ঝিকঝিক শব্দে ট্রেন চলেছে। বাইরে অন্ধকার। মাথার উপরে মৃদু আলোর বাতি জ্বলছে, ফ্যান চলছে ছন্দোময় শব্দে। সুস্মিতা বসেছে জানালার পাশে। আম্মুর কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজে রয়েছে। তার মাথাটা বেশ ঝিমঝিম করছে।
ভ্রমণ চলাকালীন সে কোনো যানবাহনের ভেতরে খেতে পারে না।
বিকেলেই রওনা হওয়ার কথা। ট্রেনটা দেরি করতে করতে আসরের সময় পেরিয়ে ফেলেছে। ইফতারে সুস্মিতা তেমন কিছু খেতে পারেনি। কোনোমতে দুটো খেজুর আর কয়েক ঢোক পানি গিলেছে। শরীরটা খারাপ লাগছে।
বাসে থাকলে এতোক্ষণে একটা দুর্ঘটনা ঘটেই যেতো।
সুস্মিতা মনে মনে স্থির করেছে, ঈদের দুই-একদিন আগে আর কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করবে না ভুলেও। দরকার হলে বাসা থেকে এক সপ্তাহ আগেই বেরিয়ে পড়বে, নাহলে বাসাতেই ঈদ করবে।
শেষ সময়ে এসে এমন ছোটাছুটি করাটা ভীষণ কষ্টকর। এতো মানুষ, এতো অনিয়ম!
রেলগাড়ির গতি কমতেই মেয়েটা ধীরে ধীরে চোখ মেলে জানালার দিকে তাকায়। নাটোর রেলস্টেশন। সে মায়ের কাঁধ থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলো।
ট্রেন পুরোপুরি থামেনি। অথচ যাত্রীরা ইতোমধ্যে উঠে দাঁড়াতে শুরু করেছে, দরজার দিকে ভিড় জমে গেছে।
সুজয় স্যুটকেসটা ধরে ত্যক্ত মুখে উঠে দাঁড়ালেন। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ভিড় ঠেলে দরজার কাছে গেলেন।
এতো রাতেও চারিদিকে কোলাহলের কমতি নেই। বাদামওয়ালার হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। সাথে ঘণ্টার ক্রিং ক্রিং শব্দ। চায়ের স্টলগুলোতে আড্ডার আসর বসেছে। সবখানে লোকজনের চেঁচামেচি, হাঁটাহাঁটির শব্দ। কয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে দূরে কোথাও।
সুস্মিতা যখন প্ল্যাটফর্মে পা রাখলো, তখন এই সমস্ত আওয়াজ ভেদ করে তার কানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দটা খুব তীব্র শোনালো।
ঠাণ্ডা বাতাস। মেয়েটা একটু শিউরে উঠলো, কুঁচকে থাকা ওড়নাটা দিয়ে ভালোভাবে মাথা ঢাকলো। আশেপাশে তাকালো। চিরচেনা স্টেশনটাকে নতুন করে দেখলো সে।
এই দীর্ঘ সময়ে অনেককিছুই বদলে গেছে, বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। নব্বই দশকের ঐ সময়টার চিহ্ন খুব একটা অবশিষ্ট নেই। তবুও সে বড় বড় চোখে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করলো, যতোদূর পর্যন্ত তার দৃষ্টি যায়।
স্টেশনের বাতিগুলোর একরঙা ঘোলাটে আলোয় সব কেমন যেন স্বপ্নীল দেখালো।
“আপু? আসো।”
মেয়েটা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে আব্বু-আম্মুর পেছনে হাঁটতে শুরু করে। আরেকটা ভারী ব্যাগ হাতে নিয়ে বোনের পাশাপাশি হাঁটতে থাকে সৌম্য, “সব দোকান তো খোলা। এক জায়গায় বসে চা খেয়ে রওনা দিলেই হতো।”
“স্টেশনে চা খাবি! ক্লাস সিক্সের বাচ্চার ঢং দেখলে বাঁচি না!”
