রাত পৌনে এগারোটা। নেভাল বেইজের সিচুয়েশন রুমটা থমথমে নীরব হয়ে আছে। টেবিলে ছড়ানো চট্টগ্রামের উপকূলাঞ্চলের স্যাটেলাইট ম্যাপ আর গোপন ডিকোডার ল্যাপটপ। তাজধীর টেবিলের ওপর দু-হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে। ওর পরনে ডার্ক কমব্যাট কটেজ ইউনিফর্ম। কপালে তীক্ষ্ণ ভাজ। যে মিশনটার জন্য ওরা তৈরি হচ্ছে, তার আগের মুহূর্তের এই প্রিপারেশনটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঠিক তখনই পাশে থাকা অর্ণবের ল্যাপটপ থেকে একটা খটখট বিকট শব্দ ভেসে এলো।তাজধীর চট করে চোখ তুলে অর্ণবের দিকে তাকাল। বরফশীতল সেই চাহনি আর চিবুকের কঠিন ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে এখনই একটা বড়সড় ধমক খেতে যাচ্ছে অর্ণব!হলোও তাই। উঁচু কণ্ঠে ধমকে উঠল,
'অর্ণব! সাউথ চ্যানেলের ফ্রিকোয়েন্সি এনক্রিপশন এখনও কেন কমপ্লিট হয়নি?হোয়ায়? পাঁচ মিনিট আগে তোকে সিগন্যাল ডিকোড করতে বলেছিলাম না?'
ল্যাপটপের কি-বোর্ডে দ্রুত আঙুল চালাতে চালাতে মুখ কুঁচকে ফোঁস করে উঠল অর্ণব,
'সিগন্যাল ডিকোড তো কেবল বোতাম টিপলেই হয় না! এনক্রিপ্টেড ডাটা ট্রাফিক জ্যাম হয়ে আছে। ট্রাফিক জাম তো কেবল রাস্তায় হয় না, স্যাটেলাইট লাইনেও হয়! ট্রাই তো করছি!'
'ট্রাফিক জ্যামের অজুহাত দিবি না!'
তাজধীর চিবুক শক্ত করে টেবিল চাপড়ে বলল।অর্ণব শুনেও না শোনার ভান ধরে পরে রইল। ঘাড় উঁচিয়ে আরো জোড়ালো হয়ে তাজধীর বলল,
'মিশনের মাত্র কিছুক্ষণ বাকি। এই সময় তোর এই ঢিলেমি সহ্য করব না আমি! কাজের জায়গায় কাজ কর, অহেতুক বাহানা দিবি না একদম!'
অর্ণব এবার ল্যাপটপ থেকে মাথা তুলে বসল।দুই হাত কোমরে দিয়ে মেয়েদের মতো অঙ্গভঙ্গি করে জানাল,
'তুই কি আমাকে তোর বউ পেয়েছিস রে ভাই? যখন-তখন কথায় কথায় আইসা আমার ওপর চিল্লাইতেছিস! তোর এই অহেতুক চ্যাঁচামেচি আর ঝাড়ি সহ্য করার জন্য কি আমি তোকে কবুল বলেছি? বল বল বলেছি?'
পাশে থাকা ফাহিম ম্যাপ চেক দিচ্ছিল।অর্ণবের কথায় হু হ্যা করে হেসে উঠল অমনি। তাজধীর এযাত্রায় নিজেও কিছুটা থতমত খেল। ঘাড় ঢলে কড়া গলায় শাসালো অর্ণবকে,
'বাজে বকবক বন্ধ করে সিগন্যাল এনক্রিপ্ট কর! কাজের কাজ করবি। ফালতু থিওরি দিবি না।'
ফাহিম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
'সেহরোজ তো এখনো পৌঁছায়নি। ও কি ল্যান্ড থেকে সরাসরি মিশনে জয়েন করবে?'
তাজধীর ম্যাপের ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল,
'হ্যাঁ। সেহরোজ লোকাল কোস্টলাইনের চ্যানেল ওদিক থেকে কভার করছে। ও সরাসরি আমাদের সাথে সাইলেন্ট ক্রিক-এ এসে কমব্যাটে যোগ দেবে। ব্যাকআপ রেডি আছে ওর।'
তাজধীর এর ফোনটা ছিল অর্ণবের সামনে। ফোনের মেসেজের নোটিফিকেশণের ভাইব্রেট শব্দে অর্ণব ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো। মেসেজটা এসেছে হোয়াটস্যাপ থেকে। সচরাচর এই গাব্বার সিং তো তেমন কারো সঙ্গে কথা, বা মেসেজ আদান প্রদান করেনা।তবে আজকাল একটু বেশিই ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখে অর্ণব। করেটা কি এতো ফোনে? কৌতূহল বশতই ঘাড় উঁচিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিতেই ধুম করে কেড়ে নিলো তাজধীর। চোখ রাঙিয়ে শাসালো বন্ধুকে।
তাজধীর লক খুলে দেখল একটা ২০ সেকেন্ড এর ভিডিও এসেছে। পাঠিয়েছে মিতালী। তাজধীর ঢুকল সেখানে। সাইলেন্ট মোড উঠিয়ে ভিডিওটা প্লে করল।
সঙ্গে সঙ্গে সেই কঠিন, শক্ত মুখোভঙ্গি পাল্টালো মানবের। থমথমে রাগ উধাও হয়ে ভর করল একরাশ প্রচ্ছন্ন বাঁকা হাসি। সেই হাসি চোখ এড়ালো না অর্ণবের।
অর্ণব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাজধীরের এই ভোলবদল দেখছিল। বেইজে আসার পর থেকেই তাজধীরের এই অদ্ভুত, রহস্যময় হাফভাব বরাবরই ওর মাথার উপর দিয়ে যায়। এইমাত্র যে লোকটা বাঘের মতো গর্জাচ্ছিল,বকছিল তাকে। সে এখন ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ওভাবে মুচকি মুচকি হাসছে?
'কী ব্যাপার রে? রসগোল্লার মতো চোখ দুটো বড় বড় করে কি এমন দেখছিস? দেখাতো একটু।'
অর্ণব ভিডিওর স্ক্রিন অব্দি পৌঁছানোর আগেই সরে দাঁড়ালো তাজধীর। পকেটে ফোন ভরে চলে গেল বারান্দায়। এবার বারান্দার দরজাটা আগে লক করল টেনে।
ওদিকে বারান্দার দিকে হাঁ করে কতক্ষন তাকিয়ে থাকল অর্ণব। ফাহিমের পায়ে সজোরে একটা লাথি বসিয়ে বলল,
'হুম! জটিল কেইস ফাহিম! শালার ঐরকম দিমুখী চেহারার আসল কারণটা খুব শীগ্রই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।'
'ওটা ওর বউ!এতটুকু বুঝতে পারছিস না?'
ফাহিম সহজ গলায় বলে দৃষ্টি নামাল ম্যাপে।অর্ণব এগিয়ে এসে ফাহিমের বরাবর চেয়ার টেনে বসল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
'তুই এতো কিছু জানলি কিভাবে?'
'এটা কমন সেন্স এর ব্যাপার!বিয়ে করে এলোনা ও? নতুন বউ, নয়া নয়া ফিলিংস। প্রায়োরিটি পাবে ইটস সিম্পল!'
'কিরে শ্যালা! তুই তো দেখি ভেতরের খবর সব রাখিস! তা আমাক একটু আগেভাগে বলবি না?'
'মানুষ বিয়ে করলে বদলায়।এতে অবাক হওয়ার কী আছে?'
'বদলায় মানে? এটা বদলানো না, এটা তো পুরো সফটওয়্যার আপডেট!একদম ভার্সন টু-পয়েন্ট-জিরো।শালা এতক্ষণ আমাদের ফোকাস অন দ্য মিশন শিখিয়ে এখন নিজে কি করছে?'
ফাহিম হেসে উত্তর দিল,
'নিজেও ফোকাসেই আছে। শুধু মিশনের পাশাপাশি আরেকজনের দিকেও একটু ফোকাস রাখছে।এই যা!'
'হুম! আগে ফোনে এনক্রিপ্টেড সিগন্যাল ছাড়া কিছু ঢুকত না। এখন ভিডিওও ঢোকে।আর আমরা ধরতে গেলেই "অ্যাক্সেস ডিনাইড"!শালা একটা চিজ'ই। কিন্ত একটা জিনিস সিউর!'
'কী?'
'ভাগ্য ভালো, শত্রুপক্ষ এটা জানে না। জানলে মিসাইল না পাঠিয়ে,হোয়াটসঅ্যাপ পাঠাত।'
'বাজে কথা বলিস না। মিশনের সময় তাজধীর নিজের দায়িত্বের সঙ্গে কখনো আপস করবে না।'
অর্ণব হেসে মাথা নাড়ল।
' না ভাই, বিষয়টা সন্দেহজনক। একদিন না একদিন ভিডিওটা আমি দেখবই।'
ফাহিম সঙ্গে সঙ্গে বলল,
'কাজ কর। কাজ ফেলে এসব আলোচনা করছিস শুনলে পরবর্তী রাতের শিফটে ডিউটিতে কাটাতে হবে!'
—————
এই নিয়ে টানা এগারো বার ভিডিওটা দেখল তাজধীর। চিকন মেয়েলি সুরেলা কণ্ঠখানা শুনেই গেল আরো অনেকক্ষণ লাগিয়ে। বিকেলের দিকে ছাদে উঠেছিল প্রিয়ন্তী। ধমকা বাতাস বইছে। সেই বাতাসের মাঝেই ছাদের এক কোণে বসে গানের দুটো লাইন ধরেছিলো কি, কোন ফাঁকে এসে মিতালী সেটা ক্যামেরা বন্ধি করে ভাইকে পাঠিয়ে দেয়। বিষয়টা প্রিয়ন্তীর অগোচরেই করে মিতালী। মেয়েটা ওড়নার খুঁট আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে একদম গলা ছেড়ে আপন মনে গান গাইছে,
'ভালোবেসে আমি বারে বার,
তোমারি ও মনে হারাবো...
এ জীবনে আমি যে তোমার..
মরণেও তোমারি রবো,
তুমি ভুলোনা আমারই নাম..
'তুমি চোখের আড়াল হও, কাছে কিবা দূরে রও...
মনের কাছেও ছিলাম!
এই মন তোমাকে দিলাম,
এই প্রেম তোমাকে দিলাম...!'
সতেরো বারের মাথায় এসে থামল তাজধীর। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে সোজা ঢুকল কল লিস্টে। ব্লুহাফমুন দিয়ে সেইভ করা নাম্বারটা ক্লিক করে কল লাগালো তৎক্ষণাৎ। একহাতে ফোন কানে চেপে ধরে ওপর হাতখানায় চুলগুলো ঠেলল পিছনের দিকে।
—————
মিতালীর সঙ্গে গল্প করছিলো প্রিয়ন্তী। আগামীকাল মিতালী হসপিটালে মান্থলি চেকআপে যাবে। প্রিয়ন্তী যেতে পারবে কিনা সেটাই জানতে এসেছিলো। প্রিয়ন্তী আপাতত নিচে গেছে দুজনের জন্য কফি করে আনতে। মিতালীর সামনে থাকা প্রিয়ন্তীর ফোনটা বেজে উঠল তখনি। স্ক্রিনে নিরামিষ কমান্ডার নামটা দেখে কপালে ভাজ পড়ল মিতালীর। ভালো করে চাইতেই বুঝল মানুষটা আর কেউ না, ওর ভাই। প্রিয়ন্তী এলো মিনিট খানেক বাদে। ফোনটা বেজে যাচ্ছেন তখনো। একবার রিং হয়ে কেটে আবারও কল এসেছে। প্রিয়ন্তী যেতেই মিতালী বলল,
'উহুম উহুম! প্রিয় তোমার নিরামিষ কমান্ডার কল দিয়েছে। দেখো দু দন্ড কথাবার্তা বলে তাকে একটু আমিষ করতে পারো কিনা।'
প্রিয়ন্তী ত্রস্ত এগোলো। একটা মগ মিতালীর দিকে এগিয়ে দিতেই উঠে দাঁড়িয়ে সেটা হাতে নিলো সে। মুচকি মুচকি হাসছে এদিকে চেয়ে। প্রিয়ন্তী বেচারি লজ্জায় পড়ল বেশ। রিসিভ না করে দাঁড়িয়ে রইল ঠাই। মিতালী বলল,
'যাও কথা বলো। বাব্বাহ আমাদের তো বছরে একবারও কল দেয়না। পাওয়াই যায়না ভাইকে। আর এখানে তো দেখি কাহিনী অন্য কিছুই চলছে!'
'ওরকম কিছু না ভাবি।'
'বুঝি, বুঝি। দেখো, কোনদিন না এসে বাড়ির সামনেই হাজির হয়। যাও কথা বলো। আমি গেলাম!'
দাঁড়ালো না মিতালী আর। চলে গেল। মিতালী যেতেই তড়িঘড়ি ফোনটা রিসিভ করে কানে তুলল প্রিয়ন্তী।
প্রিয়ন্তী কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই, ওপাশ থেকে শুনতে পেল সরাসরি,
'হ্যাঁ, আমিও সযত্নে রাখিলাম!'
আচমকা এরকম একটি বাক্যয় খানিকটা ভ্রু কুঁচকে গেল প্রিয়ন্তীর। কফির মগটা টেবিলে রেখে হতভম্বের মতো শুধাল,
'মানে? কী রাখবেন?'
'এইযে আপনি যেটা দিলেন!'
'আজব! কি দিলাম আপনাকে আমি?কি বলছেন?
কিসের কথা বলছেন?'
'একটু আগে আপনি ভালোবেসে আমায় যা অর্পণ করলেন। সেটাই সযত্নে রাখিলাম, মিসেস। এখন শুধু দেখার পালা আমারটা আপনি ঠিকভাবে সামলে সযত্নে রাখতে পারেন কি না!'
প্রিয়ন্তীর মাথায় এখনো কিছু ঢুকেনি। বুঝতেই পারছে না লোকটা কি উদ্দেশ্য করে কি বলছে। অবুঝের মতো বলল তাই,
'আমি আবার আপনাকে কখন কী দিলাম? কোনো পার্সেল তো পাঠাইনি! আর কীসের ‘আপনারটা সযত্নে রাখা’র কথা বলছেন? আপনি কি সোজা ভাষায় কথা বলতে পারেন না?'
'সবকিছু কি পার্সেলে বক্সে ভর্তি করে পাঠাতে হয়, মিসেস সিদ্দিক?চাইলে দূরে থেকেও অনেক কিছু বিলিয়ে দেয়া যায়?বাই দ্যা ওয়ে, আপনার কাছ থেকে পাওয়ার পর এখন তো আমার দায়িত্ব বেড়ে গেল।'
প্রিয়ন্তী মুখ কুঁচকে বলল,
'দায়িত্ব বেড়ে গেল মানে? কীসের দায়িত্ব?'
তাজধীর স্বরটা একদম খাদে নামাল।বলল ওভাবেই,
'এই যে আপনি আপনার সমস্তটা এক লহমায় আমার নামে লিখে দিলেন। আমি তো এখন বাধ্য হলাম আমার সমস্ত মন-ধ্যান, চিন্তা আর অস্তিত্বটা আপনার অধীনস্থ করে দিতে। আমি তো আমার সবটুকু আপনার নামে জমা করে দিলাম। আপনি কিন্ত আমার সবটা আমার মতোই সযত্নে রাখিবেন। এবার এসে এক এক করে তার প্রতিটা ইঞ্চি আমি আপনার কাছ থেকে বুঝে নেব।একদম হিসাব কষে!'
গলার কাছে বড় একটা দলা পাকিয়ে এলো প্রিয়ন্তীর। আটকে গেলো কথারা। এতক্ষনেও লোকটার বলার কথার মাথামন্ডু বুঝল না কিছুই।
'আপনি এত পেঁচিয়ে কথা বলছেন কেন বলুন তো? আমার কী বুঝে নেবেন আপনি? আমার তো নিজস্ব কোনো ধন-সম্পদ নেই!সবটাই ভাইয়ার!'
ঠোঁটের কোণে বিষাদের একচিলতে তিতকুটে হাসি ফুটিয়ে ফোঁস করে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল তাজধীর। খানিকটা বিরক্তিতেই চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
'নিরামিষটা বোধহয় আমাকে শুধু শুধু বলা হয়, মিসেস সিদ্দিক! আসল নিরামিষ তো আসলে আপনি নিজেই! একটা রোমান্টিক কথার সাবস্ট্যান্স বোঝার মতো ন্যূনতম সেন্সও যার মাথায় নেই, সে নাকি আবার সাহিত্য নিয়ে পড়ালেখা করে!'
প্রিয়ন্তী ক্ষোভে একপ্রকার ফেটে পড়ল,
'কী বললেন? আমি নিরামিষ? আপনি জানেন, আমার ডিপার্টমেন্টের সবাই আমাকে 'কবিতার রানী' বলে ডাকে? আর আপনি আমাকে সাহিত্যজ্ঞান শেখাচ্ছেন? এত ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে জাঁহাবাজ মার্কা ডায়ালগ মারলে কি সাহিত্যের রূপ বোঝা যায় নাকি? সোজা বাংলায় বলতে পারেন না?'
'সোজা বাংলা তো সবাই বোঝে। কিন্তু যে জিনিসটা যত বেশি পেঁচানো আর গভীর, তার আসল তৃপ্তি তো সেখানেই! কবিতা তো অনেক পড়লেন কিন্তু লাইনের ভেতরের গভীর অর্থ ডিকোড করার আসল প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞানটা যে আপনার এখনো একদমই শূন্য, তা তো হাড়েনাহাড়ে টের পাচ্ছি।'
টেবিলে রাখা কফির মগটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল প্রিয়ন্তী। গালের পাশটা এক লহমায় কেমন গরম হয়ে উঠল। মনে মনে বলল,
'নিজে পাঁচশো লাইনের ডাবল মিনিং পেঁচিয়ে কথা বলবে, আর আমি না বুঝলেই দোষ আমার? ফাজিল একটা!'
তোতলাতে তোতলাতে মুখে বলল,
'আ-আপনি আবার কী আবোল-তাবোল ইঙ্গিত দিচ্ছেন? কিসের ডিকোড আর কিসের প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান? আমি আবার কী করলাম?'
'দূর থেকেও যেভাবে উসকানিমূলক সিগন্যাল ট্রাফিক আপনি আমার লাইনে পাঠাচ্ছেন মিসেস তাতে আমার এই কঠিন, এনক্রিপ্ট করা সিস্টেমেও মারাত্মক শট-সার্কিট হয়ে যাচ্ছে। যা সামলাতে এখন আমার মারাত্মক কসরত করতে হচ্ছে।'
'আচ্ছা আপনি কি জন্মগতই এমন?'
'যেমন?'
'এইযে সাধারণ একটা কথাকেও এমনভাবে বলেন যে মানুষ পরে বসে বসে সেটা নিয়েই ভাবতে থাকে।'
'তাহলে কাজ হয়েছে।'
'কীসের?'
'আপনাকে ভাবাতে পেরেছি।'
প্রিয়ন্তী সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানাল,
'মোটেও না!'
'নিশ্চিত?'
'একশো ভাগ।'
' আচ্ছা, তাহলে আজ রাতে ঘুমানোর আগে যদি আমার কথাগুলো একবারও মনে পড়ে...
প্রিয়ন্তী তাড়াতাড়ি বলে উঠল,
'পড়বে না।'
'বাজি?'
'বাজি।'
' হারলে?'
প্রিয়ন্তী একটু ভেবে বলল,
' হারলে... আপনি যা চাইবেন তাই।'
তাজধীর মৃদু হেসে বলল,
'আর যদি আমি হারি?'
' তাহলে আপনাকে একদিন পুরোটা সময় আমার কথা মতো চলতে হবে।'
'এত বড় শর্ত?'
'ভয় পেলেন?'
তাজধীর নিচু স্বরে হেসে বলল,
'আপনার কাছে হারতে আমার কোনো আপত্তি নেই, মিসেস ব্লুহাফমুন।'
—————
ভোর চারটা। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের শেষ সীমানায় অবস্থান করছে ওরা। নোনা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া চারপাশ নিঝুম, থমথমে। সমুদ্রের মাঝপথে ভেড়ানো এক বিশাল স্পেশাল নেভাল শিপ থেকে নামানো চারটে রেডার-প্রুফ স্পিডবোট নিঃশব্দে ভেসে এলো চ্যানেলের গোপন খাঁড়িতে। তাজধীর এর চোখে নাইট-ভিশন ট্যাকটিক্যাল গগলস। হাতে কাস্টমাইজড অ্যাসাল্ট রাইফেল। মুখের একপাশটা কড়া ছায়ায় ঢাকা থাকলেও ওর চিবুক আর নাকের কাটা দাগে ফুটে আছে ইস্পাতকঠিন কাঠিন্য। যে মিশনটা দুদিন আগে কৌশলগত কারণে তাজধীর স্থগিত রেখে ফিরে গিয়েছিল, আজ ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে সেটাই সম্পূর্ণ করতে এসেছে তারা।ফাহিম আর অর্ণবও নিজেদের ট্যাকটিক্যাল পজিশনে তৈরি।
ফাহিম নিচু গলায় শুধাল,
'কমান্ডার, লোকাল কোস্টগার্ড বা ইনটেলিজেন্স ব্যাকআপ কিন্তু এখনও পৌঁছায়নি। আমরা কি তাদের জন্য ওয়েট করব?'
তাজধীর গগলসটা কপালে তুলে অতি-শীতল, কড়া চোখে বন্ধুদের দিকে চাইল। ওর ঠান্ডা মাথার হিসাব-নিকাশ কতটা নিখুঁত, তা এই তিনজনের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।
'লোকাল ইনফর্মারদের মধ্যে ব্ল্যাক শিপ আছে। এই মিশনের খবর হেডকোয়ার্টার বা কোস্টগার্ড—কাউকেই দেওয়া হয়নি। ইনফরমেশন লিড শুধু একজনের কাছে ছিল। সারপ্রাইজ অ্যাটাক না হলে এই আন্তর্জাতিক চোরাকারবারীদের মূল সর্দারকে জীবিত ধরা সম্ভব নয়।'
অর্ণব আর ফাহিম চমকে একে অপরের দিকে চাইল। তাজধীর যে একদম নিরবচ্ছিন্ন গোপনীয়তা বজায় রেখে এত বড় একটা নেটওয়ার্ক একা হ্যান্ডেল করছিল,তা ভাবাই যায় না!
ঠিক তখনই যোগাযোগ লাইনে ভেসে এলো আরেকটি পরিচিত কণ্ঠ।
'সেহেরোজ রিপোর্টিং। আমি পৌঁছে গেছি।'
তাজধীর বলল,
'পজিশন?'
'নির্ধারিত জায়গায় আছি। নির্দেশের অপেক্ষায়।'
'ভালো। প্ল্যান অনুযায়ী এগোবো। কোনো পরিবর্তন নেই।'
বলতে বলতে একপল হাতঘরির দিকে চাইল তাজধীর। সময় একদম পারফেক্ট। পরবর্তী প্রতিটা পদক্ষেপের কমান্ড ছুড়ল,
'শোনো সবাই। অর্ণব, তুই ইস্টার্ন চ্যানেল ব্লক করবি। কোনো অবস্থাতেই যেন ওদের তিনটা স্পিডবোটের একটাও ওখান থেকে বের হতে না পারে। ফাহিম, তুই সাউথ সাইডের ওয়্যারহাউজের সাইলেন্সার স্নাইপার নিয়ে পজিশন নে। আমার গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া কোনো ওপেন ফায়ার হবে না। আর সেহরোজ তুই আর আমি ফ্রন্ট গেট কভার করব। সর্দারকে আমার জ্যান্ত চাই।গট ইট?"
'ইয়েস, কমান্ড একসেপ্টেড!'
তিনজন একযোগে নিচু গলায় সায় দিল।
তাজধীরের পরিকল্পনা ছিল একদম ছক-কাটা দাবার চালের মতো। ও জানত, শত্রুপক্ষ ভাবছে নেভি কেবল রুটিন তল্লাশি চালায়। কিন্তু তাজধীর তাদের মূল আস্তানা আর পালানোর ব্যাকআপ রুট দুটোই আগের দিন নিজের দূরদর্শী বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মার্ক করে রেখেছিল। শত্রুকে ভুল সিগন্যাল দিতেই ও সেদিন মিশন হোল্ড করেছিল, যাতে আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র ভাবুক নেভি পিছু হটেছে!
ভোর ৪টা ২০ মিনিট। তাজধীরের হাত থেকে একটা নীরব ফ্লেয়ার গান আকাশে উঠতেই মিশন শুরু হলো! ফাহিমের নিখুঁত স্নাইপিং মুহূর্তের মধ্যে আস্তানার বাইরে থাকা চারজন সশস্ত্র গার্ডকে মেঝেশায়ী করল,কোনো শব্দ ছাড়াই! অর্ণব ততক্ষণে ওদের পালানোর স্পিডবোটগুলোর ইঞ্জিন বিকল করে ইস্টার্ন চ্যানেল পুরোপুরি সীল করে দিয়েছে।
“নাউ! সেহরোজ মুভ!”
তাজধীরের বরফশীতল হুকুম পাওয়ার সাথে সাথেই ওয়্যারহাউজের ভারি কাঠের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করল তাজধীর আর সেহরোজ!ভেতরে তখন হুলুস্থুল পড়ে গেছে। পাচারকারী দলের মূল প্রধান, সেই কুখ্যাত ‘রেড স্কাল’ বাকিদের নিয়ে পেছনের সী-রুট দিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেহরোজ এর ক্ষিপ্র কমব্যাট মুভমেন্ট আর স্পেশাল কিক মুহূর্তে তিনজনকে মাটিতে আছড়ে ফেলল।
প্রধান সর্দার রিভলবার উঁচিয়ে সেহরোজ এর দিকে নিশানা করতেই সর্দারের হাতের ওপর পা চালিয়ে দিল তাজধীর!
'গেম ওভার!'
কয়েক মিনিটের টানটান উত্তেজনার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে এলো।পালানোর শেষ চেষ্টাটুকুও ব্যর্থ হলো।একজন...দুজন...তারপর একে একে সবাই ধরা পড়ল।ফাহিম দ্রুত সামনে এসে নিশ্চিত হয়ে বলল,
' সব টার্গেট কাস্টডিতে।'
অর্ণব গভীর শ্বাস ছেড়ে হেসে উঠল।
'ফাইনাললি!'
পরের দশ মিনিটের মধ্যে পুরো আস্তানা নেভি স্পেশাল ফোর্সের কব্জায়। কোটি টাকার অবৈধ চালান আটক, আর তার সাথে মূল অপরাধীসহ পুরো আন্তর্জাতিক গ্যাং হাতেনাতে গ্রেফতার!
সেহরোজ হাতে থাকা রিভলবারটা লক করতে করতে তাজধীরের দিকে চেয়ে একচিলতে গর্বিত হাসি দিল। বলল,
'তোর আগের দিনের ওই ব্যাকআউট করার চালটা না থাকলে আজকে এদের এই পজিশনে পাওয়া অসম্ভব হতো, তাজধীর। ব্রিলিয়ান্ট প্ল্যান!'
ফাহিম আর অর্ণবও এসে তাজধীরের কাঁধে চাপড় দিল,
'সত্যি ভাই! তোর মাথার খুলির ভেতরে যে কী পরিমাণ শয়তানি আর ঠান্ডা বুদ্ধি চলে, তা একমাত্র বেচারা অপরাধীরাই হাড়ে হাড়ে টের পায়!'
তাজধীর ওর অ্যাসাল্ট রাইফেলটা শোল্ডারে ঝুলিয়ে গগলসটা খুলে পকেটে পুরল। সাগরের বুকে ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। রক্তিম আলোর আভা এসে পড়েছে তাজধীরের গম্ভীর, সুগঠিত মুখে।
'সবাইকে বোটগুলোতে তোল। মিশন সাকসেসফুল। দশ মিনিটের মধ্যে বেইজে রিপোর্ট পাঠা!'
—————
মিশন শেষ। এত বড় একটা আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রকে একা হাতে, নিখুঁত ছক কষে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার পরও তাজধীরের চেহারায় কোনো অতিরিক্ত উত্তেজনার ছাপ নেই। বরং ওর ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন দেখে মনে হচ্ছে, ও স্রেফ বাজার থেকে শাকসবজি কিনে বেইজে ফিরেছে!এমনটাই ধারণা অর্ণবের।
ভোর সকালে প্রয়োজনীয় রিপোর্ট জমা দিয়েই ওরা নিজেদের কোয়ার্টারে ফিরেছে।ওদের ধরাবাধা নিয়মমত মিশন শেষে অর্ণব আর ফাহিম দুজনে তাজধীর এর কক্ষে আড্ডা মারার উদ্দেশ্য এগিয়ে যেতেই মুখের উপর ধুম করে দরজা লাগিয়ে দিলো তাজধীর। উপায়ন্তর না পেয়ে দুজনে মিলে আশ্রয় নিলো আপাতত সেহরোজ এর কক্ষে।
আজ সেহেরোজ ফিরে এসেছে। তাই অর্ণব আর ফাহিম সোজা ঢুকে পড়ল ওর রুমে।
দরজা খুলেই অর্ণব বলল,
'এই যে! হারিয়ে যাওয়া বীরপুরুষ অবশেষে নিজ গৃহে ফিরল!'
ফাহিম গিয়ে সোফা দখল করে বলল,
'উফ! শরীরটা একবারে ম্যাথম্যাথ করতাছে। সেহরইজ্জা তোর কফি মেকারটা কোথায় রে?'
সেহরোজ উত্তর না দিয়ে উল্টো আদেশ ছুড়ল,
'আগে জামাকাপড় চেঞ্জ করে আয়। শরীর থেকে মাছের গন্ধ আসছে!'
বলতে বলতে সোজা নিজের আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। টেনে খুলল আলমারির দুটো পাল্লা। কিন্তু পাল্লা খোলামাত্রই তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো হঠাৎ কুঁচকে এলো। আলমারির গুছিয়ে রাখা টি-শার্ট আর ক্যাজুয়াল শার্টগুলোর মাঝখানটায় স্পষ্ট অগোছালো হয়ে আছে। কাপড়গুলো কেমন যেন এলেমেলো। খুঁজে খুঁজে জামাকাপড় চেক করল সেহরোজ। বেশ কয়েকটা কাপড় মিসিং ওর।
এযাত্রায় সেহরোজ কপাল কোঁচকাল মারাত্মকক্যাবে। আলমারির ভেতর হাতড়ে এপাশ ওপাশ বেশ কয়েকবার চেক করল।
'তোরা কেউ আমার অবর্তমানে এই রুমে এসেছিলি?'
অর্ণব সোফায় এলিয়ে পড়ে আরাম করছিল। বন্ধুর এমন গম্ভীর প্রশ্ন শুনে চোখ বড় বড় করে বলল,
'আলহামদুলিল্লাহ! এত বড় অপবাদ!'
'ফাজলামো ছেড়ে যা জিজ্ঞেস করছি উত্তর দে, অর্ণব!'
অর্ণব বলল,
'না ভাই! এতোটাও বেকার নই আমরা। আমাদের পাছার পিছনে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা স্বয়ং গাব্বার সিং পাহারায় থাকে। বাথরুমে যাওয়ার টাইম পাইনা ঠিকঠাক!'
ফাহিম চিন্তিত হয়ে বলল,
'ক্যান রে? কী হইছে? রুমের কিছু চুরি গেছে নাকি?'
সেহরোজ চোয়াল শক্ত করে আলমারির দিকে ইশারা করে বলল,
'আমার ব্ল্যাক টি-শার্ট আর হুডিটা পাচ্ছি না। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আলমারির কাপড়গুলো হাতড়ানো হয়েছে। আমার এখান থেকে আরো অনেক কিছু মিসিং!'
কথাটা শোনামাত্রই অর্ণব সোফায় ঝট করে সোজা হয়ে বসল। মুখের ভাবটা এমন করল যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের কথা শুনে ফেলেছে!কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
'ব্যাপারটা আমি একদম বুঝলাম না ভাই! কিসের মধ্যে কী! কিছুদিন পর পর তোর জামাকাপড় হারায়, আর কিছুদিন পর তাজধীরের জিনিসপত্র গায়েব হয়ে যায়! তোদের এই দামি জিনিসগুলা আসলে চুরি করে কে বল তো? কোন চোরের তোদের দুই নেভি অফিসারের ওপরই বেশি পিরীত উথলায়া উঠছে?'
ফাহিম হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে বলল,
'আরে ভাই, চোরও বোধহয় বোঝে কোয়ার্টারে কার কাপড়ের কালেকশন ভালো!'
অর্ণব এবার নিজের টি-শার্টের হাতা টেনে টুনে হতাশ চিত্তে বলল,
'সত্যি বলতে কী ভাই, আমার এখন নিজেদের খুব ছোট মনে হচ্ছে! আমাদের কাপড়চোপড়গুলা কেমন পচা দেখ তো? চোর তো দূর, কোনো ভিক্ষুকও মানবতার খাতিরে আমাদের রুম থেকে একজোড়া মোজাও চুরি করে না! খালি তোদের দুজনের আলমারিই হাতড়াবে! আমাদের কপালে কি চোরের সান্নিধ্যও নাই?'
সেহরোজ এমনিতেই স্বল্পভাষী। তারউপর আসার পর থেকেই কোনো একটা অজানা কারণে মেজাজ বিগড়ে ছিল। অর্ণবের কথায় চড়া মেজাজটা আরো চড়াও হয়ে উঠল ওর। আলমারির দরজাটা সশব্দে ধাম করে বন্ধ করে দিয়ে গর্জে উঠল,
'অর্ণব! তোকে বলিনি আমার সঙ্গে এমন বাচালতা করবি না?'
অর্ণব এতটুকুও ভয় পেল না। সে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সেহরুজের কাছে এগিয়ে এলো।অতি-চিন্তিত একটা মুখ বানিয়ে বিচলিত কণ্ঠে আওড়াল,
'রেগে যাচ্ছিস কেন ভাই? আমি তো চোরের সাইকোলজি বোঝার চেষ্টা করতেছি! আচ্ছা, শোন তোর আলমারির সব চেক করছিস তো?তোর আন্ডারওয়্যারগুলা ঠিক আছে তো নাকি অহেতুক ভালোবাসার টানে ওইগুলাও টেনে নিয়ে গেছে ব্যাটা চোরে?'
'তোরা দুইজন কি ভালোয় ভালোয় এই রুম থেকে বের হবি? নাকি এখনই দুটোকে চ্যাংদোলা করে কিক মেরে সোজা সাগরের নোনা পানিতে ফেলে দিয়ে আসব?'
·
·
·
চলবে……………………………………………………