিশ্চয়ই আরও ভালো দেখাতো।
রাবেয়া কাছে এলেন, “মার্জু? একটা খোঁপা বেঁধে দিতে এতো সময় লাগে?”

মার্জিয়া ব্যস্তভাবে বললো, “রিতা আপা ফুল আনতে গেছে। সব ঐ ঘরে রাখা। আগেই আনতে চাইলাম, রিতা আপা পাত্তা দেয় না। যাই হোক, আর বেশিক্ষণ লাগবে না।”

“আচ্ছা।” তিনি মৌমিতার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “মন খারাপ কেন?”

মেয়েটা শান্তভাবে উত্তর দেয়, “মন ভালো থাকার মতো কিছু হয়েছে?”

“তোমার আব্বাকে বললাম, আজকে মৌয়ের বিয়ে। শুনেই এতো সুন্দর করে হাসলো!”

মারুফের স্বাস্থ্য আর অবস্থার বেশ অবনতি হয়েছে। বাম হাত-পা একেবারেই নড়ে না। ডান দিকটার অবস্থাও সুবিধার না। কালেভদ্রে আঙুল নড়ে সামান্য। কথা বলা ছেড়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। শুধু বিছানা থেকে উঠানোর সময় ব্যথা পেলে অদ্ভুত শব্দ করেন। কাউকে হয়তো চিনতেও পারেন না ঠিকমতো। মুখের অভিব্যক্তি সর্বদা একইরকম থাকে।
মমতাজ খন্দকার তো সেদিন বলেই ফেললেন, রাবেয়া যেন মারুফের দিকে একটু খেয়াল রাখেন। মৃত্যুর ছায়া নাকি নেমেছে তার মুখে!

সেই লোকটা মেয়ের বিয়ের কথা শুনে হেসেছেন! মৌমিতা অভিভূত হয়ে মায়ের দিকে তাকালো, ভ্রু কুঁচকে বললো, “সত্যিই?”

“হ্যাঁ।”

“আমি চলে যাচ্ছি বলে আব্বা খুশি হয়েছেন।”

“পাগলি! ওনার তো এটা দায়িত্ব। মেয়ে একটা ভালো পরিবারে যাচ্ছে। অসুস্থ হয়ে এতোদিন পড়ে থাকার পরেও মানুষটা নিজ চোখে মেয়ের বিয়ে দেখতে পারছে, খুশি হবে না?”

“হুম।”

মৌমিতা আর তর্ক করলো না। আব্বাকে খুশি করতেই তো এতোকিছু। মানুষটার জন্য সেভাবে কিছু করা হয়নি কখনও।
তাড়াতাড়ি চাকরির পড়া শুরু করতে হবে। সামনে কোরবানির ঈদ। জমানো টাকা দিয়ে কি একটা পাঞ্জাবি কেনা সম্ভব হবে? চাকরি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার নেই। এই ঈদেই কিছু না কিছু উপহার দেওয়া হবে আব্বাকে—সে এমনটাই ভেবে রেখেছে।

—————

মফস্বল নাটোরে সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশের রঙ গাঢ় নীল। মেঘ নেই। কিছু নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে শুধু। উপরের দিকে তাকালেই মনটা উদাস হয়ে যাবে, এমন বিষণ্ণ সাজে সেজেছে আজকের আকাশ।
খন্দকারের বাড়িটাও সাজানো হয়েছে। এই গলির মাথা পর্যন্ত আলোয় ঝিলমিল করছে রাস্তা।

ভিড় এড়িয়ে শাহানা সুলতানা কিনারার ঘরটাতে ঢুকলেন। তার পিছু পিছু রূপা। এ ঘরে কোনো পুরুষ মানুষ নেই। ছোট্ট ছেলেটার কণ্ঠ শোনা গেলো শুধু, “এটা চাচি?”

৬-৭ বছর বয়সী ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে রূপা মাথা দোলায়, “হ্যাঁ। ছোট চাচি।”

খাটের মাঝ বরাবর দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে মেয়েটা। পরনে লাল বেনারসী। ঘোমটা দিয়ে মুখটা আংশিক ঢেকে রাখা। মাথা নিচু করে রেখেছে সে। একমনে মেঝের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
শাহানা সামনে গিয়ে বসলেন, “মৌ?”

মেয়েটা চমকে উঠে মুখ তুললো, আমতা আমতা করলো, “আসসালু আলাইকুম।”

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। শরীরটা কি এখন ভালো?”

মৌমিতা ঘাড় কাত করলো।

“আলহামদুল্লিল্লাহ। এখন আর কোনোকিছু নিয়ে চিন্তা কোরো না। তোমার যখন ইচ্ছা, তুমি তখনই মাস্টার্স শুরু করে দাও। পাশাপাশি জব প্রিপারেশন নিতে পারো। তুমি যেহেতু সায়েন্সের সাবজেক্ট থেকে পড়েছো, সুজয়ও তোমাকে হেল্প করতে পারবে। চিন্তা নেই।
আর মারুফ ভাইয়ের দায়িত্বও কিন্তু আমাদের। সুজয় আগের মতোই শুক্রবার করে এখানে আসবে। চেকআপ করবে। তুমিও ওর সাথে আসতে পারো ব্যস্ততা না থাকলে। বুঝেছো?”

সে মাথা নাড়লো। হবু শাশুড়ির এমন মিষ্টি মিষ্টি কথা কিছুতেই হজম করতে পারলো না! তার ভাগ্যে এতো ভালো পরিবার জুটলো কেন? এই মানুষগুলোর স্নেহের প্রতিদান দেয়ার বিন্দুমাত্র সক্ষমতা যে তার মধ্যে নেই।

রূপা শাহানাকে উদ্দেশ্য করে বললো, “চলেন মা, কাজী এসেছে।”

শাহানা উঠে দাঁড়ালেন। মৌমিতা আবার ঘাড় নামালো। তার কোলের উপর টুপ করে কিছু একটা পড়লো হঠাৎ। সে ভ্রু কুঁচকে জিনিসটা হাতে নিলো, সোনালি মোড়কে আবৃত একটা চকলেট। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছেলেটার দিকে সেটা এগিয়ে দিলো।
ছেলেটা হাসলো। সামনের দুটো দাঁত নেই। সে সম্ভবত মৌমিতার হবু ভাসুরের ছেলে। তার ঐ অদ্ভুত হাসি দেখে মেয়েটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিক করে হেসে ফেললো, চকলেটটা দেখিয়ে বললো, “নাও।”

বাচ্চাটা জোরে জোরে মাথা নাড়লো, “তুমি নাও, এটা তোমার।”

“উঁহু। তুমি নাও।”

“তোমাকেই তো দিয়েছে।”

“কে?”

সতর্ক হয়ে আশেপাশে তাকায় ছেলেটা। হাতের ইশারায় হবু চাচিকে কাছে ডাকে। মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে কান এগিয়ে দেয়। ছেলেটা দু'হাত দিয়ে সুড়ঙ্গ বানিয়ে ফিসফিস করে বলে, “চাচ্চু দিয়েছে।”

তারপর সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

“অ্যাই, তোমার নাম—” কথাটা শেষ না করেই মৌমিতা আবার জড়োসড়ো হয়ে বসে। হাতের মুঠোয় ধরে রাখা সোনালি আবরণে মোড়ানো উপহারটার দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে।

সময় কাটলো ঘোরের মধ্যে। অনেকক্ষণ পর মমতাজ ফুপুর কণ্ঠ শুনে তার ধ্যান ভাঙলো। তবে ঘোর কাটলো না পুরোপুরি। এক অদ্ভুত ঘোরের মাঝেই সাক্ষীরা উপস্থিত হলেন, মোহরানা ধার্য করা নিয়ে সব আলাপ শেষ হলো। তারপর কানের কাছে কেউ বলে উঠলেন, “কবুল বলো মা।”