“খ্যাঁচখ্যাঁচ করো কেন সবকিছুতে? আমি কিছু বললেই তোমার সমস্যা।”
জিনিসপত্রগুলো একটা অটোরিকশায় তোলা হলো। ততোক্ষণে আরও জোরে বাতাস বইতে শুরু করেছে। পুরো এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ কেটে গেছে।
তবে আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো কয়েকবার। তীব্র আলোয় অন্ধকার স্টেশনটা ক্ষণে ক্ষণে স্পষ্ট দেখালো।
অটোরিকশাটা বেশিদূর যায়নি। হঠাৎ করেই ঝুম বৃষ্টি নামলো। চারপাশ এখনও পুরোপুরি অন্ধকার হয়নি। দোকানগুলোতে আলো জ্বলছে। জেনারেটরের শব্দ শোনা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও মোমবাতি জ্বলছে। মার্কেটে ক্রেতাদের ঢল।
বেশ কিছু বড় বড় দালান গড়ে উঠেছে এদিকে। শহরটা প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে। তাছাড়াও আজ শেষ সেহরি।
গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই বৃষ্টিটা থেমে গেলো। একটা সরু রাস্তায় নেমে এলো অটোরিকশা। এদিকে বাড়িঘর ক্রমশ কমে এসেছে। ফাঁকা ফাঁকা লাগছে না তবু। এতো রাতেও পুরো পাড়া জেগে রয়েছে।
মেয়েটা উন্মুখ হয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো। আকাশ পরিষ্কার। অসংখ্য তারা দেখা দিলো সেখানে। এই উৎসবমুখর ব্যস্ত লোকালয়ে কয়েকটা জোনাকি উড়তে দেখা গেলো।
তারা যখন খন্দকার বাড়িতে পৌঁছালো, তখন রাত প্রায় সাড়ে ১১টা।
বারান্দার হলদে বাল্বের আলোয় ভেজা উঠোনটা চিকচিক করছে। মানুষগুলো ব্যাগপত্র নিয়ে বারান্দায় উঠে দাঁড়ালো। কলিংবেল চাপতেই দরজা খুললেন শাহরিয়ার হাসিব, কোলে এক বছর বয়সী তামিম।
“আসসালামু আলাইকুম। এতো দেরি করে আসলেন আপনারা!”
মৌমিতা ভেতরে এলেন, পায়ের স্যান্ডেল খুলে রাখলেন দরজার পাশে, “ছুটি পাওয়াই যায় না। আমাদের তাও আসা হয়। তোমরা তো আসোই না অনেকদিন হলো।”
“হ্যাঁ। আপনারা আরও আগে আসলে ভালো হতো। আমরা তো পরশু নীলফামারী যাচ্ছি।”
সুজয় অবাক হয়ে বললেন, “এতো তাড়াতাড়ি কেন? এসেছো, কয়েকটা দিন থাকো।”
সুস্মিতা হাসিবকে সালাম দিলো। তারপর আর থাকলো না বড়দের কথার মাঝে। তামিমকে দেখে তার গাল টিপে দিতে খুব ইচ্ছা করলো। কিন্তু তামিম খালুর কোলে থাকায় সে এই কাজটা করতে পারলো না!
খন্দকার বাড়িতে এখন তিনটা ঘর। রান্নাঘরের পাশের নতুন বড় কক্ষটা মার্জিয়া খন্দকারের। ভেতরে খালামণিকে এক ঝলক দেখে সুস্মিতা ওদিকেই এগিয়ে গেলো, “আসসালামু আলাইকুম।”
মার্জিয়া ছোট ছোট জামাকাপড়গুলো ভাঁজ করছিলেন, পাশ ফিরে হেসে বললেন, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম সুস্মি! এতো তাড়াতাড়ি এসেছো যে? আমি আরও ভাবলাম, ঈদের দিন আসবে তোমরা।”
সুস্মিতা ক্লান্ত ভঙ্গিতে কাঁধ থেকে ব্যাগ নামালো, “আব্বু যে ছুটি নিতেই চায় না! সেজন্যই এতো দেরি হলো।”
“আচ্ছা, ব্যাপার না। জামাকাপড় ভিজে গেছে নাকি? তাড়াতাড়ি বদলে ফেলো, নাহলে ঠাণ্ডা লাগবে। দরজাটা বন্ধ করো নাহয়।”
“হ্যাঁ, জামা বের করতে হবে। তাহমিদ, তৌকির—ওরা কোথায়?”
“ওরা আম্মার কাছে। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কথা শোনে না। তোমাদের আসার কথা শুনে আরও লাফালাফি শুরু করেছে।”
“তাহমিদ এবার ক্লাস ফাইভে না? ওর বৃত্তি পরীক্ষা আছে সামনে।”
মার্জিয়া হেসে বললেন, “পড়ার কথা তো শুনতেই পারে না। কতোবার বললাম যে তোমার সৌম্য ভাইয়ার কাছ থেকে কোনো বই এনে দেবো নাকি? পাত্তাই দেয় না।
তৌকিরকে আগামী বছর স্কুলে ভর্তি করাবো। এখন তো দেখছি, ও বড়টার চেয়েও বড় ফাঁকিবাজ। বইখাতা দেখলেই ওর পেটব্যথা করে।”
সুস্মিতা আফসোসের সুরে বললো, “কী আর করার? ছোটগুলো বেশি পাজি হয়।”
“কী! কী বললে?”
“আরে নাহ!” সে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসলো, “তোমাকে বলিনি। তুমি বাদে।”
“আচ্ছা, তাহলে ঠিক আছে।” মার্জিয়া ফিক করে হাসলেন, খাট থেকে উঠে দাঁড়ালেন, “তুমি তাহলে কাপড় চেঞ্জ করো। আমি আপাদের সাথে দেখা করে আসি। কিছু তো খাওনি বোধহয়? ভাত দিচ্ছি গরম গরম, কাপড় বদলে খেতে আসো।”
মেয়েটা মাথা নাড়লো। খালামণি বেরিয়ে যেতেই দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিলো সে। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিলো।
এই ঘরটা বেশ আলাদাভাবে সাজানো। পড়ার টেবিলটাতে মোটা মোটা ইংরেজি বই। দেয়ালে আড়াআড়ি তিনটা ছবি। মাঝখানের ছবিটাতে শুধু মার্জিয়া। পরনে সাদা শাড়ির উপরে কালো কোট, গলায় সাদা রঙের কলার ব্যান্ড। পেছনে আদালত প্রাঙ্গণ।
ছবিটা বিয়ের আগের, নাকি পরের—বোঝা গেলো না।
—————
সেহরির পর ফজরের নামাজ পড়ে সুস্মিতা আবার ঘুমিয়েছিলো। যখন ঘুম ভাঙলো, তখন ঘড়িতে প্রায় ১০টা বাজে। বাহিরটা তবুও অন্ধকার। মুষলধারে বৃষ্টি। ছোটদের মধ্যে সে ছাড়া সম্ভবত আর কেউ ওঠেনি।
এই ঘরটা মৌমিতার। অনেককিছু বদলে গেছে। জানালায় এখন কাঠের কপাটের পরিবর্তে স্বচ্ছ কাচ। গ্রিল লাগানো হয়েছে অবশেষে।
গতরাতে মেঝেতে বিছানা করা হয়েছিলো। সুস্মিতা নিচেই ঘুমিয়েছিলো।
বাতি নেভানো। আম্মু আর খালামণি উঠে চলে গেছেন। ঘর প্রায় ফাঁকা। শুধু সে আছে, আর খাটের উপর তামিম হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে।
বাচ্চাটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মেয়েটা উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরালো। বাহির থেকে আসা নীলচে আলোয় ভেসে গেলো ঘরটা।
মেঘের চাপা গর্জন শোনা গেলো। তামিম একটু নড়েচড়ে উঠে আবার শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লো।
সুস্মিতা তাকালো বাইরে, জানালার কাচে বৃষ্টির পানি পড়ে জমেছে ফোঁটায় ফোঁটায়। ঐপাশটা আবছা দেখা যাচ্ছে।
বড় কামরাঙা গাছটার পাশে একটা পেয়ারা গাছ, চারিদিকে ফুলের বাগান। সেই বাগানের এক মাথায় কবরটা। চারপাশে সিমেন্টের অনুচ্চ দেয়াল। তাতে মরহুমের নাম লেখা—মারুফ খন্দকার।
বাড়ির সীমানায় প্রাচীর তুলে দেওয়া হয়েছে। শ্যাওলা জমেছে সেখানে। তবে দেখতে মন্দ লাগছে না। জায়গাটা একেবারে সবুজ। তাকালেই চোখ জুড়িয়ে যায়।
খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ বাকি আছে। মেয়েটার মন খচখচ করছে এ কারণেই। আম্মুকে এখনও চিঠিটা দেখানো হয়নি। সুযোগই আসেনি। মৌমিতা কাল থেকেই ভীষণ ব্যস্ত। এমন গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে আলাপ করার ফুরসত আসেনি। আজ হয়তো তিনি একটু ফাঁকা সময় পাবেন।
মেয়েটার ভাবনায় ছেদ পড়লো। বিদ্যুৎ চমকালো বিকট শব্দে। তামিম কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতেই নিজ দায়িত্বে উঠে বসলো সে। চোখ ঘষতে লাগলো।
সুস্মিতা ধীরপায়ে কাছে এলো। সামনে গিয়ে সুযোগ বুঝে তাকে কোলে তুলে নিলো, “কাঁদছো কেন? এই যে, আপু এখানে...”
