যেই চোখে দুনিয়া রঙিন লাগত,
আজ তাকে দেখে দুনিয়া ফিকে লাগছে।
বিদেশের মাটিতে দাওয়াত-নিমন্ত্রণ যেন খুবই স্বাভাবিক বিষয়। এক বাঙালি পরিবারের বাড়ি আরেক বাঙালি পরিবারের দাওয়াত। একজন আরেকজনের এই দাওয়াতের পর্ব চলতেই থাকে। যেন ভিনদেশে নিজেদের মতো করে কাটানোর, দেশি ভাব নেওয়ার আমেজ চলে। দেশি খাবার, দেশি ঘ্রাণ, দেশি মানুষের ভাষা, দেশি স্বস্তি সবই যেন এই দাওয়াত নামক আয়োজনে নি হি ত।
ইসমাত পুরো রাস্তায় লক্ষ্য করেছে সাহিদ ঘনঘন চাইছিল তার দিকে। ওইযে ছ্যাঁচড়া ধরানার একটা নজর আছে না, ওমন না। এই নজরে ভিন্ন কিছু ছিল। সম্ভবত একরাশ মুগ্ধতার ঘোর? যা ইসমাতের অস্বস্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তার মতো আত্মসম্মানী, প্রচন্ড কনফিডেন্সে ভরপুর মেয়েও আজ কেমন অপ্রস্তুত হচ্ছে, নজর লুকাচ্ছে। ছেলেটা এই নজরে দেখছে কেন তাকে? মতলব কি? ইসমাত জানে, সাহিদ কমপ্লিমেন্ট দেওয়ার মানুষ নয়। কখনো তার রান্নার প্রশংসাও করেনি ছেলেটা। সাহিদ কখনোই তার দিকে ঘনঘন চাইত না, আজ বুঝি তাকে সুন্দর লাগছে?
শাবাবের বাড়িটা প্যারিসের একটু ভেতরের শহরে। এখান থেকে আইফেল টাওয়ারকে দেখতে পাওয়া অসম্ভব। ওরা প্রায় পঁচিশ তলা বিল্ডিং এর তেরো তলার এপার্টমেন্টে থাকে। ওরা লিফটে উঠতেই সাহিদ ঘোরের মাঝেই বাটন টিপল। পরপর আবারও তাকাল ইসমাতের দিকে। ইসমাত দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল। কিছু একটা বলতে চাইছে, প্রসঙ্গ ভিন্ন টানতে চাচ্ছে কিন্তু বিশেষ লাভ হচ্ছে না। গলায় কথারা কেমন দলা পাকিয়ে আছে।
বাড়িতে বাড়িওয়ালির সামনে সাহিদ যা বলেছিল তাতে ইসমাতের মুখে লাজ ভীড় জমিয়েছিল, সেখান থেকেই মূলত তাকিয়ে থাকার সূত্রপাত। যখন আর সহ্য করতে পারছে না। তখন কাট কাট গলায় বলল,
--"অন্য দিকে তাকাও।"
--"আচ্ছা।"
কিন্তু সাহিদের নজর বিন্দুমাত্র নড়ল না। ইসমাত এবার চোখ পাকিয়ে তাকাল।
--"ফাজলামো পেয়েছ?"
--"ভেরি গুড, এবার দেখতে সুবিধা হচ্ছে।"
ইসমাত হতভম্ভ, দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। তবুও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে জানাল সাহিদের নজরের নড়চড় হয়নি। মহা মুসিবত তো দেখছি। সাহিদ গলা নামিয়ে বলল,
--"শুকুরিয়া করুন আপনাকে শুধু আমিই দেখছি। অন্য কেউ দেখছে না।"
--"কেন? অন্য কেউ দেখলে কি করবে?"