ফুপুর দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো মৌমিতা। মমতাজ আবারও বললেন, “বলো আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”

মেয়েটা চারপাশে তাকালো। তারপর মাথা নিচু করলো। ক্ষীণ স্বরে বললো, “আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”

এতোক্ষণ ধরে ঝিমিয়ে থাকা মজলিশে আবার কোলাহল শুরু হলো।
শীঘ্রই মেয়েটার সামনে রাখা হলো কিছু অপরিচিত কাগজপত্র। সে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো। কাবিননামা! বড় বড় কয়েকটা শ্বাস টানলো। নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করলো।

হাতে কলমটা পাওয়ামাত্র মৌমিতা আবারও দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো। ঘোমটার কাপড় পুরোপুরি স্বচ্ছ না। তার অভিব্যক্তি হয়তো কেউ দেখতে পারবে না ভালোভাবে। এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে মুখের পেশি টানটান করলো সে। নিজেকে শান্ত করলো, প্রস্তুত করলো বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্দেশ্যে।
অবশেষে বাম হাতে ধরে রাখা কলমের মাথাটা রাখলো কাবিননামার কাগজে। হবু স্বামীর স্বাক্ষরের দিকে তাকালো একবার। একটানে লেখা হয়েছে তার ডাকনামটা—‘সুজয়’। মেয়েটা নির্ধারিত স্থানে নিজের নামটা সই করতে যাবে, এমন সময় আবারও তার চোখ পড়লো সুজয়ের নামের স্বাক্ষরটাতে। কানের কাছে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর আবদার করে বসলো, “এই যে আপু? এটা আমার জায়গা।”

মেয়েটার হাত অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে শুরু করলো। চোখে ঘোলা দেখালো সব লেখা। আড়চোখে আশেপাশে তাকালো সে।
রাবেয়া আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলেন, মমতা মাখা স্বরে বলে উঠলেন, “সময় নিয়ে সাইন করো মা, কোনো তাড়াহুড়ো নেই।”

মৌমিতার মাথা ঘুরছে ভনভন করে। সে মায়ের কথামতো সময় নিলো। চোখ বন্ধ করে অনেকগুলো বাতাস টানলো ফুসফুসে। ধীরে ধীরে দম ছাড়লো। তারপর কাঁপা হাতেই সই করলো। নিজের হাতের লেখা নিজেই চিনলো না। তবুও খানিকটা স্বস্তিবোধ করলো। অসাধ্য সাধন করেছে বলে কথা!

রিপন আর জুনায়েদ মিলে মারুফকে তুলে হুইল চেয়ারে বসিয়েছে। রাতের খাবার এবং ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে একটু আগেই। তবু লোকটার ঘুম কাটেনি পুরোপুরি। দেখা করতে আসা অতিথিদের দিকে ঠিকমতো তাকাননি এতোক্ষণ।
রিপন হুইল চেয়ারটা উঠোনে নামালো সাবধানে। হঠাৎ চারিদিকে এমন আলো দেখে মারুফ চোখ ছোট করে এদিক-ওদিক তাকাতে শুরু করলেন। ডান বাহুতে কারও স্পর্শ অনুভব করলেন। সেদিকে তাকাতেই অলঙ্কার আর মেহেদীতে সুসজ্জিত একটা হাত দেখলেন। ধীরে ধীরে মাথা তুলে মেয়েটাকেও দেখলেন। ভ্রু কুঁচকালেন।

মৌমিতা! কী সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে! কিন্তু সে এভাবে কাঁদছে কেন?
মারুফের ঠোঁট নড়ে উঠলো। মৌমিতা আব্বার সামনে প্রায় হাঁটু গেড়েই বসে পড়লো। চোখ মুছে বললো, “আব্বা... চলে যাচ্ছি।”