তামিমের কান্না থামলো, সে আঙুল দিয়ে দরজার দিকে ইঙ্গিত করলো, “মা।”
“মায়ের কাছেই তো থাকো সারাদিন। এখন যাওয়া হবে না।”
ছেলেটা আবার ঠোঁট উল্টে কাঁদতেই যাচ্ছিলো, সুস্মিতা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললো, “আচ্ছা আচ্ছা, চলো, নিয়ে যাচ্ছি।”
বসার ঘরে সোফায় বসে কথা বলছিলেন রাবেয়া, আর তার দুই মেয়ে। তাদের গল্পগুজবের মাঝখানে ঢুকে পড়লো সুস্মিতা, “খালামণি, ও কান্না করছে।”
মার্জিয়া তামিমের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, “করুক! কালকে সারারাত ঘুমাতে দেয়নি বেয়াদবটা। খালি খামচি দেয়।”
তামিম হাত বাড়ালো তার দিকে, “মা, মা—”
মৌমিতা বলে উঠলেন, “আহারে! কতো সুন্দর করে ডাকছে। আসো তো আব্বু, তুমি খালামণির কাছে আসো।”
সুস্মিতা বাচ্চাটাকে নিজের মায়ের কাছে হস্তান্তর করলো, তারপর তার পাশেই বসে পড়লো। তামিম আর কাঁদলো না ঠিকই; কিন্তু হাত-পা ছোড়াছুড়ি করলো, নিজেকে মুক্ত করে মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলো।
মৌমিতা হেসে হেসে বললেন, “চোখদুটো কতো বড় হয়ে গেছে কাঁদতে কাঁদতে! এটা একদম তোর মতোই হয়েছে মার্জু। চুপচাপ বসে থাকতে পারে না, খালি নড়াচড়া করে। তুইও অনেক জ্বালাতন করেছিস এই বয়সে।”
মার্জিয়া সোফায় হেলান দিলেন, “আমার ওরকম বয়সে তুমি কতোটুকু ছিলে? এখন তো মনেই থাকার কথা না। আমি যথেষ্ট ভদ্র ছিলাম। তাই না আম্মা?”
রাবেয়া হেসে উঠলেন, নাতির দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, “দেখি বাবু...” তিনি তামিমকে নিজের কোলের উপর বসালেন, “তোমার আব্বার মতো হয়েছে দেখতে।”
“কার আব্বা? ওর, নাকি আমার? হাসিবের মতো হয়নি।”
“হাসিব না, তোমার আব্বার কথা বলছি।”
“হ্যাঁ, মিল আছে একটু। তবে আপার ঐ ছেলেটা পুরোই আব্বার—”
রাবেয়া খাতুনের চোখ রাঙানি দেখে মার্জিয়া চুপ করলেন। আড়চোখে আপার দিকে তাকালেন।
মা-বোনকে নিজের দিকে অমন করে চেয়ে থাকতে দেখে মৌমিতা সামান্য হেসে সোজা হয়ে বসলেন। শান্তভাবে বললেন, “এতো চিন্তার কিছু নেই। আর লুকানোরও কিছু নেই। আমি জানি।”
রাবেয়া ভ্রু কুঁচকালেন, বিষয়টা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করলেন, “আরে, মার্জুর খালি উল্টাপাল্টা কথা। কী জানো তুমি?”
“এটাই। আমার প্রথম ছেলেটা আব্বার মতো দেখতে হয়েছিলো।”
হকচকিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন রাবেয়া। সুস্মিতা চুপচাপ বসে রইলো মাথা নিচু করে। এসব কথার মাঝখানে উপস্থিত থাকা ঠিক হবে কিনা—বুঝতে পারলো না। যদিও তার অনেক কৌতূহল হচ্ছে।
মার্জিয়া অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসলেন, “তোমাকে এই কথা কে বলেছে?”
“ফ্যামিলির ভেতরকার কোনো মানুষ তো বলেনি। জেনেছি আরকি, বলেছিলো একজন।”
“কে বলেছে?”
“ঐ যে... নাসরিন। আব্বা যখন রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি ছিলেন, একজন নার্স দেখাশোনা করতো না? ও আমার ডেলিভারির সময়েও ছিলো। আমাকে এসে বলেছিলো, ম্যাম, আপনার ছেলেটা অনেক সুন্দর হয়েছে। একদম আপনার আব্বার মতো দেখতে।
ঐ সময়ে আমি একটু ঘোরের মধ্যে ছিলাম। কাউকে যে আবার জিজ্ঞেস করবো, এটাও মাথায় আসেনি। পরে কেউ আর বললোও না। তাই জানতেও চাইনি। স্বপ্নে দেখতাম অবশ্য, আমার ছেলেটা ওরকমই দেখতে... আব্বার মতো।”
মৌমিতা চুপ করলেন। বাকিরাও চুপচাপ বসে রইলো। শুধু তামিম তার মায়ের দিকে দুই বাহু ছড়িয়ে কেঁদে উঠলো, “মা...”
আজ বিকেলবেলা ইফতারের আয়োজন করতে করতে সুস্মিতার ঘাম ছুটে গেছে। আগে সে এতো কাজ করতো না। চিৎপটাং হয়ে কোনো একদিকে পড়ে থাকতো। ইদানিং নিজেকে একটু কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে আরকি!
সব ইফতার তৈরি করে টেবিলে রাখা হয়েছে। অথচ মাগরিবের আজান দেয়ার প্রায় আধঘণ্টা বাকি রয়েছে এখনও।
টেলিভিশনে রমজান উপলক্ষে কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান চলছে। সেদিকে কারও মনোযোগ নেই। রাবেয়া দুই জামাইয়ের সাথে কী নিয়ে যেন আলাপ করছেন।
সামনের ঘরটার মেঝেতে ছেলেগুলো পাটি বিছিয়ে বসে গেছে। তাদের মাঝে আবার তামিমও গিয়ে ঢুকেছে। খোলা দরজা দিয়ে তাদের দেখা যাচ্ছে সরাসরি। ঘরটাকে একেবারে এলোমেলো করে দিয়েছে ওরা।
সুস্মিতা মনমরা হয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। মার্জিয়া শরবতের জগটা নিয়ে পাশে এসে দাঁড়াতেই সে বলে উঠলো, “খালামণি? তোমার যদি একটা মেয়ে থাকতো, কতো ভালো হতো।”
“আমিও তো চেয়েছিলাম, একটা মেয়ে হোক। সারাদিন সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতাম। আমার মেয়ে বাচ্চার খুব শখ। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা। কারও কারও তো কিছুই থাকে না।
ও হ্যাঁ... ভালো কথা, তোমার হাতে কিন্তু মেহেদী পরিয়ে দেবো ইফতারের পর। কালকেই ঈদ। হাতটা একেবারে ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।”
“আচ্ছা—”
সৌম্য পাটির এক কোণে বসে ছিলো। সে হঠাৎ দরজার দিকে তাকিয়ে হাত উঁচিয়ে বললো, “আসসালামু আলাইকুম মামা।”
জুনায়েদ ভেতরে এলেন, সালামের উত্তর দিলেন। তার পিছু পিছু এলেন আসমা। সুস্মিতা সালাম জানিয়ে সরে দাঁড়ালো, সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে খালামণির দিকে তাকিয়ে রইলো।
এই মানুষদুটোকে আগেও কি এমন মুখোমুখি দেখা গিয়েছিলো? কখনোই তো মনোযোগ দেওয়া হয়নি, কিছু খেয়ালও করা হয়নি।
“মাহফুজ ভাই, কখন এসেছেন?”
সুজয় সোফা থেকে উঠে এগিয়ে এলেন, জুনায়েদের সাথে করমর্দন করে বললেন, “গতকাল রাতেই আসলাম। আপনারা আবার এতোকিছু আনতে গেলেন কেন?”
“আজকে শেষ রোজা। ভাবলাম, কিছু নিয়ে আসি। আপনারাও যে এসেছেন, এটা জানতাম না। ভালোই হলো। কালকে আবার দেখা হচ্ছে তাহলে।”
“বসেন। ইফতার করে যান।”
মার্জিয়া শান্তভাবে সম্মতি জানালেন, “হ্যাঁ, বসেন। এসেছেন যখন, ইফতার করে যান। আবার কবে দেখা হবে, কে জানে? বসেন ভাবী। আপনাকে তো দুই বছর পর দেখলাম।”
আসমা মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, কতোদিন পর এসেছো তোমরা! আমাদের ঈদ ছাড়া তেমন আসা হয় না এখানে। আর তোমরা তো শ্বশুরবাড়িতেই ঈদ করো। এবার ভালো হয়েছে।” তিনি আশেপাশে তাকালেন, “তোমার পিচ্চিগুলো কোথায়?”
“আছে, আপার ঘরে। আপনি এখন বসেন তো ভাবী। একসাথে ইফতার করি।”
“এবার হবে না, থাক। ওনার আব্বা একা আছেন বাড়িতে। আমরা আসি।”
অতিথিরা আর দাঁড়ালেন না।
অল্প সময়ের ব্যবধানে সবাই খাওয়ার টেবিলে এসে হাজির হলো। আজান দেবে কিছুক্ষণের মধ্যে।
সুস্মিতা বসে থাকা অবস্থাতেই চেয়ারটা একটু চাপিয়ে নিলো, মায়ের দিকে সরে বসলো। ঘাড় ঘুরিয়ে ফিসফিস করে ডাকলো, “আম্মু?”
মৌমিতা মেয়ের দিকে তাকালেন, “হুম?”
“জুনায়েদ মামার তো কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি, না?”
“না।”
“ঝামেলা হয় না এটা নিয়ে?”
“উঁহু। ওরা ভালো আছে। কে কী বললো—ওসব নিয়ে ভাবে না। আর ভাবা উচিতও না। সমাজের কথা শুনতে গেলেই জীবন শেষ।”
“হুম।” মেয়েটা মাথা নাড়লো, “তোমাকে একটা জিনিস দেখাবো আম্মু।”
“কী?”
“এখন না। রাতে খাওয়ার পর।”
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পর খন্দকার বাড়িতে একপ্রকার ঈদ শুরু হয়ে গেলো।
মসজিদ থেকে আসার সময় সৌম্যরা অনেক হাবিজাবি খাবার কিনে এনেছে। বাকিদের মাঝে সেগুলো বিলিয়ে দিয়েছে। এখন সবাই মিলে বাড়িটাকে মাথায় তুলে রেখেছে।
খাটের উপর ভাগ্নিকে নিয়ে বসে পড়লেন মার্জিয়া। একটা বালিশ কোলে রেখে তার উপর সুস্মিতার হাতটা নিলেন। মেহেদী দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি একটু ঝুঁকতেই তামিম এসে মায়ের ঘাড়ের উপর ওঠার চেষ্টা করলো। মার্জিয়া রেগে উঠে বললেন, “অ্যাই তাহমিদ! ওকে সরা তো এখান থেকে। কী একটা বড় ভাই হয়েছে, কোনো কাজে লাগে না!”
তাহমিদ ঘ্যানঘ্যান করতে লাগলো, “ও অনেক ডিস্টার্ব করে আম্মু, তোমার কাছেই থাক—”
তার কথা শেষ না হতেই সৌম্য এসে ছোঁ মেরে তামিমকে কোলে তুলে নিলো। তাকে একবার শূন্যে ছুঁড়ে আবার খপ করে ধরে ফেললো। তামিম হয়তো বেশ মজা পেলো সেটাতে, জোরে জোরে হেসে উঠলো।
সুস্মিতা ধমক দেয়, “ওরকম করছিস কেন বাচ্চাটার সাথে? ব্যথা পাবে তো।”
সৌম্য বোনের দিকে ঘুরলো, “তোমার সাথে কিছু করেছি?”
“থাপ্পড় খাবি!”
মার্জিয়া মুখ না তুলেই ধীরে সুস্থে বললেন, “সমস্যা নেই। তামিমের অভ্যাস আছে। ওর বাবা তো রীতিমতো সার্কাস দেখায় ওকে নিয়ে। খালি সিলিংয়ের সাথে যেন না লাগে, দেখো!”
সুস্মিতা নিজের হাতের দিকে এক ঝলক দেখে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো, “তোর পকেটে ওগুলো কী?”
“কোনগুলো?” বলে সৌম্য নিজের পকেটের দিকে তাকায়। সাদা পাঞ্জাবির ভেতর লাল মার্বেল সদৃশ কিছু দেখা যাচ্ছে, অনেকগুলো থাকায় পকেটটা ফুলে গেছে।
তামিমকে এক হাতে কোলে নিয়ে সৌম্য পকেটে হাত ঢোকায়। কয়েকটা রক্তচন্দনের বীজ বের করে বোনকে দেখায়, “এগুলো? মসজিদের ওখানে গাছ আছে। কুড়িয়ে আনলাম।”
“কী—”
“তেলাপোকার ডিম।”
“কী করবি এগুলো?”
“তামিমকে খাওয়াবো।”
সৌম্য মেঝের উপর বসে পড়লো, ছোট ভাইটাকে নিজের কোলে বসালো।
মার্জিয়ার মেজো ছেলে তৌকির নিজের সংগৃহীত সব খেলনা দেখাচ্ছে। ছোট ছোট গাড়ি, প্লাস্টিকের তৈরি বল-জাতীয় জিনিস।
সুস্মিতা ভুলে গেলো, তার হাতে মেহেদী দেওয়া হচ্ছে। হাতটাকে অনুভবই করলো না যেন। সে একদৃষ্টে নিজের ভাইগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো।
তামিম বারবার খেলনাগুলো হাতে নিয়ে মুখে ঢোকানোর চেষ্টা করছে। সৌম্য প্রতিবারই ধৈর্য সহকারে তার হাত থেকে সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছে, শান্ত স্বরে বলছে, “মুখে দিও না ভাইয়া, এগুলো খাওয়ার জিনিস না।”
—————
১৮ জুলাই।
শনিবার।
ঈদের সকাল। বাসায় তামিম ব্যতীত কোনো পুরুষ মানুষ নেই। রাবেয়া খাতুন বারান্দায় বসে আছেন। কিছু প্রতিবেশী এসেছেন তার সাথে কথা বলতে।
মৌমিতা আর মার্জিয়া হয়তো রান্নাবান্নার কাজ সামলাচ্ছেন।
সুস্মিতা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মুখের উপর থেকে ভেজা চুলগুলো সরিয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালো।
এই জামাটা সে আব্বুর পছন্দে নিয়েছে। সুজয় এসব বিষয় থেকে এমনিতে একশো হাত দূরে থাকেন। সবসময় কেমন যেন বেরসিক সেজে বসে থাকেন! তবে তার পছন্দের তারিফ করতে হয়।
“সেমাই খেলে না সুস্মি?” মার্জিয়া দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন, অবাক হয়ে বললেন, “বাহ! দারুণ লাগছে তো। মাশাআল্লাহ।”
সুস্মিতা হেসে বললো, “এটা আব্বু পছন্দ করেছে। আগে কখনোই শপিংয়ে যেতো না, এই প্রথম গেলো।”
“ওহ। ডাক্তার সাহেব এই প্রথমবার এতো বড় রিস্ক নিলেন? তবুও ভালো জিনিসই নিয়েছেন। অনেক সুন্দর মানিয়েছে—”
মেয়েটা কিছু বলার আগেই খাওয়ার ঘর থেকে ডেকে উঠলো কেউ, “মর্জিনা? কই থাকো তুমি? বাবু কান্না করছে...”
মার্জিয়া একবার পেছনে তাকিয়ে আবার সামনে ঘুরলেন, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, “আজকে তোমার খালুর কপালে অনেক দুঃখ আছে!”
তিনি খাওয়ার ঘরের দিকে ছুটলেন। ছেলেগুলো বোধহয় ঈদগাহ থেকে ফিরে এসেছে। চেঁচামেচির আওয়াজ হচ্ছে।
সুস্মিতা খাটের এক কোণে বসে পড়লো। সৌম্য তার বাহিনী নিয়ে হাজির হলো বড় বোনের সামনে। হাত বাড়িয়ে ভারী গলায় আদেশ করলো, “দাও।”
মেয়েটা ভ্রু কুঁচকালো, “তোর এতো খারাপ দিন আসলো যে ভিক্ষা করতে হচ্ছে?”
“আরে ফালতু কথা বলো কেন! সালামি দাও।”
“তুই পা ছুঁয়ে সালাম কর, তাহলে দেবো।”
“ওভাবে সালাম করা যায় না।”
“করলে পাবি, না করলে পাবি না। সোজা কথা।”
সৌম্য কিছুক্ষণ ভাবলো। তারপর তাচ্ছিল্য করে হেসে বললো, “লাগবে না সালামি। আমরা অহংকারী মানুষের কাছে টাকা নিই না। চলো সবাই!”
দলনেতার নির্দেশ পেয়ে, তাহমিদ আর তৌকির গম্ভীর ভঙ্গিতে ঘুরে হাঁটতে শুরু করে। তাদের কার্যকলাপ দেখে সুস্মিতা শব্দ করে হেসে ওঠে।
চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়ার পর, কী যেন ভেবে আবার ফিরে এলো সৌম্য। পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে বোনের হাতে দিলো, “যাও, আমিই সালামি দিলাম। ধন্যবাদ দিতে হবে না।”
সে চলে যেতে উদ্যত হতেই সুস্মিতা ডেকে ওঠে, “সৌম্য? এদিকে আয়, শোন।”
“কী?”
“আরও চকলেট আছে?”
“হ্যাঁ।”
“আব্বু আর আম্মুকেও দে।”
ছেলেটা বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে মাথা দোলায়, “আচ্ছা দেবো। কিন্তু আম্মু তো চকলেট নিতে চায় না।”
“এবার দিয়ে দ্যাখ। নিতেও পারে। না নিলে জোর করে দিবি।”
দুপুরের রান্নাবান্না তখন শেষ। খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে বিকেলে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রাবেয়ার ঘরে আলোচনা সভা বসেছে।
সুস্মিতা ঐ ঘরের চৌকাঠে এসে ভেতরে উঁকি দিলো। কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে পাওয়া গেলো না এখানে। রাবেয়া ডেকে উঠলেন, “সুস্মি? ভেতরে আসো, এই যে এখানে বসো।”
“জ্বী নানি, আসছি। একটু কাজ আছে।”
মেয়েটা রান্নাঘরে গেলো, খালামণির ঘরে দেখলো। পুরো বাসা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাকে পেলো না।
বারান্দায় এসে উঠোনের দিকে তাকালো, মেহগনি গাছটার চারপাশে খুঁজলো, পেছনের বাগানে খুঁজলো। আম্মু কোথাও নেই।
কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে আঙিনার দরজাটার কাছে এসে দাঁড়ালো।
রাস্তা দিয়ে অনেক মানুষ যাচ্ছে। ছোট বাচ্চাগুলোর হাতে বেলুন, কেউ কেউ বিকট শব্দে ভেঁপু বাজাচ্ছে।
মেয়েটা গেইটের বাইরে বেরিয়ে আসে।
বাড়ির প্রাচীরটার পেছনে অনেকদূর পর্যন্ত ফাঁকা জায়গা। বিস্তৃত ফসলের মাঠ। যদিও আয়তন আগের চেয়ে অনেকখানিই কমে এসেছে। এখনও এই জমিতে ধান চাষ করা হয়। আশেপাশে নতুন বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। তবে সরু কাঁচা রাস্তাটা আর পুকুরটা প্রায় আগের মতোই আছে।
সেদিকে তাকাতেই দৃশ্যটা দেখতে পারলো সুস্মিতা।
পুকুরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজোড়া মানুষ। অদ্ভুতভাবে, উভয়ের বয়সই অনেক কম দেখাচ্ছে। যেন কোনো সদ্য বিবাহিত দম্পতি। দূর থেকে তাদের অভিব্যক্তি ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। ওখানে দাঁড়িয়েই তারা শান্তভাবে কথা বলছে। পৃথিবী থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন মনে হলো তাদের।
মৌমিতা খন্দকারের ঘর।
জানালা খোলা থাকায় বেশ আলোকিত দেখাচ্ছে চারপাশ। জানালার ঐপাশে শ্যাওলা পড়া প্রাচীর, একটা কামরাঙা গাছ, ফুলের বাগান। সবুজের সমারোহে একটা ছোটখাটো গোরস্তান।
দমকা হাওয়া বইছে। পাতার খসখসে আওয়াজ আসছে। সাথে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ। আকাশে কিছু শুভ্র মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে।
সুস্মিতা জানালার পাশে গিয়ে বসলো। পাশের ঘর থেকে হাসাহাসির আওয়াজ আসছে এখনও। বৈঠক শেষ হয়নি। ঘোরাঘুরির প্রসঙ্গ বদলে গেছে। নানি হয়তো পুরোনো দিনের কোনো গল্প শোনাতে শুরু করেছেন।
মেয়েটা টেবিলের উপর রাখা ব্যাগটা নামিয়ে কোলের উপর রাখলো। সামনের পকেট থেকে বের করলো ভাঁজ করা একটা চিঠি। তারপর সযত্নে তার ভাঁজ খুলতে শুরু করলো।
পুরোনো কাগজটার ভাঁজ পড়া জায়গাগুলো এমনিতেই দুর্বল। সামান্য টান দিতেই চিঠিটা ছিঁড়ে দুই ভাগ হয়ে গেলো। সে খুব যত্ন সহকারে সেটাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করলো। সেগুলোকে এক হাতের মুঠোয় রাখলো।
ঐ মুষ্টিবদ্ধ হাতখানি জানালার বাইরে মেলে ধরলো সুস্মিতা। কাগজের টুকরোগুলি বাতাসে যত্রতত্র উড়তে লাগলো। ছন্নছাড়া, ঠিকানাহীন।
·
·
·
চলবে……………………………………………………