পবনপত্র - পর্ব ৫০ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
   ১৩ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮ সাল।
   শুক্রবার।

সকাল ৯টা বাজে।
উঠোনের এক কোণে বিশাল হাঁড়িতে বিরিয়ানি রান্না করা হচ্ছে। রিপন তদারকি করছে। এমনিতে বাড়ি ফাঁকা। তেমন কেউ আসেনি এখনও।
বাইরের ঘরে একটা চৌকি পেতে রাখা। বুয়াকে কাজ বুঝিয়ে রাবেয়া খাতুন ক্লান্ত শরীরটাকে ঐ চৌকিতে এলিয়ে দিলেন।

আজ তার বড় মেয়ে আর জামাই আসবে বাড়িতে। মেয়েটার বিয়ে নিয়ে কতো স্বপ্ন ছিলো, সব পূরণ হলো না। তবে মৌমিতা ভালো একটা পরিবার পেয়েছে, এটাই ঢের। সুখে থাকবে কিনা—বলা যাচ্ছে না এখনও।
মাত্র একটা রাত কাটলো তাকে ছাড়া। তাতেই বাড়িটাকে শূন্য মনে হচ্ছে। এই শূন্যতা কমবে না কোনোদিন। বরং বাড়বে। ছোট মেয়েটারও বিয়ে হয়ে যাবে।
আজ তবু মৌমিতা আসবে, কিছু সময়ের জন্য হলেও।

রাবেয়ার অন্তরে আনন্দের সাথে কোথায় যেন একটুখানি বিষাদ জমে আছে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

মার্জিয়া গোসল সেরে বেরিয়েছে মাত্র। সে উঠোনে গিয়ে গামছাটা দড়িতে ঝুলিয়ে দিলো। যেখানে সবচেয়ে বেশি রোদ পড়ে, সেখানেই শুকাতে দিলো। তাড়াতাড়ি শুকিয়ে গেলে ভালো হয়। গামছা তো এখানে বেশিক্ষণ রাখা যাবে না। অতিথিরা আসার আগেই সরিয়ে ফেলতে হবে। এই উৎসবমুখর দিনে আম্মার বকা খাওয়ার একটুও ইচ্ছে নেই মেয়েটার।
সে ভেজা চুলগুলো দোলাতে দোলাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। টেলিফোন বাজছে।
মার্জিয়া রিসিভার তুলে কথা বললো, “আসসালামু আলাইকুম।”

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কী রে মর্জিনা? খুব ফূর্তিতে আছিস মনে হচ্ছে।”

“আপা আসবে আজকে। আমি অনেক ব্যস্ত। কথা বলার সময় নাই।”

“ওহ। বিয়ে তো কালকেই হয়েছে, না?”

“হুম।”

“চল, আমরাও বিয়েটা করেই ফেলি।”

“এহ, শখ কতো! খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই তোকে বিয়ে করবো? ভাগ!”

হাসিবের পরবর্তী কথা না শুনেই সে ফোন কেটে দিলো। আব্বার ঘরে গিয়ে ঢুকলো।
মারুফ চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছেন। স্থির হয়ে থাকা সিলিং ফ্যানটা দেখছেন মন দিয়ে। ঘন ঘন হেঁচকি তুলছেন। তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে মার্জিয়া আদুরে স্বরে ডেকে উঠলো, “আব্বা?”

মারুফ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসলেন। মুখের চামড়া শুকিয়ে কুঁচকে গেছে। দাঁতগুলো কেমন বেখাপ্পা দেখালো ঐ মুখে। তিনি অস্ফুটে বললেন, “মা?”

মার্জিয়া হাসলো, হাসির সাথে চোখ বেয়ে অশ্রুর বন্যা নামতে চাইলো। সে অন্যদিকে ঘুরে তা আড়াল করলো। তারপর আবার আব্বার দিকে মুখ ফেরালো।
আজকাল লোকটার দিকে তাকালেই ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কবে যে তার আব্বাটা সুস্থ হবেন! আর কতো যে অপেক্ষা করতে হবে।

আব্বার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে মার্জিয়া। মারুফ কয়েকবার ঢোক গিলে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ জোরে হেঁচকি তুললেন।

“আব্বা?”

অদ্ভুত একটা শব্দ বের হলো লোকটার মুখ দিয়ে। চোখ থেকে জল গড়ালো। মারুফ ছটফট করলেন। আকুল হয়ে আশেপাশে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজতে শুরু করলেন। মেয়েটা এসবের কারণ বুঝলো না, জিজ্ঞেস করলো, “কিছু বলবেন আব্বা? কিছু বলবেন?”

মারুফের ঠোঁট কাঁপলো। তিনি মাথা নাড়ানো বন্ধ করলেন। তার চোখজোড়া হঠাৎ স্থির হয়ে গেলো উপরের দিকে। মার্জিয়া ভয়ার্ত গলায় আবার ডাক দেয়, “আব্বা? কী হয়েছে? কোথায় অসুবিধা হচ্ছে আব্বা?”

সাড়া না পেয়ে মেয়েটা উন্মাদের মতো বিছানা হাতড়ে আব্বার হাতটা খুঁজে বের করে। কব্জির উপর আঙুল চেপে ধরে।

“আব্বা! আব্বা!”