সাহিদ এই উত্তরে নিশ্চুপ। প্রশ্নটা খুব সুন্দর করেই এড়িয়ে গেল। তেরো তলায় আসতেই লিফট থেমে গেল। বেরিয়ে আসতেই সাহিদের কল এলো বাংলাদেশ থেকে। মাহফুজ সাহেব কল করেছেন। সাহিদ কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মাহফুজ সাহেব বলে উঠলেন,
--"কোথায় আছ?"
--"শাবাব ব্রোর ফ্লোরে।"
--"কিছু নাওনি সাথে করে?"
ওই কথাটুকু বুঝি ইসমাতও শুনল। সঙ্গে সঙ্গে সে কপালে হাত দিল। ধুর! সাহিদের চক্করে সে গিফট কিনতেই ভুলে গেছে। এভাবে খালি হাতে কারো বাড়ি যাওয়া যায়? রাগ হলো এবার চরম! চিবানো নজরে তাকাল সাহিদের দিকে। সাহিদ এতে অপ্রস্তুত হলো। বাবাকে বলল,
--"নেইনি কিছু! কেন? কি নিব?"
ওপাশ থেকে মাহফুজ সাহেব বুঝি হতাশার নিঃশ্বাস ফেললেন। এই গাধা ছেলে জানেই না কারো বাসায় গেলে হাতে কিছু নিয়ে যেতে হয়। জানবেই বা কেমন করে? সবসময় তো নিজের বাড়ি আর ফ্ল্যাটই করেছে। কখনো ঘটা করে কারো বাড়ি গিয়েছে নাকি? বন্ধুদের বাড়ি যাওয়া-আসা হলেও খালি হাতেই যেত। মাঝেমধ্যে মাহফুজ সাহেব তাদের জন্য উপহার পাঠাতেন, এই যা। এই বেকুবটার যে এখনো কতকিছু শেখা বাকি!
বাবার এক দফা বকাঝকা শুনে সাহিদ কল কেটে দিলেন। সাহিদ ইসমাতের দিকে তাকাতেই দেখল ইসমাত আবারও লিফটের দিকে যাচ্ছে। সাহিদ পিছু নিল।
--"আরে, কোথায় যাচ্ছেন?"
ইসমাত জবাব দিল না। সাহিদ তবুও পিছু ছাড়ল না। ইসমাত খুঁজে খুঁজে কিছুটা এগিয়ে গেল। সেখান থেকে ডেজার্টসহ বাচ্চাদের জন্য গিফট কিনল। সবটা র্যাপিং করিয়ে আবারও গেল শাবাবদের বাড়ির উদ্দেশে। বেচারা ইতিমধ্যেই কল করতে করতে হয়রান। আবার তার বস আর ইসমাত হারিয়ে গেল নাকি? নাকি বাড়িই খুঁজে পায়নি। উনি আছেন অন্য চিন্তায়।
সাহিদ নীরবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করল। বিল অবশ্য সব তার কার্ড থেকেই কেটেছে। সাহিদ এতক্ষণে বুঝেছে ইসমাত কি করেছে। সে আরেকটা শিক্ষা নিল, কারো বাড়ি যেতে হলে খালি হাতে যাওয়া যাবে না। ইসকাত যা রেগে আছে, চেঁচামেচি তো দূর.. ম্যাডাম কথাই বলছে না। ওরা কিছুক্ষণের মধ্যে শাবাবদের বাড়ি এলো। শাবাব এবং তার স্ত্রী বিনয়ের সাথে তাদের স্বাগতম জানাল। দুই রুমের একটা ফ্ল্যাট, ছোটো লিভিং। লিভিং ডাইনিং একসাথেই। আর লাগোয়া কিচেন। লিভিংরুমের মেঝে বাচ্চাদের খেলনা দিয়ে ভর্তি।
ওনার স্ত্রী তা আবার গোছাতে গোছাতে বলল,
--"সো সরি, আমি রান্নাঘরে ছিলাম আর বাচ্চাদের বাবা ছিলেন ভেতরের রুমে। আপনাদের কল করছিল। কখন যে বাচ্চারা আবার খেলনা দিয়ে ঘর অগোছালো করেছে কেউ টের পাইনি।"
ইসমাত হাসল। সাহিদ ততক্ষণে খেলনা সরিয়ে একপাশের সোফায় বসেছে। স্বভাবতই পায়ের ওপর পা তুলে। ইসমাত যখন শাবাবের স্ত্রীকে সাহায্য করতে নিচ্ছিল, মেয়েটা চমকে গেল। বয়সে সম্ভবত ওরা সমবয়সী।
--"ছি ছি আপু। কি করছেন? আপনি ভাইয়ার পাশে বসুন। আমি করে নিচ্ছি।"
শাবাব স্ত্রীকে শুধরানোর জন্য ডাকতে চাইলেন। কিন্তু সাহিদ তাকে ইশারায় থামিয়ে দিল। ভাইয়া, আপু ডাকছে ডাকুক। ঘরের মধ্যে বস, ম্যাম শুনতে তার ভালো লাগে না। তবুও সাহিদ শুধরে দিল,
--"আপু যেহেতু ভাইয়া ডেকেছেন। মিসেসকে ভাবী ডাকলে খুশি হবো।"
শাবাবের স্ত্রী নেহা মুখ চেপে হাসলেন। ইসমাত অপ্রস্তুত হলেও মুখে তা প্রকাশ পেল না, সে এখনো চরম রেগে আছে। যতই অন্যদের সাথে হেসে কথা বলুক না কেন!
নেহা মুচকি হেসে বলল,
--"আপনাকে অভিযোগ করার সুযোগ দেব না ভাইয়া।"
শাবাবের বাচ্চারা তখনই এলো। চুপিচুপি দেখল মানুষ দুটোকে। কিছুটা সময় পেরোতেই দুজন মিশে গেল ইসমাত আর সাহিদের সঙ্গে। সাহিদ বাচ্চা-কাচ্চা পছন্দ করে না। কিন্তু আজ ইসমাত রেগে বিধায় মুখ ফুটে কিছু বলল না। বাচ্চাদের বয়স একজনের পাঁচ আরেকজনের তিন। মেয়েটা ছোটো। সাহিদকে তার পছন্দ হয়েছে। সাহিদ এমন একজন মানুষ, ছোটো থেকে বড় সব মেয়েদেরই পছন্দ হয়ে যায়। মেয়ের এমন সাহিদের সাথে লেগে থাকা দেখে নেহা মুচকি হেসে বলল,
--"একটা বাচ্চা নিয়ে নিন না ভাইয়া। মেয়ে হলে তো বাবার পিছুই ছাড়বে না।"
কি হলো কে জানে, সাহিদ বিষম খেল। শাবাব ছুটল পানি নিতে। ইসমাত না চাইতেও চাপা হাসল। এই হাসি কেউ দেখল না। বাচ্চা মেয়েটা ওর মাথায় ছোটো হাতে বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
--"ডিংক ইত ডিংক ইত।"
এতে আরেক দফা হাসির রোল পড়ল শাবাব আর নেহার মাঝে। ইসমাতও অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসল। আসলেই, বাচ্চারা কত নিষ্পাপ হয়। ইসমাতের এবার তুবার কথা মনে পড়ছে। এখানে আসার পর একবার বোধ হয় সারাহকে কল করেছিল সে। তুবার সে কি মিষ্টি হাসি। বারবার জিজ্ঞেস করছিল,
--"ইসমাত আন্তি কবে আসবে?"
—————
সাহিদ আর ইসমাত ফুটপাত ধরে হাঁটছে। গাড়িতে চড়বে না ইসমাত। এজন্য সাহিদ তার গাড়ির চাবি শাবাবকে দিয়ে এসেছে। যখনই আসে সে যেন গাড়িটা নিয়ে আসে। সাহিদ নিরিবিলি ইসমাতকে পরখ করছে। এখন রাস্তা পার হবে ওরা। ইসমাত সাহিদের থেকে দূরত্বে দাঁড়াল। দূরত্ব ঘুচাতে সময় নিল না সাহিদ। ট্রাফিক দিতেই ইসমাত যেতে চাইল, কিন্তু সাহিদ তার হাতটা টেনে ধরল। অনুভব করল ইসমাত কাঁপছে। মেয়েটা আজও জামার ওপর দিয়ে কোনো কোট নেয়নি। গাউনটা বেশ পাতলা, হাতাও ছোটো। সাহিদ জোরপূর্বক নিজের গায়ের জ্যাকেটটা খুলে ওকে পরিয়ে দিল। ইসমাত বিরক্ত হয়ে সরাতে চাইল। সাহিদ দিল ধমক,
--"এতটাও অবাধ্য হবেন না যা আমার মুখ খুলতে বাধ্য করবে।"
অগত্যা, ইসমাত নীরব হয়ে গেল। ট্রাফিক ততক্ষণে ছুটে গেছে। আবারও অপেক্ষা করতে লাগল। সাহিদের এই টাইম ওয়েস্টটা কেন যেন খারাপ লাগল না। গুণগুণিয়ে গান গাইছে সে। কিছুক্ষণের মধ্যে আবারও ট্রাফিক হলো। এবার ইসমাত যেতে চাইলে সাহিদ হাত টেনে নিয়ে বলল,
--"আমি পার করিয়ে দিচ্ছি।"
--"নিজেকে সামলাতে পারো না, আমাকে সামলাবে কোন মুখে?"
সাহিদ ইসমাতের দিকে ফিরল। বিকেলের পর অবশেষে মেয়েটা কথা বলছে। সাহিদ মিনমিন করে বলল,
--"নিজেকে না সামলাতে পারলে আপনার হাসবেন্ড হলাম কি করে?"
--"হাসবেন্ডকে আমার তো বাচ্চাদের মতোই পালতে হয়।"
--"তাহলে আসেন, এবার থেকে নাহয় আমিই আপনাকে পালব।"
--"হাত ছাড়ো সাহিদ।"
--"হোয়াই? প্রুভ দিতে হবে তো, আপনাকে আদৌ পালতে পারি কিনা।"
বলেই সাহিদ ইসমাতের হাত ধরে রাস্তা পার হলো।
—————
সেদিনের পাঁচদিন পেরিয়েছে। ইসমাত এখনো ঠিকঠাক তার সাথে কথা বলছে না। কিন্তু এদিকে সাহিদ বেশ অধৈর্য হয়ে আছে। এমন করে শাস্তি দেওয়ার মানে কি? আগের মতো বকুক মা রুক যা খুশি করুক, কথা বলছে না কেন? গতকাল তার কাউন্সিল গেল। আজকাল কেন যেন সাব্বিরকে আশেপাশে পাচ্ছে না। তার ওপর ইসমাতের রাগ। সাহিদ না পেরে এবার আকিবকে টেক্সট দিল। বন্ধুদের সাথে তার প্রায়ই কথা হয়। তবুও, আগের মতো না। সবার সাথে কেমন যেন দূরত্ব বেড়ে গেছে।
আকিব রিপ্লাই করতেই সাহিদ জিজ্ঞেস করল,
--"বউদের রাগ ভাঙায় কি করে?"
আকিব অবাক হওয়ার ইমুজি দিল।
--"বউ তো নেই, তবে গার্লফ্রেন্ড আছে।"
--"ফাজলামো করিস না তো। গার্লফ্রেন্ড আর বউয়ের পার্থক্য কি? মেয়েই তো রাইট?"
--"ওকে ওকে, লেট মি থিংক।"
আকিব সময় নিয়ে রিপ্লাই করল,
--"কিছু উপহার দিতে পারিস।"
--"সেটা কী?"
--"গর্ধব! এটাও বলে দেওয়া লাগবে? দূরে গিয়া মর!"
সাহিদ পরপর আরও কয়েকবার টেক্সট দিল। রিপ্লাই নেই। আকিব তখনই অনলাইন থেকে বেরিয়ে গেছে। এবার সাহিদের কপালে চিন্তার ভাজ। ইসমাতের পছন্দ-অপছন্দের কোনোপ্রকার ধারণাই নেই তার। সে কিই বা উপহার দিবে?
সাহিদ আশেপাশে ইসমাতকে খুঁজল। এখন প্যারিস সময় সকাল আটটা। আজ তার সকালেই ঘুম ছুটে গেছে। টেরেসে বসে নাস্তা করতে করতেই টেক্সট করছিল আকিবকে। কিন্তু ওই হারামিটাও ঠিকঠাক সাহায্য করতে পারল না। সে আবারও আশেপাশে সাব্বিরকে খুঁজল। সাব্বির ছাড়া কেউ তাকে কোনো সমাধান দেয় না। কিন্তু আজ সাব্বিরও নেই। কেন? মাথা ভার লাগছে এবার। মেইডকে আরেক কাপ কফির নির্দেশ দিল। সে পরপর তাকাল আইফেল টাওয়ারের দিকে। রোদ নেই, কেমন কুয়াশা ভাব চারপাশে। তবে সকালটা ভীষণ সুমধুর।
নিচ থেকে বিভিন্ন ক্যাফে/বেকারীর সুস্বাদু সব ডেজার্ট আর ব্রেডের ঘ্রাণ নাকে এসে বিঁধছে। সাহিদ নিশ্চিত কোনো ক্ষুদার্ত মানুষ যদি এখানে এসে দাঁড়ায়। এসব ঘ্রাণে উলটো সে ক্ষুদায় মা রা পড়বে। এজন্য সাহিদ সবসময় এখানে খাবার নিয়ে বসে।
কফি আরেক কাপ শেষ করতেই মেইডের দিকে তাকাল সে। সময় নিয়ে প্রশ্ন করল,
--"ইসমাত কোথায়?হ্যাঁ "
মেইড জানাল ইসমাত বাড়িওয়ালীর মেয়ের ব্রেড শপে গিয়েছে। সাহিদও তখনই রওনা দিল। যেতে যেতে অনলাইনে সার্চ করল মেয়ে বিষয়ক। কীভাবে একটা মেয়ের রাগ ভাঙানো যায়, তাকে খুশি করা যায় ইত্যাদি। সাহিদ এক জায়গায় দেখল, "প্রেমিকাকে বিশেষ নামে সম্বোধন করা।"
এটা দেখে সাহিদের কপাল কুঁচকে গেল। বিশেষ নাম? স্পেশাল ফিল করানো? সাহিদ ততক্ষণে ব্রেডের দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। পরপর দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। গিয়ে দেখল তার মিসেস কর্মচারীদের মতো একপাশে দাঁড়িয়ে কুকিজ বানাচ্ছে। তাকে বিভিন্ন রেসিপিসহ এটা ওটা বলে নির্দেশনা দিচ্ছে এ দেশের কোনো এক খুবই সুন্দরী মেয়ে। তার পাশেই আরেক মধ্যবয়সী মহিলা কাস্টমারদের এটা সেটা বিক্রি করতে ব্যস্ত। ফ্রন্ট গ্লাসে অনেক ধরণের বিভিন্ন ডেজার্ট, ব্রেড পেস্ট্রি সাজানো। অনেকগুলো বেশ নতুন তার জন্য। ভদ্রমহিলা আন্তরিক হেসে স্বাগতম জানাল ওকে।
সাহিদ এগিয়ে গিয়ে ইসমাতকে দেখল। ইসমাত তাকাতেই দেখল সাহিদ এসেছে। সে আবারও কাজে মনোযোগ দেয়। ইসমাতের পাশের মেয়েটা বৃদ্ধার নাতনি।
সাহিদ এদিক সেদিক না চেয়ে ডাকল ওকে। খুবই শান্ত সেই কণ্ঠস্বর।
--"ইসমি, বিকালে রিভার ক্রুসে যাবে আমার সাথে?"
—————
আহেরের বদদোয়া খুব বাজে ভাবে লেগে গেছে ইফরার ওপর। কয়েকদিন ইফরা আর সেলিমকে ঘুরতে দেখা গেছে। কিছু রেস্টুরেন্টেও একসাথে দেখা গেছে। এই নিয়ে আবারও আলোচনা-সমালোচনা শুরু। সবখানে ইফরা আর সেলিমকে নিয়ে চর্চা। সবাই বলাবলি করছে ইফরা নাকি তাদের প্রেমে আ গু ন ধরিয়েছে, ব্রেক আপের মূল কারণ ইফরা। ইফরার সাথে হয়তো সেলিম ধরা খেয়েছে, আদিবার সাথে চিট করেছে। যেই মানুষরা আগে আদিবাকে বিচার করত এখন সেই আদিবাকে অসহায় ভেবে মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে। তার হয়ে কথা বলছে। বেশিরভাগ কমেন্টস, পোস্ট, রিলস সব মিলিয়ে এটাই বলার চেষ্টা করছে যে, "রূপের কাছে ভালোবাসা হেরে যায়। আদিবা আজ কম সুন্দর বলে তাকে সেলিম চিট করেছে। বেশি সুন্দরী ইফরার জন্য আগের প্রেমিকাকে ভুলে গেছে," ইত্যাদি ইত্যাদি।
এ নিয়ে ইফরা নিজের বাড়িতেই বেশ প্যারায় আছে। চারপাশের কথাবার্তা মমতাজ বেগমেরো কান অবধি পৌঁছে গেছে। তিনি এখন দিন রাত এক করছেন ইফরাকে বিয়ে করার জন্য। বিয়ে করে না দেখেই মানুষ যা পারে তা বলার সুযোগ পায়। ইফরার না বাইরে শান্তি, আর না বাসায়। অধৈর্য ইফরা এবার পুরোপুরি ধৈর্য হারিয়ে ফেলল।
পরেরদিন সকাল সকালই একটা ভিডিও আপলোড হলো ইফরার অফিশিয়াল আইডি আর পেজ থেকে। সেখানে ইফরা বিয়ের পোশাক পরে, তার পাশে তার বয়সীই এক যুবক ছেলে। ওরা কাজী অফিস থেকে বের হচ্ছে। ইফরা সকলের মুখে চুনকালি লাগিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
--"গতকাল অবধি যেই মেয়ের গায়ে কলঙ্ক লাগাচ্ছিলেন আজ আবার আরেক মেয়েকে ধরেছেন কলঙ্ক লাগানোর জন্য? আপনাদের জন্য কলঙ্ক ছোঁড়াছুড়ি এত সোজা বুঝি? নিন, আমার জন্যও বিয়ে করা বেশ সোজা। লেট মি ইন্ট্রোডিউজ, হি ইজ মাই হাসবেন্ড। মি. আশিফ তাওসীফ। আমার ভার্সিটি জীবনের প্রেমিক, আর আপনাদের অতি প্রিয় জার্নালিষ্ট। আর যদি দেখেছি আপনারা সেলিম ভাইয়াকে জড়িয়ে অন্যের বউকে হেনস্থা করার চেষ্টা করেছেন। তখন আমার হাসবেন্ড দেখে নিবে আপনাদের। তাই না আশিফ?"
আশিফ মুচকি হাসল, বড্ড আদরের সাথে গাল টেনে দিল তার প্রিয়তমা স্ত্রীর। দুজনের চোখেই যেন উচ্ছ্বাস, প্রেম কত ঝরে ঝরে পড়ছে। যেন কত বছরের পূর্ণতা। সে কি সুন্দর দৃশ্য।
·
·
·
চলবে……………………………………………………