মারুফ যেন পুরোপুরি বুঝলেন না কথাটা। মমতাজ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভাইয়ের হাতটা ধরে তিনি মৌমিতার মাথায় রাখলেন, “মারুফ, দোয়া করে দে মৌকে। সুখী হোক।”

লোকটার অভিব্যক্তি বদলে গেলো। তিনি অবাক হয়ে একবার বড় বোনের দিকে তাকালেন।
মৌমিতা মাথা থেকে আব্বার ডান হাতটা সরালো, দুই হাতে শক্ত করে ধরলো সেটাকে। আকুতির সুরে বললো, “আব্বা, আজকে একবার ‘মা’ বলে ডাকেন। শুধু একবার—”

কথাটা গলাতেই আটকে গেলো।
বেশিদিন হয়নি, খুব বিশেষ একজন মানুষ ঠিক এভাবেই আকুতি জানিয়েছিলো তার কাছে, ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শোনার জন্য। তাকে বলা হয়নি। আর কখনোই বলা হবে না। আফসোসের তালিকা এবার যদি আরও লম্বা হয়?
মৌমিতা আরও শক্ত করে ধরলো আব্বার হাত। কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো, “আব্বা। আমি আপনাকে আজ পর্যন্ত অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করে দেন...”

মারুফ ভ্রু কুঁচকে ডানে-বামে মাথা নাড়লেন। মেয়ের মুঠো থেকে নিজের হাতটা মুক্ত করে তার অশ্রু মুছে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন।

“আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি আব্বা। আপনি আমার দেখা সবচেয়ে সেরা মানুষ। আপনার মতো কেউই নাই, কেউ হবেও না কোনোদিন।”

লোকটার গাল বেয়ে চোখের পানি গড়াতে লাগলো। বাম হাতটা অকেজো। ডান হাত এতো উপরে তোলার সাধ্য নেই। অশ্রু লুকানোর উপায় না পেয়েই যেন তিনি অস্থির ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। তার হাতখানি ধরে বসে থাকে মৌমিতা, “দেখেন, সবাই কতো খুশি। আপনিও খুশি হয়ে যান। কোনো চিন্তা করবেন না। আপনার মৌ অনেক সুখে থাকবে। কিন্তু একটা শর্ত আছে আব্বা। আপনাকে তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে হবে...” সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, “এরপর যেন এসে দেখি, আপনি পুরোপুরি সুস্থ।”

মারুফ অস্থির হয়ে উঠলেন। মাথা নাড়তে লাগলেন। মমতাজ বললেন, “মেয়েটাকে এখন বিদায় দে মারুফ, ও শ্বশুরবাড়ি চলে যাচ্ছে—”

ভদ্রলোক আরও জোরে জোরে মাথা নেড়ে শব্দ করলেন, “না মা, না না...”

মেয়েটা আবারও ধাম করে বসে পড়লো তার পায়ের কাছে, “জ্বী আব্বা, বলেন? আমি শুনছি।”

“না না...”

মারুফ ঠোঁট ফুলিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালেন। চোখদুটো টলটল করছে পানিতে।

“ফুপু?” আব্বার দিকে তাকিয়েই মমতাজের উদ্দেশ্যে বললো মৌমিতা, “আমি থাকি? আব্বা থাকতে বলছেন! আমি যাবো না ফুপু।”

মার্জিয়া দ্রুত চোখ মুছে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাবেয়ার উদ্দেশ্যে বলে, “আম্মা, আপা থাকুক না! আজকের রাতটা খালি থাকুক।”

রাবেয়া কোনো উত্তর দিলেন না। আঁচলে মুখ চাপা দিয়েছিলেন অনেকক্ষণ আগেই। এবার চোখদুটোও বন্ধ করলেন জোর দিয়ে।
মমতাজ খন্দকার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, পেছনে ঘুরলেন, “রিতা? মৌয়ের হাতটা ছাড়িয়ে নাও। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে।”

রিতা অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বললো, “ও একটু থাকতে চাচ্ছে—”

“সেটা সম্ভব না। ওর মানসিক অবস্থা কেমন, জানোই তো। নিয়ে যাও।”

“আমাকে বলছেন কেন? আপনি—”

“আমি পারবো না!”