গলা কেঁপে ওঠে তার। সে মারুফের মুখ থেকে চোখ না সরিয়েই গলা ফাটিয়ে ডাকতে শুরু করে, “আম্মা? আম্মাআআ—”

মেয়ের বিকৃত আর্তচিৎকার শুনে রাবেয়া ধড়মড় করে উঠে বসলেন, তারপর দৌড়ে ঘরে এলেন। স্বামীর কাছাকাছি এলেন না। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দ্বিধান্বিত স্বরে বললেন, “খিঁচুনির ওষুধটা কি দেওয়া হয়েছিলো আজকে?”

“আমি নিজে দিয়েছি আম্মা, দেখেশুনেই ওষুধ দিয়েছি।”

মেয়ের কান্না দেখেও রাবেয়া নিজের কোনো বড় আতঙ্ক ধামাচাপা দিতে চাইলেন, ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন। মার্জিয়ার কাছ থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে নিলেন মারুফের হাতখানি। হাতের তালু মালিশ করতে করতে ঐ স্থির হয়ে আসা চোখের দিকে দেখলেন, ভেতরটা শুকিয়ে যেতে লাগলো। কাঁপা গলায় আদেশ করলেন তিনি, “ও... ঐ হাতটা ম... মালিশ করো। পা মালিশ করো... তাড়াতাড়ি...”

মার্জিয়া দৌড়ে আরেকপাশে গেলো, খাটের উপর উঠে আব্বার অন্য হাতটা মালিশ করতে শুরু করলো। রাবেয়া মমতামাখা গলায় মারুফকে বললেন, “মৌয়ের আব্বা? আপনার মৌ আসছে জামাই নিয়ে। মেয়ে-জামাইকে কতো কিছু খাওয়াতে চাইলেন না আপনি? বলেন, কী খাওয়াবো?
মৌয়ের আব্বা! মেয়েটা বিয়ের পর প্রথম আসছে বাড়িতে। আপনি যদি এমন করে থাকেন, ও কষ্ট পাবে না, বলেন?
ঐ যে, মার্জু ওখানে। মৌও আসছে। আপনার আদরের দুই মেয়ে... দেখেন—”

মার্জিয়া কাঁদতে কাঁদতে ডাকলো, “আব্বা? আমার দিকে একবার তাকান দেখি।”

চোখ মুছে ভগ্ন গলায় বললেন রাবেয়া, “মৌকে দেখবেন না? একবার ‘মা’ বলে ডাকবেন না? এই যে মার্জু, ওকে ডাকেন তো? এই যে আপনার ছোট মা। মৌ মা আসবে। এতোক্ষণে বোধহয় রওনা দিয়েছে, বেশিক্ষণ লাগবে না। মৌয়ের আব্বা?”

রাবেয়ার মনে হলো, তার দু'হাতের মুঠোয় থাকা মারুফের হাতখানি ক্রমে শীতল হয়ে আসছে। এটা কি মনের ভুল? তিনি আড়চোখে মার্জিয়ার দিকে তাকালেন, মেয়েটা আব্বার নিথর হাতখানি মালিশ করে চলেছে। তার অশ্রুসিক্ত চোখদুটোতে এখনও কী অদম্য আশা!
রাবেয়ার চোখ জ্বালা করতে লাগলো, ইচ্ছে করলো—এখনই দেয়ালে সজোরে মাথা ঠুকতে। কিন্তু তিনি কিছু করতে পারলেন না, কেবল বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে শুরু করলেন।

বসার ঘর থেকে আওয়াজ আসছে। মেহমান চলে এসেছে হয়তো। জুনায়েদ হাসিমুখে ভেতরে এলো, “চাচি?” ভেতরের দৃশ্য দেখে তার হাসি মিলিয়ে গেলো, সে দ্রুত হেঁটে কাছে এলো, “দেখি চাচি, সরেন।”

রাবেয়া সরলেন না।
জুনায়েদ মারুফের হাতটা মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে ধরে, কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করে। তার মুখ বিবর্ণ হতে থাকে। তারপর কিছু না বলেই হনহন করে বেরিয়ে যায় সে। অতিথিরা তার আচরণ দেখে হয়তো সন্দেহ করলো।
মারুফের বড় বোন মমতাজ খন্দকার ভেতরে এলেন। বৃদ্ধা স্নেহ মিশ্রিত কণ্ঠে ডেকে উঠলেন, “মারুফ?”

কোনো উত্তর নেই।
মাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসে রিতা, মামার হাত ধরে, জীবনের কোনো স্পন্দন পায় না সেখানে। মমতাজ আবারও কাছে এসে ছোট ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, তার গলা কেঁপে উঠলো, “মারুফ?”

একে একে আরও অনেকেই ঢুকতে থাকে ঘরে। কারও মুখে কোনো কথা নেই। কারও মুখেই হাসির লেশমাত্র নেই।
উঠোনের দড়িতে শুকনো গামছাটা একাকী ঝুলতে থাকে। বিরিয়ানির ঘ্রাণটা যেন উপহাস করতে থাকে মারুফের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অতিথির অনুপস্থিতিকে।

রাবেয়া একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন স্বামীর মুখের দিকে। কী নিষ্পাপ আর মিষ্টি ঐ মুখখানি! ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গাল বেয়ে অশ্রু নামলো। তার চোখের সামনেই মমতাজ খন্দকার ভীষণ সন্তর্পণে মারুফের চোখদুটো বন্ধ করে দিলেন। এই দৃশ্য দেখে রাবেয়া সবধরনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। রিতা দ্রুত তাকে ধরে ফেললো, কোনোমতে সোফায় নিয়ে গিয়ে বসালো।

ঘরটা চুপচাপ, নিস্তব্ধ। বাইরের কোলাহলও কমে এসেছে।
মারুফের হাত ধরে এখনও বসে আছে ছোট মেয়েটা। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রয়েছে মানুষটার নিষ্পাপ মুখে। কী সুন্দর করে ঘুমাচ্ছেন আব্বা! মার্জিয়া তাকে আর ডাকলো না। পানিতে চোখ ঝাপসা হয়ে এলে সে দ্রুত চোখের পাতা ঝাপটায়, তারপর আবার তাকিয়ে থাকে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, মারুফ হঠাৎ করে ‘মা’ বলে ডাকবেন। নিশ্চয়ই ডাকবেন।
মেয়েটা সেই ডাক শোনার জন্য অধীর অপেক্ষায় কান পেতে থাকে। তার দু'হাতের মাঝে আব্বার হাতখানি হঠাৎ খুব ভারী মনে হয়। কিন্তু সে হাত ছাড়ে না। ছাড়তে চায় না।

—————

রাজশাহী।

মৌমিতা দোতলার সিঁড়ির ধার থেকে নিচে উঁকি দেয়।
বাড়িভর্তি মানুষ। প্রায় সবাই অচেনা। সবাই ব্যস্ত। মেয়েটা ঘোমটা টেনে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। বসার ঘরে ভিড়ের মধ্যে কোনো পরিচিত মুখ খুঁজতে থাকে। দরজার দিকে নজর যেতেই সে দেখে, সুজয় হাত নেড়ে নেড়ে কারও সাথে কথা বলছে। মৌমিতা স্বভাবসুলভ দূরত্ব বজায় রেখে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে, কাছে যায় না।
ছেলেটা অন্যদিকে যেতে উদ্যত হলেও সে কোনো সাড়াশব্দ করে না, দ্রুত হেঁটে তার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে মাত্র।

সুজয় পেছনে ঘুরে তাকে দেখে হাঁটা থামায়। মৌমিতা কাছে এসে নিচু গলায় বলে, “কখন বের হবো আমরা?”

“এই তো, এখনই। সব প্রায় রেডিই আছে।” মেয়েটার দিকে ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়ালো সুজয়, “আলাদাভাবে আর কী নেয়া যায় বলেন তো?”

মৌমিতা ইতস্তত করে, “আপনার ইচ্ছা।”

“আপনিই বলেন। বাকি জিনিস তো আমার ইচ্ছাতেই নেয়া হয়েছে।”

“কিছু নিতে হবে না। একটু... তাড়াতাড়ি বের হতে পারলে, ভালো হতো।”

বাড়িতে যাচ্ছে, সবার সাথে দেখা হবে—মৌমিতার তো খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তার আচরণে অস্থিরতা ছাড়া কিছু দেখা গেলো না। সুজয় কিছু বলতে যাবে, তখনই পেছনে থাকা টেলিফোনটা বেজে উঠলো। সে ওদিকেই এগিয়ে গেলো, রিসিভার তুলে কানের কাছে ধরলো, “হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।”

মৌমিতা তার দিকে চেয়ে রইলো। আরেকটু কাছে এসে দাঁড়ালো। ফোনের ওপাশের মানুষটা কী বলছে—বোঝার উপায় নেই। সুজয়ও কোনো শব্দ উচ্চারণ করলো না।
মেয়েটা বুঝতে পারলো না, হঠাৎ করে তার এমন হাঁসফাঁস লাগছে কেন। সে অধীর আগ্রহে সুজয়ের কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকে।

“আচ্ছা।” বলে সুজয় ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখলো। শাহানা হয়তো কোনো কাজে যাচ্ছিলেন, ছেলের অভিব্যক্তি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এলেন, “কে ছিলো সুজয়?”

“জুনায়েদ ভাই।”

মৌমিতা নিজের আগ্রহ দমন করতে পারলো না, বলে উঠলো, “আব্বা কেমন আছেন?”

সে যে সরাসরি মারুফের কথা জিজ্ঞেস করবে—সুজয় হয়তো এমনটা আশা করেনি। ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগলো ছেলেটার। তবুও মাথা কাজ করলো না। সে একবার মায়ের দিকে, একবার স্ত্রীর দিকে তাকায়। চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে তার দীর্ঘদিনের পড়াশোনা আর প্রশিক্ষণ যেন হুমড়ি খেয়ে পড়লো, যখন সে আর কোনোকিছু না লুকিয়ে ধরা গলায় বলে ফেললো, “উনি আর নাই।”

মৌমিতা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে অবিশ্বাস, আর কানে বাজতে থাকে তার সর্বশেষ শোনা দু'টি শব্দ, “আর নাই...”

শাহানা প্রথমে বুঝে উঠতে পারলেন না, তার কী করা উচিত। চেতনা ফিরতেই তিনি পুত্রবধূর দিকে এগিয়ে গেলেন। তার কাঁধ বরাবর হাত রেখে তাকে স্পর্শ করতেই যেন বাঁধ ভেঙে পড়লো, মেয়েটা ঐ হাতের উপর ঢলে পড়ে। নিজেকে সামলানো আর সম্ভব হয় না তার দ্বারা। শাহানা তাকে শক্ত করে ধরে সোফার কাছে নিয়ে গেলেন। মেয়েটাকে সোফায় বসিয়ে তিনি সুজয়ের দিকে তাকালেন বিরক্ত হয়ে।
এরকম কথা এতো সরাসরি বলাটা তার কাছে খুব অপছন্দনীয়। বিশেষ করে যখন মেয়েটা আগে থেকেই এতো দুর্বল চিত্তের।

মৌমিতার কাছে আশেপাশের সব ঝাপসা, অন্ধকার দেখাচ্ছে। সে কিচ্ছু দেখতে পারছে না, তবে কিছু দেখতে না পারাটা তাকে ভাবাচ্ছে না। সে এখনও বিশ্বাস করেনি, তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন সত্যি হয়ে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ আশঙ্কা বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
তার অনুপস্থিতিতে আব্বার মৃত্যু ঘটলো! মারুফের ইচ্ছে ছিলো, চিরবিদায় নেওয়ার আগে স্ত্রী-সন্তানকে দেখবেন একবার। সেই বিদায়টা তাহলে গতকালই হয়ে গেছে!

মৌমিতার নিজের অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আব্বার এই ইচ্ছেটা পূরণ হলো না! সে দীর্ঘদিন ঐ মানুষটাকে কষ্ট দিয়েছে, অবহেলা করেছে। সেই মানুষটা সব যাতনা থেকে মুক্তি পেলেন অবশেষে, মেয়েটাকে যাতনায় ডুবিয়ে গেলেন।

মৌমিতার দম ফুরিয়ে আসতে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে আসে। শাহানার বাহুর উপর নেতিয়ে পড়ে সে।

“মৌ, জোরে জোরে শ্বাস নাও তো। হাত তো ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। হায় আল্লাহ!”

শাহানা তাকে আরও দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরলেন। এমন শীতল আবহাওয়াতেও মেয়েটার মুখ ঘেমে যাচ্ছে। তিনি আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে দিলেন, “সুজয়? দেখো তো কী হলো—”

সুজয় নিজের ভেতরের ঝড়টাকে চাপা দিয়ে সোফার সামনে ঝুঁকে দাঁড়ায়। মৌমিতার রাঙা হাতখানি টেনে নেয়, অনুভব করে—নাড়ির স্পন্দন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে। সে যথাসম্ভব শান্তভাবে বলে ওঠে, “মৌ? আমার দিকে তাকাও।”

“আব্বা...”

খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ শুনে মেয়েটা বিড়বিড় করলো। কিন্তু তাকালো না। আব্বাকে যদি আর দেখাই না যায়, তাহলে চোখ খুলে লাভ কী? মৌমিতা অভিযোগ করতে চাইলো, অস্বীকার করতে চাইলো। কিন্তু আর কোনো শব্দই সে উচ্চারণ করতে পারলো না। কণ্ঠনালী ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
শাহানা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “মা, মানুষটা অনেক কষ্ট পাচ্ছিলো রে মা। আল্লাহ তাকে আর কষ্ট দিতে চাননি।”

সুজয় পেছনে ঘুরে উঁচু গলায় বলে, “আজমল ভাই, গাড়ি বের করেন তাড়াতাড়ি।”

“তোমার বাবাকে ডেকে আনো তো সুজয়, জলদি যাও। আমি আছি এখানে।”

বাবার প্রসঙ্গ আসতেই যেন মৌমিতার আরও একবার মনে পড়ে গেলো, কতো ভয়ঙ্কর একটা ঘটনা ঘটে গেছে তার সাথে। কী হারিয়ে ফেলেছে সে! শ্বাস নেওয়ার জন্য অনেক কসরত করতে হলো তাকে। পৃথিবীর সব বাতাস যেন ফুরিয়ে গেছে।
সুজয় চলে গেলো। শাহানা আরও একবার তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা করো তো। ওকে হসপিটালে নিতে হবে।”

মেয়েটা বিড়বিড় করলো, “আমি বাড়ি যাবো।”

—————

মার্জিয়া বসে আছে দেয়াল ঘেঁষে, বিছানার শেষপ্রান্তে। আশেপাশে তেমন কেউ নেই। তার কান্নাকাটি অনেকখানিই কমেছে, তবু থেমে থেমে শ্বাস নিচ্ছে। গোসলের পর চুলে আর চিরুনি পড়েনি আজ। সবসময় পরিপাটি হয়ে থাকা মেয়েটা চরম অগোছালো অবস্থায় খাটের এক কোণে পড়ে রয়েছে।

রাবেয়া প্রায় অচেতন। তিনি কিছু পুরাতন পরিকল্পনার কথা স্মরণ করে বারবার ভেঙে যাচ্ছেন। মাস খানেক আগেও কতো কিছু ভেবে রেখেছিলেন। মেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হবেন। ওরা সুখে সংসার করবে। এই বাড়িতে রয়ে যাবেন কেবল তিনি আর মারুফ।
কয়েক যুগ আগে, নববধূ সেজে প্রায় ফাঁকা একটা বাড়িতে যেভাবে এসে উঠেছিলেন, জীবনের শেষ ক'টা দিনও জীবনসঙ্গীর সাথে সেভাবেই কাটিয়ে দেয়ার কথা ছিলো। সব হিসাবে এতো গড়মিল দেখা দেবে—কে জানতো?

রাবেয়া আবার কেঁদে উঠলেন। আরেকজন মহিলা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগলেন। আশেপাশে এখনও অনেক মানুষ জড়ো হয়ে আছে। সবাই নানাভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ঐ ভিড়ের মধ্য থেকেই মার্জিয়াকে এক ঝলক দেখলো আসমা। ধীরপায়ে এগিয়ে এলো।

মেয়েটা ঘাড় নিচু করে বসে আছে। মাথায় কারও স্পর্শ অনুভব করতেই তার স্মৃতিচারণ ধূলিসাৎ হয়ে গেলো। সে টের পেলো, আব্বা অতীত হয়ে গেছেন। বর্তমানে তিনি নেই, ভবিষ্যতেও আর কখনোই পাওয়া যাবে না তাকে।
আজ থেকে তার আব্বা নেই। বাসায় ফিরে ঐ ঘরটাতে উঁকি দিলে আব্বাকে আর দেখা যাবে না। টেবিলে খেতে বসলে ঐ চেয়ারটা ফাঁকা পড়ে থাকবে। সব আগের মতোই থাকবে, কতো তুচ্ছ সব জিনিসপত্র থেকে যাবে বাড়ি জুড়ে। কিন্তু আব্বা থাকবেন না।

মেয়েটা শিউরে ওঠে। আসমা আঁচলে তার চোখ মুছিয়ে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে, “কাঁদে না।”

না কাঁদার এই অনুরোধ যেন মার্জিয়ার অশ্রুকে আরও উস্কানি দেয়। সে ডুকরে কেঁদে ওঠে, হাতের পিঠে চোখ মুছতে শুরু করে।

বাড়ির আঙিনায় মানুষের ভিড়। একেক জনের মুখে একেকরকম কথা।
কেউ সহানুভূতি দেখাচ্ছে, কেউ ভাবছে সম্পত্তি নিয়ে। কেউ কেউ আবার মৃত ব্যক্তির কোনো পুত্র সন্তান না থাকার আফসোস করছে। কেউবা নিজের কোনো আত্মীয়ের মারা যাওয়ার ঘটনা শোনাচ্ছে। বউ ভাতের দাওয়াত খেতে এসে, শোক সমাবেশে অংশগ্রহণকারী লোকগুলোর এমন মুখরোচক আলোচনার মাঝেই হর্নের শব্দ পাওয়া গেলো।

কালো গাড়িটা এসে খন্দকার বাড়ির সামনে দাঁড়ালো। যেমনটা হওয়ায় কথা ছিলো, ঠিক সেভাবেই। কিন্তু গাড়ি থেকে নামতেই সুজয়ের কানে যে আওয়াজ ভেসে এলো, তাতে আনন্দের কোনো চিহ্ন নেই। বড় একটা শ্বাস ফেলে সে, মাফলারটা আরেকটু ভালোভাবে পেঁচিয়ে নেয় গলার চারপাশে। বাড়ির ভেতরে উঁকি দিতেই তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে।

এই তো সেদিনই, সে প্রথম এসেছিলো এই বাড়িতে। মারুফ হাসিমুখে স্বাগত জানিয়েছিলেন, স্ত্রীকে বলেছিলেন, “সুজয় কী পছন্দ করে, সেটা রান্না করো আজকে।”

সেই অমায়িক মানুষটাই চোখের সামনে অসুস্থ হয়ে গেলেন। শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে রইলেন কতোদিন। কতো নির্ঘুম রাত কাটালেন। কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। দেখতে দেখতে পুরো মানুষটাই বদলে গেলেন যেন। স্বাস্থ্যবান লোকটা শুকিয়ে কঙ্কালসার হয়ে গেলেন। আর এখন, তাকে নিয়ে সব আশা ভরসার সমাপ্তিও ঘটলো।

সুজয় আর কিছু ভাবতে পারলো না। কয়েকটা ঘণ্টা আগেই তার অসুস্থ শ্বশুর নিজের প্রাণপ্রিয় আমানতকে তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ওটাই যে শেষ দেখা, তিনি কি ভাবতে পেরেছিলেন? তার মেয়েটা ভাবতে পেরেছিলো?

গাড়ির দরজা খুলতে গিয়ে সুজয়ের হাত কেঁপে উঠলো। ধাতব হাতলটা অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা! শাহানা গাড়ি থেকে বের হলেন, তারপর পুত্রবধূর দিকে হাত বাড়ালেন।
নিস্তেজ ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলো মেয়েটা। দীর্ঘ বারো ঘণ্টা পর পৈতৃক ভিটায় পা রাখলো। কিন্তু তার পিতা এই রাজকন্যাকে রাজরানী রূপে দেখার অপেক্ষা করলেন না।

মানুষগুলো মৌমিতার দিকে কীভাবে যেন তাকাচ্ছে। তাদের চোখে করুণা... কিংবা কৌতূহল।
অন্য কোনো দিন হলে মৌমিতা নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করতো। এতো লোকসমাগম তার ভালো লাগে না। কিন্তু আজ সে শুধু ক্লান্ত নয়, সর্বস্বান্ত। আব্বা নেই। হারানোর বাকি নেই কিছু।
এখন এই লোকসমাগম তাকে বিরক্ত করছে না, স্বস্তিও দিচ্ছে না।

সে তাকালো দরজার দিকে। আশেপাশের সবকিছু মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে গেলো, কোনো মানুষ নেই। কেবল একজন মধ্যবয়সী লোক দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে। অমলিন স্নিগ্ধ একটা হাসি তার মুখে। মৌমিতাকে দেখে তিনি বললেন, “রেজাল্ট কেমন হয়েছে, মা?”

কলেজের পোশাক পরিহিত এক ক্লান্ত কিশোরী তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকলো, রুক্ষ স্বরে বললো, “আপনার খালি রেজাল্টের চিন্তা!”

মৌমিতার পায়ের নিচের মাটি ভয়ানকভাবে দুলে উঠলো। শাহানা তাকে ধরে ফেললেন। এগিয়ে সামনে যেতে সাহায্য করলেন।
মেয়েটা চৌকাঠের উপর উঠে দাঁড়ায়। বারান্দা পেরিয়ে বাড়িতে ঢোকার আগে একটু দম নেয়। জুতো খুলে অপরিষ্কার শীতল মেঝেতে পা রাখে। কেউ একজন বলে ওঠে, “জুতা পরে আসো মৌ, ঠাণ্ডা লাগবে।”

মেয়েটা সেই নির্দেশ মানলো না। ভেতরে ঢুকে চিরপরিচিত বাড়ির মেঝেতে ইতস্তত পা ফেলতে লাগলো। রিতা ছুটে এলো তার দিকে, দুই হাতে মৌমিতার গায়ের চাদরটা ঠিক করে দিলো, “এদিকে আসো।”

সবাই হয়তো আহাজারি করতে করতে এখন ক্লান্ত হয়ে বসে আছে। সর্বত্র শুধু কথাবার্তার মৃদু আভাস। খাওয়ার টেবিলে মারুফের ওষুধের বক্স, জানালার গ্রিলে ঝুলে আছে লুঙ্গি, সোয়েটার। ওগুলোতে নিশ্চয়ই আব্বার গন্ধ লেপ্টে আছে এখনও।
মৌমিতা প্রশ্ন করে, “আব্বা কই?”

রিতার মুখ দিয়ে কথা বের হতে একটু সময় লেগে গেলো। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো ব্যক্তি বলে উঠলো, “লাশ তো ঐ ঘরে...”

লাশ!

মৌমিতার শরীরটা ভারী হয়ে আসে, ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় সে। তার আব্বাকে লাশ বলে ডাকার এমন স্পর্ধা কার—সেটা দেখতে ঘুরে তাকানোর মতো শক্তিটুকু অবশিষ্ট নেই।
সে সামনে এগিয়ে গেলো, আব্বার ঘরের দিকে। তাকে দেখতেই আরেকবার কান্নার রোল উঠলো ঘরজুড়ে। ঝিমিয়ে পড়া শোক হঠাৎ জেগে উঠে উত্তাল সমুদ্রের মতো আরেকবার আছড়ে পড়লো খন্দকার বাড়িতে।

রাবেয়া বড় মেয়ের দিকে হাত বাড়ালেন। মৌমিতা মাকে জড়িয়ে ধরলো, তার কাঁধে মুখ লুকিয়ে নিজেকে শান্ত করতে চাইলো।

বোনের উপস্থিতি টের পেয়ে মার্জিয়া মুখে হাত চেপে রাখলো। এলোমেলো চুলগুলো তার চেহারা ঢেকে রেখেছে। আপা তো জানে না, নিজের শেষ সময়টাতে আব্বা কী ব্যাকুলভাবে তাকে খুঁজছিলেন! অপূর্ণ একটা ইচ্ছে নিয়ে চলে গেলেন তিনি।
মার্জিয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। পাশে বসে থাকা মমতাজ তাকে কাছে টেনে নিলেন, ঘাড়ে আলতো চাপড় মেরে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, “আর কেঁদো না মা। ঐ যে দেখো, তোমার আপা এসেছে।”

মৌমিতাকে বিছানায় বসতে বলা হলো। সে বসলো না। মোটা চাদরটা দ্বারা মুখের একাংশ ঢেকে বসার ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। দরজার কাছে আসতেই তার পা আটকে গেলো মেঝের সাথে।
ঘরের মাঝামাঝি রাখা, সাদা কাফনে মোড়ানো দেহটাকে দেখে সে আর এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেলো না। মনের ভেতর যে ক্ষীণ আশা বেঁচে আছে এখনও, সেটাকে হত্যা করার প্রস্তুতি নেই তার। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে তাকিয়ে রইলো নিঃসঙ্গ মৃতদেহটার দিকে।
বাড়িতে এতো মানুষ, তবু আব্বা একা একা শুয়ে আছেন। কিছুক্ষণ আগেও তাকে নিয়ে সবার কতো সতর্কতা ছিলো, এখন তিনি ঠাণ্ডা মেঝেতে পাতলা মাদুরের উপর শুয়ে আছেন। অথচ কেউ আর চিন্তা করছে না তাকে নিয়ে। মৃত মানুষের তো অসুস্থতার ভয় নেই!

রিপন পাশে এসে দাঁড়ালো, ভাগ্নির কাঁধে হাত রেখে শান্তভাবে বললো, “ভেতরে আসো।”

মেয়েটা নড়তে চাইলো না। পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো। রিপন তার হাত ছাড়লো না, “শেষবার দেখে নাও। আর কিন্তু দেখতে পারবা না। যোহরের পর জানাযা। একটু পরেই নিয়ে যেতে হবে।”

মৌমিতার চোখ থেকে আরেক দফা অশ্রু ঝরলো। মামার পিছু পিছু ভেতরে এলো সে। রিপন ঝুঁকে পড়লো, মারুফের মুখের উপর থেকে কাপড়টা সামান্য সরালো।
মেয়েটা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না, ধপ করে বসে পড়লো মেঝেতে।

আব্বার মুখটা ফ্যাকাসে, চোখের নিচে সুরমার প্রলেপ। মৌমিতা নিজের কাঁপতে থাকা হাতখানি মারুফের কপালে রাখে, বরফ শীতল সেই কপাল! সে চোখ মুছে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়, পরম স্নেহে ডেকে ওঠে, “আব্বা?”

রিপন চোখ ফেরালো। গতরাতে এই ভাগ্নিটাকে একপ্রকার জোর করে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়েছে সে! খুব আফসোস হলো। একটা রাত যদি বাড়িতেই থাকতো মেয়েটা। মৃত বাবাকে অমন করে ডাকতে হতো না।
আর কিছুক্ষণ আগেও তো মারুফ বড় মেয়েকে দেখতে কতোটা অস্থির হয়ে উঠেছিলেন! এখন ঐ মেয়ের এমন আকুল ডাকে তিনি সাড়াটুকু দিলেন না।

—————

   ২০১৫ সাল।
   বনানী, ঢাকা।

আকাশটা হুটহাট মেঘে ঢেকে যাচ্ছে, সাথে সূর্যটাও। পরিবেশ একটু শীতল হতেই আবার দিগ্বিদিক পালিয়ে যাচ্ছে মেঘগুলো! চড়া রোদ এসে ঢুকে পড়ছে জানালার কাচ ভেদ করে। ফ্যানের বাতাসে ঘরের পর্দাগুলো উড়ছে। কোনো নির্মাণাধীন ভবন থেকে বিদঘুটে শব্দ আসছে।

সুস্মিতার এসব দিকে খেয়াল নেই। সে হা করে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। খাটের পাশে বিছিয়ে রাখা মাদুরে মুখোমুখি বসে আছে দু'জন। মৌমিতা কপালে হাত দিয়ে রেখেছেন, হাতটা কাঁপছে। চোখ হতে পানি ঝরছে অনবরত।
এই দৃশ্য সুস্মিতার কাছে একেবারেই নতুন। আর অবিশ্বাস্যও বটে।

“আব্বার সাথে আমার দেখা হয়নি, মাত্র কয়েকটা ঘণ্টার জন্য।
ছোটবেলায় ভাবতাম, বড় হয়ে আব্বা-আম্মার জন্য অনেককিছু করবো। একটা চাকরি পেলেই তাদেরকে সব ফিরিয়ে দেবো, যা আমার জন্য ত্যাগ করতে হয়েছে। কতোই না বোকা ছিলাম!” মৌমিতা চোখ মুছলেন, “আমরা সবসময় এমনই ভাবি, সময় আসবে। কিন্তু আসে না, সময়টাকে তৈরি করে নিতে হয়।

আব্বাকে যতোটুকু সময়ের জন্য পেয়েছিলাম, ততোক্ষণই যদি কাছে থাকতে পারতাম। যদি একবারের জন্যে হলেও কৃতজ্ঞতা দেখাতে পারতাম। আমি চাকরি পাওয়ার অপেক্ষা করলাম। আব্বা অপেক্ষা করলেন না। সারাজীবন শুধু দিয়েই গেলেন, কিছু নিলেন না।

আজ আমার কাছে টাকা আছে, সব আছে। আব্বা নেই। ছোটবেলার আচরণটাই ছিলো একমাত্র জিনিস, যেটার মাধ্যমে আমি আব্বাকে সহজেই খুশি করতে পারতাম। আমার কতো ছোট ছোট কথায় আব্বা খুশি হয়ে যেতেন। অথচ ঐ সামান্য কথাটুকু বলতেও কতো অলসতা দেখিয়েছি।
ঐটুকুই সময় ছিলো আমার হাতে, চাইলেই কাজে লাগাতে পারতাম।”

সুস্মিতা মাথা নাড়লো। মাথা নিচু করেই ক্ষীণস্বরে বললো, “এসব নিয়ে এখন আর আফসোস কোরো না আম্মু। নানা নিশ্চয়ই অনেক ভালো আছেন ওখানে।”

“আফসোস? যতোদিন বেঁচে আছি, এই আফসোস মিটবে না।
ঘরের মানুষের ভালোবাসাকে আমরা সহজলভ্য ভেবে নিই। কারণ তাদের ভালোবাসার বিনিময়ে কোনো চাহিদা থাকে না, শর্ত থাকে না। মানুষের স্বভাবই এমন। বিনামূল্যে কিছু পেয়ে গেলে সেটাকে গুরুত্ব দিতে পারে না, সস্তা ভেবে নেয়। আমিও এই ভুলটা করেছি।
জীবনের সবচেয়ে দামী জিনিসগুলো খুব সাধারণ। সেগুলো টাকা দিয়ে কেনা যায় না, দরদাম করা যায় না। কিন্তু আমরা দরদাম করেই অভ্যস্ত।”

দূরের কোনো মসজিদ থেকে যোহরের আজান ভেসে আসছে। একে একে আরও কয়েকটা আজানের ধ্বনি যুক্ত হলো সেটার সাথে।
এ ঘরের ভেতরে দু'জন মানুষ নীরব হয়ে রইলো অনেকক্ষণ।

সুস্মিতা মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাতে পারছে না। ছোটবেলা থেকে যে মানুষটিকে পাথরের মতো শক্ত দেখেছে, অনুভূতিহীন ভেবে এসেছে; হঠাৎ তার এভাবে ভেঙে পড়া মেয়েটা সহ্য করতে পারছে না। সে সর্বদাই মায়ের নমনীয় রূপটা দেখতে চেয়েছে। কিন্তু আজ সে চাইছে, তার মা শক্ত হয়ে যাক।

“সুস্মিতা? একবার ভেবে দেখো। সবকিছু নির্ধারিত ছিলো। আমরাই ভুল করি। আমাদের ভাগ্যে যে মানুষটা থাকে, সে সঠিক সময়েই আসে। কিন্তু আমরা বড়ই অধৈর্য। ঐ জায়গাটা অন্য কাউকে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগে থাকি। এরপর যখন আসল মানুষটা আসে, তার কাছে অপরাধী হয়ে থাকতে হয়। অথচ একটু সংযমী হলে, একটু ধৈর্য ধরতে পারলেই সবকিছু কতো সুন্দর হতে পারতো।” মৌমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আর মাঝখান থেকে কারো জীবনও নষ্ট হতো না। কোনো হতাশা থাকতো না, আফসোস থাকতো না।”

বড় একটা শ্বাস ফেলে মায়ের চোখে চোখ রাখলো সুস্মিতা, “আমি তোমাকে প্রমিস করছি আম্মু। আমার জীবনে যা ঘটবে, তুমি সব জানবে। আমাকে নিয়ে যেন কোনো আফসোস না থাকে তোমার। আর হ্যাঁ, আমার কাছে কোনো কিছুই নিজের পরিবারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারবে না। ওসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আমি আর মাথা ঘামাবো না।”

মৌমিতা মলিন হাসলেন, “আমি জানি মা। আমার থেকে তোমার বুদ্ধি অনেক বেশি। সত্যিই বলছি। তুমি সহজেই অনেককিছু বুঝতে পারো। আমি পারি না। বুঝেও বুঝি না‌—”

“আমি একটা প্রশ্ন করি?”

“হ্যাঁ। করো।”

“যদি তুমি কিছু মনে না করো।”

মৌমিতা একটু দ্বিধায় পড়ে গেলেন। তবু মাথা নাড়লেন, “কিছু মনে করবো না। তুমি বলো।”

“তুমি জানতে, আমাদের মধ্যে যে দূরত্বটা তৈরি হয়েছে, সেটা এতো সহজে মিটবে না। আর তুমি যদি ঐ অবস্থায় আমাকে সরাসরি বলতে—আদিবকে ভুলে যাও, আমি তোমার কথায় কোনো গুরুত্ব দিতাম না। তাই তুমি আমাকে এতোকিছু শোনালে। তবুও একটা প্রশ্ন আছে আমার।

আমি জানি, তুমি শুধু ছড়া-কবিতাই লেখো না। বানিয়ে বানিয়ে সুন্দর গল্পও শোনাতে পারো। বিশেষ করে আমার জন্য। আমি খেতে না চাইলে তুমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প শোনাতে, ঘুমাতে না চাইলে নিজের বানানো গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে। তুমি ভালোভাবেই জানো, আমাকে কীভাবে বোঝালে আমি বুঝবো। সবসময় এমন করো।
আমার মনে হচ্ছে, এবারও তুমি একই কাজ করেছো। তাই জানতে চাচ্ছি... বাদল বলতে কি আসলেই কেউ ছিলো?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp