আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রকে ধূলিসাৎ উপলক্ষে একটা পার্টি থ্রো করেছে প্রধান কর্মকর্তা। এত বড় একটা মিশন সাকসেসফুল! নেভি চিফ স্বয়ং গ্র্যান্ড সেলিব্রেশনের আয়োজন করেছেন তাই।
নেভাল বেইজের সুবিশাল অডিটোরিয়াম ভবনটি আজ সেজেছে রাজকীয় সাজে। বাইরে একে একে থামছে সারি সারি কালো ফ্ল্যাগশিপ গাড়ি। সিনিয়র হাই-অফিসিয়াল থেকে শুরু করে বিদেশি প্রতিনিধি ও শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা আসছেন সেখানে। ব্যাঙ্কোয়েট হল কানায় কানায় পূর্ণ তাতে।
এমন আলো ঝলমলে সন্ধ্যার মাঝেই সেলুন কারের দরজা খুলে একে একে নামল ওরা চারজন। তাজধীর,সেহরোজ,ফাহিম আর অর্ণব।প্রতিদিনের সাদা সুতি ইউনিফর্ম ছেড়ে আজ চারজনের গায়েই চাপানো ব্ল্যাক-টাই ফর্মাল লুক। বুকের বা পাশটায় চকচক করছে ডেকোরেশন মেডেল।
তাজধীর হেঁটে আসছে সবার আগে। ধবধবে সাদা শার্টের ওপর ডার্ক বো-টাই পরা। হাতের কব্জিতে শোভা পাচ্ছে ব্র্যান্ডেড ঘড়ি। ওর পাশেই সেহরোজ। দুজনের একই রকম সুগঠিত দেহ। ওদের পিছু পিছু কিছুটা জড়সড় ভঙ্গিতে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে ফাহিম আর অর্ণব। অর্ণব শার্টের টাইটা একটু ঢিল করার চেষ্টা করতে করতে নিচু গলায় ফাহিমকে বলল,
'ভাই ফাহিম!সুটের কলারটা এমনভাবে চেপে বসেছে না! মনে হচ্ছে সিগন্যাল টাওয়ারটাই সোজা গলায় এসে বিঁধেছে। আর ওই সামনে তাকিয়ে দ্যাখ।এই দুইটার গলায় কি এসব ফাঁস লাগেনা?'
ফাহিম জোরপূর্বক হাসি চেপে রাখল মুখে। বলল,
'চুপ কর তো অর্ণব! চিফ স্যার একটু পরেই অভ্যর্থনা জানাবেন। তোর এই ভাড়ামো অন্তত আজকের দিনটা বন্ধ রাখ!'
হলে ঢুকল ওরা। একের পর এক সিনিয়র নেভাল অফিসার ঘিরে ধরলেন ওদের।রিয়ার এডমিরাল মাহমুদ এলেন এগিয়ে। মুখে সাবলীল হাসি এঁটে তাজধীরের কাঁধে হাত রাখলেন তিনি। বললেন,
'আউটস্ট্যান্ডিং জব, কমান্ডার তাজধীর! অ্যান্ড ইউ টু, সেহরোজ। সাউথ চ্যানেলের অপারেশনের রিপোর্ট দেখে হেডকোয়ার্টারস দারুণ ইমপ্রেসড। ওয়েল ডান, বয়েজ!'
তাজধীর আর সেহরোজ দুজনেই একসঙ্গে স্যালুট ঠুকল,
'থ্যাংক ইউ, স্যার। প্রপার ইনটেলিজেন্স আর টিমওয়ার্কের সাফল্য।'
ক্যাপ্টেন রশিদ হাসলেন। হেসে উঠে অর্ণবের দিকে চেয়ে শুধালেন,
'কী অর্ণব? শোনলাম সিগন্যাল ডিকোড করতে গিয়ে নাকি বেশ ঘেমেছিলে?'
অর্ণব বোকাসোকা হাসল। বলল,
'কী যে বলেন স্যার! দেশের কাজে ব্রেন খরচ করে ঘাম ঝরানো তো আমাদের ভাগ্য!'
সিনিয়ররা একত্রে হেসে উঠলেন। এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। ওনারা যেতেই অর্ণব ট্রে থেকে দুটো জ্যুসের গ্লাস তুলল। ফাহিমের দিকে বাড়াল একটা,
'খা ভাই। পেট পুরে খা। নেভি চিফ নিজের পকেট থিকা খাওয়াচ্ছেন। না খেলে পাপ হবে!'
পুরো ব্যাঙ্কোয়েট হলের আবহওয়া পাল্টে গেল হঠাৎ। মূল প্রবেশদ্বারে স্বয়ং নৌ প্রধান এসে উপস্থিত হয়েছেন। তবে উপস্থিত সবার নজর শুধু নৌ প্রধানের ওপর আটকে রইল না। আটকালো উনার পাশে দাঁড়ানো অসম্ভব এক রূপসী নারীর ওপর!
জেনিফার রাজ।ব্যবসায়ী মহলে এক সুপরিচিত নাম। পরনে অফিসিয়াল সুট। তবে এ পরিচয় ছাড়াও আরেকটা পরিচয় আছে তার। স্বয়ং নৌ প্রধানের একমাত্র আদুরে কন্যা সে!সবশেষে নৌ প্রধান হাসিমুখে সবাইকে শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে এগিয়ে এলেন ওদের দিকে।
'ইভনিং জেন্টলমেন!”
চিফের ভরাট গলায় চারজনই সাথে সাথে সোজা হয়ে দাঁড়াল।সসম্মানে একযোগে বলল,
'ইভনিং, স্যার!'
নৌ প্রধান মেয়েকে ডাকলেন পাশে। বললেন,
'মিট মাই ডটার, জেনিফার রাজ। জেনিফার, এরা আমার ডিপার্টমেন্টের সেরা রত্ন। তাজধীর সিদ্দিক আযান আর সেহরোজ। নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছ?'
জেনিফার এগোলো একটু। একদম মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো ওদের। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে হাত বাড়ালো তাজধীর এর উদ্দেশ্য,
'শুনেছি মানে? কমান্ডার তাজধীরের সাহসিকতার গল্প তো পুরো বেইজে রূপকথার মতো ঘোরে! নাইস টু মিট ইউ, কমান্ডার।'
তাজধীর অসস্তিতে নড়েচড়ে উঠল খানিকটা। কি করবে, কি করবে ভেবে একপর্যায়ে হাত মেলালো। গম্ভীর গলায় বলল,
'মাই প্লেজার, মিস রাজ। থ্যাংক ইউ।'
জেনিফার এবার ঘুরল সেহরোজের দিকে। সেহরোজ অন্যমনস্ক ছিল। তার উদ্দেশ্য হাত বাড়াতেই নিঃসঙ্কোচে হাত মিলালো সে-ও,
'অ্যান্ড ইউ মাস্ট বি সেহরোজ!আপনার পারফর্মেন্সও দারুণ ছিল।'
'ধন্যবাদ, মিস রাজ।'
আরো বেশ কিছুক্ষন কথাবার্তা শেষে নৌ প্রধান এগোলেন সামনে।জেনিফার রাজও এক গ্লাস শ্যাম্পেন হাতে দূরে সরে দাঁড়ালো। ওরা একটু আড়ালে যেতেই অর্ণব আর ফাহিম এক কোণে দাঁড়াল।অর্ণব জ্যুসের গ্লাসে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে বলল,
'নেভি চিফ স্যারের মেয়ে এইটা? এই মাইয়া তো বিজনেসম্যান কম, খতরনাক ডন মার্কা পার্সোনালিটি বেশি লাগছে দেখতে!'
'ইন্টারন্যাশনালি কাজ করে, ব্যক্তিত্ব তো থাকবেই।'
ফাহিমের জবাবে অর্ণব নাক কুঁচকে বলল,
'হ্যাঁ, ব্যক্তিত্ব! দেখলি না কীভাবে তাজধীর আর সেহরোজ এর দিকে তাকাচ্ছিল? যেন কাল সকালেই দুজনকে কিডন্যাপ করে জাহাজে তুলে নেবে! ভাইরে ভাই! চোর-ডাকাত ধরা থেকে এই টাইপের মেয়েদের ফেস করা হাজার গুণ কঠিন!
'তো তুই তাকাচ্ছিস কেন? তোর তো একটা নাদান বাচ্চা আছেই!'
'আর বলিস না ওই বিড়ালের বাচ্চাটা দিন দিন লেদা হইতাসে আরো। মকনে যেহেতু করিয়েই দিলি,ওয়েট একটু দেখে আসি!'
অর্ণব ফোন বের ককরে এক কোণে সরে যেতেই ফাহিম এগোলো সামনের দিকে।
—————
অডিটোরিয়ামের কাচের বিশাল দরজাটা দিয়ে বাইরের রাতের সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে তাজধীর আর সেহরোজ। হাতে ওদের ড্রিংকসের গ্লাস। কোনো একটা অফিসিয়াল টপিক নিয়েই কথাবার্তা চলছে দুজনের মধ্যে।ওদের ঠিক গজ দশেক দূরে পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে একজন।
হাতে ধরা শ্যাম্পেনের গ্লাসটা নাড়াচ্ছে আনমনে। নজর স্থির এদিকে। সেদিকে চোখ গেঁথে রেখেই শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দিল জেনিফার। চোখ দুটোতে চকচক করছে চরম লেভেলের উন্মাদনা। তার মতে মা রাত্মক অবসেসন! এক সেকেন্ডের জন্যও সেই দৃষ্টি আড়াল করল না। সেদিকে তাকিয়ে থেকেই বিড়বিড় করল।
'ওয়ান থাউজ্যান্ড নাইনটি-নাইন ডেজ! টুয়েন্টি-ফোর থাউজ্যান্ড ফোর হান্ড্রেড টুয়েন্টি-ফোর আওয়ার্স। এইটি লাখ নাইনটি-সিক্স থাউজ্যান্ড সেকেন্ডস! এতগুলো দিন আমি স্রেফ দূর থেকে অপেক্ষা করেছি। কিন্তু আর না! আর একটা মুহূর্তও না। এবার আর তোমাকে চোখের আড়াল হতে দেব না আমি। তুমি আমার। তুমি পুরোটাই আমার। আমার ছিলে, আর তুমি শুধুই আমার থাকবে!'
—————
অর্ণব কথা শেষে সেদিকে আসতেই ওর চোখ পড়ল জেনিফারের ওপর। ওকে দেখতেই নড়েচড়ে দাঁড়াল সে। উসখুস করে সরে গেল ওখান থেকে।অর্ণব কি মনে করে যেন তাজধীর কে পাশ কাটিয়ে এসে দাঁড়াল সেহরোজ বরাবর। বন্ধুর কানের পাশে ঝুকে নিম্মস্বরে বলল,
'সেহরইজ্জা রে, দেখ তোর ফিমেইল ভার্সন পেয়ে গেছি! একদম তোর টাইপ। তোর তো এমনই পছন্দ, তাই না? আন্টির সাথে বলব নাকি কথা? বিয়ের ঘটকালিটা আমিই না হয় শুরু করে দিই!'
চিবুক শক্ত হলো সেহরোজের। কড়া চাহুনি বিদ্ধ করতেই সরে দাঁড়াল অর্ণব। নিজের বিপদ আঁচ করতে পেরে এক কদম পিছিয়ে এসে, পরপরই কপাল কুঁচকে সোজা হেঁটে গেল ফাহিমের দিকে। অর্ণব লক্ষ্য করল জেনিফার সরে দাঁড়ালেও দূর থেকেও ওর দুই বন্ধুর ওপর নজর এঁটে রেখেছে মেয়েটা।
'কেমনে চেয়ে আছে দেখ! মেয়ে মানুষ হলে এই দুটোকে এতক্ষণে এই বেডি চোখ দিয়েই প্র্যাগনেন্ট বানিয়ে দিতো!'
কাবারের এক টুকরো মুখে দিয়েছিলো ফাহিম। অর্ণবের কথায় হাসতে গিয়ে গলায় আটকে যাওয়ার উপকৃম হলো। কাশতে কাশতে কোনোমতে পানি খেয়ে গিলল সেটা।
'তোর মুখে কি কোনো লাগাম নেই অর্ণব? নেভি চিফ স্যারের মেয়ের ব্যাপারে তুই অডিটোরিয়ামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এসব ফালতু কথা বলছিস? কেউ শুনে ফেললে কিন্তু আমাদের সোজা কোর্ট মার্শাল করে দেবে!'
অর্ণব দুই হাত দিয়ে নিজের ট্যাক্সিডোর সুটটা টেনে ঠিক করল। ভাব নিয়ে বলল,
'কোর্ট মার্শাল করবে কোন দুঃখে? আমি তো জেনুইন অবজারভেশন তুলে ধরছি! তুই দেখবি তো তাকানো কাকে বলে! আস্ত এক জোড়া লেজার লাইট ফিট কইরা আনছে চোখে!'
'তোর মন চাইলে তুই ও দেখ।'
'কাকে দেখব? অফিসারদের বউ আর ওই লেদা লেদা আন্ডা বাচ্চাদের? এছাড়া আর কারো ওপর তো চোখ পড়ছেনা তেমন।'
'সালা!তার মানে তুই ও খোঁজছিস? এই তোর লয়াল গিরি?'
—————
আগামীকাল থেকে প্রিয়ন্তীর ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। বিকেল থেকে ঘাট হয়ে পড়ার টেবিলে বসে রয়েছে ও। এখন রাত দশটা। এর মধ্যে শুধু কেবল দুইবার'ই চেয়ার ছেড়ে উঠেছে। একবার ওয়াশরুমে গিয়েছে। আরেকবার শ্রেয়ার কলে। শ্রেয়ার সঙ্গে কথার মেইন টপিকটাও ছিল পড়া নিয়ে।
মিতালী একটু আগে চা আর টোস্ট এনে দিয়ে গেছে।ইংরেজি প্রোস বইটা থেকে 'ক্যাট ইন দ্যা রেইন' গল্পটার সারাংশ মুখস্ত করছিল। ওটা শেষ করেই চায়ের কাপে টোস্ট টা ভিজিয়ে এক কাপড় বসালো। দ্বিতীয় কামড়ের মাথায় বইয়ের পাশে থাকা ফোনটা টুং করে বেজে উঠল। পরিচিত সেই শব্দ। এসেছে হোয়াটস্যাপ থেকে। প্রিয়ন্তী চটজলদি ফোনটা হাতে তুলে দেখল একটা মেসেজ এসেছে,
'আগামীকাল থেকে পরীক্ষা শুরু। আশা করি সমস্ত চঞ্চলতা আর অনর্থক চিন্তা একপাশে সরিয়ে রেখে সম্পূর্ণ মনোযোগ পড়ালেখায় থাকবে। পরীক্ষার দিনগুলোতে অহেতুক ফোনে চোখ রাখা বা মেসেজের অপেক্ষায় সময় নষ্ট করা একদম বন্ধ। অল দ্য বেস্ট, নিজের সেরাটা দিবেন আশা করি।'
মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষন 'থ' হয়ে রইল ও।গত দুদিন যাবৎ আগের মতো লোকটাকে অনলাইনে পাওয়া যায়না আর। দুদিন পর মেসেজ দিয়েছে শুধু মাত্র এটা বলতে? লোকটার কাঠখোট্টা স্বভাবের কোনো সীমা নেই! পরীক্ষা আসছে বলে কি একটু ভালো করে দু'খান কথা বা দুটো মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা যেত না?ফোন করেও তো বলতে পারতো কথাটা। এত কড়া ডিসিপ্লিন দেখানোর কী আছে? প্রিয়ন্তী মুখ কুঁচকে ফোনটা পাশে রেখে বিরবির করে উঠল,
'হুঃ! আসছে আমার বড় ডিসিপ্লিন শিখাতে!থাকুন আপনি আপনার মতো। দিলাম না আপনায় মেসেজ আর!'
সত্যি সত্যিই সেই রাতের পর থেকে আর কথা হয়নি দুজনের। দুজনের কেউ'ই যেচে পড়ে মেসেজ দেয়নি। তবে পরবর্তী দিনগুলোতে যে যে দিন প্রিয়ন্তীর পরীক্ষা থাকত, ঠিক সেদিন রাত সাড়ে সাতটা বা আটটার দিকে তাজধীরের অ্যাকাউন্ট থেকে স্রেফ দু-তিন শব্দের মেসেজ একটা আসত,
'পরীক্ষা কেমন হলো?'
প্রিয়ন্তীও অভিমানের তোড়ে উত্তরটা এক শব্দেই সীমাবদ্ধ রাখত,
'ভালো, আলহামদুলিল্লাহ।'
ব্যাস! ওইটুকুই। প্রিয়ন্তীর উত্তর পাওয়ার পর তাজধীর আর একটা শব্দও বাড়াত না। কোনো ফলো-আপ প্রশ্ন করত না। দিন কেমন কাটল জানতে চাইতো না। লোকটা যেন ঘড়ির কাঁটা মেপে ঠিক একটা নেভাল দায়িত্ব পালন করে মেসেজটা দিয়েই খালাস!
এক দিন, দু দিন করে দেখতে দেখতে দীর্ঘ ২৯টি দিন পেরিয়ে গেল। এই দীর্ঘ এক মাসে তাজধীর আর একটাবারও প্রিয়ন্তীকে কল দেয়নি। প্রথম প্রথম প্রিয়ন্তী নিজেকে বুঝ দিয়েছিল ‘ভালোই হয়েছে, লোকটা ডিস্টার্ব করছে না। শান্তিতে পড়তে পারছে সে। কিন্তু দিন যত গড়াতে লাগল, প্রিয়ন্তীর ভেতরের অস্থিরতা আর খালি খালি ভাবটা তত বাড়তে লাগল। পড়তে বসে বারবার চোখ চলে যেত ফোনের স্ক্রিনে। মেসেজের টোন বাজলেই বুকটা একলহমায় কেঁপে উঠত। এই বুঝি লোকটার কল এলো! কিন্তু স্ক্রিন অন করতেই, দেখত কোনো কলেজের নোটিফিকেশন বা সিম কোম্পানির মেসেজ।
লোকটা পড়া নিয়ে এতই সিরিয়াস যে সত্যি সত্যি একটা মাস তাকে এভাবে দূরে সরিয়ে রাখল? একটা মানুষের প্রতি কারো এতখানি নিস্পৃহ আর কড়া হোল্ড কীভাবে থাকতে পারে? প্রিয়ন্তীর মন খারাপের মেঘ জমে জমে পাহাড় হয়ে উঠল এই ২৯ দিনে।
আজ প্রিয়ন্তীর অনার্সের এই টার্মের শেষ পরীক্ষা।
দুপুরের কড়া রোদ পেরিয়ে পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরল কেবল'ই। ঘরে ঢুকে ব্যাগটা সোফায় রেখে সোজা ওয়াশরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে কাপড় বদলে নিলো। তোয়ালে দিয়ে হাত-মুখ মুছতে মুছতে বাইরে এসে দেখল মিতালী দাঁড়িয়ে আছে।
'যাক বাবা! ফাইনালি আমার ননদিনী ম্যাডামের পরীক্ষার যুদ্ধ শেষ হলো! তা পরীক্ষা কেমন দিলে প্রিয়?'
প্রিয়ন্তী চটপটে গলায় জানাল,
'হয়েছে ভাবি, ভালোই। যাক বাঁচা গেল আপাতত।মাথা থেকে মস্ত বড় বোঝা নামল।'
'আচ্ছা খেতে আসো তবে।'
'তুমি খাওনি?'
প্রিয়ন্তী জানে উত্তরটা। তবুও প্রশ্নটা করল আগ পেতে। প্রিয়ন্তী কে ছাড়া মিতালী একা খাবার খায়না। সে প্রিয়ন্তী যত দেরি করেই আসুক না কেন। এলে একসঙ্গেই খাবে দুজন। প্রিয়ন্তী এই নিয়ে কতবার নিষেধ করেছে ভাবীকে এমনটা করতে।আগে হলেও মানা যেত। তবে এখন তো উনারা দুইজন। ঠিকঠাক মতো না খেলে হবে? তবে সেসব শুনলে তো ওর ভাবি? প্রিয়ন্তী তোয়ালে রেখে ভাবির সঙ্গে পা বাড়াল। মিতালী নিচে নামতে নামতে বলল,
'প্রিয় শোনো। আজ বিকেলে ঘুমিয়ো না। রাতে খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে! কাল ভোরেই উঠতে হবে কিন্ত!'
'কেন ভাবি? কাল ভোরে উঠতে হবে কেন? কোথাও যাব নাকি আমরা?'
সিঁড়ির গোড়ায় থেমে দাঁড়ালো মিতালী। ঘাড় উল্টে বলল,
'ওমা! তোমার ভাই তোমায় কিচ্ছু বলেনি?'
প্রিয়ন্তী মাথা নেড়ে বলল,
'না তো! কী হয়েছে ভাবি?'
'আজ সকালে বলল আগামীকাল ভোরেই নাকি তোমাদের গ্রামের বাড়িতে যাবে। আমাদের কে নিয়ে। সব ব্যাগপ্যাক আজ রাতেই গুছিয়ে রাখতে বলেছে।যেত নাকি আজই, তবে তোমার পরীক্ষার জন্য একদিন দেরি করা।'
'গ্রামের বাড়ি!'
আলগোছে প্রিয়ন্তীর মুখ থেকে শব্দটা বেরিয়ে এলো।
—————
আজকের সকালটা বেশ প্রাণবন্ত। দুদিন একটানা বৃষ্টির পর মিষ্টি রোদ উঠেছে আজ। সামনেই বঙ্গোপসাগরের শান্ত জলরাশি। ওপরে বিস্তীর্ণ নীল আকাশ। সেই খোলা আকাশের নিচে ওপেন ফিল্ডের দুটো কাঠের বেঞ্চে বসে আছে সেহরোজ আর অর্ণব।
সেহরোজ এর হাতে কফির কাপ থাকলেও ও সেদিকে তাকাচ্ছে না। দূর দিগন্তের সাগরের দিকে চেয়ে আছে উদাস চিত্তে। অর্ণব নানান কথার জুড়ি বসিয়েছে। তবে সেহরোজ শুধু হু, হা করে উত্তর দিচ্ছে। ব্যাপারটা অর্ণব লক্ষ্য করছে আজ থেকে নয়। বরং এবার ছুটি কাটিয়ে বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকেই। কেমন যেন বদলে গেছে ছেলেটা। আগের মতো এবার কথায় কথায় রাগে না, তর্ক করেনা।
অর্ণবের কফি তলানিতে পড়ে থাকলেও সেহরোজ এক চুমুকও বসায়নি ওরটায়। খাওয়ার উপযুক্ত নেই আর। কফির কাঁপটা বেঞ্চের ওপর রেখে এবার অর্ণব ঘুরে বসল বন্ধুর মুখোমুখি হয়ে।
'আচ্ছা সেহরইজ্জা, তুই কি ইদানীং কোনো বিশেষ ভাইরাসে আক্রান্ত হইছিস?'
সেহরোজ চোখের পলক না ফেলে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
'ফালতু কথা বলবি না অর্ণব।'
'আরে ফালতু কথা কোথায় বললাম ভাই?ছুটি শেষ করে আসার পর থেকে পুরো একটা মাস ধরে তোকে লক্ষ্য করছি। চেহারাটা একদম ঝিম ধরা মুরগির মতো বানিয়ে রাখিস! মনমরা হয়ে বসে থাকিস। হঠাৎ হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই গভীর ভাবনায় ডুব দিস। কী হইছে তোর?'
সেহরোজ কফির কাপটা বেঞ্চের পাশে রেখে ঠান্ডা গলায় বলল,
'কাজের চাপ। আর কিছু না।'
অর্ণব মুখ বাঁকিয়ে একচিলতে হাসল। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দাবার প্রথম চালটা চালল ও,
'আমাকে মিথ্যা অজুহাত দিচ্ছিস কেন?'
'তোকে অজুহাত দেওয়ার কোনো প্রয়োজন আমি বোধ করছি না অর্ণব।'
'তোর প্রয়োজন বোধ না থাকলেও আমার আছে ভাই। গত এক মাস ধরে চেষ্টা করছি তোর সাথে একটু প্রাণ খুলে কথা বলতে। কিন্তু তুই নিজেকে গুটিয়ে রাখছিস। এমনকি... ইউএসএ থেকে গত সপ্তাহে যে আঙ্কেল দেশে ফিরলেন, উনার সাথেও তুই কোনো কন্টাক্ট করিসনি, তাই না?'
সেহরোজ অবাক চোখে অর্ণবের দিকে চাইল। অর্ণব মলিন হেসে বলল,
'অবাক হচ্ছিস? ভেবেছিলি আমি কিছু জানি না? আঙ্কেল আমেরিকা থেকে ফিরে তোকে ফোন দিয়েছিল, তুই ধরিসনি। মেসেজ দিয়েছে কিন্তু কথা বলিসনি। শেষমেশ উপায় না পেয়ে আন্টি কাকে ফোন দিয়েছে জানিস? আমাকে!'
'আম্মু তোকে ফোন দিয়েছিল মানে? তোকে এসবের মধ্যে টানার কী দরকার ছিল?'
'আন্টির কী দোষ বল? তুই তো নিজের মন খারাপের কারণ কাউকে বলবি না। যোগাযোগও করবি না! তুই আমাদের পর ভেবে কোনো কিছু শেয়ার না করলে কী হবে সেহরইজ্জা! আন্টি তো আমাদের ঠিকই নিজের আপন ছেলের মতো দেখে! কান্নাকাটি করে ফোন দিয়ে বলল তোকে বুঝাতে।'
'আর এইজন্যই তুই এখন আমায় বুঝাতে এসেছিস?'
'উহুম। জানতে এসেছি।'
'কিহ?'
অর্ণব বুঝল শিকারে এবার আসল টান পড়েছে! তাই মূল প্রসঙ্গে এলো এবার,
'প্রেমে পড়েছিস তাইনা? কে মেয়েটা?'
সেহরোজ লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ দুটো বুজে বেঞ্চের পেছনে হেলান দিয়েছিলো সবেই। অর্ণবের কথায় ঝট করে চোখ খুলল! কপাল কুঁচকে বলল,
'মানে?'
'মানে গুরু একদম পরিষ্কার। এই যে এক মাস ধরে নাওয়া, খাওয়া ভুলে দেবদাস হয়ে ঘুরছিস।এটা কোনো সাধারণ ডিসিপ্লিনারি প্রবলেম না ভাই! এটা খাঁটি একতরফা কোনো টান। তুই কাউকে নিজের মনের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিস, কিন্তু স্বীকার করতে পারছিস না। বল কে সে?'
সেহরোজ চোখ সরিয়ে দূর সমুদ্রে তাকাল।চোয়াল শক্ত হয়ে এলো ওর।এরপর আচমকাই বিরস কণ্ঠে জানাল,
'কেউ না অর্ণব। যেটা কখনো সম্ভব নয়, সেটা নিয়ে ভেবে লাভ কী?'
অর্ণব ঝেঁকে বসল,
'সম্ভব নয় কেন? তোর মতো একটা ছেলে! নেভাল কমান্ডার, পারফেক্ট ব্যাকগ্রাউন্ড, সুগঠিত চরিত্র যার। তোর জন্য কোনটা অসম্ভব? সমস্যাটা কোথায় বলবি তো?'
'মেয়েটা ভীষণ ছোট!'
'বড় করে নিবি!'
'অবুঝ!'
'বুঝিয়ে নিবি।'
'গ্রামের মেয়ে!'
'তোর কাছে নিয়ে আসবি!'
সেহরোজ অর্ণবের এহেন একঘেয়েমি উত্তরে বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকাল,
'ইয়ার্কি মারিস না অর্ণব! আমি সিরিয়াস কথা বলছি। ও অনেক ছোট।ওর বয়স আর আমার বয়সের তফাৎ অনেক। ভীষণ চঞ্চল, কিছু বোঝে না!'
'বয়সের ব্যবধান কোনো ক্রাইম নয়! তুই পরিপক্ক, তুই সামলে নিবি। মেয়েটা চঞ্চল হলে কী হয়েছে? তুই তো কড়া, ব্যালেন্স হয়ে যাবে!'
সেহরোজ আবার ভ্রু কুঁচকে বলল,
'আমাদের বয়সের তফাৎ অনেক বেশি অর্ণব।'
অর্ণব চটপটে গলায় বলল,
'বয়সের তফাৎ বেশি হলে কেয়ার বেশি পাওয়া যায়। ব্যালেন্স ভালো হয়।'
সেহরোজ আবার বলল,
'আমাকে ভীষণ ভয় পায়।হয়তো কখনো এই নজরে আমাকে দেখেইনি!'
'ভয় থেকে ভক্তি হয়, আর ভক্তি থেকেই আস্তে আস্তে ভালোবাসা জন্মায়। চেষ্টা না করেই কেন সাদা পতাকা দেখাচ্ছিস সালা?'
'তাই বলে ওরকম একটা ইমমেচুয়ার মেয়েকে?'
'অহেতুক অজুহাত আর উসিলা দিয়ে নিজের মনকে কতদিন এভাবে কষ্ট দিবি?'
অর্ণব এবার বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
'এক কাজ কর। তুই আর কোনো যুক্তি দাঁড় কারাস না। সব ভয়, সব বাধা, সব সামাজিক চিন্তা একপাশে সরা। এখন শান্ত হয়ে নিজের চোখ দুটি বন্ধ কর।চোখ বন্ধ করে ভাব তো... ওই মেয়েটার জন্য তোর বুকের ভেতরে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে তা কি আগে কখনো অন্য কোনো মেয়ের জন্য করেছিস? কিংবা ভবিষ্যতে অন্য কারো জন্য করতে পারবি? চোখ বন্ধ করে নিজের মনকে জিজ্ঞেস কর সেহরইজ্জা। তোর সব প্রশ্নের উত্তর তুই নিজের ভেতরেই পেয়ে যাবি। সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সম্পূর্ণ তোর হাতে।'
অর্ণব চলে গেল। সেহরোজ অর্ণবের কথা সিরিয়াসলি নেয়নি। বেশ খানিকক্ষণ এভাবে বসে থাকল। তবে কেন যেন বারবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও অর্ণবের শেষের কথাগুলো ওর মস্তিস্ক জুড়ে ঘুরছে-ফিরছে। সেহরোজ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। অনিচ্ছাকৃতই একপ্রকার জোরপূর্বক টেনেটুনে চোখ দুটো বন্ধ করল সে।অমনি চোখের কোণে ভেসে উঠল একটা ফর্সা গোলগাল চেহারার রমণীর মুখায়ব।বিদ্যুৎ বেগে চোখ টেনে মেলল সে।
হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের বুকের ওপরে হাত রাখল। অর্ণব ঠিক বলেছিল। উত্তরটা ওর নিজের ভেতরেই স্পষ্ট ছিল এতদিন।নাহ! মোটেও এটা ঠিক নয়। এই অর্ণব তো বলেই সবসময় উল্টাপাল্টা কথা।
'নো! দিস ইজ ইম্পসিবল!'
স্বগতোক্তি করল সেহরোজ।এরপর সোজা ফিল্ড থেকে উঠে কোয়ার্টারে ফিরে এলো। বুক জুড়ে অদ্ভুত তোলপাড় চলছে তখনো। টেবিলের ওপর রাখা ফোনটার দিকে তাকাল একপল। কপালে বৃদ্ধা আঙ্গুল চেপে ভাবল কিছু একটা। এরপর মুখ গোল করে একটা শ্বাস ছেড়ে ফোনটা তুলল। স্কিন স্ক্রোল করে সোজা ফোন দিল বাবার নম্বরে।ওপার থেকে দু-বার রিং হতেই বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে,
'হ্যালো,সেহের? তুই কেমন আছিস রে বাবা?'
বাবার গলা শুনে সেহরোজ এর গলার স্বর কিছুটা নরম হলো,
'ভালো আছি, বাবা। এতদিন আমি তোমার সাথে কথা বলতে পারিনি, আই অ্যাম সরি বাবা।সরি ফর দ্যাট!'
'আরে ধুর! সরি কিসের? আমি জানি তো নেভির দায়িত্ব কতটা কঠিন। তোদের মিশন সাকসেসফুল হয়েছে শুনে খুব গর্ব হয়েছে রে। তোর মা পাশে দাঁড়িয়ে আছে, ধর কথা বল।'
ফোনটা হস্তান্তরিত হতেই ওপার থেকে সুমি বেগমের অভিমানী কণ্ঠ ভেসে এলো,
'এখন ফোন দেওয়ার সময় হলো তোর?মা হয়েও এক মাস পর ছেলের গলার আওয়াজ শুনছি! তুই এতটা নির্দয় কবে থেকে হলি রে বাবু?'
' একটু ব্যস্ত ছিলাম!'
হুট করেই সেহরোজ বলল,
'আম্মু ব্যাক ক্যামেরাটা অন করো তো। তোমায় একটু দেখি।'
সুমি বেগম হেসে ভিডিও কল অন করলেন। ফোনে মায়ের মুখটা ভেসে উঠতেই সেহরোজ এর চোখ চলে গেল মায়ের পেছনদিকের ড্রয়িং রুমের দৃশ্যে। ও ব্যাকগ্রাউন্ডে সেই কাঙ্ক্ষিত চঞ্চল অবয়বটা হন্যে হয়ে খুঁজল। কিন্তু না! সেখানে কেউ নেই। তাহলে কি চলে গেছে মেয়েটা? ঝুমুর ড্রয়িং রুমের মেঝেতে বসে বসে ব্যাগ পত্র এনে জড়ো করছে। সেহরোজ কপাল কুঁচকে শুধাল,
'কোথাও যাচ্ছ নাকি তোমরা?'
সুমি বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফোনের দিকে চেয়ে বললেন,
'হ্যাঁ রে বাবা। কাল ভোরেই আমি আর তোর বাবা গ্রামে যাচ্ছি।'
'হঠাৎ গ্রামে যাচ্ছ কেন? কোনো বিশেষ রিজন?'
উদাস কণ্ঠে জবাবটা দিলেন সুমি,
'আর বলিস না! খুব করে চাইলাম মেহরিণ মেয়েটাকে নিজের বাড়িতে রাখব। কত বড় মুখ নিয়ে বান্ধবীর কাছ থেকে মেয়েটাকে চেয়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে এলাম। তবে ভাগ্য তো আর সেটা লেখা নেই। তুই যাওয়ার কিছুদিনে মাথায় ওকে গ্রামে দিয়ে আসি আমি। ওই বায়না ধরেছে এখানে থাকবেনা আর। কিন্তু গ্রামের চেয়ারম্যানের ওই লম্পট ছেলেটার জন্য মেয়েটাকে কোনোভাবেই বাড়িতে ঠিকঠাক রাখতে পারছেনা ওরা।
"মানে? কী করেছে চেয়ারম্যানের ছেলে?'
'ছেলেটার চরিত্র বড্ড খারাপ। মেহরিণ গ্রামে যাওয়ার পর থেকেই ওকে রাস্তায় বাজেভাবে উত্ত্যক্ত করছে। এমনকি গুন্ডাপান্ডা নিয়ে মেয়েটার বাড়িতে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছে! মেহরিণ এর বাবা-মা তো ছেলে খারাপ দেখে স্পষ্ট না করে দিয়েছে। কিন্তু চেয়ারম্যানের ছেলে হুমকি ধমকি দিচ্ছে! কোনোভাবেই মেয়েটাকে রাখা যাচ্ছে না সেখানে।'
সেহরোজ এর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো কেমন। সুমি আবার বললেন,
'তাই বাধ্য হয়ে মেহরিণ এর বাবা উনার শহরের এক দূর সম্পর্কের বন্ধুর ছেলের সাথে মেহরিণ এর বিয়ের কথাবার্তা পাকা করেছেন। ছেলে শহরের নামকরা ডাক্তার। পরিবারও খুব ভালো। গত পরশু ওরা এসে মেহরিণ কে দেখে পছন্দ করে গেছে। এখন ছেলের পরিবার নাকি তাড়া দিচ্ছে, অতি দ্রুত বিয়ের কাজ সারতে চায়। আমাদের ও দাওয়াত দিয়েছে। ভাবলাম বাড়িতে থেকে তো শুধু বসেই থাকি। এরথেকে ভালো তোর বাবাকে নিয়ে একটু ঘুরে আসি!'
'ওহ! আচ্ছা। ঠিক আছে। সাবধানে যেও তোমরা।'
কথাটা বলেই খট করে কলটা কেটে দিল !সোফায় বসে ছিল সেহরোজ। এসি চলছে। তবুও ঘামছে দরদর করে। এমন অস্থির কেন লাগছে তার? এই সবটা ওই অর্ণবের কথার ফল। নাতো ওর কথা শুনে কল দিতো আর নাতো ইসিবি শুনতে হতো এখন। উফ!
সেদিন রাতটা এভাবেই পাড় হলো ওর। ছটফট করতে করতে, এপাশ থেকে ওপাশ পাইচারি করতেই করতেই ভোর চারটা বাজল কখন যেন। ঘুম আর এলোনা। ধুপ করে উঠে বসল শোয়া থেকে। ফোনটা হাতড়ে আনলো চোখের সামনে। চারটা বেজে ১৯ মিনিট।
সুমি বেগম মাত্রই ফজরের নামাজ পড়ার জন্য অজু করে জায়নামাজে বসেছিলেন। ভোরবেলা হঠাৎ ছেলের ফোন দেখে উনি বেশ ঘাবড়ে গেলেন। দ্রুত ফোনটা কানে তুলে উদ্বেগ ভরা গলায় বললেন,
'হ্যাল্লো!বাবু? কী হয়েছে রে বাবা? এত সকালে ফোন দিলি যে? শরীর ঠিক আছে তোর?'
একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিলেন সেহরোজ।একটা ঢুক গিলল। এরপর রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল আচমকা,
'আম্মু, আমি বিয়ে করতে চাই। আর সেটা তোমার ওই পছন্দের মেয়েকেই! এখন তুমি কী করবে, কীভাবে করবে—আই ডন্ট কেয়ার! কিন্তু বিয়ে আমি ওই মেয়েকেই করব! যেভাবে পারো, তুমি আর পাপা ওই গিয়ে ওর বিয়েটা আটকাও! তোমরা গ্রামে রওনা হও। আমি বেইজ থেকে ছুটি নিয়ে সোজা গ্রামে আসছি!'
·
·
·
চলবে……………………………………………………