আব্বার হাতটা ঠোঁটের সাথে চেপে মৌমিতা আঙিনার মাঝামাঝি হাঁটু গেড়ে বসে রইলো। সম্ভব হলে সে পুরো রাতটাই যেন এভাবে কাটিয়ে দিতে রাজি।
রিতা আলতো করে মেয়েটার বাহু স্পর্শ করলো, জোর করে কান্না আটকে রাখায় তার গলার স্বর অত্যন্ত কঠোর শোনালো, “ওঠো মৌ। যাওয়ার সময় হয়েছে।”

রিপনও এসে দাঁড়ালো সামনে, “মৌ? এখন ওঠো।”

মৌমিতা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকায়, “এভাবে বলছেন কেন? আমি যেতে চাই না! বের করে দিবেন আমাকে?”

রিপন তার আরেকটা বাহু ধরলো। টেনে তুললো তাকে। মৌমিতা আব্বার হাত ছাড়লো না। ডান হাতটা জোর করে ছাড়িয়ে নেয়া গেলেও বাম হাতে আব্বার হাতখানি শক্ত করে রাখার চেষ্টা করলো। রিপন শান্তভাবে তার আঙুল ছাড়িয়ে দিতে লাগলো। মেয়েটা বড় বড় চোখে তাকায় তার দিকে, “মামা! এমন কেন করছেন আমার সাথে?”

“একদিন তো যেতেই হবে মৌ। কালকে আবার আসবা না? শুধু অল্প কিছুক্ষণই তো।”

সব উপায় হারিয়ে মেয়েটা আব্বার তর্জনী ধরে রাখলো শুধু। তার মনে হলো, আব্বাও তার হাতটা ছাড়তে চাচ্ছেন না। কিন্তু ধরার শক্তি নেই।

মারুফ নিঃশব্দে চোখের জল ফেললেন। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। দুই চোখ ভরে দেখলেন আদরের মেয়েটাকে।
কী ব্যাকুল হয়ে তার আঙুল ধরে আছে! মেয়েটার বয়স আর বাড়লো না। এখনও সেই ৬-৭ মাস বয়সী মৌমিতার মতোই আঙুলটা ধরে আছে। চারপাশের সবাই ঐ হাত ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য অস্থির হচ্ছে কেন? মেয়েটা কেঁদে ফেলবে তো!
তিনি শ্যালকের মুখের দিকে তাকালেন, ছেলেটার চোখে চকচক করতে থাকা জল দেখলেন। আবার মৌমিতার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। ইতোমধ্যেই আঙুল ছাড়ানো হয়েছে। তিনি টের পাননি।
মৌকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে বারবার তবু পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। এখনও কাঁদছে।

মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়েটাকে গাড়িতে উঠতে দেখলেন। রঙিন ফুলে সাজানো সাদা রঙের গাড়িটা বেরিয়ে গেলো খন্দকার বাড়ি থেকে। খন্দকার সাহেব অসহায় হয়ে সেই চলে যাওয়া দেখলেন। যতোক্ষণ পর্যন্ত দেখা যায়, তিনি অপলক তাকিয়ে রইলেন।

—————

চারিদিকে অনেক আলো। এই সময়টাতে অনেকেরই বিয়ে হয়। এদিকেও কারো বিয়ে হচ্ছে হয়তো। রাস্তাটা সুন্দরভাবে সজ্জিত, আলোকিত।

মেয়েটার শরীর এখনও থরথর করে কাঁপছে। পেছনের সিটে বসে জানালার বাইরে চেয়ে রয়েছে সে। অন্যান্য অনুভূতি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু একটু শীত লাগছে।
গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো ইচ্ছে নেই তার। এভাবে বাইরের দৃশ্য দেখতেই ভালো লাগছে।

কতো রকমের মানুষ সেখানে। কিছুক্ষণ আগেই একটা মেয়েকে দেখেছে সে। বাচ্চা মেয়ে। বাবার কোলে বসে ছিলো হাসিমুখে, হাতে হাওয়াই মিঠাই। মেয়েটা জানেই না, তার জন্যেও হয়তো এমন একটা দিন অপেক্ষা করছে!
রাস্তা এমন আলোকিত দেখানোর কারণটা মৌমিতা এতোক্ষণে বুঝলো। আগামীকাল পহেলা ফাল্গুন। এখানে মেলা বসেছে।

সময়টা পিছিয়ে দিতে ইচ্ছে করলো খুব। মন চাইলো, আব্বার হাত জড়িয়ে মেলার ঐ জনসমুদ্রে হারিয়ে যেতে। আব্বার কাছে খেলনার জন্য বায়না করা হয় না কতোদিন হলো!

“আপনাকে কিছু দেয়ার ছিলো।”

মেয়েটা চমকে উঠে সুজয়ের দিকে তাকায়, “জ... জ্বী?”

“একটা উপহার আছে আপনার জন্য।”

মৌমিতা হাতে থাকা সোনালি মোড়কের চকলেটটা দেখালো, “এটাই?”

সুজয় অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসলো, “না, এটা না। অন্যকিছু। একটু দাঁড়ান।” পাশে রাখা ব্যাগটার চেইন খুলতে খুলতে বললো, “ওটা আমি দিয়েছিলাম—শোয়াইব সেটা বলে দিয়েছে তাহলে!”

কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না মৌমিতা। ফোকলা দাঁতের ছোট্ট ছেলেটার কথা মনে পড়লো। রূপা ভাবীর ছেলে। ওর নাম তবে শোয়াইব। আরও অনেক নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হবে হয়তো।

“এই যে, এটা। আপনি অনেক বই পড়েন শুনছিলাম।”

সে সুজয়ের হাতের দিকে তাকালো। চকচকে রঙিন কাগজে মোড়ানো একটা বই।
বুকের ভেতরটাতে ধড়াম ধড়াম শব্দ হলো। জিনিসটাকে ছোঁয়ার সাহস হলো না কোনো কারণে।
সুজয় বইটা এগিয়ে দিলো, “নেন।”

মৌমিতা কাঁপা হাতে উপহার গ্রহণ করলো। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সেটার দিকে। রঙিন কাগজে বাঁধাই করার পর একটা নীল ফিতেও বাঁধা হয়েছে। তার এক প্রান্তে বাঁধা হয়েছে একটা ভাঁজ করা ছোট কাগজ। উপরে নাম লেখা—মৌমিতা খন্দকার। পেশায় চিকিৎসক হলেও ছেলেটার হাতের লেখা সুন্দর।
মেয়েটা নিজের নামের উপর আঙুল বোলায় একবার। নামটা সম্ভবত বলপয়েন্ট কলমে লেখা হয়নি, অন্যকিছু ব্যবহার করা হয়েছে। সে যৎসামান্য কৌতূহল নিয়ে কাগজের ভাঁজ খুললো। ভেতরে চার লাইনের ছড়া সদৃশ কিছু লেখা।

   “ঠিকানা তোমার হারিয়ে ফেলেছি,
   উড়োচিঠি বাকি আর নেই।
   জানা অজানার ভিড়ে কেন তবু
   বারবার খুঁজি তোমাকেই?”

মৌমিতা বিদ্যুৎপৃষ্টের মতো চমকে উঠে সুজয়ের দিকে তাকায়। সুজয় বলে, “কী হলো?”

“এ... এটা কোথায় পেলেন?”

“কোনটা?”

চিরকুটের দিকে নির্দেশ করে মৌমিতা বললো, “এটা।”

“ওটা আমার লেখা না। হাতের লেখা আমার, ছড়াটা অন্যকারও।”

“অন্যকারও বলতে? কার?”

“জানি না।”

“পেলেন কীভাবে?”

সুজয় অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলে, “অনেক আগের ঘটনা। ভালোভাবে মনে নাই।”

“প্লিজ...” অনুরোধ করলো মেয়েটা, “বলেন।”

“আচ্ছা। যতোটুকু মনে আছে, বলি। ঐ ঘটনার প্রায় সাত-আট বছর হবে। তখন এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিলো। কয়েকদিন পরপর হরতাল, অবরোধ। খুব খারাপ একটা সময় যাচ্ছিলো। আমি ঐ সময় রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়তাম। যাই হোক।
সেদিন বিকালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজের জন্যই বের হয়েছিলাম। কী কাজ—সেটা মনে পড়ছে না।”

মৌমিতা মনোযোগ দিয়ে শুনলো, মাথা নাড়লো, “হুঁ।”

“এমনিতে অনেক দেরি করে ফেলেছিলাম। তার উপর রাস্তায় নেই কোনো যানবাহন। হেঁটে যাচ্ছিলাম। রোদ ছিলো অনেক।
হঠাৎ মনে হলো, আমার মাথায় কেউ ছোটখাটো একটা ঢিল ছুঁড়েছে। পরে দেখি, ওটা কাগজের প্লেন।
এই লেখাটা ওখানেই পেয়েছি। কাগজটাও অনেকদিন ছিলো আমার কাছে। দুই-তিন বছর আগে কয়েকটা পুরাতন বই বিক্রি করে দিয়েছি, ওটা ওগুলোর সাথেই হারিয়ে গেছে। তবু ছড়াটা ভুলে যাইনি।
আপনার জন্য গিফট কিনতে গিয়ে মনে হলো, এটা যেহেতু মনে আছে, কাজে লাগাই। আর তাছাড়াও, আমার ঠিকানায় আপনি আসবেন, তাই...”

মৌমিতার মুখের দিকে তাকিয়ে সুজয় চুপ করলো। ঐ চোখদুটোতে অশ্রুর পাশাপাশি থাকা কোনো তীব্র অনুভূতি ছেলেটাকে দ্বিধায় ফেলে দিলো। সে বুঝলো না, তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী এই ঘটনা জেনে খুশি হয়েছে, নাকি রাগ করেছে।
সে কেবল এতোটুকুই বুঝলো, মৌমিতার কিছু বলার আছে। হয়তো অনেক কিছুই বলার আছে। কিন্তু সেই না বলার বলা কথার ভার তাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে।
সুজয় ভ্রু কুঁচকে বলে, “কোনো সমস্যা?”

মৌমিতার গালজুড়ে কাজলের কালি ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিকে তার খেয়াল নেই। দু'হাতে চোখ মুছে সুজয়ের দিকে পুরোপুরি ঘুরে বসলো সে, “ওটা কে ছুঁড়েছিলো, দেখেননি?”

“না। আসলে, একটুর জন্য দেখতে পারিনি। একটা নতুন বিল্ডিং ছিলো ওখানে। আমি মাথা ঘুরিয়ে সরাসরি ওদিকে তাকিয়েছিলাম, দোতলার একটা জানালায়। কেউ হয়তো দাঁড়িয়ে ছিলো, আমি তাকাতেই সরে গেলো—এমন মনে হয়েছিলো।
ভালোভাবে খেয়াল করিনি। ঠিকঠাক মনেও নেই অবশ্য। এটাও বুঝতে পারিনি, কোনো ছেলে ছিলো, নাকি মেয়ে ছিলো—”

মেয়েটা কাঁপা স্বরে বলে ওঠে, “আমি ছিলাম!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp